হোম অনুবাদ লোরকা’র চিঠি

লোরকা’র চিঠি

লোরকা’র চিঠি
775
0

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র জন্ম ১৮৯৮ সালের ৫ জুন, স্পেনের আন্দালুসিয়ার গ্রানাদা’য়। তার গ্রামের নাম ফুয়েন্তে ভাকুইরোস। উনিশ বছর বয়সে বের হয় তার প্রথম বই, ১৯১৮ সালে, ছায়ারেখা এবং ভূ-দৃশ্যাবলী। মূলত, ভ্রমণকাহিনি। বইটিকে বলা হয় স্পেনের চিত্রকলা, ভূ-দৃশ্যাবলী এবং ইতিহাস নিয়ে এক তরুণ কবির গভীর ধ্যান। গ্রানাদা’র সূর্যাস্ত, ক্যাথিড্রালগুলির গথিক স্থাপত্যরীতি, পর্বতমালার সৌন্দর্য থেকে তিনি যেন স্পেনের অন্তর্নিহিত চেতনার রূপটিকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯১৯ সালে বন্ধুত্ব হয় লুইস বুনুয়েল আর সালভাদোর দালি’র সঙ্গে। পাবলো নেরুদা, রাফায়েল আলবেরতি, হুয়ান রামোন হিমেনেথ—এইসব দুনিয়াখ্যাত লেখক ছিলেন তার বন্ধু। এ বছরই লোরকা রচনা করেন তার প্রথম নাটক ‘প্রজাপতির কু-মন্ত্র’। মাদ্রিদের তিয়েত্র এলসাভা’র মঞ্চে, পরের বছর এই নাটকের চারটি প্রদর্শনী হয়। তার উল্লেখযোগ্য নাটক হলো রক্তবাসর, ইয়ারমা, বারনারদা আলমা’র বাড়ি, পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে। ১৯২১-এ বের হয় ‘কবিতা বই’। তার মা, দোনা ভিসেন্তা, কিশোর বয়সেই নাটক আর গানের প্রতি আগ্রহের বীজটি বুনে দিয়েছিলেন, যে-আগ্রহ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার ভিতর তীব্র ছিল। গানকে তিনি বলতেন গভীর গান। গভীর গানের উপর তিনি প্রথম বক্তৃতাটি দেন, গ্রানাদায়, ১৯২২ সালে। পিয়ানো আর গিটার বাজাতে দক্ষ ছিলেন। ১৯৩৩ সালের ১৬ই অক্টোবর বুয়েন্স আইরেসে ‘কিভাবে একটি নগরী গান গাইতে থাকে, নভেম্বর থেকে নভেম্বরে’ শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন—আজ আমি সেই ছেলেটির মতো, কোনো উৎসবের জন্য নিজের মাকে রঙিন সাজে সাজতে দেখে যে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে, ঠিক তেমনিভাবে আমি আপনাদেরকে একটি নগরীর কথা বলব, যেখানে আমি জন্ম নিয়েছিলাম। তার নাম গ্রানাদা। আর গ্রানাদা’র কথা বলতে গিয়ে আমি এই নগরীর সংগীতের বিভিন্ন উদাহরণ দিব। আমি গানগুলো গাইবও… এই গভীর গান হলো স্পেনের আন্দালুসিয়ার মানুষের মুখে মুখে ফেরা গীতি; এই গান ছিল গারসিয়া লোরকা’র আত্মা। ১৯২৫ সালে দালি’র বোন আনা মারিয়া দালির সঙ্গে হয় প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। তার সবচেয়ে বড় কাজ হিশেবে বিবেচিত জিপসি-গীতিকা বের হয় ১৯২৮ সালে। তার অন্যান্য কবিতাবইগুলি হলো : গভীর গানের কবিতা, গীতিমালা। ১৯২৯-এর জুনে চলে যান আমেরিকায়। ধনতান্ত্রিক আমেরিকা তাকে চরমভাবে আহত করে। নিউইয়র্কে কবি বইয়ে তিনি আমেরিকাবাসের এক রক্তাক্ত প্রতিক্রিয়া লেখেন, দেশটির সমালোচনা করেন। ১৯৩৬-এ বের হয় আরেকটি কবিতা বই—প্রথম গানগুলি। ১৯ আগস্ট ১৯৩৬-এ স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়, ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো’র ফ্যাসিবাদী প্যারামিলিশিয়া ব্ল্যাক স্কোয়াডের সদস্যরা তাকে হত্যা করে। তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় নি।

বন্ধুদের কাছে লেখা লোরকা’র চিঠিগুলিই তার স্মৃতিকথা, তার আত্মজীবনী। মূল এস্পানিওল থেকে ইংরেজিতে David Gershator অনূদিত Selected Letters, FEDERICO GARCIA LORCA, First published in Great Britain in 1984 by Marion Boyars Ltd, London বইটি থেকে নেয়া হয়েছে। ভাষান্তর করেছেন এমদাদ রহমান।


চিঠি-১ : আন্তনিও গালিগো বুরিন’কে লিখিত

[আসকুইরোসা, ২৭ আগস্ট, ১৯২০]

প্রিয় আন্তনিতো,
একটু একটু করে পারিবারিক বন্ধন আর ভালোবাসা উত্তরোত্তর ক্ষয় করে দিচ্ছে কাপড়ের ফালির মতো আমার হৃদয়টাকে। আমাকে খুব দৃঢ়ভাবে বোঝানো হচ্ছে, আমি যেন তাদের প্রত্যাশাকে অবশ্যপালনীয় কর্তব্য বলে মনে করি। আমি যেন আমার ডুবতে থাকা জীবনটাকে রক্ষা করতে স্নাতক হই আর একজন পেশাজীবী হিশাবে জীবনটা কাটিয়ে দিই—তুমি কী ভাবছ? বাবা ইতোমধ্যেই আমার ব্যাপারে তার ভাবনা জানিয়ে দিয়েছেন : আমি যেন মাদ্রিদ চলে যাই। আত্মীয়স্বজনরাও তা মেনে নিয়েছেন। এই মেনে নেওয়ার ব্যাপারটা হয়েছে উপায়ন্তর না দেখেই। আসলে, আমার চাওয়ার মতো তো আর তাদের চাওয়া নয়। এক-কথায়, তারা কেউই আমার উপর খুশি নন। আমি ভবিষ্যতে কিছু করে খেতে পারব না ভেবে বাবা খুব অস্থির আর খুব ব্যথিত। তিনি এসব জেনেও ব্যথিত যে, আমার আগ্রহটা ঠিক স্নাতক হওয়া নয়, আগ্রহটা, অন্যান্য জিনিসের প্রতি আমার প্রচণ্ড টান। গতকাল বললেন, ‘দেখো ফেদেরিকো, তুমি স্বাধীন, তোমার যেখানে যাওয়ার ইচ্ছা সেখানে যাও, তোমাকে এই কথাটি বলবার কারণ, আমি এটাই বুঝতে পেরেছি যে শিল্পের সাধনার প্রতি তোমার আছে দুর্নিবার টান; কিন্তু তবুও, এটা আমাকে বলো কেন তুমি পড়ালেখা শেষ করছ না? আর আমাকেও শান্তি দিচ্ছ না? তা তুমি যেভাবেই পার না কেন, আমার কথাগুলো কি বুঝতে কষ্ট হচ্ছে?’ তুমি যদি এই সেপ্টেম্বরে অন্তত কয়েকটি বিষয় পাশ কর, তাহলে চরম আনন্দের সঙ্গেই আমি তোমাকে মাদ্রিদ চলে যেতে বলব, আর আমার মনে হবে তুমি আমাকে সম্রাট বানিয়ে দিয়েছ!… দেখলে তো প্রিয় বন্ধু, আমার বাবা কতটা সঠিক করে ভাবলেন আমাকে নিয়ে। তিনি ইতোমধ্যেই বুড়ো হয়ে গেছেন আর সেকারণেই চাইছেন যে আমি যেন কোনো একটি পেশায় ঢুকে পড়বার মতো শ্রীমণ্ডিত হয়ে যাই। তাই, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। পড়াশোনাটা এবার শেষ করবই। বেচারা (মারতিয়েন দোমিনগোয়েজ) বেরুতা’ও মারা গেছে, (আমার এই অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছে যে তাকে ছাড়াই পরীক্ষাগুলো দিতে যাচ্ছি), আমি নিবন্ধন করব—বিনা পয়সায় পড়তে আসা ছাত্রদের মতো, আমার সেই গুরুসদনে।


আমি কাজ করে যাচ্ছি মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাবার জন্য। মরে মরে বেঁচে থাকবার জন্য আমি কিছুই করতে চাই না।


আর, এখানেই আমার প্রশ্ন : আমি আসলেই কী করব? আমি এখন দু’টি নাটকের কিছু অংশ নিয়ে কাজ করছি, যার ভিতরে ব্যবহার করেছি একটি কবিতা—’সেই শিশু পপলারগুলি’, আর, যেমনটা সব সময় করে থাকি, আমার গীতিধর্মী কবিতার ক্ষেত্রে। তুমি অবশ্যই, আন্তনিতো, আমার আত্মার অংশ তুমি, আমার উদ্দাম, বেপরোয়া এইসব সন্তানদের উত্থান ছাড়া, আমার আত্মার কান্না আর হৃদয়ের ক্ষরণ ছাড়া, কিভাবে বিপুল মৃত ইতিহাস আর মৃতপ্রায় ধারণাগুলিকে প্রেমময় স্পর্শ দিব? অথবা কিভাবে এই উভয় ভারহীন গুরুভারকে নিজের ভিতর বহন করতে সক্ষম হব? বিশ্বজনীন ইতিহাস থেকে আরও এগিয়ে গিয়ে আমাকে সব কিছুকে পাশ করতে হবে। পরীক্ষার জন্য আমি কোন বিষয়টা পাশ করতে সক্ষম? তুমি কি মনে কর আমি যদি বেছে নিই ইতিহাস, প্রাচীন লিপি-বিজ্ঞান (যা হয়তো আমার পাশ করার জন্য সহজ হবে), মুদ্রা ও পদকবিদ্যা কি আমার জন্য সঠিক হবে? তাহলে হয়তো আমি পাশ করে ফেলব, যারা পরীক্ষা দিবে তাদের সঙ্গে। তবে এটা এমন নয় যে আমি কোনো কাজ করতে রাজি নই (আমি তো যন্ত্রণা ভোগ করতে শুরু করেছি আর এটাই তো কাজ), কিন্তু ব্যাপারটা বড়ই ঝামেলাপূর্ণ, আর আমিও তোমাকে বলছি—’আমার ত্রাণকর্তা!’ ঘুরে দাঁড়াবই।

আমি আসলে সেপ্টেম্বরের পরীক্ষায়, অন্তত কয়েকটি বিষয়ে পাশ করে, বাবাকে সুখী করতে মনস্থির করেছি। তারপর আমি আমার বইগুলোর প্রকাশের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব, আর পেইপে ওরতেগা’র সঙ্গে মিলে দর্শনের খুঁটিনাটি পড়তে শুরু করব, খুব নিরিবিলি কোনো জায়গায়; আমার কাছে কিছু বিশেষ প্রতিজ্ঞা করেছিল সে।

ফিরতি মেইলে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আর সত্যিকার অর্থেই পরিস্থিতি এখন কেমন তা জানাও। বিশেষ করে এটা জানাও,—আরবি আর হিব্রু কি পাইয়ের মতোই সহজ হবে [হোশে] নাভারো’র কাছে গেলে? (কিভাবে এই পৃথিবীতে আমি শিখতে পারব হিব্রু আর আরবি?) (খুব শীঘ্রই আমাকে পাশ করতে হবে), তুমি তো দীর্ঘদিন ধরেই এই অনুষদের [কলা ও বিজ্ঞানের] প্রশিক্ষক, তুমি অবশ্যই এই বিষয়গুলো সম্পর্কে, অধ্যাপকদের সম্পর্কে আর [বাতিল করছি] আর [ওহ, ব্যাকরণ!] অসঙ্গতিগুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখ।

গুরুত্বের সঙ্গে বলছি, তোমার কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব আন্তনিতো। আমার আশা, আমাকে তুমি সত্যিকার অর্থেই সাহায্য করবে যেমনটা ইচ্ছা করছি আর যেমনটা আশা করছি। দয়ালু হও এমনভাবে যাতে দ্রুত তোমার চিঠি থেকে সবিস্তার জানতে পারি।

আমার এই গ্রামটা কী চমৎকার। কেন তুমি কিছুদিনের জন্য এখানে চলে আসছ না? আর আমি পুরো গ্রামটাকে আমার আত্মার ভিতর গভীরভাবে আশ্রয় দিয়েছি। তুমি যদি দেখতে পেতে সেইসব ভুতুড়ে শিশিরবিন্দুভর্তি সূর্যাস্তগুলো, সেই অপরাহ্ণের শিশিরবিন্দু, দেখলে মনে হবে যেন মৃতদের জন্য ঝরছে, যেন তারা সেইসব বিপথগামী প্রেমিকদের জন্য নেমে আসছে, যাদের পরিণতি সেই একই! তুমি যদি দেখতে পেতে এই বিষণ্ণ খালগুলোর বিষাদ আর সেই জলযন্ত্রগুলোর চাকার জপমালার মতো ধীর আবর্তন! আমি প্রত্যাশা করছি এই দেশ, এই গ্রাম আমার গীতিকার শাখাগুলোকে, অপরাহ্ণের লাল ছুরি দিয়ে এই পবিত্র বছরে পরিমার্জিত করে দিবে।

পরবর্তী চিঠি না আসা পর্যন্ত তোমার ছাত্র-কবি এবং পিয়ানোবাদক-জিপসি বন্ধুর ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গন।

ফেদেরিকো


চিঠি-২ : মালশোর হেরনান্দেথ আলমাগরোকে লিখিত

[গ্রানাদা, জুলাই; ১৯২১]

প্রিয় মালসোরিতো,
যদিও তুমি এখন আর আগের মতো বন্ধু নও, আমাকে আর আগের মতো গ্রাহ্যও কর না, তবুও; আমি এখনও তোমার বন্ধুই আছি, এখনও তোমাকে ভীষণভাবে পছন্দ করি। আমি আজ নিজেকে অনুমতি দিয়েছি তোমাকে লিখব বলে যাতে তুমি আবারও মনে করতে পার যে আমি এখনও বেঁচে আছি। আমি এখনও দেশেই আছি, কী অপূর্ব, স্বর্গের মতো এক দেশ! আমার সমস্ত স্মৃতিকেই আমি দেখতে পাচ্ছি মূরদের মতো আদলজাগা মুখে, বিষাদে পূর্ণ চাঁদে, রেজিনা ক্যাফেতে, সন্ধ্যায়।

আমার কাজ চলছে… (কিছুই বলো না), আমি কাজ করে যাচ্ছি মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাবার জন্য। মরে মরে বেঁচে থাকবার জন্য আমি কিছুই করতে চাই না।

আসলে, নিজেকে আমি নতুন করে গড়ছি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিচ্ছি এই জন্য যে, দিনের পর দিন ধরে আমি আমার আকাঙ্ক্ষা আর বিভ্রমগুলোর সমন্বয় করতে পেরেছি!

আমি কিছু অদ্ভুত সংলাপ লিখে ফেলেছি, সংলাপগুলো এতই গভীরতাহীন যে তারা অগভীর বলেই গভীর, প্রগাঢ়। প্রতিটি সংলাপ শেষ হচ্ছে একটি গানের সঙ্গে। ইতোমধ্যেই আমি শেষ করে ফেলেছি ‘কুমারী’, ‘নাবিক আর ছাত্র’, ‘পাগল আর পাগলী’, সিভিল গার্ডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল’ আর ফিলাদেলফিয়া বাইসাইকেল’-এর সংলাপ, এবং নাচের সংলাপ। এই নাচের সংলাপ নিয়েই এখন কাজ করছি।

প্রকৃত কবিতা। নগ্ন। আমি বিশ্বাস করি যে তারা ধারণ করে গভীর আগ্রহ আর আসক্তি। তারা আমার অন্যসব কাজ থেকে অনেক বেশি বৈশ্বিক (যেগুলোকে, আলাদা আলাদাভাবে, সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবার মতো কিছু পাই নি)।

তুমি যদি উত্তর দাও আর যদি আমাকে ভালোবাস, তাহলে কিছু লেখা তোমাকে পাঠাব।

দ্রুত লিখো। ভুলে যেও না। আমি আশা করছি যে তুমি গ্রানাদা’য় আসছ। আমার প্রচণ্ড আগ্রহ আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে মিলে তোমার সম্মানে খাওয়ার আয়োজন করব। আমি তোমাকে পান করাব, কাব্যের রস।

ম্যালসোরিতো, আমাকে জানাও তো মাদ্রিদে এখন ঠিক কী হচ্ছে।

আমাদের বন্ধুদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ রইল—পেইপে বারগামিন এবং গুইলিয়েন, এবং অন্য সবাইকে।

গুইলিয়েন হচ্ছে মুগ্ধ করবার শক্তি। তার বাড়িতে আমার জীবনের অবিস্মরণীয় কিছু মুহূর্ত কাটিয়েছি। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে বলো যে আমার তেরেসিতাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখব আর তাকে পাঠিয়ে দিব।

বিদায়, বন্ধু। একবার আলিঙ্গন এবং আরেকবার। পরিবারের সকলের প্রতি ভালবাসা আর শ্রদ্ধা। আঠার তারিখ পবিত্র সন্ত দিবস। আমাকে লিখো—অতীতে এবং ভবিষ্যতে। বিদায়।

ফেদেরিকো (প্রাক্তন কবি)


চিঠি-৩ : হোসে দে সাইরা এসকেলেন্তে’কে লিখিত

[আসকুইরোসা, ৩০ জুলাই, ১৯২৩]

কী সুন্দর দেখায় লেবুগুলোকে
এক ঐশ্বর্যময়ী নারীর বুকে!

[ড্রইং : চারটি লেবু]

প্রিয় পেপিতো,
দীর্ঘ এক গাড়িভ্রমণ শেষে, অনেক খোঁজাখুঁজির পর তোমার পোস্টকার্ডটা পেয়েছি। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ আমার কবিতার প্রশংসার জন্য, যেগুলো তুমি এখনও দ্যাখো নি।


শব্দকে এখন আরও বেশি কিছু মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে মৃদু আলোই যেন আলোকস্ফুরণ, রহস্যময় ধ্বনিতরঙ্গ আর অর্থবোধ।


এবারের গ্রীষ্মকালটা কেটেছে জ্বর আর খুব তিক্ততা নিয়ে, আর বিরক্ত হয়েছি কবিতার অবিরাম আগমনে; এই ব্যাপারটা আমার জীবনকে অসম্ভব করে তুলেছে। আর এ কারণেই স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমার সমস্ত মনোযোগকে এখন ‘চাঁদের বাগানের আঙুরফল’-এর উপরেই নিয়ে আসব। অন্য কবিতাগুলোকে আপাতত ত্যাগ করব, তাদেরকে দেখতে শুরু করব আরও কিছুদিন পর। গতকাল বৃদ্ধা রাখালকন্যা আমারিলি আমার এখানে এসেছিল। সে তার ঘর থেকে বের হয়ে এসেছিল সনেটের এক জ্যামিতিক রাতে—আমার জন্য; আর এসেছিল তার গানগুলো গাইতে। বয়সের ভারে কাঁপতে থাকা আমারিলির মাথায় অগোছালো ফুলের মুকুট! সে নাকি আলত্রাইস্ত্রাস ঘুরে এসেছে, ওখানকার সবাই ইভের সঙ্গেই আছে, ভবিষ্যৎবাদী ইভ, তারা আমারিলিকে গুরুত্ব দেয় নি। তার প্রতি সামান্য মনোযোগও দেয় নি… বিষয়টা আমার কাছে খুবই লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াল। আমি তার সঙ্গে আন্তরিক কথা বললাম, তাকে দুধ মিশিয়ে কফি খাওয়ালাম। তার কাছে প্রতিজ্ঞা করলাম যে আমার একটি কবিতায় আমারিলি পুনর্বার জেগে উঠবে, যে-কবিতায় সে গান গাইবার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকবে। তাকে ঘিরে ধরবে ঘুগরা আর জোনাকিপোকারা,—স্ফটিক আর কড়াগন্ধের নার্সিসাসের মাঠে। যদি সে কখনও তোমার আর গেরারদো দিয়েগো’র কাছে বেড়াতে যায়, তাহলে তার সঙ্গে খুব অমায়িক ব্যবহার করতে হবে; আমরা তো জানিই সে কতটা বৃদ্ধা। যেকোনো সময় সে মারা যাবে। আমারিলি’কে নিয়ে এই কবিতাটি তুমি উপলব্ধি করতে পারবে বলেই আজ লিখে শেষ করলাম আর চাঁদের বাগানের অদ্ভুত আঙুরফল দিয়ে তাকে ঘষামাজা করলাম।

কবিতাটির কয়েকটি খসড়া পাঠাচ্ছি। শর্ত এটাই, অন্য কাউকেই এগুলো পড়তে দেয়া যাবে না। এখনও এগুলো শুধুই খসড়া। কী, শর্ত মানতে প্রতিজ্ঞা করতে রাজি?

শব্দকে এখন আরও বেশি কিছু মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে মৃদু আলোই যেন আলোকস্ফুরণ, রহস্যময় ধ্বনিতরঙ্গ আর অর্থবোধ। যখন লিখতে শুরু করি তখনই আমি সত্যিকার অর্থেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি!… আর কী মহত্তম আনন্দ, প্রাচীন কবিরা আমাকে দিয়েছেন! … পেপিতো, ফিরতি চিঠিতে বলে দিও আমার দীন পঙ্‌ক্তিগুলো সম্পর্কে তুমি কী ভেবেছ। কিন্তু, অন্য কাউকেই এগুলো পড়ে শোনাতে পারবে না! এখন, প্রতিদিনই ভাবছি, খুব শীঘ্রই আমার ‘গীতিমালা’কে প্রকাশ করব।

সেপ্টেম্বরেই আমি আর ফালা দ্বিতীয়বারের মতো ‘বিলি ক্লাব পাপেট’-এর জন্য প্রদর্শনীর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এই পুতুলনাচে আমরা একটি ডাইনি-উপাখ্যান তুলে ধরব, যেখানে মানুয়েল দে ফাইয়া’র প্রেতলোকের সংগীত ব্যবহার করা হবে, এরনেস্ত হাফতার আর আদলফিতো সালাযার আমাদের সহযোগী হিশাবে কাজ করবে। আমার পক্ষ থেকে অনুরক্ত শুভেচ্ছা রইল আমাদের কমরেড, গেরারদো দিয়েগো’কে।

তুমি ছাড়া আর কেউ যেন আমার পঙ্‌ক্তিগুলো না পড়ে!

আমাকে লিখতে দেরি করো না, তোমার কাজগুলো আমাকে দেখাও। বিদায়। তোমার কবি—

ফেদেরিকো

 

এত কিছু পাঠাবার পরও তুমি আমাকে সরাসরি কিছু লিখতে না চাও, তাহলে স্পষ্ট করে শুধু এটুকুই বলো যে এগুলো নিয়ে তুমি আসলে কী ভাবছ। না হলে সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাব আর তোমাকে কখনই কিছু উৎসর্গ করব না।
.
যে কবিতাগুলো তোমাকে দিচ্ছি :
.
অজাত শিশুটির জন্য ছোট্ট গান, শুভ্র বনদেবতা, চাঁদের বলয়গুলি, অন্য ছোট নকশা, পৃথিবী/আকাশ, ধীরে ঘণ্টাধ্বনি।

চিঠি-৪ : হোর্হে গুইলিয়েনকে লিখিত

[ল্যায়ারন, ৬ আগস্ট, ১৯২৬]

মি. হোর্হে গুইলিয়েন (কবি), বিদ্যামন্দির, ভ্যালাদোলিদ।

কার্ডের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

আমি কিন্তু আকাঙ্ক্ষিত ছিলাম আর একটি চিঠির আশা করছিলাম। আমি এখন সিয়েরা নেভাদা’য় আছি, বিকালের দিকে নেমে যাচ্ছি সমুদ্রে! এই দক্ষিণের ভূমধ্যসাগর কী অদ্ভুত! দক্ষিণ! দক্ষিণ! (বিস্ময়কর শব্দ এই দক্ষিণ)।

চরম কিছু অবিশ্বাস্য কল্পনার জন্ম হয় এই যৌক্তিক আর প্রশান্ত পরিবেশে। আন্দালুসিয়ার বৈচিত্র্যসমূহ মিশে যায় স্থির আর পরিশুদ্ধ উত্তরে।

আমি কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, যথারীতি। জিপসি গীতিকা শেষ করবার স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছি প্রায়। এখানে আমি আরও কয়েকখানি গীতিকা লিখেছি যার ভিতর দিয়ে আমার অভিপ্রায় এক দুর্দান্ত সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, বলতে পারি। এমনকি, আমি তোমাকে কবিতা এবং কবিতাশ্রিত-শিল্প বিষয়ক একটি লেখা পাঠাব, যে-লেখাটি অবধারিতভাবেই হয়ে যাবে এক দীর্ঘ কবিতা, একঘেয়ে কাঠামোঘেরা, বিশৃঙ্খল এবং বিরক্তিকর। হ্যাঁ, আমার হৃদয়ের কবিতা। হ্যাঁ, আমারই কণ্ঠস্বরের অলংকারবহুল ভাষাচিত্র।

জারমেনে আর তোমাদের বাচ্চাদের—তেরেসিতা আর ক্লাওদিয়’র জন্য অনেক অনেক ভালবাসা।

আর তোমাকে উষ্ণ আলিঙ্গন করছে—

ফেদেরিকো


চিঠি-৫ : আনা মারিয়া দালি’কে লিখিত

[১৯২৬-এর প্রথম দিকে]

প্রিয় বন্ধু আনা মারিয়া,
তোমার চিঠির উত্তর এখনও লিখতে পারি নি কারণ বেশ কয়েকদিন ধরেই আমি জ্বরে ভুগছি, খুবই জাঁক-জমক-পূর্ণ জ্বর, আমাকে একেবারে শয্যাশায়ী করে ফেলেছে আর আমিও তাকে সেবা করে যাচ্ছি; যা সে আকাঙ্ক্ষা করেছে!

এই জ্বরের শুরুটা হয়েছিল এক নিখাদ কোমল ভীতিজাগানিয়া সুর দিয়ে, যা চোপিনের টেমপো রুবাতো’র অনুরূপ; সুরটাকে আমি বদলে নিয়েছিলাম এক শক্তিশালী আর জটিল ধরনের ছন্দবদ্ধ রূপে, আমার উদ্দেশ্য ছিল এই পরিবারের লোকগুলোকে খানিকটা ভয় পাইয়ে দেয়া, যাতে তারা ভীত, বিভ্রান্ত হয়ে ঘরের উপরতলা আর নিচতলায় দৌড়াদৌড়ি করে! ব্যাপারটায় ভালোই কাজ হয়েছে।

এজন্য আমি মনস্তাপে পুড়লেও, ব্যাপারটা অবশ্য দাঁতের ব্যথার মতো যন্ত্রণাদায়ক কিছু ছিল না! দাঁতের ব্যথাটা ছিল আমার কাছে নিদারুণ যন্ত্রণার। সমস্ত চেতনাকে জানান দিয়ে আসা তীব্র ব্যথার আক্রমণ। ব্যথা কমে যাওয়ার পরও এখনও অল্প অল্প অনুভূত হচ্ছে। তীব্র যন্ত্রণাকর এই ব্যাপারটায় আমি একেবারে হলদে হয়ে গিয়েছিলাম, কানগুলো হয়েছিল কাগজের মতো। আহ, ব্যথাটা এখন আর নেই!

আবহাওয়া সুন্দর হতে শুরু করতে না করতেই গ্রানাদা’র মেয়েরা—যাওয়া ধরেছে চুনকাম করা মনোরম টেরেসে, পর্বতগুলো দেখবার জন্য, তবে সমুদ্রে নয়। উজ্জ্বল ত্বক আর চুলের মেয়েরা বের হতে শুরু করেছে সূর্যস্নানে আর ঘন-বাদামী চুলের শ্যামাঙ্গী মেয়েরা দাঁড়িয়ে রয়েছে ছায়ার মাঝে। যারা বাদামি-চুলের মেয়ে—টেরেসের প্রথম তলায় তারা নিজেদের দেখে নিচ্ছে, আয়নায়। তারা তাদের উশৃঙ্খল চুলের ঢেউয়ে সেলুলয়েড চিরুনি ঢুকিয়ে দিল! আহা!!

বিকেলে তারা পরে নিল রেশম আর অন্তঃসারশূন্য সিল্কের পোশাক, তারপর তারা চলে গেল বিহারে, যেখানে হীরক-প্রস্রবণ বয়ে চলেছে, যেখানে রাখা আছে প্রাচীনকালের নির্যাতনের গোলাপ আর ভালোবাসার বিষাদ, যে-বিষাদ এখনও সেই আগের মতোই আছে! তারপর তারা বানবনের ভিতর পুরে নেয় কেক আর চকলেট, একটি দোকান থেকে, দোকানটির নাম হওয়া উচিত ছিল ‘পারিস দে ফ্রানসিয়া’, কিন্তু তার নাম হয়েছে ‘পাখির খাঁচা’। গ্রানাদা’র সামাজিক জীবন ভরপুর হয়ে আছে কবিতা আর গানে, যাতে আছে শুধুই অবক্ষয়।


আমি এখন খুব রক্তাক্ত কিছু কবিতা লিখছি, রক্তনালীগুলোকে বিক্ষত করবে—এমন কবিতা


ভূমধ্যসাগরীয় গাছগাছড়ারা তাদের অপূর্ব ধূসর রং নিয়ে এখানে যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছে। আগাভি আর জলপাই। এখনও গ্রানাদা’র মেয়েরা সমুদ্র পছন্দ করে না। তাদের কাছে আছে বিশাল ঝিনুক-খোল, যেখানে আঁকা আছে সমুদ্রদৃশ্যের অনুষঙ্গগুলো। এই ছবিই তাদের সমুদ্র। তাদের ঘরের দেয়ালে দেয়ালে ঝুলানো আছে বিশাল সব শঙ্খ, এই শঙ্খ দেখাই তাদের কাছে শঙ্খধ্বনি শোনা!

কী ভাগ্যবান তুমি, আনা মারিয়া, একই সঙ্গে মৎস্যনারী আর রাখালকন্যা। একই সময়ে তোমার দেহঘেরে ঘনরং জলপাই আর শুভ্রতা, হিম ফেনায়। জলপাইকুঞ্জের ছোট্ট মেয়ে তুমি, সমুদ্রের বোনঝি।

মারিয়া, গ্রানাদা’য় আমি ক্লান্ত, বিরক্ত। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাইছি—মাঝেমাঝেই, এবং খুব সম্ভবত কিছুদিনের ভিতর। আমার আনন্দ হবে তোমাকে সম্ভাষণ জানাতে পারলে!

ততক্ষণ পর্যন্ত বন্ধুত্বের শ্রেষ্ঠটুকু তোমাকে দিচ্ছে—

ফেদেরিকো

 

এখানে পশুরা এসেছিল!
.
তুমি কি জানাতে পারবে—রোজিনল’কে শ্রদ্ধা জানাতে ঠিক কতজন পশু জড়ো হয়েছিল?
হ্যাঁ।
.
[সান্তিয়াগো রোজিনল উনিশ শতকের একজন কবি, ভূ-দৃশ্যাবলী ও প্রতিকৃতিশিল্পী। জন্ম : স্পেনের বার্সেলোনায়, ১৮৬১ সালে। ‘নূহার নৌকা’ নামে তিনি একটি বিশেষ গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন, যে-গোষ্ঠীর সদস্যদের নামকরণ করা হতো বিভিন্ন পশুর নামে।]

চিঠি-৬: হোর্হে যেলমেইকে লিখিত

[সেপ্টেম্বর, ১৯২৮]

প্রিয় হোর্হে,
অবশেষে তোমার চিঠি পেয়েছি, অবশ্য আমিও তোমাকে একখানা লিখেছি এবং ছিঁড়েও ফেলেছি! এবারের গ্রীষ্মটা তোমার ভালো যায় নি, জানি। ভাগ্যগুণে, শরৎকাল—যে-কাল আমাকে নতুন জীবন দান করে—এসে পড়েছে। তবে, আমারও খুব খারাপ সময় যাচ্ছে, খুবই বাজে অবস্থা। আমাদের প্রত্যেকের জন্যই প্রচুর আনন্দের দরকার, হ্যাঁ, ঈশ্বর আমাকে তা দিয়েছেনও, তবে তা কিন্তু সুখের জঞ্জাল বানাবার জন্য নয়; নিজের ভিতরকার দ্বন্দ্বের সমাধানেরই দরকারে, যা কিনা আমাকে পরে, অনেক পরে, আকস্মিক আঘাত করবে; তবে, ঈশ্বর আমাকে কখনই ছেড়ে যাবেন না। এর মধ্যে আমি প্রচুর কাজ করেছি এবং এখনও করছি। আমার গীতিকাব্য নির্মিত হয়ে যাবার পর,—এগুলোর ভিতরে, বা, এগুলো নিয়ে অনেক আশা, অনেক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে আমার। বিশেষ কিছু একটা করে ফেলবার পর আমি এই ধরনের কবিতার উৎসার-আবর্ত থেকে দূরে সরে যাব। আমি এখন খুব রক্তাক্ত কিছু কবিতা লিখছি, রক্তনালীগুলোকে বিক্ষত করবে—এমন কবিতা, যারা খুব কৌশলে বাস্তবতাকে পরিহার করবে, যে-বাস্তবতার সঙ্গে মিশে থাকবে প্রচণ্ড আবেগ আর মূর্ত হয়ে উঠবে সবকিছুর প্রতি আমার ভালোবাসার প্রচণ্ড অনুভব, সবকিছুর প্রতি তীব্র উপহাস। মৃত্যুর জন্য ভালোবাসা, মৃত্যু নিয়ে মশকরা। ভালোবাসা। আমার হৃদয়। এইসব ফিরিস্তি হলো কিভাবে আমার আজকালকার কাজকর্ম চলছে, তার। পুরোটা দিন—যেন আমি এক কারখানা—কবিতা লিখলাম; তারপর, বুক ফুলিয়ে একজন খাঁটি আন্দালুসিয়ানের মতো চলে গেলাম রক্তমাংসের উল্লাসের এক পানশালায়। আন্দালুসিয়া বিস্ময়কর। বিষমুক্ত প্রাচ্য। ক্রিয়াকৌশলহীন পাশ্চাত্য। প্রত্যেকটি দিনেই আমি নতুন নতুন বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। দক্ষিণের শরীর, তুমি যদি হেঁটে হেঁটে তার পুরোটা দেখে ফেলতে পার, তাহলে অবশ্যই তুমি তাকে ধন্যবাদ দিতে ভুলবে না। এতকিছুর পরও আমি ভালোও না, সুখীও না। গ্রানাদা’র আজ প্রথম শ্রেণির ধূসর দিন। হোয়েরতা দে সান ভিয়েনে,—(আমার মায়ের নাম ভিয়েন্তা),—যেখানে আমি থাকি, আজ সেই জায়গাটি থেকে উল্লসিত ডুমুর আর ঝাঁকড়া ওক গাছগুলোসহ পর্বতমালার বিপুল বিস্তৃত দৃশ্যপট ফিরে ফিরে দেখছি (তার আবহমণ্ডলের কারণে), ইউরোপের অদ্ভুত সৌন্দর্য।

এই চিঠি দেখেই তুমি বুঝতে পেরেছ যে আমি গালো স্টেশনারি থেকে লিখেছি! হ্যাঁ, এখান থেকেই আমাদের সাময়িকীর কাজ শেষ করছি আর তার তৃতীয় সংখ্যার ছাপার কাজও চলছে, এখানে।

আশা করছি, এই সংখ্যাটি হবে অসাধারণ।

বিদায়, হোর্হে। এখানে তোমাকে প্রীতিপূর্ণ আলিঙ্গন করছে।

ফেদেরিকো


চিঠি-৭: এঞ্জেল দেল রিও’কে লিখিত

[ইডেন মিলস, আগস্ট, ১৯২৯]

প্রিয় এঞ্জেল,
তোমাকে ইডেন মিলস থেকে লিখছি। সময়টা দারুণ। প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্যগুলি বিস্ময়কর হলেও মনে হচ্ছে তা অনন্তকাল ধরে বিষণ্ণ। বিষণ্ণতার ব্যাপারটা আমার জন্য খুব ভালো একটা অভিজ্ঞতা অর্জনের মতো। হ্যাঁ, আমি তোমাকে সবকিছু খুলেই বলছি। তবে, আমি এখন শুধু এটাই জানতে চাচ্ছি যে আমার সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটানোর মতো অবসর কিভাবে খুঁজে বের করছ?

অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে। আমি এখন যে-পরিবারটির সঙ্গে থাকছি, তারা আসলেই চমৎকার। খুব অমায়িক আর কোমল আনন্দে তারা ঝলমল করছে। কিন্তু এখানকার ঘন জঙ্গল আর লেকগুলি, আমাকে আমার ক্ষমতার চেয়েও অধিক বেপরোয়া এক কাব্যিক ঘোরের ভিতর নিমজ্জিত করে ফেলেছে! আজ সারাদিন লেখা এসেছে আর এখন এই রাতের বেলা নিজেকে বড় নিঃস্ব লাগছে। এঞ্জেল—প্রতিউত্তরে জানাও কিভাবে তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব। যখনই এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছি—ঘরে বসে পান করছি আর সেই ঘরে তুমিও আছ… ভাবনাটা আমাকে সুখী করছে।

রাত গভীর হচ্ছে। তেলের বাতিটা জ্বলছে আর আমার পুরো ছেলেবেলাটা আবার যেন ফিরে আসছে—পপি ফুলের উল্লাসে আর শস্যক্ষেতের উজ্জ্বলতায় মোড়ানো—ছেলেবেলা। এই বাড়িতে যে-ফার্নগুলো পেয়েছি, তাতে মাকড়শার জাল জড়ানো, আর, লেকের জলে আজ একটা ব্যাঙও ডাকছে না! আমার নাজুক হৃদয়ের জন্য কনিয়াক অতীব জরুরি। দ্রুত উত্তর দাও। আমি তোমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে রওয়ানা হই। এমিলিয়া’র জন্য স্নেহ আর শুভকামনা। বাচ্চাদের ছোট্ট পায়ে চুমু।

আর, তোমাকে অন্তর দিয়ে আলিঙ্গন করছে—

ফেদেরিকো

 

(ইডেন মিলস থেকে তোমাকে প্ররোচিত করছি রোমান্টিসিজমের উগ্র সুরায়।)
.
আমাদের ভ্রমণের পথ কোন দিকে গেছে, জানাও। যদি তোমার পক্ষে পথটা সহজতর হয়, তবে আমাকে বিস্তারিত জানিয়ে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দিও।টেলিগ্রামের জন্য আমার ঠিকানাটা এমন— [ফিলিপ], এভাবে টাইপ করা থাকবে। যদি তুমি টেলিগ্রাম পাঠাতে চাও, তাহলে আমি এভাবেই পেয়ে যাব। অন্যথায়, আমি নিউইয়র্ক ছেড়ে চলে যাব। সম্ভবত, বৃহস্পতিবার। জায়গাটা আমার জন্য স্বর্গ কিন্তু এখানকার ধূলিময় আবহাওয়া আমাকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলছে। মনে হয় এ-কারণেই খুব প্রশান্ত হয়ে আমার স্মৃতিগুলো বার বার ফিরে আসছে আর বড় জ্বালাতন করছে।
বন্ধু, বিদায়!

চিঠি-৮: রেজিনো সেইলজ দে লা মাঝা’কে লিখিত

[গ্রানাদা? ১৯৩১]

প্রিয় রেজিনো,
আমি কখনোই চাই নি তোমার জিজ্ঞাসার জবাব আগেভাগে দিয়ে দিতে, কারণ, আমার জানা ছিল না যে কী তোমাকে বলা যায়। হ্যাঁ, আমি কাজ করছি। এই তো শেষ করে ফেললাম ‘পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে’ নাটকটি। ভালোয় ভালোয় নাটকের কাজটা শেষ করতে পারায় বেশ তৃপ্তি পাচ্ছি, আর হ্যাঁ, ‘ইয়েরমা’ নাটকটি জিরগু’র মঞ্চে অভিনয়ের জন্য প্রায় আধাআধি পর্যন্ত শেষ করে এনেছি। এটা একটা দারুণ প্রচেষ্টা, রেজিনো। পাশাপাশি একটি কবিতাবইয়ের কাজও গুছিয়ে ফেলেছি, মৃত্যুর জন্য কবিতা। কবিতাগুলো খুব তীব্র, প্রগাঢ়। এখনও, মৃত্যু নিয়েই আমার বলবার মতো কিছু কথা রয়ে গেছে! আমি, প্রকৃত অর্থেই, এক প্রস্রবণের আদিমুখ। দিনরাত লিখছি। লিখছিই। এই সময় আমি যেন এক প্রাচীন রোমান্টিক, কিন্তু এই অলীক কল্পনাবিলাসটুকুকে মর্ম থেকে না তাড়িয়ে এক বিপুল, খুব সচেতন এক সৃষ্টির দিকেই আমার যাত্রা।


নিজেকে প্রশান্ত করো। আজকের স্পেনে ইউরোপের সবচেয়ে সৌন্দর্যময় কবিতা লেখা হচ্ছে।


আমি এখন তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, সৃষ্টির জন্য এমন উন্মাদ হওয়ার পর, ঠিক কখন তুমি আমার সঙ্গে আবার মিলিত হবে? আমি তোরেলাভিগা’য় একটি বক্তৃতা দিতে যাচ্ছি, আরেকটি বক্তৃতা দিব সানতানদারে। তুমি যদি অন্য কোথাও চাও, তবে সেখানেই বক্তৃতা দেবো। আমি এইসব কাজের কথা তোমাকে বলছি তার কারণ হলো তুমিই এখন আমার ম্যানেজার, এবং সবকিছু। আমার সবকিছুই তুমি দেখভাল করবে,—যা আমি কখনোই ঠিক মতো করে উঠতে পারি নি, অথবা, যেসব কাজ করতে গিয়ে ভয়ের কারণে পিছিয়ে এসেছি।

আমি তোমার সঙ্গে কিছুদিন থাকতে চাচ্ছি এবং নতুন কিছু লেখা পড়াতে চাচ্ছি। উত্তর দিও। আর যদি তোমারও আমার সঙ্গে কয়েকদিন কাটাতে ইচ্ছা করে, তাহলে আমাকে কী করতে হবে জানিয়ে দিও।

জেসোফিনা’কে (দে লা সরনা) ভালোবাসা। মিস কনসা (ইসপিনা), প্রিয়জন হোর্হে লুই পারিস (লুই দে লা সেরনা)-কে, যাকে আমি একটি নাটকে চরিত্ররূপে এনেছি; এবং সকলকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

দ্রুত জানাও। তাহলে, নিজেকে তৈরি করব কিনা কিংবা আদৌ তৈরি হওয়া দরকার কিনা, বুঝতে পারব। এক’হাজার বার তীব্র আলিঙ্গন আর শ্রদ্ধা জানাচ্ছে তোমার—

ফেদেরিকো (তোমার প্রশ্রয়ে)

 

কোসিও খুব আগ্রহের সঙ্গেই বলেছে যে, আমি যেন আমার আগমন বিষয়ে তাকে বিস্তারিত জানাই।

চিঠি-৯: মিগুয়েল হারনেন্দেজকে লিখিত

[১৯৩৩]

প্রিয় কবি,
আমি তোমাকে ভুলে যাই নি। এখানে জীবনকে যাপন করতে গিয়ে বড় বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছি আর চিঠি লেখার কলমগুলিও আমার কাছ থেকে যেন দূরে সরে গেছে!

তোমাকে প্রতিমুহূর্তেই মনে করছি, কারণ,—আমি তো এই ব্যাপারটা খুব ভালো করেই জানি যে তারা তোমাকে উৎপাত করছে, তুমি আক্রান্ত হয়ে পড়েছ এক শ্রেণির শূকরবৎ মানুষের দ্বারা, আর এই বিষয়টা আমার জন্য ভয়ানক যন্ত্রণাকর ব্যাপার এই কারণে যে আমাকে খুব তীব্রভাবে বুঝে নিতে হচ্ছে তোমার প্রাণশক্তি আর সেই ক্ষমতা যা কী না ঘোড়ার আস্তাবলের ভিতর আলোকোজ্জ্বল শক্তিমত্তার আর সমস্ত বাধাবিপত্তির বিপ্রতীপে বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে-থাকা এক বন্ধুর লড়াই।

হ্যাঁ, তুমি এভাবেই লড়াই করতে শিখেছ। এই পন্থাতেই তুমি শিখে যাবে কিভাবে জীবনে প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজের ওপর কর্তৃত্ব তৈরি করবার ভয়ানক শিক্ষানবিশি। তোমার বই নীরবতা দিয়ে ঘেরা—পৃথিবীর সমস্ত প্রথম বইয়ের মতো, আমার প্রথম বইটিরও মতো। আর এই নীরবতারও আছে বিপুল জাদু আর শক্তি। নিজের আনন্দে, লেখ। পড়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করো। যুদ্ধ করো। নিজের কাজ নিয়ে নিজে কখনও অহংকার করো না। তোমার বইয়ের ভিতর অনেক শক্তি আছে, আছে অনেক অনেক আশ্চর্য হওয়ার মতো প্রসঙ্গ, এবং অত্যন্ত চমৎকারভাবে ঘৃণা আর ক্রোধের এক মনুষ্যচিত উন্মোচনের উৎকৃষ্ট চোখ, কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ সাহসী নয়। যে-সাহসের কথা তুমি বলে থাক, যা প্রায় সকল কবির ভিতরেই আবশ্যকীয়রূপেই বিদ্যমান থাকে।

নিজেকে প্রশান্ত করো। আজকের স্পেনে ইউরোপের সবচেয়ে সৌন্দর্যময় কবিতা লেখা হচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে, মানুষের কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না তোমার ‘পেরিতো এন লুনাস’ (আয়নার কুশলতা) কখনই নির্বোধ নীরবতা প্রত্যাশা করে নি। না। এই বই প্রত্যাশা করে তীব্র ধ্যান, মনোযোগ, উৎসাহ আর সকলের ভালোবাসা। যা তোমার অধিগত এবং সামনের দিনগুলোয় যা তুমি হয়ে উঠবে, কারণ তোমার ভিতর আছে কবির রক্ত। এমনকি তুমি যখন অক্ষরগুলো দিয়ে কিছুর প্রতিবাদ লিখছ, তোমার আলোকোজ্জ্বল আর যন্ত্রণাদগ্ধ হৃদয়ের কোমলতা দিয়ে, তুমি তখনও নিষ্ঠুর বর্বরোচিত ব্যাপারগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পার (যা আমার খুব পছন্দের)। আমি অবশ্যই তোমার এইসব বিষয়কে পছন্দ করব, যদি তুমি এই ঘোর থেকে বের হয়ে আসতে পার। এই ঘোর হলো কবিকে বুঝতে-না-পারার ঘোর। অন্যভাবে বলতে গেলে, এই ঘোর হলো অধিকতর উদার রাজনৈতিক এবং কাব্যিকতায় আচ্ছন্ন অবস্থা। আমাকে লিখ। আমি আমার কিছু বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছি যাতে করে তাদের ভিতর ‘আয়নার কুশলতা’ নিয়ে কোনোরকমের আগ্রহ তৈরি হয় কিনা, এটা দেখতে।

কবিতার বই, প্রিয় মিগুয়েল, খুবই মন্থর গতিতে এগিয়ে চলে। ধীরে। খুব ধীরে।

আমি তোমাকে পুরপুরি বুঝতে পারছি এবং তোমাকে আমার পক্ষ থেকে দিচ্ছি ভ্রাতৃসুলভ অভিন্নহৃদয়ের আলিঙ্গন, যে-আলিঙ্গনে ভরে আছে তোমার প্রতি মমতা আর পারস্পরিক আস্থা।

ফেদেরিকো

এমদাদ রহমান

গল্পকার ও অনুবাদক
জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৭৯; বাদেসোনাপুর, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল স্টাডিস অ্যান্ড পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন-এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প [গল্প, চৈতন্য, ২০১৪]

ই-মেইল : emdadrahman777@gmail.com