হোম অনুবাদ শরণার্থী জীবন

শরণার্থী জীবন

শরণার্থী জীবন
801
0

পাকিস্তানের জন্ম আমাকে আমার ঘরছাড়া করেছিল। কোনো এক গ্রীষ্মকালে যখন আমরা সিমলায় বসবাস করতাম, তখন দেশ ভাগ হয়েছিল। হঠাৎ এক ভোরে আমরা জানতে পারলাম যে, সেদিনই মধ্যরাতে ইন্ডিয়া স্বাধীনতা পেতে চলেছে এবং দেশটি দুইভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। সত্যি সত্যিই ইন্ডিয়া সেই মধ্যরাতে স্বাধীনতা পেল আর আমরা গৃহহীন ও নিঃস্ব হয়ে গেলাম। দর্জি যখনই ওর জমি, বাড়ি আর আমার নানার সম্পত্তির কথা মনে করত, যা উত্তরাধিকার সূত্রে আমার মায়েরই পাবার কথা ছিল—তখন ওর মন খারাপ হয়ে যেত। সেই ক্ষণগুলোতে আমিও চিন্তা করতাম আমার মাছ, গলার নেকলেস, বইপত্র আর মসৃণভাবে লিখতে পারা কলমগুলোর কথা।

আমার লাহোরের কথাও মনে পড়ে যেত। লাহোর মানেই তো আমার নিজের ঘর। আমার চোখের সম্মুখে ভেসে উঠত রাতের বেলায় আমাদের রাস্তার উপর দিয়ে চলে যাওয়া গরুর গাড়ির কথা। গাড়িগুলোর নিচে ঝুলিয়ে রাখা লন্ঠনের আলো রাস্তায় গড়িয়ে চলা চাকার ছায়াকে বিস্তৃত করে দিত। আমার মনে পড়ে যেত সিমলা পাহাড়ের শ্যাওলাপড়া পাথুরে রাস্তার কথা, যেখানে মধুতে পরিপূর্ণ বুনোফুলেরা জন্মাত। ওই ফুলগুলো তুলে বোঁটা ফেলে ফুলের মধু খেতে প্রচণ্ড ভালো লাগত।

আমার চোখের সম্মুখে ভেসে উঠত এক পশলা বৃষ্টির পর লাল মখমলের মতো দেখতে পোকাগুলোকে। যারা মৃদু সূর্যালোকেও জ্বলজ্বল করত। তাদের পিঠের উপর কালো কালো ফুটকি আর গলার চারপাশ ঘিরে কালো রঙের রিং। সেইসব উজ্জ্বল জোনাকি পোকাদের জন্য আমি শূন্যতা অনুভব করতাম। যাদের ধরে আমি একমুঠো তারার মতো ওড়নার ভেতর আটকে রাখতাম। কখনোবা ওদের এক হাতে রেখে অন্য হাত দিয়ে ঢেকে দিতাম। আর অবাক হয়ে দেখতাম ওদের শরীরের আলো আমার ত্বক আর হাড় ভেদ করে বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

ওখানকার চিড়িয়াখানার প্রায় প্রতিটা প্রাণীকেই আমি ভালো করে চিনতাম। ভোদরটা আমার অতি প্রিয় ছিল। সে ক্রমান্বয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলকেলি করত। ফের ডাঙায় উঠে এসে বাদামি ত্বকের বিভা ছড়িয়ে পুকুরের পাড়ে বসে থাকত। আর আমার সঙ্গে ওর বাঙ্ময় গোল গোল কালো নয়ন দিয়ে কথা বলে যেত। এবং আমি আমার বান্ধবী রোহিণীর জন্যও শূন্যতা অনুভব করতাম। পাহাড়ের দিকে যাত্রা করার পূর্বে আমরা দেখেছিলাম লেলিহান আগুনের শিখা সমস্ত শহরকে গ্রাস করেছে। আমাদের মনে ওই আতঙ্ক তখনও  দানা বেধে ছিল। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আমরা রাতভর ছাদের উপর দাঁড়িয়ে থাকতাম। আর একে অপরকে ডেকে কথা বলতাম ‘ওই যে শাহালমি পুড়ে যাচ্ছে।’ ‘ওই ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভাটি দরজা থেকে উঠছে।’ ‘গোলমান্ডির স্লোগান আমরা শুনতে পাচ্ছি।’


একজন প্রতিবেশী মেয়ের সঙ্গেও বন্ধুত্ব হলো। তার নাম ছিল সাভিন্দার। আমাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি ছিল দীর্ঘক্ষণ ধরে হাঁটাহাঁটি করবার নেশা। এবং আমাদের এই স্বভাবের উপর আমাদের দুই পরিবারের নিষেধাজ্ঞা ছিল।


ক্যাম্পগুলো পরিপূর্ণ ছিল রাওয়ালপিণ্ডির পথোহরের এবং উত্তর-পশ্চিমের সম্মুখে প্রদেশের মানুষে। তাদের জন্য কাপড় সেলাই করা হচ্ছিল, তুলা দিয়ে লেপ বানানো হচ্ছিল। হাজার হাজার বাড়িতে দিবারাত্র তাদের জন্য খাবার রান্না করা হতো। শের-ই-পাঞ্জাব অমর সিংহ এবং জ্ঞানী গুরুমুখ সিংহ মুসাফির আমাদের ছাদে তেরঙ্গা টানানোর কাজ করছিল দর্জির সঙ্গে। সময়টা ২৬ জানুয়ারি। ওই সময়ে ওসব করা রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ভিতরে ছিল। এবং ওইসব করতে প্রচণ্ড সাহস লাগত। পরবর্তীকালে ওরাই জেলে যাওয়া মানুষদের পরিবারকে এবং শরণার্থী শিবিরে থাকা দুর্ভাগা মানুষগুলোকে দেখাশোনার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দর্জি বাড়িতে ফিরে বিজীকে (ফুপু) ওদের গল্প বলত। সেসব শুনে আমি বিষণ্ন বোধ করতাম। এবং ওই মুহূর্তে আমার বাবাকে নিয়ে গর্ববোধ করতাম। কিন্তু আমরা কথা বলছিলাম আমার ছোট্ট বাড়িটা নিয়ে, যার দেয়ালে একটা মাছ পেরেকে ঝোলানো ছিল। ওই ঘরটা সেই দুঃখের সময়ে হারিয়ে গিয়েছিল, যেন এক শিশু কোনো মেলায় গিয়ে তার বাবাকে হারিয়ে ফেলার মতো।

সময়ের সাথে আমি সিমলাতে বসবাসে অভ্যস্ত হতে শুরু করলাম। আমি কিছু ঝোপঝাড়ের সাথে পরিচিত হলাম, পায়ে চলা কিছু পথের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলাম। কয়েকটা বৃক্ষের সঙ্গে আমার গোপনতা ভাগাভাগি করলাম। একজন প্রতিবেশী মেয়ের সঙ্গেও বন্ধুত্ব হলো। তার নাম ছিল সাভিন্দার। আমাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি ছিল দীর্ঘক্ষণ ধরে হাঁটাহাঁটি করবার নেশা। এবং আমাদের এই স্বভাবের উপর আমাদের দুই পরিবারের নিষেধাজ্ঞা ছিল। তারা কিছুতেই ভালো নজরে দেখত না যে, আমাদের বয়সী কোনো মেয়ে একা একা হেঁটে বেড়াবে। সাভিন্দারের বাবা-মা বলত যে, ওরা আর ছোট নেই। সাভিন্দারের মায়ের বান্ধবীর স্কুল পড়ুয়া ছেলের সঙ্গে ওর বিয়ে প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। ও যদি এরকম দড়ি ছেঁড়া জন্তুর মতো ঘুরে বেড়ায় তাহলে তো সমস্যা। এসব ওর পরিবারের জন্য অসম্মান বয়ে আনবে। আর আমার বাবা-মা বলত যে, আমি বড় হচ্ছি—তাই আমার এরকম ঘোরাঘুরি বাদ দেওয়া উচিত। ঘুরে বেড়ানো বাদ দিয়ে ভালো কোনো কিছু শেখা উচিত। আমি যত্রতত্র ঘুরে বেড়ালে, আমার জন্য পাত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

যেভাবেই হোক বা অন্যভাবে আমরা আমাদের  বাবা-মার কাছ থেকে অনুমতি আদায় করে নিয়েছিলাম—যেন আমাদের একসঙ্গে বাইরে ঘোরাঘুরি করতে দেয়, যদিও আমরা কোনো সময় একা একা বেরুতাম না। এর বাইরে আমাদের আর কোনোই মিল ছিল না। সে অনর্গল বলে যেত তার সর্বশেষ জামা-কাপড়, ম্যাচ করা ওড়না, শৌখিন জুতো এবং জুয়েলারি সম্পর্কে। এমনকি সে অকপটে তার হবু স্বামী এবং শ্বশুর বাড়ি সম্বন্ধে বলে যেত। আমি সামান্যতম আগ্রহান্বিত ছিলাম না তার ভবিষ্যৎ পরিবার নিয়ে। এবং আমার বাবা-মা তেমন অবস্থাতেও ছিল না যে, আমাকে তারা নিত্যই নতুন জামা-কাপড় ও ম্যাচকরা জুতা-স্যান্ডেল কিনে দেবে। ওইসব দিনগুলোতে আমি সাধারণ পোষক-পরিচ্ছদেই অভ্যস্ত ছিলাম। হালকা রঙের সালোয়ার কামিজের সেট, সঙ্গে মসলিনের চাওড়া ওড়না। এবং আরামদায়ক জুতো-স্যান্ডেল। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর বিশেষ সুবিধা হিসেবে আমি হাঁটাহাঁটির সময় পরার জন্য একজোড়া ক্যানভাস শু পেয়েছিলাম।

বহু বছর পরে, আমার পরিচয় যখন বলদেবের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে, আমি হঠাৎ আবিষ্কার করলাম—বলদেব হলো সেই স্কুল পড়ুয়া ছেলে যার সঙ্গে ছোটবেলায় সাভিন্দারের বিয়ের কথা হয়েছিল। যদিও ওই সময়ে আমি খুবই ছোট ছিলাম, কিন্তু আমার সচেতনতা ও ভালোমন্দ বুঝার ক্ষমতা অনেক বেশি পরিপক্ব ছিল। আমি বলদেবকে বলেছিলাম, ‘আমি এখন থেকে আর তোমার সাথে দেখা করব না। তুমি সাভিন্দারের।’  একথার উত্তরে বলদেব বলেছিল—‘আমি অনেক পূর্বেই ওই বাগদান ভেঙে দিয়েছি। ওটা তেমন কিছ্ইু ছিল না। শুধুমাত্র দুই বান্ধবীর ছেলেখেলা ছিল। এবং আমি তাদের দাবার ঘুটি হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছি।’

তখন থেকে আমি প্রায়ই চিন্তা করতাম—আমার এই গৃহহীন, যাযাবর অস্তিত্বের কারণ, যা আমার অজান্তেই ছিল। এবং সাভিন্দারের স্বপ্নগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। কিন্তু যদি অন্যের স্বপ্নের পৃথিবীকে ধ্বংস করে দেওয়া মানুষেরা নিজেদের ঘর না-ই বাধতে পারে, তাহলে বলদেবের ঘর কীভাবে গড়ে উঠল? (দোয়া করি সে যেন আরও শত-সহস্র বৎসর উন্নতি করতে  পারে)। আমি এসব ভেবেও বিস্মিত হয়ে যাই যে, হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ গগনচুম্বী অট্টালিকা তৈরি করার জন্য অন্যদের বাড়ি-ঘর  কীভাবে ধ্বংস করে দেয়? হয়তো তারা বাড়ি তৈরি করে। বড় বড় কক্ষ বিশিষ্ট প্রাসাদের মতো অট্টালিকা। কিন্তু তা ঘর নয়। আমি যখনই সিমলার পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম, তখুনি দর্জি জালানধার একটা বাড়ি ঠিক করল এবং আমরা ফের নতুন এলাকায় আবাস গড়লাম।


নিজের ঘর-বাড়ি হারিয়ে ফেলার চাইতেও অধিক শোকাবহ ছিল এই বাড়িতে বসবাস করা। যে বাড়ির দেয়ালে মাকড়সার ঝুলগুলোতে আগেকার বাসিন্দাদের চাপা আর্তনাদ মিশে ছিল।


রেলস্টেশন থেকে আমাদের রিসিভ করতে এসে সে তার এক পুরানো বন্ধুর কথা বলছিল। সে তখন জালানধারে কমিশনার ছিল। ওই ভদ্রলোক দর্জিকে বলেছিল, ‘খালি হয়ে যাওয়া সম্পত্তি থেকে একটা বাড়ি অাগে পছন্দ কর। আমি ওটা তোমাদের নামে করে দেব।’ দর্জি একটা দোতলা হলুদ রঙের বাড়ি ঠিক করেছিল। জি.টি. রোডের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। বাড়িটা এতই বড় ছিল যে, এর জানালাগুলো খুললে জি.টি রোড এবং সমান্তরাল সব বাড়ির জানালা দেখা যেত। ওই বাড়িটাকে বলা হতো খিড়কীওয়ালি পিলী হেভিলি (জানালাওয়ালা হলুদ রঙা বাড়ি)। দর্জির ক্লিনিক ছিল বাড়িটির নিচতলায়, জি.টি রোড ঘেষে। এর উপরের অংশটা মামাজি ও তার পরিবারকে দেওয়া হয়েছিল। তখন পর্যন্ত তারা শেকড়হীনভাবে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমরা নিচতলার অংশতেই থাকতাম। ওপরতলার রুমগুলো বড় ছিল, যা বিজীর জন্য পরিষ্কার করা কষ্টকর ছিল। যাইহোক, ওই বিল্ডিংয়ে কোনো পানির কল ছিল না। নীচতলার উঠানে একটিমাত্র  চাপকল ছিল। উঠোনের সামনের দীর্ঘ প্রশস্ত  বারান্দাটিকে আমরা রান্নাঘর, বৈঠকখানা এবং ঘুমোবার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতাম। ভেতরের রুমগুলো ছিল অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং নোংরা। এবং একটা রুম ছিল প্রচণ্ড রকম ভীতিজনক। প্রতিবেশী এক মহিলা বিজীকে জানিয়েছিল যে, হেভিলির এই বাড়িটিতে প্রথম দিকে যারা থাকত, তারা ছিল মুসলিম। এবং তাদেরকে ভেতরের রুমগুলোতে হত্যা করা হয়েছিল। যদিও আমি জানি না তা সত্য নাকি মিথ্যা? কিন্তু এখনও, ওই সমস্ত ছায়াচ্ছন্ন রুম থেকে কারও দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়, ঠিক বিষণ্ন ও চাপা আর্তনাদের মতো।

হেভিলির দেয়ালগুলো বিজীকে স্মরণ করিয়ে দিত যে, লাহোরের গুজরানওয়ালায় তার বাড়ি। এবং তার পিতামাতার স্মৃতি তাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত করে তুলত। নিজের ঘর-বাড়ি হারিয়ে ফেলার চাইতেও অধিক শোকাবহ ছিল এই বাড়িতে বসবাস করা। যে বাড়ির দেয়ালে মাকড়সার ঝুলগুলোতে আগেকার বাসিন্দাদের চাপা আর্তনাদ মিশে ছিল। আমি মাঝে মাঝে চিন্তা করতাম, যদি এই বাড়ির আগের বাসিন্দাদের কেউ বেঁচে থাকত, তাহলে তারা নিশ্চয়ই তাদের পুরাতন বাড়িটার কথা মনে করত। ওই অদৃশ্য মানুষেগুলোর কথা চিন্তা করে আমি প্রায়ই কাঁদতাম। বাড়িটার ভেতরের ছোট একটা কুঠুরিতে আমি ইউনানী ওষুধ এবং উর্দুভাষায় লিখিত কয়েকটা ধর্মগ্রন্থ আবিষ্কার করেছিলাম। সেখানে কিছু উপন্যাসও ছিল। আমাদের জালানধারে থাকার দিনগুলোতে ওই রুমটিই আমার ‘ঘরে’ পরিণত হয়।

আমরা জালানধার থেকে ফের সিমলা ফিরে গিয়েছিলাম এবং দিল্লী আসার জন্য সিমলা ছেড়েছিলাম। কিন্তু বাস্তুহারা মানুষের বসতি স্থাপন বা অস্থাপন নিয়ে কি-ই বা বলার আছে? দিল্লীতে আমরা দেবনগরের নুল্লাহর কাছে একটা বাড়িতে থাকতে আসলাম। ওই বাড়িটা ছিল দর্জির এক দূরসম্পর্কের ভাইয়ের। ওই বাড়ির চারটি অংশ ছিল। দুটো নিচে আর দুটো উপরে। নিচতলার উঠানে দুটো অংশের শিবিরের মধ্যবর্তী ভূমি হিসেবে কাজ করত। উপর তলার দুটো অংশ দেয়াল তুলে আলাদা করা ছিল।

আমাদের ছিল দুটো রুম। সামনের প্ল্যাটফর্মের অর্ধেক। একটা ছোট বারান্দা, বাথরুম আর ছিল উঠান—যা সকলেই ব্যবহার করত। গ্রীষ্মকালের রাত্রিগুলিতে আমরা উপরের উঠানের এক চতুর্থাংশ জুড়েই থাকতাম। ওটা কোনোভাবেই ঘর ছিল না। বড়জোর ওটাকে একটা বাড়ি বলা যেত,  সেখানে আশ্রয় পাওয়া গিয়েছিল। ওই বাড়িতি কারও নিজস্ব বা আলাদা কোনো জায়গা ছিল না। এর কয়েকমাস পরই আমরা দেবনগরের জন্য একটি বাড়িতে চলে গেলাম। যে বাড়ির ছোট্ট লন ফুলে পরিপূর্ণ হয়ে থাকত। আর রাতের বেলায় গেইটে তালা পড়ে যেত। বাড়িটাতে ছিল তিনটা বেশ প্রশস্ত রুম—যা আলো-হাওয়াতে ভরে থাকত। ছাদের ওপরেও একটা রুম ছিল এবং একটা স্টোররুমও ছিল।  আমার একটা আলাদা রুম ছিল, যাতে আমি ঘুমাতাম ও পড়াশুনা করতাম। আমার রুমটা ছিল ঠিক রান্নাঘরের উল্টা দিকে। রান্নাঘরের দরজাটা খোলাই থাকত। আর বিজীর সতর্ক চোখ দুটো আমাকে অনুসরণ করত।

ওই সতর্ক দৃষ্টির বিরুদ্ধে আমার প্রবল বিদ্রোহ এই রুমটাতেই শুরু হয়। ওয়েল্ডিং টর্চের মতো যার প্রচণ্ড উত্তাপ আমায় সমস্ত সত্তায় ক্রমাগত পটাপট আওয়াজ তুলত। ঠিক গলে যাওয়ার পূর্বে স্ফুলিঙ্গের উদগীরণ হতো আর ঠান্ডা হবার পর আরও শক্ত হয়ে যেত। আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টাদিকের বাড়িতে দিশ নামক এক মেয়ে বসবাস করত। ওই অন্তহীন গলন এবং জমাট  বাধার প্রক্রিয়া সমাপ্ত হলে দিশের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ছিল তীব্র  আনন্দদায়ক। অনেকটা শীতল জলে ডুব দেবার মতো প্রশান্তিদায়ক। আমার প্রতিবাদ আরেকটু কম হিংস্র হলে, ও বিজীর উপর আমার রাগ ও বিরক্তি অত তীব্র না হলে, দিশের সঙ্গে আমায় বন্ধুত্ব এতটা প্রগাঢ় হতো না।


দিশের বাড়িতে আমি ছিলাম শরণার্থীর মতো। আমার বাড়িও দিশের কাছে একই রকম ছিল। বিষয় যা-ই হোক না কেন—আমাদের কোনোখানেই শান্তি ছিল না।


নিজের বাড়িতে দিশও কড়া নজরদারিতে থাকত। দিশকে নজরবন্দী রাখার জন্য আরও অনেক মানুষজন নিযুক্ত ছিল। ওই বাড়িতে সাতভাই আর তাদের পরিবার বসবাস করত। সাত ভাইয়ের এক ভাই ছিল দিশের বাবা। সবচাইতে ছোট ভাইটি ভাইদের মাঝে সর্বোচ্চ শিক্ষিত ছিল। তার এম.এস.সি ডিগ্রী ছিল। ছোট ভাইটি তাদের দ্বিতল বাড়ির গ্যারেজে রঙ বানাতো। তার অন্য ভাইয়েরা ওই ব্যবসায় সাহায্য করতো। ওই ছোট ভাইটি পুরো পরিবারকে নাদির শাহর মতো শাসন করত। ওই কাজে সাহায্য করত তার অমৃতসরি স্ত্রী।

দিশের বাড়িতে আমি ছিলাম শরণার্থীর মতো। আমার বাড়িও দিশের কাছে একই রকম ছিল। বিষয় যা-ই হোক না কেন—আমাদের কোনোখানেই শান্তি ছিল না। ওর বাড়িতে বিরতিহীনভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলত। সারাদিনই ওই বাড়িতে কাপড় ধোয়া হতো অথবা রুটি বানানোর প্রস্তুতি চলতো। খাবারের সময় ওদের নিচের বারান্দা আর উঠানের দৃশ্যাবলি আমাকে গুরুদুয়ারের  লঙ্গরের কথা স্মরণ করিয়ে দিত। দিশ এবং আমি সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরোতে শুরু করলাম। গা ঘেষাঘেষি করে আমরা হাঁটতাম। হাঁটতাম হাত ধরাধরি করে। প্রায়ই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে।

আমাদের এলাকা থেকে সরকারি কোয়ার্টারের পেছনের একটা গলিপথ ধরে আনন্দ পর্বতে যাওয়া যেত। ওই গলির একপাশে ছিল বিল্ডিংগুলির পেছনের দেয়াল। অন্যপাশে ছিল সরকারি কোয়ার্টারগুলোর বাগানের নিচু সীমানা পাঁচিল। দিশ আর আমি ওই নিচু সীমানা পাঁচিলের ওপর বসে রাজ্যির গল্প করতাম। একদিন দিশ আমাকে অসম্ভব মিষ্টি একটা কথা বলল। এমনই মধুর ছিল সে কথা যে, আমার মা-ও  তেমন করে কোনো কথা আমাকে বলে নাই। ওই মধুর বাক্যের প্রতিক্রিয়ায় আমি দিশের হাত আমার হাতে নিয়ে চুম্বন করলাম। তক্ষুণি কাছাকাছি কোয়ার্টারের বাসিন্দা এক মহিলা বারান্দায় এল। কোমরে হাত রেখে কনুই দুটি বাইরের দিকে বাঁকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘এই মেয়েরা, তোমাদের নিজেদের বাড়িতে বসে গল্প করার জায়গা নেই? এক্ষুণি এই দেয়াল থেকে নামো আর নিজেদের বাড়িতে চলে যাও।’

ওইদিন আমাদের দুজনেরই প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর কষ্ট হয়েছিল। আমি জানিনা কেন আমার মুখ লজ্জায় পুড়ে গিয়েছিল এবং আমি দিশের কানে ও গালে রক্তিমাভা দেখেছিলাম। ওই মহিলার দিকে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে আমি আর দিশ ওখান থেকে কেটে পড়লাম। ঠিক চোরের মতো। এরপর অনেকদিনই ওই মহিলার কথা আমার কানে বাজত—তোমাদের নিজেদের বাড়িতে জায়গা নেই?

সে যা বলেছিল তা ছিল নিদারুণ সত্য। আমাদের বাড়িতে সত্যিই  আমাদের নিজের কোনো জায়গা ছিল না!

papree.rahman@gmail.com'

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।
লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং অনুবাদক।

গল্পের বই:
লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা (২০০০)
হলুদ মেয়ের সীমান্ত (২০০১)
অষ্টরম্ভা (২০০৭)
ধূলিচিত্রিত দৃশ্যাবলি (২০১০)
মৃদু মানুষের মোশন পিকচার (২০১২)
মামুলি জীবনের জলতরঙ্গ (২০১৪)
Lilies, Lanterns, Lullabies (২০১৪) Edited By Niaz Zaman
শহর কিংবা ঊনশহরের গল্প (২০১৬)

উপন্যাস:
পোড়া নদীর স্বপ্নপুরাণ (২০০৪)
মহুয়া পাখির পালক (২০০৪)
বয়ন (২০০৮)
পালাটিয়া (২০১১)

সম্পাদনা:
ধূলিচিত্র (সাহিত্যপত্রিকা)
বাংলাদেশের ছোটগল্প : নব্বইয়ের দশক
গাঁথাগল্প (যৌথ), লেখকের কথা (যৌথ)
অ্যালিস মানরোর নির্বাচিত গল্প (যৌথ)
Women Writing from Bengal (Joint)

গবেষণা : ভাষা শহীদ আবুল বরকত
আত্মজীবনী : মায়াপারাবার (২০১৬)

ই-মেইল : papree.rahman@gmail.com
papree.rahman@gmail.com'