হোম অনুবাদ যে লোকটি খুন হয়েছিল

যে লোকটি খুন হয়েছিল

যে লোকটি খুন হয়েছিল
164
0

লোকটি প্রতিদিন সকাল ছ’টা কী সাড়ে ছ’টার দিকে ঘর হতে বেরিয়ে যেতেন। গোঁফ-দাড়ি কামিয়ে নিতেন তার আগেই। তিনি হাতের তালুতে সোনালি সুগন্ধিফোঁটা মাখতেন, তারপর কোমরে আলতো হাত বুলাতেন। তার কোমর শিহরিত হতো, তিনি অনুভব করতেন লেবুর সূক্ষ্ম ঘ্রাণ। তীব্র গন্ধে তার কাছে এমন অনুভূত হতো যে, তিনি কোনো ফলবাগানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন আর সে বাগানের ফলের গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে গেছে। তিনি পরিষ্কার এক জোড়া জুতো পরতেন। আগের রাতে ঘুমাতে যাবার আগে জুতাজোড়া মুছে পরিষ্কার করে রাখতেন। তিনি ঘর হতে বের হতেন নিঃশব্দে। শীতকালে উদিত সূর্যের প্রথম আলোকচ্ছটার সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যেত তার। কিন্তু গ্রীষ্ম ঋতুতে বের হওয়ার আগেই সবকিছু আলোকিত হয়ে উঠত। রাস্তার পাশ থেকে একটা নুড়িপাথর তুলে নিতেন। খুব সতর্কতার সাথে তিনি পাথরটি বাছাই করতেন। বেশকিছু পাথর হাতে তুলে নিয়ে নাড়িয়েচাড়িয়ে পরীক্ষা করে দেখতেন, কোনো একটা পাথরকে তার কাছে বিশেষ মনে হলে এবং তার হৃদয় তুষ্ট হলেই তিনি সেটিকে পছন্দ করতেন। তারপর তিনি সেটিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পকেটে পুরে নিতেন। এই বাক্‌শক্তিহীন পাথরটি তাকে স্বস্তি দিত। পাথরের নিখুঁত গোলাকার আকৃতি তাকে এমন একটা অনুভূতি দিত যে, তিনি যেন রহস্যময় ও মূল্যবান কিছু একটা বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন, রাস্তার পাশ থেকে কুড়িয়ে নেয়া সত্ত্বেও যার মূল্য এক বিন্দুও কমে না।


জানালার ধারিতে পড়ুক কিংবা উড়ে গিয়ে কোনো দেয়ালে পড়ুক; পাথরের উড়াল সমাপ্ত হলেই লোকটির অভিযানেরও সমাপ্তি ঘটত। 


লোকটি ছোট একটা সেতু পার হতেন। সেতু পারাপারে তিনি সেতুর পার্শ্বস্থ লোহার বেড়ি অনুসরণ করতেন। বাতাসে মৌ মৌ করত লেবুর গন্ধ। তিনি সামনে পা ফেলতেন আর সাথে সাথে তার চকচকে জুতোর উজ্জ্বলতাও সামনে অগ্রসর হতো। দোতলা একটি বাড়ির কাছে পৌঁছার আগ পর্যন্ত তিনি স্বচ্ছন্দগতিতে হাঁটতেন। বাড়িটির ছিল সুপ্রশস্ত বেলকনি আর পুরাতন হয়ে যাওয়া কাঠের বড় বড় জানালা। দেখে মনে হতো এটি বৃহৎ আমের বাগান সম্বলিত একটা বাড়ি যেটিতে গ্রীষ্মকালে অবকাশ যাপন করা হয়। একসময় যখন বাড়িটিতে চাষাবাদ হতো, তখন যেসব আমের গাছ লাগানো হয়েছিল সেগুলো এখন বিশালাকার সবুজ ডালপালা নিয়ে আকাশের দিকে বেড়ে উঠছে।

বাড়িটিকে ঘিরে থাকা পাথরের দেয়ালের কাছে তিনি দাঁড়াতেন। তিনি পকেট থেকে পাথরটি বের করে আনতেন এবং দেয়ালের উঁচু ফলকের স্তম্ভের উপর দিয়ে বেলকনির দিকে তাকাতেন। তিনি শেষবারের মতো পাথরটিকে মুঠোর ভেতর পাকিয়ে নিতেন এবং সামনের দিকে শরীর কিছুটা ঝুঁকিয়ে সেটি নিক্ষেপ করতেন। সমস্ত নিঃসঙ্গতার শক্তি দিয়ে তিনি পাথরটি নিক্ষেপ করতেন কোনো একটি বিশেষ জানালার দিকে যেটির কাচ ভেঙে গেছে বহুদিন আগেই। তিনি সচরাচর তার লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হতেন এবং পাথরটি কোনো একটি কক্ষের ভেতর পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে এমন শব্দ শুনতে পেতেন। মাঝেমাঝে তিনি তার লক্ষ্যভেদ করতে পারতেন না, কিন্তু এমনটি খুব কমই হয়ে থাকত। এসব ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই হয়তো তার হাত কেঁপে উঠত কিংবা এক বা একাধিক কারণে তার শক্তিমত্তা অসফল হতো। পাথরটি জানালার ধারিতে বা দেয়ালে পড়ে বিপরীত দিকে লাফিয়ে উঠত। এতে তার অনুভূতির এক কানাকড়িও পরিবর্তন হতো না। তার অভিযান সর্বদা একই অনুভূতি নিয়ে সম্পন্ন হতো।

পাথরটি দেয়ালে পড়ুক, জানালার ধারিতে পড়ুক কিংবা উড়ে গিয়ে কোনো দেয়ালে পড়ুক; পাথরের উড়াল সমাপ্ত হলেই লোকটির অভিযানেরও সমাপ্তি ঘটত। তিনি বাড়ি ফিরে আসতেন আর তখন তার নিজের কাছে সমস্ত দিন ও রাত্রির ভারবাহী বোঝা হতে মুক্তির আনন্দ অনুভূত হতো। জানালার দিকে পাথর নিক্ষেপের চিন্তা ছাড়া এর আগে তিনি আর কিছুই ভাবতে পারতেন না।

আজ ফিরে যাবার সময় তিনি দূরের একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। এটা ছিল একটা ইঞ্জিনের গর্জন, লেবুর গন্ধ ছড়িয়ে দেয়া কোনো বাতাসের গন্ধ নয়। তিনি খুব স্পষ্ট শুনলেন। তিনি নিজেই নিজেকে বললেন, এটা কোনো কারগাড়ির ইঞ্জিন বা কার্গো ট্রাকের হবে হয়তো। সম্ভবত মাঝারো আকৃতির ট্রাক হবে যেমনটা তিনি প্রায়ই দূর হতে সাঁইসাঁই করে ছুটে আসতে দেখে থাকেন। তিনি ব্রিজে এসে পৌঁছলে ট্রাকটির সাথে সাক্ষাৎ হয়। লোকটি ও ট্রাক—উভয়ই ব্রিজটির ওপারে ছিল। যেইমাত্র লোকটি ব্রিজের ওপর উঠলেন, ট্রাকটিও তার গতিপথ পরিবর্তন করল। ট্রাকটির চলে যাওয়ার জায়গা করে দিতে তিনি ব্রিজের পাশের লোহার বেড়ির সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিলেন। ট্রাকের জানালা দিয়ে একজন মহিলাকে তাকাতে দেখলেন তিনি। ট্রাকটি পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় মহিলার মাথাটা তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসেছিল। তার চোখগুলো ছিল এতটা প্রশস্ত যেন সেগুলো বহুকাল ধরে উন্মেষিত হয়ে আছে। চোখ দুটির নিচে একটা ম্রিয়মাণ ধূসর রেখা, দেখতে উল্টানো চাঁদের মতো। মাথার পেছনে চুলের গোছা। মহিলা এমনভাবে মাথা সরিয়ে নিলেন যেন তিনি লোকটিকে বহুবার দেখেছেন। মহিলার মাথাটির জায়গায় এবার একটি পুরুষ মাথা দেখা গেল। মোটা গোঁফ ও খোঁচাখোঁচা সাদা দাড়ি। পুরুষ লোকটি যখন ব্রিজের উপর লোকটিকে দেখছিল, তখন ট্রাকটি চালাচ্ছিল সে।

এত ভোরে ব্রিজের ওপর কাউকে দেখে ট্রাকে থাকা লোকটি যারপরনাই অবাকই হলো খুব। বাড়িটিকে সবরকম কোলাহল-মুক্ত করে ছাড়বে সে, এমন একটা পরিস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সে বাড়ি ফিরে যেতে রাজি নয়। লোকটির ব্রিজের লোহার বেড়ির সাথে মিশে যাওয়া দেখে সে সন্দিহান হয়। সে ভাবে সে হয়তো অন্য কাউকে দেখে থাকবে, দিনে বা রাতে যে-কোনো সময়ে যাদের গলা থেকে কথা বেরিয়ে আসে।

প্রতিদিনের ন্যায় লেবুর সুগন্ধি লাগিয়ে পরদিন সকাল ছ’টায় লোকটি ঘর হতে বের হলো। প্রতিদিনের ন্যায় তার মনে হলো, তিনি কোনো ফলের বাগানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। ধবধবে পরিষ্কার জুতো পরে তিনি নিঃশব্দে ফুটপাতের দিকে পা বাড়ালেন। স্বস্তিদায়ক মনে হয়েছে এমন একটি পাথর তিনি তুলে নিলেন। পাথরটি পকেটে নিয়ে তিনি ব্রিজের দিকে পা বাড়ালেন।

পুরু গোঁফ ও খোঁচাখোঁচা দাড়িঅলা লোকটি আগের রাতটি নির্ঘুম ছিলেন। স্ত্রী অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই তিনি আর রাতে ঘুমান নি। কখনো কখনো হয়তো সামান্য তন্দ্রা এসেছে, কিন্তু পরক্ষণেই তিনি সচকিত হয়ে খেয়াল করতেন, তার স্ত্রী চোখ বুঁজেছে কি-না। পায়ের শব্দ শোনা যেতে পারে—এই ভয়ে তিনি থালি পায়ে হাঁটতেন। তিনি খেয়াল করছেন, প্রতিদিন তার স্ত্রীর মুখের বিবর্ণতা বাড়ছে। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে সে এক মুহূর্তের জন্যেও চোখ বন্ধ করতে পারে নি। প্রথমে তার কাছে মনে হয়েছিল, একেবারে নিঃসঙ্গতাই তার স্ত্রীর ঘুমের জন্যে যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু আদতে তা হয় নি। সময় যাওয়ার সাথে সাথে মনে হতে লাগল তার স্ত্রীর চোখ পাথরের ন্যায় আরও অসাড় হয়ে আসছে। যখন তিনি ডাক্তারকে সব খুলে বললেন, ডাক্তার মহিলাটির দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন তিনি এই প্রথম তাকে দেখছেন।

‘নিথর? না, না। চোখজোড়া এমনিতেই খুলে আছে।’ ডাক্তার এটুকুই বললেন। তারপর সব ধরনের শব্দ হতে স্ত্রীকে দূরে রাখার জন্যে তাকে উপদেশ দিলেন।

‘যেকোনো শব্দ, তা যতই কোমলই হোক, সেটি তার ঘুমের বিঘ্ন ঘটাবে এবং তার অসুস্থতাকে তীব্র করে তুলবে।’

বেশ কয়েকবার দেখাদেখির পর স্বামীটি যখন নিশ্চিত হলেন বাগানের ভেতরের এই বাড়িটি সকল প্রকার শব্দমুক্ত, তখন তিনি এই বাড়িটিতে উঠতে রাজি হয়েছিলেন।


তিনজন লোক চোখ বন্ধ করার আগে ছোট্ট একটা মুহূর্ত পেরিয়ে গেল : রুগ্‌ণ নারীটি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করলেন, দীর্ঘ সময় পর তার চোখের পাতাজোড়া কেঁপে উঠল; 


এর আগেও তিনি কক্ষে প্রবেশ করে ভাঙা কাচ পড়ে থাকতে দেখেছেন বহুবার। প্রতিবারই তিনি মেঝেতে পাথর পড়ে থাকতে দেখে অবাক হয়েছেন। গতরাতে তিনি যখন জানালার পাশ দিয়ে বাইরে এলেন, অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে তার মনে হলো তিনি কোনো দুর্গম পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পাথরের সংখ্যা দেখে তিনি এতটাই বিস্মিত হলেন যা আগের সকল বিস্ময়কে ছাড়িয়ে গেছে। পাথরের সংখ্যা তার কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি জানালা দিয়ে লক্ষ রাখতে শুরু করলেন। যেই মাত্র তিনি ব্রিজ হতে লোকটিকে বাড়ির দেয়ালের কাছাকাছি আসতে দেখলেন, তিনি তার পিছু নিলেন। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব হতে তিনি তার দিকে নজর রাখছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন, লোকটি পকেট থেকে হাত বের করেছেন, আঙুলগুলো ঘষছেন, তারপর সামনের দিকে পুরো শরীর ঝুঁকিয়ে কিছু একটা নিক্ষেপ করছেন। ও খোদা! একটা পাথর! একটা পরিষ্কার কালো পাথর জানালা পেরিয়ে বাসার মেঝেতে পড়েছে। খোঁচাখোঁচা দাড়িঅলা লোকটি দ্রুততার সাথে নুয়ে দেয়ালের ওপাশে মাটিতে রাখা বন্দুকটি তুলে নিলেন। সম্ভবত তিনি একজন পেশাদার শিকারি, অথবা একজন নৈশপ্রহরী, কিংবা একটা দীর্ঘ নির্মম যুদ্ধ যা কখনো শেষ হবে বলে কল্পনা করা যায় না—এমন যুদ্ধ পেরিয়ে আসা কোনো এক কর্মকর্তা। তিনি সম্ভবত এমন কেউ একজনই হবেন। কারণ শুধুমাত্র এরাই জানে, সামান্য নুয়ে কিভাবে দেয়ালের বিপরীতে মিশে থাকা একটা বন্দুক তুলে নিতে হয়।

বন্দুক তাক করার শব্দই পাথর নিক্ষেপ করা লোকটির সতর্ক হবার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বাড়ির নীরবতা ভাঙা শব্দটিকে বিস্ময় নিয়ে আবার দেখতে তিনি প্রাচীরের ওপর মাথা তুললেন। তিনি কোনো শব্দ শুনতে পান নি এমনটা ভেবে যেইমাত্র ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলেন, তখনই বাড়িতে থাকা লোকটি বন্দুক তাক করলেন এবং গুলি করলেন। গুলিটি নিখুঁতভাবে বামপাশের ভ্রু’র ঠিক ওপরে লক্ষ্যভেদ করল। ছোট্ট একটা সূক্ষ্ম গর্ত তৈরি করে ঢুকে গেল ভেতরে।

তিনজন লোক চোখ বন্ধ করার আগে ছোট্ট একটা মুহূর্ত পেরিয়ে গেল : রুগ্‌ণ নারীটি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করলেন, দীর্ঘ সময় পর তার চোখের পাতাজোড়া কেঁপে উঠল; রাইফেলধারী লোকটি চোখ বুঁজলেন; পাথর নিক্ষেপকারী লোকটিও তার সকালের অভিযানটি সমাপ্ত করতে পেরেছেন কি-না তা জানার আগেই চোখ বুজলেন।


[গল্পটি ইয়াসমিন হানুস-এর ইংরেজি অনুবাদ হতে ভাষান্তর করা হয়েছে]

মাইনুল ইসলাম মানিক

কবি ও অনুবাদক
জন্ম ১১ মার্চ, ১৯৮৪; বলশীদ, শাহরাস্তি, চাঁদপুর। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই—
‘স্বপ্নের শঙ্খচিল’ [কবিতা, ২০১৪]
‘দশ নোবেলজয়ী লেখকের সাক্ষাৎকার’ [অনুবাদ, পাঞ্জেরী, ২০১৮]

সম্পাদনা—
কবিতার ছোট কাগজ তরী’র নির্বাহী সম্পাদক
ওয়েবম্যাগ তীরন্দাজ-এর সম্পাদনা সহযোগী

ই-মেইল : mainulislammanik54@gmail.com

Latest posts by মাইনুল ইসলাম মানিক (see all)