হোম অনুবাদ লেখালেখি আমাকে নিজেকে নিয়েও বিদ্রূপের সুযোগ দেয়

লেখালেখি আমাকে নিজেকে নিয়েও বিদ্রূপের সুযোগ দেয়

লেখালেখি আমাকে নিজেকে নিয়েও বিদ্রূপের সুযোগ দেয়
782
0

পল বিটি, একজন প্রথম আমেরিকান লেখক যিনি ২০১৬ সালে দ্য সেলআউট উপন্যাসটির জন্য ম্যান বুকার পুরস্কার জিতেন। দ্য সেলআউট—বর্ণবাদের বিষয় ধারণ করা অসামান্য একটি উদ্ভট হাস্যরসাত্মক কাহিনি—যার জন্য তিনি বিশ্বের সবার কাছে অনন্যসাধারণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। বিটির লেখায় তার রহস্যময় কৌতুকরসবোধ ও গভীর অন্তর্দৃষ্টি লক্ষ করা যায় এবং ডোনাল্ট ট্রাম্পের সময়ে জিইই জয়পুর সাহিত্য উৎসবে তার রাজনৈতিক শুদ্ধতাসহ সবকিছু মিলিয়ে তার অনেক, হাজার ভক্তের সংখ্যা বাড়ে। জেএলএফ অফিসিয়াল থেকে ব্লগার অর্জুন ভাটিয়ার সাথে তার লেখার বিভিন্ন বিষয়, চিন্তাভাবনা, সামাজিক প্রভাব, পরিবর্তন এবং নিজস্ব ভাবনা নিয়ে আলাপের সুযোগ হয়। সেই সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেছেন তরুণ কবি দেবাশীষ ধর।


সা ক্ষা কা


অর্জুন ভাটিয়া

আপনি বলেছেন, কারো মত পরিবর্তনের জন্য লিখেন না—আপনার ভেতরে স্থির জমে থাকা অস্বস্তিকর চিন্তার জায়গা থেকে লিখে যান এবং এই কারণে আপনি দ্য সেলআউট উপন্যাসটি পরিতৃপ্তির সাথে লিখেছেন। আপনার কাছে লেখালেখিটা যদি কোনো সামাজিক প্রভাব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হয় না, বরং তা কঠিন, কষ্টদায়ক ও আর্থিকভাবে নিরুৎসাহজনক হয়, তবে আপনার লেখায় কী প্রেরণা জোগায়?

পল বিটি

আমি লিখতে উপভোগ করি এবং এটা আমাকে প্রশান্তি দেয়। লেখালেখি আমাকে নিজেকে নিয়েও বিদ্রূপের সুযোগ দেয়। এটা কতটুকু পরিতৃপ্ত নাকি অপরিতৃপ্ত হচ্ছে তা আমার মধ্যেও ভাবনা তৈরি করে আর এই ধরনের প্রবৃত্তির পেছনে কী হতে পারে এসব প্রশ্ন আসে। এটা এমন একটা বিষয় যা নিজেকে দ্রুত মানসিকভাবে এবং শারীরিকভাবে অনেক কিছুতে আনন্দময় করে তোলে। দ্য সেলআউট-এ রূপকার্থে যদিও-বা ভৌগোলিক বিচারে অনেকগুলো চরিত্রে নিজেকে অনেকভাবে আনার চেষ্টা করেছি। এই ব্যাপারটাই আমার কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ এবং এখনো আমার কাছে সব চেয়ে আরাধ্য।


আমাদের বিকশিত হওয়ার ধাপ হচ্ছে অনেক অনেক পড়াশোনা এবং অনুসন্ধান করা।


অর্জুন ভাটিয়া

দ্য সেলআউট-এ প্রচুর ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ উঠে আসে, যা অনেকেই ঠিক ধরতে পারে নি। যখন এটা একটা বেশ মজাদার পাঠের হয়, পাঠকের জন্য তা কিছুটা গলাধঃকরণের প্রয়াস পায়। বহু বড় বড় পাঠক-সম্প্রদায় আছেন, তাদের কাছে কি এই কন্টেন্টগুলো অত্যন্ত মর্মস্পর্শী এবং অধিক সংবেদনশীলতার সাথে সহজে গভীরভাবে প্রবেশ করে নি? যখন আপনি লিখেন তখন পাঠকের ব্যাপারে আপনার ভাবনা কেমন থাকে?

পল বিটি

না, আমি সহজগম্য করে লিখি না। এতে আমার যা কিছু উপলব্ধ তাই, এগুলো আমার মস্তিষ্কের পেছনে যতটুকু অবগত চিন্তা, ধারণা এসব। ব্যক্তিগতভাবে জানার ব্যাপারে আমি খুব অনড়। একবার ব্রুকলিন বই উৎসবে আমি একটি সভায় অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে প্রথম প্রশ্নটি ছিল ‘কেন তুমি লেখ?’ আমার যাওয়ার আগে মহিলাটি বলেছিল, আমি পাঠককে আনন্দ দেয়ার জন্য লিখি এবং আমি একটা অভিজ্ঞতা ভাগ করতে চাই… ওরকম প্রকারের কিছু কথাবার্তা। এবং আমি যা বলেছিলাম, আমার ক্ষেত্রে ওগুলো না, আমি পাঠককে একটানা দ্রুত তাড়া করতে থাকি, তবে এটা করতে করতে চেষ্টা করি দরজাটিকে আধখোলা করে ছেড়ে দিতে এবং পাঠক অনেকটা সাহস করে এর ভেতরে প্রবেশ করে। কেননা আপনি এর ভেতর যদি সহজেই প্রবেশ করেন তবে নেহাত আর এগুচ্ছেন না, সেটা আমার দরকার নেই। তাই এই সহজগম্যতা ব্যাপারটাই আমার প্রয়োজন নেই।

যদি আমার নিজের উপর যথেষ্ট আস্থা থাকে তাহলে যেকোনো দিকে যাওয়াটা সহজসাধ্য হয়। আমার জাপানিজ লেখক ইয়াসুনারি কায়াবাতা-কে খুব ভালো লাগে, যখন আমি তার বই পড়ি তিনি কিন্তু আমার কাছে সহজলভ্য হওয়ার ব্যাপারে আমাকে নিয়ে অতটা উদ্বিগ্ন নন। আমি আমার পাঠককে নিয়ে চিন্তিত নই। আমাদের বিকশিত হওয়ার ধাপ হচ্ছে অনেক অনেক পড়াশোনা এবং অনুসন্ধান করা। আপনি জানেন ইন্ডিয়ার বাইরের প্রদেশেগুলোয় কালোদের, শাদাদের, ল্যাটিনদের কাছ থেকে আমরা একই প্রতিক্রিয়া খুঁজে পাই। তারা বলে, ‘হ্যাঁ ভাই, ফালতু! আমি জানতাম না আপনি কী ব্যাপারে বলছেন?’ কিন্তু আমি জানাতে ভালোবাসি না, আমি হারাতে ভালোবাসি, শিখতে ভালোবাসি। এর মানে এই নয় যে আমি মানুষকে আমার লেখা পড়াতে চাই না। আমার বিশ্বাস যে তারা আমার লেখা পড়তে চায় এবং পড়বে বলে আশা করি।

অর্জুন ভাটিয়া

আমি পড়েছিলাম যে ‘স্ট্যান্ড-আপ কমেডি’তে আপনার আগ্রহ আছে এবং বিয়িং অফেনডেড একটি আবেগহীন কমেডি তা জোর দিয়ে বলা যায়। এই ধরনের ‘স্ট্যান্ড-আপ কমেডি’র বিবেচনায় যেটি এক ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্পষ্টবাদিতা হাস্য-রসাত্মকভাবে সরাসরি তুলে ধরে এবং একটা সামাজিক বার্তাবহ হয়ে বয়ে নিয়ে যায়। এটা কি একটা সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যম তৈরি করে?

পল বিটি

আমার মনে হয় না কোনো একটি মাধ্যমকে আপনি সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যম বলতে পারেন; পরিবর্তনটা কাজ করে অনেকগুলো মাধ্যমের বিষয় নিয়ে একটা কনসার্ট-এর ভেতর। রিচার্ড প্রিয়র একজন কমেডিয়ান ছিলেন, আমি তাকে একজন সাহিত্যানুগ প্রভাবপূর্ণ ব্যক্তি হিশেবে নিয়েছি, কারণ তিনি এমন একজন চমৎকার গল্পকথক যা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক-আওয়াজ কাজ করে। এটা নয় যে তিনি সামাজিক পরিবর্তনের কাজ করেছিলেন, কিন্তু কমেডিটা কী ছিল সেটাকে তিনি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। উনার এরকম কেবল ঘোরের বেগে বলে যাওয়াটাকে আমার কাছে কবিসুলভ লাগত এবং অন্তর্দৃষ্টি বেশ রসবোধপূর্ণ। এই যে তিনি এত গুচ্ছ গুচ্ছ উপাদানের সাথে মিশিয়ে গভীরভাবে গড়ে তুলছেন, এসবের মধ্য দিয়ে কি সামাজিক পরিবর্তনটা আসে? কেন আমি লিখি বা কেন আমি কমেডি করি এগুলো কি সামাজিক পরিবর্তনটা আনে? এসবই হয়তো মানুষ যা কিছু করে সেসবের উপজাত হয়ে প্রতিফলিত হয়।


অনেক লেখক আছেন যারা সামাজিক পরিবর্তনের জন্য লেখে—আমি তাদের প্রশংসা করি।


এরকম অনেক লেখক আছেন যারা সামাজিক পরিবর্তনের জন্য লেখে—আমি তাদের প্রশংসা করি। কিন্তু যখন আমার ক্ষেত্রে শুনি এটা, তখন আমার অস্বস্তি হয়। আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে জিজ্ঞেস করে যে, কিভাবে আমি বিশ্বটাকে বদলাই? ভালো, এটা একটা বড় কাজ। আমি তাদের বলি যে, ‘এই নিরন্তর পরিবর্তনশীল বিশ্বে যা কিছু আছে, তুমি তা থেকে যে কোনো কিছু নিয়ে লিখতে পারো, এটি প্রতিদিন বদলাচ্ছে এবং বদল হতে চায়। তুমি একজন লোককে নিয়ে লিখতে পারো, যে কিনা ভাবার চেষ্টা করছে কিভাবে পৃথিবীটাকে পরিবর্তন করা যায়। তুমি কোনো কিছু না বলেই দেখাতে পারো যে, আমি বিশ্বটাকে পরিবর্তন করাচ্ছি। কিন্তু কিছু মানুষ আছে তা করছে ব্যক্তিগত বা সামাজিকভাবে, কিছু বইতে এই পরিবর্তনের প্রভাব থাকে এবং কিছু কমেডিয়ানদের মধ্যে। ‘রিচার্ড প্রিয়র এইভাবে জনসাধারণের সাথে কেবল তার ব্যবহৃত শব্দগুলো দিয়ে এবং তার বিষয়-ব্যাপার নিয়ে গল্প বা আলাপচারিতা করে সম্প্রসারিত করে। এবং এটাই প্রকৃত পরিবর্তন। ওইটাই সামাজিক পরিবর্তন। স্পষ্টত, এইভাবে জনমানুষের সাথে যোগাযোগ করে পরিবর্তন করাটায় তার বড় ভূমিকা।

অর্জুন ভাটিয়া

তাই, তাহলে এটা খুব বিরক্তিকর বা অস্বস্তিকর যে, আপনাকে সামাজিক পরিবর্তনের কথা জিজ্ঞেস করা! তাহলে আপনি কি কেবল নিজের জন্য লেখেন?

পল বিটি

হাঁ অবশ্যই, তবে এটা আমি বুঝি এবং এরকম নয় যে বইটিতে একেবারেই এসব বিষয় নিয়ে কোনো কিছু আসে নি বা তুলে ধরা হয় নি, তা না। এতক্ষণ যা তালগোল পাকাচ্ছি (হেসে)… তা কিন্তু বইতে সবই বুঝিয়ে দেয়া আছে। এজন্য এখানে এটা একটা সমান অস্বস্তিকর বিষয়। যখন আমি ভাবি, ব্যক্তিটি যে আমাকে ওই প্রশ্নগুলো করছে, প্রকৃতপক্ষে ওগুলোকে ঐ রকম গুরুত্বের মাত্রায়, তখন আমার প্রতিক্রিয়াগুলোকে বিবেচনায় আনি। সাধারণত যে কেউ ভালো অবস্থানে যেতে চায়, বর্তমানটাকে আরো পরিবর্তন করতে চায়, আমি মনে করি এ ব্যাপারগুলোতে কোনো দোষের কিছু নেই, এটা হতেই পারে ।

অর্জুন ভাটিয়া

দ্য সেলআউট-এ নায়কটি আফ্রিকান-আমেরিকানদের বারাক ওবামার প্রধানমন্ত্রীত্বের একটি বিজয় উৎসবকে অস্বীকার করে। এই জয়োৎসবে এমন কী হয়েছিল?

পল বিটি

ওহ! নাহ আমার এসবে কোনো তালগোল করার পরিকল্পনা নেই (হেসে)। আমার মনে হয় যে কোনো কাউকে নিয়ে ডেলা পাকানোটা বিপজ্জনক, যেহেতু এখানে একটি বিজয় উৎসব, হয়তো এক ব্যক্তির পরাজয় কিংবা কারোর জন্য তা অনগ্রসরতা দেখানো হয়েছে। তাই মনে হয়, আমি একজনের পরাজয় এবং বিজয় উৎসব—এসব নিয়ে কিছু বলি নি। আমি এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম, তবে সেগুলোর মানে ব্যাখ্যা করেছি আমার বা সকলের জন্য। তাই এসবে আমার কোনো পরিকল্পনা নেই।


আমি আফ্রিকান-আমেরিকান এই দুইটার কোনোটার জন্যই লিখছি না কিংবা তাদের সুরে লিখছি না। আমি আমার জন্য লিখছি। তবে আমি একজন আফ্রিকান-আমেরিকান লেখক।


অর্জুন ভাটিয়া

তাহলে আপনি কি একজন কেবল লেখক হিশেবে, নাকি একজন আফ্রিকান-আমেরিকান লেখক হিশেবে লেখেন?

পল বিটি

আমি একজন আফ্রিকান-আমেরিকান লেখক। ওই ক্ষেত্রে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমি আফ্রিকান-আমেরিকান এই দুইটার কোনোটার জন্যই লিখছি না কিংবা তাদের সুরে লিখছি না। আমি আমার জন্য লিখছি। তবে আমি একজন আফ্রিকান-আমেরিকান লেখক।

অর্জুন ভাটিয়া

ডোনাল্ট ট্রাম্পের প্রধানমন্ত্রীত্বে সেখানে খুব আতঙ্ক আর অনিরাপদ অবস্থা বিরাজ করছে। মূলত এসব অভিবাসীদের, আফ্রিকান-আমেরিকানদের এবং অন্যান্য উদ্বিগ্ন সম্প্রদায়ের কী ঘটতে যাচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

পল বিটি

এটা এখন অধিক প্রশ্নের ব্যাপার যে ইউনাইটেড স্টেটসের মতো একটি দেশে এখন কী ঘটতে চলেছে। অভিবাসীদের, আফ্রিকান-আমেরিকানদের, নারী এবং এলজিবিটি সম্প্রদায়ের কী ঘটতে পারে, না পারে… দেখুন কারও কোনো কিছু ঘটলে এটা সবার জন্যই হবে—তাই এভাবে বলতে পারেন না কিছু। এটা বলা খুব সংকটময় যে, কোনো এক ব্যক্তির জন্য কী সমস্যার সম্মুখীন হতে চলেছে এবং না কেবল আমার জন্য, না সবার ক্ষেত্রে—এভাবে এসব বলতে বলতে হয়তো আপনি কিছু বিষয় বা সিদ্ধান্ত বানাতে পারেন, তাই এটা নিয়ে কিছু বলতে আমি প্রস্তুত নই।

আপনি জানেন যে, যখন একজন ব্যক্তির মধ্যে কখনো মন্দ ভর করে তখন সে মন্দের ভাবনায় ঘুরপাক খেতে থাকে এবং তখন আপনি ওই ধরনের যে কোনো মন্দ কাজের জন্য প্রস্তুত থাকেন যেকোনো ভাবে, কিন্তু আপনি বা কেউ আঁচ করতে পারেন না এরকম কিছু করেছেন। আবার কখনো সে করল অপদার্থের মতো এমন কিছু, যেটা চাইল তা করতে পারল না। আমি জানি না ঠিক কী ঘটতে চলেছে। তার এসব প্রক্রিয়া, আড়ম্বরপূর্ণ ভাষা এবং অসহিষ্ণু আচরণে জনতার মধ্যে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি এবং হতাশা তৈরি করে যে, তারা এসবের কী প্রতিকার করতে পারে না পারে, তাদের এসব ঘটনার সতর্কতা আমাকে প্রণোদিত করে। কিন্তু সে আসলে কী করতে পারে আমার কোনো ধারণা নেই এবং যদি থাকত তবে আমি কখনো জনসম্মুখে বলতাম না। (হেসে হেসে)

দেবাশীষ ধর

জন্ম ৫ জানুয়ারি, ১৯৮৯; চট্টগ্রাম। গণিতে স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পেশায় শিক্ষক। গণিতের প্রভাষক, মিপস ইনস্টিটিউশন অব ম্যানেজমেন্ট টেকনোলজি।

প্রকাশিত বই :
ফসিলের কারুকাজ [অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৬]

ই-মেইল : debdhar121@gmail.com