হোম অনুবাদ মলাট খুলে দেখা : ফের্নান্দ পেসোয়ার নির্বাচিত কবিতা

মলাট খুলে দেখা : ফের্নান্দ পেসোয়ার নির্বাচিত কবিতা

মলাট খুলে দেখা : ফের্নান্দ পেসোয়ার নির্বাচিত কবিতা
885
0

ভূমিকার বদলে, অন্য ভূমিকা

পেসোয়ার নাম প্রথম শুনি এক আন্টিক শপের বৃদ্ধ মহিলার কাছে। পরের দিনই বুকশপে যাই। আর আমার নজরে পইড়া যায় সেই অবধারিত লাইন:

শূন্যে অবশিষ্ট থাকে শূন্য। আমরা কিছুই না।

এই লাইন পইড়া, আমি ধন্ধে পইড়া গেলাম। আর মনে হইল, এই কবিতা বাংলায় অনুবাদ কইরা পড়লে কেমন হয়। কইরাও ফেললাম। এই কবিতা, উনার আরো লিখা পড়তে উত্সাহিত করল। দেখলাম, ভালো লাগে। এগুলোকে বাংলায় পড়তে ইচ্ছে হইল। কয়েকটা অনুবাদ করলাম। তখন মনে হইল, আরও কিছু করলে তো বইও করা যায়। মালেক ভাইয়ের সাথে শেয়ার করলাম বিষয়টা। তো, উনি বললেন, আমার বই বের করবেন। এই শুরু।

আমি ভাবি নি পর্তুগিজ থিকা অনুবাদ করার কথা। পর্তুগালে তিন বছর ধরে আছি হিসেবে টুকটাক জানি পর্তুগিজ। কিন্তু পেসোয়া নিজে আমারে উত্সাহ দিছেন। উনার কবিতার মাধ্যমে। এত অর্গানিক তাঁর কবিতা। অপ্রয়োজনীয় শব্দ থাকেই না। কাটা তরমুজের মতো, টকটকে লাল দেহখানি থাকে কেবল। আর, তার কবিতা ফরফরাইয়া চলে। ভাষার লালিত্য/গাম্ভীর্য কম। এক চলমান মুগ্ধতা টাইনা নেয় শেষ পর্যন্ত।…

সে যাক, ফের্নান্দ পেসোয়া (১৩জুন ১৮৮০—৩০নভেম্বর ১৯৩৫) বিংশ শতাব্দীর কবি। পর্তুগালে ব্যাপক পঠিত। এমনকি ইউরোপেও। অন্যসব ইউরোপীয় আধুনিক কবির মতো প্রতীকবাদ, সুররিয়ালিজম সহ বিভিন্ন ইজমের প্রভাব তাঁর কবিতায়ও আছে। তাঁর প্রাতিস্বিকতা কবিতার স্বচ্ছন্দতায়। সাহিত্যের প্রচলিত ইসথেটিকসরে তিনি থোড়াই কেয়ার করছেন।

পেসোয়াকে বলা হয় পর্তুগালের ইতালো কালভিনো আর বোর্হেস।…

অল্প বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়া, বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যু—এসবের প্রভাব আছে তাঁর ব্যক্তিজীবনে। লেখায়। দেশত্যাগ তাঁর ভেতরে তৈরি করছে বোহেমিয়ানা। শেকড়চ্যুতি তাঁর দেখার চোখরে পাল্টাইয়া দিছে। তাঁর একটি কবিতা:

সফর। দেশের পর দেশ হারানো হামেশা অন্য কেউ
শেকড়হীন আত্মা নিয়ে কেবল দেখতে দেখতে বাঁচা।…

তো, জীবনের অন্য অনেক ঘটনার সাথে, এইসব পাঠ, অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে একধরনের প্লুরালিজম তৈরি করছে। এগুলোর চর্চাও তিনি করছেন, কবিতায়:

আমাদের মধ্যে বসত করে অগণিত প্রাণ
যখন ভাবি বা অনুভব করি
জানি না কে ভাবে আর অনুভব করে।…

পেসোয়া’র মরমিপনাও দেখার মতো:

মৃত্যু হইল রাস্তায় বাঁক
মরা কেবল অদৃশ্য হওয়া
…   …   …
…   …   …
কেউ কাউকে হারায় নি কখনো
সকলই সত্য আর রাস্তা।…

এসবের শেষে, অনুবাদগুলি আমারই কবিতা আসলে। পেসোয়াকে পাওয়া না পাওয়ার ঊর্ধে রাইখা, কবিতাগুলো যদি পড়তে ভাল্লাগে আপনার, যদি টানে—তখন হয়ত অনুবাদ নিয়া, পেসোয়া নিয়া আমরা বিস্তর ভাবতে/আলাপ করতে পারব।

পর্তুগালে, শব্দের শেষে ‘o’ থাকলে, এরে উ-কার আর ও-কার এর দরমিয়ানে উচ্চারণ করা হয়। তাই আমি ‘Fernando’ কে ফের্নান্দু বা ফের্নান্দো না লিখে, ফের্নান্দ লিখা প্রিফার করছি।
.

আবু তাহের তারেক

লিসবুয়া, পর্তুগাল


গীতিকা 

ধর্মের বৃহত্তর জঙ্গলে
বেশুমার বিশ্বের, অবশেষে
কেউই পায় না তার পরচিত খোদার সাক্ষাৎ
মলয় বাতাস যা নিয়ে আসে
আমরা কেবল তাই শুনি
যা ভাবি আমরা, হোক তা প্রেম বা ঈশ্বর
সরে যায়। কারণ, আমরাও সরে সরে যাই

 

আত্মতথ্য 

মৃত্যু হইলো রাস্তায় বাঁক
মরা কেবল অদৃশ্য হওয়া
কান পাতলে, পায়ের আওয়াজ পাই
বেঁচে আছো, যেমন আমি আছি বেঁচে
দুনিয়া বেহেশত দিয়ে গড়া
মিথ্যার বাস নাই কোনো
কেউ কখনও হারায় নি কাউকে
সকলই সত্য আর রাস্তা

 

অনুধ্যান 

বস্তুর গভীরে তাকাও
যদি না থাকে তার গভীরতা?
আহা, উপরিতল কত মনোহর
মনে হয়, উপরিতলই সার
পৃষ্ঠের বাইরে যা, তা সবকিছুর বাইরে
সবকিছুর বাইরে, কিছুই নাই
ও দুনিয়ার রূপ, তুমিই সকল রূপের রূপ
একই সত্তা, যা প্রতিফলিত করো

 

কিছু গান

আমি ভাবি নিরাই পুস্করিণী
তারে আন্দোলিত করে মৃদুমন্দ বায়ু
জানি না সব’রে নিয়া ভাবতেছি কিনা
অথবা আমারে ভুইলা গেল সবে।…
পুকুর কিছুই বলে না আমারে
না অনুভব করি বায়ুপ্রবাহ
জানি না আমি তৃপ্ত কিনা
জানি না কী আমি চাই
স্মিতহাস ভাঙা ভাঙা ঢেউ
নিদ্রিত জলের উপর।…
কেন রে স্বপ্ন দিয়া গড়লাম
একমাত্র জীবন আমার

 

নাতাল/বড়দিন

ভগবান জন্মাইলো। অন্যরা হইলো গত। সত্য
না আইলো, না গেল। মিথ্যা বদলাইলো কেবল
এখন অন্য শাশ্বত আমাদের
ভালো ছিল আগের আমল
অন্ধ বিজ্ঞান চষে বন্ধ্যা পৃথিবী
পাগলা বিশ্বাস তার দিবাস্বপ্নে
নয়া ভগবান একটা শব্দ কেবল—
খুঁইজো না। কইরো না বিশ্বাস। সকলই নিগূঢ়

 

দ্যুতিময় বিড়াল

ভেতরের এই রাত্রি কখন দূর হবে, মহাবিশ্ব
আমি, আমার আত্মা, আমার আসবে দিন
কখন জাগব আমি, এই জেগে থাকা থেকে
জানিনা। ওই উঁচুতে কিরণ দেয় সূর্য
উদাস তারা মিটমিট করে
বেশুমার তারা
হৃদয় স্পন্দিত হয় একান্তে
যায় না শোনা
কবে অবসান হবে থিয়েটারহীন এই নাটকের
নাটকবিহীন থিয়েটার
যেতে পারব ঘরে
কোথায়। কখন। কিভাবে
চেতনার চোখ নিয়ে তাকাইতেছে বিড়াল। গভীরে উঁকি দেয় কে
সে। সে
যিহোশুয়’র মতো সূর্যকে থামতে বলবে সে। আর জাগব আমি
তারপর হবে দিন
স্মিতহাস, নিদ্রিত আত্মা আমার
মৃদু হাসো। ভোর হবে

 

তেরছা বৃষ্টি ৩

মিশরের বৃহৎ স্ফিংক্স ঢুলছে এই ভূর্জপত্রে
আমি লিখি, সে দৃশ্যগোচর হয় আমার স্বচ্ছ হাতে
কাগজের কোণে জাগে পিরামিড…
আমি লিখি। হতবাক, আমার কলমের ডগায়
সম্রাট কেওপ্সের প্রোফাইল…
আমি থমকাই…
অন্ধকার ঘনায়
সময়ের অতল খাদে ডুবি…
মোমবাতির হালকা আলোয় পয়ার লিখতে লিখতে
পিরামিডের কবরে শায়িত আমি
কলমের প্রতিটি আঁচড়ে সমগ্র মিশর আমাকে চাপ দেয়…
রি রি হাসিতে ফেটে পড়ে স্ফিংক্স
কাগজের উপর কলমের খসখস আওয়াজ…
অবাঙ্‌মানসগোচর দৈত্যাকার হাত ঢুকে
আমার পেছনে, সিলিংয়ের কোনায় ঝাড়ু দেয়
কাগজ আর কলমের মাঝখানে সম্রাট কেওপ্সের লাশ
খোলাচোখে, দেখছে আমাকে
আমাদের দৃষ্টিবিনিময়ের মাঝ দিয়ে বইছে নীল নদ
নিশানমোড়া উদ্দাম বারকি
অস্পষ্ট। আঁকাবাঁকা। কোনাকুনি
আমি আর আমার চিন্তায়…
পুরনো সোনার চিতায় মহান কেওপ্স আর আমি !…

 

বইটি প্রকাশ করেছে নাগরী প্রকাশ
আবু তাহের তারেক

আবু তাহের তারেক

জন্ম ২৬ জানুয়ারি, ১৯৮৫; সুহিত্পুর, ছাতক, সুনামগঞ্জে। বাংলাদেশে, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক, স্নাতকোত্তর। ব্রিটেনে, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে পর্তুগালে বসবাসরত।

প্রকাশিত বই :
ফের্নান্দ পেসোয়ার নির্বাচিত কবিতা, ২০১৬, নাগরী প্রকাশ (অনুবাদ)

ই মেইল: tarek_sius@yahoo.com
আবু তাহের তারেক