হোম অনুবাদ পাণ্ডুলিপির কবিতা : তদোগেন গিরতের কবিতা

পাণ্ডুলিপির কবিতা : তদোগেন গিরতের কবিতা

পাণ্ডুলিপির কবিতা : তদোগেন গিরতের কবিতা
1.22K
0

তদোগেন গিরতের কবিতা। অনুবাদ : কবি সব্যসাচী সান্যাল। কবিতায় ভিন্নতার স্বাদসন্ধানী সব্য’র কাছ থেকে জানতে পারি—তদোগেন গিরতে পেশায় শিক্ষক। মঙ্গোলিয়ার ওন্দোরহান বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পারেটিভ লিটারেচার পড়ান। কবিখ্যাতি সেভাবে নেই। কোনো প্রকাশিত বই নেই। সময় কাটানোর জন্যই লেখালিখি করেন। তার নিজের কথায়; “কবিতা নিয়ে সেরকম কোনো অ্যাম্বিশন নেই। তা’ছাড়া আমার লেখাগুলি যে আদৌ কবিতা—মঙ্গোলিয়ার কোনো দৈনিক বা পত্রিকা সে কথা স্বীকার করে না।”

সেজন্যই হয়তো গুগল সার্চ করে তদোগেন গিরত বলে কাউকে পাওয়া গেল না। কিন্তু এত ধারালো লেখা। সত্যি কি এই নামে কেউ আছে? জিজ্ঞেস করতেই সব্য বললেন—‘থাক না এই রহস্য।’

আমিও বললাম—থাক তবে। আর তো মাত্র ক’টা দিন। বাংলাদেশের ‘বেহুলা বাঙলা’ প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হবে শিগগির। পাঠকরা বইটি হাতে নিতে পারবেন বাংলা একাডেমি’র অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। তখন না হয় দেখা যাবে—তদোগেননামা’র কতটুকু রহস্যভেদ করতে পারেন তারা।
মাজুল হাসান, পরস্পর।


তদোগেন গিরতের কবিতা-১


আমি নোংরা মেয়েদের কাছে যাব
কাঠের নথ নিয়ে যাব
আমার বাহুর মাংসে গিঁথে গোবি ভাল্লুকের দাঁত
আমার কোনো নিষেধ নেই

আমি নোংরা মেয়েদের মুখের ভেতর
ঘুরে দাঁড়াচ্ছি, আর কাঁপছি
কোঁচকানো মুখের চামড়া টান করে দিচ্ছি
আমার কোনো নিষেধ নেই

ঘাসের মধ্যে উঠে দাঁড়াচ্ছে সারস
ওর চোখের পাতা লাল
ওর পিঠের রঙ কালো
চকচকে দুই দাবনার মাঝে সবচে মিষ্টি ওর পুটকি


তদোগেন গিরতের কবিতা


আমার নাম তদোগেন গিরতে
তদোগেন গিরতে বলে কেউ নেই
আমার বউ দুশ্চরিত্তির
আমার বউয়ের বোঁটা খুঁড়ে দিয়ে যায় কাক

আমি স্তেপ পেরিয়ে আর নদী পেরিয়ে
নোংরা মেয়েছেলের কাছে যাই
আর দেখি ওর বিছানায় রাত্রি
আর দেখি ওর বিছানায় দু’পায় রাত্রিকে জড়িয়ে
বনশুয়োর

আমার বউ দুশ্চরিত্তির
আমার বউ বলে কিছু নেই
আমি নোংরা মেয়েছেলের কাছে যাই
পুরো মঙ্গোলিয়ায় কোনো নোংরা মেয়েছেলে নেই।


তদোগেন গিরতের কবিতা


সে সারাদিন তাইমেন মাছ কাটে
উবু হয়ে বসে ট্রাউট কাটে
ওর তলপেটে মাছের গন্ধ
আমরা দিনের বেলায় করি,
করার পর আমার তলপেট মাছ হয়ে যায়

রাতে যখন চিকচিক করে জল
আমার তলপেট বরফজলে সাঁতরে বেড়ায়
সে ভোরভোর তাকে খ্যাপলা জালে ধরে
আর কেটেকুটে বরফের ওপর রেখে দেয়


তদোগেন গিরতের কবিতা


আমি পাল্লা বেড়ালের ধুমসো লোম
থেকে শব্দ বাছি
আমি আর্গালি ভেড়ার পেট কাটতে কাটতে
শব্দ তুলে আনি
আমি তথাগতর সামনে ধূপকাঠি জ্বালি
আর প্রার্থনা করি—দেবতা আমার একটা গান হোক
পপলার বনে পাতা নড়ে
গাঁয়ের বাইরের টিলায় লাল রং ধরে
আমি তুষার চিতার পায়ের ছাপ থেকে কান্না ছেনে তুলি
আর আমি শব্দ খুঁজতে উলান বাটোরে
মায়া খুঁজতে জুয়ার টেবিলে
আমার ভেড়ার চামড়ার ডিল শব্দে ভরে ওঠে
আমি তদোগেন গিরতে শব্দ’র পাশে শব্দ সাজাই
আর তাকে কম্বলের তলায় নিয়ে শুই
তার দু’পায়ের ফাঁকে উংলি করি
আর সে গানে সুর বসে

সেই গান সারাজ্যোৎস্না বরফের ওপর হেঁটে বেড়ায়
খুব ভোরে উলান বাটোরের রাস্তায় তার পায়ের ছাপ দেখা যায়

অনুবাদকের নোটঃ  (ডিল= মঙ্গোল ট্রাডিশনাল পোশাক)


তদোগেন গিরতের কবিতা-৫


তথাগত তিনি করুণাময়
তথাগত তিনি তার হাতের ছপটি
গুনেগুনে তিরিশবার আমার দাবনায়
তার মূর্তির সামনে সে আমার ওপর উঠে পড়ে
আর করে আর করে আর করে
তার বোঁটা থেকে নুন বেরোয়
অথচ সমুদ্র এখান থেকে চারশো মাইল পুবে
চীনের জিনঝৌ আমি তদোগেন কখনো যাই নি
আমি এক বসন্তে ম্যানহাটানে গেছিলাম
নিউ ইয়র্কের মেয়েরা আমার ভাষা বুঝতে পারে নি
ওরা আমার পিঠের, দাবনার কালসিটে দেখতে চেয়েছিল

নিউ ইয়র্কের মেয়েদের রঙ বেগুনি ওদের চুলের রঙ সবুজ
ওদের বুকে নুন নেই, তথাগত ওদের করুণা করো


তদোগেন গিরতের কবিতা-৮


আমি তোমার হারিয়ে যাওয়া চিন্তা
তুমি যখন দোরগোন হ্রদে ছিপ ফেলো
আর বইয়ের শিরদাঁড়ায় হাত বোলাও
আনমনে আমি ঘাসের ওপর পাতা
কম্বল থেকে ছারপোকার মতো উঠে আসি
৩৯-এ একলা জাপ সৈন্যের ক্ষমা প্রার্থনার মতো উঠে আসি

ওন্দোরহানের রাস্তায় আমি পিক-আপ চালাই
বার্চবনে পাতা উড়িয়ে যাই
তোমার থেকে এখন আমি ৫০০ মাইল দূরে
৭০০ মাইলের দিকে যেতে যেতে
পায়ের ফাঁকের শিরশিরানি ভাঁজ করে রাখি

আমি তোমার হারিয়ে যাওয়া চিন্তা
তোমার চেয়ে কে’ই বা ভালো জানে
যৌনতা ভাঁজ করে রাখলে বই হয়ে যায়


তদোগেন গিরতের কবিতা-৯


ঐ ছাই জিন্স আর বম্বার জ্যাকেটের
ছোকরা আমার কবিতা পড়ে না
ঐ নীল স্ট্রোলে রেশমি প্যাটার্নের
মেয়েটা আমার কবিতা পড়ে না
ঝানু তিরকিত আর তার আম্মা
আমার কবিতা পড়ে না

পীন বুকের কিরঘিজ ছুঁড়ি আদেলেত
সে ঘুড়ির দুধ দোয়ায়
সে ঘুড়ির দুধ গেঁজিয়ে আইগার বানায়
আমি সময়ে হেলান দিয়ে শাদা টোকো আইগার খাই
আর সকাল থেকে জোছনা অব্দি নেশা করি
কুচুটে ছুঁড়ি আদেলেত আমার কবিতা পড়ে না

আমি যেন সেই নিরক্ষর গান
মানুষের স্মৃতির মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে
মানুষ হয়ে গেছি

আকাশ থেকে আমায় পেড়ে
মগজ থেকে আমায় পেড়ে
কেউ আর শুদ্রাগায় বসাচ্ছে না

অনুবাদকের নোট : (আইগার= ঘুড়ি (Mare)-এর দুধ থেকে প্রস্তুত মদ। শুদ্রাগা= তিন তার বিশিষ্ট বাজনা। জাপানি বাদ্যযন্ত্র শামিসেন-এর সাথে মিল আছে)


তদোগেন গিরতের কবিতা-১০


চাঁদের আলোয় খরগোশগুলো খেলছে
আমি ওদের বিষণ্ণতা বলে জানি
চাঁদের আলোয় ছেয়ে নেকড়ের থাবা
আমি ওকে বিষণ্ণতা বলে জানি
হ্রদের ওপারের মিনারের একলা আলো
ওকেও বিষণ্ণতা বলে মনে হয়
আয়নায় এক ঝলক আমায় থামিয়ে দেয়
আর মাঝরাতের দরজায় চেস্টনাট গাছের
ছায়া আছড়ে পড়ে

আমার খোলা মাথার ওপর
চোখের ভেতর বরফকুচি
আমার বিষণ্ণতা গলে যাওয়া বরফকণা

বরফকুচির বিষণ্ণতা আমি

সব্যসাচী সান্যাল

জন্ম ১৯৭৩ ত্রিপুরা, আগরতলা।
শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বোলপুর, ইটানগর, হাজারিবাগ ও পুরুলিয়ায়।

১৯৯১-১৯৯৬ বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।

১৯৯৭-২০০২ দক্ষিণ কোরিয়ায়, চোন্নাম ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রথম বিদেশি গবেষক হিশেবে আণবিক জীববিজ্ঞানে পিএইচডি।

২০০২-২০০৭ স্টকহোমের ক্যারোলিন্সকা ইন্সটিটিউটেট-এ পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক হিশেবে কাটানোর পর বর্তমানে লখনৌ-এর সেন্ট্রাল ড্রাগ রিসার্চ ইন্সটিটিউটে কর্মরত।

২০০৩ থেকে কৌরব পত্রিকার সহসম্পাদক।

sanyal73@yahoo.com

Latest posts by সব্যসাচী সান্যাল (see all)