হোম অনুবাদ পাণ্ডুলিপি থেকে : লাতিন কবিতা

পাণ্ডুলিপি থেকে : লাতিন কবিতা

পাণ্ডুলিপি থেকে : লাতিন কবিতা
599
0

প্রাচীন সভ্যতায় কবিতা কেমন ছিল?—এই জিজ্ঞাসা থেকে অনুবাদের কাজটি করেছেন কবি, প্রাবন্ধিক সুমন সাজ্জাদ। অনুবাদগুলো ইংরেজি থেকে করা।

বইটি ছেপেছে ‘অক্ষর প্রকাশনী’।


কাতুলুস


লেসবিয়ার প্রতি

চলো বাঁচি আর ভালোবাসি, লেসবিয়া আমার।
কানাকড়ি-ফুটো পয়সায় চলো কিনে ফেলি
নীতিবাদী বুড়োদের এইসব কানাঘুষা, ফিসফাস।
জানো তো, সূর্য ডুবে যায়, আবার জেগে ওঠে।
অথচ আমাদের আলোর দৈর্ঘ্য কতটা সীমিত,
আর একদিন তা ডুবেও যায়, অতঃপর ঘুমাতে হয়
চিরতর অন্ধকারে। আমাকে দাও হাজার চুম্বন,
আরও এক শত, আরও এক হাজার, আরও
এক শত, আরও এক হাজার, আরও একশত—
এইভাবে যতক্ষণ না চুমুতে চুমুতে আমাদের
হারিয়ে ফেলি গণনার স্রোতে—আর ততক্ষণে
গুনে গুনে ব্যর্থ হবে মন্দ লোকের চোখ—ঠিক
কতগুলো চুমু আমরা খেয়েছিলাম!

 

ইপসিথিল্লা

ইপসিথিল্লা, প্রিয়তম আমার,
মিনতি জানাই পাখি,
বন্ধ রেখো না দ্বার
ডেকে নিয়ো দুপুর-শয্যায়।

আমারই প্রতীক্ষায় থেকো তুমি
তোমার ঘরে, সময় কোথায়
সময় নষ্ট করার! প্রস্তুতি নাও
পাখি—নয়টি দীর্ঘ সঙ্গমের।

দুপুরে খেয়েছি আমি, শুয়ে শুয়ে
ভাবছি, তোমাকে জানানো দরকার
আমার আলখাল্লা আর জোব্বার ভেতর
জেগে আছে তীক্ষ্ণচূড় এক অঙ্গের উত্থান।

 

প্রেম ও ঘৃণা

আমি ঘৃণা করি, আবার ভালোও বাসি;
তুমি বললে, কেন?
কে জানে? কিন্তু এটাই সত্যি, এমনই ঘটে;
আর জানি যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছি আমি।

 


হোরেস


ক্লোয়ের প্রতি

ক্লোয়ে! পাহাড়ে হরিয়ে যাওয়া, ভয়ার্ত, ছোট্ট
হরিণশিশুর মতো কেন তুমি দৌঁড়াচ্ছ একা?
খুঁজছ কি দুঃশ্চিন্তায় বিক্ষত হরিণমাতাকে?
দৌড়াও দৌড়াও—দৌড়াও মায়ের খোঁজে!
ভয় দেখাচ্ছে কর্কশ বাতাস, শোঁ শোঁ শব্দ করছে গাছ।

পত্রপল্লব ভেঙে মর্মর শব্দ তুলে হামাগুড়ি দিতে পারে
সবুজ গিরগিটি। হঠাৎ হাওয়ায় নড়ে ওঠা ঝরা পাতা,
ঝোপঝাড় বাজাতে পারে সাঁইসাঁই খসখসে স্বর।
দৌড়াও দৌড়াও—দৌড়াও মায়ের খোঁজে!
আহা, ছোট্ট হরিণশিশু, কম্পিত হাঁটু দুটি।

প্রিয়তম, আমি কোনো বাঘ নই, যে তার
শিকারের খোঁজে ধাবমান, অথবা নই হিংস্র সিংহ,
ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছি ছোট্ট হরিণের দিকে;
কিশোরী মেয়ে, দৌড়ে যেয়ো না মায়ের দিকে,
একটু দাঁড়াও, আমার জন্য অপেক্ষা করো ক্লোয়ে!

 

আজকের দিন

লিওকোনই, জিজ্ঞেস করো না; কী করে জানবে তুমি
দেবতাদের অভিপ্রায়, তোমার আমার জন্যে কী আছে
পরিশেষে। সরিয়ে রাখো রাশিচক্রের নাক্ষত্রিক হিশেব;
তারচে বরং আমরা গ্রহণ করি আমাদের এই শীতঋতুকে,
জোভের হাতেই ছেড়ে দিই যোগফল হিশেবের ভার।
হতে পারে এ-বছরই আমাদের শেষতম বছর—যা দেখছে
খাড়ির দিকে ছুটে আসা ঢেউয়ের লহরী। আমরা যখন
কথা বলি, তখন সময়ের যেন খুব তাড়া, সহসা ফুরিয়ে
যায়; দূরে ঠেলো তার অভিশাপ, জীবনের এই স্বচ্ছ,
তলানিবিহীন মদে ডুবিয়ে দাও তোমার হৃদয়, ছুড়ে ফেলো
দীর্ঘ আশার শতদল, বিশ্বাস রেখো না ‘আগামী’কে, মুঠোর
ভেতর কেবলই আঁকড়ে ধরো ‘আজকের দিন’।

 


ওভিদ


মেটামরফসিস : প্রথম পুস্তক

প্রভু, এখন আমি শোনাতে চাই রূপান্তরের গল্প;
কিভাবে বদলায় শরীর, পুরনো থেকে অবিরল
কত রূপে নতুনের জন্ম ঘটে, আমাকে দাও সেই
কণ্ঠ, সারি সারি শব্দের সুতো যেন আমি আদি
থেকে শেষতম প্রহর পর্যন্ত শোনাতে পারি পৃথিবীর
রূপান্তরের গান; কেননা তুমিই তো বদলাও সব।

সেই কবে যখন সমুদ্র ছিল, ছিল ভূমি, আর তখন
সব কিছু ঢেকে রাখত আকাশ, পরমা প্রকৃতি ছিল
নৈরাজ্যে বিভোর, ছিল সব এক, একাকার; তখন
পূর্ণ-বিকশিত সব প্রাণের প্রবাহ মিশে ছিল অখণ্ড
সত্তায়, সজীব অণুরা সব যুদ্ধরত ছিল নিষ্প্রাণতার
বিরুদ্ধে। কোনো ঈশ্বর, অথবা কোনো টাইটান আলো
হাতে ছড়িয়ে পড়ে নি আকাশব্যাপী। কোনো চাঁদ,
অথবা কোনো ফোয়েবে রাত্রির পথে বাড়িয়ে ধরে নি
তার বাঁকানো শিং। পৃথিবী ছিল না শূন্যে সুস্থির।
তখনো আফ্রোদিতি সমুদ্র-তীর ছুঁয়ে বাড়িয়ে দেয় নি
তার চকচকে বাহু। যদিও মাটি, বাতাস, জল সকলই
ছিল, তবু তা এমন মাটি যার স্থিরতা নেই, তবু তা
এমন জল, যেখানে ভাসে না কেউ, তবু তা এমন
বাতাস, যেখানে কোনো আলো নেই। কোনো কিছুই
ছিল না সুস্থির, নিজের ভেতরে নিজে। একই দেহে
পরস্পর যুদ্ধে মেতেছে শীতল ও উষ্ণ, কোমল ও
কঠিন, সিক্ত ও শুষ্ক, ভর ও নির্ভর।
তখন পরমেশ্বর অথবা পরমা প্রকৃতি সব কিছু শান্ত
করলেন; মাটিকে আলাদা করলেন আকাশ থেকে,
মাটি থেকে সমুদ্রকে, মেঘ ও বৃষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন
করলেন অন্তরীক্ষ। পরম প্রভু আলাদা করে দিলেন
মৌলিক সব বস্তুপুঞ্জ। আগুন উঠে গেলে স্বর্গের
সর্বোচ্চ চূড়ায়, তার নিচে বইল বাতাস, মাঝামাঝি
ঠাঁই পেল বস্তুভারে নত বৃহৎ পৃথিবী। জলের আবাস
হলো ভূমির কাছাকাছি শেষতম স্থানে।

পরম প্রভু যখন বিশ্ব সৃষ্টি করলেন, তিনি তখন
বিশৃঙ্খলার বদলে নিয়ে এলেন বিন্যাস, একে একে
ভাগ করলেন কাজের পরিধি, মাটি থেকে তৈরি
করলেন বিরাট এক গোলক; সমুদ্রকে বললেন
প্রবাহিত হও, ত্বরিৎ বহমান বাতাসের সঙ্গে তুমি
মিশে যাও ঢেউয়ের আকারে, ছুঁয়ে যাও পৃথিবীর তট ।
প্রভুর স্পর্শে তৈরি হলো ঝরনা, সুবিশাল জলাধার,
এবং হ্রদ; অধোগামী নদীগুলোকে বাঁধলেন ঢালু
তীরের বিন্যাসে; অতঃপর জলের কিছুটা বইল
মাটির শরীরে, বাকিটা ছুটে গেল বিপুল সমুদ্রে,
তীরের বদলে জলেরা কম্পিত হলো সমুদ্রসৈকতে।
তিনি সমতলকে বললেন, প্রসারিত হও, আর
উপত্যকাকে দিলেন স্থিরতার নির্দেশ; অরণ্যে
দেখতে চাইলেন পত্রপল্লবে ঢাকা গাছ। তার
ইচ্ছেয় তৈরি হলো পাথুরে পর্বত। সুউচ্চ স্বর্গের
উত্তরে দক্ষিণে ডানে বামে তিনিই চাইলেন দুটি
করে ভাগ, পঞ্চম স্তরটি ছিল সকলের চেয়ে
উষ্ণ। একইভাবে একই সংখ্যায় পৃথিবীও বিভক্ত
হলো পাঁচ ভাগে। আগুনের উত্তাপে বসবাস-অযোগ্য
পঞ্চম স্তর; উত্তরে দক্ষিণে বরফে ঢাকা দুটি মেরু;
আর তাদের পাশেই আছে আগুন উত্তাপ ও শৈত্যের
বিমিশ্র প্রবাহ। তার ওপরে ছড়ানো বাতাস—আগুনের
চেয়ে ভারি, জলের চেয়ে হালকা, হালকা সে মাটির
চেয়েও। পরম প্রভুই বাতাসে পাঠালেন মেঘ, বৃষ্টি;
বরফশীতল ঠান্ডা বাতাস, আকাশে অশনি—যা দেখে
চমকায় মানবহৃদয়। অথচ তিনি বাতাসকে দেন নি
সর্বত্র ব্যাপ্ত থাকার সুযোগ। বাতসেরা চারজন, তাদের
চারটি অঞ্চল; ঝগড়ায় মত্ত চার ভাই। ইউরুস : বয়ে
যায় অরোরার সাম্রাজ্যে, নাবাতিয়ায়, পারসি ভুবনে;
যেখানে উজ্জ্বল ভোরের আলো। জেফিরের করতলে
সূর্যাস্তের সন্ধ্যাতারা আর পশ্চিমের সমুদ্রতীর। শীতল
বোরিয়াস দখলে নিয়েছে স্কাইথিয়া ও উত্তর-ভাগ।
মেঘ ও বৃষ্টি ভেজা দক্ষিণের রাজত্বে আছে অস্তার।
সব চেয়ে উঁচুতে প্রভু রেখেছেন নিষ্কলঙ্ক অন্তরীক্ষ।

ঈশ্বর যখন পৃথিবীকে নানা ভাগে বিভক্ত করলেন,
তখন বহু যুগ আদিম অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া তারা
আকাশে প্রজ্জ্বলিত হলো। ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি কোনায়
ঘটল প্রাণের সঞ্চার, প্রত্যেকে পূর্ণ হলো যার যার
নিজের আদলে। দেবতারা ফিরে গেলেন স্বর্গশিখরে,
যেখানে তাদের বাস। সমুদ্রে জায়গা পেল রুপালি
মাছের ঝাঁক। বুনো জন্তুদের কাছে টানল মাটি, পাখিরা
উড়ল শূন্যে, আকাশে। তবু যেন পূর্ণতা পেল না;
চাই এমন এক প্রাণ, যে কিনা অন্য সবার চেয়ে পবিত্র,
ঐশী, আছে যার সুউচ্চ হৃদয়; যার কাঁধে তুলে দেয়া
যায় পৃথিবী শাসনের ভার। অতঃপর বিশ্বকর্তার ইচ্ছায়
স্বর্গবীজ থেকে মানুষের জন্ম হলো; যদিও স্বর্গচ্যুত, তবু
নতুন পৃথিবী ধরে রাখল স্বর্গীয় মর্মবীজ। নদীজলে
মিশিয়ে সেই বীজ আইপেতুসের সন্তান তৈরি করলেন
ঈশ্বরপ্রতিম এক রূপ—সেই-ই তো মানুষ। অন্য
জীবেরা যখন ঘাড় গুঁজে মাটির পানে নতজানু, প্রভু
তখন মানুষকে দিলেন মাথা তুলে আকাশে তাকাবার
অধিকার, চোখ তুলে দেখতে দিলেন নক্ষত্রের বিভা।
একটু আগে যে-পৃথিবী ছিল আদিম ও আকারবিহীন,
অচেনা প্রাণের স্পর্শে সহসা সে বদলে গেল।

(আংশিক)

 


মার্শাল


ফিদেনতিনাসের প্রতি

যে-কবিতাটি তুমি পড়ছ, তুমি জানো সেটি আমার,
কিন্তু তুমি তা পড়েছ ভীষণ জঘন্যভাবে,
আমার মনে হয়, তোমার দাবি করা উচিত
কবিতাটি তোমারই লেখা।

 

পন্তিলিয়ানুসের প্রতি

তুমি জিজ্ঞেস করেছ, কেন আমি তোমার কাছে
আমার কবিতার বই পাঠাই না?
উত্তর এই : আমি আতঙ্কে থাকি, এই বুঝি তুমি
তোমার কবিতার বই পাঠাও!

 

পস্তুমুসের প্রতি

ধূপগন্ধের মতো তোমার চুম্বন; তুমি সব সময় মাখো
অদ্ভুত সুগন্ধি, কস্তুরী ঘ্রাণ অথবা চন্দন, অথবা অন্য কিছু;
অনুমান করি, যে-লোকটি প্রতি মুহূর্তে তোমার মিষ্টি গন্ধ নেয়,
সে ঠিক মতো তোমার গন্ধই নিতে পারে না।

 


ফ্লোরাস


জীবনের ধর্ম

প্রতিটি নারী বুকের ভেতর
বিষের মড়ক লুকিয়ে রাখে,
ঠোঁট জুড়ে নেই মিষ্টি স্বর,
হৃদয় আবার ফন্দি আঁকে।

 

বসন্তের গোলাপ

অবশেষে ফুটেছে গোলাপ;
বসন্ত, তোমাকে ধন্যবাদ।
প্রথম দিন ফুটেছে কুঁড়ি;
দ্বিতীয় দিন সুতীক্ষ্ণ চূড়া,
তৃতীয় দিন পাপড়ির দেখা,
চতুর্থ দিন ফুটে ওঠা শেষ,
এই দিন লেখে মৃত্যুমোহর,
সকালবেলা প্রথম প্রহর,
যদি না কেউ কুড়াতে আসে।

 


হাদ্রিয়ান


মৃত্যুকালে আত্মার প্রতি

ছোট্ট, মধুর, নশ্বর আত্মা আমার—
দেহের দোসর, সতত সঙ্গী, কোন সে দেশে
তোমার গন্তব্য এখন? হায়, বিবর্ণ, আসাড়,
নগ্ন আত্মা, ঠিক যেমন থাকে বুড়ো মানুষের,
হারিয়ে ফেলেছ তুমি ঠাট্টার শক্তি?

 


পড়ুন এ বইটির ভূমিকা : উজান স্রোতের নদী


অনুবাদসূত্র :
Allen Mandelbaum (2004), The Aeneid of Virgil, Bantam Classic, New York
David Mulroy (2002), The Complete Poetry of Catullus, The University of Wisconsin Press, Wisconsin, England
Dorothea Wender (1991), Roman Poetry (From the Republic to Silver Age), Southern Illinois University Press, USA
Horace Gregry (1958), The Metamorphoses, The Viking Press, New York
J. D. Duff (1962), The Civil War, William Heinemann Ltd, Cambrige, Massachusetts, London
J. Wight Duff and Arnold M. Duff (1934), Minor Latin Poets, Havard University Press, London, England

সুমন সাজ্জাদ

জন্ম ৮ মে ১৯৮০। স্নাতক, স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
পতনের শব্দগুলো [সমুত্থান, ২০০৭]
ইশক [রাচী গ্রন্থনিকেতন, ২০১৪]
নীলকণ্ঠের পালা [শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
প্যাপিরাসে লেখা [কবি, ২০১৬]

প্রবন্ধ—
প্রকৃতি, প্রান্তিকতা ও জাতিসত্তার সাহিত্য [আবহমান, ২০১১]
আধুনিকতা ও আত্মপরিচয় [চৈতন্য, ২০১৬]

রম্যগদ্য—
রসেবশে বারোমাস [অক্ষর, ২০১৫]

অনুবাদ—
হোমারের দেশ থেকে (প্রাচীন গ্রিক গীতিকবিতা) [অক্ষর, ২০১৬]

ই-মেইল : sumon_sajjad@yahoo.com