হোম অনুবাদ পাণ্ডুলিপির গল্প : আমার অদৃশ্য বন্ধু

পাণ্ডুলিপির গল্প : আমার অদৃশ্য বন্ধু

পাণ্ডুলিপির গল্প : আমার অদৃশ্য বন্ধু
776
0
একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ‘বিপন্ন সিরিয়ার কথাকার জাকারিয়া তামেরের গল্প’ অনুবাদ গ্রন্থ। সিরিয়ার অন্যতম কথাসাহিত্যিক জাকারিয়া তামেরের ২০টির মতো গল্প, একটি সংলাপ এবং সিরিয়ার সাহিত্য ও তামেরের পরিচিতি নিয়ে ৯৬ পৃষ্ঠার বইটি প্রকাশ করেছে ‘মেঘ’। লেখকের অনুমতি নিয়ে বাংলার পাঠকদের সিরিয়ার জাফরানি খুনের উষ্ণ অনুভব দিতে চেয়েছেন ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ। বাংলা ভাষায় জাকারিয়া তামেরের গল্প নিয়ে এটিই প্রথম অনুবাদগ্রন্থ। হয়ত সিরিয়ার কোনো সাহিত্যিকেরও এটিই প্রথম বাংলা অনুবাদগ্রন্থ। এখানে বই থেকে একটি গল্প দেওয়া হলো। গল্পটি মূল আরবি থেকে ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ম্যারিলিন হ্যাকার। ‘ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডার্স’ অনলাইন থেকে নেওয়া হয়েছে। গল্পটি জাকারিয়া তামেরের ‘আল কুনফুদ’ বা ‘শজারু’ গ্রন্থের সিরিজ গল্পগুলোর একটি।

মা প্রতিবেশী উম্মুল বাহার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। আমাকে সঙ্গে নিতে চাইলেন না। অজুহাত দেখিয়ে বললেন, পুরুষ যায় পুরুষের কাছে, আর নারী যায় নারীর কাছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ফেরার কথা বলে তিনি আমাকে বাড়িতে একা রেখে গেলেন।

আমার বিড়ালকে বললাম, তাকে ঝুলিয়ে দেব। সে আমার কথা কানেই তুলল না। জিব দিয়ে নিজের গায়ের লোম গোছানোয় সে ব্যস্ত।

বাড়ির উঠানে মাটির টবের তিতা কমলার গাছকে বললাম, কুড়াল এনে তাকে কাটব। তার পাতাও ভয়ে হলুদ হলো না।

দেয়ালকে বললাম, ‘এমন জোরে ঢুঁ মারব না! একেবারে ফেলে দেব।’ দেয়াল আমার হুমকি হেসে উড়িয়ে দিল। অবজ্ঞা করে বলল, ‘চেষ্টা করেই দেখো, মাথা ফেটে যাবে। শেষে তুমিই কষ্ট পাবে।’


 জিনদের স্কুলও আছে নাকি 


আমার মনে হল, উঠান ঘিরে থাকা ওপরের ঘরগুলোতে কেউ হাঁটছে। সাহস রাখতে নিজেকে বললাম, এটা জানালা দিয়ে আসা বাতাসের শব্দ। কিন্তু, গাছের ছোট পাতাটা নাড়ানোর মতো বাতাসও তো নেই। উঠানে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম। বড়দের মতো ভারী গলায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে ওখানে?’

আমার পাশেই কেউ খলখল করে হেসে উঠল। চমকে চারপাশে তাকালাম। কাউকে দেখতে পেলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে হাসছে?’

একটা মেয়েকণ্ঠ জবাব দিল: ‘আমি হাসছি। কেন, হাসতে মানা আছে নাকি?’

‘কে তুমি?’

‘আমি এই বাড়ির জিন।’

‘তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। তুমি কোথায়?’

‘তোমার খুব কাছে। আমাকে দেখছ না, কিন্তু আমি তোমাকে দেখছি।’

‘আমার কাছে কী চাও?’

‘কিছু চাই না। মা আমাকে একা রেখে তার বান্ধবীর ওখানে গেছেন। আমার খারাপ লাগছে, ভয় করছে।’

‘তোমার মা-ও আছে!’

‘মা আছে, বাবা আছে এবং বড় এক ভাইও আছে। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যায়।’

‘জিনদের স্কুলও আছে নাকি?’

‘হ্যাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে।’

11004679_10153101575564581_82320467_n
মেঘ প্রকাশন; অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫

‘তোমার বয়স কত?’

‘পাঁচ বছর।’

‘আমি কিন্তু তোমার বড়।’

‘মিথ্যা বলো না।’

‘তোমার চেয়ে দুই মাস তিন দিনের বড়।’

‘যখন একটা বড় মেয়ে হব, আমি তোমাকে যেমন দেখছি, তখন তুমি আমাকে তেমন দেখতে পাবে।’

‘তুমি কোথায় থাকো?’

‘এই বাড়িতেই। মা-বাবা একটা ঘরে ঘুমায়। ভাই একটা ঘরে আর আমি একটা ঘরে।’

‘আমাদের বাড়িতে তো থাকার ঘর মাত্র তিনটি। একটা মেহমানের ঘর আর একটা বসার ঘর।’

‘তোমাদের বাড়িই আমাদের বাড়ি। তোমাদের থাকার ঘরই আমাদের থাকার ঘর।’

‘তুমি কোথায় ঘুমাও?’

একটু লজ্জা পেলেও জিনের মেয়েটি বলল, ‘তোমার ঘরে।’

জানতে চাইলাম, ‘তোমার চুলের রং কী?’

সে বলল, ‘আমার চুল কালো ও লম্বা। ত্বক বাদামি। চোখ সবুজ।’

আমি একটু সংকোচ নিয়েই বললাম, ‘আমি সবুজ চোখ ভালোবাসি।’

মেয়েটি হি হি করে হাসল। বলল, ‘বড় হলে তুমি সবুজ চোখ, নীল চোখ, কালো চোখ এবং বাদামি চোখ—সবই ভালোবাসবে।’

বললাম, ‘আমি বড় হবো না।’

সে বলল, ‘অবশ্যই তুমি বড় হবে এবং আমিও বড় হবো।’

মা ফিরে এলেন। আমাকে বসে বসে একা একা কথা বলতে ও হাসতে দেখে বললেন, ‘আল্লাহ তোমার আত্মার হেফাজত করুন। তুমি এতটাই পাগল হয়ে গেছ যে একা একা কথা বলছ?’


আমি এখন আর আগের মতো বিছানার মাঝখানে ঘুমাই না। বাম দিকটা খালি রেখে ডান পাশে খুব সাবধানে ঘুমাই। ক্লান্ত কেউ যাতে বাম দিকে শুয়ে আরামে ঘুমাতে পারে


মাকে বললাম জিনের মেয়েটির কথা। আমার চেয়ে ছোট সেই মেয়ের সঙ্গে কথা বলে বেশ আনন্দ পাচ্ছিলাম। মা বললেন, ‘চুপ করো! আমাদের বাড়িতে কোনো জিন নেই। তোমার বাবা মৌলানা-মৌলভি দিয়ে কোরান পড়ানোর পরই আমরা এই বাড়িতে উঠেছি।’

ছোট্ট জিন বন্ধুটির কথা মা শুনলেনই না। আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন উম্মুল বাহার বাড়িতে। মিনতি করে তাকে বললেন, ‘বাহা, আমাকে বাঁচাও! আল্লাহর পরে তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই! আল্লাহ আমার আত্মাটা নিয়ে গেছেন! বাড়িতে তাকে রেখে আসাটা ঠিক হয় নাই।’

উম্মুল বাহা মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর দয়ার ওপর ভরসা হারিয়ো না!’

উম্মুল বাহা আমার মাথায় হাত রেখে কোরান তেলাওয়াত করতে লাগলেন। তার কণ্ঠের ওঠানামায় আমার ঘুম এসে গেল।

শুনতে পেলাম, উম্মুল বাহা মাকে আশ্বস্ত করছেন, ‘ঘুমাক। আল্লাহ চায় তো ঘুম থেকে উঠলে তুমি তাকে সুস্থই দেখবে। তখন হয়ত সে সবই ভুলে যাবে।’

এই প্রথম উম্মুল বাহাকে আমি মনে মনে তাচ্ছিল্য করলাম। কোনো বন্ধুই বন্ধুকে ভুলতে পারে না। মনে পড়ল, জিন বন্ধুটির নামই তো জানা হয়নি। খারাপ লাগল। পরেও তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি। সফল হইনি। জানি না কেন সে রাগ করল, কেন কথা বলা বন্ধ করে দিল। যখন বড় হব তখন এমন একটা মেয়ে খুঁজব যার চুল কালো, গায়ের রং বাদামি আর বড় বড় চোখগুলো সবুজ।

আমি এখন আর আগের মতো বিছানার মাঝখানে ঘুমাই না। বাম দিকটা খালি রেখে ডান পাশে খুব সাবধানে ঘুমাই। ক্লান্ত কেউ যাতে বাম দিকে শুয়ে আরামে ঘুমাতে পারে। সেখানে ঘুমানোর জন্য আগামী রাতগুলোতে যদি কেউ ফিরে আসে।

ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

জন্ম ১৯৭৭; ময়মনসিংহ। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
আলো অন্ধকারে আলো অন্ধকারের যাত্রা [গল্প; ঐতিহ্য, ২০০৪]
বিপন্ন সিরিয়ার কথাকার জাকারিয়া তামেরের গল্প [অনুবাদ; মেঘ, ২০১৫]
মওদুদিপুত্রের জামায়াত-বিরোধিতা [অনুবাদ ও সম্পাদনা; প্রকৃতি, ২০১৭]

ই-মেইল : soroishwarja@gmail.com