হোম অনুবাদ নৈঃশব্দ্য

নৈঃশব্দ্য

নৈঃশব্দ্য
526
0
অ্যালিস মানরো জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩১ সালের ১০ জুলাই। তিনি অন্টারিওর উইংহ্যামে বেড়ে উঠেছেন আর ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন। ছোটগল্প রচনার জন্য তিনি পৃথিবী বিখ্যাত। তার ছোটগল্পের সংকলনগুলোর মধ্যে রয়েছে—রানঅ্যাওয়ে, ড্যান্ অফ দ্য হ্যাপি শেডস, সামথিং আই হ্যাভ বিন মিনিং টু টেল ইউ; দ্য বেগার মেইড, দ্য মুনস অফ জুপিটার, দ্য প্রোগ্রেস অফ লাভ, ফ্রেইন্ড অফ মাই ইয়োথ, ওপেন সিক্রেটস, সিলেকটেড স্টোরিজ, দ্য লাভ অফ এ গুড ওম্যান, এবং হেটসশিপ, ফ্রেইন্ডশিপ, কোর্টশিপ, লাভসশিপ, ম্যারিজ ছাড়াও উপন্যাসের মধ্যে আছে, লাইভস অফ গার্লস আর ওম্যান। ‘নেশা’ গল্পটি তার রানঅ্যাওয়ে গল্প সংকলন থেকে নেওয়া। অসাধারণ লেখক জীবনে তিনি অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে আছে কানাডা সরকারের তিনটি সাহিত্য পুরস্কার আর তাদের গিলার প্রাইজ। ছোটগল্পের জন্য তিনি পেয়েছেন রি পুরস্কার, লানান সাহিত্য পুরস্কার, ইংল্যান্ডের ডাব্লিউ এইচ স্মিথ বুক পুরস্কার এবং ইউনাইটেড স্টেটস ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল পুরস্কার। নিউ ইয়র্কার, দ্য অ্যাটলান্টিক মান্থলি, দ্য প্যারিস রিভিউ ইত্যাদি বিখ্যাত পত্রিকায় তার গল্প নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে, এবং তার গল্প বিশ্বের তেরটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ছোটগল্পের জন্যই তিনি ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। অ্যালিস মানরো এবং তার স্বামী ক্লিনটন, অন্টারিও, লেক হুর আর বৃটিশ কোলাম্বিয়ার কোমোক্স অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করে জীবন কাটাচ্ছেন।

মূল : অ্যালিস মানরো
অনুবাদ : আফসানা বেগম


বাকলে-বে থেকে ডেনম্যান যাওয়ার পথে জুলিয়েট ছোট ফেরিটার সিট ছেড়ে সামনের খোলা জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়াল। গ্রীষ্মের চমৎকার বাতাস। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন মহিলা তাকে চিনে ফেলল, তার সাথে কথা বলা শুরু করল। জুলিয়েটের দিকে দ্বিতীয়বার ফিরে তাকিয়ে ‘তাকে কোথায় দেখেছে’ এরকমটা ভাবা কারো জন্য অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের মনেও পড়ে যেত। প্রুভিন্সিয়াল টেলিভিশন চ্যানেলে তাকে নিয়মিত তারা দেখত, বিভিন্ন ক্ষেত্রের নামকরা মানুষদের সাক্ষাৎকার নিত সে, তাদের কয়েকজনের গোলটেবিল বৈঠকও সঞ্চালন করত, অনুষ্ঠানটির নাম ছিল আজকের তাজা খবর। চুল তার ছোট করে কাটা, যতটুকু ছোট রাখা যায়, বেশ গাঢ় লালচে বাদামি রঙ, চশমার ফ্রেমের সাথে মিলিয়ে রঙ করানো। বেশিরভাগই সে পরে কালো প্যান্—সেদিনও যেমন পরেছিল—সাথে আইভরি সিল্কের শার্ট, আর মাঝে মাঝে পরে একটা কালো জ্যাকেট। সে দেখতে, তার মা যেমন বলত, মনে রাখার মতো চেহারা।

“মাফ করবেন। মানুষজন নিশ্চয় প্রায়ই আপনাকে যন্ত্রণা করে।”

“কোনো অসুবিধা নেই,” জুলিয়েট বলে, “একমাত্র আমি যদি কোনো দাঁতের ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসি, তবে।”

মহিলাটি বয়সে জুলিয়েটের সমানই হবে। তার লম্বা কালো চুল জায়গায় জায়গায় ধূসর, মুখে কোনো সাজ নেই, জিন্সের লম্বা স্কার্ট পরনে। মহিলা থাকেন ডেনম্যানে, তাই জুলিয়েট প্রশ্ন করে আধ্যাত্মিক ভারসাম্য কেন্দ্রের ব্যাপারে তার কিছু জানা আছে কি না।

“কারণ আমার মেয়েটা সেখানে আছে,” জুলিয়েট বলে, “ওখানেই থাকছে, একটা কোনো কোর্স করছে মনে হয়, আমি ঠিক জানি না কী কোর্স সেটা, তবে ছয় মাস ধরে চলছে। আমি গত ছয় মাসে এই প্রথম তাকে দেখতে যাচ্ছি।”

“ওরকম বেশ কিছু জায়গা আছে সেখানে,” মহিলা উত্তর দেন। “ওই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো আসে আর যায়। আমি এটা বলছি না যে ওরা খারাপ। তবে কেবল মনে হয় তারা জঙ্গলে কিছুদিনের জন্য আসে, বুঝতেই পারছেন, আশেপাশের লোকালয়ের সাথে তাদের তেমন যোগাযোগও থাকে না।”

মহিলা জানতে চান, জুলিয়েট নিশ্চয়ই মেয়েকে দেখার জন্য অধীর, জুলিয়েট জানায়, নিশ্চয়ই, সে খুব উত্তেজিত।

“আমি আসলে তাকে ছাড়া থাকতেই পারি না,” জুলিয়েট বলে। “আমার মেয়ের বয়স একুশ—মানে এই মাসেই একুশ হবে, আসলে বলতে গেলে এতদিনে আমি তার থেকে দূরে থাকিনি তেমন।”

মহিলা বলেন তারও বিশ বছর বয়সী একটি ছেলে আছে, আরেক মেয়ে আঠারোতে পা দিল, আরেক ছেলে পনের। বহুদিন হয়ে গেছে সে তাদের একা একা বা কারও সাথে ঘোরার জন্য টাকা দেয়নি।

জুলিয়েট হাসে। “তাই? আমার তো মাত্র একজনই, তবু মনে হয় না কয়েক সপ্তাহ আগে যা দিয়েছি তা দিয়েই তার এখন পর্যন্ত চলছে।”

এই ধরনের মা সুলভ কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়া মোটামুটি সহজ (জুলিয়েট তো মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে দেখে অভ্যস্ত), কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, পেনিলোপ অভিযোগ করার মতো কোনো কারণই কখনও তৈরি করেনি। আর সেভাবে ভাবলে পেনিলোপের থেকে একদিনের জন্য দূরে থাকাও তার পক্ষে কঠিন, সেখানে ছয় মাস ধরে তারা আলাদা। পেনিলোপ বাফে কাজ করেছিল কিছুদিন, সেটা ছিল একটা গ্রীষ্ককালীন চাকরি, তারপর বাসে করে মেক্সিকোতে গিয়েছিল, নিউফাউন্ড ল্যান্ডে একটা পাহাড়ে ওঠার ক্যাম্পেও গেল একবার। কিন্তু সে বরাবরই থাকে জুলিয়েটের সাথে, আর এর মাঝে কখনই ছয় মাসের কোনো ছাড়াছাড়ির ঘটনা ঘটেনি।


কী যে বলেন, ওভাবে বলবেন না। আপনি তারকা। আমি মন থেকে বলতে পারি, আপনি যে কাজ করেন তার জন্য আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি। এখানে তো কেবলই অন্ধকার চারদিকে, একমাত্র টেলিভিশনই কিছু আলো ছড়ায়


সে আমাকে আনন্দে ডুবিয়ে রাখে, জুলিয়েট হয়তো বলতে পারে। ব্যাপারটা এমন না যে সে সারাক্ষণ নাচ-গান করছে আমার সামনে, আবার এমনও নয় যে সে সবসময় সুন্দর কথা বলছে। আমার মনে হয় আমি তার চেয়েও তাকে ভালোভাবে মানুষ করেছি। পেনিলোপ ব্যক্তিত্ববান আর আবেগপ্রবণ, আবার সে এমন জ্ঞানী যে মনে হয় অন্তত আশি বছর ধরে এই পৃথিবীতে বিচরণ করছে। প্রতিক্রিয়াশীলতা তার স্বভাব, আমার মতো উদ্দেশ্যহীন নয়। কখনও কখনও বেশ গম্ভীর, তার বাবার মতো। আর সে সুন্দরও খুব, পরীর মতো, তাকে দেখতে অনেকটা আমার মায়ের মতো, আমার মায়ের মতোই বাদামি চুল তবে অত বেশি ঢেউ খেলানো না। আমার তাকে নিয়ে খুব গর্ব হয়। আর এই যে সবসময় তাকে ছাড়া—এমনকী তার কণ্ঠস্বরও শুনি না কতদিন, কারণ সে তো ধ্যানে আছে। আধ্যাত্মিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠানটি কোনো ফোন বা চিঠি অনুমোদন করে না। পুরোটা সময়ই মনে হলো একটা মরুভূমিতে আছি, আর যখন তার মেসেজ এল, মনে হলো আমি যেন খরায় শুকনো একটা মাটির ফাটল, হঠাৎ বৃষ্টি আসায় ঢকঢক করে গিলছি।

“রোববার বিকেলে হয়তো তোমার সাথে দেখা হবে। এরকম সময়ে।”

বাড়ি যাবার সময় হয়েছে, জুলিয়েট কি ভাবেনি যে এর মানে এটাই, তবে সেটা অবশ্য নির্ভর করে পেনিলোপের উপরে, জুলিয়েট জানে।

পেনিলোপ তাকে নিখুঁত একটা ম্যাপ এঁকে দিয়েছিল আর জুলিয়েট সেটা দেখে অনায়াসে চার্চের বাইরে গিয়ে গাড়ি থামাল। চার্চের ইমারতটা পচাত্তর থেকে আশি বছরের পুরনো হবে, লতাপাতায় ঢাকা, তবে কানাডার যে অংশে জুলিয়েট বড় হয়েছে সেখানকার চার্চগুলোর মতো আদিম আর আকর্ষণীয় নয়। তার পেছনে বেশ নতুন ধরনের একটা বিল্ডিং, ঢালু ছাদওলা আর সামনের পুরো দিকটায় কেবল জানালা। সামনের দিকে একটা ভলিবল কোর্টের মতো, নেট লাগানোর ব্যবস্থা আছে, দুদিকে গ্যালারির মতো চেয়ার পাতা। চারদিকটা পরিত্যক্ত, ধীরে ধীরে লতাগুল্মের দখলে চলে যাচ্ছে।

বেশ কিছু মানুষ, জুলিয়েট জানে না, ছেলে না মেয়ে—কোর্টে কাঠের কাজ করছে, বাকিরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বেঞ্চে বসে আছে। সবার পরনেই সাধারণ জামাকাপড়, চার্চের মানুষদের মতো হলুদ আলখাল্লা জাতীয় কিছু না। প্রথমে কিছুক্ষণ তারা জুলিয়েটের গাড়ির দিকে তাকায়নি। তারপর বেঞ্চ থেকে একজন উঠে আস্তে আস্তে জুলিয়েটের দিকে এগিয়ে এল। মধ্যবয়সী, ছোটখাট, চশমা পরা একজন মানুষ। জুলিয়েট গাড়ি থেকে বেরিয়ে তাকে সম্ভাষণ করল আর পেনিলোপের কথা জানতে চাইল। সে কোনো কথা বলল না। হতে পারে সেখানে নীরবতা পালনের কেনো নিয়ম আছে। তবে লোকটি মাথা নাড়িয়ে চার্চের ভেতরের দিকে চলে গেল। তারপর আবার চার্চের ভেতর থেকে আরেকজন ছোটখাট মোটা মহিলাসহ জুলিয়েটের সামনে এসে দাঁড়াল। মহিলার গায়ে জিন্সের প্যান্ট আর ঢিলেঢালা সোয়েটার।

“কী সৌভাগ্য, আপনার সাথে দেখা হলো,” মহিলা বলল। “ভেতরে আসুন। আমি ডনিকে আমাদের জন্য চা দিতে বলেছি।”

মহিলা সতেজ তবে মুখে বিরক্ত ভঙ্গি, হাসিটা যেন সুন্দর আবার সাজানোও, আর চোখের দিকে তাকালে জুলিয়েট অবশ্যই তাকে পিটপিট করা চোখ বলবে। “আমার নাম জোয়ান,” সে বলল। জুলিয়েট অবশ্য মনে মনে তার নাম সেরেনিটি ধরনের কিছু ভেবে রেখেছিল, পূর্বদিকে নামগুলো যেমন হয় সাধারণত। পরে অবশ্য জুলিয়েটের মনে পড়েছে পপ জোয়ানের কথা।

“আমি তো ঠিক জায়গাতেই এসেছি, তাই না? আমি আসলে এখানে প্রথম এলাম,” জুলিয়েট গড়গড় করে বলে যেতে থাকে, “আপনি তো বুঝতেই পারছেন, আমি পেনিলোপকে দেখতে এসেছি।”

“নিশ্চয়ই, পেনিলোপ।” জোয়ান টেনে টেনে বিশেষ মায়া করে পেনিলোপের নাম উচ্চারণ করল।

চার্চের উঁচু জানালা থেকে বেগুনি পর্দা ঝুলছে। হসপিটাল ওয়ার্ডের মতো করে সাদা পর্দা দিয়ে বড় হলরুমে ছোট ছোট রুম তৈরি করা হয়েছে। জুলিয়েটকে যে ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেখানে কোনো বিছানা ছিল না। তবে একটা বড়সড় টেবিল আর কিছু প্লাস্টিকের চেয়ার, টেবিলভরা কাগজপত্র।

“সত্যি কথা বলতে কী, আমারা এখনও পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করে উঠতে পারিনি,” জোয়ান বলল। “জুলিয়েট, আমি আপনাকে জুলিয়েট বলে ডাকতে পারি?”

“নিশ্চয়ই।”

“আমি আসলে কোনো তারকার সাথে কথা বলতে অভ্যস্ত নই।” জোয়ান নিজের হাতদুটো প্রার্থনার মতো করে থুতনির নিচে ধরে। “আমি আসলে ঠিক বুঝতে পারছি না, স্বাভাবিকভাবেই কথা বলব কি না।”

“আমি তারকা নই।”

“কী যে বলেন, ওভাবে বলবেন না। আপনি তারকা। আমি মন থেকে বলতে পারি, আপনি যে কাজ করেন তার জন্য আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি। এখানে তো কেবলই অন্ধকার চারদিকে, একমাত্র টেলিভিশনই কিছু আলো ছড়ায়।”

“অনেক ধন্যবাদ,” জুলিয়েট বলে। “আমি পেনিলোপের কাছ থেকে একটা চিরকুট পেলাম—”

“আমি জানি। কিন্তু আমি খুবই দুঃখিত যে আপনাকে এটা বলতেই হবে, আপনাকে কিছুতেই আমি হতাশ করতে চাই না, জুলিয়েট, তবে আমি সত্যিই দুঃখিত যে পেনিলোপ এখানে নেই।”


তা কেন হবে, আমাদের বাড়িতে ধর্ম কোনো নিষিদ্ধ বিষয় ছিল না, আমরা তা নিয়ে প্রচুর কথা বলতাম


মহিলা গলা যতটা নামানো যায় ততটা নামিয়ে পেনিলোপ এখানে নেই কথাটা উচ্চারণ করল। পেনিলোপের সেখানে না থাকার খবরটা অবশ্যই তাদের দুজনের কথোপকথনে একটা ধস নামিয়ে ফেলার মতো ব্যাপার। জুলিয়েট একটা গভীর শ্বাস নেয়। কিছুক্ষণের জন্য সে কোনো কথা বলতে পারে না। একরকম আতঙ্ক তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় লাগে। আর পরমুহূর্তেই সে নিজেকে যুক্তির মধ্যে ফিরিয়ে আনে। সে তার হাত ব্যাগের মধ্যে তন্ন তন্ন করে চিরকুটটা খুঁজতে থাকে।

“সে বলেছিল হয়তো— ”

“জানি। জানি সে বলেছিল,” জোয়ান বলে। “তার ইচ্ছে ছিল এখানেই থাকার, কিন্তু ব্যাপার হলো, সে পারল না— ”

“তবে সে কোথায়? কোথায় গেল?”

“আমি আপনাকে বলতে পারব না।”

“মানে আপনি বলতে পারবেন না, নাকি বলবেন না?”

“আমি বলতে পারব না। আমি আসলে জানিই না। তবে আমি আপনাকে একটা কথা বলতে পারি যাতে আপনি কিছুটা স্বস্তি পাবেন। সে যেখানেই যাক, যেখানেই গিয়ে পৌঁছাক, সেটাই তার জন্য সঠিক। তার আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য সেটাই সবচেয়ে উপযুক্ত।”

জুলিয়েট এ বিষয়ে আর কথা বাড়াবে না বলেই সিদ্ধান্ত নেয়। আধ্যাত্মিক শব্দটা জুলিয়েটের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, সে আপ্রাণ চেষ্টা করে কথাটা হজম করতে। জুলিয়েট কখনই ভাবেনি পেনিলোপ, যদি তার বুদ্ধিমত্তা আর তীক্ষ্ণতার কথা ভাবা যায়, এরকম একটা দলের সাথে ভিড়ে যাবে।

“আমার শুধু মনে হলো যে আমার জানা উচিত সে কোথায়,” জুলিয়েট বলে। “এমনও তো হতে পারে যে তার কিছু লাগবে, আমার কাছে চাইতে পারে, আমি যেন পাঠাতে পারি।”

“তার নিজস্ব জিনিসপত্র?” জোয়ান যেন নিজের মুখে ধেয়ে আসা বিস্তৃত হাসিটা থামাতেই পারছিল না, যদিও সে কোনোরকমে হাসির বদলে সেখানে একটা প্রসন্ন ভাব ফুটিয়ে তুলল। “পেনিলোপ এখন তার সম্পদ সম্পত্তি নিয়ে মোটেই চিন্তিত না।”

কখনও কখনও স্যুটিং এর আগে জুলিয়েটের এমন মনে হয়েছে, যে মানুষটিকে সে প্রশ্ন করবে ক্যামেরা চালু হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত যেন সে জুলিয়েটের উপরে ক্ষেপে আছে। যাকে জুলিয়েট মনে করে তেমন উপযুক্ত নয়, কখনও কখনও বেশ বোকাও মনে হয়, তাদের ক্ষেত্রেই এই আচরণ দেখা যায়। এটা হতে পারে এক রকমের খেয়াল কিন্তু ভীষণ অস্বস্তিকর। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বুঝতে পারলেও যেটা করা যায় না তা হলো সামনের মানুষটির প্রতিও একইভাবে অনীহা বা বিরক্তি প্রকাশ করা।

“সঠিক বা উপযুক্ত বলতে আমি যা বুঝিয়েছি তা হলো, অন্তরের উৎকর্ষতা, অবশ্যই ভেতরের ব্যাপার,” জোয়ান বলে।

তার চোখে চোখ রেখে জুলিয়েট বলে, “আমি বুঝতে পেরেছি।”

“পেনিলোপ খুবই সৌভাগ্যবান যে সে জীবনে অনেক ভালো মানুষ দেখেছে—তার ভীষণ সৌভাগ্য যে সে আপনার মতো একজন মায়ের হাতে বড় হয়েছে—তবে জানেন, কিছু একটা আছে যেটা পেনিলোপের মধ্যে ছিল না, বড় হয়ে যাবার পরে বাচ্চারা বুঝতে পারে যে তাদের লালন পালনের সময়ে কিছু একটা বাদ পড়েছে।”

“নিশ্চয়ই,” জুলিয়েট বলে। “আমি জানি বড় হলে বাচ্চারা অনেক কিছুর ব্যাপারে মতামত দেয়, অভিযোগ করে।”

জোয়ান নিজের ক্রোধ সামলাতে চাইল।
“আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনা—আমার এ কথাটা বলতেই হবে—এই আধ্যাত্মিক বোধ আর বিশ্বাসটা কি পেনিলোপের জীবনে অনুপস্থিত ছিল না? আমি ধরে নিয়েছি যে সে ধর্মে বিশ্বাসী কোনো বাড়িতে মানুষ হয়নি।”

“তা কেন হবে, আমাদের বাড়িতে ধর্ম কোনো নিষিদ্ধ বিষয় ছিল না, আমরা তা নিয়ে প্রচুর কথা বলতাম।”

“কিন্তু আমার মনে হয় সেটা কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আপনাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনায় ছিল। আমার মনে হয় আপনি বুঝতে পারছেন আমি কী বলতে চাচ্ছি। আপনি অনেক বুদ্ধিমান,” শেষের কথাটা সে বলে খুব বিনয়ের সাথে।

“ঠিক আছে, আপনি যা মনে করেন।” জুলিয়েট জানে কথায় কথায় অনেক কথা বাড়তে পারে আর নিজের উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।

“এসব আমি মনে করি না, জুলিয়েট। এসব মনে করে পেনিলোপ। পেনিলোপ খুবই লক্ষ্মী মেয়ে কিন্তু এখানে সে এসেছে নিঃস্বের মতো। এমন কিছুর জন্য তার তীব্র ক্ষুধা ছিল যা সে বাড়িতে পায়নি। সেই বাড়িতে ছিলেন আপনি, আর ছিল আপনার চরম সফল জীবন কিন্তু জুলিয়েট, একটা কথা আপনাকে বলতেই হচ্ছে, আপনার মেয়ে একাকিত্ববোধে ভুগেছে। সে মনে করে সে অসুখী।”

“সব মানুষই কি জীবনের কখনও না কখনও এভাবে ভাবে না? একাকিত্ববোধ আর অসুখী হওয়ার অনুভূতি কি সবারই আসে না?”

“আমার আসলে এসব নিয়ে কথা বলা উচিত না। মাফ করবেন, জুলিয়েট। আপনি একজন জ্ঞানী মানুষ। আমি প্রায়ই আপনাকে টেলিভিশনে দেখি আর ভাবি, কীভাবে আপনি মানুষের সাথে সবসময় এত সুন্দর করে কথা বলেন, ভীষণ উল্টোকথার উত্তরেও কী করে হাসিমুখটি ধরে রাখে? আমি কখনই ভাবিনি আপনার সাথে সামনাসামনি বসে কথা বলব। আর দেখুন আজ আপনি রেগে যাচ্ছেন, কিন্তু আমি আপনাকে সাহায্য করার জন্যই এখানে— ”

“আমার মনে হয় আপনি ভুল করছেন।”

“দেখলেন, আপনার খারাপ লাগল। এটা খুবই স্বাভাবিক, আপনার খারাপ লাগতে পারে।”

“সেটা কিন্তু আমার নিজের ব্যাপার।”

“অবশ্যই। পেনিলোপ হয়তো আপনার সাথে পরে যোগাযোগ করবে। যাই হোক না কেন, আপনারই মেয়ে তো।”

কয়েক সপ্তাহ পরে পেনিলোপ সত্যিই জুলিয়েটের সাথে যোগাযোগ করল। উনিশে জুন, পেনিলোপের জন্মদিনে তারই তরফ থেকে একটা জন্মদিনের কার্ড এসে উপস্থিত হলো। তার একুশ তম জন্মদিন। মানুষ কারও পছন্দ সম্পর্কে অজ্ঞাত হলে যেরকম সাধারণ কার্ড পাঠায়, সেটি দেখতে তেমন। তাতে না আছে কোনো খুশির বা হাসির কথা, না আছে কোনো মজার বা আবেগী কোনো বাক্য। কার্ডের উপরে ঝুড়ি ভরা ফুলের ছবি, ফুলগুলোর গায়ে বেগুনি ফিতা জড়ানো যার প্রান্তটি শুভ জন্মদিন লেখাটির উপরে ছড়িয়ে আছে। একই শব্দগুলো ভেতরেও লেখা হয়েছে, সাথে সোনালি রঙে লেখা আছে, তোমার জন্য। আর সেখানে কারও নাম লেখা নেই। জুলিয়েট প্রথমে ভাবল কেউ হয়তো পেনিলোপকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছে, আর তাড়াহুড়োয় নিজের নাম লিখতে গেছে ভুলে, আর জুলিয়েট ভুলে সেই কার্ডের খামটা খুলেও ফেলেছে। এটা নিশ্চয়ই এমন কেউ যার ডায়েরিতে পেনিলোপের নাম আর জন্মদিন লেখা আছে। তার দাঁতের ডাক্তার হতে পারে, কিংবা কোনো শিক্ষক। কিন্তু যখন খামের উপরে লেখা ঠিকানাটার দিকে তার চোখ গেল, সে দেখল কোনো কাটাকাটি ছাড়াই লেখা হয়েছে জুলিয়েটের নাম, আর আশ্চর্য হলো সে যখন বুঝল যে হাতের লেখাটি পেনিলোপের। কোথা থেকে পোস্ট করা হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। কেবল বোঝা যাচ্ছে কানাডার কোথাও থেকে এসেছে। জুলিয়েটের মনে হলো অন্তত কোন বিভাগ থেকে এসেছে তা বের করা যেতে পারে। কিন্তু সে জন্যে একটা কোনো পোস্ট অফিসে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা দরকার। পোস্ট অফিসে গিয়ে চিঠিটা কোথা থেকে এলো জানতে চাইলে তারাও নিশ্চয়ই জানতে চাইবে যে এই তথ্যগুলো কেন দরকার আর কেনইবা তারা বলবে। তবে তাদের মধ্যে কেউ না কেউ বলতে পারবেই চিঠিটা কোথা থেকে এল।

জুলিয়েট গিয়েছিল তার পুরোনো বন্ধু ক্রিস্টার সাথে দেখা করতে, পেনিলোপের জন্মের আগে জুলিয়েট যেখানে থাকত, সেই হোয়েল বে-তে থাকে ক্রিস্টা। ক্রিস্টা ছিল কিটসিলানোতে, থাকার জন্য চমৎকার জায়গা। নিচের তলায় তার ঘর, পাশে ছোট্ট খোলা জায়গা, জুলিয়েট সেখানে বসে ছিল তার সাথে। সেখানে খব সুন্দর রোদ আর পাঁচিলের গা ঘেঁষে উঠে যাওয়া উস্টেরিয়ার ঝাড়। জুলিয়েট ক্রিস্টাকে ডেনম্যান দ্বীপে যাবার পুরো গল্পটা বলল। সে অন্য কাউকে সেখানে যাওয়ার কথা বলেনি আর বলতে চায়ও না। প্রতিদিন কাজ থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে তার মনে হয় ফিরে দেখবে বাড়িতে পেনিলোপ অপেক্ষা করছে। অথবা একটা কোনো চিঠি তো পড়ে থাকতেই পারে। আর তারপর এল সেই অদ্ভুত কার্ডটা, ভীষণ নিষ্ঠুর—আর সে নিজের কাঁপাকাঁপা হাতেই সেটি ছিঁড়ে বের করল।

“এর কিন্তু একটা মানে আছে,” ক্রিস্টা বলল। “এটা তোমাকে অন্তত এটুকু জানাচ্ছে যে পেনিলোপ ভালো আছে। এরপর নিশ্চয়ই আরও কিছু আসবে। আসবেই। ধৈর্য রাখ।”

জুলিয়েট কিছুক্ষণের জন্য সেই সর্বেসর্বা মায়ের ব্যাপারে নিন্দা করল। তাকে নিয়ে মজা করার জন্য আর পেনিলোপের ঠিকানা না বলার জন্য এটাই পোপ জোয়ানকে ডাকার জন্য যথোপযুক্ত নাম বলে তার মনে হয়। অসহ্য তার কথাবার্তা, জুলিয়েট বলে। মুখে মুখে ধর্মের মুখোশ এঁটে, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলার পেছনে নোংরামি আর ভণ্ডামি।

“ভাবতেই পারি না যে পেনিলোপকে ওই মহিলা বশীভূত করে ফেলেছে।”

ক্রিস্টা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে পেনিলোপ হয়তোবা সেখানে গেছে কোনো কারণে, হয়তোবা জায়গাটা নিয়ে কিছু লিখতে চায়। যেমন ধরো কোনো একটা বিষয় নিয়ে সরেজমিনে জেনে তারপর তা নিয়ে সাংবাদিকতা করা, মাঠ পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদ। কোনো একটা বিষয় নিয়ে সূক্ষ্মভাবে খোঁজখবর নিয়ে তারপর সেটার ব্যাপারে নিজের ভাবনাটা সবাইকে জানানো, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এসব আজকাল খুবই জনপ্রিয়।

“ছয় মাস ধরে খোঁজখবর নেওয়া?” জুলিয়েট বলে। “পেনিলোপের যে পরিমাণ বুদ্ধি আছে তাতে ওই সর্বেসর্বা মাকে বুঝতে তার দশ মিনিটের বেশি লাগার কথা না।”

“সেটাই, একটু অদ্ভুত বটে,” ক্রিস্টা স্বীকার করে।


আজকাল ফোন নিয়ে ছেলেমানুষি করে, দেখে দরজা থেকে কয় পা এগুলে ফোনটা পাওয়া যায়, কী করে সে সেটা কানে তুলে নেয়, কী করে একটা নিঃশ্বাস টেনে কথা বলা শুরু করে। এসবকিছু তার নিজস্ব স্টাইল


“তুমি নিজেকে যতটুকু ব্যবহার করতে দেবে ততটুকুই ভুগবে, তাই না?” জুলিয়েট বলে। “ওই মহিলার কাছে আমার আর কিছু জানতেও রুচি হয়নি। মনে হলো আমি যেন পানিতে পড়েছি। নিজেকে বোকা বোকা লাগছিল। মহিলা চাচ্ছিল যে আমার যেন নিজেকে গাধা মনে হয়। হ্যাঁ, সেটাই চাচ্ছিল। হয় না এমন যে, একটা নাটকে কেউ একটা জিনিস দেখে চমকে উঠল আর বাকিরা সবাই নির্লপ্তই থাকল কারণ তারা জানে যে চমকে ওঠা মানুষটি এটা জানত না।”

“এরকম নাটক হয়তো আর হবে না,” ক্রিস্টা বলে। “এখন তো অন্য কেউ এসব জানে না। না—পেনিলোপ আমার ব্যাপারে নিশ্চয়ই অতটা নিশ্চিন্ত না যতটা তোমাকে নিয়ে। সে জানে এসব এসে আমি তোমাকেই বলব।”

“আচ্ছা, এখন চুপ কর,” ক্রিস্টা বলে, নিচু গলায় বলে, “আবার নতুন করে শুরু কর না।”

“ঠিক আছে, আর না,” জুলিয়েট মেনে নেয়। “আমার মেজাজ আসলে ভীষণ খারাপ, এই আর কী।”

“একটু ধৈর্য ধর। এসব মা হওয়ার যন্ত্রণা। সে তো তোমাকে তেমন জ্বালায়নি কখনও। বছরখানেক পরে এসব আর মনে থাকবে না তোমার।” জুলিয়েট আর তাকে বলেনি যে তার সেখান থেকে হেঁটে ফিরে আসার শক্তি ছিল না তার। বাইরে বেরিয়ে চিৎকার করে কেঁদেছিল সে।

“আচ্ছা, সে তোমাকে ঠিক কী কী বলল?”
মনে হচ্ছিল সেই ভয়ঙ্কর মহিলা যেন জুলিয়েটের মাথার উপরে দাঁড়িয়ে আছে, জুলিয়েট কী বলে দেখার জন্য। শক্ত করে আটকানো তার ঠোঁটের উপরে একটা করুণার হাসি লেগে আছে আর মজা করে তালে তালে সে তার মাথা নাড়াচ্ছে।

পরের বছরটা জুড়ে যখন তখন জুলিয়েটের কাছে বিভিন্ন ফোন আসতে লাগল, যখন তখন, যেসব মানুষ পেনিলোপের প্রিয় ছিল তাদের কাছ থেকে। তাদের প্রশ্নের বিপরীতে তার উত্তরটা ছিল বরাবরই এক। পেনিলোপ এক বছরের জন্য ছুটি নিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখন কোথায় আছে বলা যায় না, আর তাই জুলিয়েটের কোনো উপায়ও নেই তার সাথে যোগাযোগ করার, এমন কোনো ঠিকানাও নেই তার কাছে যে সে তাদের দিতে পারে। তবে পেনিলোপের যারা খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল তাদের কারও কাছ থেকে কোনো ফোন পাওয়া গেল না। এর মানে দাঁড়াচ্ছে যারা তার কাছের লোক তারা জানে সে কোথায় ছিল এবং কোথায় আছে। অথবা এমনও হতে পারে তারা নিজেরাও এখন শহরের বাইরে বা দেশের বাইরে চলে গেছে, অন্য কোনো বিভাগে চাকরি নিয়ে চলে যেতে পারে, নতুন কোনো জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। তারা হয়ত এতই ব্যস্ততা আর চাপের মধ্যে আছে যে পুরনো ঘনিষ্ট বন্ধুর কথা মনে করার সময়ই নেই। (এই বয়সে পুরনো বন্ধু মানে এমন একজন মানুষ যাকে কেউ অন্তত ছয়মাস দেখেনি।)

জুলিয়েট বাসায় ফিরলেই প্রথমে টেলিফোনের দিকে চোখ দেয়, অ্যানসারিং মেশিনের আলোটা জ্বলছে নিবছে—আগে এই বিষয়টা সে এড়িয়েই যেত, মনে করত কেউ না কেউ তার কাজকর্ম নিয়ে কোনো মতামত দিয়ে রেখেছে, অথবা সমালোচনা। আজকাল ফোন নিয়ে ছেলেমানুষি করে, দেখে দরজা থেকে কয় পা এগুলে ফোনটা পাওয়া যায়, কী করে সে সেটা কানে তুলে নেয়, কী করে একটা নিঃশ্বাস টেনে কথা বলা শুরু করে। এসবকিছু তার নিজস্ব স্টাইল।

কোনো কিছুতেই কোনো কাজ হয়নি। কিছুদিনের মধ্যে মনে হলো এই পৃথিবীতে পেনিলোপকে চিনত এমন সব লোকেরা উবে গেছে। কিছু ছেলেবন্ধু ছিল যাদের সে ছেড়ে দিয়েছে, কেউ ছিল যে পেনিলোপকে ছেড়ে দিয়েছে, যেসব মেয়েদের সাথে খোশগল্প করত তারাও তাকে ভুলে আছে। মেয়েদের প্রাইভেট একটা বের্ডিং স্কুলে পড়ত পেনিলোপ—নাম টরেন্স হাউজ—যেহেতু সেটা পাবলিক স্কুল ছিল না তাই তার বেশিরভাগ ঘনিষ্ট বন্ধুরাই ছিল অন্য এলাকা থেকে আসা—এমনকী কলেজেও যারা তার বন্ধু ছিল—এসেছে শহরের বাইরে থেকে। কেউ এসেছে আলাস্কা থেকে, কেউ প্রিন্স জর্জ অথবা পেরু থেকে।

ক্রিস্টমাসের সময়ও কোনো খবর এল না। কিন্তু জুনে আরেকটি কার্ড এল, আগেরটার মতোই প্রায়, ভেতরে কোনো লেখা নেই। কার্ডটা খাম থেকে খোলার আগে জুলিয়েট এক গ্লাস ওয়াইন খেয়েছিল, খুলে দেখার সাথে সাথেই ছুঁড়ে ফেলে দিল। প্রথমে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল, তারপর ভয়ার্তের মতো কাঁপা শুরু করল, কিন্তু দ্রুতই সেসব থেকে বেরিয়ে এল, বাড়িময় হাঁটা শুরু করল, এক হাতের তালুতে আরেক হাতের মুঠো দিয়ে আঘাত করতে লাগল। রাগটা পুরোটাই গিয়ে পড়ে সেই সর্বেসর্বা মায়ের উপরে, তবে তার চেহারাটা কেন যেন অনেকটা ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু জুলিয়েট এটা বোঝে যে তার কাছে যাওয়াটাই একমাত্র উপায় তার। শোবার ঘর থেকে পেনিলোপের সমস্ত ছবি জুলিয়েট সরিয়ে ফেলেছে, এমনকী হোয়েল বে ছেড়ে আসার আগে পেনিলোপ যে ক্রেয়ন দিয়ে কিছু ছবি এঁকেছিল সেগুলোও সরিয়েছে জুলিয়েট, পেনিলোপের বই, এক কাপ কফি বানানোর যে কফি মেকারটি পেনিলোপ গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করে প্রথম আয় করা টাকা দিয়ে মাকে কিনে দিয়েছিল, সেটিও। এছাড়া ওই ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে রাখার মতো বেমানান কিছু উপহারও সরিয়ে ফেলল জুলিয়েট, যেমন ফ্রিজে আটকে রাখা একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের ফ্যান, চাবি দিয়ে চালানো যায় এমন একটা ট্রাক্টর, বাথরুমের জানালায় ঝোলানো কাঁচের পুঁতি দিয়ে তৈরি একটা পর্দা। পেনিলোপের শোবার ঘরের দরজাটা সবসময় বন্ধ যেন তার সামনে দিয়ে সহজে চলাচল করা যায়।

সেই অ্যাপার্টমেন্টটা ছাড়ার আগে জুলিয়েট অনেকবার ভাবল, নতুন জায়গাটাতে চলে যাবার পক্ষে নিজেকে নানান ভালো ভালো যুক্তি দিতে লাগল। তবে সে ক্রিস্টাকে বারবার বলছিল যে এই জায়গা ছেড়ে সে চলে যেতে পারে না কারণ এটাই একমাত্র ঠিকানা যা পেনিলোপের কাছে আছে। তিনমাসের চিঠিপত্র জমলে তবে হয়তো তাকে দিয়ে আসা হবে, তাই তার মেয়ে যদি তাকে খোঁজে তো কোথায় খুঁজবে?

“সে তো তোমার কাজের জায়গা থেকেই তোমাকে খুঁজে পেতে পারে।” ক্রিস্টা বলল।

“কে জানে আমি সেখানে কতদিন কাজ করব?” জুলিয়েট বলল। “সে হয়তো এমন কোথাও আছে যেখানে তারা বাইরের কারও সাথে যোগাযোগ করতে দেয় না। হয়তো কোনো গুরুর সাথে যে সব মেয়েদের নিয়ে একসাথে ঘুমায় আর সময়মতো রাস্তায় পাঠায় তাদের, ভিক্ষে করতে। আমি যদি তাকে রোববার করে চার্চে পাঠাতাম আর সে ধর্মের সাধারণ ব্যাপারগুলো জানত তবে এটা নিশ্চয়ই হতো না। আমার উচিত ছিল সেটা করা। আমার নিশ্চয়ই উচিত ছিল। আমি ধর্মের বিষয়টা থেকে তাকে সরিয়ে রেখেছিলাম। তার ভেতরে আধ্যাত্মিক চিন্তা জাগতে দেইনি। সর্বেসর্বা মা এমনটাই বলেছিলেন।”

পেনিলোপের যখন তের বছর হয়েছে কি হয়নি, সে বৃটিশ কোলাম্বিয়ার কুটেনি পর্বতে ক্যাম্পিং করতে গিয়েছিল। গিয়ছেল টরেন্স হাউজের এক বন্ধু আর তার পরিবারের সাথে। জুলিয়েট খুশিই হয়েছিল। পেনিলোপ টরেন্স হাউজে ছিল মাত্র এক বছরের জন্য (অন্যদের চেয়ে কম বেতনে পড়তে পারত কারণ তার মা আগে একবার সেই স্কুলে পড়িয়েছিল কিছুদিন), আর জুলিয়েটও খুশি হয়েছিল যে সে এত তাড়াতাড়ি সেখানে একজন ঘনিষ্ট বন্ধু পেয়ে গেছে যার পরিবারও পেনিলোপকে গ্রহণ করেছে হাসিমুখে। জুলিয়েট এজন্যেও খুশি হয়েছিল যে পেনিলোপ ক্যাম্পে যেতে পারছে, এত ছোট বয়সেই, জুলিয়েট ছোট থাকতে যে সুযোগ কখনও পায়নি। বিষয়টা এমন ছিল না যে সে কোথাও যেতে চায়নি, সে ততদিনে বইয়ের পোকা হয়ে গিয়েছিল—তবে পেনিলোপ যে আর সবার মতো সাধারণ একটা মেয়ে হয়ে উঠছে এটা দেখে জুলিয়েট খুব খুশি হয়েছিল।

এরিক ছিল সেই বিষয়টার একেবারে বিপক্ষে। সে মনে করত যে পেনিলোপ তখনও খুব ছোট। সে চাইত না পেনিলোপ এমন কারও সাথে কোথাও ছুটি কাটাক যাদের সে খুব কম জানে। আর তখন সে বোর্ডিং স্কুলে থাকত যখন কিনা তার সাথে বাবা-মায়ের কমই দেখা হতো। তাই ছুটির সময়টাকে এখানে ওখানে বেড়িয়ে নষ্ট করার কী দরকার? জুলিয়েটের কাছে অবশ্য ছিল অন্য একটা কারণ—সে চাইত পেনিলোপ তার গ্রীষ্মকালীন ছুটির প্রথম দুটো সপ্তাহে এখানে ওখানে বেড়াক, কারণ তার এবং এরিকের মধ্যে সম্পর্কটা স্বাভাবিক যাচ্ছিল না। সে চাচ্ছিল বিষয়গুলোর একটা সমাধান হোক, কিন্তু হয়নি। বাচ্চা আছে বলে বেঠিক সবকিছুকে ঠিক বলে ভাবতে চাচ্ছিল না জুলিয়েট। অন্যদিকে এরিকও হয়তোবা এটাই চাইত যে তাদের সমস্যা শেষ হোক, যত বিরক্তি সব হাওয়া হয়ে যাক। এরিকের মতে মৌনতাই সব সমস্যার সমাধান। যতদিন হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে ততদিন ভালোবাসা আছে এটা ভেবে নিলেই চলে—বলতে গেলে তাই করা হয়েছিল। এরিক সুন্দরভাবেই সেটা করেছিল।

জুলিয়েট দেখেছিল, হ্যাঁ, এরিক সেটাই করছিল। পেনিলোপ বাড়িতে থাকলে যেটা হতো তাদের দুজনকেই ভদ্র ব্যবহার করতে হতো। আর জুলিয়েট তার সামনে কখনই খারাপ ভাবে কথা বলেনি। একমাত্র সন্তান বলে তার মতে প্রাধান্য দিয়েছে। এরিকের মত অনুযায়ী সব কথাও বলেছে। তাই পেনিলোপ ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য একে তো তাদের মধ্যে তিক্ততা বেড়ে গেল আর বাবা মেয়েকে কাছে পায়নি সে দোষটাও গিয়ে পড়ল জুলিয়েটের উপরে। তাদের ঝগড়ার কারণটা অবশ্য ছিল খুবই পুরনো। গত বসন্তে তাদের বহুদিনের প্রতিবেশী এইলো, যার কিনা এরিকের আগের বউয়ের ব্যাপারে বিশেষ টান ছিল আর জুলিয়েটের ব্যাপারে ছিল কিছু ভ্রান্ত ধারণা, তার কাছ থেকেই জুলিয়েট জানতে পেরেছে যে এরিক ক্রিস্টার সাথে থেকেছে। ক্রিস্টা তার বহুদিনের ঘনিষ্ট বান্ধবী, কিন্তু তার বান্ধবী হবার আগে সে এরিকের বান্ধবী ছিল, তার রক্ষিতাও বলা যায় (যদিও এখন আর কেউ সেটা নিয়ে কথা বলে না)। জুলিয়েটকে এরিক যখন তার সাথে থাকতে বলেছিল তার অনেক আগেই ক্রিস্টার সাথে তার সম্পর্কটা শেষ হয়ে গিয়েছে। ক্রিস্টার ব্যাপারে জুলিয়েট সব জানত আর এরিকের জীবনে সে আসার আগে কী হয়েছিল না হয়েছিল, এ নিয়ে জুলিয়েটের তেমন মাথাব্যথাও ছিল না। তাই সে মাথা ঘামায়ওনি। কিন্তু যেটা নিয়ে সে মাথা ঘামিয়েছে, যেটা নিয়ে তার অভিযোগ তা ঘটেছে সে এরিকের জীবনে আসার পরে। এই ঘটনা তার মন ভেঙে দিয়েছে। (তবে এরিক অবশ্য যুক্তি দেয় যে ঘটনাটি তো অনেক আগের।) সেটা ঘটেছিল পেনিলোপের যখন প্রায় এক বছর বয়স, জুলিয়েট তাকে নিয়ে অন্টারিও গিয়েছিল। জুলিয়েট গিয়েছিল তার মা-বাবাকে দেখতে। দেখতে—যেভাবে এখন সে সবসময় সেই সময়টা উল্লেখ করে—তার মৃত্যুপথযাত্রী মাকে দেখতে। সে যখন বাড়ির বাইরে ছিল প্রতিটি মুহূর্তে এরিককে অনুভব করেছে (এখনও সে সেটা মনে করতে পারে), কিন্তু তখন এরিক যথারীতি তার নিজস্ব অভ্যাসে ফেরত চলে গিয়েছিল। এরিক প্রথম সেটা স্বীকার করেছিল একদিন মদ খেতে খেতে। কিন্তু পরে বারবার জানতে চাওয়ায়, কখনও মদের নেশায় বা কখনও এমনিতেই এরিক বলতে বাধ্য হয়েছে যে সে সম্ভবত ক্রিস্টার সাথে থেকেছে, প্রায়ই থাকত তখন।
সম্ভবত? সে কি মনে করতে পারছিল না? সেটা কি এতই বেশিবার যে মনেই নেই?
শেষে সে মনে করতে পেরেছিল।

ক্রিস্টা এসেছিল জুলিয়েটকে সান্ত্বনা দিতে, নিশ্চিত করতে যে বিষয়টা তেমন গুরুতর কিছু নয়। (পূর্বপরিকল্পনামতোও না আবার এরিকের দিক থেকে খুব ইচ্ছেও ছিল না।) জুলিয়েট তাকে চলে যেতে বলেছিল আর মানাও করেছিল যেন কখনও না আসে। ক্রিস্টা তখন ভাবল নিজের ভাইকে দেখার ছলে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যাওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। ক্রিস্টার প্রতি জুলিয়েটের রাগটা আসলে ওই পরিস্থিতির জন্য জরুরি একটা বিষয় ছিল মাত্র। কারণ একটা ফাঁকা জায়গায় একজন পুরনো প্রেমিকার সাথে কী হতে পারে সে সম্বন্ধে তার ভালো ধারণা আছে। এরিকও কিছু খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করেছিল, বলেছিল নতুন কোনো তরুণী মেয়ের সাথে তো ভিড়ে যায়নি সে। তবে এরিকের প্রতি জুলিয়েটের রাগ এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে এরিক সে দোষ থেকে নিজেকে বাঁচানোর কোনো রাস্তা পাচ্ছিল না। জুলিয়েটের বক্তব্য ছিল যে এরিক তাকে তখন ভালোবাসে না, কখনও ভালোবাসেনি, কেবল তার সাথে অভিনয় করেছে, আর গোপনে ভালোবেসেছে কেবল ক্রিস্টাকে। এরিক জুলিয়েটকে এইলোর মতো মানুষের সামনে হাসির পাত্র বানিয়ে ছেড়েছে যে কিনা বরাবরই তাকে অপছন্দ করত। সে তাকে ভালোবাসার প্রলোভন দেখিয়ে বাড়িতে থাকতে বাধ্য করেছে, নিজের প্রতি তার ভালোবাসাকে নিয়ে খেলেছে, জুলিয়েটের সাথে একটা মিথ্যের উপরে বসবাস করেছে। কেবল যৌনতা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাপার নয়, অথবা সেটা যতই উত্তেজক হোক না কেন জুলিয়েট সেটাকে যেভাবে দেখছে সেটা আসলে তা নয়, শারীরিক মিলন তো যে কোনো দুটো মানুষে যে কোনো সময়ে হতে পারে।

জুলিয়েট জানত, এরিকের শেষের দিকের কথাগুলোতে কিছুটা হলেও সত্যতা আছে। কিন্তু সেই সত্য সামান্য হলেও তার চারদিকের সাজানো জীবনটাকে দুমড়ে-মুচড়ে একাকার করার জন্য যথেষ্ট। এত অল্প ব্যাপারে জুলিয়েটের অবস্থা এমন লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবার কথা নয়। কিন্তু হয়েছে। আর এরিকও পারেনি—তার যাবতীয় সততা দিয়েও জুলিয়েটকে বোঝাতে পারেনি। জুলিয়েট অভিযোগ করাতে, চেঁচামেচি আর কান্নাকাটি করাতেও সে অবাক হয়নি। তবে বারো বছর আগের ঘটনা নিয়ে এখন টানাহেঁচড়া করা, এই ব্যাপারটি সে ঠিক বুঝতে পারেনি। কিছু কিছু সময়ে এরিকের মনে হতো জুলিয়েট কেবল তাকে লজ্জা দিতে চায়, যতটা সম্ভব। আর এভাবেই এক সময় এরিকের মনে অপরাধবোধও জেগে উঠল, মনে হলো সে-ই তো জুলিয়েটকে কষ্ট দিয়েছে। এই অপরাধবোধে এরিক আরও বেশি ঝুঁকে পড়ল জুলিয়েটের দিকে, পাগলের মতো আদর করত তাকে। আর প্রতিবারই ভাবত এটাই শেষ, সব অশান্তি শেষ হলো। কিন্তু প্রতিবারই সেটা ছিল ভুল।


এরিকের লাশ পাওয়া গেল তৃতীয় দিনে। জুলিয়েটকে দেখতে দেওয়া হলো না। কিছু একটা তার মৃতদেহটা পেয়ে গিয়েছিল, সবাই এমনটাই বলাবলি করছিল (হয়তোবা কোনো জংলী পশু), মৃতদেহটা যখন স্রোতের টানে তীরে এসে পড়ে ছিল


বিছানায় শুয়ে শুয়ে জুলিয়েট তাকে পেপি আর তার বউয়ের কথা শোনাত, একইরকম পরিস্থিতি ছিল তাদের, তারাও এরকম এক এক সময় যৌনাবেগে পাগল হয়ে যেত। (প্রাচীন সাহিত্য পড়া মোটামুটি বাদ দিয়ে দেয়ার পরেও জুলিয়েট কিছু না কিছু পড়েই। আর আজকাল সে যা কিছু পড়ে সবই এরকম প্রাপ্তবয়স্কদের অপ্রাপ্তি সংক্রান্ত।) পেপি বলেছিল, এত উত্তেজিত তারা আগে কখনও হয়নি আর এত ঘনঘনও না, যদিও সে জানত তার বউ তাকে ঘুমের মধ্যে খুন করার কথা ভাবছে। জুলিয়েট এই কথাগুলো বলত হেসে হেসে, কিন্তু আধা ঘণ্টা পরেই যখন চিংড়ির ঘের দেখাশোনা করার জন্য এরিক নৌকায় করে রওনা দেবে, সে তাকে ছেড়ে দেবার মতো করে গম্ভীর মুখে একটা চুমু খেত যেন মাঝসমুদ্রে বৃষ্টির মধ্যে এরিক কোনো মেয়ের সাথে মিলিত হতে যাচ্ছে।

তখন আসলে বৃষ্টির চেয়েও বেশি দুর্যোগ ছিল। এরিক বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে খুব বেশি অঝোর ধারায় ঝরেনি কিন্তু সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ উথাল পাতাল বাতাস আরম্ভ হয়ে গেল, দক্ষিণ পূর্ব দিক থেকে হু হু করে বাতাস আসতে লাগল, পুরো এলাকায় প্লাবন বয়ে গেল। রাত পর্যন্ত তেমনই চলতে লাগল, বলতে গেলে রাত এগারোটার আগে থামেইনি। ততক্ষণে ক্যাম্পবেলের একটা নৌকা হারিয়ে গেল, তাতে ছিল তিন জন বয়স্ক মানুষ আর দুজন শিশু। তার সাথে দুটো মাছ ধরার নৌকাও গায়েব হয়ে গেল—একটিতে দুজন মানুষ আরেকটিতে কেবল একজন—এরিক।

পরের সকালটা ছিল শান্ত আর রোদেলা—পর্বতগুলো, সমুদ্রের পানি, বালুময় তীর, সবকিছুতে আলো ঠিকরে জ্বলজ্বল করছিল। অবশ্য এটা সম্ভব যে নৌকার কোনো মানুষই একেবারে হারিয়ে যায়নি। তারা নিশ্চয়ই কোনো না কোনো তীরে, কোনো দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছে। বেড়ানোর নৌকায় যে পরিবারটি ছিল তারা এলাকায় বাইরে থেকে বেড়াতে আসা মানুষ। কেবল তাদের কথা বলা যায় না। তবে মাছ ধরার নৌকার লোকেরা অবশ্যই জানে কী করে নিজেদের বাঁচাতে হয়। সুতরাং সকাল সকাল কিছু নৌকা বেরিয়ে পড়ল তাদের খোঁজে। ডুবে যাওয়া বাচ্চাগুলোকে খুঁজে পাওয়া গেল সবচেয়ে আগে, তাদের গায়ে লাইফ জ্যাকেট আর দিনের শেষে তাদের বাবা-মায়ের মৃত শরীরগুলোও মিলে গেল। সাথে তাদের যে দাদা বা নানা কেউ ছিল তাকে পরের দিন পর্যন্ত পাওয়া গেল না। মাছ ধরার যে নৌকায় দুজন মানুষ ছিল তাদের আর কখনও পাওয়া যায়নি, যদিও তাদের নৌকার কিছু ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেল রিফিউজি কোভের কাছে।

এরিকের লাশ পাওয়া গেল তৃতীয় দিনে। জুলিয়েটকে দেখতে দেওয়া হলো না। কিছু একটা তার মৃতদেহটা পেয়ে গিয়েছিল, সবাই এমনটাই বলাবলি করছিল (হয়তোবা কোনো জংলী পশু), মৃতদেহটা যখন স্রোতের টানে তীরে এসে পড়ে ছিল। হয়তো এজন্যেই—যেহেতু মৃতদেহটি দেখার কোনো প্রশ্ন ছিল না, তাই সেটাকে সেখান থেকে আনাও হয়নি। লাশটি সমুদ্রের তীরেই পুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত হলো, এরিকের পুরনো বন্ধুরা আর অন্যান্য মাছ ধরার লোকেরা মিলে এই সিদ্ধান্ত নিলো। জুলিয়েট তাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি। মৃত্যুর একটা সার্টিফিকেট অবশ্য পাওয়া গেল। হোয়েল বে-তে সপ্তাহে একদিন করে আসেন যে ডাক্তার তিনি সার্টিফিকেট বানিয়ে এইলোর হাতে দিয়ে দিলেন। এইলো সেখানকার পার্টটাইম নার্স হিসেবে কাজ করত।

সেখানে চারদিকে অনেক কাঠ পড়ে ছিল, সমুদ্রের স্রোতে ভেসে আসা লবনাবৃত অসংখ্য শুকনো কাঠের টুকরো, যেগুলো দিয়ে বেশ জোরেসোরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া সহজ। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সবকিছুর আয়োজন করে ফেলা গেল। খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল—কী করে যেন অত অল্প সময়ে মহিলারা খাবারদাবার নিয়ে সেখানে উপস্থিত হতে লাগল। এইলোই সবকিছুর দায়িত্ব নিলো—তার স্ক্যান্ডিনেভিয়ান রক্ত, শক্ত সমর্থ শরীর, ঝুলে থাকা ধবধবে সাদা চুল, এসবকিছু মিলে সমুদ্রের তীরের বিধবার ভূমিকায় সে সহজেই মানিয়ে গেল। কাঠের স্তুপের পাশে বাচ্চারা খেলাধুলা করতে লাগল, ভেতরের থলেমতো জিনিসটার মধ্যে আছে এরিকের লাশ। কিছুটা নাস্তিক মতের এই মৃত সৎকারের কাজে যোগ দিতে এলাকার বহু মানুষ কফি, বিয়ার আর নানারকম পানীয় নিয়ে চলে এল। চার্চ থেকেও কিছু মানুষ এল। কিছুক্ষণের জন্য সমুদ্রের তীরের ওই জায়গাটা গাড়ি, ট্যাক্সি আর ট্রাকে ভরে গেল।

তখন প্রশ্ন উঠল কে ব্যাপারটা পরিচালনা করবে, কে চিতায় আগুন দেবে? তারা জুলিয়েটকে জিজ্ঞাসা করল, সে কি এটা করতে চায়? আর জুলিয়েট কিছুটা ব্যস্ততা দেখিয়ে, হাতের কফির মগ সামলাতে সামলাতে বলল, তারা কেন এ প্রশ্ন তাকে করছে, বিধবা হিসেবে তার নিজেকেও তো ওই আগুনে ফেলে দেবার কথা! এই কথাগুলো বলার সময়ে সে বস্তুত হাসছিল, আর যারা তাকে জিজ্ঞাসা করতে এসেছিল তারা ছিটকে চলে গেল, ভাবল সে আসলে হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত। এরিকের সাথে মাছ ধরার নৌকায় যে লোকটি বরাবর সঙ্গী হতো সে চিতায় আগুন দেবার ব্যাপারে সম্মত হলো, তবে বলল যে সে কোনো কথাবার্তা বলতে পারবে না। কেউ কেউ মনে করল এই শেষ কাজটি করার জন্য তিনি উপযুক্তও নন। অবশেষে এইলোর স্বামীকে বলা হলো কিছু বলতে। তিনি রাজি হলেন, নিজেও কখনও একটা নৌকায় আগুন লেগে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলেন বলে একই রকম দুর্ঘটনায় পড়া সহোদর হিসেবে এরিককে বর্ণনা করে তিনি তার বক্তৃতা শেষ করলেন। আগুন লাগানোর সাথে সাথে উপস্থিত লোকজনেরা হায় হায় করতে লাগল, কেউ কেউ অন্য কী করা যেত এই নিয়ে গবেষণা শুরু করল, সেখান থেকে বেশ একটা শোরগোলের মতো আসতে লাগল। কেবল আগুন নিয়ে বাচ্চাদের খেলাধূলা বন্ধ করার জন্য একজন যখন চিৎকার করে তাদের মানা করল তখন সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। সেটা ঠিক তখন, যখন আগুন এরিকের শরীর ছুঁয়ে ফেলল প্রায়, হয়তো চর্বি, হয়তো তার যকৃত বা অগ্নাশয়, হয়তো হৃদপিণ্ড পুড়ছিল তখন, পটপট আওয়াজ হচ্ছিল, সবাই নিঃশব্দ হওয়াতে বিষ্ফোরণের মতো সে শব্দগুলো প্রকট হলো। বাচ্চারা সেখান থেকে নড়তেই চাচ্ছিল না। মায়েরা টানাহেঁচড়া করে নিয়ে যেতে লাগল। পরে কেবল বয়স্ক লোকেরা থাকল সেখানে, ভাবতে লাগল কতটা অনৈতিক হলো কাজটা।

জুলিয়েট সেখানেই থেকে গেল, চোখ খুলে বসে থাকল গাছের গুঁড়ির উপরে, আগুনের তাপের দিকে মুখ দিয়ে রাখল। সে যে কিছু ভাবছিল না, তা নয়। ভাবছিল আগুনের মধ্যে হতে পারে যে কেউ আছে, কে সে?ট্রেলনি কি?আগুন থেকে শেলির হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে নিয়ে আসছে? সেই হৃদপিণ্ডটা, যার একটা লম্বা ইতিহাস আছে, অনেক গুরুত্ব আছে তার। এটা সত্যিই বিস্ময়কর যে সেই যুগে কী করে শরীরের ওই অঙ্গটিকে এত গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়েছিল, কী করে ভাবা হয়েছিল সেখানেই থাকে সমস্ত ভালোবাসা আর সাহস। কিন্তু ওটা আসলে শুধুই রক্তমাংস, পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর সাথে আর এরিকের কোনো সম্পর্ক নেই।

সেখানে কী হচ্ছে পেনিলোপ তার কিছুই জানত না। ভ্যাঙ্কুভার পেপারে একটা ছোট্ট রিপোর্ট বেরিয়েছিল, অবশ্য সমুদ্রের তীরে শবদেহ পোড়ানো নিয়ে নয়, কেবল সমুদ্রে মাছ ধরার নৌকা ডুবে যাওয়া নিয়ে—তবে কুটেনে পর্বতের লোকালয়বিহীন এলাকায় তার হাতে কোনো পত্রিকা গিয়ে পৌঁছেনি। সে যখন ভ্যাঙ্কুভারে ফিরে এসেছিল, তার বন্ধু হিথারের বাসা থেকে ফোন করেছিল বাড়িতে। ক্রিস্টা সমুদ্রের ধারের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিল বেশ দেরিতে, সেখান থেকে জুলিয়েটের সাথে ফিরে এসেছিল বাড়িতে আর তাকে সাহায্য করছিল যতটুকু পারা যায়।  ফোন ধরে ক্রিস্টা পেনিলোপকে বলল যে জুলিয়েট বাসায় নেই—সেটা ছিল একটা মিথ্যে—আর তারপর হিথারের মায়ের সাথে কথা বলতে চাইল। তাকে বুঝিয়ে বলল যে ঘটনা কী হয়েছে, বলল যে সে জুলিয়েটকে নিয়ে তাদের বাড়িতে আসবে আর জুলিয়েট নিজের মুখেই পেনিলোপকে সব জানাবে।

ক্রিস্টা জুলিয়েটকে নিয়ে পেনিলোপ যে বাড়িতে ছিল সেখানে এল, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল, জুলিয়েট একাই ভেতরে গেল। হিথারের মা তাকে বাইরের ঘরে বসতে দিল যেখানে পেনিলোপ অপেক্ষা করছিল। পেনিলোপ ঘটনা শুনে ভড়কে গেল, তারপর—জুলিয়েট যেন কর্তব্যবশতই তার ঘাড়ের উপরে হাত রাখল আলতো করে—সেই ছোঁয়াটা কেন যেন বিব্রতকর। আলোকিত ঘরটির সাদা, সবুজ আর কমলা রঙগুলোতে, জানালার বাইরে হিথারের ভাই বাস্কেটবলের ঝুড়িতে বলটা ঢোকানোর চেষ্টা করছে, সব আনন্দময় দৃশ্যের মধ্যেও খবরটা যেন থমকে রইল। শবদেহ পোড়ানোর কথা অবশ্য জুলিয়েট উল্লেখ করেনি। ওই পরিপাটি বাড়ি আর তার চারদিকের এলাকার কথা ভাবলে ওখানে বসে ওই কথাটা বলাটা নিতান্তই অসভ্যতা হতো। তাই সেখানে জুলিয়েটের ভূমিকাটা কী হবে সেটা ছিল একবারে পরিকল্পনামাফিক, একটা খেলার মতো।

হিথারের মা দরজায় ছোট্ট টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকলেন, তার হাতে বরফশীতল চায়ের গ্লাস। পেনিলোপ তার গ্লাসটা ঢকঢক করে শেষ করে হলরুমে হিথারের কাছে চলে গেল। হিথারের মা তখন জুলিয়েটের সাথে কথা বলছিলেন। কিছু বাস্তব সমস্যা নিয়ে ওরকম সময়ে হঠাৎ আলোচনা শুরু করে দেয়ার জন্য তিনি প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিলেন। তিনি বললেন যে কিছুদিনের মধ্যেই হিথারের বাবাকে নিয়ে পূর্বদিকের সমুদ্রতীরে বেড়াতে যাচ্ছেন । এবারে তারা যাবে এক মাসের জন্য আর হিথারকেও যে সঙ্গে নিয়ে যাবে সেটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। (ছেলেরা চলে যাবে ক্যাম্পে।) কিন্তু এখন হিথার বলছে যে সে যেতে চায় না, সে হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করছে তাকে এ বাড়িতে পেনিলোপের সাথে রেখে যাবার জন্য। এখন একটা চৌদ্দ আরেকটা তের বছর বয়সের মেয়েকে কি একলা বাড়িতে রেখে এতদিনের জন্য যাওয়া যায়? জুলিয়েটের জীবনে যেহেতু এত বড় একটা বিপর্যয় ঘটে গেল সে যদি সেসব ভুলে থাকার জন্য কিছুদিন অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে চায় তবে এ বাড়িতে এসে থাকলে খুব ভালো হয়। সুতরাং কদিনের মধ্যেই জুলিয়েটের দিনগুলো কাটতে লাগল সেই বিশাল, নিখুঁত বাসাটিতে, পুরোপুরি অন্য পৃথিবী, বাসার প্রতিটি কোণ ভেবেচিন্তে সাজানো। যেখানে যা দরকার সব তৈরি আছে—তবে তার ভাষায় সেটা নিতান্তই বিলাসিতা। বাঁকানো রাস্তার ধারে সারি সারি একই রকমের বাসা সেখানে, সামনে পেছনে ফুলে ফুলে ঢাকা। এমনকী সেই মাসটির আবহাওয়াও এত ভালো ছিল—হালকা গরম, বাতাসে আর আলোয় ভরা। হিথার আর পেনিলোপ সাঁতার কাটে, পেছনের কোর্টে ব্যাটমিন্টন খেলে, সিনেমায় যায়, বিস্কিট বানায়, তারা চিৎকার করে বাড়িময় ঘুরে বেড়ায়, খায় আবার একসাথে ব্যায়াম করে, জোরে জোরে গান বাজিয়ে বাড়িটাকে কাঁপাতে থাকে। গানগুলো এমন যার কথা জুলিয়েটের কাছে বেশ অসহ্য মনে হয়, কখনও আবার অন্য মেয়ে বন্ধুদেরও দাওয়াত দেয়, কোনো ছেলেবন্ধুকে ডাকে না বটে তবে তাদের ব্যাপারে দীর্ঘসময় ধরে আলাপ করতে থাকে। বাড়ির সামনে দিয়ে কেউ গেলে বা পাশের বাসার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনো ছেলেকে নিয়ে হাসাহাসি করে। একদিন জুলিয়েট শোনে পেনিলোপ বেড়াতে আসা একটি মেয়েকে বলছে, “ব্যাপারটা হলো আমি আসলে তাকে সেভাবে চিনতামই না, সত্যি।”
সে তার বাবার ব্যাপারে কথা বলছিল।
কী অদ্ভুত!
পেনিলোপ কখনও নৌকায় করে সমুদ্রে বেরিয়ে পড়তে ভয় পেত না, যেমন পেত জুলিয়েট, বিশেষ করে পানিতে বড় ঢেউ উঠলে। বাবার সাথে নৌকায় যেতে সে মাঝে মাঝে জেদ করত, কখনও কখনও সফলও হতো। আর এরিকের পেছনে পেছনে রওনা দিলে সে তার কমলা রঙের লাইফ জ্যাকেট, সাঁতারের সময় পরার মতো সামনে যা পায় আর দরকারী অন্য জিনিস গুছিয়ে নিয়ে যেত। বাবার সাথে থেকে থেকে সে চিংড়ির জন্য ফাঁদ পাতা, ওঠানো সব ভালোভাবেই রপ্ত করেছিল। একটা বয়সে তো এমন হলো—সম্ভবত সে যখন আট থেকে এগারো বছরের মধ্যে, বলত যে সে বড় হয়ে মাছ ধরার কাজেই যোগ দেবে। এরিক তাকে উৎসাহ দিত, বলত, আজকাল মেয়েরাও এসব কাজ করে। জুলিয়েটও মনে করত পেনিলোপ আসলে ওদিকেই যাবে যতদিন না পর্যন্ত সে পড়াশোনা নিয়ে খুব মেতে উঠেছে। কিন্তু এরিক পেনিলোপের আড়ালে বলত, কোনো মতে পেনিলোপের মাথা থেকে এসব চলে গেলেই বাঁচা যায়, সে বলত তার মতো জীবন নিজের মেয়ের জন্য চায় না। নিজের কাজের কথা বলতে গেলে সে বলত, খুব পরিশ্রমের কাজ আর অনিশ্চয়তাও খুব বেশি, কিন্তু সেই কাজটা সে নিজে করতে পারছে বলে বেশ গর্ববোধ করত। আর এখন পেনিলোপ বাবার কথা ভাবতেই রাজি না। সেই পেনিলোপ, যে কিনা কদিন হলো নিজের নখগুলোতে বেগুনি রঙ দিয়ে রাখে আর ঘাড়ের পাশে একটা ট্যাটু আঁকিয়ে আনে প্রায়ই। যে বাবা তার জীবনটা বানিয়ে দিলো নিজের হাতে, আজ তাকেই সে ভুলতে পেরেছে অনায়াসে।

কিন্তু জুলিয়েটের হঠাৎ মনে হয় সে-ও যেন একই কাজ করছে। অবশ্য সে নিজের জন্য কাজ আর থাকার উপযুক্ত  জায়গা খোঁজা নিয়ে তখন খুব ব্যস্ত ছিল। হোয়েল বে-র বাড়িটা এখন সে বিক্রি করার চেষ্টা করছে—সেখানে একা একা থাকার কথা সে এখন আর কল্পনাও করতে পারে না। এরিকের ট্রাকটা সে প্রথমেই বিক্রি করে দিয়েছে, তার কাজের যন্ত্রপাতিগুলো একেওকে দিয়ে দিয়েছে, কিছু মাছ ধরার ফাঁদ আর নৌকাটা, পরে যা যা পাওয়া গিয়েছিল, সব। এরিকের এক পাতানো ছেলে এসে বাড়ির কুকুরটাকে নিয়ে গেছে। জুলিয়েট কলেজ লাইব্রেরি আর পাবলিক লাইব্রেরিতে কাজের জন্য আবেদন করেছিল, সে জানত একটা না হলে আরেকটা পাবেই। শহরের আশেপাশে অ্যাপার্টমেন্ট খোঁজা শুরু করে দিল। শহুরে জীবনের পরিচ্ছন্নতা, ছিমছাম পরিবেশ আর দৈনন্দিন কাজকর্মে জরুরি যাবতীয় জিনিসের সহজলভ্যতা তাকে বিস্মিত করল। বেশ কিছু মানুষ সেখানে কেবল ঘরে বসে কাজ করে আর কারও কারও কাজ ঘরের বাইরে। সেখানে আবহাওয়া তোমার মনের অবস্থার উপরে প্রভাব ফেলতে পারে তবে কাজের উপরে তেমন প্রভাব ফেলে না। মানুষের অভ্যাস প্রতিদিন বদলায়, স্যালমন বা চিংড়ি মাছ সেখানে মোড়কে মোড়ানো পাওয়া যায়, কোত্থেকে আসে সে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এই মাত্র কদিন আগেই সে হোয়েল বে-তে যে জীবন কাটিয়ে এসেছে তখন সেখানকার সাথে তুলনা করে সে জীবনের কথা ভাবলে মনে হয় সেটা ছিল অগোছালো, ছিন্নভিন্ন আর ক্লান্তিকর। সে নিজেও যেন সেখানে এসে ফুরফুরে হয়ে গেল, আগের চেয়ে তাকে দেখতে অনেক সুন্দর দেখাত।
এরিকের তখন তাকে দেখা দরকার ছিল।

রাস্তায় বেরোলে প্রায় সবসময় সে এরিকের কথা ভাবত। এটা এমন নয় যে সে বুঝতে পারছে না এরিক মারা গেছে—সেরকম এক মুহূর্তের জন্যও হয়নি। কিন্তু সব কাজের শুরুতে সে কেন যেন তার কথা ভাবত, মনে মনে সেই কাজের সাথে এরিকের কোনো একটা সম্পর্ক টেনে বের করত, ব্যাপারটা ছিল এমন যেন সে যা-ই করছে না কেন তার কোনো অংশ এরিকের উপরে নির্ভর করত। যেন এরিক এখনও সেই মানুষ যার চোখ এখনই তার দিকে তাকিয়ে জ্বলজ্বল করবে। এরিক যেন এমন কেউ যার কাছে সে যুক্তি দেখায়, বিভিন্ন ব্যাপারে নতুন কিছু বলার থাকলে বলে আর তাকে অবাকও করে দেয় কখনও। এরকম সব কাজ করা জুলিয়েটের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল, আর এসব সে নিজে থেকে ইচ্ছে করে করেছে, তা নয়, এরিকের মৃত্যু তার এসব ভাবনার রাস্তায় কখনও কোনো সমস্যা হয়ে দেখা দেয়নি। তাদের শেষ ঝগড়াটা শেষ পর্যন্ত আর মেটেনি। এরিকের অসততার জন্য এখনও তাকেই দোষী করে জুলিয়েট। তবে আজকাল সেই রাগটা অনেক কমে এসেছে। সেই ঝড়, সমুদ্রের ধারে এরিকের লাশ উদ্ধার, তীরের উপরে পুড়িয়ে ফেলা—সেসব যেন ছিল সাজানো, বানানো, সব তাকে বিশ্বাস করতে হয়েছে, দেখতে হয়েছে, এখনও সে সেসব ঘটনার সাথে তার কিংবা এরিকের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পায় না।
. . .

জুলিয়েট কলেজের লাইব্রেরিতে কাজ পেল, সাধ্যের মধ্যে দুই বেডরুমের একটা বাসা খুঁজে নিলো আর পেনিলোপ টরেন্স স্কুলে যাওয়া শুরু করল আবার। হোয়েল বে এলাকাটির সাথে তাদের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল, তাদের জীবন সেখান থেকে উপড়ে চলে এল। এমনকী ক্রিস্টাও সেখান থেকে সরে পড়ছে, আগামী বসন্তে সে-ও ভ্যাঙ্কুভারে এসে আস্তানা গাঁড়বে। তার মাত্র একদিন আগে, দিনটা ফেব্রুয়ারির কোনো একটা সময়ে, বিকেল বেলা জুলিয়েট তার কলেজের পাশের বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিল। সেদিনের মতো বৃষ্টি থেমে গেছিল, পশ্চিম দিকে পরিষ্কার আকাশ দেখা যাচ্ছিল, যেদিকে সূর্য নেমে গেছে সেদিকটায় লালিমা, সেটা যেন জর্জিয়ার সমুদ্রে গিয়ে ঠেকেছে। এটা দিন ধীরে ধীরে বড় হবার সংকেত, ঋতু বদলাবে, ঠিক তখন কেন যেন জুলিয়েটের এমন একটা অনুভূতি হলো যেটা খুবই অপ্রত্যাশিত আর ভেতরে ভেতরে তাকে ভেঙেচুরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। হঠাৎ করেই সে আবিষ্কার করল, এরিক মারা গেছে। ব্যপারটা এমন, এই যে এতগুলো দিন হলো সে ভ্যাঙ্কুভারে আছে, এরিক যেন কোথাও অপেক্ষা করছে, প্রতীক্ষায় আছে যে কোনো একদিন আবার জুলিয়েট তার সাথে থাকতে আসবে। যেন তার সাথে থাকাটা অনেকগুলো সম্ভাবনার মধ্যে একটা যা কিনা এখনও হতে পারে। তার জীবন, এখানে আসার পরে এই এত দিন যেন এরিকের অপেক্ষায় কেটে যাচ্ছে, সে হয়তো ঠিকমতো অনুধাবন করেনি যে এরিক আসলে কোথাও নেই। কোথাও তার কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রাত্যহিক জীবনে তার স্মৃতি রোমন্থন করা নিতান্তই এক ইচ্ছাকৃত কাজ।

সুতরাং সেই সময়টা ছিল কষ্টের। তার কাছে মনে হলো এক দলা নরম সিমেন্ট তার উপরে ধপাস করে পড়ল আর সাথে সাথে জমাট বেঁধে গেল। সে আর নড়তে পারছে না, বাস পর্যন্ত যেতে পারবে কি না সন্দেহ, তারপর নেমেও বাড়ির দিকে পা আর চলে না। সে এখানে কেন থাকে? জায়গাটা যেন একটা পর্বতশৃঙ্গে ওঠার মতো কষ্টকর। আর তখন তার সেই অনুভূতিটা পেনিলোপের কাছ থেকে অবশ্যই লুকিয়ে রাখতে হবে। রাতের খাবার টেবিলে সে কাঁপছিল তবে হাত থেকে যেন চামচ আর কাটা পড়ে না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হচ্ছিল। পেনিলোপ টেবিলের ওপাশ থেকে উঠে তার দিকে এল, কাঁপতে থাকা হাত ধরে বলল, “তোমার বাবার কথা মনে পড়ছে, তাই না?” জুলিয়েট পরে কিছু মানুষকে সেদিন রাতের কথাটা বলেছিল—যেমন ক্রিস্টাকে বলেছিল যে পেনিলোপের কথায় সে ভীষণ অবাক হয়েছিল, তার শোনা সেই কথাগুলো ছিল এত মধুর যা আজ অব্দি অন্য কেউ তাকে আর বলেনি।

পেনিলোপ জুলিয়েটের হাত ধরেছিল। পরদিন পেনিলোপ স্কুলে ফোন করে বলেছিল যে তার মায়ের শরীর খারাপ আর সে ক’দিন বাড়িতে থেকে তার সেবা করবে, জুলিয়েট পুরোপুরি ভালো না হওয়ার আগে সে আর স্কুলে যায়নি। সেই কাছে থাকার সময়গুলোতে জুলিয়েট পেনিলোপকে অনেক কিছু বলেছিল, ক্রিস্টার কথা, বাবার সাথে সেই ঝগড়াটার কথা, সমুদ্রের তীরে তাকে পুড়িয়ে ফেলার কথা (যেটা অলৌকিকভাবে এতদিন ধরে সে পেনিলোপের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল) সেই ঘটনার খুঁটিনাটি সব বলল।

“একসাথে এত কথা বলে তোমাকে বিপদে ফেলে দিলাম।”

পেনিলোপ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “তা কিছুটা, আবার নয়।” তবে তার পরে আবার কঠিনভাবে এ-ও বলল, “কোনো অসুবিধা নেই। আমি তো আর ছোট্ট শিশু নই।”

জুলিয়েট আবার প্রাত্যহিক জীবনে ফিরে গেল। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে তার সেদিনের কথা মনে পড়ত তবে সেভাবে আর নয়। লাইব্রেরিতে একটা গবেষণার কাজে জড়িত হওয়ায় বিভাগের টেলিভিশন চ্যানেলের কিছু মানুষের সাথে তার যোগাযোগ হলো। তাদের প্রস্তাবিত একটা কাজে সে যোগ দিল। সেখানে সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরুর আগে প্রায় বছরখানেক সে কাজ করল। তারপর থেকেই সাক্ষাৎকার নেওয়ার কাজ করছে যত্মের সাথে। জীবনে যত তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার শিক্ষা সে এখানে প্রয়োগ করতে পারে, মানুষকে তার ব্যক্তিত্বের বাইরে থেকে দেখতে পারে। যদিও বিষয়টিতে সে দক্ষ হয়ে উঠেছে তবু এখনও নিজের কাজের ব্যাপারে সে খুব সচেতন। নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা তার প্রতিনিয়ত। সামান্য একটা উচ্চারণের ভুল নিয়েও সে বাড়িতে ফিরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবে, পায়চারি করে কী করে সেটা ঠিক করা যায় ভাবতে ভাবতে।

পাঁচ বছর পরে জন্মদিনের কার্ড আসা বন্ধ হয়ে গেল।
“এতে কিছু বোঝায় না,” ক্রিস্টা বলল। “কার্ডগুলো আসলে পাঠানো হয়েছিল সে যে কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে সেটা বোঝাতে। এখন তুমি যেহেতু বিষয়টা বুঝে গেছ তাই আর প্রয়োজন নেই। সে তোমাকে বিশ্বাস করেছে যে তুমি তার পেছনে কোনো ফেউ লাগাবে না। এই আর কী।”
“তুমি কি তাকে একটু বেশিই ভালো দেখাচ্ছ না?”
“কী যে বলো জুলিয়েট!”
“আমি কেবল এরিকের মৃত্যুর কথা বলছি না। অন্য আর যারা আমার জীবনে এল, পরেও, আমি আসলে আমার দুর্দশাগুলো খুব বেশি পেনিলোপের সামনে তুলে ধরেছি। আমার বোকামি।”
পেনিলোপের চৌদ্দ থেকে একুশ বছর বয়সের মধ্যে জুলিয়েটের দু’জন মানুষের সাথে প্রেম হয়েছিল। দুজনের সাথেই তাড়াহুড়ো করে প্রেমে পড়েছিল জুলিয়েট। একজন বিবাহিত আর বয়স্ক, আরেকজন তরুণ, যে সহজেই তার আবেগে সাড়া দিত। তবে দুটো প্রেমের জন্যই পরে লজ্জিত হয়েছিল সে, বিস্মিতও হয়েছিল। কোনো প্রেম টিকিয়ে রাখার কোনো চেষ্টা করেনি জুলিয়েট।
“আমার মনে হয় না পেনিলোপের সাথে তুমি তা করেছ,” ক্লান্তভাবে ক্রিস্টা বলে। “আসলে আমি ঠিক জানি না।”
“ক্রিস্টা, জানো, এখন আমি আর কোনো পুরুষের সাথে নেই। বিশ্বাস কর তুমি?”
ক্রিস্টা তাকে এ কথা মনে করিয়ে দেয়নি যে কোনো পুরুষ এখন তার ধারেকাছে থাকলে তো সে তার সাথে থাকবে।
“না, জুলিয়েট, আমি জানি।”
“বলতে গেলে আমি তো সেরকম ভয়াবহ কিছু করিনি কখনও,” জুলিয়েট বলে ওঠে তখন, হঠাৎ মুখ উজ্জ্বল হয়ে যায় তার। “এই পুরো বিষয়টার জন্য আমি আমাকে দায়ী ভাবছি কেন? পেনিলোপ একটা দুর্বোধ্য মানুষ, এটাই আমাকে কেবল মেনে নিতে হবে, এই।”
“দুর্বোধ্য নাকি শীতল,” থেমে আবার বলে সে, নিজেকেই সান্ত্বনা দেয় হয়তো।
“না,” ক্রিস্টা বলে।

নিঃশব্দে জুনের দুই তারিখ পেরিয়ে গেলে জুলিয়েট বাড়ি বদলানোর সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথম পাঁচ বছর জুলিয়েট জুনের জন্যই অপেক্ষা করত, ক্রিস্টাকে বলেছিল, প্রতিবার ভাবত এবারের জুনে কী আসতে পারে। আর তারপর থেকে এমন হলো যে সে প্রতিদিন অপেক্ষা করে, প্রতিদিন ভাবতে থাকে কিছু একটা আসবে। আর প্রতিদিনই হতাশ হয়। পশ্চিম তীরের দিকে একটা উঁচু বাড়িতে চলে যায় সে। প্রথমে তার মনে হলো পেনিলোপের ঘরের সবকিছু ফেলে দেয়, তারপর আবার কী মনে করে সেগুলো ময়লা ফেলার ব্যাগে ভরে নিজের সাথে নিয়ে গেল। এখন তার বাড়িতে কেবল একটাই শোবার ঘর, তবে নিচে স্টোররুম আছে। স্ট্যানলি পার্কে প্রতিদিন সে ব্যায়াম করতে যায়। আজকাল সে পেনিলোপের কথা খুব কমই বলে, এমনকী ক্রিস্টার কাছেও। তার ছেলেবন্ধুও আছে—ছেলে বন্ধুকে ছেলেবন্ধুই বলতে হবে—যে কিনা পেনিলোপের কথা জীবনেও শোনেনি।
ক্রিস্টা কেমন যেন শুকিয়ে যেতে লাগল, কী হলো বোঝা গেল না। একেবারে হঠাৎ করে পহেলা জানুয়ারি সে মারা গেল।

একই অনুষ্ঠান টেলিভিশনে সারাজীবন চলতে পারে না, কারও মুখ যতই পছন্দনীয় হোক না কেন, একটা সময় আসে যখন পরিচালকেরা অন্য একটা নতুন মুখ চায়। জুলিয়েটকে অন্য কাজের আহ্বান জানানো হলো—গবেষণা, প্রকৃতির ডকুমেন্টরিতে ধারাবর্ণনা—কিন্তু হাসিমুখেই সেসব কাজ করবে না বলে জানাল সে, বলল তার আসলে বিরাট পরিবর্তন দরকার। সে আবার প্রাচীন সাহিত্য পড়তে চলে গেল—আগের চেয়েও ছোট একটা প্রতিষ্ঠানে, পিএইচডি থিসিস করার কাজে হাত দিল সে। সেই উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট থেকে একটা ব্যাচেলর কোয়ার্টারে চলে এল জুলিয়েট খরচ বাঁচাবার জন্য। তার ছেলেবন্ধু চীনে পড়ানোর কাজ নিয়ে চলে গেল।


মহিলাটি যদি সত্যিই চার্চে দেখা সেই মহিলা হয়ে থাকে তবে সে যে নতুন কোনো পৃথিবীতে পদার্পন করেছে। আর সত্যিই যদি সে হয়ে থাকে তবে কী করে তার এতটা অধঃপতন হলো


জুলিয়েটের বাসাটা ছিল একটা বাড়ির মাটির নিচের তলায়। তবে পেছনের দরজাটা মাটির সমতলে। আর সেখানে তার এক চিলতে বারান্দা, টবে ফুলগাছ। জীবনে সেই প্রথম সে গাছের পরিচর্যা করা শুরু করল, তার বাবার মতো। কখনও কোনো দোকানে বা ক্যাম্পাসের বাসস্ট্যান্ডে মানুষ তাকে বলত—“মাফ করবেন, আপনাকে কেন যেন খুব চেনা চেনা লাগছে,” অথবা বলত, “আপনিই কি সেই মহিলা নন যাকে প্রায়ই টিভিতে দেখা যেত?” তবে কয়েক বছরের মধ্যে সেসব বন্ধ হয়ে গেল। সে রাস্তাঘাটে, ইউনিভার্সিটিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকত, কফির কাপ নিয়ে বসে থাকত, কেউ তাকে খেয়াল করত না। সে তার চুলগুলোকে বড় করে ফেলেছিল। গত কয়েক বছর ধরে লাল রঙ করাতে আগের সেই বাদামি ভাবটা পুরোপুরি চলে গেছে। কিছু কিছু চুল ধূসর হয়ে যাচ্ছিল। এখন তার চুলগুলো দেখতে তার মায়ের মতো, কিছুটা ধূসর আর ঢেউ খেলানো। কাউকে বাড়িতে ডেকে খাওয়ানোর মতো জায়গা নেই তার আর রান্নার শখও চলে গেছে। শরীরের জন্য যা প্রয়োজন কোনো রকমে সেটুকু খেয়েই সে দিন পার করে। কোনো নির্দিষ্ট করণে ছাড়াই, পরিচিত সমস্ত লোকদের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অবশ্য এটা খুব অবাক হওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। সে আগে যেমন মানুষের কাছাকাছি ছিল, নিজেকে প্রতিমুহূর্তে জাহির করত, সাবার সাথে প্রতিনিয়ত কাজের খাতিরে যোগাযোগ করতে বাধ্য হতো, তার থেকে তখন অনেক অন্যরকমের জীবন যাপন করা আরম্ভ করল। তখন সে থাকত কেবল বইয়ের মধ্যে বুঁদ হয়ে, যতক্ষণ জেগে থাকত ততক্ষণ পড়ত, বিষয়ের গভীরে ঢুকে যেত, আগের লেখা নতুন করে লিখত। কখনও কখনও পৃথিবীর খবরাখবর দেখা বা শোনাতেও সে সপ্তাহখানেকের বিরতি নিয়ে ফেলত। থিসিস তার প্রায় তৈরি হয়ে গেল আর তা করতে করতে বিভিন্ন গ্রিক ঔপন্যাসিকের ব্যাপারে তার আগ্রহ বেড়ে গেল। গ্রিক সাহিত্যে যাদের কাজ বেশ দেরিতে এসেছিল, সেই সব ঔপন্যাসিকদের বেশিরভাগ লেখাই হারিয়ে গিয়েছে আর যা কিছু আছে তা-ও আবার অশালীন বলে অভিযুক্ত। কিন্তু হেলিওডোরাসের লেখা একটি উপন্যাস আছে, যার নাম এইথিওপিকা। উপন্যাসটি প্রেমে পরিপূর্ণ। সেটি আসলে কারও নিজস্ব লাইব্রেরিতে ছিল। ১৫৩৪ সালে ইউরোপে নতুন করে ছাপানো হলে সেটি জনপ্রিয়তা পায়। সেই উপন্যাসের কাহিনীতে ইথিওপিয়ার রানি একটি সাদা শিশুর জন্ম দেন, তিনি খুব আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন যে এজন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুতরাং তিনি তার সদ্যপ্রসূত মেয়েটিকে জিমনোসোফিস্টদের হাতে তুলে দেন, যারা হলো উলঙ্গ দার্শনিকের দল। মেয়েটির নাম দেওয়া হয়েছিল ক্যারিক্লেইয়া যাকে পরে ডেলফি নিয়ে যান, যিনি ছিলেন আর্টেমিসের একজন যাজিকা। সেখানে মেয়েটির সাথে দেখা হয় একজন থেসালিয়ানের যার নাম ছিল থিজিনিস, তার প্রেমে পড়ে সে। বুদ্ধিমান মিশরীয়দের সাহায্যে মেয়েটিকে নিয়ে তিনি পালিয়ে যান। ইথিওপিয়ান রানি তখন মিশরীয় কিছু মানুষের সহায়তায় মেয়েকে খুঁজতে থাকেন। রহস্য আর রোমাঞ্চ চলতে থাকে যতক্ষণ না তারা সবাই মেরো নামক জায়গায় একসাথে মিলিত হয়, ক্যারিক্লেইয়াকে উদ্ধার করা হয়, ঠিক যখন আরেকটু হলে তার নিজের বাবাই তাকে হত্যা করতে যাচ্ছিল।

জুলিয়েটের কাছে কাহিনি আর তার গতিটা বড় ভালো লেগেছিল। বিশেষ করে জিমনোসোফিস্টের অংশটুকু। সে এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে যতটা সম্ভব খোঁজখবর করতে লাগল। তাদের আসলে সেখানে হিন্দু দার্শনিক বলে ডাকা হতো। ইথিওপিয়া ইন্ডিয়ার পাশে বলেই কি? না মনে হয়, ভূগোলটা জানার আগেই হেলিওডোরাসের আবির্ভাব হয়েছিল। জিমনোসোফিস্টরা ছিল এক রকমের যাযাবর, জীবনের শুদ্ধতা আর নিবেদনের খোঁজে, কখনও আবার সামান্য ভরণপোষণের খোঁজে তারা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের ভেতরে এক পরমা সুন্দরী নারীর বেড়ে ওঠা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী এক ব্যাপার।

ল্যারি নামে জুলিয়েটের এক নতুন বন্ধু হলো। সে গ্রিক পড়াত। নিচের তলায় জুলিয়েটের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল। এইথিওপিকা উপন্যাস নিয়ে গীতিনাট্য তৈরির ব্যাপারে তার ছিল অসীম আগ্রহ। জুলিয়েট তার কল্পনার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে মজা করতে পছন্দ করত, গানগুলো প্যারোডি করে গাইত আর স্টেজের বিভিন্ন আলো-আঁধারির অভিনয় করে দেখাত। কিন্তু মনে মনে সে নিজেও সেই কাহিনির চরিত্রটির মধ্যে ডুবে থাকত। মনে মনে সে তখন সেই মেয়েটি যার সাথে দেখা হয় প্রতারকের, নিজেকে যে উজাড় করে দেয়, যার জীবন ধীরে ধীরে নিজের কাছেই অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যত যাই হোক শেষ পর্যন্ত সমস্ত ভুলভ্রান্তি আর ঘটনা দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে সে হয়ে দাঁড়ায় ইথিওপিয়ার রানি।

জুলিয়েটের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে চার্চের সেই মহিলার সাথে ওখানে, ওই ভ্যাঙ্কুভারে তার দেখা হবে। পরে আর পরবে না এমন কিছু কাপড়চোপড় আলমারি থেকে গুছিয়ে নিয়ে জুলিয়েট একদিন ব্যাগে ভরল, স্যালভেশন আর্মির দোকানে দান করার জন্য। ব্যাগগুলো নিয়ে নিচে নেমে সে দেখে এক মোটা মহিলা তার প্যান্টের ওপরে একটা স্টিকার লাগানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। মহিলা আশেপাশের কাজের লোকদের সাথে কথা বলছে। কিছুক্ষণ পরে মনে হলো মহিলা আসলে কিছু লোককে দিয়ে কোনো একটা কাজ করিয়ে নিচ্ছে। তার হুকুম দেয়ার ধরনে সেটা বুঝে নেওয়া খুব স্বাভাবিক। মহিলাটি যদি সত্যিই চার্চে দেখা সেই মহিলা হয়ে থাকে তবে সে যে নতুন কোনো পৃথিবীতে পদার্পন করেছে। আর সত্যিই যদি সে হয়ে থাকে তবে কী করে তার এতটা অধঃপতন হলো? তার কাজ ছিল উপদেশ দেওয়া, কেবলই উপদেশ দেওয়া। সে চরম ক্ষুধায় আমাদের কাছে এসে উপস্থিত হয়েছে।

জুলিয়েট ল্যারিকে পেনিলোপের কথা বলেছিল। কাউকে যেন তার বলার দরকার ছিল এটা। ”আমার কি তাকে উৎসর্গীকৃত জীবনের গল্প শোনানো উচত ছিল?” জুলিয়েট বলেছিল। ”বলা উচিত ছিল নিবেদনের কথা? অপরিচিত মানুষজনের প্রয়োজনে নিজেকে বিলিয়ে দেবার কথা? আমি সত্যি এসব ভাবিনি। আমি নিশ্চয়ই তাকে এমনভাবে মানুষ করেছিলাম যে আমি জানতামই সে আমার মতোই এক নারী হবে। আমার এই ভাবনা কি তাকে এতটাই অসুস্থ করে তুলেছিল?”

ল্যারি সেরকম মানুষ ছিল না যে জুলিয়েটের কাছে বন্ধুত্ব ছাড়া অন্য কিছু চায়। সে আসলে বেশ প্রাচীন পন্থী অবিবাহিত একজন মানুষ। তাদের সম্পর্ক তাই হয়ে দাঁড়াল যৌনতাবিহীন ভীষণ ঘনিষ্ট এক সম্পর্ক। আরও দুজন ছিল, যাদের মধ্যে একজন জুলিয়েটকে সঙ্গী হিসেবে চাইত। তার সাথে দেখা হলো বারান্দার ধারের সরু টেবিলে বসে থাকতে থাকতে। সেই লোকটি সদ্যই বিপত্নীক হয়েছিল। জুলিয়েট তাকে পছন্দ করত কিন্তু তার একাকিত্বের বিষয়টা এতই একমুখী আর জুলিয়েটকে সেভাবে পাওয়ার জন্য সে এতটাই উন্মুখ হয়ে উঠল যে জুলিয়েটকে সতর্ক হতে হলো। আরেকজন হলো ক্রিস্টার ভাই, যার সাথে ক্রিস্টা বেঁচে থাকতে বহুবার দেখা হয়েছে। তার সাথে সময় কাটাতে জুলিয়েটের ভালোই লাগত কারণ সে ছিল অনেকটা ক্রিস্টার মতোই। তার বিবাহিত জীবন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, আর এ ব্যাপারে সে তেমন উদগ্রীবও ছিল না—জুলিয়েট জানত, ক্রিস্টার কাছে শুনেছে, বেশ কিছু মহিলা ছিল যারা তাকে বিয়ে করতে চাইত কিন্তু সে তাদের এড়িয়ে চলত। সে আসলে যুক্তিবাদী, জুলিয়েটের ব্যাপারেও সে একেবারে নির্লিপ্ত, ভাবটা কেমন যেন একরকম জুলিয়েটকে ছোট করা। কিন্তু ছোট করাই বা হতে যাবে কেন? জুলিয়েট তো আর তাকে ভালোবাসে না। এটা আসলে তখন মনে হলো যখন ক্রিস্টা মারা যাবার পরে ভ্যাঙ্কুভারে তার সাথে আবার হঠাৎ দেখা হলো—তার নাম গ্যারি ল্যাম্ব। জুলিয়েট আর গ্যারি সন্ধ্যার আগের এক সিনেমা শো থেকে বেরিয়ে আসছিল। তারা আলাপ শুরু করল রাতের খাবার কোথায় খেতে যাওয়া যেতে পারে, এ নিয়ে। সেটা ছিল গ্রীস্মের এক তারা ভরা রাত, আকাশ যেন পুরোপুরি অন্ধকার হচ্ছিলই না।

এক মহিলা তার সাথের লোকদের ছেড়ে রাস্তার মাঝখানে সোজা জুলিয়েটের দিকে এগিয়ে এসেছিল। সরুমতন মহিলা, হয়তোবা তিরিশের কোঠায় বয়স। বেশ ফ্যাশন সচেতন, কালো কুচকুচে চুলে হরেক রকমের বেনি।
“মিসেস পোর্টিয়াস, মিসেস পোর্টিয়াস”।
জুলিয়েট সেই কণ্ঠটি চিনত, যদিও মুখ দেখে বলতে পারত না কে। সেটা ছিল হিথার।

“কী আশ্চর্য, আপনি!” হিথার বলেছিল, “আমি এখানে দিন তিনেক আগে এসেছি, কাল ফিরে যাব। আমার স্বামীর একটা কাজে এলাম, এখানে তো কাউকে চিনি না, তাই আপনাকে দেখে ছুটে এলাম।”
জুলিয়েট তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল সে কোথায় থাকছে, সে বলেছিল কানেকটিকা।

“আর মাত্র তিন সপ্তাহ আগের কথা, আমি যশ কে দেখতে গিয়েছিলাম—আমার ভাই যশের কথা আপনার মনে আছে? আমি যশের বাড়িতে তার বউবাচ্চার সাথে দেখা করে রাস্তায় বেরিয়েছি আর দেখি পেনিলোপ। ঠিক এভাবেই, খোলা রাস্তার উপরে। না, ঠিক রাস্তা নয়, সেটা ছিল একটা শপিং মলের গেট, কী অস্বাভাবিক বড় বড় সব মল বানিয়েছে না তারা? সে তার বাচ্চাদের নিয়ে সেখানে ঢুকছিল তাদের স্কুলের কাপড় কিনতে। সাথে ছিল তার দুই ছেলে। আমরা দুজনেই চমকে উঠেছিলাম। আমি তাকে না চিনতে পারলেও সে ঠিকই আমাকে চিনেছিল। সে উত্তরের দিকে একটা শহরে থাকে, এডমন্টনের চেয়েও সভ্য কোনো জায়গায়, তার কাছেই জানলাম যে আপনি এখনও এখানে থাকেন। কিন্তু সে যাই হোক, এখন আমাকে যেতে হচ্ছে, আমার স্বামীর বন্ধুদের সাথে বেরিয়েছি, ওরা অপেক্ষা করছে, আর সত্যি একটা ফোন ধরারও সময় নেই আমার।”
জুলিয়েট এমন ভঙ্গি করল যে সে বুঝতে পেরেছে তার সময় নেই আর সে কোনো ফোনও আশা করছে না। সে শুধু জানতে চাইল হিথারের বাচ্চা কয়টা।

“তিনটা। সবকটা বিচ্ছু। কে জানে কবে বড় হবে। তবে পেনিলোপের পাঁচ বাচ্চার সাথে তুলনা করলে আমার জীবনটা বলতে গেলে পিকনিকের মতো। পাঁচ পাঁচটা বাচ্চা!”

“নিশ্চয়ই।”

“আমাকে এখনই ছুটতে হবে। আমরা সিনেমায় যাচ্ছি। অবশ্য জানি না কোন সিনেমা। ফ্রেঞ্চ সিনেমা আমার একদম পছন্দ নয়। কিন্তু আপনার সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাওয়াটা খুবই অদ্ভুত। আমার বাবা-মা হোয়াইট রকে থাকে এখন, বরাবর আপনাকে টেলিভিশনে দেখে। তারা মুখ বড় করে বন্ধুদের শোনায় যে একসময় আপনি আমাদের বাসায় থেকেছিলেন। তারা বলল আপনি নাকি আর টিভিতে আসছেন না। এখন আর ওসব ভালো লাগে না আপনার?”

“হ্যাঁ, সেরকমই।”

“আসছি, আসছি।” সে জুলিয়েটকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল, সবাই বিদায়ের সময় যা করে, তারপর দ্রুত নিজের দলের সাথে ভিড়ে গেল।

সুতরাং, পেনিলোপ আর এডমন্টনে থাকে না, সেখান থেকে চলে এসেছে। তার থেকে নিচের দিকে চলে এসেছে। সে নিশ্চয়ই হোয়াইট হর্স বা ইয়েলো নাইফে থাকে। এছাড়া এডমন্টনের চেয়ে সভ্য জায়গা আর কোনটা? সে হয়তো নিজেকে কিছুটা সান্ত্বনা দিয়ে হিথারকে এই কথাটা বলেছিল। তার পাঁচটা বাচ্চা, আর তাদের মধ্যে অন্তত দুটো ছেলে। তাদের স্কুলের পোশাক ছিল না। এর মানে অবশ্যই প্রাইভেট স্কুলে পড়ে তারা। তার মানে পেনিলোপের কাছে যথেষ্ট টাকাপয়সা আছে। হিথার তাকে চিনতে পারেনি। তার মানে কি সে দেখতে খুব বুড়িয়ে গেছে? তার মানে কি পাঁচবার অন্তঃসত্তা হবার কারণে তার শরীর অন্যরকম হয়ে গেছে, সে নিজের প্রতি একটুও যত্নশীল নয়? হিথার তো প্রায় একইরকম আছে। যেমন জুলিয়েটও বহুদিন পর্যন্ত ছিল। পেনিলোপ কি সেই গুটিকতক মহিলার মতো যারা মনে করে নিজের খেয়াল রাখার কোনো প্রয়োজন নেই কিংবা বাচ্চা হবার পরেও নিজের শরীর ঠিক রাখা আসলে এক ধরনের অনিরাপত্তাবোধ থেকে আসে? অথবা এমন হতে পারে তার এজন্য কোনো বাড়তি সময়ই নেই—এই অতিরিক্ত একটা বিষয় নিয়ে সে কখনও ভাবেইনি।

জুলিয়েট ভেবেছিল পেনিলোপ জাগতিক চাওয়া পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে গেছে, পৃথিবীতে অবস্থান করেও সে হয়ে উঠেছে এক রহস্যময় মানবী, অসাধারণ এক ধ্যানের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। তবে সে যাই হোক, তাকে বোঝা গেল একেবারে বিপরীতভাবে সে বেঁচে আছে, নিশ্চয়ই কঠোর পরিশ্রম করে জীবন চালাচ্ছে, হয়তো কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজও করছে, মাছ ধরা নয় তো? সাথে তার স্বামীও থাকতে পারে, কিংবা হয়তো কেবল সাখে আছে কতকগুলো দুষ্টু বাচ্চা, শীতের রাজ্যে ব্রিটিশ কোলাম্বিয়া তীরের কাছে সে কোনোরকমে দিন যাপন করছে। হতে পারে একেবারেই ভুল ধারণা। পেনিলোপ বেশ আনন্দেই আছে, চমৎকার জীবন কাটাচ্ছে, তার মতো মেয়ের যা হওয়া উচিত। সে একজন ডাক্তারকে বিয়ে করেছে, হয়তোবা, অথবা কোনো সরকারী কর্মচারিকে, উত্তরের দিকে যাদের দাপট খুব বেশি। সেখানকার লোকজনের সাথে তার ভালোই দিন কাটছে। হিথার যখন তাকে জুলিয়েটের সাথে দেখা হওয়ার কথা বলবে, তখন দুটো ভিন্ন ঘটনার সাদৃশ্য নিয়ে তারা দুজনে খুব হাসবে। না না। তারা অনেক হাসাহাসি করেছে। পুরো জীবনটাকেই একটা কৌতুক বানিয়ে ছেড়েছে। খুব বেশি কৌতুকময় হয়ে উঠেছে জীবন—নিজস্ব চিন্তাধারা, ভালোবাসা, যুক্তি, আছে তাদের। জুলিয়েটেরই হয়তো মা হয়ে ওঠার যথেষ্ট যোগ্যতা ছিল না। পেনিলোপ বলেছিল যে জুলিয়েট তখনও ভ্যাঙ্কুভারে থাকে। জুলিয়েট তাই ব্রিচের ব্যাপারে তাকে কিছু বলেনি। বলেনি, ভালোই করেছে। বললে হিথার এত সহজে গড়গড় করে পেনিলোপের কথা বলে যেতে পারত না। কিন্তু পেনিলোপ কী করে জানত যে সে তখনও ভ্যাঙ্কুভারে থাকে? সে নিশ্চয়ই টেলিফোন ডিরেক্টরি দেখেছে। আর সে যদি তাই করে থাকে তবে তার মানে কী দাঁড়াল? কিছুই না। এর কোনো মানেই নেই। রাস্তার বাঁক পেরিয়ে সে গ্যারির দিকে এগিয়ে যায় যে কিনা হিথারের সাথে জুলিয়েটের দেখা হওয়া মাত্রই কৌশলে সরে গিয়েছিল।

হোয়াইটহর্স আর ইয়েলোনাইফ। জায়গাদুটোর নাম জানা তার জন্য কষ্টকরই বটে। সে ইচ্ছে করলেই সেখানে চলে যেতে পারে। জায়গাগুলো এত কাছে যে সে ইচ্ছে করলেই সেখানে গিয়ে তার কোণাকাঞ্চি ধরে পেনিলোপকে খুঁজতে পারে। কিন্তু সে ততটা পাগল নয়। ততটা পাগল সে কিছুতেই হতে পারে না। রাতের খাবারের সময়ে সে মনে মনে ভাবছিল, যে খবরটা তখন সে হজম করছিল সেটা গ্যারিকে বিয়ে করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট কি না। কিংবা তার সাথে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত—গ্যারি যেরকম চায়। তখন আসলে আর পেনিলোপের কথা ভেবে নিজের জীবনকে থামিয়ে রাখার কোনো অর্থ ছিল না। পেনিলোপ আর চিন্তার কোনো বিষয় না, সে ভালোই আছে, নিরাপদে আছে, একজন মানুষ যতটা সুখি হতে পারে, সে হয়তো তাই আছে। সে নিজেকে জুলিয়েটের থেকে পৃথক করে নিয়েছে, হয়তো তার স্মৃতি থেকেও সে আলাদা হয়ে গেছে। বিনিময়ে জুলিয়েটও তার থেকে নিজেকে পৃথক করে নেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। তবে সে হিথারকে বলেছে যে জুলিয়েট ভ্যাঙ্কুভারে থাকে। সে একথা বলার সময়ে তাকে কীভাবে উল্লেখ করেছিল, জুলিয়েট অথবা মা কিংবা আমার মা?

জুলিয়েট গ্যারির কাছে হিথারের পরিচয় দিলো পুরনো বন্ধুর মেয়ে বলে। সে তার কাছে কখনও পেনিলোপের কথা বলেনি। আর সে-ও কখনও পেনিলোপের থাকা-না-থাকার ব্যাপারে জানে বলে কিছু প্রকাশ করেনি। এমন হতে পারে যে ক্রিস্টা তাকে পেনিলোপের কথা বলেছিল আর সে জেনেবুঝেই তার বিষয়ে নীরব, হয়তো মনে করেছে এটা তার বলার মতো কোনো বিষয় না। অথবা ক্রিস্টা তাকে বলেওছিল কিন্তু সে একেবারে ভুলে গেছে সে কথা। অথবা ক্রিষ্টা তাকে কখনই পেনিলোপের নাম বলেনি, তার বিষয়েও কিছু বলেনি, আর সে কখনও জানেনি।

জুলিয়েট তার সাথে থাকলেও পেনিলোপের কথা কোনোদিন তাদের মাঝখানে আসবে না। পেনিলোপ কোথাও নেই। যে পেনিলোপের কথা জুলিয়েট ভাবত, সে কোথায় চলে গেছে। যে মহিলার সাথে এডমন্টনে দেখা হওয়ার কথা হিথার বলছিল, সেই মা যার বাচ্চাদের স্কুল ইউনিফর্ম কেনার জন্য সে শপিং মলে ঢুকতে যাচ্ছিল, যে তার মুখ এবং শরীর বদলে ফেলেছে, যে কারণে হিথার তাকে দেখে চিনতে পারেনি, সে কিছুতেই এমন কেউ হতে পারে না যাকে জুলিয়েট সত্যিই চেনে।

জুলিয়েট কি এটা আসলে বিশ্বাস করে? জুলিয়েটকে চিন্তিত হতে দেখলে হয়তো গ্যারি না দেখার ভান করত। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় তাদের সাক্ষাৎটা এমন হলো যে তারা বুঝে গেল কখনও একসাথে চলতে পারবে না। যদি থাকত তবে জুলিয়েট হয়তো বলত, আমার মেয়ে আমাকে কিছু না বলেই কোথায় যেন চলে গেছে আর হয়তোবা মেয়েটা তখন জানতও না যে সে চিরতরে চলে যাচ্ছে। সে সত্যিই জানত না যে আর কখনও ফিরবে না। তারপর ধীরে ধীরে হয়তো, খুবই ধীরে সে বুঝেছে যে একাকিত্ব তার জন্য কতটা জরুরি। এটা আর কিছু নয়, সে কেবল তার জীবন যাপনের একটা উপায় খুঁজে পেয়েছে। এমন হতে পারে এটা কেবল তার দুর্বলতা যে সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে সব কথা ব্যাখ্যা করতে পারবে না। অথবা সত্যি সেটা করার জন্য তার হাতে সময় নেই। আসলে ব্যাপারটা হয়েছে কী, আমরা বরাবর সবকিছুর একটা কারণ খুঁজতে থাকি, ভাবি এ ঘটনাটা হয়তো ঘটেছে এজন্য, অথবা এজন্য নয়, ওই জন্য। আমরা কেবল কারণ খুঁজে বেড়াই। আর আমি হাজারও এমন কাজের কথা উল্লেখ করতে পারি যা যা জীবনে ভুল করেছি। কিন্তু সত্যিকারের কারণটা খুঁজে পাওয়া অত সহজ নয়। হয়তো পেনিলোপের চরিত্রে কিছু কঠোর স্বভাব ছিল। হ্যাঁ, তার স্বভাবে ছিল কিছু অসম্ভব সুচারু ব্যাপার, ভয়ানক কাঠিন্য, পাথরের মতো অনঢ় সততা। আমার বাবা একজন অপছন্দের লোক সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে এ ধরনের একজন মানুষের তার কোনো প্রয়োজন নেই। এই কথাটুকুই কি সবকিছু বলে দেয় না? আমার আসলে পেনিলোপকে কোনো প্রয়োজন নেই। হয়তো সে আমাকে সহ্যই করতে পারে না। এমনই হবে হয়তো।

জুলিয়েটের কিছু বন্ধুবান্ধব আছে। আজকাল তত বেশি নয়—তবে আছে। ল্যারি প্রায়ই আসে, গল্প বলে হাসায়। জুলিয়েট নিজের পড়ালেখা নিয়েই আছে। পড়ালেখা শব্দটি আসলে বোঝাতে পারবে না যে সে আসলে কী করে, সত্যিকার অর্থে সে যেটা করে তা হলো তত্ত্বের অনুসন্ধান। আর টাকাপয়সার প্রয়োজন হলে সে কাছের একটা কফির দোকানে কিছু সময় কাজ করে। অবশ্য সেখানেও ফুটপাথের টেবিলে বসে পড়তে পারে। প্রাচীন গ্রীসের সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য এটাকেই সে সবচেয়ে উপযুক্ত পথ বলে মনে করে। শুধু মনে করা নয়, এটা সে এমনভাবে বিশ্বাস করে যে এই পড়াশোনা ছাড়ার সুযোগ হলেও ছাড়তে পারবে না। জুলিয়েট পেনিলোপের তরফ থেকে কিছু শোনার অপেক্ষায় দিন গোনে। তবে সেটা সে নিজে থেকে জোর করে ঘটাবে না। কখনও কখনও মানুষ যেমন প্রাপ্তির যোগ্যতা আছে কি নেই না জেনেও কেবল অপেক্ষা করে, মুক্তির জন্য প্রতীক্ষা করে, তেমনই আশা নিয়ে বসে থাকে সে।

আফসানা বেগম

আফসানা বেগম

জন্ম ২৯ অক্টোবর, ১৯৭২, ঢাকা। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা: ব্যবসা।

প্রকাশিত বই:
অনুবাদ: ঝাঁপ ও অন্যান্য গল্প ( নাদিন গোর্ডিমার), রোমান সাম্রাজ্য (আইজ্যাক আসিমভ), লেখালেখি তাদের ভাবনা (এগারো লেখকের প্রবন্ধ), পলাতক (এলিস মানরো)
ফিকশন: দশটি প্রতিবিম্বের পাশে (গল্প ), জীবন যখন থমকে দাঁড়ায় (উপন্যাস), প্রতিচ্ছায়া (উপন্যাস)

ই মেইল : afsana_29@yahoo.com.au
আফসানা বেগম

Latest posts by আফসানা বেগম (see all)