হোম অনুবাদ ডেভিড ব্রুকসের কবিতা

ডেভিড ব্রুকসের কবিতা

ডেভিড ব্রুকসের কবিতা
283
0

পুরো নাম ডেভিড গর্ডন ব্রুকস। ১২ জানুয়ারি ১৯৫৩ সালে ক্যানবেরাতে জন্মগ্রহণ করেন। একজন অস্ট্রেলিয়ান কবি, ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক।

১৯৭৪ সালে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে ১৯৭৫ এ চলে যান কানাডায়, পোস্ট-গ্রাজুয়েশন এর উদ্দেশে। টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষে ১৯৮১ সালে অস্ট্রেলিয়া ফিরে আসেন এবং শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ক্যানবেরার ডানট্রুন রয়্যাল মিলিটারি কলেজে। এরপর ১৯৮২ সালে শিক্ষকতা করেন অস্ট্রেলিয়ান ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। অস্ট্রেলিয়ান কবি নিকোলেট স্টাস্কো-র সাথে সেখানেই সাক্ষাৎ হয় তাঁর, যার সাথে পরবর্তীতে বিশ বছর সংসার করেন। ১৯৯১ থেকে এখন পর্যন্ত তিনি অস্ট্রেলিয়ান সাহিত্যে শিক্ষকতা করছেন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৫ এ বিয়ে করেন স্লোভেনিয়ান অনুবাদক ও ফটোগ্রাফার তিজা প্রিবাক-কে। সাউদার্লি নামে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে পুরনো সাহিত্য-পত্রিকার সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন কবি। উপন্যাস ‘দ্যা ফার্ম ট্যাটু’ মাইলস ফ্রাংকলিন এওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয় ২০০৮ সালে।

পাঁচটি কবিতাগ্রন্থ, চারটি উপন্যাস, চারটি ছোটগল্পের বই, চারটি নন-ফিকশন লিখেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন আরো পাঁচটি গ্রন্থ। কবিতাগ্রন্থগুলো হচ্ছে : দ্যা কোল্ড ফ্রন্ট (১৯৮৩); ওয়াকিং টু দ্যা পয়েন্ট ক্লিয়ার (২০০৫); আরবান এলিজিস (২০০৭); দ্যা ব্যালকনি (২০০৮); ওপেন হাউজ (২০১৫)।


ডেভিড ব্রুকস-এর ১৪টি কবিতা


মাঠ

তোমাকে চলে যেতে দেখলাম
চোখের কিনার হতে—বাইরে, বেরিয়ে গেলে আর
আমিও পেছন পেছন ছুটলাম
যতটা সম্ভব দ্রুত, অথচ ততক্ষণে তুমি হয়ে গেছ
এক বিস্তৃত মাঠ,
একটি আপাত সন্ধ্যা,
এক অচেনা পাখির কান্না।

 

সতর্কবার্তাবিহীন

আমার বাপ, তার বয়সী জীবনের অধিকাংশ সময়ই কাটায় কমনওয়েলথে, সরকারি চাকরি করে,
লম্বা টেবিলের এক কোনা থেকে অন্য কোনায় ফাইলপত্র চালাচালি করে।
মরবার আগে, সে অস্ট্রেলিয়ান জনসংখ্যার উপর এক ইতিহাস পাণ্ডুলিপি রেখে যায়, অস্ম্পূর্ণ,
অসম্পূর্ণ এক ফাজলামির মতো, কারণ, উইলে লিখে গেছে, বাকি বই আমাকেই শেষ করতে হবে।
অথচ একবারও জানায় নি, ওটা শেষ করবার আর কতটুকু বাকি?
আমার প্রশ্নের জবাব নিরুত্তর, তার ব্যাংক একাউন্ট দোদুল্যমান, দুজনার প্রতিশ্রুতি অসম্পূর্ণ…
ভাবি—ওয়েস্টগ্রাথ স্ট্রিটে, কনক্রিটের মেঝেতে দশটি বছর শুয়ে-বসে, লোকে এভাবেও মরে যায়—
কোনো সতর্কবার্তাববিহীন, অস্ম্পূর্ণ বাক্যের মাঝখানে, পরের শব্দগুলো বগলদাবা ক’রে, সঙ্গে নিয়ে

 

পেঁচা

তোমার জানালাতে, সেই একটি পেঁচা
লক্ষ করেছ তুমি?
সকাল সকাল এসে
ওভাবেই বসে ছিল, সমস্ত রাত,
সান্তা মারিয়ার ভোরে প্রথম আলোর আগে
ফিরে চলে যায়—ফিরে
চলে যেতে চায়

অথচ থুবড়ে পড়ে যায় জলপাই বনের ধারে,
ওর রাতজাগা লাল চোখ—
তোমাকেই দেখতে দেখতে যেন অন্ধ ভীষণ।
আর ওর ডানাগুলো
তোমারই ঘুমের ভারে ভারী হয়ে ছিল?

 

ব্যালকনি-১

সোজা বিমানবন্দর থেকে এসে, ইতোমধ্যেই, এই দুদিনে
বিভিন্ন ঢঙে—সে আমার কৌমার্য কেড়েছে—
গণনার অধিক
এবং এখন, বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে
আবার অনুবাদ করছে কবিতা—এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায়
সীমান্ত-প্রহরীকে ঘুষ দিয়ে
ব্যাকরণবিদদের সাথে তর্ক জুড়ে
অভিধান লেখকের চোখের চামড়া তুলে…
উঠে বারান্দায় যাই আমি
চুমু খাই ওকে—
এত দীর্ঘ সময় যে, রাত্রি নেমে এল এবার আর
পথঘাট জনশূন্য।
চুমু শেষে তাকাতেই, জোছনার আলো এসে ধাঁধিয়ে
দিচ্ছে চোখ,
ঘাড়ে আমার—জিহ্বা দিয়ে সে লিখছে মেসেজ,
আমি সেই ভাষা জানি না তো—
আমার চুলে পাখিরা বাঁধছে বাসা,
আমার শরীর, গেয়ে উঠছে বুনো সুর, অনুবাদ-অসম্ভব
এক আনন্দোৎসবে

 

ব্যালকনি-৫

রাত ১০ টা,
গ্রীষ্মের মাঝামাঝি এক সন্ধ্যায়,
আবার আমরা দুজন—
বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুমু খেতে থাকি।
রাস্তায় মানুষ ছিল, দেখে শিস বাজালো,
আরো কিছু লোকজন জড়ো হয় পথের ধারে।
কেউ বিদ্রূপ করছিল হেসে,
কেউ উল্লাসে দিশেহারা হলো। কেউ কেউ সাধুবাদ জানাচ্ছিল।
কেউ ট্যাক্সিতে আসে,
একটা বাস তার
সবকটা জানালাই খুলে
মাঝরাস্তায়—বেমালুম থমকে দাঁড়ায়।
কয়েক মুহূর্ত পর
বিদ্রূপ, সাধুবাদ, হৈ চৈ
চুপ করে যায়। নীরবে দাঁড়িয়ে সব আমাদের দেখতে থাকে।
চুমু শেষে আমরা বাইরে তাকাই
দেখি, কেউ নেই
ফিরে গেছে সব—শুধু গাছের পাতাগুলো
পড়ে আছে পথের উপর
আর কোয়েল ও পরিযায়ী পাখিরা—
উড়ে চলে গেছে তারা অনেক আগেই;
সম্বিৎ ফিরে দেখি, চারিদিকে শীতকাল—শীত এসে গেছে।

 

কারমেন ১৯৩

সমস্তদিন কবি লিখে চললেন
পৃথিবীর বিস্ময়কর যত সৃষ্টি নিয়ে—
পশু ও পাখি ও মাছ
ও তাদের সৌন্দর্য, গতি-প্রকৃতি ও উড়ে চলা নিয়ে;
ভাবনাগুলো টাইপ করা হয়ে গেলে—
নতুন ভাবনা এসে জড়ো হয় :
আজ রাতে কী খাবেন—মাংস, না মাছ!

 

মহাকাল

এই রাত্তিরে—শহরে—
যে কোনো আঙুল
তার নিজস্ব
পথ খুঁজে নেয়।
কোথাও সামান্য দেরি।
অন্ধগলিজুড়ে দিগভ্রান্ত
এদিক সেদিক,
শেষমেশ তোমার
মেরুদণ্ড বেয়ে সোজা,
পথ কেটে কেটে…
পথ—
হৃদয়ের মতন
প্রশস্ত হয়ে উঠছে,
আর ভবঘুরে চাঁদের আলো
বাইরে
পথে ও বিপথে ঘুরে
লিখে রাখছে—মহাকাল,
শহরের সমস্ত
দেয়ালজুড়ে।

 

পৃথিবীর পাঠশালাতে

এইসব মৃত্যু অচেতন মানবিকতার।
পাঁচটি হাজার বছর
লেগে গেছে
সোজা হয়ে দাঁড়াতেই,
বড়জোর তাতে আরো ইঞ্চি দুয়েক
বেড়েছে,
আর কিছু স্থূলতা
চল্লিশটি বছর ধরে বেঁচে থেকে থেকে;
কিসের জন্য?

একই সেই হিংসা ও প্রাচীন

রিরংসাবোধে মেতে থাকতে?
আপন মেজাজে, নিজেদের মতো করে
ভক্ষণ করে যাচ্ছি পৃথিবীর
যে কোনো প্রাণী—
যেন আমরা কোনোদিনই ছিলাম না
তাদেরই একজন।

 

ওপেন হাউজ

কুহুতান শোনাবার মতো কোনো পাখি নেই আজ
শুধু নিজ-শরীরের সেই ঢিবঢিব সুর
যেন এক মস্ত জাহাজ
বিস্তৃত সমুদ্রজলে
শান্ত ও ধীরে
পথ কেটে এগিয়ে চলেছে আরো গভীরের দিকে
আর এ ঘরের জানালা
দরজা
প্রশস্ত হতে হতে এতটাই—
যে এখন প্রায় যা-কিছুই প্রবেশ করতে পারে।

 

একটি ফোনকল

অন্যপ্রান্তে
নিজেরই হৃদয়—
এত গভীরে, ফিসফিস করে কথা
বলাটাও আজ—
নিষ্প্রয়োজন।

তাই চুপচাপ,
নীরবতার ভাষা
মিথ্যে বলুক।

 

ফটোগ্রাফি পাঠ

টিনা মদোত্তি ও এডওয়ার্ড ওয়েস্টন
১৯২৩-এ দুজন, হাত ধরে মেক্সিকো চলে গিয়েছিল।
শর্ত সামান্যই : টিনা ঘর সামলাবে, স্টুডিও
দেখভাল করবে এবং এডওয়ার্ড তাঁকে শেখাবে
ফটোগ্রাফির কলাকৌশল।
তারপর—পাথরে, বালুতে, সাদা চাদরে—নগ্ন হয়ে
তোলা হলো অনেক ছবি;
সিঁড়িতে, বাগানে, কাস্তে হাতে কিংবা অনুষ্ঠানে,
অনুরোধে, আরো কত মানুষের পাশাপাশি।

১৯২৬-এ এডওয়ার্ড লস এঞ্জেলসে ফিরে এল
তাঁর নিজ পরিবারে, স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে :
টিনা চলে গেল বার্লিন, সেখানে বামদলে যোগ দেয় সে।
ইতিহাসে এগুলোই বিস্তারিত,
ইতিহাস লিখে রাখে না—
কে কার হৃদয়টি আগে ভেঙেছিল।

 

নিখোঁজ নামগুলো

তোমার স্পর্শ পেলেই নদী ও নক্ষত্র
চলে আসে আঙুলে আমার

চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে পাহাড়-সাগর

তোমার শরীরের ঘ্রাণ পেলে আকাশ
ও মরুভূমি কথা বলে আমার সাথে

তোমার কোলে শোয়ামাত্র
পাখিরা ছায়া ফেলে দুপুরের খররৌদ্রে

বাচ্চারা লেকের জলে খেলা করছে
মা ওদেরকে নাম ধরে ডাকছে, ঘরে ফিরতে

মাইকেল, বোর্ভা, ক্লোই, ডেভিড

যে নামগুলো, কবেই হারিয়ে গেছে

 

২৫ মে

মন খারাপ করে আছ
আজ, বলতে পারছ না কেন,
আর আমিও নিশ্চিত ভঙ্গিতে তার—নিচ্ছি না দায়,
আর সেই পুরনো আঘাত, যতক্ষণ না জানছি আমিই কারণ,
প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে তোমার : ঐ কফিমগে, হাতের খোলা বইটিতে,
নিশ্চুপ টেলিফোনে, দেয়ালের ফটোফ্রেমে; যে ছবি নিজের
চরকাতে অর্ধেক মনোযোগী, বাকি অর্ধেক
আনমনা, দেখছে তোমায়।

 

আমার মেয়েটির প্রতি

এক শনিবার, মনে হলো, তুমি এসেছ
আর তোমার জন্য একটা বই উপহার হাতে ঘরে ফিরলাম
কিন্তু—আমার সে মনে হওয়া ভুল ছিল, কিংবা
ততক্ষণে তুমি ফিরে চলে গেছ— দশ হাজার মাইল দূরে,
নিজের কাছে,
সাক্ষাৎ হলো না আমাদের, এ
দফায়, একা একা কথা বলছি তাই, তোমার শৈশবস্মৃতির
গল্প বলছি, একান্তে, বাতাসের কাছে।

রনক জামান

জন্ম ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১; মানিকগঞ্জ। কবি ও অনুবাদক। রসায়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত গ্রন্থ :
ললিতা (মূল : ভ্লাদিমির নবোকভ) [অনুবাদ; ঘাসফুল প্রকাশন, ২০১৬]
ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা [কবিতা; অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৬]

ই-মেইল : ranakzaman1991@gmail.com