হোম অনুবাদ রবীন্দ্রনাথের এলিয়ট অনুবাদ

রবীন্দ্রনাথের এলিয়ট অনুবাদ

রবীন্দ্রনাথের এলিয়ট অনুবাদ
739
0

রবীন্দ্রনাথ ও এলিয়টের সাক্ষাৎ হয় ১৯২২ সালে, আমেরিকায়, এলিয়টের শিক্ষক জনৈক উড্‌স্ সাহেবের বাসায়। [উৎস : রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর বিদেশি বন্ধুরা/ বিনায়ক সেন]

কিন্তু সেন মশাই একটু গোলমাল করে ফেলেছেন। কারণ ১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথ আমেরিকায় ছিলেন না, ছিলেন ভারতে। টি এস এলিয়টও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে চলে এসেছেন বিলাতে। এখানে উল্লেখ করা দরকার, রবীন্দ্রনাথ মোট ৪ বার আমেরিকা গিয়েছিলেন—১৯১২-১৩, ১৯১৬-১৭, ১৯২০-২১ এবং ১৯৩০ সালে। [উৎস : রবীন্দ্রজীবনী/ প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়]

আমার ধারণা তাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এক সান্ধ্য আড্ডায় রবীন্দ্রনাথ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় দর্শনের অধ্যাপক উড্‌সের সম্মানে উপনিষদ থেকে আবৃত্তির পাশাপাশি তার নিজের কিছু ঔপনিষদিক গান গেয়ে শোনান।

অনুমান করা অসঙ্গত নয়, ঠাকুরের মুখে শোনা শ্লোকের উচ্চারণই দি ওয়েস্টল্যান্ড-এর শেষ দুই চরণে উদ্ধৃত হয়েছে। যদিও এ সত্য যে, সংস্কৃত ভাষা ও ভারতীয় দর্শন খোদ এলিয়টেরই পাঠ্যবিষয় ছিল। কিন্তু আমাদের বক্তব্যের সমর্থন মেলে আর এফ রাট্রে নামক এলিয়টের জনৈক বন্ধুর চিঠিতে। রাট্রে ছিলেন রবীন্দ্র-অনুবাদক অজিতকুমার চক্রবর্তীরও বন্ধু। ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে তিনি রবীন্দ্রনাথকে লেখেন :

আপনার মনে আছে কিনা জানি না, আমার এক সহপাঠী বন্ধু সেদিন সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন, তিনি এখনকার বিখ্যাত কবি টি এস এলিয়ট। তিনি ও আমি একই সঙ্গে ভারতীয় দর্শনের চর্চা করেছি। হতে পারে যে সেদিন সন্ধ্যায় আপনার মুখে আবৃত্তি শুনে তার ওয়েস্টল্যান্ড কবিতার (শেষের লাইনে) ‘শান্তি, শান্তি, শান্তি’ ব্যবহার করতে আগ্রহী হন। আমি অবশ্য তার কবিতার অনুরাগী নই, কিন্তু তার খ্যাতির কথা ভেবে তথ্যটি উল্লেখ করলাম। [উৎস : রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর বিদেশি বন্ধুরা/ বিনায়ক সেন]

স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথ এ চিঠি পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন। ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত টি এস এলিয়টের লেখা তিনি ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করে এসেছেন। টি এস এলিয়টের বইপত্র তাকে বিলাত থেকে পাঠাতেন কবি অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তী। অমিয়কে লেখা প্রায় শ-চারেক চিঠি খুলে দেখলে এর সাক্ষ্য মেলে। এলিয়টের The Family Reunion নাটক পড়ে প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু অনেক খুঁজেও আমি নিশ্চিত হতে পারি নি, রবীন্দ্রনাথ Murder in the Cathedral পড়েছিলেন কিনা।

এসব তথ্য উত্থাপনের কারণ, রবীন্দ্রনাথের হাতে টি এস এলিয়টের কবিতার অনুবাদ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর আগে চিঠিপত্রে দুএক ছত্র অনুবাদ করলেও পূর্ণাঙ্গ কবিতা এই প্রথম। সম্ভবত বাংলা ভাষাতেই প্রথম। ঠিক একই বছর, অর্থাৎ ১৯৩২ সালে তিনি লেখেন তার বিখ্যাত ‘বাঁশি’ কবিতাটি। অনেকের বিশ্বাস, এটিও কিছুটা এলিয়ট-অনুপ্রাণিত রচনা। যেমন—

              হঠাৎ খবর পাই মনে
       আকবর বাদশার সঙ্গে
              হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।
                     বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে
       ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে
                            এক বৈকুণ্ঠের দিকে।

এলিয়ট তার The Love Song of J. Alfred Prufrock-এ লিখেছেন :

No! I am not Prince Hamlet, nor was meant to be;
Am an attendant lord, one that will do
To swell a progress, start a scene or two,
Advise the prince;

এই রাজপুরুষের উল্লেখের কারণে নিশ্চয়ই মিল খোঁজা হয় নি। আমাদের বিবেচনায় অবশ্য অন্তর্গত মিলও নেই। হরিপদ কেরানির মূল সমস্যা দারিদ্র্য, সে কারণে দায়িত্বগ্রহণে অপারগতা এবং তজ্জনিত হাহাকার। প্রুফ্রকের সমস্যা দারিদ্র্য নয়। জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা, সিদ্ধান্তহীনতা। এই দার্শনিক সংকটের ফলাফল অস্তিত্বের শূন্যতাবোধ।

যা হোক, এলিয়টী আধুনিকতাকে রবীন্দ্রনাথ কিভাবে অনুধাবন করেছেন এবং মোকাবেলা করতে চেষ্টা করেছেন, তার কিছু প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করা জরুরি। আমরা দেখব, তিনি একদিকে আধুনিকতার সমালোচক, অন্যদিকে নিজের কবিতায় তার অনুপ্রবেশে অনুমোদক, উচ্ছ্বসিতও বটে।

২৩ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৩৯, অমিয়কে ঠাকুর লিখছেন :

আমাদের দেশে হাল আমলের কাব্য, যাকে আমরা আধুনিক বলচি, যদি দেখি তার দেহরূপটাই অন্য দেহরূপের প্রতিকৃতি তাহলে তাকে সাহিত্যিক জীবসমাজে নেব কী করে? যে কবিদের কাব্যরূপ অভিব্যক্তির প্রাণিক নিয়মপথে চলেছে তাঁদের রচনার স্বভাব আধুনিকও হতে পারে সনাতনীও হতে পারে অথবা উভয়ই হতে পারে, কিন্তু তার চেহারাটা হবে তাদেরই, সে কখনই এলিয়টের বা অডেনের বা এজরা পাউণ্ডের ছাঁচে ঢালাই করা হতেই পারে না। সজীব দেহের আপন চেহারার পরিচয়েই মানুষকে সনাক্ত করা চলে, তার পরে চালচলনে তার ভাবের পরিচয় নেয়া সম্ভব হয়। যে কবির কবিত্ব পরের চেহারা ধার করে বেড়ায় সত্যকার আধুনিক হওয়া কি তার কর্ম?

তোমাকে আমি এত কথা বললুম তার মূলে আছে আমার নিজের কাব্যরূপের অভিব্যক্তির অভিজ্ঞতা। সেই অভিব্যক্তি নানা পর্বে নানা পথে গেছে কিন্তু সব নিয়ে স্বতই তার একটা চেহারার ঐক্য রয়ে গেল। যুগধর্মের তিলকলাঞ্ছিত হবার লোভে সেটাকে বদল করা আমার পক্ষে অসম্ভব।

তুমি এখনকার ইংরেজ কবিদের যে সব নমুনা কপি করে পাঠাচ্চ পড়ে আমার খুব ভালো লাগচে,—সংশয় ছিল আমি বুঝি দূরে পড়ে গেছি, আধুনিকদের নাগাল পাব না—এই কবিতাগুলি পড়ে বুঝতে পারলুম আমার অবস্থা অত্যন্ত বেশি শোচনীয় হয় নি।

আমার বড়ো বড়ো চিঠির বহর দেখে মনে কোরো না আমার অবকাশের wasteland বুঝি বহুবিস্তৃত।

আরও কিছু টুকরো কথা তুলে দিচ্ছি চিঠি থেকে :

মরুতে যে গাছ ওঠে তার টেকনিক কাঁটার টেকনিক—সে কেবলই বলে দূরে থাকো, যে যার আপন আপন চণ্ডীমণ্ডপে। [৬ জানুয়ারি ১৯৩৫]

এই যুগের মধ্যে যে আবর্তন যে আবিলতা এসেছে আমি জীবন আরম্ভ করেছিলুম তার থেকে দূরের হাওয়ায়—এই ক্ষুব্ধ মনোবৃত্তি আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়ে না। তাই ব’লে জানবার কৌতূহল নেই বা তাকে অশ্রদ্ধা করি তা নয় কিন্তু জানবার ভাষাতেই যদি তালা লাগানো থাকে তা হলে হতাশ হয়ে এই সাহিত্য-লীলাটাকেই দোষ দেই কিংবা নিজের অদৃষ্টকে। [১৬ ডিসেম্বর ১৯৩৮]

কান পেতে থাকি, জিজ্ঞাসা করি এরা কী শোনাতে চায়—কানে আসে গোলমাল, নতুন ফ্যাশনের কলরব। গোলমাল করার চেয়ে সহজ কিছুই নেই—যদি সবটাই হয় গোল, মাল কিছুই না থাকে। কোনো এক দেশে ভাঙনের যুগের ব্যাকুলতা যে আকুতি জাগিয়ে তোলে, তার উদ্ব্যগ্র ভাষা অনেকখানি হয়তো বোঝা কঠিন, কিন্তু বোঝবার একটা কোনো বিষয় তার ভিতরে আলোড়িত হয়, তার অন্তর থেকে বাণীর ইঙ্গিত ফেনায়িত হয়ে উঠতে থাকে—সে ইঙ্গিত আপন মমতায় ব্যাকরণেরও বাঁধানিয়ম ভাঙে। বস্তুত সেই ভাঙাচোরার উচ্ছৃঙ্খলতাই তার ঈডিয়মরূপে কাজ করে। যেখানে বলবার উদ্বেগেই বলবার বেড়া ভাঙতে থাকে সেখানে বেড়া ভেঙেছে বলেই হয়তো রাস্তার নির্দেশ পাওয়া যায়। কিন্তু যেখানে অন্তর্গত আবেগে বলবার কোনো তাড়া নেই, কেবল বেড়া ভাঙারই উৎসাহ আছে সেখানে মনে সন্দেহ জাগে। [১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯]

অমিয়, তুমি জান চারিদিকের সঙ্গে আমার মনের স্পর্শের যোগ খুব ঘনিষ্ঠ। যাই বলি না কেন বর্তমান যুগধর্মের প্রেরণাকে অতিক্রম করা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমার পথের বাঁকচুর সে ঘটিয়েছেই সব সময় জানতে পারি বা না পারি। আমার বিশ্বাস আমার মধ্যে আধুনিক দেখা দিয়েছে পুরাতন বাসাতেই, আমি বাসা বদল কিরি নি—বোধ হচ্ছে না করবার কারণ এই যে আমার বাসায় জায়গা ছিল যথেষ্ট। [২৩ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৩৯]

টি এস এলিয়ট-এর The Journey of the Magi কবিতার যে অনুবাদ রবীন্দ্রনাথ তার পুনশ্চ কাব্যে ঠাঁই দিলেন, সেই ‘তীর্থযাত্রী’ কবিতার একটি পঙ্‌ক্তি এমন : ‘দুজন মানুষ খোলা দরোজার কাছে পাশা খেলছে টাকার লোভে’। মূলে ছিল ‘Six hands at an open door dicing for pieces of silver’। ‘ছয়টি হাত’ কেন ‘দুজন মানুষ’ হয়ে গেল, বুঝে ওঠা মুশকিল। সম্ভবত তাস খেলাটা পাশা খেলায় রূপান্তরিত হওয়া মাত্র আমাদের মহাভারতীয় অভিজ্ঞতা ‘দুজন’কেই মুখোমুখি টেনে আনে।

সবশেষে, আমাদের মনে একটা প্রশ্ন জাগে, টি এস এলিয়ট নিজে কি এসব অনুবাদের কথা জানতে পেরেছিলেন? জানলে কি তার মন কৃতজ্ঞতায় আর্দ্র হয়ে উঠত? অথবা খ্রিস্টীয় এলিয়ট রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করতেন? একটি ছোট্ট সৌহার্দ্যের ঘটনা আমরা জানতে পারি। এজরা পাউন্ড—যিনি প্রথম জীবনে রবীন্দ্রমুগ্ধ, শেষ জীবনে খানিকটা ক্ষুব্ধ—তার মৃত্যুর পর ‘সিলেক্টেড লেটার্স’ নামে যে বইটি বেরোয় এলিয়টের সম্পাদনায়, তা থেকে রবীন্দ্র-দ্বেষমূলক লেখাটি সম্পাদক বাদ দেন।

 সোহেল হাসান গালিব

 


তীর্থযাত্রী

টি. এস. এলিয়ট-এর The Journey of the Magi-নামক কবিতার অনুবাদ

কন্‌কনে ঠাণ্ডায় আমাদের যাত্রা—

    ভ্রমণটা বিষম দীর্ঘ, সময়টা সব চেয়ে খারাপ,

        রাস্তা ঘোরালো, ধারালো বাতাসের চোট,

           একেবারে দুর্জয় শীত।

ঘাড়ে ক্ষত, পায়ে ব্যথা, মেজাজ-চড়া উটগুলো

           শুয়ে শুয়ে পড়ে গলা বরফে।

        মাঝে মাঝে মন যায় বিগড়ে

যখন মনে পড়ে পাহাড়তলিতে বসন্তমঞ্জিল, তার চাতাল,

    আর শর্বতের পেয়ালা হাতে রেশমি সাজে যুবতীর দল।

এ দিকে উটওয়ালারা গাল পাড়ে, গন্‌গন্‌ করে রাগে,

        ছুটে পালায় মদ আর মেয়ের খোঁজে।

    মশাল যায় নিভে, মাথা রাখবার জায়গা জোটে না।

        নগরে যাই, সেখানে বৈরিতা; নগরীতে সন্দেহ।

           গ্রামগুলো নোংরা, তারা চড়া দাম হাঁকে।

কঠিন মুশকিল।

           শেষে ঠাওরালেম চলব সারারাত,

               মাঝে মাঝে নেব ঝিমিয়ে

           আর কানে কানে কেউ বা গান গাবে—

                   এ সমস্তই পাগলামি।

 

                   ভোরের দিকে এলেম, যেখানে মিঠে শীত সেই পাহাড়ের খদে;

সেখানে বরফ-সীমার নীচেটা ভিজে-ভিজে, ঘন গাছ-গাছালির গন্ধ।

নদী চলেছে ছুটে, জলযন্ত্রের চাকা আঁধারকে মারছে চাপড়।

দিগন্তের গায়ে তিনটে গাছ দাঁড়িয়ে,

বুড়ো সাদা ঘোড়াটা মাঠ বেয়ে দৌড় দিয়েছে।

পৌঁছলেম শরাবখানায়, তার কপাটের মাথায় আঙুরলতা।

দুজন মানুষ খোলা দরোজার কাছে পাশা খেলছে টাকার লোভে,

        পা দিয়ে ঠেলছে শূন্য মদের কুপো।

           কোনো খবরই মিলল না সেখানে,

               চললেম আরো আগে।

                   যেতে যেতে সন্ধে হল;

        সময় পেরিয়ে যায় যায়, তখন খুঁজে পেলেম জায়গাটা—

           বলা যেতে পারে ব্যাপারটা তৃপ্তিজনক।

 

    মনে পড়ে এ-সব ঘটেছে অনেক কাল আগে,

           আবার ঘটে যেন এই ইচ্ছে, কিন্তু লিখে রাখো—

এই লিখে রাখো—এত দূরে যে আমাদের টেনে নিয়েছিল

        সে কি জন্মের সন্ধানে না মৃত্যুর।

           জন্ম একটা হয়েছিল বটে—

               প্রমাণ পেয়েছি, সন্দেহ নেই।

এর আগে তো জন্মও দেখেছি, মৃত্যুও—

        মনে ভাবতেম তারা এক নয়।

কিন্তু এই-যে জন্ম এ বড়ো কঠোর—

দারুণ এর যাতনা, মৃত্যুর মতো, আমাদের মৃত্যুর মতোই।

এলেম ফিরে আপন আপন দেশে, এই আমাদের রাজত্বগুলোয়

    আর কিন্তু স্বস্তি নেই সেই পুরানো বিধিবিধানে

যার মধ্যে আছে সব অনাত্মীয় আপন দেবদেবী আঁকড়ে ধ’রে।

           আর-একবার মরতে পারলে আমি বাঁচি।

 

  মাঘ, ১৩৩৯