হোম অনুবাদ লুইস বাগারিয়া’র সঙ্গে ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা : অদম্য দুই শিল্পী-সত্তার বৈঠক

লুইস বাগারিয়া’র সঙ্গে ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা : অদম্য দুই শিল্পী-সত্তার বৈঠক

লুইস বাগারিয়া’র সঙ্গে ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা : অদম্য দুই শিল্পী-সত্তার বৈঠক
433
0

[লুইস বাগারিয়া স্পেনের প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট। জন্ম ১৮৮২ সালে, বার্সেলোনায়। তাকে বিবেচনা করা হয় স্পেনের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ আর বিদ্রূপাত্মক অনুচিত্রী হিশাবে। বিভিন্ন প্রাণীকে ব্যঙ্গচিত্রে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তার বক্তব্য প্রকাশ করতেন। এই স্টাইল তাকে পরিচিত করে তোলে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ এক শিল্পী হিশেবে। তিনি তার অনুচিত্রের মাধ্যমে ফ্যাসিজমের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। দেশ থেকে তাকে পালিয়ে ফ্রান্সে চলে আসতে হয়েছিল। বাগারিয়া কাজ করতেন মাদ্রিদের দৈনিক এল সল-এ, একজন ব্যঙ্গচিত্রী আর সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী হিশাবে। ১৯৪০ সালে জীবনাবসান হয় এই শিল্পীর।

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র জন্ম ১৮৯৮ সালের ৫ জুন, স্পেনের আন্দালুসিয়ার গ্রানাদা’য়। তার গ্রামের নাম ফুয়েন্তে ভাকুইরোস। উনিশ বছর বয়সে বের হয় তার প্রথম বই, ১৯১৮ সালে, ছায়ারেখা এবং ভূ-দৃশ্যাবলী। মূলত, ভ্রমণকাহিনি। বইটিকে বলা হয়—স্পেনের চিত্রকলা, ভূ-দৃশ্যাবলী এবং ইতিহাস নিয়ে এক তরুণ কবির গভীর ধ্যান। গ্রানাদা’র সূর্যাস্ত, ক্যাথিড্রালগুলির গথিক স্থাপত্যরীতি, পর্বতমালার সৌন্দর্য থেকে তিনি যেন স্পেনের অন্তর্নিহিত চেতনার রূপটিকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। ১৯১৯ সালে বন্ধুত্ব হয় লুইস বুনুয়েল আর সালভাদোর দালি’র সঙ্গে। পাবলো নেরুদা, রাফায়েল আলবেরতি, হুয়ান রামোন হিমেনেথ এইসব দুনিয়াখ্যাত লেখক ছিলেন তার বন্ধু। এ বছরই লোরকা রচনা করেন তার প্রথম নাটক ‘প্রজাপতির কু-মন্ত্র’। মাদ্রিদের তিয়েত্র এলসাভা’র মঞ্চে, পরের বছর এই নাটকের চারটি প্রদর্শনী হয়। ১৯২১-এ বের হয় ‘কবিতা বই’। তার মা, দোনা ভিসেন্তা, কিশোর বয়সেই নাটক আর গানের প্রতি আগ্রহের বীজটি বুনে দিয়েছিলেন, যে-আগ্রহ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার ভিতর তীব্র ছিল। গানকে তিনি বলতেন গভীর গান। তার সবচেয়ে বড় কাজ হিশেবে বিবেচিত জিপসি-গীতিকা বের হয় ১৯২৮ সালে। তার অন্যান্য কবিতাবইগুলি হলো—গভীর গানের কবিতা, গীতিমালা। ১৯২৯-এর জুনে চলে যান আমেরিকায়। ধনতান্ত্রিক আমেরিকা তাকে চরমভাবে আহত করে। নিউইয়র্কে কবি বইয়ে তিনি আমেরিকাবাসের এক রক্তাক্ত প্রতিক্রিয়া লেখেন, দেশটির সমালোচনা করেন। ১৯৩৬-এ বের হয় আরেকটি কবিতা বই—প্রথম গানগুলি। ১৯ আগস্ট ১৯৩৬-এ স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়, ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো’র ফ্যাসিবাদী প্যারামিলিশিয়া ব্ল্যাক স্কোয়াডের সদস্যরা তাকে হত্যা করে। তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় নি।

গারসিয়া লোরকার সঙ্গে লুইস বাগারিয়ার এই আলাপচারিতাটি দৈনিক এল সল-এর ১০ জুন, ১৯৩৬ সংখ্যায় ছাপা হয়। ক্রিস্তোফার মোরের সম্পাদিত ও অনূদিত, গারসিয়া লোরকা’র গদ্য সংগ্রহ গভীর গান এবং অন্যান্য প্রবন্ধ বইয়ে এই আলাপচারিতাটি স্থান পেয়েছে।]




শিল্পীকে অবশ্যই পদ্মফুলের গুচ্ছের পাশে বসে পড়তে হবে আর তার কটিদেশকে কাদামাটির ভিতর ডুবিয়ে দিতে হবে, একই সঙ্গে তার একটি হাত তাদের দিকে এগিয়ে দিতে হবে যারা হন্যে হয়ে পদ্মফুল খুঁজে মরছে।


ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

বাগারিয়া, বন্ধু আমার, তুমি হিল রবলেসের মুণ্ডুকে কাব্যের মূর্ছনা দিয়েছ, যে-কাজে ফুটে উঠেছে তোমার অপূর্ব গীতিভঙ্গি, যা একেবারে জীবন্ত, তীক্ষ্ণ; উনামুনোর পেঁচা আর পিও বারোহার নেড়ি কুকুরটিকেও এঁকেছ, তুমি কি আমাকে দয়া করে বলবে তোমার কাজের বিশুদ্ধ দৃশ্যাবলীর প্রেক্ষাপটে শামুকের অর্থ কী হতে পারে?


লুইস বাগারিয়া

ফেদেরিকো, তুমি জিজ্ঞেস করছ শামুক আঁকার প্রতি আমার এই পক্ষপাতের অর্থ কি? আসলে, ব্যাপারটা খুবই সরল। একবার, আমি আঁকছি, স্কেচ করছি, মা আমার কাছে এসে আমার আঁকিবুকির দিকে চেয়ে রইলেন, সেগুলি সব যাচ্ছেতাই আঁচড়কাটা, দেখলেন, তারপর বললেন : বাবারে, তুমি কিভাবে শামুক এঁকে নিজের জীবন চালাবে সেটা বোঝার আগেই আমার মৃত্যু হবে। আসলে, তখন থেকেই, আমি আমার সমস্ত ড্রয়িংকে এই পথেই নির্দিষ্ট করে নিয়েছি। এখন, তোমার এই কৌতূহলকেই শুধু নয়, সুক্ষ্মদর্শী এবং প্রগাঢ় মননের অধিকারী কবি লোরকা, তুমি, যে লিখেছ অসম্ভব প্রাণস্পর্শী পঙ্‌ক্তিসমূহ, যার কাব্যকে আমার মনে হয়েছে ইস্পাতের তীক্ষ্ণ ডানা, পৃথিবীমায়ের বুক ভেদ করে তার ভিতরকার সমস্তকিছুকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখবার সেই ক্ষমতা কি তোমার নেই? তবে, আমাকে এখন বলো তো কবি, তুমি কি শিল্পের জন্য শিল্প—এই কথাতে বিশ্বাস কর? না কি শিল্প জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে, মানুষ যখন কাঁদছে তখন কাঁদবে, মানুষ যখন হাসছে তখন হাসবে?


ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

এই ব্যাপারে কথা বলা বা চিন্তা করাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়, প্রিয় বাগারিয়া। আমি এই কথাটি বলে তোমার প্রশ্নটির উত্তর দিতে চাই যে, শিল্পের জন্য শিল্প—এই ধারণাটি অত্যন্ত বাজে, অনেকটাই হিংস্র, নিষ্ঠুর ব্যাপার, সৌভাগ্যক্রমে, বিষয়টা যদি স্থূল না হয়। কোনোভাবেই একজন প্রকৃত মানুষের পক্ষে শিল্পের জন্য শিল্প—ধারণায় বিশ্বাসী হওয়া সম্ভব নয়। আজকের দিনের নাটকীয় সব মুহূর্তে, শিল্পীকে অবশ্যই তার মানুষদের জন্য হাসতে হবে, এবং কাঁদতে হবে। শিল্পীকে অবশ্যই পদ্মফুলের গুচ্ছের পাশে বসে পড়তে হবে আর তার কটিদেশকে কাদামাটির ভিতর ডুবিয়ে দিতে হবে, একই সঙ্গে তার একটি হাত তাদের দিকে এগিয়ে দিতে হবে যারা হন্যে হয়ে পদ্মফুল খুঁজে মরছে। আমার ক্ষেত্রে হয় কী, আমি সব সময়ই অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মরিয়া হয়ে থাকি। আর এ কারণেই আমি থিয়েটারের দরজার কড়া নাড়ি, আমার সমস্ত সংবেদনকে, এর ভিতরে ব্যবহার করবার জন্য একত্র করি।


লুইস বাগারিয়া

তুমি কি কখনও ভেবেছ যে কবিতা আমাদেরকে অনাগত জীবনের কাছাকাছি হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়? কিংবা ধরো, আমার জিজ্ঞাসাটি এমন হতে পারে—কবিতা কি উত্তরকালে আমাদের স্বপ্নগুলোকে শেষ করে দিতে পারে?


ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

‘এই উদ্ভট, অত্যন্ত জটিল প্রশ্নটি, আমার মনে হচ্ছে, সত্তার প্রকৃতি ও জ্ঞান সংক্রান্ত অধিবিদ্যা থেকে তোমার ভিতরে যে চরম শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকেই এসেছে। বাগারিয়া, এই ধরনের দুশ্চিন্তাকে একমাত্র সে-ই বুঝতে পারবে যে তোমাকে খুব ভালো করে জানে, বোঝে। কাব্যিক সৃষ্টিধর্ম হচ্ছে অনির্ণেয় গোপন এক রহস্য। পৃথিবীতে মানুষের জন্মের মতোই রহস্যময়। একজন শুনতে পাবে কিছু কণ্ঠস্বর আর সে জানবেও তা কোথায়, তবে এই ধারণাটাই অনুচিত হবে যে, তারা কারা আর কোথা থেকেই বা কথাগুলো আসছে। ঠিক কোন জায়গা থেকে এত এত কণ্ঠের কোরাস শোনা যাচ্ছে। আমি যেমন শুধুমাত্র জন্ম ব্যাপারটা নিয়েই চিন্তিত নই তেমনি মৃত্যু সম্পর্কেও উদ্বিগ্ন নই। আমি প্রকৃতিকে শুনছি, মানুষের কাছ থেকে শুনছি আর কেবল বিস্ময় অনুভব করছি। আর আমি শুধুমাত্র তার অনুলিপি তৈরি করছি, যা কিছু তারা আমাকে শোনাচ্ছে একেবারে সরাসরি, কোনো আড়াল না রেখেই, কোনো কিছুর অর্থ না করেই, এবং আমি জানিও না যে কোথায় গিয়ে এইসব শেষ হবে। কবি কখনোই অতিকায় ক্যাফের ছাদে ডানাওয়ালাদের সংগীতকেও শুনতে পাবেন না, শুনবেন না অট্টহাসি আর পাবেন না অনন্ত তৃষ্ণার অনির্বচনীয় চিরন্তন বিয়ার। তবে, চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই হে বন্ধু, নিশ্চিত থেক, আমরা তা পেয়ে যাব।


লুইস বাগারিয়া

তুমি বলছ এই প্রশ্নগুলো অদ্ভুত? একজন ক্রুদ্ধ ব্যঙ্গচিত্রীর করা প্রশ্ন এইগুলো অদ্ভুত! তুমি তো আমাকে জানোই যে আমি দিনে দিনে বন্য, আদিম, নৃশংস হয়ে উঠছি, হাতে অগুনতি কলম আর অল্পকিছু বিশ্বাস নিয়ে। আমার ভিতরে অসভ্যতা, নির্মমতা, আমার কাজকে যা যন্ত্রণাময় করে তোলে। এখানে শুধু একটু ভেবে দেখ, কবি, জীবনের ট্র্যাজিক প্রশ্নগুলোর উত্তর যেন একটিমাত্র কথাতেই বহুদিন আগে আমার বাবা-মা বারবার থেমে থেমে, ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করেছিলেন। লাইনটি এ-রকম :

‘আর মানুষের সব চেয়ে বড় অপরাধ ছিল
সে জন্ম নিয়েছে।’

পেদ্র মিউনজ সেকা’র তীব্র জীবনবাদের চেয়ে এই কথাটি কি অনেক বেশি শুদ্ধ নয়?


ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

বাগারিয়া, তোমার প্রশ্ন যে একেবারেই অদ্ভুত, তা কিন্তু নয়। তুমি হলে এক সত্য কবি, সব সময়ই হাতের আঙুলগুলো দিয়ে যে কবি ক্ষতকে ঢেকে দেয়। আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি একেবারেই আন্তরিক হয়ে, সহজ করে। আর আমি যদি যথার্থভাবে বলতে না পারি, যদি তোতলাতে শুরু করি, তাহলে মনে করবে এসব হচ্ছে কেবলমাত্র অজ্ঞতাজনিত, অনভিজ্ঞতাজনিত। তোমার ভিতরকার যন্ত্রণার, ক্রুব্ধতার পাখা হলো দেবদূতের ডানার পালক, তোমার ভিতরে যে তূর্য নাদ করছে তা কিন্তু তোমার ‘মৃত্যুর নৃত্য’। এই মৃত্যুনৃত্য ইতালির আদিশিল্পীর হাতে চিত্রিত হয়েছে গোলাপি এক স্তরের রঙের ওপর। জীবনবাদিতা, আশাবাদিতা এক-মাত্রিক আত্মাদের একটি বিশেষ পরিচয় বা বৈশিষ্ট্য; এই আত্মাগুলি আমাদের চারপাশের অশ্রুধারা দেখে না, তারা মনে করে যে একভাবে না একভাবে অশ্রুধারা বন্ধ হবেই!


প্রিয় যন্ত্রণাদগ্ধ বন্ধু, বাগারিয়া, তুমি কি জানো না, চার্চ আমাদেরকে বলেছে বিশ্বাসীদের মহান পুরস্কার হিশাবে গলিত মরদেহ থেকে পুনরুত্থান হবে?


লুইস বাগারিয়া

সংবেদনশীল, কোমলহৃদয় কবি, লোরকা; এসো আমরা জীবনের উত্তরকালের আলোচনায় স্থির হই। আমি আবারও বলছি, এই বিষয়গুলি কেমন যেন অনাবশ্যক লাগে। তুমি কি ভেবে দেখেছ তাদের কথা, যারা আত্মাদের দেশে জীবনোত্তরকালে সুখী হবে বলে বিশ্বাস করে, যেখানে চুম্বন করবার মতো রক্তমাংসের ঠোঁট থাকবে না! তারচেয়ে শূন্যতা বা নাস্তির নীরবতাও তো অনেক ভালো!


ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

প্রিয় যন্ত্রণাদগ্ধ বন্ধু, বাগারিয়া, তুমি কি জানো না, চার্চ আমাদেরকে বলেছে বিশ্বাসীদের মহান পুরস্কার হিশাবে গলিত মরদেহ থেকে পুনরুত্থান হবে? নবি ঈশা এ সম্পর্কে এই ভয়ানক কথা বলেছেন—‘অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত হাড়গুলো ঈশ্বরের মধ্যে আনন্দে উদ্বেলিত হবে।’ একদিন সেন্ট মার্টিন সমাধি ক্ষেত্রে আমি একটি পাথরের পাশে এক শূন্য গর্ত দেখলাম। পাথরটি এক ভাঙা দেয়ালে এমনভাবে ঝুলছিল যে দেখে মনে হলো এক বৃদ্ধের দাঁত। পাথরটা বলছিল : এখানে দোনা মেসেইলা গোমেজ তার মরদেহ থেকে পুনর্বার জাগবে বলে অপেক্ষা করছে। কিছু ধারণা সব সময়ই অস্তিমান থাকে এবং তাদের প্রকাশ এবং প্রদর্শন করা যায়। তার কারণ, আমাদের মাথাও আছে, হাতও আছে! কোনো সৃষ্টিই ছায়া হয়ে বেঁচে থাকতে চায় না।


লুইস বাগারিয়া

তুমি কি মনে করো গ্রানাদায় ফিরে আসবার সম্পূর্ণ অধিকার তোমার সেই বন্ধুদের আছে?


ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

আসলেই এই মুহূর্তটি বড় ভয়ঙ্কর। যদিও তারা বলবে যে তারা শুধু একটি বিশেষ ভাবধারার, একটি বিশেষ গোষ্ঠীর বিরোধিতা করছে। শ্রদ্ধা করবার মতো একটি সভ্যতা হারিয়ে গেল তার কাব্য, তার জ্যোতির্বিদ্যা, স্থাপত্যকলা এবং তার সমস্ত সৌন্দর্যসহ, পৃথিবীতে যা ছিল অতুলনীয়; আর, গ্রানাদাকে দারিদ্র গ্রাস করল; কাপুরুষোচিত আর সংকীর্ণমনা এক নগরীতে পরিণত হলো সে। সমগ্র স্পেনের সবচেয়ে জঘন্য বুর্জোয়ারা এখন এই নগরীর স্থায়ী বাসিন্দা।


লুইস বাগারিয়া

তোমার কি তা মনে হয় ফেদেরিকো, পিতৃভূমি বলে যেন আর কিছুই নেই, সীমান্তবাসীরা সবাই যেন অন্তর্ধান করেছে। কেন একজন খারাপ হিস্পানি একজন ভালো চিনার চেয়ে আরেক হিস্পানির সঙ্গে ভাই সম্পর্কে সম্পর্কিত হবে না?


ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

আমি আগাগোড়াই হিস্পানি আর এটা আমার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার হবে, আমার ভৌগোলিক সীমারেখার বাইরে গিয়ে বসবাস করাটা। তবে, আমি কিন্তু তাদের ঘৃণা করব যে কিনা শুধুই হিস্পানি হওয়ার জন্যই সে হিস্পানি। আমি সকলের ভাই। আমি ঘৃণা করছি তাকে যে নিজেকে উৎসর্গ করছে একটি বিমূর্ত জাতীয়তাবাদী আদর্শের জন্য। নিজের দেশকে সে ভালোবাসছে কালো কাপড় দিয়ে চোখদুটিকে বেঁধে। আর এইসব কারণেই একজন ভালো চিনা আমার কাছে একজন বাজে হিস্পানির চেয়ে বেশি প্রিয়। আমি স্পেনের জন্য গান গাই আর আমি তাকে অনুভব করি আমার মজ্জার ভিতর। তবে, এই সবকিছুর আগে আমি এই পৃথিবীর লোক, সকলের ভাই। না, আমি কোনো রাজনৈতিক সীমানায় বিশ্বাসী লোক নই। শোন বাগারিয়া, সাক্ষাৎকারীরা সবসময় সবকিছু জিজ্ঞেস করে না; তাদের জিজ্ঞাসার অধিকার থাকে সীমাবদ্ধ। তাই, এখন আমাকে তুমি বলো, কী সেই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, কী সেই বুভুক্ষা এই পৃথিবীর অন্যান্য অংশে বিরাজমান, যা তোমাকে অস্থির করে তুলেছে? তুমি কি এখন কবরের ভিতর লুকিয়ে থেকে টিকে থাকবার লড়াই করবে? তুমি কি দেখছ না ইতোমধ্যে সবকিছুকেই কেমন করে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে? মানুষ কোনোভাবেই এই বাধা নিয়মের বাইরে যেতে পারবে না, কিছুই করতে পারবে না, তা সে নিয়মে বিশ্বাস করুক আর না-ই করুক।


লুইস বাগারিয়া

হ্যাঁ, সত্য, সম্পূর্ণরূপেই দুর্ভাগ্যজনক সত্য। আমার মূল কথাটি হলো আমি একজন ক্ষুধার্ত অবিশ্বাসী। কারুর গুম হয়ে যাওয়া, কারো অন্তর্ধান বেদনাদায়ক এবং যন্ত্রণাকর। হে আনন্দ, ওহ নারীর ঠোঁট, ও খাঁটি ওয়াইনের গ্লাস; কেবল তোমরাই জানো কিভাবে আমাকে দিয়ে সত্যকে ভুলিয়ে দেয়া যায়! ও ল্যান্ডস্কেপ, ও আলো, তোমরা আমাকে অন্ধকার ভুলিয়ে দিতে পেরেছ! যখনই কোনো ট্র্যাজিক সমাপ্তি উপস্থিত হয়, আমি সবাইকে ডেকে ডেকে বলি, দেখো, এই ট্র্যাজেডি এক-দুইদিনের জন্য নয়; এটা চিরস্থায়ী হবে। আমাকে উদ্যানে কবর খুঁড়ে শুইয়ে দিও, তাতে আমার জানা হয়ে যাবে যে আমার পরবর্তী জীবন হবে মাটির মতো উর্বর…

প্রিয় লোরকা, আমি এখন তোমার কাছে দুইটি বিষয়ে জানতে চাইব। আমার ধারণা মতে, এই দুইটি মহামূল্য সম্পদ যা স্পেনের আছে, একটি হলো জিপসি গীতি, দ্বিতীয়টি ষাঁড়ের লড়াই। জিপসি গীতির একটা ব্যাপার আমার কাছে ভুল হিশাবে ধরা দিয়েছে। এদের গানে শুধু মায়েদের কথাই বলা হয়। বাবাদের প্রসঙ্গ যেন হঠাৎ আলোক ঝলকানির মতো দেখা যায়। মনে হয় বাবার প্রসঙ্গ তারা এতটা গ্রাহ্য করে না। আর এই ব্যাপারটাই আমার কাছে কিছুটা অন্যায় বলেই মনে হয়। হাহাহা, ঠাট্টার কথা এখানে একপাশে থাক, আমার বিশ্বাস, এই গীতি আমাদের দেশের এক মহৎ সম্পদ।


হিমেনেথ একজন বড় মাপের কবি, যিনি নিজেকে নির্মমভাবে তার ‘আমি’ দিয়ে এক ভীতিকর উচ্চাসনে নিয়ে গেছেন!



ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

জিপসি গীতের সঙ্গে এখানকার বেশিভাগ মানুষেরই ভালো পরিচয় নেই। এখানকার নাইট ক্লাবগুলোতে তথাকথিত ফ্লামেনকোর সঙ্গে এই গীত পরিবেশিত হয় আর এই ব্যাপারটাই পুরো জিপসি গীতিকাকে দূষিত করে ফেলছে। আসলে, এই যে এখন তোমার সঙ্গে কথা বলছি, এ ধরনের বৈঠকে এই নিয়ে সবিস্তার বলবার আসলেই এটা সত্যিকার জায়গা নয়, এ সম্পর্কে বলতে গেলে অনেক দীর্ঘ সময় নিয়েই বলতে হবে আর এটা সাংবাদিকতার জন্যও উপযুক্ত প্রসঙ্গ নয়। বাগারিয়া, তুমি যেভাবে বললে, অবশ্য মজা করেই বলেছ—জিপসিরা তাদের গীতে শুধু মাকেই স্মরণ করে থাকে। আমি বলছি, তোমার কথা পুরোটা নয় তবে অংশত ঠিক আছে। সেই আদি থেকেই জিপসিরা বাস করছে মাতৃশাসিত সমাজে, এখানে তারা বাবা বলে যাকে জানে, সে আসলে তার সত্যিকার বাবা নয়। তাদের জীবনধারাটা—তারা আসলে, তাদের মায়ের সন্তান। অন্যদিকে, খেয়াল করলেই দেখবে, জনপ্রিয় জিপসি কাব্যে, যেখানে অনেক চমৎকার কবিতাই লিখিত হয়েছে, যেখানে বাবার অনুভূতিটুকু ব্যক্ত হয়েছে। তবে সংখ্যার দিক থেকে এমন কবিতা খুবই কম। তুমি আরেকটি মহান বিষয়ে আমার কাছে জানতে চেয়েছ, হ্যাঁ, ষাঁড়ের লড়াই, এই লড়াইটাই সম্ভবত স্পেনের সবচেয়ে মহত্তম জীবনসম্পৃক্ত এবং কাব্যিক সম্পদ; যা কিনা অবিশ্বাস্যভাবে লেখক এবং চিত্রশিল্পীদের দ্বারা উপেক্ষিত হয়েছে, তাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। এই দেশে আমাদেরকে এমন শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে আমরা সবকিছুকেই ভুল শিখেছি, আসলে শিক্ষাপদ্ধতির প্রয়োগ হয়েছে ভুল, এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা যা আমার প্রজন্মের লোকদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আমার মতে, ষাঁড়ের লড়াই হচ্ছে পৃথিবীতে সবচেয়ে পরিশুদ্ধ এক উৎসব। এ হলো এক খাঁটি নাট্যকলা যেখানে স্পেনের লোকেরা তাদের শ্রেষ্ঠ কান্নাটা কেঁদে নেয় আর তাতেই তাদের মনের প্রখরতা বেড়ে যায় বহুগুণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার—ষাঁড়ের লড়াই হলো একমাত্র জায়গা যেখানে তুমি যাবে চোখ-ধাঁধানো এক নিশ্চিত মৃত্যুকে দেখতে। কী হবে স্পেনের বসন্তের, কী হবে আমাদের রক্তের, আমাদের ভাষার; যদি এই তীব্র নাটকীয় মুহূর্তে জীবনের তূর্যগুলো দ্রিম দ্রিম শব্দে বেজে উঠে হঠাৎ লড়াইয়ের রিংয়ের ভিতর থেমে যায়? প্রকৃতি আর কাব্যিক রস আস্বাদনের জন্যই আমি হুয়ান বেলমন্ত-কে গাঢ়ভাবে শ্রদ্ধা করি।


লুইস বাগারিয়া

স্পেনের এই সময়কার কবিদের মধ্যে কোন কোন কবিকে তুমি বেশি পছন্দ করো?


ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা

এখানে আছেন দু’জন বড় শিল্পী, আন্তনিয় মাচাদো এবং হুয়ান রামোন হিমেনেথ। একজনের বাস একেবারে খাঁটি প্রশান্তি আর নির্মলতার ভিতর আর তিনি আছেন কাব্যিক উৎকর্ষের প্রতীক হয়ে; মানবিক এবং দিব্যসুন্দর কবি, যিনি ইতোমধ্যে জীবনযুদ্ধের প্রত্যেকটি অধ্যায়কেই ছাড়িয়ে গেছেন আর যিনি তার বিপুল অন্তর্জগতের একমাত্র অধিকর্তা। হিমেনেথ একজন বড় মাপের কবি, যিনি নিজেকে নির্মমভাবে তার ‘আমি’ দিয়ে এক ভীতিকর উচ্চাসনে নিয়ে গেছেন! তার চারপাশের বাস্তব অবস্থাই তার ভিতরের ক্ষতগুলোকে তৈরি করেছে। তাৎপর্যহীন বিষয়-আশয়ের দ্বারা তিনি অবিশ্বাস্যভাবে দংশিত হয়েছেন, তার কর্ণযুগল পৃথিবীর দিকে হৃদয়ের সমস্ত সুরকে ছড়িয়ে দিয়েছে। আমার মনে হয়, এই ব্যাপারটাই তার বিস্ময়কর এবং অদ্বিতীয় কাব্যিক আত্মার সত্যিকার শত্রু।

আর এখানেই তবে বিদায় বন্ধু। তুমি যখন তোমার সেই কাঠের বাড়িটিতে ফিরে যাবে, তোমার প্রিয় ফুলগুলো, বন্য পশুগুলো, সেই জলপ্রপাত আর তোমার সেইসব সহকর্মী বন্ধুরা, তোমার মতোই যাদের হৃদয় যন্ত্রণায় কাতর, তাদেরকে বলো : অর্ধেক দামে বেচে দেয়া প্রত্যাবর্তনসহ ভ্রমণের টিকিটের ব্যাপারে যেন তারা সাবধান থাকে। তাদের বলে দিও আমাদের এই নগরীতে যেন তারা কখনোই না আসে। বন্য পশুগুলোকে বলবে, তুমি তাদের চিত্রিত করেছ ফ্রান্সিস্কান মমত্ব দিয়ে; যাতে, তারা তাদের সৌন্দর্যকে সদর্পে প্রকাশ না করে কিংবা এই উন্মাদনার সময়ে তারা যেন নিজেদের ঘরের পোষমানা প্রাণী হিশাবে বদলে নেয়। আর তোমার প্রিয় ফুলগুলোকে বলো : তারা যেন খুব বেশি অহংকারী হয়ে না ওঠে, অন্যথায় তদেরকে বেড়ি পরানো হবে, তাদেরকে খেতে হবে মৃত পচা বাতাস।

এমদাদ রহমান

গল্পকার ও অনুবাদক
জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৭৯; বাদেসোনাপুর, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল স্টাডিস অ্যান্ড পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন-এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প [গল্প, চৈতন্য, ২০১৪]

ই-মেইল : emdadrahman777@gmail.com

Latest posts by এমদাদ রহমান (see all)