হোম অনুবাদ পাণ্ডুলিপির কবিতা : রেজর ব্লেডে তৈরি বাড়ি

পাণ্ডুলিপির কবিতা : রেজর ব্লেডে তৈরি বাড়ি

পাণ্ডুলিপির কবিতা : রেজর ব্লেডে তৈরি বাড়ি
463
0

অতি-সাম্প্রতিক, সমসাময়িক ইউরোপীয় কবিতা সম্পর্কে একটি গহন ইশারা পাওয়া যাবে এই বইটি থেকে। পরস্পরের পাঠকদের সামনে কবিতাগুলি হাজির করার সূত্রে অনুবাদকের ছোট্ট একটি ভূমিকা সন্নিবেশিত হলো, যা কবিকে বুঝতে অনেকখানি সহায়তা করবে।

বইটি অনুবাদ করেছেন কবি সুহৃদ শহীদুল্লাহ। ২০১৭-র বইমেলায় তা প্রকাশ করেছে উলুখড় প্রকাশনী।



লিন্ডা মারিয়া বারোস : খোলস-ছাড়ানো এক পৃথিবীর সন্ধানে


শুধু ফরাসি বা রুমানিয়ান নয়, সমসাময়িক গোটা ইউরোপীয় কবিতার জগতে সমীহ জাগানো নাম লিন্ডা মারিয়া বারোস; তরুণ প্রজন্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা বলে বিবেচিত হন তিনি। জন্ম ১৯৮১ সালে রুমানিয়ার বুখারেস্টে। শৈশবে পেয়েছেন স্বৈরাচারী শাসকের অধীনে বসবাস করার তিক্ত যন্ত্রণা। এতটাই যে, স্কুলে যেতেও অপছন্দ করতেন লিন্ডা। স্কুলে যেতে না-চাওয়ার জেদেই এক সকালে বাবা-মাকে বলে দেন ‘ওসব শেখার চেয়ে আমি বরং A বর্ণটিকেই পোশাক করে পরে নেব। কবিজীবনের প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতার নামও তাই ‘A বর্ণটিকে আমি বরং পোশাক করে পরে নেব’।

সাত বছর বয়সে প্রথম লেখা প্রকাশ বুখারেস্টে। কিন্তু কৈশোরে চলে আসেন প্যারিসে। সেখানে প্যারিস-সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যে মাস্টার্স করার পর পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ক্যাম্পাসে থাকতে থাকতেই কবিতার জন্য পেয়ে যান ‘পোয়েট্রি প্রাইজ’। সেখানেই ২০০৩ সালে অনেকটা এপিফ্যানির মতো তাঁর মনে এল ললাট-লিখনের মতো কেউ কোনো সুনির্দিষ্ট ভাষা নিজের কপালে সেঁটে আসে না। তখনই সিদ্ধান্ত নেন ফরাসি এবং রুমানিয়ান দুই ভাষাতে লিখলেও লেখালেখির মূল ভাষা হিসেবে বেছে নেবেন ফরাসিকেই। দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত; চ্যালেঞ্জিংও। সে চ্যালেঞ্জ যে লিন্ডা ভালোভাবে মোকাবেলা করেছেন, তাঁর কবিতা সেসবের উজ্জ্বল প্রমাণ হয়ে আছে।

অথচ এসবের আগে রুমানিয়ান ভাষায় ওর ২টি বই প্রকাশিত হয়ে গেছে। প্রথম বই সূর্যাস্ত বহুদূর, ওর ফিতে ছিঁড়ে দাও, আর দ্বিতীয় কবিতার বই বন্য শুয়োরের মাথা-ওয়ালা কবিতা। এই দুয়ের মাঝখানে আবার দুটি নাটকও।

ফরাসিতে লেখার চ্যালেঞ্জটাকে আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং করার জন্যই বোধহয় লিন্ডা ঠিক করলেন, পর পর পাঁচটি বইয়ের একটি পেন্টালজি লিখবেন তিনি। আর এই পেন্টালজির মাধ্যমে পৃথিবীর জন্য এক নতুন মিথ উপহার দেবেন। খোলস-ছাড়ানো এক মিথ যা ক্ষুদ্রাণু জগৎ থেকে শুরু করে ব্রহ্মাণ্ড ঘুরে ঘরে ফিরে তুলে ধরবে মানুষের টাচস্ক্রিন বাস্তবতাকে। পেন্টালজির প্রথম বইি চিহ্ন ও ছায়ার  অভিধান প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। একই বছরে বইটি লাভ করে ‘পোয়েট্রি কলিং’ পুরস্কার। এরপর ২য় বই রেজর ব্লেডে তৈরি বাড়ি (২০০৬), ৩য় বই হাইওয়ে A4 অন্যান্য কবিতা (২০০৯) এবং ৪র্থ বই হাড়হীন সাঁতারু, মেট্রোপলিটন উপকথা (২০১৫)। পেন্টালজির পঞ্চম বই এখনো প্রকাশিত হয় নি।

লিন্ডার কবিজীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক বলা যায় এই পেন্টালজির ২য় বই রেজর ব্লেডে তৈরি বাড়ি। কবি ও সমালোচক লিওনেল রে এই বই উপস্থাপন করতে গিয়ে বলেন, ‘ওস্তাদিগুণ সম্পন্ন সাহসী বই; বিস্ময়কর এবং অপ্রথাগত। একই সাথে স্বপ্নিল এবং ক্ষুরধার’। কবির ব্যাপারে বলেন, ‘অসাধারণ এক কবি’ (আজকের কবিতা, সংখ্যা ৭৯, ২০০৭)। বার্নার্ড মেজো প্রশংসা করে লিখেন, ‘লিন্ডা মারিয়া বারোস সত্যিকারের শিহরণ আর মৌলিকত্ব নিয়ে এসেছেন’ (আজকের কবিতা, সংখ্যা ৮৪, ২০০৭)। আর চার্লস ডোবজিনস্কি মন্তব্য করেন, ‘সমসাময়িক ফরাসি কবিতার জন্য (এই বই) একটি ঘটনা’ (আজকের কবিতা, সংখ্যা ৮৫, ২০০৭)। এই ঘটনাকে পুনর্নিশ্চিতি দিল ফরাসি ভাষায় কবিতার জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার। রেজর ব্লেডে তৈরি বাড়ি এপোলিনিয়ার প্রাইজ পেল ২০০৭ সালে। এই পুরস্কারকে ‘কবিতার গোকু’ বলা হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে গোকু কথাসাহিত্যের জন্য দেয়া হলেও ফ্রান্সে সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার হিসেবে স্বীকৃত ছিল। ২০১৬ সাল থেকে অবশ্য কবিতার জন্যও এই পুরস্কার দেয়া হচ্ছে।

লিন্ডা এই বই বলতে গেলে সম্পূর্ণভাবে নতুন করে লিখলেন রুমানিয়ান ভাষায় এবং তা প্রকাশও পেল ২০০৬ সালে। পল আরেটজু সেই বই সম্পর্কে মন্তব্য করেন ‘এক অসাধারণ পরিণতি, নন্দনচিন্তা আর কাঠামো নির্মাণের অসম্ভব জ্ঞান’ (স্কারা দিন বিবলিওতেকা, ফুনদাতিয়া কুলতুরালা ইদিয়া ইউরোপিয়ানা, ২০০৭)। আর গ্যাব্রিয়েল রুসু এই বইয়ের ‘অসাধারণ কাব্যিক ভিশন’-এর উপর নজর দিতে বলেন পাঠকদের। এই বইয়ের রুমানিয়ান সংস্করণের জন্য ২০০৮ সালে পেলেন ‘পোয়েট্রি ন্যাশনাল প্রাইজ’।

এখন পর্যন্ত মোট বাংলাসহ মোট ৭টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে বইটি। আর এবছরই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে আরো ৬টি ভাষায়।

নিজেকে বাইকার কবি বলে মনে করেন লিন্ডা। একজন বাইকার (মোটরবাইক চালক) হাইওয়ে ছুটতে ছুটতে যেমন তার হাতে-ধরা স-মেশিন দিয়ে দিগন্তকে ফালাফালা করে তেমনি নিজের কবিতা দিয়ে লিন্ডা ফালাফালা করতে চান কবিতাজগতের সব বন্ধ্যাত্ব আর প্রচলকে। নিজের জন্য লিন্ডা বেছে নেন হাইওয়ে A4-কে। আসলে যা A4 সাইজের কাগজের টুকরো। কবির নিজস্ব চলার পথ।

নিজের কবিতার পাশাপাশি নিয়মিত অনুবাদ করেন কবি। অনুবাদকে মনে করেন আগামী পৃথিবীর মানবতার একমাত্র ভাষা। এখন পর্যন্ত তাঁর অনুবাদে ৩০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা নিয়ে ১০টি ক্রোড়পত্র করেছেন। তার মধ্যে আছে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের লিটলম্যাগ ‘শিরদাঁড়া’-র সাথে নব্বইয়ের দশকের রুমানিয়ান কবিদের উপর করা ক্রোড়পত্রটিও।

সংগঠক হিসেবেও প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। এখন যেমন সামলাচ্ছেন এপোলিনের প্রাইজের জুরি বোর্ডের সাধারণ সম্পাদকের পদ। লিন্ডা ২০১৩ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন মালার্মে একাডেমির সদস্য হিসেবে। একাডেমির ইতিহাসে তিনিই সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। আর ২০১৬ সাল নির্বাচিত হয়েছেন এর জেনারেল র‌্যাপোর্টিয়ার পদে। জন্মভূমি রুমানিয়ায় ‘কবিদের বসন্ত’ নামে একটি উৎসব শুরু করেছেন লিন্ডা, যা একই সময়ে ৬০টি শহরে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়।

সুহৃদ শহীদুল্লাহ

যদি পাথর তোমার শিরশ্ছেদ করে তাহলে লক্ষণ খারাপ


আমি জন্মেছিলাম নবম দশকের এক ডেকচিতে;
        যখন ঘর বলতে ছিল এক দেয়াল শুধু—আর কিছু নয়।
তোমার দিকে আসছি আমি অন্ধদের দেশ থেকে।
          অনেক অনেক আগে আমার বাম চোখ
                                  গড়িয়ে পড়েছে জামার বোতাম দিয়ে।
          সাত বছর ধরে হাঁটছি আমি ডান চোখ
                                    ডান হাতের তালুতে নিয়ে।
          এসেছি যে-দেশ থেকে সেখানে আইন বানায় একচক্ষু লোক।
আমার কথা বলতে গেলে—শৈশবে ছেড়েছি দেশ;
          সেখানে ভাঁড়ারঘরে সিংকের নিচে বসে গোপনে কাঁদতাম।

কিন্তু আমি ভুলে গেছি সেইসব গল্প যা একদা আমার
          মোহাচ্ছন্নতার মিথ্যে মুদ্রাগুলোকে ঘষে-মেজে চকচকে করেছিল।

একটি কথাই বলার আছে তোমাকে আমার : আমি এসে গেছি,
                                                  এই দ্যাখো আমি।


বুক আর হৃৎপিণ্ডের শিরা


          যদি গলা কেটে ফেলি আমার, এক রাতে বলেছিলে তুমি,
তাহলে অনর্গল কথার ধারা বইবে শুধু।

কারণ, মাঝে মাঝে কবি
                       শান দেয় পাহারাদার কুকুরের মতো তার লম্বা দাঁত
আর তা দিয়ে, ভোর রাতে, ছিঁড়ে ফেলে নিজের
                          বুক আর হৃৎপিণ্ডের শিরা।

কিন্তু আজ আমি অনেক দূরে।
          বন্ধুরা নিজেদের টেনে নিয়ে গেছে রেলপথ অভিমুখে।

কোন হাসাহাসি নেই। শব্দ করে কান্না নেই কোনো।
তুমি শুয়ে আছ। তোমার পা ডুবে আছে রক্তের নালায়।


খনির ঘোড়া


যে-বাড়িটি তোমাকে মানুষ করেছে, সম্ভবত,
          একরাতে সেই-ই তোমাকে
              শুনিয়েছে খনির ঘোড়াদের সকল কাহিনি :
খনির ঘোড়ারা জন্মায় ও বাঁচে মাটির গভীরে;
টানেলের দেয়ালে দেয়ালে গাঁথা ওদের ঘর ও টেবিল।
সেখানে ওরা খায় কয়লা ও অন্ধকারের
                                     বড় বড় টুকরো সব।
প্রদীপের আলোয় ওরা খায় হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে
আর সশ্রম কারাবন্দির মতো অন্ধভাবে টানতে থাকে কয়লার গাড়ি।
এভাবে টেনে চলে প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্ত, যতক্ষণ ঘোড়াদের
                                                        দেহে থাকে প্রাণ।

তারা বয়ে আনে আলো—মাটির উপরে।

কিন্তু মাটির উপরে, আলোর পৃথিবীতে ওরা টিকতে পারে না।
এমনকি তখনও—যখন ওরা খনি থেকে মুক্ত হয়ে অবসরে থাকে।
কেননা ওরা পৃথিবীতে আসে বাঁধা-চোখ নিয়ে।
ওদের কপালে লেপ্টে থাকে অন্ধকার।

আর এভাবেই ওরা বেঁচে থাকে আরো ক’টা দিন; চুপচাপ।
ভেঙে পড়া আস্তাবলে, খনির উঠোনে
হাওয়া ও সুগন্ধ তাদের কাঁপুনি ধরায় শুধু।

চোখ-বাঁধা,
যতদিন না তারা আবার ঢুকে পড়ে নতুন এক মাটির গভীরে।

তাদের নিবাস চিরদিন অন্ধকার।


সারফেস টেনশন


কোনো কোনো কবি শহর থেকে বিতাড়িত;
                    যেন তাদের তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে উপকূল হতে
জানালার ওপাশ থেকে ভেজা দড়ির
                           চাবকানি দিয়ে।

(লোকজন বলে থাকে, রাতের বেলায়, প্রতিটি জানালা
          অবিরাম দাবি করে মানুষের মাথা;
                    যেন মাথা কোনো খাল—স্বপ্ন যাকে আনমনে
                                           কাটাকুটি করে বৈঠার ঘায়ে।)

অন্যদিকে, কোনো কোনো কবি—বলা হয়ে থাকে—
                              শুনতে পায় বেশ জানালার গোঙানি।

আবার দ্যাখো অন্যরাও আছে—যারা ছাদের ধাতব উপকূল থেকে
          পালাতে চেয়েছে বৃথাই,
          আর চেষ্টা করেছে বৃথাই
          কাব্যিক দুনিয়ার চার কার্ডিনাল পয়েন্টে
                              উড়ে যেতে একসাথে;
          যাদের কপাল ভালো
                              তারা প্রত্যেকে পেয়েছে ছোট এক
                              মাটির জাহাজ।
          আর তাই ডানার ঝাপটানির মতো,
          কাদামাটি থেকে শুনতে পাওয়াা
                                      ওদের গলিত ধাতুর চিন্তার গুঞ্জরন
          ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে দমবন্ধ হয়ে পড়ে।

আর উপকূল ধীরে ধীরে হারায় কুয়াশায়,
          একটু একটু করে
                       বৈঠার প্রতিটি ঘায়ে
                              ডানার প্রতিটি ঝাপটায়
                                   ক্রমশ দূরে আরো দূরে চলে যায়।
         উপকূলে তখনও যেসব মানুষ থাকেন
তারা তাদের বিদায় জানান
                                  বিনম্র ইশারায়।


গ্যাস মাস্ক


যতদূর আছ তুমি ততদূর যত্রতত্র ভেঙে পড়ে
             সিঁড়ির রেলিং
             দূর দিগন্তের দিকে চেয়ে—
যতদূর আছ তুমি।
সিঁড়ির আঠালো খাাঁচায় নরম ও ডুবন্ত ওরা।

যতদূর আছ তুমি ততদূর দরজার পর্দা,
             —বন্য শুয়োরের দাঁতে দাঁতে এ-ফোঁড় ও-ফোঁড়
             গরুর বাছুরের চামড়া সব।
সুগন্ধি মাটিতে গড়া তোমার বন্য চোখ আর
মার্কারি মুখ।

যতদূর আছ তুমি ততদূর পর্যন্ত রয়েছে এক রাস্তার কোণ
          যেখানে ক্রিস্টাল মেঘের ভেতর স্থির ঘুমায় ওরা
          যাদের না আছে ঘর না আছে ঈশ্বর।
          নালার দূষিত মুখ দিয়ে
          ওদের ছেঁড়া পোশাকের ফাঁক দিয়ে
উপরে-আসীন তিনি ওদের দিকে চেয়ে থাকেন অসীম করুণায়।

যতদূর আছ তুমি ততদূর রয়েছে বীথিকার বিশাল সরণি
যার নিচে ইস্পাতের বড়শিতে ঝুলে থাকে,
          গ্যাসমাস্কের মতো,
          বিগত সব দিনের মুন্ডু।
আর থাকে মেশিনগান যা দিয়ে দিন রাত গুলি ছুড়ো তুমি।
গুঞ্জন তুলে বুলেট এবং ক্যারাভাঁ আসে না।

যতদূর আছ তুমি ততদূর—ব্যক্ত কথা। ভুল পদক্ষেপ।
জানালা দিয়ে তুমি গুলি করো নিজেকেই।


বালিশের নিচে সবসময় এক বোতল পেট্রোল রেখো


স্যাঁতসেঁতে সকালগুলোয় তুমি নিজেকে বেঁধে নাও
               তোমার বিছানায়
                          আরেকটু পোক্ত করে
       উজ্জ্বল সব মদমত্ত দড়ির প্রতিভায়।
ভগ্নকণ্ঠ তুমি—
ঐসব গলাভাঙা ছোকরাদের মতোই
যারা রাতে কাচের লিফটের ভেতর অতি ক্ষিপ্রতায়
             জাপটে ধরে সরু-পাছার তরুণীদের।
(ওদের ছায়া তো তোমাকে প্রায় ছুড়ে ফেলেছিল কারাগারে।)

বিশ্বাসঘাতক সময়!
চেষ্টা করো না এখন বুঝে নিতে দেয়াল-চরিতপুরাণ
অথবা ওদের ডানপন্থি কলা ও কৌশল।
(বিশেষত সিলিংয়ের নিচে যেখানে জন্মায় সব চেতনানাশক)
পূত-মন্দিরের লবণদানি দিয়ে
চাষ করতে যেও না ওদের নিয়মমাফিক, বলছি আবারো।

আর চেষ্টা করো না দাঁত দিয়ে উপড়ে আনতে প্লাগ,
বরাবর যেমনটা অভ্যাস,
জানোয়ারের মতো চূর্ণ করো না সুইচ আর কামড়ে দিও না হাতল
(ওর সবুজ মরিচা যেন আগুন জ্বালায়)
সবচেয়ে বাজে হবে যদি চেষ্টা করো
                এক লহমায় খেয়ে ফেলতে জানালার চুম্বক ফ্রেম।

রাস্তায়, যদি তোমার প্রবল ইচ্ছেও হয়ে থাকে,
তবু বুক থেকে ছিঁড়ে আনা নিজের চামড়া দিয়ে
চেষ্টা করো না পালিশ করতে দিনরাত
লাল গাড়িটার বডি,
       তলা ও ছাদ, জানালার কাচ;
ভেবো না তুমিও মালিক
ব্রান্ড নিউ, ঝাক্কাস, এই দুরন্ত গাড়িটির।
হেলে-দুলে চলে সে যেন এক বাজারি-খানকি।

পাচক রসে সিক্ত আদ্র সকালগুলোয় তুমি,
নিজেকে বেঁধে নাও ঠিকঠাক বিছানার সাথে, বাধ্যানুগত—
যেন তুমি নিজেকে বাঁধতে চেয়েছিল এক শক্ত মাস্তুলে।
আর কান দিও না রাস্তা থেকে উঠে আসা কোনো হাঁক-ডাকে;
ওরা তোমাকে শেখাতে চায় কিভাবে
               নিজেকে
                    পোড়াতে হয়
                                   জীবন্ত
চিলেকোঠার সম্মত ছাদের নিচে
              যেনবা তাহলে মনে হবে নিজেকে পোড়াচ্ছ তুমি
                                                               কোনো সেন্ট্রাল স্টেশনে।


রিঙ রোডে


কেবল বস্তির মেয়েরা—যারা
দাঁড়ায় এসে সদর রাস্তায়—
দেয়ালে থু করে ছুড়ে ফেলে বীর্যের দীর্ঘ মুদ্রা ,
তোমাকে আগেই বলেছি আমি।

চিলেকোঠায় বসে, বাড়িতে তোমার,
ওদের জন্য দুঃখ করো না বিরক্তি বা করুণার বশে।
তুমি দেখতে পাও না ওদের আত্মার গহিন অন্দর
তার চাবি লুকিয়ে রাখে ওরা নিজেদের দুই স্তনের মাঝখানে।

হাতে শেকল পরে
              বস্তির মেয়েরা নিজেদের ছুড়ে দেয়
                              মেঘের ভেতর থেকে।

ওদের হাসি খুলে না কখনও।
তা হলে তো মনে হতো
            ধর্ষকের অসীম করুণায়
            সেলাই হচ্ছে যোনিচ্ছদ পুনরায়।

বস্তির মেয়েরা বেঁচে আছে,
তোমাকে তো বলেছি আগেই। ঠিক এই ধরণীর মতো।

সুহৃদ শহীদুল্লাহ

জন্ম ২৯ এপ্রিল ১৯৭৫, কুষ্টিয়া।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
ঈশ্বরের অটোবায়োগ্রাফি [২০০০]
আমার যুদ্ধাপরাধের কাহিনীসকল [২০০৭]
জলপাই, স্নেহ ও শর্করা [২০১২]
শরীর, সর্বস্ব তুমি [২০১৪]
উদীয়মান সমাধি শিবির [২০১৬]

অনুবাদ—
তরুণ কবির প্রতি চিঠি / রাইনার মারিয়া রিলকে [২০১১]
রেজর ব্লেডে তৈরি বাড়ি/ লিন্ডা মারিয়া বারোস[২০১৭]

ই-মেইল : shuhrid.shahidullah@gmail.com