হোম অনুবাদ নিগ্রো ভাই আমার : কালো আফ্রিকার কবিতা

নিগ্রো ভাই আমার : কালো আফ্রিকার কবিতা

নিগ্রো ভাই আমার : কালো আফ্রিকার কবিতা
787
0

এই সংকলনে রয়েছেন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের কবিরা। এদের মধ্যে কেউ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুক্তিসংগ্রামে যুক্ত থাকারঅপরাধে’ কারাগারে বন্দি হয়েছেন কেউ বরণ করেছেন শহিদের মৃত্যু। কেউ আবার সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও কলমের তরোয়ালে বিদ্ধ করতে চেয়েছেন ঔপনিবেশিক স্বৈরশাসককে। বিভিন্নতা থাকলেও তাদের রচনার অভিন্ন সুরটি কিন্তু এক, আফ্রিকার জাতীয় স্বাধীনতা এবং মানবাত্মার মুক্তি।

কালো স্বাধীন আফ্রিকার বুকে একদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শাদা সাম্রাজ্যবাদ। তারা বাইরের পৃথিবীকে জানিয়েছিল যে তারা গেছে ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ আফ্রিকাকে মুক্ত করতে। কিন্তু অচিরেই বিশ্ববাসী জেনে ফেলেছিল শাদা বেনিয়ার চাবুকের কাহিনি। ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ আফ্রিকার কোনো মুক্তি বা স্বাধীনতার জন্ম হচ্ছে না, তা আর লুকোনো ছিল না। আফ্রিকার মানুষ শাদা ডাঁশ তাড়াতে বাজাতে শুরু করেছিল ড্রাম। আর সেই ড্রামের আওয়াজ হয়ে উঠেছিল মুক্তিকামী আফ্রিকার অনন্য কবিতা।

এই সংকলনের আলাদা করে ভূমিকা লেখার দরকার নেই। কবিতাগুলো তো স্বয়ংই তাদের মুখবন্ধ।

 

– ভাষ্য ও ভাষান্তর মৃন্ময় চক্রবর্তী


কঙ্গো
প্যাট্রিস লুমুম্বা

জন্ম ১৯২৫। মৃত্যু ১৯৬১। আফ্রিকার সর্বকালের সেরা বিপ্লবী প্যাট্রিস লুমুম্বা কবি হিশেবেও পরিচিত। কঙ্গোর জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লেখা তার কবিতাগুলি সারা দুনিয়ায় পরিচিতি পেয়েছে। দীর্ঘ উপনিবেশ বিরোধী জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম শেষে কঙ্গো সাধারণতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিশেবে শপথ নেবার পর পশ্চিমি নয়া উপনিবেশবাদী শক্তির হাতের নিষ্ঠুর শিকার হতে হয়েছে তাকে। আফ্রিকার এই বিপ্লবী শহিদ কবিকে কঙ্গো এবং সারা পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুক্তিকামী মানুষ চিরকাল মনে রেখেছেন।

 

কাঁদো, প্রিয় কালো ভাই আমার
❑❑

শতাব্দীর ভারবাহী পশু, হে কালো মানুষ
তোমার পোড়াদেহের ছাই ছড়িয়ে রয়েছে স্বর্গের বাতাসে,
একসময় ছিল যখন তুমি যেখানে তোমার হত্যাকারীরা অন্তিম শয়নে নিদ্রা গিয়েছে
সেইসব কবরের উপর স্মৃতিসৌধ তৈরি করেছ।
তোমাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে পিছু ধাওয়া করে শিকার করা হয়েছে।
যুদ্ধে তুমি মার খেয়েছ আর বর্বরেরা পুরস্কৃত হয়েছে
হত্যা ও ধর্ষণের এই বর্বর শতক তোমার কাছে
প্রস্তাব দিয়েছে মৃত্যু কিংবা দাসত্বকে বেছে নেবার।
তোমাকে উদ্বাস্তু হয়ে চলে যেতে হয়েছে গভীর অরণ্যে,
যেখানে অন্য মৃত্যুরা তোমার জন্য ফাঁদ বিছিয়ে রেখেছে
জ্বরের জ্বলুনি, শ্বাপদের দাঁত, শীত, অমঙ্গুলে কুণ্ডলী পাকানো সাপ
তোমাকে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর দিকে।
তারপর এসেছে ধূর্ত, আরো হিংস্র, আরো ঠগ শাদা চামড়ার মানুষ।
সে তোমার সোনা দখল করেছে বাজে জিনিসের বিনিময়ে
তোমার বীরদের মাতাল বানিয়ে তোমার মেয়েদের ধর্ষণ করেছে।
তোমার সন্ততিদের খোঁয়াড়ের পশুর মতো তুলে নিয়ে গিয়েছে ওদের জাহাজে।
গ্রাম থেকে গ্রামে টমটমগুলো শব্দ করে ঘুরে বেড়িয়েছে,
যেখানে তুলো ভগবান আর ডলার সম্রাট সেই দূর দেশে
নির্বাসনের সংবাদ তীব্র বিলাপ ছড়িয়ে দিয়েছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।
এই দাস শ্রমিকের দণ্ড ভুলিয়ে দিয়েছে যে তুমিও মানুষ।
ওরা তোমায় ওদের ঈশ্বরের স্তুতিগান গাইতে শিখিয়েছে,
আর সেই প্রার্থনাগুলো গাঁথা হয়েছে তোমারই বেদনার সুরে
আসন্ন সুন্দর পৃথিবীর আশা দিয়েছে তোমায় এই গান।
তোমার মানব হৃদয় কেবল তোমায় বলেছিল
বেঁচে থাকার অধিকারের কথা, সুখী জীবনের উপর তোমার অংশীদারত্বের কথা।
তোমার আগুনের পাশে তোমার চোখ—তোমার স্বপ্ন ও
যন্ত্রণাকে প্রতিফলিত করেছে,
তোমার নীল আকাশকে কণ্ঠ দিয়েছে তোমার চারণ কীর্তন
আর মাঝে মাঝে গোলাপের গাছের শরীর থেকে প্রাণরস
সংগ্রহের কালে তোমরা আনন্দে নেচে উঠেছ উদ্দাম আর্দ্র সন্ধ্যায়,
আর এই চঞ্চলতা, চমৎকারিত্ব, জীবন আর পৌরুষের
বাইরে পিতলের ঘণ্টার মতো
তোমার বেদনার ধ্বনি হয়ে বেজে চলেছে, সেই প্রচণ্ড গান—
জ্যাজ,—যা সারা দুনিয়ার ভালোবাসা আর প্রশংসা কুড়িয়েছে,
শাদা চামড়ার মানুষদের বাধ্য করেছে শ্রদ্ধায় নতজানু হতে,
সেই স্পষ্ট চড়া সুর সেদিন ঘোষণা করেছে
এই দেশ আর বেশিদিন ওদের অধীনে থাকবে না।
আর এটাই তোমায় তোমার জাতি ভাইদের
মাথা তুলে সামনের সবকিছুকে সোজাদৃষ্টিতে দেখতে শিখিয়েছে
আসন্ন সুন্দরকে বয়ে আনছে মুক্তি।
বিরাট নদীর তীরে ফুলে ফুলে ভরা আশাগুলো
এখন থেকে তো তোমারই।
এই পৃথিবী আর তার প্রাচুর্যের ভারাগুলো
এখন থেকে তো তোমারই অধিকারে যাবে
বিবর্ণ আকাশে ঐ আলোছড়ানো সূর্য
আমাদের বেদনাকে গলিয়ে দেবে উষ্ণ তরঙ্গমালায়।
আর তার জ্বলন্ত কিরণ চিরকালের জন্য আমাদের
পিতৃপুরুষের, অত্যাচারী প্রভুর হাতে নিহত শহিদের
চোখের জলের বন্যাকে মুছে ফেলবে।
তারপর পৃথিবীতে যাকে তুমি সবচেয়ে ভালোবেসেছ
সেই কঙ্গোকে তোমরা গড়ে তুলবে আর স্বাধীন সুখী জাতি হিশেবে
এই বিশাল বিপুল কালো আফ্রিকার বুকের ভিতরে।



অ্যাঙ্গোলা
অগাস্তিনহো নেটো

জন্ম ১৯২৩। মৃত্যু ১৯৭৯। শুধু অ্যাঙ্গোলা নয় গোটা আফ্রিকার মহত্তম কবি অগাস্তিনহো নেটো। কবি অ্যাঙ্গোলার জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হয়েছিলেন স্বাধীন অ্যাঙ্গোলার প্রথম রাষ্ট্রপতি। পেয়েছিলেন আফ্রো-এশিয়া লেখক সম্মেলনে ‘লোটাস’ পুরস্কার।

 

দু’বছর পার
❑❑

গতকালের চিঠিতে তোমার শুভেচ্ছা পেয়েছি
প্রিয়তমা, কবে আবার আমাদের দেখা হবে
খুব তাড়াতাড়ি নাকি অনেক দেরিতে?
জানিও।

এই স্তব্ধতার ভেতর
আমাদের কথারা নেই
চুমু বিনিময় নেই
অনুমোদিত না হবার আশঙ্কায়
আমরা চিঠিতে সেই শব্দগুলো
লিখতে পারছি না।

এই বশ্যতা কিংবা নির্যাতনের
মধ্যকার টানাপোড়েনের বিরুদ্ধে
আমাদের আত্মত্যাগ
আর ন্যায়ের জন্য স্পর্ধাগুলো
মানুষের স্বাধীন অধিকার নিয়ে
ভাবতে আর বাঁচতে সাহায্য করবে।

স্বপ্ন আর প্রত্যাশার মাঝখানে
কখন আবার আমাদের দেখা হবে
খুব তাড়াতাড়ি নাকি অনেক দেরিতে,
জানিও প্রিয়তমা!

আমাদের জাতির বেড়ে ওঠা আশাগুলো
ন্যায়বিচার পাবেই একদিন
তারা চিরকালের জন্য স্বাধীন হবেই একদিন।

 

PIDF জেল, ফেব্রু ১৯৫৭


নাইজেরিয়া
ওলে সোয়েঙ্কা

নাইজেরিয়ার খ্যাতনামা কবি, নাট্যকার ও রাজনৈতিক কর্মী ওলে সোয়েঙ্কার জন্ম ১৯৩৪ সালে। ১৯৬০-এ নাইজেরিয়ার শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের সময় তিনি বন্দি হন। বিয়াফ্রানদের সহযোগিতা করার অপরাধে তার নির্জন কারাবাস হয়। ১৯৯৭ সালে আমেরিকায় যখন তিনি নির্বাসনে, তখন যুদ্ধবিরোধী প্রচার লেখালেখি ইত্যাদি কাজকর্মের জন্য তাকে ফাঁসির সাজা শোনায় নাইজেরিয়ার আদালত। আফ্রিকার সাহিত্যে অত্যন্ত সম্মানের অধিকারী নোবেলজয়ী (১৯৮৬) কবি সোয়েঙ্কার কলম এখনো সজীব।

 

আমি হাত বোলাই
❑❑

আমি আমার শরীরে হাত বোলাই
যদিও তা এখন নিঃসঙ্গতার চর্বিহীন তেলে
পবিত্র হয়ে উঠছে।
আমি তোমাকে চেয়েছি, সর্বদা, সমসময়
হে সারিবদ্ধ আলো। এসো
সরিয়ে ফেলি অন্ধকার।

আমি আমার কণ্ঠস্বরে হাত বোলাই
তাকে উচ্চারিত হতে দিতে চাই আবারো
অথবা তা মিশে থাক নির্জনে তোমার শূন্যতায়।
অশুভ’র পদচারণা আবার নতুন স্বরের
আগমন ঘটাবে নিশ্চিত।

আমি আমার হৃদয়ে হাত বোলাই
তার আগুন শিখায় নিজেকে সাজিয়ে রাখি,
তোমার ঘৃণার ভেতর পুড়িয়ে ছাই করতে করতে
অশুভকে মরতে পাঠাই এসো।



আলজেরিয়া
লায়লা জাবালি

জন্ম ১৯৩৩। তিনি আলজেরিয়ার একজন অন্যতম বুদ্ধিজীবী এবং কবি। লায়লা আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কারারুদ্ধ হন এবং ফরাসি ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের হাতে নির্যাতিত হন। তার এই কবিতাটি শুধু আলজেরিয়া নয় গোটা আফ্রিকায় সুপরিচিত।

 

আমায় অত্যাচার করার জন্য তোমাকে লেফটেন্যান্ট ডি…
❑❑

তুমি আমাকে থাপ্পড় মেরেছ
যে থাপ্পড় কেউ কখনো আমাকে মারে নি—
বৈদ্যুতিক শক
তারপর তোমার হাতের প্রচণ্ড ঘুষি
তোমার নোংরা খিস্তি
যতটা হওয়া সম্ভব আমি তার চেয়ে ঢের বেশি রক্তাক্ত হয়ে গেছি।
সারা রাত
একটা ইঞ্জিন আমার তলপেটে যাতায়াত করেছে
রামধনুর ধাঁধাঁ ধরিয়েছে আমার চোখে
নিজের গালে নিজেরই কামড় পড়ায় যেন
চোখে জল এসেছে আমার
এভাবে আমি নিজেকে বুঝ মানিয়েছি
আর হাসতে চেষ্টা করেছি।
তারপর সকাল হয়েছে, এসেছে আরো একজন
তোমারই কোনো এক রক্তের দোসর।
আচ্ছা তোমার বউ—
তোমার কফিতে চিনি নেড়ে দেয় তো?
তোমার মা তোমার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে সাহস করেন তো?
তুমি তোমার শিশুর চুলে বিলি কাটো তো লেফটেন্যান্ট?



নাইজেরিয়া
কেন সারো উইয়া

নাইজেরিয়ার পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক কবি, সাংবাদিক কেন সারো উইয়ার জন্ম ১৯৪১-এ। ১৯৯০-এ তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে Movement for the Survival of the Ogoni People। প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের উপর সামরিক হামলা নেমে আসে। কেন সারো গ্রেপ্তার হয়ে যান।

এই আন্দোলনের পিছনে ছিল সাম্রাজ্যবাদী অবাধ লুটের কাহিনি। বহুজাতিক তেল উৎপাদনকারী সংস্থা ‘শেল’ নাইজেরিয়ার ওগোনিল্যান্ড অঞ্চলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করে। চারদিক বিষাক্ত হয়ে পড়ে, পশু পাখি কীট-পতঙ্গসহ পুরো জৈববৈচিত্র্য সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেন সারো এই দানব তেল দস্যুর বিরুদ্ধে দুঃসাহসী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিকেরা তাদের দেশীয় সহযোগী সরকারকে এই আন্দোলন বন্ধ করার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। এবং আন্তর্জাতিক জনমত উপেক্ষা করে ১৯৯৫ সালের ১০ নভেম্বর নাইজেরিয়ার বহুজাতিকের আজ্ঞাবহ স্বৈরাচারী সরকারের সামরিক আদালত কেন সারো উইয়াকে ফাঁসি দেয়।

 

আমরা সবাই জড়িত রয়েছি
❑❑

এটা কোনো ফুটো ছাদওয়ালা
বা প্যানপেনে মশার ঝাঁকে ভরা
জঘন্য কারাকুঠুরি নয়।
ওয়ার্ডেন তোমাকে বন্ধ করার সময়
চাবির যে ঝনঝন শব্দ ওঠে এটা তাও নয়।
এটা কোনো অখাদ্য রেশনও নয়
যা মানুষের তো বটেই পশুরও খাবার অযোগ্য।
অথবা রাতের শূন্যতায় ডুবে যাওয়া
ক্ষুধার্ত একটা দিনও নয় এটা।
এসব কিছুই নয়
এসব কিছুই নয়
এসব কিছুই নয়
এ হলো সেই মিথ্যেগুলো যা পুরুষের পর পুরুষ ধরে
তোমার কানের কাছে ঢাক বাজিয়ে গেছে।
এ সেই নিরাপত্তার দালাল যে ছুটে যাচ্ছে উন্মত্তের মতো
নির্মম দুর্দশায় ভরা হুকুম চালু করতে।
দুপুরের একথালা নগণ্য খাদ্যের বিনিময়ে
বিচারপতি তার খাতায় একটি শাস্তির কথা লিখেছেন
সেটা অনুচিত জানা সত্ত্বেও।
নৈতিকতার জীর্ণতা
মানসিক অক্ষমতা
স্বৈরাচারীর মেদ মাংস
বাধ্যতার কাপুরুষ মুখোশ
ওঁত পেতে থাকে আমাদের আত্মাকে কলঙ্কিত করতে
এ হলো সেই ভয় যা পাজামা ভিজিয়ে ফেলে
আর আমরা যা ধুয়ে ফেলতে সাহস করি না
এসব তাই
এসব তাই
এসব তাই
প্রিয় বন্ধু, যা আমাদের মুক্ত দুনিয়াকে
বিষণ্ন জেলখানার ভেতর ফিরিয়ে দিয়েছে।



দক্ষিণ আফ্রিকা
জেরেমি ক্রোনিন

জন্ম ১৯৪৯। মৃত্যু ২০১২। আফ্রিকার প্রাতিষ্ঠানিক কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাশানাল কংগ্রেসের সভ্য ছিলেন কবি জেরেমি ক্রোনিন। যুক্ত ছিলেন আফ্রিকার মুক্তিসংগ্রামে।

 

নির্জন কারায় রুদ্ধ কমরেডদের জন্য
❑❑

প্রায়ই ওরা একটি করে পাখিকে বন্দি করে খাঁচায়
আকাশ আরো একটু সংকুচিত হয়ে পড়ে।
কোথায় ক্ষুধাহীনতা—
তুমি কমিউন
তোমার বাসি রুটি নিয়ে ঘুরে মরছ
ঘাড়ের উপর ঝুঁকে থাকা বদ আলাপীর
তাড়া এড়িয়ে।
তোমার চোখ
সহস্র চোখগুলোকে
কবে টেনে নিয়ে যাবে উঁচু জানালায়,
যেখানে ধরা দিয়েছে আলোর তরঙ্গ,
কবে, কতদিন পরে?
আকাশজুড়ে দৃশ্য অদৃশ্য
এই প্রশ্ন—
নির্জন সারস হয়ে উড়ে বেড়ায়!



গিনি দ্বীপপুঞ্জ
আমিলকার কাবরাল

জন্ম : ১৯২৪। পর্তুগীজ গিনির জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা, চিন্তাবিদ এবং কবি। আফ্রিকার সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মুক্তি সংগ্রামের খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব কাবরাল গিনির মুক্তিসংগ্রাম চলাকালীন পর্তুগীজ ঔপনিবেশিক সরকারের গুপ্ত চক্রান্তে নিহত হন। তিনি মার্কসবাদী ছিলেন না, কিন্তু মার্কসবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব তার মনে ঘোরতর আশাবাদ জাগিয়ে তুলেছিল।

 

দ্বীপদেশ
❑❑

মাগো, তোমার দীর্ঘ ঘুমের ভেতর
তুমি বেঁচে আছ উলঙ্গ, বিস্মৃত
আর নিস্ফলা হয়ে,
আছাড় মেরেছে বাতাস
বাদ্যযন্ত্রহীন প্রতিধ্বনি তুলে
গান গেয়েছে জলরাশি আর ঘিরে রেখেছে আমাদের..
দ্বীপদেশ :
তোমার পাহাড় আর উপত্যকা
অনুভব করতে পারে নি সময়ের গতিপথ
তারা রয়ে গেছে তোমার স্বপ্নে—
তোমার শিশুদের স্বপ্নে—
দুর্দশারা চিৎকার করে উঠেছে
বয়ে যাওয়া হাওয়া
আর উড়ে চলা বেপরোয়া পাখিদের কাছে।
দ্বীপদেশ :
অনন্ত এক পাহাড়ের মতো আকার নিয়েছে লাল মাটি
—পাথুরে মাটি—
লোমশ পর্বত আটকে রেখেছে সব দিগন্তকে
যখন আমাদের তাবৎ যন্ত্রণাগুলো
বেঁধে ফেলা হচ্ছে ঝড়ো হাওয়ায়।



মোজাম্বিক
জোসে কারভেইরিনহা

জন্ম ১৯২২। মৃত্যু ২০০৩। মোজাম্বিকের খ্যাতনামা কবি। ১৯৬০-এ FRELIMO পরিচালিত মোজাম্বিকের উপনিবেশবাদ-বিরোধী জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিয়ে তিনি জেল খাটেন। আফ্রিকার সুখ্যাত নেগ্রেচুড আন্দোলনের জনকদের অন্যতম ছিলেন কারভেইরিনহা।

 

কালো বিক্ষোভ
❑❑

আমি কয়লা
তুমি আমাকে নির্মমভাবে উৎখাত করেছ মাটি থেকে
আমাকে করে নিয়েছ তোমার মালিকানার খনি
সর্দার!
আমি কয়লা
তুমি আমাকে বসিয়েছ আগুনে
যাতে সারাজীবন আমি তোমার সেবা করে যাই
কিন্তু চিরকাল এসব চলে না
সর্দার!
আমি কয়লা,
আমার ধর্মই উত্তাপে বদলে যাওয়া
আর তোমার শোষণের দুনিয়াটাকে জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া
অঙ্গারে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত জ্বলব আমি
জ্বলব তপ্ত আলকাতরার মতো,
যতদিন তোমার খনি হয়ে থাকব ততদিনই
হে, সর্দার!
আমি কয়লা
আমার প্রকৃতিই আগুনে বদলে যাওয়া
আর সব কিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া নিজস্ব দহনে।
সর্দার, হ্যাঁ, আমি তোমার কয়লা হবো।

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম ১৯৭৬। কবি, গদ্যকার, অনুবাদক এবং চিত্রশিল্পী।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলি [২০০৪]
এই মৃগয়া এই মানচিত্র [ ২০০৮]
পাঁচালি কাব্য : ভুখা মানুষের পাঁচালি [২০০৯]

সম্পাদিত গ্রন্থপুস্তিকা :

রাত্রির কঠোর বৃন্ত থেকে, মানিক শতবর্ষপূর্তি (শমীবৃক্ষ)
নির্মোহ রবীন্দ্রনাথ (শমীবৃক্ষ)

সম্পাদিত পত্রিকা : মাটির প্রদীপ

ই-মেইল : mrinmoyc201@gmail.com