হোম অনুবাদ ফের্নান্দো পেসোয়ার কবিতা

ফের্নান্দো পেসোয়ার কবিতা

ফের্নান্দো পেসোয়ার কবিতা
865
0

ফের্নান্দো আন্তবিউ নুগেইরা পেসোয়া জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৮৮ সালের ১৩ জুন লিসবন শহরে, মারাও যান সেখানেই, ১৯৩৫ সালের ৩০ নভেম্বর, অ্যালকোহলের ক্রিয়ায়। শৈশবেই পিতৃহীন হন তিনি, তাঁর পাঁচ বছর বয়সে পিতা যক্ষ্মায় মারা গেলে তাঁর মা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। পেসোয়া তখন তাঁর মায়ের কাছে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে চলে যান, যেখানে তাঁর বিপিতা পর্তুগালের কনসাল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অত্যন্ত একাকিত্বময় শৈশব তাঁর। সতেরো বছর বয়সে তিনি লিসবনে ফিরে আসেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই রয়ে যান। তাঁর মধ্যে ভ্রমণস্বাচ্ছন্দ্য ছিল না, হয়তো এ কারণেই অন্য কবিদের মতো তিনি ছিলেন না ভ্রামণিক, অথবা হয়তো অন্তর্গত গোটানো মানসিকতাই এর কারণ ছিল। তাঁর ঘটনাহীন আত্মজীবনীতে তিনি বলেছেন, ‘ভ্রমণের চিন্তা এলেই আমার বিবমিষার উদ্রেগ হয়। যা দেখি নি তা এরই মধ্যে দেখে ফেলেছি আমি। যা দেখার আছে তাও এরই মধ্যে দেখে ফেলেছি আমি।’ এই কথাটিতে মূর্ত হয়ে উঠতে চায় এ অন্তর্দর্শনের ব্যাপারটি যে, বাহ্যিক জগৎকে মোটাদাগে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন তিনি। শৈশবের নয়টি বছর ব্রিটিশ শাসিত ডারবানে থাকাকালীন ইংরেজি ভাষায় লেখাপড়া এবং চর্চা করার কারণে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর মাতৃভাষার মতোই দখল তিনি অর্জন করেন। ইংরেজি ভাষায় প্রবন্ধ লিখে সে সময়ে  কুইন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পুরস্কারও পেয়ে গিয়েছিলেন। ফরাসি ভাষাও তিনি ভালো জানতেন। লিসবনে ফিরে তিনি কিছুকাল লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন কিন্তু অবশেষে তাও ছেড়ে দেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় অর্জিত ঐতিহ্যগত ইংরেজি শিক্ষাকে প্রসারিত করার জন্য তিনি জাতীয় পাঠাগারে নিজে নিজে পাঠ নেন দর্শন,  ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান এবং বিশেষভাবে পর্তুগিজ সাহিত্য। এ সময়ের রচিত ইংরেজি গদ্য ও পদ্য রচনা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯১০ সালে তিনি পর্তুগিজ ভাষায় লেখা শুরু করেন। বহুধা ব্যক্তিসত্তার এক আশ্চর্য প্রকাশ তাঁর মধ্যে দেখা যায়। লিখেছেন অনেক নামে যাকে তিনি ছদ্মনাম বলতে রাজি ছিলেন না, বলতেন অন্যনাম বা হেটারোনাইম। কবিতা লিখেছেন আলবের্তো কায়েইরু, রিকার্দো রাইশ, আলভারো দ্য কাম্পোশ এবং নিজ নাম ফির্নান্দো পেসোয়ায়। পর্তুগিজ সাহিত্যে তিনি জন্ম দেন পাউলীয় এবং সংবেদনবাদ ধারার।

সাহিত্যের সমালোচনামূলক তাঁর প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশ পায় ১৯১২ সালে। তাঁর প্রথম সৃষ্টিশীল গদ্যের অংশবিশেষ, যা হলো তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত গদ্যগ্রন্থ দ্য বুক অব ডিসকোয়াআট-এর অংশ, প্রকাশিত হয় ১৯১৩ সালে, আর প্রথম কবিতা ১৯১৪ সালে। উল্লেখ্য, তাঁর মৃত্যুর পরে ট্রাঙ্কে বিপুল পরিমাণ পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। বাণিজ্যিক ফার্মের জন্য ইংরেজি ফরাসি চিঠি লিখে দিয়ে যে আয় হতো, তাতেই তিনি কবিতালেখায় আত্মনিয়োগ করে জীবনের অবশিষ্টকাল কাটিয়ে দিয়েছিলেন। বিয়ে করেন নি তিনি, তাঁর প্রেম ছিল দমিত এবং কষ্টকর। তবে সবকিছুই শেষ পর্যন্ত লেখার কাছে আটকে যেত। ১৯২০ এবং ১৯২৯ সালে লেখা কিছু প্রেমপত্র পাওয়া গিয়েছিল। জানা যায়, তাঁর প্রেমিকা ছিলেন ওফেলিয়া কুয়েইরোজ নামের এক নারী, তার একই অফিসে একসাথে কাজ করতেন এবং সেখানেই তাঁদের পরিচয়। বৃদ্ধ বয়সে এই নারী জানিয়েছিলেন যে, হাতে মোমবাতি নিয়ে হ্যামলেট থেকে সংলাপ উচ্চারণ করতে করতে তাকে প্রেম নিবেদন করেছিলেন পেসোয়া: ‘হে প্রিয় ওফেলিয়া, যন্ত্রণাকে গণনা করার শিল্প আমার জানা নেই: কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি সবচেয়ে বেশি, আহ,  বিশ্বাস করো, সবচেয়ে বেশি।’  প্রেম সম্পর্কে নোটবুকে তিনি লিখেছিলেন, কিভাবে ভালোবাসতে হয় তা জানতেন না  তিনি, শুধু জানতেন ভালোবাসার স্বপ্ন দেখতে।


রাখাল -এর কবিতা থেকে


১.
কখনও ভেড়ার দেখভাল করি নি
তবে কেন যেন মনে হয় আমি তাদের দেখভাল করতাম।
আত্মা আমার যেন এক রাখাল,
জানে হাওয়া আর সূর্যের গতিবিধি,
ঋতুতে ঋতুতে হাত ধরাধরি করে চলে
শুনতে আর অনুসরণ করতে।
মানুষ ছাড়া প্রকৃতির সব প্রশান্তিই
আমার পাশে এসে বসে।
কিন্তু একটি সূর্যাস্তের মতোই আমি থাকি বিমর্ষ
যেহেতু আমাদের চিন্তা এ রকমই,
যখন উপত্যকার দূরবর্তী এলাকায় কনকনে ঠান্ডা এসে পড়ে
আর তুমি ভাবো
যেন জানালা দিয়ে এক প্রজাপতির আসার মতোই
নেমে এল রাত।

কিন্তু প্রশান্ত আমার এই বিমর্ষতা
কারণ তা স্বাভাবিক ও যথাযথ
এমনকি যেভাবে থাকা উচিত আত্মার ভেতর, সেভাবেই রয়েছে তা,
যখন চিন্তা করে তখনই সে অস্তিত্বশীল
আর বাছবিচার ছাড়াই হাত দিয়ে তুলছে ফুল।

পথ যেখানে বেঁকে গেছে তার ওপাশে
ভেড়ার কর্কশ স্বর,
ভাবনারা তৃপ্ত হয় আমার।
কেবল, দুঃখ এই যে আমি জানি তারা তৃপ্ত,
কারণ, তৃপ্তিবোধ এবং দুঃখ ব্যতীত
যদি তা আমি না জানতাম,
তবে তারা থাকত আনন্দিত এবং তৃপ্ত।
বাতাসের তোড়ে মুষলধারে বৃষ্টিতে হাঁটার মতোই
চিন্তা করা অস্বস্তিদায়ক ।

আমার নেই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা চাওয়া-পাওয়া।
কবি হওয়া আমার কোনো অভিলাষ নয়।
এটা আমার নিজেকে একা রাখার উপায়।

কিন্তু চিন্তা করার জন্য যদি কখনও আমি ভেড়াশিশু হতে চাই,
(বা সমগ্র ভেড়ার ঝাঁক হয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ছড়িয়ে পড়তে চাই,
একই সময়ে অনেক সুখের ব্যাপার ঘটা),
এটাই হয় কারণ সূর্যাস্তের সময় যা অনুভব করি তা-ই আমি লিখি,
বা যখন আলোর ওপর দিয়ে চলে যায় মেঘের হাত
আর উন্মুক্ত ঘাসের ভেতর বয়ে যায় নীরবতা।

যখন কবিতা লিখতে বসি,
রাস্তা বা সোজাসাপটা পথ দিয়ে হাঁটি,
কবিতা লিখি কাগজে যা আসে আমার চিন্তায়,
অনুভব করি হাতে রয়েছে মেষপালকের বাঁকা লাঠি
আর দেখি ওখানে ওই পাহাড়ের চূড়ায়
আমার নিজের রূপরেখা,
ভেড়ার শব্দ শোনা আর ভাবনাগুলোকে দেখা,
বা ভাবনাগুলোকে শোনা আর ভেড়ার পাল দেখা,
আর সেই মানুষটির মতো অস্পষ্টভাবে হাসা
যে বুঝতে পারে না কী কথাবার্তা হচ্ছে
আর ভান করে যে সে আলবত বুঝতে পারে।

যারা আমাকে পড়তে পারে তাদের সবাইকে সালাম,
বড় কানওয়ালা টুপি খুলে তাদের ধন্যবাদ জানাই
যেহেতু তারা আমাকে দেখে ঘরের দরজায়
আর বাস কোনোমতে পৌঁছে যায় পাহাড়ের চূড়ায়।
তাদের আমি সালাম করি আর সূর্য ও বৃষ্টি
কামনা করি তাদের জন্য
যখন দরকার হয়ে পড়ে বৃষ্টির,
আর তাদের ঘরগুলোয় থাকতে হবে
একটু নিচু এক খোলামেলা জানালা
এক চমৎকার চেয়ার
যেখানে তারা বসতে পারে আর পড়তে পারে আমার কবিতা।
আর, যেহেতু তারা আমার কবিতা পড়ে
তাই তারা আমাকে ভাবতে পারে কিছু একটা প্রাকৃতিক বস্তু―
উদাহরণস্বরূপ, এক প্রাচীন গাছ
যার ছায়ায় শিশুবেলায় তারা হঠাৎই বসে পড়ত, খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে যেত,
আর তাদের ঢিলেঢালা পোশাকের আস্তিন দিয়ে
তপ্ত কপাল থেকে মুছে ফেলত ঘাম।

২.
আমার  অপলক চেয়ে থাকাটা সূর্যমুখীর মতোই স্বচ্ছ।
রাস্তায় হাঁটার সময় নিয়মমাফিক
আমি তাকাই ডানে ও বায়ে
আর কখনোবা পেছনেও,
আর প্রতিটি মুহূর্তেই যা দেখি
তা কখনোই আগে দেখি নি,
বস্তুদের ভালোভাবে পরখ করতে যারপরনাই ওস্তাদ আমি।
নবজাতকের মতোই অবাক হওয়ার অনুভূতি রয়েছে আমার
যদি নবজাতক জানায় যে সত্যিই সে জন্মগ্রহণ করেছে।
প্রতিটি মুহূর্তেই মনে হয়, সম্পূর্ণ নতুন এক পৃথিবীতে
এইমাত্র জন্মেছি আমি…

ডেইজি ফুলের প্রতি যেমন আমার বিশ্বাস তেমনই পৃথিবীর প্রতি
কারণ আমি তাকে দেখতে পাই। কিন্তু তার সম্পর্কে ভাবি না,
কারণ ভাবা মানেই বোধগম্য হওয়া নয়।
আমাদের এসব ভাবার জন্য পৃথিবী সৃষ্টি হয় নি
(ভাবা মানে এমন চোখ থাকা যা নয় ভালো)
পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে তাকে দেখার জন্য আর তার সাথে মিলমিশের জন্য।

একমাত্র অনুভূতি ছাড়া কোনো দর্শন নেই আমার…
প্রকৃতি সম্পর্কে যদি কিছু বলি তা এজন্য নয় যে আমি তাকে জানি
এজন্য যে আমি তাকে ভালোবাসি, আর  কেবল এ কারণেই,
কারণ যারা ভালোবাসে তারা কখনোই জানে না কী তারা ভালোবাসে
বা কেন তারা ভালোবাসে, বা কাকে বলে ভালোবাসা।
ভালোবাসা সরল,
আর সরলের সমষ্টি কোনো ভাবনা নয়…

৫.
ভেতরে ভেতরে রয়েছে অনেকানেক অধিবিদ্যা যা নিয়ে মোটের ওপর চিন্তাভাবনাই করা হয় নি।

পৃথিবী সম্পর্কে কী আমার ভাবনা?
কিভাবে জানব, কী ভেবেছি আমি পৃথিবীকে নিয়ে?
অসুস্থ হলেই ভাবতে পারতাম পৃথিবীকে নিয়ে।

বস্তু-বিষয়ে কী ধারণা আমার?
কারণ-কার্য বিষয়ে আমার অভিমত কী?
ঈশ্বর, আর আত্মা আর জগৎ-সৃষ্টি বিষয়ে কী ধ্যান আমি করেছি?

জানি না। তা চিন্তা করার মানে হলো
চোখ বন্ধ করে ফেলা আর
চিন্তা না করা। এটা হলো আমার জানালার পরদা
টেনে দেওয়া (কিন্তু জানালায় কোনো পরদা নেই)।

বস্তুর রহস্য? কিভাবে জানব যে কাকে বলে রহস্য?
একমাত্র রহস্য হলো রয়েছে এমন একজন
যে রহস্য নিয়ে ভাবতে পেরেছিল।
যে মানুষ সূর্যালোকে দাঁড়ায় আর চোখ বন্ধ করে রাখে
সূর্য বস্তুত কী তা না জেনেই ভাবতে শুরু করে
আর ভাবতে থাকে একেবারে তপ্ত অনেক বস্তুর কথা।
কিন্তু সে চোখ খুলে দেখে সূর্য,
আর এখন সে কোনোকিছুই ভাবতে পারে না,
কারণ সব দার্শনিক ও কবির ভাবনার চেয়েও
সূর্যের আলো অনেক বেশি মূল্যবান।
সূর্যের আলো জানে না সে কী কাজ করছে
অতএব পথভ্রষ্ট হয় না তা, রয়ে যায় সর্বসাধারণের আর কল্যাণকর।

অধিবিদ্যা? ওইসব গাছেদের কি কোনো অধিবিদ্যা আছে?
তারা সবুজ আর শাখাপ্রশাখায় পরিপূর্ণ
তারা ঠিক সময়ে দেয় ফল,—এটা এমন কিছু নয়
যা আমাদের ভাবায়,
আমাদের মধ্যে, যে জানে না কিভাবে তাদের বিষয়ে সাবধান হতে হয়।
তাদেরটার চেয়ে ভালো অধিবিদ্যা আর কী আছে,
জানে না কেন বেঁচে আছে তারা
আর এও জানে না যে এ বিষয়ে তারা অজ্ঞ?

‘বস্তুর অন্তর্গত গঠন’ …
‘মহাবিশ্বের অন্তর্গত অর্থময়তা’…
সব মিথ্যা, মোটের ওপর কিছুই না।
খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে মানুষ এসব নিয়ে ভাবে।
যেন যুক্তি আর সমাধানকে নিয়ে চিন্তা করা
যখন আলোকরশ্মি নিয়ে সকালের শুরু, আর
গাছপালার রেখার ওপারে এক কুয়াশামোড়ানো উজ্জ্বল সোনা সাফ করছে,
দূরীভূত করছে অন্ধকার।

বস্তুর অন্তর্গত অর্থ চিন্তা করা মানে
উদ্যমের অপচয়, যেনবা স্বাস্থ্যের চিন্তা করা
বা ঝরনার জলে একটি গ্লাস ধরা।

বস্তুর একমাত্র অন্তর্গত অর্থ হলো
এর কোনো অন্তর্গত অর্থ নেই।

আমি বিশ্বাস করি না ঈশ্বরে, কারণ আমি তাঁকে কখনও দেখি নি।
যদি তিনি চাইতেন যে আমি তাঁকে বিশ্বাস করি, তাহলে তিনি
অবশ্যই আমার কাছে আসতেন আর কথা বলতেন,
আমার দরজা দিয়ে ঢুকে এসে বলে উঠতেন, এই যে আমি!

কিন্তু যদি ঈশ্বর হন ফুল এবং বৃক্ষ
এবং পাহাড়পর্বত এবং সূর্য এবং চাঁদের আলো,
তাহলে তাঁকে আমি বিশ্বাস করি,
তাহলে প্রতি মুহূর্তেই তাঁকে বিশ্বাস করি,
আর আমার জীবন শুধুই এক প্রার্থনা আর উপাসনা,
দর্শনে এবং শ্রবণে এক গভীর চিন্তন।

কিন্তু যদি ঈশ্বর হন গাছপালা এবং ফুল
এবং পাহাড়পর্বত এবং চাঁদের আলো এবং সূর্য,
তাহলে কেন আমি তাঁকে ডাকব ঈশ্বর?
আমি তাঁকে ডাকব ফুল এবং বৃক্ষ এবং পাহাড় এবং সূর্য
এবং চন্দ্রকিরণ;
কারণ যদি তিনি নিজেকে বৃক্ষ আর পাহাড় আর চাঁদের আলো আর
সূর্য আর ফুল হিসেবে গড়ে তোলেন, তবেই তাঁকে দেখা হয় আমার,
আমার কাছে যদি তিনি বৃক্ষ আর পাহাড় আর চাঁদের আলো আর
সূর্য আর ফুল হিসেবে আবির্ভূত হন
তবেই তাঁকে আমার বৃক্ষ আর পাহাড় আর ফুল আর চাঁদের আলো
হিসেবে জানা, যা তাঁরও কাঙ্ক্ষিত।

অতএব তাঁকে আমি মান্য করি
(ঈশ্বরের নিজের চেয়ে আমি আর কতটুকু বেশি ঈশ্বরকে জানি),
স্বতঃস্ফূর্তভাবে, যাপনে যাপনে তাঁকে আমি ভক্তি করি,
যেমন একজন চোখ খোলে আর সবকিছু দেখে,
আর তাঁকে আমি ডাকি চাঁদের আলো আর সূর্য আর ফুল আর
বৃক্ষ আর পাহাড়,
আর তাঁকে না চিন্তা করেই ভালোবাসি
আর দর্শন এবং শ্রবণ দিয়ে তাঁকে চিন্তা করি,
আর প্রতি মুহূর্তেই একসাথে হাঁটি।

৬.
ঈশ্বর সম্পর্কে ভাবা মানে তাঁর অবাধ্য হওয়া,
যেহেতু ঈশ্বর চান নি যে আমরা তাঁকে জানি,
এ কারণেই তিনি আমাদের মাঝে নিজেকে প্রকাশ করেন নি…

বৃক্ষ আর ঝরনার মতো
চলো হই শান্ত আর সরল,
ঈশ্বর আমাদের ভালোবাসবেন, আমাদের সত্তাকে অপরিবর্তিত রেখে
বৃক্ষ যেমন বৃক্ষই
আর ঝরনা ঝরনাই,
আর বসন্তে দেবেন সবুজতা, যা সবুজেরই ঋতু,
আর জীবনান্তে চলে যাবার জন্য দেবেন এক নদী…
আর এর বেশি কিছু নয়, কারণ বেশি দিলে
আমরা হারাব অনেক কিছুই।

৭.
আমার গ্রাম থেকে মহাবিশ্বকে ততটুকুনই দেখা যায়
পৃথিবী থেকে একজন যতটুকু দেখে,
অতএব আমার গ্রাম অন্য যে-কোনো শহরের মতোই বড়,
কারণ আমি আমার নিজের উচ্চতার মাপের নই
যা দেখি আমি তারই মাপের…

এখানে এই পাহাড়ের চূড়ায়
ঘর-গেরস্থালির জীবনের চেয়ে আমার শহুরে জীবন ছোট।
শহরের বাড়িগুলো রুদ্ধ করে রাখে দৃশ্যাবলি আর তা থাকে বন্ধ,
তারা আড়াল করে দিকচক্রবাল, আকাশ থেকে অনেক দূরে
নিয়ে যায় আমাদের দৃষ্টিসীমাকে।
তারা আমাদের ছোট করে দেয়, কারণ দৃষ্টির বিশালত্বকে
আমাদের থেকে কেড়ে নেয়,
আর আমাদের করে হতদরিদ্র, কারণ দেখাই আমাদের একমাত্র সম্পদ।

৯.
রাখাল আমি, চড়াই ভেড়ার পাল
ভেড়ারাই আমার ভাবনা
আর সব ভাবনাই আমার অনুভূতি।
আমি ভাবি আমার চোখ আর কান দিয়ে
আর হাত ও পা
আর নাক ও মুখ দিয়ে।
ফুলকে ভাবার মানে হলো ফুলকে দেখা আর তার গন্ধ নেওয়া।
ফল খাওয়ার মানে হলো তার নিজস্ব স্বাদকে আস্বাদন করা।
আর এ কারণেই, কোনো গরমের দিনে
আনন্দ পাওয়ার জন্যই আমি হই বিষণ্ন
আর ঘাসের ওপর সটান শুয়ে বিশ্রাম নিই
আর সূর্যে তেতে ওঠা চোখদুটো বুজে রাখি,
বুঝি, আমার সমগ্র দেহ বাস্তবতায় শিথিল হয়ে আছে
আর জেনে যাই সমগ্র সত্য, খুশিতে ভরে ওঠে মন।

১৪.
ছন্দ নিয়ে আমি থোড়াই পরোয়া করি।
পাশাপাশি দুটো গাছ কমই সমান হয়।
ফুলের যেমন রয়েছে রঙ তেমনই ভাবনা আর লেখালেখি আমার,
কিন্তু নিজেকে প্রকাশের বিষয়ে আমার রয়েছে অপূর্ণতা
কারণ শুধু বাইরের ঠাট ছাড়া আমার
সমগ্র অস্তিত্বজুড়ে রয়েছে দিব্য সারল্য।

তাকাই আর চালিত হই,
ভূমির ঢালুপথ ধরে জল যেভাবে গড়িয়ে পড়ে, তেমনি চালিত হই আমি,
আর আমার কবিতা বাতাসের সঞ্চরণের মতোই হয়ে ওঠে প্রাকৃতিক…

১৬.
আমার জীবন যদি শুধু একটি গরুগাড়ি হতো
তাহলে খুব সকালে ক্যাঁচক্যাঁচ করে রাস্তা দিয়ে সে চলে যেত,
আর সন্ধ্যায় একই পথ ধরে সে ফিরেও আসত…

আশাবাদী হওয়ার কোনো দরকারই  হতো না, কেবল চাকার জীবন আমার…
বুড়ো বয়সে পড়ত না বলিরেখা বা সাদা কেশ…
যখন আমি আর কোনো কাজে লাগব না, তখন আমার চাকাগুলোকে খুলে ফেলা হবে
আমি ভাঙা আর ওল্টানো অবস্থায় পড়ে থাকব খাঁড়িতে।

অথবা আমাকে বানানো হবে অন্যরকম কিছু
আর আমি জানবই না কী হয়েছি আমি…
কিন্তু আমি তো নই গরুর গাড়ি, আমি ভিন্ন কিছু।
কিন্তু ঠিক কীভাবে যে আমি ভিন্ন তা আমাকে কেউ কখনও বলে নি।

২৪.
বস্তুর যা আমরা দেখি তা-ই বস্তু
যদি ওখানে অন্য একটি জিনিসই ছিল তবে
কেন আমরা একই জিনিস দেখব?
যদি দেখা এবং শোনা কেবল দেখা আর শোনাই হয়
তাহলে এসব নিয়ে প্রতারণা  কেন?

দরকারি হলো ভালো করে দেখা
সবসময় চিন্তা ছাড়াই ভালো করে দেখা,
দেখার সময় দেখতে পারা,
দেখার সময় চিন্তা না করা,
বা চিন্তা করার সময় না দেখা।
কিন্তু এটি (হতভাগ্য আমরা বহন করি কাপড়ে মোড়ানো আমাদের আত্মা!)
এটি দাবি করে এক পুঙ্খানুপুঙ্খ শিক্ষাক্রম,
অশিক্ষায় শিক্ষানবিশি
আর সন্ন্যাসিনীদের মঠের মুক্তিতে বিচ্ছিন্ন করে রাখা
তাতে কবিরা বলেন যে নক্ষত্ররাই হলো চিরন্তন সন্ন্যাসিনী
এবং ফুলেরা হলো এক নিঃসঙ্গ দিনের আবেগময় অনুশোচনা,
কিন্তু কোথায়, শেষমেশ নক্ষত্ররা নক্ষত্র ছাড়া আর কিছুই নয়
আর ফুলেরা ফুল ছাড়া আর কিছুই নয়,
এই কারণেই আমরা তাদের বলি নক্ষত্র আর ফুল।

২৬.
মাঝেমধ্যে, নিখুঁত আর সত্যিকার আলোয় ভরা দিনে,
সম্ভাব্য বাস্তবতায় বস্তুরা যখন বিরাজিত,
আস্তে করে নিজেকে বলি
কেন বস্তুর সৌন্দর্য আরোপে আমি হই বিচলিত।
সত্যিই ফুলের কি রয়েছে সৌন্দর্য?
ফলেরও কি রয়েছে তা?
না: তাদের আছে শুধু রঙ ও আকৃতি
আর শুধুই অস্তিত্ব।
সৌন্দর্য এমনই কোনো কিছুর নাম যার কোনো অস্তিত্ব নেই
কিন্তু বস্তুকে আমি তা দিই আনন্দের বিনিময়ে, যা তারাও আমাকে দেয়।
এছাড়া তার কোনো তাৎপর্য নেই।
আর কেন আমি বস্তু সম্পর্কে বলি: তারা সুন্দর?

হ্যাঁ, এমনকি যাপনে বেঁচে থাকা আমিও
বস্তু বিষয়ে, অস্তিত্বশীল বস্তু বিষয়ে মানুষের মিথ্যা ধারণাকে ধরে ফেলি,
দৃশ্যমান ছাড়া অন্য কিছুকে দেখতে না পারা একজনের জন্য তা কী যে কঠিন।

২৮.
কোনো এক মরমি কবির লেখা বইয়ের
মাত্র দুটো পৃষ্ঠা পড়ে ফেলি আজ,
হেসে উঠলাম যেমনটা কেঁদেছিলাম অনেকটা।

মরমি কবিরা হলো অসুস্থ দার্শনিক,
আর দার্শনিকেরা হলো পাগল-ছাগল।
কারণ মরমি কবিরা বলে বসে যে ফুলের রয়েছে অনুভব
আর পাথরের রয়েছে আত্মা
আর চাঁদনি রাতে নদী হয়ে ওঠে ভাবোচ্ছ্বাসে পূর্ণ।

কিন্তু ফুলের যদি থাকে অনুভব, তাহলে তা ফুল নয়,
তারা হতো মানুষ;
আর পাথরের যদি থাকত আত্মা, তাহলে
তারা পাথর নয়, হতো জীবন্ত সত্তা;
আর চাঁদনি রাতে যদি নদী থাকে উচ্ছ্বাসময় তাহলে
নদী হতো গিয়ে অসুস্থ মানুষ।

ফুল, নদী আর পাথর কী জিনিস যাদের জানা নেই
তারাই পারে তাদের অনুভূতি নিয়ে বলতে।
যারা কেবল পাথরের আত্মা, ফুল আর নদী
নিয়ে বলে
তারা শুধু বলে যায় তাদের নিজেদের আর তাদের বিমূর্ত ধারণা সম্পর্কে।
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে পাথর পাথরই,
নদী নদী ছাড়া কিছুই না,
আর ফুল ফুলই মাত্র।
যেমনটা আমার জন্য, আমি শুধু আমার পদ্যের গদ্যই লিখে যাই
আর থাকি সন্তুষ্ট,
কারণ জানি আমি প্রকৃতিকে বাহ্যিকভাবেই অনুধাবন করি,
অন্তর্গতরূপে তাকে পারি না বুঝতে,
কারণ প্রকৃতির কোনো অন্তর্গত রূপ নেই।
যদি থাকত, তা হয়ে উঠত না প্রকৃতি।

৩০.
যদি তুমি  চাও যে আমার থাকুক এক মরমিয়াবাদ, তাহলে তথাস্তু,
আমার তো আছেই এক মরমিয়াবাদ।
আমি এক মরমি, কিন্তু শুধু গা-গতরে।
আমার আত্মা সাদাসিধা আর পারেও না ভাবনাচিন্তা করতে।

আমার মরমিয়াবাদ চায়ও না কিছু জানতে।

চিন্তাহীনভাবেই বেঁচে থাকে তা।

জানি না কাকে বলে প্রকৃতি: আমি বন্দনা করি তার।
পাহাড়ের চূড়ায় চুনকাম করা এক নির্জন বাড়িতে থাকি আমি,
আর এ-ই তো আমার স্বকীয় প্রকৃতি।

৩১.
কখনও বা যদি আমি বলি যে ফুলের হাসি
আর যদি বলেই ফেলি যে নদীর গান,
এজন্য নয় যে আমি ভাবি ফুলের আছে হাস্য
আর বহমান নদীর রয়েছে গান…
কারণ এভাবেই ফুল আর নদীর প্রকৃত অস্তিত্ব অনুভবে
ভিন্ন ভাবনার মানুষদের সাহায্য করতে পারি আমি।

কারণ তাদের জন্য আমি লিখি যেন তারা আমাকে পাঠ করে, কখনও আমি
তাদের বোধভেদের নির্বুদ্ধিতার কাছে থেমে পড়ি…
এটা ঠিক নয়, কিন্তু নিজেকে আমি ক্ষমা করে দিই,
কারণ আমি কেবল এই জঘন্য দায়িত্বই নিয়েছি, প্রকৃতির এই দোভাষীর দায়িত্ব,
কারণ এমন মানুষও আছে যারা তাদের নিজ ভাষাকেই সাদরে গ্রহণ করতে পারে না,
যা মোটের ওপর কোনো ভাষাই নয়।

৩৪.
মাঝে মাঝে আমি যে আনমনে হেসে উঠি
ঠিক জানি না কী নিয়ে, কিন্তু ভাবুক মানুষদের অস্তিত্ব যে চারপাশে রয়েছে
তার সাথে আমার হাসির সম্পর্ক যে আছে, তাতে আমি নিশ্চিত…
এ নিয়ে যে আমি মোটেই ভাবি না,  এটাই আমার কাছে স্বাভাবিক…

আমার দেয়াল কেন আমার ছায়া নিয়ে ভাবে?
কখনও বা তাতে আমি বিস্মিত হই যতক্ষণ না বুঝি যে
বস্তুকে নিয়েই আমি বিস্মিত হচ্ছি…
আর তারপর আমি বিরক্ত হই আর মনমরা হয়ে পড়ি,
যেন বা আমি বুঝে যাই যে আমার পদচিহ্ন ছিল নিদ্রাচ্ছন্ন…

এক বস্তু অন্য বস্তু সম্পর্কে কিভাবে অনুভব করে?
অস্তিত্বহীন কিছু অনুভব করতে পারে না কোনো কিছুকে।
পৃথিবী কি তার বুকে থাকা পাথর আর গাছপালা নিয়ে সচেতন?
তা যদি হতো, সে হতো এক ব্যক্তি,
আর যদি হতো এক ব্যক্তি, তার থাকত ব্যক্তির প্রকৃতি, সে হতো না
পৃথিবী।
কিন্তু কিভাবে এসব আমার ধর্তব্যের মধ্যে আসে?
যদি এসব নিয়ে আমি ভাবতাম,
গাছপালা দেখা আমি বন্ধ করে দিতাম
পৃথিবীকেও আর দেখতাম না,
কিছুই দেখতাম না, শুধু ভাবতাম…
বিষণ্ন হতাম আর অন্ধকারে পড়ে থাকতাম।
এভাবে ভাবনা ছাড়াই আমার রয়েছে পৃথিবী আর আকাশ।


বস্তুর বিস্মিত বাস্তবতা


বস্তুর বিস্মিত বাস্তবতাই আমার নিত্যদিনকার আবিষ্কার।
প্রতিটি বস্তু তা-ই যা সে নিজে,
আর কারও কাছে ব্যাখ্যা করা কঠিন, আমাকে কী যে সুখী করে তা,
কী যে তৃপ্ত করে।

পূর্ণতার জন্য সবকিছুকে হতে হয় অস্তিত্বশীল।

লিখেছি বেশ কিছু কবিতা
আর লিখতেও পারি আরও বেশি কিছু।
আমার প্রতিটি কবিতাই তার ব্যাখ্যা দেয়,
তারা একেবারে স্বতন্ত্র,
কারণ অস্তিত্বশীল প্রতিটি বস্তুই এ কথা বলার এক ভিন্ন ভিন্ন পথ।

মাঝে মাঝে একটি পাথরের দিকে তাকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমি,
পাথরটির অস্তিত্ব নিয়ে ভাবি না কিছু।
তাকে বোন বলতে উদ্দেশ্যচ্যুত হই না আমি।
কিন্তু এই পাথরসত্তার জন্যই আমার ভালো লাগে তাকে,
আমি তাকে উপভোগ করি কারণ পাথরটি অনুভূতিহীন,
আনন্দ বোধ করি কারণ পাথরটি কোনোভাবেই আমার সাথে সম্পর্কিত নয়।

মাঝে মাঝে শুনি বয়ে যাওয়া বাতাসের ধ্বনি
আর এই বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ শোনাটাই শুধু
আমার জন্মকে সার্থক করে।
আমি জানি না অন্যরা এটা পড়ে কী ভাববে;
কিন্তু আমি এটাকে সঠিক মনে করি, কারণ কোনোরকম প্রচেষ্টা ছাড়াই
আমি তা ভাবতে পারি,
অথবা মানুষেরা চিন্তা করবে আমার কাছে শুনে, এমন কোনো ধারণা,
কারণ চিন্তন ছাড়াই আমি তা চিন্তা করি,
কারণ আমার শব্দরা যেভাবে বলে, আমি সেভাবেই বলি।

একবার আমাকে অভিহিত করা হয়েছিল জড়বাদী কবি বলে
আর শুনে বিস্মিত হলাম আমি, কারণ
আমি ভাবিই নি যে কোনো অভিধায় আমাকে অভিহিত করা যেতে পারে।
আমি এমনকি কবিও নই―দর্শকমাত্র।
যদি আমার লেখার কোনো মূল্য থেকে থাকে, তার মানে এই নয় যে
আমি নিজে মূল্যবান একটা-কিছু।
মূল্য রয়েছে এখানে, আমার কবিতার।
আর এসবের সাথে আমার ইচ্ছার কোনো সম্পর্কই নেই।


দাবাড়ু


একবার শুনেছিলাম, পারস্যদেশে এক যুদ্ধে,
জানি না ঠিক কোন যুদ্ধ,
আক্রমণকারীরা যখন শহরজুড়ে চালাচ্ছিল তাণ্ডব
যখন নারীরা করছিল চিৎকার,
দুইজন দাবাড়ু তখন চালিয়ে যাচ্ছিল
তাদের অন্তহীন দাবাখেলা।

গাছপালার প্রগাঢ় ছায়ায় তাকিয়েছিল তারা
পুরোনো দাবার ছকটার দিকে,
তাদের প্রত্যেকের পাশে ছিল পেয়ালাভরতি মদিরা
যা পবিত্রভাবে প্রস্তুত ছিল
তাদের সেই মুহূর্তের তৃষ্ণা মেটাতে যখন
একজন ঘুঁটির চাল দিয়ে
পেছনে ঠেস দিয়ে আরামে বসে থাকে আর অন্যজন পাল্টা কী চাল দেয়
তার জন্য থাকে প্রতীক্ষারত।

ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল ঘরবাড়ি,
ধসে পড়েছিল ছাদ আর কারাপ্রাচীর;
ধর্ষিত হলো নারীরা, তারপর তাদের ঠেস দিয়ে রাখা হলো
ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া দেয়ালে;
বর্শাবিদ্ধ তাদের ছেলেমেয়েরা
রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে…
এসব হইচই থেকে দূরে নগরের কাছাকাছিই
সেই দুজন দাবারু মশগুল হয়ে রইল
তাদের দাবা খেলায়।

এমনকি যদিও কনকনে হাওয়া তাদের কানে পৌঁছে দিচ্ছিল
এইসব হল্লা আর আর্তনাদের খবর
আর, স্মৃতি ধরে তারা ঠিক বুঝে নিচ্ছিল যে
তাদের স্ত্রী আর কমবয়সী কন্যারা ইত্যবসরে নিকটেই
হয়ে গেছে ধর্ষিত,
এমনকি যদিও সেই মুহূর্তে তাদের চিন্তায় তা ছিল,
এক পলাতক ছায়া
তাদের অস্পষ্ট, বিস্মৃত ভ্রুর ওপর দিয়ে চলে গেল,
কিন্তু শীঘ্রই তাদের প্রশান্ত চোখগুলো
আবারও সমূহ মনোযোগে
ফিরে এল পুরোনো দাবার ছকের ওপর।
গজদন্তমিনারবাসী রাজা যখন বিপদে পড়ে, কার আর অভিনিবেশ থাকে
বোন, মা আর ছোট্টমণিদের
রক্তমাংস নিয়ে?
যখন কিস্তি রুখতে পারে না
সুন্দরী রানির পশ্চাদ্ধাবন, তখন
লুঠতরাজে কীবা যায়-আসে?
আর যখন নিশ্চিত চালে অন্যপক্ষের রাজাকে
করে ফেলা হয় অবরুদ্ধ,
কারও হৃদয়ের পক্ষেই উদ্বিগ্ন হওয়া মানায় না যে
কিছুটা দূরেই শিশুরা মরছে।

এমনকি যদি আক্রমণকারী যোদ্ধার
রাগান্বিত মুখ
হঠাৎ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে দেয়ালের ওপরে
আর পূতপবিত্র দাবাড়ুরা ঠিক এই রক্তাক্ত আবর্জনায়
যায় পড়ে,
ঠিক এর আগের মুহূর্তটিও
উৎসর্গীকৃত থাকে এই প্রিয় খেলার জন্য
চরম উদাসীনতায়।
নগর ধ্বংস হয়ে যাক, মানুষের যন্ত্রণা বাড়ুক,
জীবন ও স্বাধীনতা
সুরক্ষিত, পূর্বপুরুষদের সম্পত্তি নষ্ট হোক,
পুড়ে যাক আর সমূলে উৎপাটিত হোক,
কিন্তু যখন যুদ্ধ খেলার বিঘ্ন ঘটায়, নিশ্চিত হও যে
রাজা যেন অবরুদ্ধ না থাকে
আর সবচেয়ে এগিয়ে থাকা হাতির দাঁতের সৈন্যগুলো
কিস্তিকে উদ্ধারের জন্য যেন সদা থাকে প্রস্তুত।

আমার ভাইয়েরা এপিকিউরাসের প্রেমে মগ্ন
আর মগ্ন তাঁকে অনুধ্যানে
তাঁর চেয়েও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ
এই হৃদয়গ্রাহী দাবাড়ুদের গল্প থেকে
শিক্ষাগ্রহণ করো―কিভাবে চালাতে হয় জীবন আমাদের।
গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যেন আমাদের কাছে কমই প্রয়োজনীয় হয়
আর গভীর জিনিস হয় কমই বাঞ্ছিত,
আর রিপুর প্রাকৃতিক তাড়না যেন
তুচ্ছ আনন্দের জন্ম দেয়
(বৃক্ষের শান্তিময় ছায়ায়)
একটি উৎকৃষ্ট খেলা খেলতে।

এই অর্থহীন জীবন থেকে যা কিছুই আমরা গ্রহণ করি না কেন
তাকে হতে দাও গৌরবান্বিত অথবা খ্যাতিময়,
ভালোবাসা, বিজ্ঞান, বা জীবন নিজেই
একটি সার্থক খেলার স্মৃতি
এবং একজন ভালো খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে জয় পাওয়ার চেয়ে
বেশি মূল্যবান নয়।

একটি অতি বড় বোঝার মতো গৌরব ভারী হয়ে আছে
আর খ্যাতি জ্বরের মতো,
ভালোবাসা ক্লান্তিকর, কারণ তা আকুলভাবে খুঁজে ফেরে,
বিজ্ঞান কখনও যা পায় না,
আর জীবন দেয় গভীর দুঃখ, কারণ সে জানে সে ফুরিয়ে যাচ্ছে…
দাবার খেলা
একজনের হৃদয়কে সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন করে রাখে কিন্তু যখন সে হারে
তখন থাকে কম ভারী, কারণ এটা কিছুই না।

আহ, ছায়ার ভেতর যা অচেতনভাবে ভালোবাসে আমাদের
আর আমাদের পাশেই থাকে
তা হলো এক পেয়ালা মদ, কেবল গভীরভাবে নিবিষ্ট অপ্রয়োজনীয়ভাবে
দাবা খেলার প্রচেষ্টা,
এমনকি যদি সেই খেলা হয় কেবল এক স্বপ্ন
আর আমাদের থাকে না কোনো ভাগীদার,
এই গল্পের পারস্যবাসীদের মতো এসো করি:
ওখানে বাইরে সর্বত্রই,
কাছে বা অতিদূরে, যুদ্ধ আর আমাদের দেশ
আর জীবন ডাকছে আমাদের,
বৃথাই তাদের ডাকো, যখন আমরা
আমাদের ভাগীদারদের বন্ধুত্বময় ছায়ায়
স্বপ্ন দেখি, আর দাবার খেলা স্বপ্ন দেখে যায়
তার উদাসীনতায়।


আমাদের ভেতরে রয়েছে অসংখ্য মানব


আমাদের ভেতরে রয়েছে অসংখ্য মানব;
অনুভব করি আমি, বা ভাবি
আর জানি না কে সে―যে ভাবছে, করছে অনুভব।
আমি কেবল সেই আঁধার
যেখানে রয়েছে এইসব অনুভব বা ভাবনার আধেয়।

আমার রয়েছে অনেকগুলো আত্মা।
রয়েছে ‘আমার’ চেয়েও অনেকগুলো ‘আমি’।
আর সবার প্রতি আসক্তিহীনভাবে
আমি এখনও বেঁচে রয়েছি।
তাদের চুপ করিয়ে রেখে আমি শুধু কথা বলে যাই ।

আড়াআড়ি রেখাগুলো এগিয়ে যায়
যা কিছু বুঝি বা বুঝি না
তা আমার আমির ভেতরে বিতণ্ডার সৃষ্টি করে।
সব কিছুই অজানা। আমার পরিচিত সেই আমিকে
তারা কিছুই হুকুম করে না। লিখে যাই আমি।


মুখোশটা খুলে ফেললাম


মুখোশটা খুলে ফেললাম আর তাকালাম আয়নার দিকে।
অনেক বছর আগেকার সেই শিশুটিই রয়ে গেছি যেন।
কিছুই যেন বদলায় নি আমার…

এই হলো মুখোশ খুলতে জানার সুবিধা।
এখনও সেই শিশুটিই রয়ে গেলে তুমি,
যে যাপন করে অতীত,
সেই শিশুটিই।
মুুখোশটা খুলে ফেললাম আর আবার পরে নিলাম।
এভাবেই ভালো।
এভাবেই আমি এক মুখোশ।

আর গন্তব্যে পৌঁছানোর মতোই আমি ফিরে আসি আমার স্বাভাবিকতায়।

প্রতিটি বিদায় এক মৃত্যু
রেলগাড়িতে যার সাথে পরিচয় হলো
নেমে পড়ার সময় তাকে বিদায় জানালাম।
আট ঘণ্টা একসাথে কাটিয়েছি আমরা
কথাবার্তাও হয়েছিল আনন্দায়ক,
ভ্রমণের মেলামেশা
নেমে যাওয়াতে মন খারাপ হয়ে গেল আমার, এই হঠাৎ পাওয়া বন্ধুকে ছেড়ে
নেমে পড়তে হলো বলে আমি যারপরনাই দুঃখিত, নামও জানা হয় নি তার কখনও।
মনে হচ্ছিল চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে আমার…
প্রতিটি বিদায় এক মৃত্যু।
হ্যাঁ, প্রতিটি বিদায়ই এক মৃত্যু।
রেলগাড়িতে যাকে আমরা বলি জীবন
আমরা সবাই আশলে একে অন্যের জীবনে ঘটনাচক্র,
আর নেমে যাবার সময় আমরা হয়ে পড়ি শোকাহত।

এইসব মানবিক কিছুই আমাকে পরিচালিত করে, কেননা আমি মানুষ।
এইসব মানবিক কিছুই আমাকে চালায় এজন্য নয় যে
মানবিক ভাবনা বা মতবাদের প্রতি রয়েছে আমার অনুরাগ
বরং এজন্য যে খোদ  মানবিকতার প্রতি রয়েছে আমার অন্তহীন অনুরাগ।

চলে যেতে চায় নি সেই পরিচারিকা,
যে-বাড়িতে তার প্রতি খারাপ ব্যবহার করা হয়েছিল
তারই স্মৃতিভারে সে করছে কান্না…

এসবই, হৃদয়ের ভেতরে, মৃত্যু আর পার্থিব শোক।
কারণ মরণশীল এসব জীবন, রয়েছে হৃদয়ের গভীরে আমার।

আর আমার হৃদয় সমগ্র জগতের চেয়ে কিছুটা বিশাল।


অটোসাইকোগ্রাফি


কবিরা ভান করে
ভান করতে ওস্তাদ তারা
এমনকি তারা ভান করতে পারে সেই যন্ত্রণা
যে যন্ত্রণা তারা সত্যিই করে অনুভব,

কিন্তু পাঠকেরা পড়ে যা লিখেছিল কবি একদা
পরিষ্কার অনুভব করে যা তারা পাঠ করে
মোটেও করে না অনুভব কবির অনুভূত ব্যথাকে
অনুভব করে সেই ব্যথা যা তাদের সংবেদী ও নিজস্ব।

তারপর আমাদের যুক্তিকে ব্যস্ত রাখতে
ঘূর্ণায়মান লাইন ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে
গড়গড়িয়ে চলে রেলগাড়ি আমাদের
আর এই খেলনা রেলগাড়িই হলো হৃদয়।


আমার মৃত্যুর পর, যদি


আমার মৃত্যুর পর, যদি, তারা আমার জীবনী লিখতে চায়,
তাহলে এর চেয়ে সহজ আর কিছুই হয় না।
আমি আসলে দুটো তারিখ―একটি আমার জন্মের, আর অন্যটি মৃত্যুর।
এ দুয়ের মাঝের সব দিনগুলোই আমার।
খুব সহজ আমার পরিচয়।
পাগলের মতোই বেঁচেছিলাম আমি।
কোনোরকম আবেগময়তা ছাড়াই আমি ভালোবেসেছিলাম বিষয়আসয়।
এমন কোনো অভীপ্সাই ছিল না আমার যা অপূর্ণ ছিল, কারণ
কখনও কোনো বিষয়ে অন্ধ হয়ে যাই নি আমি।
এমনকি শোনাও দেখার আনুষঙ্গিক ব-ই
অতিরিক্ত কিছু ছিল না আমার কাছে।
এসবকেই আমি মনে করেছি সত্যি আর একটি অপরটির থেকে আলাদা;
চিন্তা দিয়ে নয়, চোখ দিয়ে আমি এসব বুঝেছি।
চিন্তা দিয়ে বুঝলে সবকিছুকে একরকম মনে হতো।

একদিন শিশুটির মতোই তন্দ্রাচ্ছন্ন হলাম আমি ।
চোখ বন্ধ করলাম আর ঘুমিয়ে পড়লাম।
আর যা  হোক, হলাম আমি একমাত্র প্রকৃতির কবি।


ভালোবাসা প্রয়োজনীয়


ভালোবাসা প্রয়োজনীয়
যৌনতা স্রেফ আকস্মিক।
এই দু-ই হতে পারে এক
বা আলাদা।
মানুষ জন্তু নয়:
এক ইন্দ্রিয়পরায়ণ প্রজ্ঞাবান
যদিও কখনও-সখনও অসুস্থ।


আমি ক্লান্ত


আমি ক্লান্ত এটা ঠিক,
কারণ, একটি নির্দিষ্ট বয়সে, মানুষকে ক্লান্ত হতে হয়।
কিসের জন্য আমি ক্লান্ত, তা আমি জানি না:
যখন থেকেই এই রকম ক্লান্তি
তখন থেকেই আমি জানি না তার কারণ।
আঘাতে সৃষ্ট ক্ষত যন্ত্রণা বাড়ায়
আর আঘাতের কারণ থাকে অজ্ঞাত।
হ্যাঁ, আমি ক্লান্ত,
এমনকি যখন একটু হাসি
তাও এই ক্লান্তির ফল―
শরীরে ঘুমের ইচ্ছা,
মনে চিন্তাহীন আকাঙ্ক্ষা
আর, সর্বোপরি, স্মৃতিচারিত বোধগম্যতার
এক জ্যোতির্ময় স্বচ্ছতা…
আর এখন আশা না-থাকার এক বিলাসিতা?
আমি বুদ্ধিমান: এ-ই সবকিছু।
দেখেছি বহু কিছু আর তাকে উপলব্ধিও করেছি,
আমাদের এইসব ক্লান্তিতে নিশ্চিত কিছু আনন্দও আছে,
ওটাই শেষকিছু যে মস্তিষ্ক এখনও কিছু একটা সেবা করে যায়।


সরলরেখায় লেখা কবিতা


মার খাওয়া কোনো মানুষকে কখনোই আমি চিনতাম না।
আমার পরিচিত সবাই সবকিছুতেই এক-একজন সেরা।

অন্যদিকে আমি নিজে হলাম গিয়ে প্রায়শই বিশৃঙ্খল, বাজে, জঘন্য,
একেবারে দায়িত্বহীন আর পরগাছা,
একেবারেই অসহ্য, ক্ষমাহীন,
আলস্যবশত স্নানটানও করি না প্রায় সময়,
আমি এমন উদ্ভট আর অর্থহীন,
যে জনসমক্ষে আদবকায়দার বেকায়দায় পড়ে পদস্খলিত,
আমি তুচ্ছ, কিম্ভূত, সমানভাবে অনুগত আর উদ্ধত,
অপমানিত ও নিশ্চুপ,
যখন ছিলাম না চুপচাপ তখন বরং ছিলাম আরও উদ্ভট
বেয়ারা ভেবেছে আমাকে সঙ
ভৃত্যদের চোখ রাঙানো দেখেছে
আমি পড়ে গেছি টাকাপয়সার সমস্যায়, ফলে পরিশোধ না করেই
আরও ধার করেছি টাকা,
মারপিটের সময় নিচু হয়ে
নিজেকে রক্ষা করেছি আঘাত থেকে,
তুচ্ছতাচ্ছিল্যে দুঃখ পেয়েছি অনেক
তারপরও গলা ফাটিয়ে বলি, আমার সমান করুণ আর কেউ নেই এই পৃথিবীতে।

যেসব পরিচিত কথা বলে আমার সাথে
কেউ করে নি উদ্ভট ব্যবহার, অপমানিতও হয় নি,
তারা সবাই রাজকুমার―সবাই―এই জীবনে…

যদি অন্য কোনো মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পেতাম:
দোষ স্বীকারোক্তি দিচ্ছে পাপাচারের জন্য নয়, অপমানের জন্য;
দ্বেষপূর্ণ কথাবার্তা বলছে না, বলছে ভয়ের কথা!
হ্যাঁ, কথাবার্তা শুনে ধরে নেওয়া যায় এরা সবাই অনবদ্য।
প্রশস্ত পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যে আমার কাছে স্বীকার করবে যে
সে হলো তুচ্ছ?
ওহে রাজকুমারেরা, তোমরা আমার ভাই,
ফেলে রেখেছি এইসব, এইসব ক্লান্তিকর গৌণ দেবতাদের!
মানুষের বড় অভাব এই পৃথিবীতে, নয় কি?

অতএব এ জগতে আমি কি চিরকালের এক জঘন্য আর ভ্রান্তি?

মেয়েদের ভালোবাসা ছাড়াই,
বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও তারা নয় হাসির খোরাক!
আর আমি, প্রতারণা ছাড়াই হয়ে আছি এক উদ্ভট,
তোতলামো ছাড়া কিভাবে সম্ভব তাদের সাথে স্বাভাবিক কথা বলা?
বাস্তবিকই আমি এক জঘন্য, নিতান্তই জঘন্য,
শব্দের নিকৃষ্ট ও নিন্দনীয়তম অর্থেই আমি জঘন্যতম…


প্রতিভাবানের ব্যক্তিত্ব


শিল্পে সবই জায়েজ, যতক্ষণ পর্যন্ত তা মহৎ। দেশপ্রেম সাধারণের,
কারণ তারা নিয়মের বাইরে যেতে পারে না, নিজ জাতির অন্তর্গত
গোত্রের বাইরে যেতে পারে না তারা। প্রতিভার অধিকারীদেরও
এমনটা হতে পারে। তার মানে মহৎ প্রতিভারা তাল মিলিয়ে চলেন
সাধারণ অনুভূতির সাথে: শেকসপিয়র তো যারপরনাই অতিমাত্রায়
ছিলেন দেশপ্রেমিক।
কিন্তু দেশপ্রেমহীন প্রতিভা ব্যতিক্রম, তবে তা গ্রহণীয়। তবে দেশপ্রেমহীন
শ্রমিক অপদার্থ।
গোত্রের মধ্যে থাকা মানুষদের মতামত নাই, কারণ মতামত ব্যক্তিগত,
মানুষ যে পর্যন্ত পরিবার বা বর্গে একাত্ম হয়ে থাকে, তখন সে ব্যক্তি নয়,
সকলের মতো সবার সাথে যেন একটি কোষ হয়ে থাকে। জাতিগোষ্ঠী এক
বিমূর্ত বিষয়, কারণ তার অতীতে আর ভবিষ্যতে মিশে থাকে সে, ফলে
ব্যক্তির আত্মাকে সে পরাধীন করে রাখে না।
শিল্পীর প্রতিরক্ষার সমস্যা প্রতিভাবানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কারণ তার
মানসিক জীবন ভিন্নতর। তার জীবিতাবস্থায় তা থাকে অবোধ্য, অর্থাৎ
তার প্রতিভা থাকে অধরা।
লেখকশিল্পী, অর্থাৎ কিনা যারা লেখার মাধ্যমে হয় অমর, তাঁদের সুরক্ষা এবং
বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন, তারা কোনোভাবেই প্রতিভাবান নয়।
প্রতিভাবান তারাই যারা জটিল পরিস্থিতি দিয়ে যায়, যা বংশধারা পরিবেশ
থেকে আরম্ভ হয়ে নিয়তিতে সমাপ্ত হয়।


বড়দিন


একজন ঈশ্বরের জন্ম হয়। অন্যরা মরে যায়। প্রকৃত সত্য
আসেও না, যায়ও না: ভ্রান্ত ধারণার বদলাবদলি।
এখন আমাদের রয়েছে অন্য এক চিরন্তনতা,
আর সবসময়ই, যে মরে যায় সে বেঁচেই যায়।

অন্ধ বিজ্ঞান ফালতু বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
বাতুল বিশ্বাস আনুষ্ঠানিক পূজাপদ্ধতির ঘোরে করছে বসবাস।
নতুন ঈশ্বর এক শব্দ বা কেবল এক নাদ।

যাচ্‌ঞা করো না, বিশ্বাসও করো না: সব কিছুই দুর্জ্ঞেয়।


আমি জানি, আমি একা


আমি জানি, আমি একা,
এই হৃদয় বিশ্বাসহীন, নিয়মহীন
সুরহীন, ভাবনাহীন
কতটা যে কষ্টকর।

কেবল আমি, কেবল আমিই জানি
আর এসবের কিছুই বলতে পারি না
কারণ অনুভব ব্যাপারটি আকাশটার মতো―
সবকিছু দৃশ্যমান, কিন্তু তাতে কিছুই দেখার নেই।


পেসোয়া সম্পর্কে বিস্তারিত : আমি জানি, আমি একা…

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা: লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব ( ২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২), তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪);

প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬), অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯),মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫);

অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪)।

ই-মেইল : kumar.4585@yahoo.com
কুমার চক্রবর্তী