হোম অনুবাদ নোয়াম চমস্কি : মার্কিন সন্ত্রাসবাদের সুদীর্ঘ লজ্জাজনক ইতিহাস

নোয়াম চমস্কি : মার্কিন সন্ত্রাসবাদের সুদীর্ঘ লজ্জাজনক ইতিহাস

নোয়াম চমস্কি : মার্কিন সন্ত্রাসবাদের সুদীর্ঘ লজ্জাজনক ইতিহাস
797
0

নোয়াম চমস্কি একাধারে ভাষাতাত্ত্বিক, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক, রাজনীতি ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কিআদর্শিকভাবে এনার্কো-সিন্ডিক্যালিজম ও লিবারেটিয়ান সোশ্যালিজমের সমর্থক সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে তরুণ বয়স থেকে সোচ্চার। ১০০টির বেশি বইয়ের রচয়িতা চমস্কি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ। তাঁর পনেরটিরও বেশি কাজ নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে। চমস্কির লেখা বেশ কিছু বই বাংলায় অনূদিত হয়েছে। ৩৮টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সন্মানজনক ডিগ্রি লাভ করেছেন। সন্মানজনক বক্তৃতা দিয়েছেন অজস্র, পেয়েছেন অসংখ্য ফেলোশিপ।
.
২০১৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত চমস্কির ‘ Noam Chomsky: The Long, Shameful History of American Terrorism’ গদ্যটি অনুবাদ করেছেন
লতিফুল বারী।


‘বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ প্রসারে যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে দায়ী; তবে অবাক করা বিষয় হলো এ ব্যাপারে তারা কখনোই নিজেদের দায় স্বীকার করে না’।

২০১৪ সালের অক্টোবরের ১৫ তারিখে নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনের শিরোনাম হওয়া ছিল ঠিক এমনটাই। তবে কিছুটা মার্জিত করে তারা শিরোনাম ছাপে ‘সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সাহায্য সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়া কতটা বাস্তবসম্মত? একটি সিআইএ-র পর্যবেক্ষণ’। সেই সময় সিআইএ-র গোপন অপারেশনগুলোর ফলপ্রসূতা নিয়ে ঐ রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছিল। কারণ তৎকালীন মিশনগুলোতে সফলতার হার এতটাই কমে গিয়েছিল যে খোদ হোয়াইট হাউজ নীতি নির্ধারনে পরিবর্তনের কথা ভাবতে বাধ্য হয়েছিল। এমনকি সেই প্রতিবেদনে এ কথাও বলা হয় যে, বিভিন্ন দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ ও রসদ সরবরাহ আদৌ কোনো কাজে আসছে কিনা তা নিয়ে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ওবামা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শঙ্কা জানিয়েছেন এ ধরনের প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও।

মূলত অ্যাঙ্গোলা, কিউবা ও নিকারাগুয়ায় সিআইএ-র গোপন অস্তিত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছিল ঐ প্রতিবেদন। একটু ভালো করে লক্ষ করলেই দেশ তিনটিতে অস্থিরতার পেছনে মার্কিন প্রশাসনের কলকাঠি নাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শুরুতেই আসা যাক অ্যাঙ্গোলার ক্ষেত্রে। সময়কাল ১৯৮৮, নেলসন ম্যান্ডেলার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সাথে যখন দক্ষিণ আফ্রিকা লড়ছে ঠিক তখনকার ঘটনা। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রশাসনের সাথে প্রিটোরিয়ার ঘনিষ্ট সম্পর্ক বেশ দৃশ্যমান। এমনকি কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে রিগ্যানের প্রচেষ্টাও ছিল লক্ষণীয়।

এমন সময় অ্যাঙ্গোলার সশস্ত্র গেরিলা দল ইউএনআইটিএকে/ইউনিটাকে সমর্থন দিয়ে দেশটিতে আক্রমণ করে বসে দক্ষিণ আফ্রিকান সেনাবাহিনী, যেখানে সমর্থন যুগিয়েছে ওয়াশিংটন। বিদ্রোহী দলটির নেতা জোনাস সাভিম্বি নির্বাচনে পরাজিত হলেও ক্ষমতায় যাওয়ার লালসায় সহিংস আন্দোলন গড়ে তুলেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ও মার্কিনিদের ছত্রছায়ায়। এমনকি সংঘাতে নিজেদের সেনাদের ব্যাপক প্রাণহানি সত্ত্বেও পিছু হটে নি সাভিম্বি। এক পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক এ সংকটে হস্তক্ষেপ করে কিউবা। তাদের অভিযানের মুখে পিছু হটে দক্ষিণ আফ্রিকার সেনারা। তবে নিজেদের অবস্থানে অটল ছিল পেন্টাগন, মদদ দিয়ে গেছে ইউনিটা বিদ্রোহীদের। পরের বছর ১৯৮৯-এ জাতিসংঘের এক হিসেব মতে ঐ সংঘাতে প্রাণহানি হয়েছিল অন্তত ১৫ লাখ মানুষের যার দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে খানিকটা।


সন্ত্রাসবাদের দোহাই দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনার ভার রবার্ট কেনেডির হাতেই ন্যস্ত ছিল সে সময়।


এবার দৃষ্টি দেয়া যাক কিউবার দিকে। ১৯৬১ সালে বে অফ পিগস অপারেশন ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে কিউবাকে হেনস্থা করার সুযোগ খুজঁছিলেন জন এফ কেনেডি। বিষয়টি আর্থার শ্লেসিনজারের লেখা কেনেডির ভাই রবার্ট কেনেডির জীবনীগ্রন্থ থেকেই স্পষ্ট। কারণ সন্ত্রাসবাদের দোহাই দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনার ভার রবার্ট কেনেডির হাতেই ন্যস্ত ছিল সে সময়।

কিউবাকে অস্থিতিশীল করতে মার্কিন উদ্যোগ ছিল কয়েক দশকের। অন্তত ৩০ বছর ধরে নানা উপায়ে চেষ্টা করে গেছে তারা যার সূত্রপাত সেই ষাটের দশকে। সম্ভবত এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতেই নিকিতা ক্রুশ্চেভ সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাক করে মিসাইল বসিয়েছিলেন কিউবার মাটিতে। সে পরিস্থিতি ঠিকঠাকভাবে সামাল না দেয়া গেলে পারমাণবিক যুদ্ধ বেধে যাওয়া অসম্ভব ছিল না মোটেও। তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট ম্যাকনামারা তো পরে স্বীকারই করেছেন, তিনি নিজে একজন কিউবান নেতা হলে ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক হামলা চালালে অবাক হতেন না মোটেও।

এই দীর্ঘসময় ধরে কিউবার মাটিতে বিচ্ছিন্নভাবে মার্কিনি অস্থিরতা সৃষ্টির প্রয়াস দেশটিকে ভুগিয়েছে বেশ। ২০১০ সালে কানাডীয় গবেষক কিথ বলেন্ডারের লেখা ভয়েজেস ফ্রম দ্য আদার সাইড: অ্যান ওরাল হিস্টোরি অফ টেররিজম এগেইনস্ট কিউবা বইটিতে উঠে এসেছে মার্কিনিদের উদ্যোগে যেসব সহিংসতা ঘটেছে সেসবে কিউবাকেই দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বেশি, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির নজির তেমন একটা দেখা যায় না।

কিউবার প্রতি মার্কিন বৈরিতা আজো অটল রয়েছে বৈশ্বিক সমালোচনার মুখেও নানা রকম অবরোধ আরোপের মাধ্যমে। ২০১৪ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘে কিউবার ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে ভোটাভুটি হয়েছিল। যেখানে বিপক্ষে ভোট দেয় ১৮৮টি দেশ, পক্ষে মাত্র দুটি; যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। শুধু জাতিসংঘ নয়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এখন এই অবরোধ বিরোধী জনমত গড়ে উঠছে। হিলারি ক্লিনটনের নতুন বই হার্ড চয়েজ-এ সরাসরিই মার্কিন অবরোধের বিরোধিতা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও বিশ্বব্যাপী গবেষকরা সরব হয়েছেন এসব অবরোধের বিরুদ্ধে। ফরাসি পণ্ডিত সালিম লামরানি ২০১৩ সালে প্রকাশিত তার বই দি ইকোনমিক ওয়ার অ্যাগেইনস্ট কিউবা বইয়ের তুলে ধরেছেন এসব অবরোধের নানা নেতিবাচক প্রভাব।


মার্কিন সন্ত্রাসবাদের এমন আরও অনেক নজির রয়েছে যার মধ্যে এল সালভাদরে ৬ জন খ্রিস্টান পাদ্রিকে হত্যার ঘটনা অন্যতম।


প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের সময় সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ের নামে সৃষ্টি করা নিকারাগুয়ার অস্থিরতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। সে সময় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল খোদ আন্তর্জাতিক আদালতও। নির্দেশ নিয়েছিল দেশটিতে অনৈতিক মার্কিন আগ্রাসন বন্ধের এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়ার। তবে সেসবে কান দেয় নি ওয়াশিংটন। বরং সন্ত্রাসবাদ আরও উস্কে দিয়েছিল নিকারাগুয়ায় সংঘাত নিরসনে নিরাপত্তা পরিষদের তোলা প্রস্তাবে ভেটো দিয়ে।

মার্কিন সন্ত্রাসবাদের এমন আরও অনেক নজির রয়েছে যার মধ্যে এল সালভাদরে ৬ জন খ্রিস্টান পাদ্রিকে হত্যার ঘটনা অন্যতম। দেশটির সেনাবাহিনীর একটি অংশকে উস্কে দিয়ে হত্যা করানো হয় ঐ ৬ পাদ্রিকে। এমনকি সাক্ষী লুকানোর জন্য বাড়ির গৃহকর্মী ও তার মেয়েকেও খুন করে সেনারা।

এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়াও চোখে পড়তে শুরু করেছিল খুব দ্রুতই। আশির দশকের মাঝামাঝি সন্ত্রাসবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপের ক্ষতিকর প্রভাব আজও সংবাদপত্রের শিরোনামে ঠাঁই পায়। যেমন ধরা যাক, মধ্য আমেরিকার দেশগুলো থেকে অবৈধ অভিবাসীদের মার্কিন ভুখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা। কারণ, মার্কিন মদদে ঐসব অঞ্চলের দেশগুলোতে সহিংসতা এতটাই মাত্রা ছাড়িয়েছিল যে মানুষ একরকম বাধ্য হতো দেশ ছাড়তে। আবার অবৈধ হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়িতও হতে হতো প্রায়ই।

শুধু সন্ত্রাসী কার্যক্রমই নয়, সন্ত্রাসবাদের বীজ গেড়ে দিতেও অতুলনীয় যুক্তরাষ্ট্র। সিআইএ-র সাবেক বিশ্লেষক পল পিলার আগেই সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন সিরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলা না চালাতে। কারণ পরবর্তীকালে জিহাদিরা এটিকে ইসলামের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন হিসেবে প্রচারণায় ব্যবহার করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ঠিক তেমনটাই ঘটেছে, বিদ্রোহী জাবাত আল নুসরা ও ইসলামিক স্টেট তাদের মধ্যে দূরত্ব ঘুচিয়েছে। এখন তারা মার্কিনবিরোধী অবস্থানে সরব।

শুধু তাই নয়, ইসলামি জিহাদে যুক্ত হওয়ার বিশ্বব্যাপী যে প্রবণতা তাতেও আফগানিস্তানে মার্কিন হামলা অনেকটাই দায়ী। এসব ঘটনাকেই পুঁজি করে আইএস ইরাক ও সিরিয়ায় তাদের তথাকথিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে কাছে টানছে। সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা গ্রাহাম ফুলার তো বলেই বসেছেন, এসব সংগঠনের উত্থানের দায় যুক্তরাষ্ট্র এড়াতে পারে না। তার মতে আইএস-এর জন্মপ্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের সরাসরি হাত না থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে ইরাকে আগ্রাসী মার্কিননীতির ফলে এ ধরনের সহিংস সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। আর এসবের সাথে যুক্ত হতে যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট ওবামার বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসীদের মুলোৎপাটনের নতুন প্রকল্প। তবে তা বাস্তবায়ন করতে ব্যবহৃত ড্রোন ও স্পেশাল ফোর্স কী পরিণতি ডেকে আনে তা সময়ই বলে দেবে।

লতিফুল বারী

লতিফুল বারী

লেখক ও সাংবাদিক।
জন্ম: ২২ জুন, ১৯৮৮; বগুড়ায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যায়ন বিভাগে স্নাতকোত্তর।
কাজ করেন একটি বেসরকারি বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তা বিভাগে।

ইমেইল: nebir_bd@yahoo.com
লতিফুল বারী