হোম অনুবাদ তিন ভাষার চার কবির কবিতা : ভাষান্তর জুয়েল মাজহার

তিন ভাষার চার কবির কবিতা : ভাষান্তর জুয়েল মাজহার

তিন ভাষার  চার কবির কবিতা : ভাষান্তর জুয়েল মাজহার
663
0

কবিতার অনুবাদ হতে পারে আক্ষরিক আর ভাবানুবাদ।
আমরা আলাদাভাবে কোনোটারই বিরোধিতা করি না, শুধু অনুবাদটাকেও
শেষ পর্যন্ত কবিতা হয়ে উঠতে হয়।
সমস্যা হলো অনেকেই সেটা পারছেন না। ভাবানুবাদে শেষ পর্যন্ত হয়তো দেখা যায়, কবিতাটি যার,
শেষমেশ আর তাঁর থাকছে না। আবার আক্ষরিক অনুবাদে হয়তো কবিতাটির
একটা অর্থই করা যায়, মূল সুরটি ধরা যায় না।
জুয়েল মাজহার মূল সুরটি স্পর্শ করেন। তাঁর অনুবাদের সাথে যারা পূর্বপরিচিত
তারা নিশ্চয়ই জানেন এই ব্যাপারটি।
জুয়েল মাজহার কবি, এটা বোধ হয় একটা কারণ। আর কবিতার অনুবাদ প্রকৃতপক্ষে কবিকেই করতে হয়।
আরেকটা কারণ হতে পারে, তিনি সবসময়েই কবিতার মধ্যে থাকেন।
কবিতার অন্তর্গত অভিঘাতটি স্পর্শ করতে চান তিনি।
পরস্পরের জন্য বিশ্বসাহিত্যের চারজন উল্লেখযোগ্য, মহান কবির কয়েকটি কবিতা
অনুবাদ করেছেন জুয়েল মাজহার
অ্যাংলো-অ্যামেরিকান কবি টি. এস. এলিঅট, চিলির কবি পাবলো নেরুদা,
স্পেনের কবি ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকা এবং রুশ কবি বেল্লা আখ্‌মাদুলিনা
এদের অনেক কবিতাই আমরা অনুবাদে পড়েছি। সেসব অনুবাদের সাথে জুয়েল মাজহারের অনুবাদের একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে।
পাঠক, পাঠ করুন। নিজেই ধরতে পারবেন সেই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি।

বয়ঃকনিষ্ঠকে আগে রেখে এখানে ক্রম সাজানো হয়েছে।

 

bbb
অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম

 

নীরবতা

কে এসে আমার কেড়ে নিয়ে গেছে কণ্ঠস্বর?
গলায় আমার রেখে গেছে এক কালো জখম
আমার এখন ডুকরে কাঁদাও অসম্ভব।
.
তুষারের তলে চলে মার্চের ক্রিয়াকলাপ
কণ্ঠে আমার পাখিরা সবাই গেছে মরে,
তাদের কানন অভিধানে রূপ নেয় এখন।
.
ঠোঁটের কাছে মিনতি করি গান শোনার,
তুষার-ধস, খাড়া পাহাড়, ঝোঁপঝাড়ের
ঠোঁটেরা যেন, মিনতি এই , শোনায় গান।
.
আমার ঠোঁটের মাঝখানে, সুগোল হাওয়া
আমার মুখের ভেতরটায়;
যেহেতু এখন
পারি নে কিছুই বলতে আর।
.
তুষারের নিচে চাপাপড়া সব গাছপালার
জন্য আমি করবো সব
দোলাই দু’বাহু, শুয়ে শুয়ে একা টানছি শ্বাস ।
.
সব শব্দের নামের প্রেমিক মৃত্যু—যে,
তারই মতোন আচমকা এ-স্তব্ধতা—এর থেকে
গানের ভেতর জাগাও আমায় এইবেলা।
.
…    …   …   …   …   …[ Silence ]
 .

রাতের বেলা


কী ক’রে ডাক পাড়ি? কী ক’রে হাঁক পাড়ি?
নীরবতায় পলকা সব কাচের অবিকল।
এলিয়ে মাথা রিসিভারে টেলিফোনটা ঘুমায় সুখের ঘুম।
ঘুমিয়ে পড়া শহর বেড়াব চষে
তুষারিত এক গলিপথ ধরে হেঁটে।
তোমার ঘরের খিড়কি অবধি যাবো
চুপিসারে আর সুকোমল পদভারে
.
আগলে রাখবো পথ-মর্মর থেকে
তোমাকে আমার করতল দিয়ে ঢেকে,
গলা-তুষারের স্বর বাজে পথে পথে।
নেভাবো প্রদীপ তোমার দু’চোখ
যেন ডুবে রয় ঘুমে।
রাতের শব্দ যেনবা সুচারু থাকে
বসন্তকে দেবো আমি নির্দেশ।
.
যে তুমি ঘুমাও কে গো তুমি কোন লোক!
তোমার এ-দু’টি হাত কতো নড়বড়ে
কতো অবসাদ লুকানো চোখের ভাঁজে—
এতোটুকু তার চিহ্ন যেন না থাকে
ওদেরকে আমি চুম্বন দেব কাল।
.
শিয়রে তোমার নিশিভোর ক’রে জেগে,
তুষারে আমার পদরেখা ভুলে তবে,
গত শরতের শুকনো পাতাকে দ’লে,
অনাবিল সেই তুষার-সকালে
তারপর যাব চলে।
.
…    …   …   …   …   …[ At Night ]
.
ppp
অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম


তোমার হাসি

.
যদি চাও তবে কেড়ে নাও তুমি রুটি আমার
হাওয়াকে তুমি নাও কেড়ে; তবুও তোমার
হাসিখানা কেড়ে নিও না হে
.
এই গোলাপকে নিও না হে
তুমি কুড়াও যে বর্শাফুল
একে তুমি কেড়ে নিও না হে ,
আচমকা এক আহলাদে
যে-জল ছুটছে দিগ্বিদিক ,
তোমার ভেতর হঠাৎ যে
জন্মাল ওই রুপোর ঢেউ
তাকে কেড়ে তুমি নিও না হে।
.
লড়াই আমার কঠোর আর কখনো-কখনো
জীর্ণ-অচল দুনিয়াটা দেখে আমি
ক্লান্ত এ-দু’টি চোখ নিয়ে ফিরে আসি;
তোমার এ-হাসি তবুও যখন ঢুকে পড়ে আলগোছে
তখন আমায় খুঁজতে খুঁজতে উঠে যায় আসমানে;
আর এ-আকাশ আমার জন্য দ্যায় খুলে দ্যায়
এই জীবনের সকল দুয়ার ।
.
লড়াই আমার কঠোর আর কখনো-কখনো
জীর্ণ-অচল দুনিয়াটা দেখে আমি
ক্লান্ত এ-দু’টি চোখ নিয়ে ফিরে আসি;
তোমার এ-হাসি তবুও যখন ঢুকে পড়ে আলগোছে
তখন আমায় খুঁজতে খুঁজতে উঠে যায় আসমানে;
আর এ-আকাশ আমার জন্য দ্যায় খুলে দ্যায়
এই জীবনের সকল দুয়ার।
.
শরৎ এলেই সাগরের তীর ঘেঁষে
জানি নিশ্চিত হাসিটা তোমার
তুলবে সে তার ফেনার প্রপাত, আর
যে ফুলের জন্য আমি থেকেছি অপেক্ষায়
প্রিয়তমা ওহে, এই বসন্তে
সেই ফুলটির মতন তোমার হাসিটুকু ফিরে চাই,
ফিরে চাই আমি অনুরণনের ধ্বনিকম্পিত
আমার দেশের সেই নীল ফুল, গোলাপ আবার।
.
রাত্রির পানে চেয়ে হেসে ওঠো
দিনটির পানে, চাঁদটির পানে,
ওই দ্বীপটার দুমড়ানো যতো
সড়কের পানে চেয়ে তুমি ওঠো হেসে,
অপটু-আনাড়ি যে-ছেলে তোমায়
ভালোবাসে, ওর মুখপানে চেয়ে হাসো,
কিন্তু যখন আমার দু’চোখ
খুলি আর বুজি আমি,
যখন আমার এগোয় কদম,
যখন আমার কদমেরা আসে ফিরে,
দিও না আমায় রুটি ও হাওয়া
আলো, বসন্ত,
কিন্তু তোমার হাসিটুকু কেড়ে নিও না কখনো
তাহলে আমি যে নির্ঘাৎ যাবো মরে।
.
…    …   …   …   …   …[ Your Laughter ]
llll
অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম

 

সেরেনাদ

.
রাত্রি ভেজায় তনুখানি তার
নদীটির তীর ধরে
আর লোলিতার বুকে
প্রণয়কাতর উচাটন ডালপালা
.
প্রণয়কাতর উচাটন ডালপালা
.
এল বসন্ত ! সাঁকো ও সেতুর ’পরে
বিবসনা এই রাত্রি গাইছে গান
লবণজলে ও রজনীগন্ধা ফুলে
লোলিতা ভেজায় আপন তনুখানি
.
প্রেম উচাটন মরে যায় ডালপালা
.
মৌরির ফুল এবং রুপোর রাত
করে ঝিকমিক বাড়িগুলোর ছাদে
আয়না এবং ছোট নদীদের রুপো
তোমার সফেদ উরুর মৌরি-মদ
.
প্রেমে উচাটন মরে যায় ডালপালা
.
…    …   …   …   …   …Serenade ]
 .
eeee
অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম

 

সিমেয়নের জন্য একটি গান

.
প্রভু, থরে থরে স্ফুটমান রোমদেশি হায়াসিন্থ ফুল
এবং শীতের সূর্য হামা দ্যায় তুষার-পাহাড়ে;
নাছোড় ঋতুটি এসে জগদ্দল জাঁকিয়ে বসেছে।
হাতের চেটোয় রাখা পালকের মতো হাল্কা জীবন আমার
প্রতীক্ষা করছে বসে মরণ হাওয়ার ।
রৌদ্রালোকে ধূলি আর কোনে কোনে স্মৃতি
মৃত ভূমি লক্ষ্য করে ছুটে-চলা হিমেল হাওয়ার তরে গুনে চলে দিন।
.
শান্তি তব আমাদেরে করো তুমি দান।
কতো না বছর আমি এ-নগরে হেঁটে বেড়িয়েছি,
রেখেছি অটুট আস্থা, করেছি উপোস আর দীনজনে হয়েছি সহায়,
দিয়েছি সম্মান-স্বস্তি আর নিজে পেয়েছিও তা-ই।
আমার দুয়ার হ’তে কখনো যায় নি কেউ ফিরে।
.
আমার বাড়ির কথা মনে পড়বে কার, কোনখানে পাবে ঠাঁই সন্তানের সন্ততি আমার
যখন ঘনাবে সেই বেদনাপ্রহর?
গড্ডলিকা পথ ধরে যাবে তারা শেয়ালের ঘরে,
পালিয়ে বেড়াবে তারা ভিনদেশি মুখ আর ভিনদেশি তলোয়ার থেকে।
.
ঘনাবার আগে সেই চাবুক, শেকল আর বিলাপপ্রহর
শান্তি তব আমাদেরে করো তুমি দান।
নির্মনুষ্য বিষাদের গিরিতীর্থে পৌঁছুবার আগে,
মাতৃবিলাপঘেরা সুনিশ্চিত প্রহরের আগে,
মরণের এ-প্রসব-লগ্নে এসে আজ,
এখনো অভাষ আর এখনো অবোল সেই শিশুটি শোনাক তাকে
ইসরেলের আশ্বাসের বাণী
আশিটি বছর যার হাতে জমা, আর যার নেই কোনো আগামী সকাল।
.
তোমারই বাক্য অনুসারে,
তোমার বন্দনা তারা গা’বে আর যুগপৎ গর্বে, অবজ্ঞায়
প্রজন্মে-প্রজন্ম ধরে হবে তারা ক্লেশের শিকার,
আলোকের ’পরে আলো, ঋষির সোপান বেয়ে উঠে যেতে যেতে।
আমার জন্য নেই আত্মবলিদানের গৌরব, আরাধনা কিংবা কোনো ভাবের পুলক
পরম দিব্যজ্ঞান সে নয় আমার,
শান্তি তব করো হে আমারে তুমি দান
(হৃদয় তোমার, হৃদি তব ভেদ করে চলে যাবে
এক তলোয়ার)
নিজের জীবনে আমি হয়েছি কাহিল আর তাদেরও জীবনে যারা পেছনে আমার
নিজের মরণে আমি মুমূর্ষু আজ আর তাদেরও মরণে যারা পেছনে আমার
তোমার নির্বাণ সে দেখতে পেলে তবে
দাসানুদাসকে প্রভু আজ্ঞা করো যেতে।
.

…    …   …   …   …   …[ A Song For Simeon ]

জুয়েল মাজহার

জুয়েল মাজহার

জন্ম ১৯৬২ সালে; নেত্রকোণা। মার্কসবাদী। কোনো অলৌকিকে বা পরলোকে বিশ্বাস নেই। ঘৃণা করেন পৃথিবীকে খণ্ড-ক্ষুদ্র করে রাখা সীমান্ত নামের অমানবিক ‘খাটালের বেড়া’। লেখেন মূলত কবিতা, বিচিত্র বিষয়ে প্রচুর অনুবাদও করেন।

বর্তমান পেশা সাংবাদিকতা। কৈশোরে বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশযাত্রা। দীর্ঘ ভবঘুরে জীবন। পেটের দায়ে নানা কাজ। যৌবনের একটা বড় অংশ কেটেছে পাহাড়ে। সেভাবে বাড়ি ফেরা হয় নি আর।


কবিতার বই :
দর্জিঘরে একরাত [ফেব্রুয়ারি ২০০৩, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা]
মেগাস্থিনিসের হাসি [ফেব্রুয়ারি ২০০৯, বাঙলায়ন প্রকাশনী, ঢাকা]
দিওয়ানা জিকির [ফেব্রুয়ারি ২০১৩, শুদ্ধস্বর, ঢাকা]

অনুবাদগ্রন্থ :
কবিতার ট্রান্সট্রোমার (নোবেল সাহিত্যপুরস্কারজয়ী সুইডিশ কবি টোমাস ট্রান্সট্রোমারের বাছাই করা কবিতার অনুবাদ সংকলন) [শুদ্ধস্বর, ফেব্রুয়ারি ২০১২]
দূরের হাওয়া (বাংলা অনুবাদে ২০০ বিশ্বকবিতা) [চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : jewel_mazhar@yahoo.com
জুয়েল মাজহার