হোম অনুবাদ পাণ্ডুলিপি থেকে : ইসমাইল কাদারে’র কবিতা

পাণ্ডুলিপি থেকে : ইসমাইল কাদারে’র কবিতা

পাণ্ডুলিপি থেকে : ইসমাইল কাদারে’র কবিতা
2.36K
0

ইসমাইল কাদার; আলবেনিয়ান কবি, ঔপন্যাসিক, রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবী। ২৮ জানুয়ারি, ১৯৩৬ সালে আলবেনিয়ার জিরোকাস্তারে জন্মগ্রহণ করেন এই মেধাবী লেখক। লন্ডনের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায় তাকে তুলনা করা হয়েছিল গোগোল, অরওয়েল, কাফকার সাথে। ১৯৬০ সাল থেকে তার একছত্র দাপট আলবেনিয়ান সাহিত্যে। ১৯৯৬ সালে, তিনি ফ্রান্সের একাডেমি অব মোরাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের আজীবন সদস্য হিশেবে যোগদান করেন। বিগত কয়েক বছর যাবৎ-ই নোবেল পুরস্কারের জন্য সম্ভাব্য তালিকায় তার নাম উচ্চারিত হয়ে আসছে শীর্ষ-পর্যায়ে।

ইসমাইল কাদারের বাল্যকাল কাটে আলবেনিয়ার জিরোকাস্তারে। সেখানে স্কুলজীবন শেষ করে ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশুনা করেন তিরানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও দর্শন ফ্যাকাল্টিতে। এরপর ভর্তি হন মস্কোর গোর্কি ইনস্টিটিউট ফর ওয়ার্ল্ড লিটারেচারে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষে পেশা হিশেবে গ্রহণ করেন সাংবাদিকতা। কম্যুনিস্ট শাসনামলে ১৯৭০ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত আলবেনীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক কারণে ও ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লেখার অভিযোগে তার বই প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। এমনকি তার বিদেশ ভ্রমণের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল বহুকাল। বলা হয়, তিনিই একমাত্র লেখক যাকে তার কাজের জন্য এত বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে।

তৎকালীন আলবেনিয়ান কম্যুনিস্ট ও ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসন ও শোষিত মানুষের চিত্র তাকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। ১৯৫৭ সালে লিখে ফেলেন প্রথম কবিতার বই ড্রিমস যা মস্কোতে প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ সময় রাশিয়ায় কাটিয়ে ১৯৬০ সালে মাতৃভূমি আলবেনিয়াতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং উপন্যাস লেখায় মনোনিবেশ করেন। প্রথম উপন্যাস The General Of the Dead Army (১৯৬৩) লেখার পূর্বে তিনি কবিতাতেই নিমগ্ন ছিলেন। উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার পর ইসমাইল কাদার ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন নিজ দেশে ও দেশের বাইরে।

তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম হলো দ্য ওয়েডিং (১৯৬৪), দ্য ক্যাসেল (১৯৭০), ক্রোনিকল ইন স্টোন (১৯৭১), ব্রোকেন এপ্রিল (১৯৮০), দ্য পিরামিড (১৯৯২), ইত্যাদি।  তার বই পৃথিবীর পঁয়তাল্লিশটিরও অধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য পুরস্কারসমূহ—

Prix mondial Cino Del Duca (1992)
Man Booker International Prize (2005)
Prince of Asturias Awards (2009)
Jerusalem Prize (2015)
The Order of Légion d’Honneur (2016)



ট্রেনের সময়সূচি


ছোটখাটো স্টেশনগুলোর ট্রেনের সময়সূচি ভালো লাগে আমার
স্যাঁতসেঁতে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে অসংখ্য ও অসীম রেললাইন ধ্যানস্থ করি।
হঠাৎ গর্জন, পায়চারি থামে। কেউ চমকে ওঠে মুহূর্তখানেক, কী হলো?
(যেন কেউ বুঝতে পারে না স্টিম ইঞ্জিনের অস্পষ্ট ভাষা)
যাত্রীবাহী ট্রেন আসে। ট্যাংক গাড়ি চলে যায়। দামি আকরিকসমেত কত
মালবাহী ট্রেন, যারা একে একে আসে, যায়, সমাপ্তিবিহীন

এভাবেই কেটে যায়, আমাদের জীবনের দিন
যার যার স্টেশনে : চেঁচামেচি, কোলাহল ও সিগনালপূর্ণ স্টেশন
যেখানে চলাচল করে—স্মৃতির আকরিক বোঝাই সব মালবাহী ট্রেন


শৈশব


আমার শৈশবঋতু—কালিমাখা হাতের আঙুল,
সকালের ঘণ্টাধ্বনি,
সন্ধ্যায় মুয়াজ্জিনের সুর
জমিয়ে রাখা যত সিগারেট প্যাকেটের তাস, পুরনো ডাকটিকেট;
আর মিছেমিছি সেইসব সওদাপাতি—
দুটো লুক্সেমবার্গের বিনিময় একটা সিংহল, ইত্যাদি
…এভাবেই কেটে গেছে
আমার শৈশবের সবকটা দিন
ন্যাকরা বাঁধাই বল—তার পেছনে পেছনে, ধুলো আর কান্না জমানো
সেই ন্যাকরা বাঁধাই করা বল,
আলবেনিয়ার ধূসর পতাকা দিয়ে তৈরি


এবং সেই স্মৃতি


আর তখন—আমাদের ম্লান স্মৃতি
মধ্যরাতের পর দূরপাল্লার ট্রেনের মতো, কেবলই
মূল স্টেশনগুলোতে থামে
তোমাকে ভাবি, কোনোদিন ভুলব না যাকে—

…আমি ঠিক মনে রাখব
তোমার চোখের গভীরের নীরব ও একা সেই সন্ধ্যাটিকে
এবং আমার কাঁধে
মেখে থাকা নির্বাক কান্নাটুকু
সমস্তজুড়ে যেন বরফ জমেছে ঢের—মুছে ফেলা দায়…

কেন বিচ্ছেদের ঋতু আসে?
আমি ছিটকে পড়ি তোমার থেকে দূর—অনেকটা দূরে

তবুও কিছু কিছু রাত, কারো আঙুল বুলিয়ে যাবে
তোমার ওই অবাধ্য চুলে,
তাই আমার আঙুলগুলো
মাইলের পর মাইল ভূমি আঁচড়ে চলেছে এতদূর থেকে—
একটু একটু করে, তোমার দিকে


স্ফটিক


অনেকদিন হয়ে গেল তোমাকে দেখি না; কিংবা তুমিও আমাকে।
মনে হয় ভুলছি ক্রমশ, তোমার স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে
মরে যাচ্ছে আমার মাঝে। তোমার সেই চুলের স্মৃতি;
সমগ্র তোমার স্মৃতি।
তাই এমন একটি স্থান খুঁজছি এখন
যেখানে তোমাকে আমি তুলে রাখতে পারি
কোনো পঙ্‌ক্তিতে, শ্লোকে বা স্ফটিক চুম্বনে—ভুলে যাবার আগেই।

কোনো কবর যদি তোমাকে গ্রহণ না করে
কোনো মার্বেল, না কোনো স্ফটিক কফিন—
আমার কি চিরকাল বয়ে বেড়াতে হবে তোমার স্মৃতি
অর্ধজীবিত, ও অর্ধমৃত?

তোমাকে রাখার মতো এতটুকু ফাঁকা স্থান যদি না পাই কখনো
আমি এক সম্পূর্ণ বনভূমি বা বিস্তীর্ণ মাঠ খুঁজে নেব
এবং ধীরে ধীরে সেখানে তোমাকে আমি ছড়িয়ে দেবো, মুক্ত,
পরাগরেণুর মতো।

অথবা তোমাকে আমি আলিঙ্গনে মিশিয়ে নেব আমার সাথেই
এবং নিজেই হারিয়ে যাব অচেনা কোথাও;
কেবল তখন—আমরা জানব না পরস্পর, আছি কে কোথায়,
বা কেমন আছি? এই তো ভুলে যাওয়া দুজন দুজনকে,
বিশুদ্ধভাবে।

রনক জামান

জন্ম ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১; মানিকগঞ্জ। কবি ও অনুবাদক। রসায়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত গ্রন্থ :
ললিতা (মূল : ভ্লাদিমির নবোকভ) [অনুবাদ; ঘাসফুল প্রকাশন, ২০১৬]
ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা [কবিতা; অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৬]

ই-মেইল : ranakzaman1991@gmail.com