হোম অনুবাদ প্লেবয়ে কাস্ত্রোর সাক্ষাৎকার

প্লেবয়ে কাস্ত্রোর সাক্ষাৎকার

প্লেবয়ে কাস্ত্রোর সাক্ষাৎকার
1.05K
0

প্রাক-কথন:

১৯৫৯ সালের শেষ দিকে, ফটোজার্নালিস্ট লি লকউড, কিউবা গিয়েছিলেন বারিস্তা আমলের যবনিকাপাত স্বচোক্ষে প্রত্যক্ষ করতে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি দেখা পান ফিদেল কাস্ত্রোর, সফল সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সবেমাত্র ক্ষমতা দখল করেছেন। কাস্ত্রোর সাথে ঘনিষ্ঠ হতে খুব একটা সময় লাগে নি লি’র। এই সখ্যতার সূত্র ধরে পরের দশকে বেশ ক’বার দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে যাওয়ার সুযোগ ঘটে তার। ১৯৬৫ সালে তার হাত ধরেই পাওয়া যায় কাস্ত্রোর সেই বিখ্যাত ৭ দিনের ম্যারাথন ইন্টারভিউ। সম্ভবত লি লকউডের করা সবচেয়ে আলোচিত সাক্ষাৎকারটি মার্কিন অ্যাডাল্ট ম্যাগাজিন প্লেবয়-এ ছাপা হয় জানুয়ারি, ১৯৬৭ সংখ্যায়। বেশ বড় ও বিশদ একটি সাক্ষাৎকার। তখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিউবার সাপে-নেইলে সম্পর্ক। ১৯৬২’তে শীতযুদ্ধের সবচেয়ে উত্তেজনাকর মুহূর্ত ‘মিসাইল ক্রাইসিস’ খানিক থিতু হয়েছে, কিন্তু সিআইএ এজেন্টরা তখনও মুহুর্মুহু সিক্রেট মিশন চালাচ্ছে ফিদেলকে হত্যার জন্য, সেই অবস্থায় ‘পুঁজিবাদের কর্ণধার দেশের পুঁজিবাদী বিকৃতি’র ধারক প্লেবয় পত্রিকায় কেনো সাক্ষাৎকার দিলেন, এ নিয়ে ফিদেলকে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু ফিদেলের যুক্তি ছিল অকাট্য। তিনি বিষয়টিকে নিয়েছিলেন সাধারণ মার্কিনিদের কাছে নিজের অবস্থান ও বক্তব্য তুলে ধরার কৌশল হিশেবে। এখানেই শেষ নয়, প্লেবয়ের আগস্ট, ১৯৮৫ ইস্যুতেও আরেকটি সাক্ষাৎকার দেন কিউবার সর্বাধিনায়ক। প্রথম সাক্ষাৎকারে নিজের গেরিলা জীবন, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক, নিজের পরিকল্পনা, সশস্ত্র বিপ্লব যেটিকে পশ্চিমারা দেখে ‘অবৈধ পন্থায় ক্ষমতা দখল’ হিশেবে, এসব বিষয়ে সরাসরি জবাব দেন ফিদেল। দ্বিতীয় সাক্ষাৎকারে, ফিদেল খোলামেলা কথা বলেন প্রেসিডেন্ট রিগ্যান, কিউবায় রুশ মিসাইল মোতায়েন, বিপ্লব, নিজের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারের অভিযোগসহ ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। ‘পরস্পর’ ধারাবাহিকভাবে সাক্ষাৎকার দুটি প্রকাশ করবে। পাঠকদের জন্য এই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেছেন অনুবাদক ও সাংবাদিক মীর মুশফিক আহসান


ফিদেল কাস্ত্রো: প্লেবয় সাক্ষাৎকার।
জানুয়ারি, ১৯৬৭।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: লি লকউড।


প্রথম পর্ব

প্রশ্ন:

আপনি ১৯৫৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী মনে হয়েছিল? দু’দেশের সম্পর্ক অতীতের চেয়ে ভালো হতে পারে এমনটা কি আপনার ভাবনায় ছিল?

কাস্ত্রো:

অবশ্যই, বলা যায় এই বিষয়টা নিয়ে আমার মধ্যে একটা মোহ কাজ করত। আমরা যারা বিপ্লবের সাথে জড়িত ছিলাম, তারা বিশ্বাস করতাম যে, আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার এই বিষয়টি যু্ক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষদের মাঝে বড় ধরনের একটা উপলব্ধি তৈরি করবে। মার্কিনিরা বিপ্লবের এই ধারাকে গ্রহণ করবে এমনটাই ধারণা ছিল আমাদের। তবে এটাও সত্য যে, এই ইস্যুতে মার্কিন সরকার কী ভূমিকা নেবে সেই বিষয়টা আমরা বিবেচনায় আনি নি। আমাদের ধারণা ছিল সাধারণ মানুষের চাহিদাকেই গুরুত্ব দেবে মার্কিন সরকার। কিন্তু তা হয় নি। কারণ বিপ্লবের প্রভাব ততদিন লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। সেই প্রভাব ঠেকাতে মার্কিন সরকার বিপ্লব এবং কিউবা সম্পর্কে বিভিন্ন ভুল এবং বিকৃত ধারণা প্রচার করতে লাগল সাধারণ মার্কিনিদের কাছে।


কিউবার উন্নয়নকে অনেক বিশ্লেষকই সমালোচনার চোখে দেখছেন।


প্রশ্ন:

সত্যটা তুলে ধরতেই কি ওই বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন?

কাস্ত্রো:

সত্যি কথা বলতে কী, হ্যাঁ। মার্কিন জনগণকে বিপ্লব সম্পর্কে সত্য ধারণা দেয়ার পাশাপাশি আমাদের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছিল সেই বিষয়ে ভুল ভাঙ্গানোই ছিল ওই সফরের লক্ষ্য।

প্রশ্ন:

সেখানে তো ভাইস প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সাথেও আপনার সাক্ষাৎ হয়েছিল?

কাস্ত্রো:

হ্যাঁ, কিন্তু আমার সেই সফর কিন্তু আনুষ্ঠানিক ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমের কিছু সম্পাদক একটা সংগঠন তৈরি করেছিলেন। তাদের আমন্ত্রণেই সেখানে যাওয়া। যদিও তখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিউবার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। সে সময় শুধু নিক্সনই নন, কয়েকজন সিনেটরের সাথেও আমার কথা হয়। আমার মনে আছে, নিক্সনের সাথে দীর্ঘ সময় বৈঠক হয়েছিল। উনি তার বক্তব্যগুলোকে লিখিত আকারে এনেছিলেন। পুরো আলোচনার মাধ্যমে উনি বোঝাতে চাইছিলেন, আমি একটা ভয়ঙ্কর চরিত্র। 

প্রশ্ন:

মার্কিন সরকারের এই শত্রু আচরণের কারণেই কি সমাজতন্ত্র রক্ষার জন্য একটা আবহ তৈরি হয়েছিল কিউবায়?

কাস্ত্রো:

অনেকটা তাই। সেই বিষয়টা বিবেচনা করেই আসলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা সমাজতন্ত্রের রক্ষায় একটা সহায়ক অবস্থা গড়ে তোলে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬০ সালে সংযুক্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে জোট করে কিউবা। বিপ্লবের পক্ষে থাকা সাধারণ মানুষ এবং নেতৃবৃন্দের জন্য এটা একটা উপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল। আসলে সমাজতান্ত্রিক দলগুলোকে একটা প্ল্যাটফর্মে আসা দরকার এটা আমাদের শুরুতেই বোঝা উচিত ছিল। একটা বিষয় সব সময় খেয়াল রাখা উচিত, বিপ্লবের মাধ্যমে যে সব দেশে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে তারাই আমাদের সত্যিকারের মিত্র, তারাই আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষি। কারণ ততদিনে বিশ্বের শোষিত দেশগুলো চিত্র আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে এসেছিল।

প্রশ্ন:

কিউবার উন্নয়নকে অনেক বিশ্লেষকই সমালোচনার চোখে দেখছেন। পুরো বিষয়টিকে ‘কমিউনিউস্ট পরিবর্তন’ হিশেবে বলছেন অনেকে। কিউবাকে ‘কমিউনিস্ট ক্যাম্প’ হিশেবেও আখ্যা দেয়া হচ্ছে?

কাস্ত্রো:

যুক্তরাষ্ট্র’র সাম্রাজ্যবাদী আচরণ আর পররাষ্ট্রনীতির কারণে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে, যার মাধ্যমে বিপ্লবীর কাছে সাধারণ মানুষের একটা দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। এসব তারই একটি অংশ। তবে এতটুকু বলতে পারি, যু্ক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ বিপ্লবের মূল ধারা থেকে বিচ্যুত হয় নি। বরং বিশ্বজুড়েই গণমানুষের আন্দোলন আরও বিস্তার লাভ করেছে।

প্রশ্ন:

ব্যক্তিগতভাবে কী মনে হয়, এমন মার্কিনি প্রচারণা না থাকলে আপনি কি এমনিতেও একজন কমিউনিস্টে পরিণত হতেন না?

কাস্ত্রো:

আমি শুধু এতটুকু বলতে পারি, যতদিন যুক্তরাষ্ট্র তার সাম্রাজ্যবাদী আচরণ অব্যাহত রাখবে, তারই পরিণতিতেই ততদিন আমরা একেকজন কমিউনিস্টে রূপান্তরিত হব।


তাত্বিক জ্ঞান আর বিপ্লব সাধনের মধ্যে অনেক বড় একটা ফারাক আছে।


প্রশ্ন:

১৯৫৯ সালে যখন ক্ষমতায় এলেন, তখন ব্যক্তিগতভাবে আপনি কি একজন কমিউনিস্ট ছিলেন?

কাস্ত্রো:

বিষয়টা এমনও হতে পারে যে, বিপ্লবের মূল সত্তাকে আমি যতটুকু ধারণ করি, ওই সময় আমি তারচেয়ে কম বিপ্লবী ছিলাম। কিংবা এমনও হতে পারে যে, আমি নিজেকে যতটুকু বিপ্লবী মনে করতাম, তখন তারচেয়েও বেশি বৈপ্লবিক ছিলাম। আসলে মূল বিষয়টা হলো যে, কেউ একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছাড়া হঠাৎ করেই কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। এই প্রক্রিয়াটা রাতারাতি কিংবা বছরের পরিকল্পনা করে হয় না। পরিবর্তনের চিন্তাটা আমার মাঝে শুরু থেকেই। একজন মার্ক্সিস্ট হবার আগেই ভাবতাম শ্রমিকদের দুর্গতি নিয়ে, তাদের অভাব নিয়ে। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন থেকেই রাজনৈতিক পরিকাঠামোতে অর্থনীতির বিষয়গুলো আমায় ভাবাত। বিশেষ করে কলকারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, অতিরিক্ত উৎপাদন আর শ্রমিকদের শোষণ আমাকে সবচেয়ে পীড়া দিত। আমার মনে হতো কেনো কিছু পণ্যের অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে শ্রমিক না খেয়ে থাকবে? আধুনিক যন্ত্রপাতির ফলে শ্রমিক কেন বেকার হয়ে পড়বে? কিভাবে এই সংঘাতগুলোর সমাধান করা যায় সেসব নিয়ে ভাবতাম আমি। আমার মনে হতো মানুষ এবং যন্ত্রের মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নিশ্চয় কোনো অভাব আছে। নইলে এই দুই সত্তার মধ্যে সংঘাত কেনো হবে? এভাবে চিন্তা করতে করতে আমার মনে হলো প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন এবং সম্পদের মধ্যে এমন একটা সমন্বয়ের প্রয়োজন যেটা হবে অতীতের চেয়ে আলাদা। যদিও সমন্বয় সাধনের সেই তত্ত্বটা একেবারেই ভাববাদী ছিল, আর বৈজ্ঞানিকভাবে সেটার কোনো ভিত্তিও ছিল না। আপনার হয়তো মনে হতে পারে আমি আসলে ধিরে ধিরে একজন ইউটোপিয়ান সমাজতান্ত্রিক হিশেবে পরিণত হচ্ছিলাম। হয়তো হতে পারে, কারণ তখনও আমি কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো পড়ি নি।

তখন মনে হয় কার্ল মার্কসের দু’একটা লেখা পড়েছিলাম। এটা সেই সময়ের কথা যখন আমি ২য় বা ৩য় বর্ষে আইনের ছাত্র ছিলাম। এর কিছুদিন পর যখন কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো পড়লাম, তখন সেটা আমার মধ্যে খুব গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কারণ আমার মনে যে প্রশ্নগুলো জেগেছিল সেগুলোর সমাধান তখন প্রথমবারের মতো পেয়েছিলাম। মনে হলো সমাধানগুলোর ঐতিহাসিক ঘটনার আলোকে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে। এর পরবর্তীতে আমি মার্কস, অ্যাঙ্গেলস, লেনিন সবাই লেখাই পড়েছি। সেই লেখাগুলোই আসলে আমাকে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে এবং পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করেছে। তবে একটা বিষয় বুঝতে হবে। তাত্বিক জ্ঞান আর বিপ্লব সাধনের মধ্যে অনেক বড় একটা ফারাক আছে। এই বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে, আমার মাঝে বুদ্ধিতান্ত্রিক পরিবর্তনের পাশপাশি বিপ্লবের মাধ্যমেও সমস্যাগুলো সমাধানের পরিকল্পনাগুলো উঁকি দিত। আমি আমার মতো করে পরিবর্তনের কথাগুলো চিন্তা করতাম। তবে যাই হোক, আমি কখনোই একজন সত্যিকারের মার্কসবাদী বলতে যা বোঝায় তা নই।

মীর মুশফিক আহসান

জন্ম ১৮ জুলাই, ১৯৮৯। নাটোর।

অনুবাদক, সাংবাদিক।

ahsan.mushfik@yahoo.com

Latest posts by মীর মুশফিক আহসান (see all)