হোম অনুবাদ লাতিন কবিতা : উজান স্রোতের তরী

লাতিন কবিতা : উজান স্রোতের তরী

লাতিন কবিতা : উজান স্রোতের তরী
764
0

রোম—ছোট্ট একটি নগররাষ্ট্র—কে জানত মানচিত্রের পাঁজর ফুঁড়ে একদিন ‘কল্লোলিনী তিলোত্তমা’ হয়ে উঠবে? ইতিহাসের পাতায় পাতায় গাঁথা হবে তার উদ্ধত গৌরব? কে জানত পুরাপৃথিবীর ভগ্নস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বলবে, এই তো আমি, এখনও আছি! নাহ, কেউ জানে নি; মিশরীয়, গ্রিক, রোমান কেউ জানে নি, যেমন জানে নি হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর অধিবাসীরা; কিন্তু পরবর্তী ভুবনবাসীরা জেনেছে প্রতিটি সভ্যতা, জাতি ও সংস্কৃতির বহুবিস্তৃত ভূমিকা। এই যে আমরা, ‘ইত্যাদি’ বোঝাতে এখনও বলে উঠি ‘এটসেটরা’, বিদ্যার্থী হিশেবে নিজের প্রতিষ্ঠানটিকে বলি ‘আলমা মাতের, অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ বোঝাতে লিখি ‘সিনে দিয়ে—তা তো সেই রোমান জনগোষ্ঠীর ভাষা লাতিনেরই সূত্র ধরে। কেউ কি জানত এ-ভাষাই একদিন পরিণতি পাবে ইউরোপের চিত্তপ্রকাশের ভাষায়? ছোট্ট নগররাষ্ট্রে থাকা হাজার কয়েক রোমান তা জানে নি। কিন্তু একদিন রোমানরা শাসন করল ইতালি, সিসিলি, আফ্রিকা, ফ্রান্স, তুরস্ক; গড়ে উঠল একটি পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য, আর কয়েক হাজার মানুষের ভাষা থেকে লাতিন হয়ে উঠল রোমান সাম্রাজ্যের রাজভাষা। লাতিন ভাষায় লেখা হলো নাটক, মহাকাব্য, গীতিকবিতা এবং দার্শনিক ভাবনা। লাতিনের ছায়ায় গড়ে উঠল আরও কিছু ভাষা : স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ফরাসি, ইতালিয়ান, রুমানিয়ান প্রভৃতি।


লাতিন সাহিত্য মূলত গ্রিক সাহিত্যের বিশ্বস্ত অনুকরণ।


শুরুতে এমন ছিল না; অন্য সব ভাষার মতোই প্রাথমিক পর্বে রোমানদের লাতিন ছিল অসংগঠিত, বর্ণমালাবিহীন একটি ভাষা। ধীরে ধীরে বর্ণমালা নির্ধারিত হলো। মৌখিকতার সমান্তরালে মুদ্রণপূর্ব যুগের বাস্তবতা মান্য করে মাটি ও পাথরের ফলকে লেখা হলো লাতিন বর্ণমালা। সাম্রাজ্য বিস্তারের কাজে রোমানরা যেসব অঞ্চলে প্রবেশ করল সেসব অঞ্চলেই বজায় রাখল লাতিনের ভাষিক ক্ষমতা। এক সময় লাতিন হয়ে উঠল সাহিত্য রচনারও ভাষা।

তাই বলে কি আজকের আঙ্গিকে বই ছিল? ছাপাখানা ছিল? লেখালেখি ও লেখকের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক ছিল কি? মোট কথা, কেমন ছিল সাহিত্যকেন্দ্রিক সংস্কৃতি? যে-কোনো ভাষার সাহিত্যের ইতিহাস বুঝতে চাইলে প্রশ্নগুলোর জবাব জানা জরুরি। নাহ, বই বলতে মুদ্রণ-পারিপাট্য সুশোভিত এ-ধরনের কাগুজে বই ছিল না। ছাপাখানার তো প্রশ্নই আসে না; কেননা মুদ্রণযন্ত্রের ধারণা তখনও জন্মায় নি মানুষের সৃষ্টিশীল মনে। পোড়া মাটি, পাথরের ফলক, দেয়াল, সমাধিফলক, তুলোট কাগজ, প্যাপিরাস এই তো ছিল লেখালেখির ক্যানভাস। প্রতিটি রচনার প্রতিটি অধ্যায়কেই ‘বই’ বলে অভিহিত করা হতো। কেননা সবগুলো অধ্যায় একত্রে বা সমন্বিত রূপে বাঁধাই করার সুযোগ কম ছিল। লাতিন সাহিত্যে প্রতিটি বইয়ের স্বয়ংসম্পূর্ণ অধ্যায়কে ‘বই’ অভিধা দেওয়া হয়েছে।

গ্রিকদের দাপুটে মৌসুম শেষে রোমানরা অধিষ্ঠিত হলো লাতিন সাহিত্যের ভাণ্ডার নিয়ে। পরবর্তী ইতিহাসে রোমানদের মতো করেই পুরো পৃথিবী পেল একজন লুক্রিশাস, একজন ভার্জিল, একজন হোরেস এবং একজন ওভিদ। কথ্য বা লেখ্য, যে-কোনো অর্থেই লাতিন আজ মৃত ভাষা, সংস্কৃতের মতোই এক ‘শ্রদ্ধেয় শব’; কিন্তু বেঁচে আছে দে নেরুম নেচুরা, ইনিদ বা মেটামরফসেস। একইভাবে বেঁচে আছে হোরেসের একগুচ্ছ ওড আর কাব্যতত্ত্ব বিষয়ক স্মৃতি ও শ্রুতিযোগ্য অসাধারণ কথাগুলো। কিন্তু কালের ধাক্কায় এ-কথা না মেনে উপায় নেই যে, হাজার হাজার বছরের দূরত্বে ফিরে গিয়ে রোমান সাহিত্যের ইতিহাস পুনর্গঠন খুবই জটিল একটি কাজ। আশার কথা, ধ্রুপদী সাহিত্যের চর্চাকারীরা এ-বিষয়ে এখনও তৎপর। আর তাই লাতিন সাহিত্য বিষয়ে ‘মিথগুলো’ ভাঙতে উৎসাহী কেউ কেউ।

 

২.
একটি গড় ধারণা এই যে, লাতিন সাহিত্য মূলত গ্রিক সাহিত্যের বিশ্বস্ত অনুকরণ। পণ্ডিত মহলের অনেকেই মনে করেন রোমান সাহিত্য মূলত গ্রিকদের সঙ্গে রোমানদের মিথস্ক্রিয়ার ফল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে গ্রিকদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়। ‘দেশীয় রাজ্য’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ যেমন লিখেছেন :

গ্রিস বিদ্যা ও বিজ্ঞানে বড়, রোম কর্মে ও বিধিতে বড়। রোম তাহার বিজয়পতাকা লইয়া যখন গ্রিসের সংস্রবে আসিল তখন বাহুবলে ও কর্মবিধিতে জয়ী হইয়াও বিদ্যাবুদ্ধিতে গ্রিসের কাছে হার মানিল, গ্রিসের কলাবিদ্যা ও সাহিত্যবিজ্ঞানের অনুকরণে প্রবৃত্ত হইল, কিন্তু তবু সে রোমই রহিল, গ্রিস হইল না—সে আত্মপ্রকৃতিতে সফল হইল, অনুকৃতিতে নহে—সে লোকসংস্থানকার্যে জগতের আদর্শ হইল, সাহিত্য-বিজ্ঞান-কলাবিদ্যায় হইল না।

কিন্তু হাল আমলের গবেষকবৃন্দ দেখাচ্ছেন, আদতে তা নয়; প্রভাববিহীন কোনো সাহিত্যই সম্ভবত নেই, গ্রিকদের প্রভাব থাকলেও লাতিন সাহিত্য মানেই গ্রিক ভাষা ও সাহিত্যের বিশ্বস্ত অনুকরণ নয়। সুসানা মর্টন ব্রাউন্ড বলছেন :

গ্রিক উৎস থেকে গ্রহণ করলেও লাতিন সাহিত্যের আছে ‘amazing fluidity and adaptability’ আর সে কারণেই তার কাছে, The story of Latin Literature is one of assimilation of new materials and creative responses to new challenges’ (Braund 2002 : 260)

বেশ কিছু কারণে থমাস এন. হেবিনেক গ্রিককেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে শক্ত যুক্তি হাজির করেছেন; তিনি মনে করেন, দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধ সমাপ্তির অনেক অনেক আগে থেকেই রোমানরা গ্রিকদের সংস্পর্শে থেকেছে; রোমানদের জন্য গ্রিক সংস্কৃতি, জনগোষ্ঠী ও বস্তুগত সম্পত্তি ছিল ঔপনিবেশিক সম্পদ। তুলনামূলক প্রমাণের ভিত্তিতে হেবিনেক বলেন :

[…] whatever the ultimate impact of Greek literary forms on Roman culture, Rome had its own culture of verbal performance that would have continued to evolve even in the complete absence of Greek literature.’ (Habinek 1998 : 35)

অবশ্য হেবিনেকও দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তবে তা লাতিন সাহিত্য উদ্ভবের পটভূমি হিশেবে নয়, বরং সাহিত্য উৎপাদনের সমাজতাত্ত্বিক পরিবর্তনের একটি পর্ব হিশেবে; যে-পর্বে অন্তত তিন ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন খেয়াল করেছেন তিনি : ক. লেখালেখির ওপর আস্থা তৈরি হয়েছে, খ. পরিবেশনা বা পারফরমেন্সের পেশাদারিত্ব দেখা দিয়েছে, গ. পরিবেশনাকারী বা পারফরমারদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্ববর্তী লাতিন সাহিত্য পরিবেশনামূলক থাকলেও লেখালেখির সঙ্গে সংযুক্তি গড়ে ওঠে নি। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর শেষ ভাগ এবং দ্বিতীয় শতাব্দীর সূচনাভাগে সাহিত্যের সংরক্ষণ, তাৎপর্য উপলব্ধি এবং সাহিত্যিক রচনার প্রচারণার দিক থেকে বড় ধরনের বদল সংঘটিত হয়। বেনেডিক্ট এন্ডারসনের ‘কল্পিত সম্প্রদায়ে’র ধারণা দিয়ে হেবিনেক এ-সময়ে দেখেছেন “‘imagined community’ of Roman nationhood’’-এর উদ্ভব। অর্থাৎ ভাষিক বা রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়েছিল রোমান জাতিসত্তার ধারণা। অভিজাত রোমানদের মধ্যে এই কল্পনা প্রকাশিত হয়েছে লেখালেখি বা সাহিত্যের মাধ্যমেই।

সে যাই হোক; ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে আসলে কেউ কারো হুবহু অনুলিপি নয়, এ-সত্য মেনে নিয়েই ইতিহাস পাঠ করা জরুরি। সেনেকা কেন সফোক্লেসের মতো লেখেন নি বা ভার্জিল কেন হোমারের মতো লিখলেন, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে আক্ষেপ বা অবজ্ঞার চোখ থেকে করা এ-ধরনের প্রশ্ন ঠিক ন্যায়সঙ্গত নয়। প্রশ্ন হতে পারে পারস্পরিক প্রভাব বা আন্তঃসম্পর্কের কার্যকারণ বিষয়ে। সামাজিক সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক যে-কার্যকারণই থাকুক না কেন রোমানদের বহু শতাব্দীর সাম্রাজ্যিক ইতিহাসে ‘লাতিন সাহিত্য’ একটি অনিবার্য গর্ব হিশেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অপরাপর ভাষা ও সাহিত্যের মতো করেই লাতিন সাহিত্য ভিন্ন ভিন্ন যুগে ভিন্ন ভিন্ন আধার ও আধেয় নিয়ে বিকশিত হয়েছে। উদ্ভবকালীন সাহিত্যের সীমানা পেরিয়ে অতিক্রম করেছে স্বর্ণযুগ, সাম্রাজ্যিক যুগ; অন্যদিকে মধ্যযুগ ও রেনেসাঁর কালে লাতিনচর্চা হয়ে উঠেছে অবশ্যসম্ভাবী সাংস্কৃতিক প্রবণতা।

 

৩.
লাতিন সাহিত্যের ইতিহাসকে কয়েকটি যুগস্তরে ভাগ করা হয়—আদি প্রজাতন্ত্রী যুগ, অন্ত্য প্রজাতন্ত্রী যুগ, অগাস্টান যুগ। এ-লেখার লক্ষ্য সামগ্রিক লাতিন সাহিত্য নয়, লাতিন কবিতার রূপরেখা মাত্র। অবশ্য সিসেরোর বক্তৃতা-গদ্যগুলোকে বাদ দিলে কবিতাই প্রতিটি যুগের লাতিন সাহিত্যে প্রধান শস্য হিশেবে বিবেচিত হয়েছে। আর তাই এর ইতিহাস লিখতে গিয়ে লিভিয়াস আন্দ্রোনিকাসের নাম নিয়েছেন অধিকাংশ ইতিহাসকার। দক্ষিণ ইতালির তারেন্তুম থেকে আসা এই গ্রিক ক্রীতদাস মূলত ছিলেন নাট্যকার; পৌরাণিক বিষয়াদি নিয়ে ট্রাজেডি কমেডি রচনা ও অনুবাদ করেছেন। হোমারের অডিসিকে লাতিনে প্রচলিত ছন্দে রূপান্তরিত করেছেন। তখনও গ্রিক হেক্সামিটার ছন্দ লাতিনে আসে নি। সেই প্রাচীন যুগে লিভিয়াসের মহাকাব্য দীর্ঘ কাল বিদ্যালয়পাঠ্য রচনা হিশেবে গৃহীত হয়েছে। জোনাথান কাট্‌জ (২০১১) লিভিয়াসের রচনাকে গ্রিক ও ইতালিয়ান সংস্কৃতির বিমিশ্রণ হিশেবে গণ্য করেছেন।


বলা হয়ে থাকে, এ-সময়ের তরুণ কবিরা গ্রিক কবি কাল্লিমাকুসের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।


The Roman Poets (1863) বইতে সেলার রোমান কবিতাকে চারটি যুগে ভাগ করেছেন : ১. ন্যাভিউস, ইন্নিউস ও লুসিনিয়াসের যুগ, ২. লুক্রেশিয়াস ও কাতুলুসের যুগ, ৩. অগাস্টান যুগ এবং ৪. অগাস্টাস পরবর্তী পুরো সময়। প্রতিটি যুগে একই উচ্চতার ভাবনা ও ভাবাদর্শ নিয়ে কবিদের বিকাশ ঘটেছে তা নয়। বিশেষ করে গ্রিক কবিতার সঙ্গে তুলনা করলে রোমান কবিতায় আধার ও আধেয়গত বৈচিত্র্যের অভাব খুব সহজেই নজরে পড়ে। গ্রিক কবিতার প্রকরণগুলো, যেমন : লিরিক, এপিক, এলিজি—লাতিন কবিতায় প্রচুর লেখা হয়েছে। স্যাটায়ারে আবার রোমানদের অবদান একেবারেই স্বতন্ত্র; বিখ্যাত রোমান স্যাটায়ারিস্ট হিশেবে যেভাবে জুভেনালকে চেনা যায়, গ্রিকদের পক্ষ থেকে তেমন কাউকে চিহ্নিত করা যায় না।

ন্যাভিউস, ইন্নিউস ও লুসিলিয়াসের যুগ থেকে খুব কম কবিতাই পূর্ণাঙ্গভাবে এ-কাল পর্যন্ত আসতে পেরেছে। ন্যাভিউস ছিলেন প্রধানত নাট্যকার, গৌণত কবি; তার লেখা নাটক বা কবিতার একগুচ্ছ ভগ্নাংশ ছাড়া ইতিহাসে আর কিছু টিকে নেই। লাতিন মহাকাব্যের জনক হিশেবে তাকেই চিহ্নিত করা হয়। বেল্লুম পুনিকুম বা Bellum Punicum নামের মহাকাব্যে তৎকালীন ইতিহাস ও পুরাণকাহিনির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুযোগ নিয়েছিলেন ন্যাভিউস। ইতিহাসের এই প্রয়োগ দেখা গেছে ইন্নিউসের অ্যান্নালস বা Annals নামক মহাকাব্যেও। অন্যদিকে লুসিলিয়াস লিখলেন স্যাটায়ার; রোমান সমাজের অভিজাত এবং ভেতরমহলের মানুষ ছিলেন তিনি।

লুক্রিশাস ও কাতুলুসের যুগটি মূলত অগাস্টাস শাসনের পূর্ববর্তী যুগ, কালের হিশেবে যার ব্যাপ্তি খ্রিস্টপূর্ব ৯০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪০ পর্যন্ত। এ-যুগের প্রভাবশালী বাগ্মী ব্যক্তিত্ব সিসেরো। তার বক্তৃতা, চিঠি, দার্শনিক আলঙ্কারিক লেখাপত্র এ-যুগের মহৎ প্রাপ্তি। এ-কালেই কবি হিশেবে ছিলেন কাতুলুস ও লুক্রিশাস। বলা হয়ে থাকে, এ-সময়ের তরুণ কবিরা গ্রিক কবি কাল্লিমাকুসের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।

কাতুলুসের কবিতা ঘিরে আছে প্রেম, নারী ও যৌনতা। তারও ছিল এক মানসসুন্দরী—লেসবিয়া—ইতিহাসে যাকে ক্লদিয়া হিশেবে চিহ্নিত করা হয়। লেসবিয়াকে এমন একটি চরিত্র রূপে হাজির করেছেন, যেখানে সে মোহময়ী এক অবিশ্বাসী নারী; তার সঙ্গে কাতুলুসের বোঝাপড়ার ঘাটতি বিস্তর হলেও কবি না পেরেছেন আবেগের মায়াজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে যেতে, না পেরেছেন সুখকর কিছু মুহূর্ত কাটাতে। দুয়ের এই দ্বন্দ্বে রক্তাক্ত কবিকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়।

কাতুলুসের কবিতা সরল। অনুভূতির জটিলতর মুহূর্তগুলো ভাষাশরীরে এমন কোনো অভিঘাত তৈরি করে নি যা এত দূরের পৃথিবীতে থাকা আজকের পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য ঠেকে। তার এই সারল্যে সহযোগী হয়ে উঠেছে বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরসিকতা, শিশুশোভন দুষ্টুমি।

কাতুলুসের একদম উল্টো পিঠে আছেন লুক্রিশাস; তার কবিতা যেন কাব্যের মোড়ক পরিহিত দর্শন। পরবর্তী কবিদের মধ্যে ভার্জিলের গেওরগিক্সইনিদে লুক্রিশাসের প্রভাব পড়েছে। দে রেরুম নেচুরা-য় লুক্রিশাস বস্তু, প্রাণ ও প্রকৃতির বিবিধ বিষয়ের যৌক্তিক ভাষ্য উপস্থাপন করেছেন। বইটিকে নীতিবাদী মহাকাব্য হিশেবে চিহ্নিত করা হয়; যদিও বক্তব্য এবং ভাষিক সৌন্দর্যের দিক থেকে বিচার করলে দেখায় যায়, মিউজদের আশীর্বাদ কমই পড়েছে বইটিতে। কেননা বিজ্ঞান ও দর্শন ঘেঁষা বক্তব্যের চাপে কাব্যের আলঙ্কারিক রূপসৌন্দর্যের আভা মারাত্মকরকমভাবে উবে গেছে। বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশ যে, কবিতার কথায় বলেছিলেন, দর্শনের জন্য দার্শনিকদের কাছেই যাওয়া উচিত। এ-কথাটি বারবার মনে পড়ে লুক্রিশাসের কবিতা পড়তে পড়তে। আর এই উপলব্ধিই তৈরি হয়, দে রেরুম নেচুরা যতটুকু কাব্য, ততোধিক দর্শন।

লুক্রিশাস এই ঐতিহ্য পেলেন কোত্থেকে? এক্ষেত্রে তিনিও মৌলিক প্রণোদনা পেয়েছেন নীতিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও দর্শনমূলক গ্রিক সাহিত্যধারা থেকে; যেমন : হেসিওডের Works and Days, তারকা ও নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে রচিত আরাতুসের ফেনোমেনা, বিষাক্ত প্রাণী ও বৃক্ষ নিয়ে রচিত নিসান্দারের থেরিয়াকাআলেক্সিফার্মাকা। কিন্তু দার্শনিক চিন্তার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে দার্শনিক এপিকিউরাসের লেখাপত্র। লুক্রেশাস মানবসমাজে বিদ্যমান মিথ্যা মূল্যবোধ ও ভয়ের মুখোশ খুলে দিতে চেয়েছেন। জীবজগৎ, বস্তুপুঞ্জ, উদ্ভিদ সব কিছুর চক্রক্রমিক বিন্যাস ও রূপান্তরের ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন লুক্রেশাস। তার কবিতার বিষয়বস্তুতে প্রবেশ করে কারো মনে হতে পারে, তিনি হয়তো দর্শন পড়ছেন, কেউবা ভাবতে পারেন পদার্থবিদ্যার কোনো তত্ত্ব হয়তোবা পরিবেশিত হচ্ছে, কেউবা ভাবতে পারেন বইটি বোধ হয় হাল-আমলের ইকোলজিকেন্দ্রিক কোনো বক্তব্য পরিবেশন করছে। এমন নয় যে, লুক্রেশাস কাব্যের সীমানা ডিঙিয়ে অপর প্রান্তে চলে গিয়েছেন; প্রকৃতপক্ষে আদি যুগের বিশ্বে কাব্য দর্শন ও সাহিত্য আজকের কাঁটাতার মেনে চলে নি।

লাতিন কবিতার চূড়ায়িত বিন্দু সৃষ্টি হয়েছে আগাস্টান যুগে। এ-যুগের ব্যাপ্তি খ্রিস্টপূর্ব ৪০ থেকে ১৪ খ্রিস্টাব্দ। ভার্জিল, হোরেস, প্রোপেরতিউস, তিবুল্লুস ও ওভিদ এ-যুগেরই দান। জোসেফ ফেরেল (২০০৫) যুগটিকে তিনটি উপস্তরে ভাগ করেছেন—প্রথম : তিন শাসকের পর্ব, দ্বিতীয় : অগাস্টাসের স্থিতাবস্থা, এবং তৃতীয় : হারানো প্রজন্ম। তিন শাসকের পর্বে জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুপরবর্তী রোম ঘোরপাক খেয়েছে তিন শাসকের করতলে, তিনজনই ছিলেন সিজারের নিকটজন : মার্কুস আন্তোনিউস, মার্কুস অ্যামিলিউস লেপিদুস এবং গাইউস অক্তাভিউস। এ-পর্বে ভার্জিল বা হোরেস কেউ-ই তাদের প্রতিভার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটান নি। এ-পর্বের রচনা ভার্জিলের ইকলগ্‌স, হোরেসের ইপোড্‌স।

ভার্জিলের প্রথম বই রাখালিয়া ধরনের কবিতার সংকলন ইকলগ্‌স। প্যাস্টোরাল বা রাখালিয়া ‘জেনর’-এর উদ্ভাবক হিশেবে কেউ কেউ ভার্জিলকে কৃতিত্ব দেন। অবশ্য এর উৎসবীজ আছে চারণ কবি হোমারের কথ্য-ঐতিহ্যে। তবে ভার্জিল সম্ভবত গ্রিক কবি থিওক্রিতাসের বুকোলিকা থেকে রাখালিয়া জাতের কবিতার ধারণা নিয়েছেন। ইকলগ্‌স দশটি ভাগে বিভক্ত। বইটির আরম্ভ তিতাইরাসকে দিয়ে, বিচ গাছের ছায়ায় যে শুয়েছিল, আর শেষ হয়েছে গান গাইতে গাইতে ছাগল তাড়াতে তাড়াতে সন্ধ্যা নামার পূর্বমুহূর্তে। শাদাসিধে রাখালদের গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি ও অভিজ্ঞতার বয়ান ইকলগ্‌স। কিন্তু এদের কণ্ঠেই ভার্জিল দিয়েছেন নবুয়তি বা প্রফেটিক উচ্চারণ; ৪-সংখ্যক কবিতায় একজন শিশুর আগমনের কথা বলা হয়েছে, যে হয়ে উঠবে জগতের ত্রাতা। পরবর্তী কালে খ্রিস্টানুরাগীরা এই কবিতায় খুঁজে পেয়েছেন যিশুজন্মের সংকেত।


অগাস্টান যুগে আবির্ভূত হন লাতিন এলিজির দুই গুরুত্বপূর্ণ স্রষ্টা প্রোপেরতিউস ও তিবুল্লুস।


তিন শাসকের ক্ষমতাবলয় থেকে রোমকে স্থিতাবস্থা দেন অগাস্টাস। খুব দ্রুত লাতিন কবিতায় তার ছাপ পড়তে থাকে। ভার্জিল লেখেন ইনিদ, হোরেসের হাতে রচিত হয় ওড্‌স। ইনিদের আগে গেওরগিক্স নামে আরও একটি কাব্য উপহার দিয়েছেন, যেটি মূলত কৃষিসংক্রান্ত কাব্য। বইটির চারটি অধ্যায়ে নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভার্জিল তুলে ধরেছেন কৃষিব্যবস্থা, প্রকৃতি ও জীবনের উপাদান। একই সঙ্গে হেসিওডের Works and Days-এর মতো করে কঠোর পরিশ্রম, কাজ-কর্ম ও দয়া ইত্যাদির ভূমিকা ব্যাখ্যা করেছেন। কাব্যোচ্চারণের দিক থেকে বইটি লুক্রিশাসের শিক্ষাদানমূলক রচনা দে রেরুম নেচুরার সমধর্মী; গ্রিক-রোমান নীতিবাদী কবিতার ধারায় ইকলগ্‌স নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় স্থান দখল করে আছে। কিন্তু ভার্জিলের নৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কও উঠেছে বিভিন্ন সময়; ‘আশাবাদী’ ও ‘হতাশাবাদী’ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ইকলগ্‌সকে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এই দুই বিপরীত প্রান্ত থেকে দেখার প্রবণতা থেকে সরে যাবার প্রণোদনা দেয়; মনিকা গেইল যেমন দেখিয়েছেন, ভার্জিলে “‘a univocal or consistent moral ‘line’” নেই, বরং মনোযোগ কেন্দ্রীভূত ‘to explore and reflect on the problems of his society without necessarily offerings a decisive solution to those problems.’ (Gale 2005 : 109)

তবে গ্রেওরগিক্স বা ইকলগ্‌স কোনোটিই ভার্জিলের কবিপ্রতিভার প্রধান নজির নয়; মহাকাব্যেই ভার্জিল স্পর্শ করেছেন সাফল্যের শিখর। ইনিদে এসে লাতিন মহাকাব্য একটি দৃষ্টিগ্রাহ্য কাঠামো পেয়ে গেল। এমনকি বহু শতাব্দী পরের কবি টি এস এলিয়ট ইনিদ-কে বলেছেন : the classic of all Europe.

কাব্যটির রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব ২৯ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৯। লাতিন মহাকাব্যের দুই শতাব্দীব্যাপী পুরনো ঐতিহ্যে ছিলেন লিভিয়াস আন্দ্রোনিকাস, ন্যাভিস ও ইন্নিউস। কিন্তু ভার্জিল গ্রহণ করেছেন হোমারিক এপিকের স্বভাব। অনেকে মনে করেন, ইনিদ-এ বয়ে গেছে স্রোত ওডেসিইলিয়াডের যুগ্ম স্রোত। বারোটি অধ্যায়ে বিভক্ত ইনিদের প্রথম ছয় ভাগে পরিবেশিত হয়েছে নায়ক ইনিয়াসের লাতিয়াম অভিমুখে যাত্রার কাহিনি, দ্বিতীয় ছয় ভাগে আছে লাতিয়ামে যুদ্ধের কাহিনি। প্রথম ছয় ভাগ যদি হয় ইনিয়াসের ওডেসি, দ্বিতীয় ছয় ভাগ ইনিয়াসের ইলিয়াড

ভার্জিল ইনিয়াসকে যুক্ত করেছেন বিজিত ট্রয়ের ইতিহাসের সঙ্গে; দৈবঘোষণা মতে ট্রয়ের এই বীর ইনিয়াস গড়ে তুলবে লাতিয়াম। কিন্তু দেবী জুনো তার বিরুদ্ধে, কেননা তিনি ভোলেন নি প্যারিসের দেয়া অপমান; রূপের ঐশ্বর্য আর বিভা সত্ত্বেও প্যারিস থাকে শ্রেষ্ঠ রূপবতীর সম্মান দেয় নি। ট্রয়ের যুদ্ধে জুনো পক্ষ নেন স্পার্টার, পরাস্ত হয় হেক্টরের মতো বীর। বিধ্বস্ত ট্রয় থেকেই দলবলে বেরিয়ে আসে ইনিয়াস। কিন্তু প্রাক্তন অপমানে ক্রুদ্ধ জুনো বাধ সাধেন। জুনো তাকে ঝড়ের কবলে ফেলেন। সকল বিপত্তি অতিক্রম করে ইনিয়াস গড়ে তোলে লাতিয়াম। এই কাহিনির মহাকাব্যিক রূপান্তর ইনিদ। হোমারিক এপিকের মিউজ-প্রশস্তি কিংবা ‘in medias res’ বা মধ্যবর্তী সূচনার ধারণার প্রয়োগ ভার্জিলও করেছেন। কাব্যভাষার দুর্দান্ত আভিজাত্য ইনিদকে প্রত্যাশিত উচ্চতায় নিয়ে যায়।

ভার্জিলের সমকালীন হোরেস লিখেছেন স্যাটায়ার, ওড ও এপিস্টেল। লাতিন স্যাটায়ারে লুসিলিয়াস পূর্ববর্তী আদর্শ হিশেবে উপস্থিত থাকলেও হোরেস তা এড়িয়ে নিজস্ব একটি পটভূমি প্রস্তুত করেন। তার ওডগুলোকে বলা যায় গ্রিক গীতিকবিতার পুনর্জাগরণ। লাতিন ভাষায় গ্রিক কবি আলকায়েউসকে পরিচিতি করেন তিনি। আলকায়েউসের তিন বিষয়কেন্দ্রিক বিশেষত্ব—সিম্পোজিয়াম, প্রেম ও রাজনীতি—হোরেসের কবিতায়ও দেখা যায়। প্রেম একটি সাধারণ বিষয় হিশেবেই বারবার এসেছে তার কবিতায়। সমকালীন রাজনীতির প্রসঙ্গগুলোও হোরেসের ওডে ব্যবহৃত হয়েছে; অগাস্টাসকে বেশ সম্মান দিয়ে উপস্থাপন করেছেন, ক্লিওপেত্রার পরাজয়কে উদ্‌যাপন করতে দেখা গেছে হোরেসের ওডে। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে এপিকিউরান আদর্শের প্রতিফলন লক্ষ্যযোগ্য।

হোরেসের ঈষৎ-পরবর্তী কবি গ্রাত্তিউস; ওভিদের লেখাসূত্রে তাকে অগাস্টান যুগের কবি হিশেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনি মূলত ন্যারেটিভ বা আখ্যানধারা কবি; তার শিকারবিষয়ক কাব্য Cynegetica বা The Chase-এ শিকারের কৌশল, প্রস্তুতি, অস্ত্রশস্ত্র, প্রয়োগ ইত্যাদির বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়। এ-বইয়ের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে কুকুরের জন্ম, বংশবিস্তার ইত্যাদি। সাহিত্যমূল্যের মাপকাঠিতে Cynegetica অসাধারণ কিছু নয়, কিন্তু এর সাংস্কৃতিক মূল্য অস্বীকারের সুযোগ নেই; কেননা মানবসভ্যতার বিকাশে শিকার গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব আর শিকারকেন্দ্রিক সংস্কৃতির পরিচয় পেতে Cynegetica সহায়ক।

অগাস্টান যুগে আবির্ভূত হন লাতিন এলিজির দুই গুরুত্বপূর্ণ স্রষ্টা প্রোপেরতিউস ও তিবুল্লুস। সিন্থিয়া নামক এক নারীকে কেন্দ্র করে রচিত প্রোপেরতিয়াসের প্রথম বইয়ের অধিকাংশ এলিজি। দ্বিতীয় বইতে প্রেম বিষয় হিশেবে গুরুত্ব পেলেও সিন্থিয়া সেখানে প্রধান নয়। তৃতীয় বইতে সিন্থিয়া বা প্রেমের চেয়ে অন্য বিষয়ের বিন্যাস লক্ষ করা যায়—যেমন : পায়েতুস ও মার্সেল্লুসের মৃত্যু, তুল্লুসের ইতালিতে ফেরা ইত্যাদি। চতুর্থ বইতে প্রতিফলিত হয়েছে রোমান এতিওলজি বিষয়ক চিন্তা। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে প্রোপেরতিউসের প্রেমবিষয়ক এলিজিগুলো।

প্রোপেরতিয়াস বা ওভিদের তুলনায় তিবুল্লুস কম আলোচিত কবি; যদিও কুইন্তিলিয়ান তাকে বড় মাপের এলিজি রচয়িতা হিশেবে চিহ্নিত করেছেন। তার কবিতায়ও প্রেম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; সে প্রেম একই সঙ্গে রমণীমোহন ও বালকবিলাসী। পৃষ্ঠপোষক মেসেল্লাকে নিয়েও দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন। সালপিসিয়া—প্রাচীন লাতিন সাহিত্যের ইতিহাসে একমাত্র রোমান নারী, যিনি কবি হিশেবে স্বীকৃত, তার উদ্দেশ্যে লেখা এলিজি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্পদ। সামগ্রিকভাবে তিবুল্লুসের কবিতা সহজ সরল গ্রামীণ জীবনের অভিমুখী, যা তাকে অন্য যুগের অন্য সব এলিজি রচয়িতা থেকে আলাদা করেছে।


কবিদের অনুসরণ ও অনুকরণে গড়ে ওঠা কবিগোষ্ঠী পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের মতো লাতিন কবিতায়ও ছিল


প্রোপেরতিয়াস ও তিবুল্লুসের সমকালীন কবি ওভিদ এলিজি ও এপিক দু’দিকেই সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। Amores-এ প্রোপেরতিয়াস বা তিবুল্লুস কাউকেই অনুসরণ করেন নি। পূর্ববর্তী দু’জনের প্রেমবিষয়ক এলিজিতে প্রেমের যে-রোমান্টিক স্বপ্নবিস্তারী অভিব্যক্তি দেখা যায়, ওভিদের কবিতায় তা তো নেই-ই, তিনি বরং উইটি, ব্যঙ্গবিদ্রূপময়, আলগোছে এড়িয়ে গেছেন অমরত্বের প্রলোভন। এলিজিগুলো নিঃসন্দেহে ওভিদের প্রতিভার একটি দিক; কিন্তু তার ভুবনছোঁয়া খ্যাতির দরজা খুলে দিয়েছে মূলত Metamorphoses—লাতিন সাহিত্যের প্রধান ধ্রুপদী রচনা। বিশালায়তন এই কাব্য হোমার বা ভার্জিলের আদর্শের ধারে কাছে ঘেঁষে নি; প্রতিভা, শিল্প বা সৃজনের ব্যাপারে মৌলিকত্ব, স্বতন্ত্রতা বা অরিজিনালিটি বলতে যে-অভিনবত্বের স্তব করা হয়, ওভিদ তা-ই দিয়েছিলেন মেটামরফসিসের মাধ্যমে।

জগৎ সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে ওভিদের কাল পর্যন্ত ব্যাপ্ত এর পরিসর। রূপান্তর বিষয়ক ১৫টি পুস্তক বা পর্বের সমাহার মেটামরফসিস—যার শেষ পর্বে নিহত জুলিয়াস সিজার রূপান্তরিত হয়েছেন ঈশ্বরে, অগাস্টাস পেয়েছেন সম্ভাব্য দেবত্বের মহিমা। রূপান্তরের এই ধারণা কেবল গ্রিক বা রোমান সংস্কৃতির বিশ্বাসজাত ব্যাপার নয়; ভারতীয় সংস্কৃতিতে এর অজস্র নমুনা চোখে পড়ে। একইভাবে ওভিদ সৃষ্টিতত্ত্বের যে-বিবরণ উপস্থাপন করেছেন তাও ভারতীয় সাহিত্যের বড় একটি বিষয়। কিন্তু ওভিদ এক ধরনের মহাবৈশ্বিকতা তৈরি করতে পেরেছেন। কেননা মেটামরফসেস আদি যুগের রামায়ণ-মহাভারত, ইলিয়াড-অডেসি-র মতো মৌখিকতার ঐতিহ্য থেকে উৎসারিত কাব্য নয়, কাব্যবিষয়ক সচেতনতা এবং সচেতন পরিকল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ওভিদের সৌধ। ফলে পৃথিবীর যে-ইতিহাস তিনি বলেন সে-ইতিহাস আদিযুগের কাব্যে পরিবেশিত সৃষ্টিতত্ত্ব ও ইতিহাসের তুলনায় অনেক বেশি সাম্প্রতিক।

ওভিদ-পরবর্তী মহাকাব্যের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ রচয়িতা নিরো-শাসনামলের কবি লুকান; Bellum Civile-এর দশটি পর্বে তিনি জুলিয়াস সিজার ও পম্পেইয়ের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের কাহিনি উপস্থাপন করেছেন। কাহিনির শুরু সিজারের রুবিকন অতিক্রমের মধ্য দিয়ে এবং কাহিনি-চূড়া গড়ে উঠেছে ফারসালুসের যুদ্ধে পম্পেইয়ের মৃত্যুর মাধ্যমে। গ্রিক-রোমান ঐতিহ্যে মহাকাব্যে অলিম্পিয়ান দেবদেবীদের যে-ভূমিকা দেখা যায়, সেটি লুকানের কাব্যে অনুপস্থিত। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, লুকান বস্তুনিষ্ঠ এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা নির্মাণ করেছেন। তবে পৌরাণিক বাস্তবতার পথ থেকে অনেকখানিই সরে এসেছেন, এ-কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

মহাকাব্যের এই জগৎ থেকে অনেকটা দূরে ছিলেন লুকানের সমকালীন কবি মার্শাল, যদিও বন্ধুত্ব ছিল উভয়ের। কাতুলুসেরপর তার হাতে আবারও জ্বলে ওঠে লাতিন এপিগ্রাম; ছোট পরিসরের কবিতাগুলো ছড়িয়ে দিয়েছে তীব্র বিদ্রূপবিচ্ছুরণ। মার্শালের এপিগ্রাম একই সঙ্গে স্যাটায়ারের আমোদ জোগায়, বহন করে উইটের ব্যঞ্জনা।

ব্যঙ্গবিদ্রূপের চমৎকার পসরা নিয়ে নিরোর সাম্রাজ্যেই আবির্ভূত হয়েছেন রোমান স্যাটায়ারিস্ট জুভেনাল, যিনি পর্যবেক্ষণশীল চোখ দিয়ে দেখেছেন রোমান সমাজের সদর-অন্দর। আর তাই দ্বিধাহীনভাবে চিহ্নিত করে গেছেন সে-সমাজের সঙ্গতি ও অসঙ্গতি। উইট, আলঙ্কারিক চমৎকারিত্ব ও সাংস্কৃতিক পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতা—তিনটি দিকেই তার ঈর্ষণীয় দক্ষতা পরিলক্ষিত হয়। এই সঙ্গে এও বলতে হয় যে, জুভেনাল এমন কোনো নৈতিক অবস্থান তৈরি করেন নি, যার পাটাতনে পা রেখেই বিদ্যমান সমাজকে পড়তে হবে; ব্র্যাম্বেল তাই মন্তব্য করেন :

Juvenal mockingly entertains us with his vice we all demand, but takes it much too far, disturbing us with half-voiced questions about the basis of our values. (Bramble 1982 : 600)

নিরো-পরবর্তী রোমান সাম্রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ক্রমশ বেড়ে চলে; সাহিত্যিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় কবি ছিলেন মার্শাল ও জুভেনাল। এই কালে আর কোনো লাতিন কবি কবিতাকে নিয়ে যেতে পারেন নি সৃষ্টিশীলতা চূড়ায়। প্রধান প্রধান কবিদের অনুসরণ ও অনুকরণে গড়ে ওঠা কবিগোষ্ঠী পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের মতো লাতিন কবিতায়ও ছিল, ছিলেন শখের কবিরা, যাদের অবদান সাহিত্যের ইতিহাসে সাধারণত তথ্য আকারেই সুপ্ত আছে। হতে পারে রচনার অপ্রতুলতা, খণ্ডিত রচনার সমাবেশ এবং তথ্যগত ঘাটতির কারণে অনেক প্রতিভা কালের পাতা থেকে মুছেও গেছেন। কবিতার ভগ্নাংশ নিয়েও টিকে আছেন কেউ কেউ; যেমন : ফ্লোরাস, হাদ্রিয়ান। ফ্লোরাস ও হাদ্রিয়ান দু’জনেই বেশ উইটি; দু’জনেরই পারস্পরিক খোঁচাখুঁচিমূলক ঠাট্টার সম্পর্ক ছিল; যদিও হাদ্রিয়ান ছিলেন রোমান শাসক।

 

৪.
প্রশ্ন জাগে, লাতিন কবিতার ঐশ্বর্য কোথায়? কেন পড়ব লাতিন কবিতা? পরবর্তী কালের জন্য কী রেখে গেছে রোমান সভ্যতার কবিরা? এটা সম্ভবত অনেকেই স্বীকার করবেন, রোমানরা অভিযান ও যুদ্ধপ্রিয় জাতি। তাদের লেখা লাতিন কবিতা তাই দিয়ে গেছে লড়াই সংগ্রাম আর মানুষের টিকে থাকার বৃত্তান্ত। বলা ভালো, রোমানদের জাতীয় আত্মপরিচয় নির্মাণের একটি আকাঙ্ক্ষা যেন উঠে আসে কবিদের উচ্চারণে। অঞ্চল, স্থান, জাতি, সংস্কৃতিকে আদর্শ ধরে রাষ্ট্র বা জাতি গঠনের আধুনিক প্রবণতা সম্পর্কে আমরা জানি; কিন্তু নিবিড় কৌতূহল নিয়ে দেখতে পারি, কয়েক শতাব্দীর কাব্যিক উচ্চারণে লাতিন কবিরা কিভাবে নিজেদের জাতীয় চেতনাকে বুঝতে চেয়েছিলেন, কিভাবে তারা উজান স্রোতে বয়ে গেলেন তরী। নিশ্চয়ই প্রেম প্রকৃতি ও দর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও আমরা পাব, কিন্তু সে তো উপরি-পাওনা, সকল কালের কবিতায় সে-সব কম বেশি থাকেই।

আর ধ্রুপদী চিন্তাকে সম্ভবত উপেক্ষা না করাই বোধ হয় ভালো; উত্তর-আধুনিক জিজ্ঞাসা অবশ্য তাকে ভাঙতে চায়, তবে ভাঙতে গিয়ে উপেক্ষার প্রকোষ্ঠে ফেলে না দেয়াই হবে যৌক্তিক এক বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্ত; কেননা প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলেই পরখ করে দেখা যেতে পারে ধ্রুপদী চিন্তাসমূহের প্রজ্ঞার সক্ষমতা—এখনও যা উদ্দীপিত করে মানুষকে, বারবার মানুষ ধাবিত হয় সেই সব রচনার প্রাচীন পৃষ্ঠায়।


রেনেসাঁকালীন ও রেনেসাঁ-পরবর্তী ইউরোপীয় সাহিত্য ঘাটলে রোমান সাহিত্যের ছায়া চোখ এড়িয়ে যায় না।


অন্ধকার যুগ থেকে উত্তরণের মুহূর্তে ইউরোপে গ্রেকো-রোমান দর্শন, সাহিত্য, বিদ্যাই দিয়েছিল চিন্তামুক্তির ইস্তেহার। আর তাই রেনেসাঁকালীন ও রেনেসাঁ-পরবর্তী ইউরোপীয় সাহিত্য ঘাটলে রোমান সাহিত্যের ছায়া চোখ এড়িয়ে যায় না। জিলবার্ট হিগেট (১৯৮৫) The Classical Traditon নামে আস্ত একটি বই লিখেছেন যার উপশিরোনাম ‘Greek and Roman Influence on Western Literature’। এ-বইয়ে দেখিয়েছেন আধুনিক রোমান্স ভাষাসমূহের সাহিত্যে প্রভাব ফেলেছে লাতিন সাহিত্য; মধ্যযুগের ফরাসি সাহিত্যে ওভিদ দিয়েছেন ‘রোমান্টিক’ প্রেমের ধারণা; ভার্জিলের কাছ থেকে দান্তে নিয়েছেন কল্পনা, দেশপ্রেম আর চরিত্র; রেনেসাঁপর্বের মহাকাব্য অনুপ্রাণিত হয়েছে লাতিন মহাকাব্য দ্বারা; গ্রেকো-রোমান সূত্র থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় প্রবেশ করেছে রাখালিয়া ও রোমান্স কবিতার ধারা; হোরেসের গীতিকবিতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন স্প্যানিশ কবিরা।

 

৫.
এ-বইয়ের অনুবাদগুলো কোনো একটি বিশেষ বইয়ের দৌলতে ঘটে নি। লাতিন কবিতার ইংরেজিতে অনূদিত বিভিন্ন সংকলন থেকে ভালো লাগা কিছু কবিতার অনুবাদ করেছি। পড়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি নি, এমন কবিতারও অনুবাদ যোগ করেছি, লাতিন কবিতার ধারাবাহিকতাকে বোঝার জন্যে। মহাকাব্য বা আখ্যানকাব্য জাতীয় কবিতার সবটা অনুবাদ করি নি, অধিকাংশই আংশিক। না করার মুখ্য দুটি কারণ : প্রথমত, এক পুস্তকে লাতিন কবিতার সামগ্রিক পরিচয় প্রকাশের চেষ্টা করেছি, দ্বিতীয়ত, আমার ভাষা ও শ্রমের ক্ষমাহীন ঘাটতি।

কোনো কোনো কবিতা অনুবাদের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বই মিলিয়ে নিয়েছি, দেখেছি একটির সাথে অন্যটির ভাব ও ব্যঞ্জনাগত দূরত্ব; সেসব ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছি নিজস্ব বিবেচনা; যদিও কবুল করছি, লাতিন জানি না বলে মূল বিচারে সামর্থ্য আমার শূন্য। তারপরও ‘ওয়ার্ড-টু-ওয়ার্ড’ অনুবাদে কিছু লাতিন কবিতা পড়ার চেষ্টা করেছি, দরকারি সহায়তাও গ্রহণ করেছি। ‘সৃষ্টিশীল অনুবাদে’র মোহনীয় প্রলোভন থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করেছি। কখনো যদি সেরকম কিছু ঘটেও থাকে তবে ভাবতে হবে তার মূলে আছে অনুবাদকের কবিতা লেখার দুরারোগ্য ব্যাধি। অবশ্য তাই বলে ছুটে যাই নি নির্মম আক্ষরিকতার দিকে, যা অনুবাদকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে হ্যাঁ, কিছু গদ্যানুবাদ থেকে পদ্যানুবাদের ক্ষেত্রে কবিশোভন মাতব্বরি যথেষ্ট করেছি। আমার বিশ্বাস, সৃষ্টিশীলতার মাত্রাতিরিক্ত স্বাধীনতা ও আক্ষরিকতার আনুগত্যের কুঁজ বহন করতে গিয়ে অনুবাদ সরসতা থেকে বঞ্চিত হয়। অবশ্য এই যে জোর গলায় কথাগুলো বললাম, এই বইয়ের ক্ষেত্রে তার প্রভাব কতটুকু পড়েছে, সেটা কেবল পাঠকই বলতে পারবেন।


পড়ুন : লাতিন কবিতা


গ্রন্থঋণ :
তরে ইয়নসন (২০১৬), লাতিন ভাষার কথা, অনুবাদ : জি এইচ হাবীব, প্রকৃতি-পরিচয়, ঢাকা
Girlbert Highet (1985), The Classical Tradition, Oxford University Press, New York
 J. C. Bramble (1982), ‘Martial and Juvenal’, E. J. Kenney (edited), The Cambridge History of Classical Literature, (II Latin Literature), Cambridge Unviersity Press, Cambridge, London
Jonathan Katz (2011), ‘Early Latin Poetry’, Classical Literature : An Introduction, Neil Croally and Roy Hyde, Routledge, London
Joseph Farrell (2005), ‘The Augustan Period : 40 BC-AD 14’, A Companion to Latin Literature, Edited by Stephen Harrison, Blackwell, Publishinge, UK
Monica Gale (2005), ‘Didactic Epic’, A Companion to Latin Literature, Edited by Stephen Harrison, Blackwell, Publishinge, UK
Susana Morton Braund (2002), Latin Literature, Routledge, London and New York
Thomas N. Habinek (1998), The Politics of Latin Literature, Princton University Press, Princeton, New Jerse
W. Y. Sellar (1863), The Roman Poets of The Republic, Edmonston and Douglas, Edinburgh

সুমন সাজ্জাদ

জন্ম ৮ মে ১৯৮০। স্নাতক, স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
পতনের শব্দগুলো [সমুত্থান, ২০০৭]
ইশক [রাচী গ্রন্থনিকেতন, ২০১৪]
নীলকণ্ঠের পালা [শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
প্যাপিরাসে লেখা [কবি, ২০১৬]

প্রবন্ধ—
প্রকৃতি, প্রান্তিকতা ও জাতিসত্তার সাহিত্য [আবহমান, ২০১১]
আধুনিকতা ও আত্মপরিচয় [চৈতন্য, ২০১৬]

রম্যগদ্য—
রসেবশে বারোমাস [অক্ষর, ২০১৫]

অনুবাদ—
হোমারের দেশ থেকে (প্রাচীন গ্রিক গীতিকবিতা) [অক্ষর, ২০১৬]

ই-মেইল : sumon_sajjad@yahoo.com