হোম অনুবাদ ‘দূরের হাওয়া’ থেকে

‘দূরের হাওয়া’ থেকে

‘দূরের হাওয়া’ থেকে
757
0

 

এবার একুশের মেলায় ‘চৈতন্য’ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে কবি জুয়েল মাজহারের দূরের হাওয়া  নামে অনুবাদ-কবিতার বই। পরস্পরের পাঠকদের জন্য কয়েকটি কবিতা এখানে ছাপা হলো।

গুরুত্বপূর্ণ এ বইটি সম্পর্কে জানতে আরও পড়ুন : দূরের হাওয়া নিয়ে

 


উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস (William Butler Yeats)

(১৩ জুন ১৮৬৫—২৮ জানুয়ারি ১৯৩৯)


দ্বিতীয়াগমন
[The Second Coming]
.

ক্রমায়ত চক্রতে অবিরাম খেয়ে খেয়ে পাক
শুনতে পায় না বাজ মনিবের ডাক;
ধসে পড়ে সবকিছু, কেন্দ্র পারে না আগলাতে,
নিখিল নৈরাজ্য এক আরূঢ় হয়েছে পৃথিবীতে;
রুধির-মলিন ঢেউ ভেঙেছে অর্গল, আর
সারল্যের নান্দীপাঠ ডোবে দিকে দিকে;
শ্রেষ্ঠরা প্রতিজ্ঞাহীন বিলকুল, আর নিকৃষ্টজনেরা
আতীব্র উল্লাসে বেসামাল।

নিশ্চয় আসন্ন কোনো পুনরুন্মোচন
নিশ্চয় আসন্ন সেই দ্বিতীয়াগমন
দ্বিতীয়াগমন আহা! কথাগুলি বলতে-না-বলতেই
জগতের মর্মবিদারী এক মূর্তি আলিশান,
আমার দৃষ্টিকে সে করছে পীড়ন; মরুবালু-জঞ্জাল এক খরসান;
এক অবয়ব, যার দেহটা সিংহের আর মুণ্ডু মানুষের,
সূর্যের মতো সেই চাহনিটা ফাঁকা, নির্মম;
চলেছে মন্থর-ধীর ঊরু টেনে টেনে, আর তাকে ঘিরে
ক্রুদ্ধ মরুপক্ষীদের ছায়াগুলি অবিশ্রাম মারছে চক্কর।
ঘনায় আঁধার ফের, তবু আমি জেনেছি এবার
পাষাণ-নিদ্রায় মগ্ন সুদীর্ঘ কুড়ি শতকেরে
দুঃস্বপ্নে করেছে তাড়িত এক দোদুল দোলনা,
আর কত কদর্য সেই জানোয়ার, অবশেষে যার অন্তিম মুহূর্ত সমাগত,
পা হড়্‌কে চলেছে সে বেথ্‌লেহেমে জন্ম নেবে বলে?

 

সুরাপানের গান
[A Drinking Song]
.

সুরা আসে মুখে
আর প্রেম আসে চোখে;
জরা ও মরণ ঘনাবার প্রাক্কালে
এটুকুই শুধু জানবো সত্য বলে।
তুলে ধরি মুখে সুরার পাত্রখানি,
তোমাকে দেখি, আর হু-হু শ্বাস টানি।

 


রবার্ট ফ্রস্ট (Robert Frost)

(২৬ মার্চ ১৮৭৪—২৯ জানুয়ারি, ১৯৬৩)


তুষার-সন্ধ্যায় বনের কিনারে থেমে
[Stopping by Woods on a Snowy Evening]
.

কার এই বনভূমি, মনে হয়, চিনি আমি তারে।
বুঝিবা বাড়িটি তার কাছেপিঠে গাঁয়ের ভেতরে;
পড়বে না চোখে তার আমি যে এখানে থামলাম
দেখতে তার বনভূমি ঢেকে যেতে তুষারে তুষারে।

ছোট্ট আমার ঘোড়া হয়তোবা অবাক হয়েছে
কী হেতু এখানে থামা, যেহেতু খামার নেই কাছে
দুই পাশে বন আর হ্রদ শুধু বরফ-জমাট
বছরের গাঢ়তম গোধূলি এখানে ঘনায়েছে।

গলতি হয়েছে কোনো এই ভেবে টাট্টু আমার
গলার ঘুন্টিটাকে নাড়লো একবার।
আরো যে শব্দ এক কানে বাজে সেটা
ঝিরিঝিরি হাওয়া আর মিহি তুষারের।

গহনগভীর মধুর কালো এ-বন,
তবু যে আমার রয়েছে একটি পণ,
ঘুমাবার আগে দিতে হবে পাড়ি যোজন যোজন
ঘুমাবার আগে দিতে হবে পাড়ি যোজন যোজন।

 


আন্না আখ্‌মাতোভা (Anna Akhmatova)

(২৩ জুন ১৮৮৯—৫ মার্চ ১৯৬৬)


থিবিসে আলেকজান্দার
[Alexander at Thebes]
.

যদিওবা বয়সে তরুণ, তবু, রাজা তিনি ভয়াল-ভীষণ,
দিলেন নির্দেশ: ‘‘দাও থিবিসকে মাটিতে গুঁড়িয়ে!’’
বুড়ো সেই সেনাপতি ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে ভাবলেন,
এ-নগর আত্মগর্বী…এর কত শৌর্যগাথা গীত হতে তিনি দেখেছেন।

বললেন রাজা, ‘‘যাও, সবখানে আগুন লাগাও!
উপাসনালয়ে আর ফটক-তোরণে, যত হর্ম্য-মিনারে…’’

তবুও কী ভেবে যেন অকস্মাৎ উদ্ভাসিত হলো তার মুখ:
‘‘ সাবধান, কবির আলয়ে যেন এতটুকু না লাগে আঁচড়!’’

 


হোর্হে লুইস বোর্হেস (Jorge Luis Borges)

(২৪ আগস্ট, ১৮৯৯—১৪ জুলাই ১৯৮৬)


দুই ভাইয়ের মিলোঙ্গা
[Milonga of Two Brothers]
.

গিটার আমাদের গল্প এনে দিক সেদিনকার
যখন ঝিল্‌কে উঠতো চাকুগুলি,
গল্প যতসব জুয়া ও পাশা নিয়ে,
ঘোড়ার দৌড় আর অমিত পানের,
কোস্তা ব্রাভা আর গরুর ব্যাপারি
বুড়োর চলাপথ নিয়ে সে কাহিনি।

যারাই আসে বটে সবারই ভালো লাগে
গল্প একখানা গতকালের;
নিয়তি নিয়ে কোনও চলে না দরাদরি,
এবং ওর দোষ খোঁজাটা অনুচিত—
এখন আসে জানি আজকে রাত্রে
কত না স্মৃতিরাশি দক্ষিণের।

শুনুন জনাবেরা, ইবেরা ভাইদের
নিয়ে সে গল্পটা—
প্রেমিক মর্দ এবং যোদ্ধা,
সবার আগে তারা বিপদে দিতো ঝাঁপ,
চাকুর খেলা যত, ছিল না জুড়ি কোনো,
আর সে-তারা আজ ছ’ফুট নিচে শুয়ে।

লালসা অহমিকা এমতো যত কিছু
গভীর রসাতলে সতত টেনে নেয়;
সাহস সেও জেনো ধরায় ঘেন্না
মাতলে তাকে নিয়ে দিবস, রাত্রি।
দুইটি ভাই তারা, ওদেরই ছোটটির
অনেক ভারী ছিল খুনের পাল্লা।

হুয়ান ইবেরা যখনই দেখল
ছোটটি তাকে ঠিক দিয়েছে টেক্কা,
তখন তার আর পরানে সইল না,
পাতলো ফাঁদ এক, যাতে ও ধরা দ্যায়।

কোস্তা ব্রাভাতীরে মারল ওকে সে
একটি বুলেটেই।

তাই তো আজ আমি সত্যনিষ্ঠায়
বলেছি এ-কাহিনি আদ্যোপান্ত;
কাবিল তাকে নিয়ে রচিত এ-কাহিনি
সতত খুন যে করছে কাবিলেরে।
.

[Eng. Trans. By Norman Thomas di giovanny]

 

ব্রাউনিং কবি হতে চাইলেন 
[Browning Decides to Be a Poet]
.

লন্ডনের এইসব লাল গোলকধাঁধার ভেতর
আমি দেখলাম, সব আহ্বানের মধ্য থেকে
অদ্ভুততমটিকেই বেছে নিয়েছি আমি
ওটা ছাড়া, যে কোনো আহ্বানই অদ্ভুত তার নিজের মতো।
প্রতিদিনের শব্দগুলোকে আমি তৈরি করে নেব
আদি সেই রসায়নবিদের মতো
যিনি পারদের মধ্যে খুঁজে ফিরতেন দার্শনিকের সমাধিপাথর—
জুয়াড়ির মার্কামারা তাসেরা, অভিন্ন সেই মুদ্রা—
মেলে ধরে সেই জাদু, যা ছিল তাদেরই নিজস্ব
যখন থর ছিল একই সঙ্গে ঈশ্বর আর কোলাহল,
প্রার্থনা আর বজ্রকরতালি।
আজকের দিনের ভাষায়
চিরায়তকে বলব আমি আমার আপন রীতিতে:
বায়রনের মহা-প্রতিধ্বনির যোগ্য হয়ে ওঠার
চেষ্টা করব আমি
যে-আমি ধুলোমাত্র, সেই আমিই হ’য়ে উঠব অভেদ্য
কোনো নারী যদি আমার প্রেমকে ভাগাভাগি করে নেয়
স্বর্গের ঘনীভূত দশম গোলকটিকে স্পর্শ করবে আমার কবিতা; আর
যদি কোনো নারী আমার প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করে হেলায়
আমি তবে আমার বিষাদকে ক’রে তুলব সঙ্গীত,
সময়ের মধ্যে এক পূর্ণতোয়া কলস্বরা নদী বয়ে যাবে।
নিজেকে ভুলে থাকার মধ্যেই বেঁচে রইব আমি।
হবো সেই মুখশ্রী যাকে চকিতে দেখি আর ভুলে যাই,
হবো সেই জুডাস, যে বেছে নেয়
বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠবার পরমব্রতকে,
আমি হবো সেই ক্যালিবান, যে বন্দি
তার নিজেরই পাঁকে,
হবো এক ভাড়াটে সেনা, যে কোনোরূপ ভয় আর
বিশ্বাস ব্যতিরেকেই ঢলে পড়ে মৃত্যুতে;
পলিক্রেতাস হবো আমি, ভয়ার্ত-বিমূঢ় চোখে যে তাকায়
ভাগ্যদেবীর ফিরিয়ে দেওয়া মোহরের দিকে।
আমি হবো সেই বন্ধু, যে ঘৃণা করে আমাকে
পারস্যবাসীরা আমাকে দেবে বুলবুল, আর রোম দেবে তরবারি
মুখোশ, তীব্র যাতনা, পুনরুত্থান
বুনবে আর খুলে দেবে এ-আমার জীবনের তাঁত,
আর এভাবেই একদিন আমি হ’য়ে উঠব রবার্ট ব্রাউনিং
.

[Eng. Trans. Norman Thomas di giovanny]

   


পাবলো নেরুদা (Pablo Neruda)

(১২ জুলাই ১৯০৪ –২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩)


জলপরি ও মাতালদের কাহিনি
[Fable of the Mermaid and the Drunks]
.

ঘরটিতে মরদেরা সবাই জুটেছে; তখুনি ভেতরে এসে
ঢুকলো সে পুরো বিবসনা।
মদ খেতে খেতে ওরা ছিটাতে লাগলো ওর সারা গায়ে থু-থু ।
নদী থেকে সবে উঠে আসা, ও ছিল সরল আলাভোলা।
ও তো এক জলপরি পথ ভুলে এসেছে এখানে।
ঝলোমলো অঙ্গে ওর বিদ্রূপের তুবড়ি গেল বয়ে।
খিস্তিতে-খিস্তিতে ওর হেমস্তন হয়েছে আবিল।
কান্না কাকে বলে ওর জানা নেই, চোখে তাই অশ্রু গড়ালো না ।
পরিধেয় কাকে বলে জানত না, সে-কারণে ছিল বিবসনা।
সিগারেটে-ছ্যাঁকা দিয়ে, বোতলের পোড়া ছিপি দিয়ে ওকে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে
সরাইয়ের মেঝে জুড়ে গড়াগড়ি খেলো ওরা ইতর হাসিতে।
সুদূর প্রেমের রঙে সেজেছিল ওর দু’নয়ন;
ওর জোড়া বাহু যেন দুধশাদা পোখরাজে গড়া।
শব্দহীন জোড়া ঠোঁট কেঁপে উঠল প্রবালের গোলাপি আভায়;
আর সেই দরজাপথে হঠাৎই সে বাইরে হারাল।
নামল নদীতে যেই, জলে ধুয়ে গেল সব আবিলতা চোখের পলকে।
তুলল ঝিলিক ফের দেহ তার; বৃষ্টিঘোরে যেন কোনো শ্বেত মর্মর।
একবারও পিছু ফিরে তাকালো না;–দিল সে সাঁতার
ভেসে গেল শূন্যতার পানে শুধু , ভেসে গেল আপন মৃত্যুতে।

 


অক্তাবিও পাস (Octavio Paz)

(৩১ মার্চ, ১৯১৪—১৯ এপ্রিল ১৯৯৮)


ঝড়
[Tempest]
.

আঁধার পর্বতে বৃষ্টি বাজে আর তোলে নিনাদ;
সে-সময় ঘুমন্ত দেহের যুগল খাড়াই ধরে
এগিয়ে চলো তুমি।

অন্ধকারে তোমার স্বপ্নের সঙ্গে যুদ্ধরত হাওয়া;
সবুজ আর শ্বেতকায় জঙ্গল;

শিশু ওক, লক্ষ বর্ষজীবী ওক।

হাওয়া তোমায় উপড়ে ফ্যালে, আর
টেনে নামায় আর ধ্বংস করে।

সে তোমার ভাবনাগুলোকে
খুলে ফ্যালে আর ছড়িয়ে দ্যায়।

চোখে তোমার ঘূর্ণি তোলে,
কেন্দ্রে তোমার ঘূর্ণি তোলে;
শূন্যতা আর ঘূর্ণি হাওয়া।

একটি গুচ্ছের মতো তোমায় জড়িয়ে রাখে হাওয়া!

তোমার ললাটে ঝড়, তোমার গ্রীবায় ঝড়, আর
ঝড় তোমার উদরে।

ঝড় শুকনো ডালের মতো তোমার বাকল নেয় খুলে।
ঝড় স্বপ্নের ভেতরে তোমার বৃষ্টিধারাকে
ফালি ফালি করে।

রাত্রির পাথুরে গলায় সবুজ আর কালো কালো পা
তোমার দেহের সূত্রে বাঁধা।

বৃষ্টি বেজে চলে যুগল ঊরুতে তোমার;
জল আর পাথরের স্বগত সংলাপ।

পাখিদের নদীর মতন
ভুরুর ঊর্ধ্বমুখ উপত্যকা তুমি পার হয়ে যাও।

আহত ষাঁড়ের মতো ঘাড় নুইয়ে দ্যায় বনভূমি,
হাওয়ার ডানার তলে হাঁটু মুড়ে আছে বনভূমি।
ঊর্ধ্বে আরো ঊর্ধ্বে
অন্ধকার আরো অন্ধকার
গভীর আরো গভীর
বৃষ্টি বেজে চলে শরীরে তোমার!

 


টম গান্‌ (Tom Gunn)

(২৯ আগস্ট ১৯২৯—২৫ এপ্রিল ২০০৪)


যিশু ও তার মা
[Jesus And His Mother]
.

সবেধন পুত্র মোর, আমার চেয়েও বেশি ঈশ্বরের তুই
থেকে যা এখানে এই নাশপাতি গাছের বাগানে।
সুপ্রচুর ফলভারে এইখানে গাছেরা আনত
তৃপ্ত আর পরিমিত রঙের বাহারে উদ্ভাসিত;
বার্ধক্যপীড়িত হয়ে তারা যেই কাঁদে, নোনাজল
নয় কোনো, সুমধুর অলস সিরাপে অশ্রু ঝরে।

“আমার নিজের আমি আর আমি থাকি না নিজের”

তাকে দেখে মনে হতো বেগানা নাগর,
চুপচাপ সে-বিদেশি,পদ্মডাঁটা হাতে নিয়ে
এসেছিল আমার দুয়ারে;
ঈশ্বরের জোড়াচক্ষু, ইউসুফেরও চোখের অধিক
গনগনে তার চোখে চোখ রেখে
কী হলো আমার আমি কী করে বোঝাই?

ছিলাম নিজের আমি আর আমি থাকিনি নিজের।

আর এই জনা-বারো শ্রমশীল লোক, এরা কারা?
তোর কথা মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি না:
আমি তোকে শিখিয়েছি বুলি আর রেখেছি পাখির নামগুলি
যে কোনো শিশুর মতো তুই
দেখাতি ওদের যারা দীর্ঘ পরিযায়ী।
ভিড় থেকে দূরে গিয়ে তুই ফের হয়ে যারে চুপ
“আমার নিজের আমি আর আমি থাকি না নিজের”
আমি যেই কথা বলি মুখভার কেন তোর বাপ?
এই তোর মালামাল, চাকু ও করাত
আর এই হাতুড়িটা রইল এই বেঞ্চির ওপরে। দিনে দিনে
হয় মাপা এইখানে তোর এ-জীবন,
মাপজোক নিয়ে তুই আসবাব বানাস যেমন;

আর আমি পত্নী হেন তোকে দেবো পাঠ;
আমার নিজের হবো আর হবো কেবলই আমার!

ইচ্ছেমতো যথাতথা বয়ে চলে বেয়াড়া বাতাস
দিলখোশ না হলে কি কেউ চলে তার অনুরূপ?
আজও মনে পড়ে, তুই গিয়েছিলি আলাপ জমাতে
পশমের আলখাল্লাধারী যত পণ্ডিতের সাথে।
কানে এল শহরের তীব্র হট্টগোল;
এ-অশুভ যন্ত্রখানি কে বয়ে বেড়ায়?
“সে তার নিজের আর নয় সে নিজের”
মাড়িয়ে সবুজ আর দ্রুত-তৃণ গালিচা মাড়িয়ে
দেখি এক আজগুবি ছায়া এসে পড়ে;
ও মানিক, এই পেটে তোকে আমি ধরেছি রে একা!
ছিলো না নিকটে কোনো কবিরাজ নাড়ি কাটবার;
ডাকব না তোকে আমি প্রভু বলে ওরে
সবেধন পুত্র মোর, দে আমায় সাড়া!

“আমার নিজের আমি আর আমি নই তো নিজের।”

 


আদোনিস (Adonis)

(জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৩০)


শৈশব-বন্দনা
[Celebrating Childhood]
.

এমনকি বাতাসও চায় হতে
প্রজাপতি-টানা
একটি এক্কা গাড়ি।

মনে পড়ে যায়, পাগলামি
দিয়েছিল প্রথম হেলান মনের বালিশে।
তখন আমি কথা বলছিলাম আমার দেহের সাথে
আর, আমার দেহটা ছিল একটি ধারণা কেবল
যা আমি লিখে রেখেছিলাম লাল কালিতে।
লাল হচ্ছে সূর্যের সবচে সুন্দর সিংহাসন
আর বাকিসব রঙ
লাল জায়নামাজে প্রার্থনায় রত।

রাত্রি হচ্ছে আরেক প্রদীপ।
বাহু এক, প্রতিটি বৃক্ষশাখায়;
একটি বার্তা বয়ে নেওয়া হয় মহাশূন্যে, যাতে
বাতাসের শরীরের প্রতিধ্বনি জাগে ।

যখনই আমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়
কুয়াশার পোশাক পরবে বলে বায়না ধরে নাছোড় সূর্যটা:
আমাকে কি বকে দিচ্ছে আলো?

ওহে, আমার ফেলে আসা দিন—
হাঁটাহাঁটি করত তারা নিজেদের ঘুমের ভেতরে
আর আমি কতকিছু তাদের বিষয়ে শিখতাম।

প্রেম আর স্বপ্ন এরা দুটো লঘু বন্ধনী।
এ-দুয়ের মাঝখানে দেহ রেখে আমি
দুনিয়াকে আবিষ্কার করি।

কতবার আমি
ঘাসের যুগল পায়ে হাওয়াকে দেখেছি উড়ে যেতে
আর, হাওয়া দিয়ে তৈরি পায়ে রাস্তাটি চলে নেচে নেচে।

আমার আকাঙ্ক্ষাগুলি ফুল
আমার দিনগুলোকে রঙিন করে তোলে।

অকালে ক্ষতের শিকার হই আমি,
আর অকালে শিখেছি
ক্ষতরাই আমার কারিগর।

আজো আমি চলি সেই শিশুর পেছনে
যে এখনো আমার ভেতরে চলে হেঁটে।

সে এখন আলো দিয়ে তৈরি এক সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে
বিশ্রামের জন্য আর রাত্রির মুখখানি ফের
পাঠের জন্য এক উপযুক্ত কোণ খুঁজে ফেরে।

রাত্রি যদি হতো একটা বাড়ি,
আমার গা-দুটো তবে এর দোরগোড়ায় ঘুণাক্ষরে যেতেই চাইত না।

তাদের গ্রহণ করে ধুলো,
মৌসুমি হাওয়ার কাছে আমাকে যা বয়ে নিয়ে যায়।

বাতাসে একটি হাত
রেখে আমি হাঁটি,
অন্য হাতটি, যা-আমি-কল্পনা করি,
তার গায়ে আদর বোলায়।

মহাশূন্যের মাঠে
একটি নক্ষত্র, সে-ও এক চিলতে নুড়ি।

দিগন্তরেখায় যাকে
যুক্ত করা হলো, সেও পারে
বহু-বহু আনকোরা রাস্তা বানাতে।

একটি চাঁদ, বুড়ো এক,
রাত্রি হলো তারই আসন;
আর, আলো তারই হাঁটবার লাঠি।

যে ঘরে জন্মেছিলাম তারই ধ্বংসস্তূপে
এলাম যে দেহটাকে ফেলে
সে দেহকে কী বলব আমি?

যেসব তারারা জ্বলে সে-বাড়ির মাথার উপরে
আর যারা রেখে আসে গোধূলির পথে পদচ্ছাপ
তারা ছাড়া আর কেউই আমার
শিশুকালের বর্ণনা দিতে পারবে না।

এখনো আমার শৈশব
জন্ম নিচ্ছে একটি আলোর করতলে
আমি তো জানি না তার নাম
আর, সে আমাকে নাম দ্যায় উপহার।

ওই নদী থেকে একটি আয়না সে আমায় দিয়েছে বানিয়ে
আর, এরই কাছে জানতে চেয়েছে তার দুঃখ বিষয়ে।
আপন দুঃখ থেকে বৃষ্টিকে সে করেছে নির্মাণ, আর
মেঘেদের করেছে নকল।

তোমার শৈশব এক গ্রাম।
যত দূরে যাও তুমি
কখনোই পারবে না সে-গ্রামের সীমানা পেরোতে।

তার দিনগুলো সবই হ্রদ
স্মৃতি তার ভেসে চলা দেহ।.

যে তুমি আসছ নেমে
অতীতের পর্বত থেকে,
বেয়ে উঠবে ফের তুমি কী করে সেসবে,
আর, কেনইবা সেটা করতে যাবে ?

সময় দরোজা এক
সেটি আমি খুলতে অপারগ।
আমার জাদুটি আজ লাগছে না কাজে,
ঘুমিয়ে পড়েছে আমার সকল স্তব-গান।

ছোট্ট ও গোপন এক জরায়ুর মতো এক গাঁয়ে
আমি জন্মেছিলাম।
কখনো যাই নি একে ছেড়ে।

তীর নয়, আমি বিপুল সাগর ভালোবাসি।
.

[Eng.Trans. by Khaled Mattawa]

 


টোমাস ট্রান্সট্রোমার (Tomas Tranströmer)

(১৫ এপ্রিল ১৯৩১—২৬ মার্চ ২০১৫)


আবহচিত্র
.

পিঠে মরীচিকার ডানা।—এই নিয়ে
অক্টোবরের সাগর তুলছে তার ঠান্ডা ঝলক

নৌকা-দৌড়ের সেই ঝিমধরা স্মৃতিকে
উসকে দেবার মতো অবশিষ্ট কিছু আর নেই

গ্রামের উপরে হলুদাভা
আর ওই ধ্বনিপুঞ্জ ধীরে উড়ে যায়

কুকুরের ঘেউ এক গূঢ়লিপি
আঁকা আছে বাগানের উপরে হাওয়ায়

গাছকে বানিয়ে বোকা সে বাগানে হলুদাভ ফল
আপনা থেকে নিচে ঝরে পড়ে।
.

[Robin Fulton–এর ইংরেজি অনুবাদ Weather Picture – এর বাংলা ভাষান্তর]

 

কোকিল
.

বাড়িটার ঠিক উত্তর দিকটায় বার্চগাছের ডালে বসে ডেকে
গেল একটি কোকিল। ওর গলার স্বর এতটাই চড়া যে
প্রথমে ভাবলাম বুঝিবা কোকিলের ডাক নকল করে গাইছে
কোনো অপেরা-গায়িকা। অবাক হয়ে পাখিটার দিকে
তাকালাম। কুহু ডেকে ওঠার সময় প্রতিবারই চাপকলের
হাতলের মতো উঠছে-নামছে ওর লেজের পালক। পাখিটা
দু’পায়ে লাফালো, ঘুরে ওড়ার প্রস্তুতি নিল আর চতুর্দিকে
ছড়িয়ে দিল গলার চিৎকার। তারপর ঝটিতি আকাশে উঠে
গজরাতে গজরাতে বাড়িটার ওপর দিয়ে উড়ে গেল দূরে
পশ্চিমে… গ্রীষ্ম বুড়িয়ে যাচ্ছে আর সবকিছু বইছে অভিন্ন
এক বিষাদের সুরে। কুকুউলাস ক্যানোরাস, ইউরোপের
কোকিল, গ্রীষ্মমণ্ডলে ফিরে যায়। সুইডেনে এর দিন
ফুরিয়েছে। এখানে ও স্বল্পকাল ছিল। এ-কোকিল আসলে
জায়ারের নাগরিক… ভ্রমণ এখন আর আমাকে টানে না।
কিন্তু ভ্রমণ নিজেই আমাতে ভ্রমণ করে যায়। এই যে এখন আমি
ক্রমাগত কোণঠাসা, এই যে এখন বর্ষবৃত্তটি ক্রমশ বড়
হচ্ছে আর আমার দরকার হয়ে পড়ছে একজোড়া চশমা।
সর্বদাই ঘটনার ঘনঘটা আমাদের সহ্যসীমা পার হয়ে যায়।
অবাক হবার মতো কিছু আর নেই। এসব ভাবনা বিশ্বস্ততার
সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলেছে আমাকে, ঠিক যেমন লিভিংস্টোনের

মমি করা মরদেহ আফ্রিকার ভেতর দিয়ে সোজা

কাঁধে বয়ে এনেছিল সুসি আর চুমা।
.

[Malena Mörling, Patty Crane  ও  John F Dean
–এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলা ভাষান্তর]

জুয়েল মাজহার

জুয়েল মাজহার

জন্ম ১৯৬২ সালে; নেত্রকোণা। মার্কসবাদী। কোনো অলৌকিকে বা পরলোকে বিশ্বাস নেই। ঘৃণা করেন পৃথিবীকে খণ্ড-ক্ষুদ্র করে রাখা সীমান্ত নামের অমানবিক ‘খাটালের বেড়া’। লেখেন মূলত কবিতা, বিচিত্র বিষয়ে প্রচুর অনুবাদও করেন।

বর্তমান পেশা সাংবাদিকতা। কৈশোরে বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশযাত্রা। দীর্ঘ ভবঘুরে জীবন। পেটের দায়ে নানা কাজ। যৌবনের একটা বড় অংশ কেটেছে পাহাড়ে। সেভাবে বাড়ি ফেরা হয় নি আর।


কবিতার বই :
দর্জিঘরে একরাত [ফেব্রুয়ারি ২০০৩, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা]
মেগাস্থিনিসের হাসি [ফেব্রুয়ারি ২০০৯, বাঙলায়ন প্রকাশনী, ঢাকা]
দিওয়ানা জিকির [ফেব্রুয়ারি ২০১৩, শুদ্ধস্বর, ঢাকা]

অনুবাদগ্রন্থ :
কবিতার ট্রান্সট্রোমার (নোবেল সাহিত্যপুরস্কারজয়ী সুইডিশ কবি টোমাস ট্রান্সট্রোমারের বাছাই করা কবিতার অনুবাদ সংকলন) [শুদ্ধস্বর, ফেব্রুয়ারি ২০১২]
দূরের হাওয়া (বাংলা অনুবাদে ২০০ বিশ্বকবিতা) [চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : jewel_mazhar@yahoo.com
জুয়েল মাজহার