হোম অনুবাদ রবার্ট হাস-এর কবিতা

রবার্ট হাস-এর কবিতা

রবার্ট হাস-এর কবিতা
70
0

রবার্ট হাস (১ মার্চ, ১৯৪১-) সবচেয়ে জনপ্রিয়, উদযাপিত, বহুল-পঠিত সমকালীন গদ্যকবিদের একজন। কাজ করেছেন “পোয়েট লরেট অব দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস” এ ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত। ২০০৭ এ ন্যাশনাল বুক এওয়ার্ড লাভ করেন, ২০০৮ এ লাভ করেন পুলিৎজার পুরষ্কার “টাইম এন্ড ম্যাটেরিয়ালস- পোয়েম্স ১৯৯৭-২০০৫” এর জন্য। ২০১৪ সালে একাডেমি অব আমেরিকান পোয়েটস থেকে লাভ করেন ওয়ালেস স্টিভেনস এওয়ার্ড।

কবি হিসেবে ব্যাপক সফলতার পাশাপাশি একজন সফল সমালোচক ও অনুবাদক। পোলিশ কবি সেজলো মিলোজ, জাপানিজ হাইকু মাস্টার বাশো, বুশন, ইসসা- প্রমুখদের অনুবাদের মাধ্যমেও প্রশংসিত হন। সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়েন তার মৌলিক কবিতার অনবদ্য বৈশিষ্ট্য স্বচ্ছতা, পরিষ্কার ইমেজারির মাধ্যমে, যেগুলো নৈমত্তিক জীবন থেকেই গৃহীত।

“হাস জাপানিজ হাইকু অনুবাদে বিশেষ পারদর্শীতা এবং নিজস্ব অনুরাগের ছাপ রেখেছে স্পষ্টভাবে। এছাড়া তাঁর মৌলিক কবিতাগুলো গুরুত্বপুর্ণ। একাধারে মিউজিক্যাল, বর্ণনাত্মক ও গভীর চিন্তাশীল সব কবিতাই।”

—কবি ফরেস্ট গান্ডার

নিউ ইয়র্ক টাইমস রিভিউ-তে ক্যারোলিন কাইজার লিখেছেন, “সে (রবার্ট হাস) এতটাই মেধাবী ও বুদ্ধিমান যে তাঁর কবিতা অথবা গদ্য পাঠ করা বা তাঁর কথা শোনা এক প্রকার অপার্থিব ও সূক্ষ্ণ প্রশান্তি দেয়।” হাস শিকাগো রিভিউ-তে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেই বলেন, “কবিতা হচ্ছে বেঁচে থাকার এক বিশেষ পদ্ধতি। ঠিক যেমন মানুষ খুব যত্নের সাথে, প্রেমের সাথে রুটি বানায় বা বাস্কেটবল খেলে, তেমনই দৈনন্দিন ও জীবনঘনিষ্ট কিছু।”

হাস-এর প্রথম কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে, “ফিল্ড গাইড”, যা ইয়েল সিরিজ, তরুণতম কবি পুরষ্কার এনে দেয় তাঁকে। এরপর ১৯৭৯ সালে “প্রেইজ” কবিতাগ্রন্থের মধ্যে দিয়ে একজন গুরুত্বপুর্ণ আমেরিকান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন যেখানে নিজের সামর্থ্যের বিপুল সম্ভাবনার সফল প্রয়োগ করেছিলেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশ করেন “টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি প্লেজারস- কবিতায় গদ্যশৈলী” যেখানে সন্নিবেশিত হয় তাঁর পূর্ব প্রকাশিত প্রবন্ধ ও রিভিউসমূহ। এরপর কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ রচনাতেও মনোনিবেশ করেন। ১৯৮৯ সালে প্রকাশ পায় কবিতাগ্রন্থ “হিউম্যান উইশেস”, যেখানে গদ্য কবিতার ব্যাপক এক্সপেরিমেন্ট ছিল এবং ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেন।

এরপর ১৯৮৪ তে “এসেনশিয়াল হাইকু : বাশো, বুশন, ইসসা” এর হাইকুর চমৎকার অনুবাদের মাধ্যমে সাহিত্যগোষ্ঠীকে চমকে দেয়া অব্যাহত রাখেন। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয় কবিতাগ্রন্থ “সান আন্ডার উড”। যে বইটিকে তিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক বলেই আখ্যায়িত করেন, সেখানে উঠে আসে তাঁর এলকোহলিক মা এর গল্প, নিজের শৈশব।

হাস বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতে শিক্ষকতা করেন, বসবাস করছেন ক্যালিফোর্নিয়াতেই, তার স্ত্রী কবি ব্রেন্ডা হিলম্যানের সাথে।


প্রশংসা


কাপ্তান-কে প্রশ্ন করেছিলাম সবাই,
যদি বিশালাকৃতি, হিংস্রতম আর অপ্রত্যাশিত কোনো পশুর সামনে
পড়ি, কী করবেন তিনি, প্রথমত?
সামান্য ইতস্তত হয়ে ফের বিচক্ষণ ভঙ্গিতে তিনি জবাব দিলেন—
“ওর প্রশংসা করব, সম্ভবত।”


এক পাঠিকার প্রতি


লক্ষ্য করেছি—স্মৃতি তোমাকে আরো আহত করে।
আর কিছু নয়; কেবল তোমার প্রতি এক ঈর্ষা জেগেছে।
বিস্তৃত ভেজা এই ঘাসের উপর শুয়ে, আমি কোনো
প্রার্থনা করিনি তো অদৃশ্য কিছুতে। শুধু ভেবে গেছি,
সৈকত ধরে হেঁটে যাচ্ছে জানুয়ারি, বিধৌত আকাশ
ও উড়ন্ত শঙ্খচিল। আর দেখেছি, সমুদ্রাভিমুখে : যা
কিছু ছিল না তাই চেয়ে চেয়ে দেখেছি কেবল, ভোরের
প্রথম আলোয়, এক বিশালাকৃতি পাখি—ক্রমাগত
ধনুকের মতো বেঁকে, ডানা মেলে উড়ে চলে যায়—
আমাদের স্পর্শ, অথবা কল্পনার সীমানা পেরিয়ে—
সত্যিকারের কোনো সৈকত পানে…


সেপ্টেম্বরের ডায়রি : আখ্যানগুলো


এখানে সবাই আসে, অনেক অনেক দূর-দূরান্ত পেরিয়ে
(গতরাতে পড়া এক কবিতার লাইন।)
*
আবছায়া পথ, ঘণ্টায় ৮০ মাইল বেগে ছুটছে গাড়ি আর
কথার পর কথা—বলে যাচ্ছে ওরা।
(বাতাস ধোঁয়াচ্ছন্ন, বনের কিনারে এক জ্বলছে দাবানল)
লোকটির গল্পটি ব্যথিত ভীষণ; মহিলার—অস্থির, বিপদাপন্ন।
*


অনুকল্প 


একজন লোক ও এক মহিলা, পুরনো বন্ধু তারা, থিয়েটারে সিনেমা দেখছে। সিনেমাতে একজন লোক ও এক মহিলা, পুরনো বন্ধু তারা, গ্রীষ্মের পাহাড়ি পথ ধরে গাড়ি করে এগিয়ে যাচ্ছে। মহিলাটি নিজের বিবাহবিচ্ছেদের গল্প শোনাচ্ছে তাকে, আর কাঁদছে। মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে একবার অট্ট-হাসছে, তারপর কাঁদছে আবার। লোকটির চোখ ঐ পথের উপর—শুনছে—নিজেরই অনাকাঙ্খিত অশান্তিসমূহ। কেননা খানিক আগে, রেস্টুরেন্টে বসে মহিলাটি শোনাচ্ছিল তার বিবাহবিচ্ছেদের গল্প, আর কাঁদছিল; দুজনেই দ্বিধান্বিত—তারা কোথায় মূলত—থিয়েটারে? নাকি কোনো পাহাড়ি পথে? বিপরীত দিক থেকে আচমকা মালবাহী ট্রাক ছুটে এলে, ঝুঁকিময় বাঁকের কাছে—দুজনেই চমকে ওঠে।
*
হেঁটে হেঁটে পানশালার ভেতরে ঢুকে গেল—দুটো কৌতুক।
একটা খাঁচা, বেরিয়ে পড়ল তার মাপসই পাখির খোঁজে।
একটি বালক, বন্দুকহাতে, সকালের ফ্রেম থেকে হেঁটে বেরিয়ে গেল।
তিনজন ইহুদি দরবেশ—পেঙ্গুইন হয়ে গেল হাঁটতে হাঁটতে।
*


সম্পদের সুষমবণ্টন-সংক্রান্ত গল্প


একদা একদেশে ছিল এক বুড়ো আর এক বুড়ি
যারা খুব…খুব…গরীব ছিল।


হলুদ বাইসাইকেল


আমি যাকে ভালোবাসি, সে মহিলা ভীষণ লোভী
যদিও এ কথা সে মরলেও স্বীকার করে না।
ঋজুভাবে হাঁটে, সে কী চায়—জিজ্ঞাসা করি,
“হলুদ এক বাইসাইকেল,” সে জবাবে জানায়।
*
সূর্য, সূর্যমুখী, কোল্টফুট—সব ফুল ফুটে আছে পথের কিনারে
ঐ স্বর্ণাভ ফিঞ্চ, আর এইসব হলুদাভ ফুলগুলোকেই শুধু
দায়ী মনে হয়—প্রেমিকার আগুন-রঙা চুল, বিড়ালের চোখ,
আমাদের খিদে আর হলুদ সাইকেল—এর জন্য।
*
এক মধ্যরাতে, মিষ্টি প্রণয় শেষে, দুজনেই সিদ্ধান্ত নিলাম, খিদে পেয়েছে, তাই পোশাক পাল্টে চলো খেয়ে আসি সারারাত-খোলা কোনো ডোনাট শপে। ড্রাইভ করে চলি শহরের দোকানগুলোতে। দোকানের বাইরে, ফুটপাতে, মেক্সিকান ভবঘুরে শিশুগুলো ঘুমিয়ে আছে। কিছু মাতাল টলোমলো যাচ্ছে হেঁটে। মাদক বেচছে এক কৃষ্ণাঙ্গ। দোকানে ঢোকার কালে এককোণে শতচ্ছিন্ন পোশাকে একা বৃদ্ধা দাঁড়ানো। খালি পা’য়। কুঁচকানো মুখের চামড়ায় অসংখ্য ক্ষত। যেন অসুখ বাড়ছে তার, সোডিয়াম আলোর নিচে পাংশুটে-হলুদ আলোয় ভিজছে। হয়ত অনাহারী, ক্ষুধার্ত ভারী। দোকানিরা এইরাতে পলিথিনে গরম খাবার নিয়ে ফুটপাতে বিলোচ্ছিল। ওরা তাকেও সাধে। আর বৃদ্ধাটি ছোট দুই চোখ মেলে একবার দেখে- সামান্য মাথা নেড়ে নরম কণ্ঠে বলল, “লাগবে না আমার।”
*
প্রেমিকার হলুদ সাইকেলীয় গান—

উপসাগরের ঐ নৌকাগুলো
তোমারই অনাত্মীয়, হে আমার
মসৃণ, বিপন্ন মরাল।


নিপাট ভদ্র কবি কোবায়াশি ইসসা’র খাতিরে



নববর্ষের সকালবেলা—
সবকিছু নতুন, প্রস্ফুটিত, আর আমার অনুভূতি
গতানুগতিক, পুরনো।


এক বিশাল ব্যাঙ আর আমি,
নিষ্পলক চেয়ে থাকি পরষ্পর,
দুজনেই অটল, অনড়।


পোকাটি, উজ্জ্বল আলো পেয়ে
মহিলার চেম্বারে ছুটে গিয়ে—
স্বেচ্ছায় ছাই হলো পুড়ে।


মাকড়শা, ভয় নেই,
আমার ঘরবাড়ি
কখনোই সাফ করি না।


বরফ গলছে
আর গ্রামগুলো ভেসে যাচ্ছে
বাচ্চাকাচ্চায়।


বাইরে গেল,
ফিরেও এলো—
এমনই প্রণয় জীবন বিড়ালের।


মশা, আমার কানের উপর—
আমাকে কী ভাবে ওরা?
বধির, বয়রা?


বুদ্ধের মতো, যতক্ষণ
ধ্যানমগ্ন, ততক্ষণ
মশাই মারতে থাকি আমি।


পোকারাও মানুষের মতো—
কেউ কেউ গান গাইতে পারে,
বাকিরা পারে না।

রনক জামান

জন্ম ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১; মানিকগঞ্জ। কবি ও অনুবাদক। রসায়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত গ্রন্থ :
ললিতা (মূল : ভ্লাদিমির নবোকভ) [অনুবাদ; ঘাসফুল প্রকাশন, ২০১৬]
ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা [কবিতা; অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৬]

ই-মেইল : ranakzaman1991@gmail.com