হোম অনুবাদ ডাকঘরহীন এক দেশ

ডাকঘরহীন এক দেশ

ডাকঘরহীন এক দেশ
495
0

১.
ফিরে এলাম আবার এই দেশে যেখানে গুঁড়িয়ে
দেওয়া হয়েছে ওই মিনারটি। মাটির দীপে
সলতে গোড়ায় কেউ একজন ঢালে শর্ষে তেল, আর
সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ মাড়িয়ে ঊর্ধ্বে ওঠে রোজ রাতে,
গ্রহের গায়ে খোদাই করা বার্তাগুলো পড়ে নিতে।
কবরে পরিণত হওয়া বা মানুষহীন-ফাঁকা প্রতিটি বাড়ির
বিধ্বস্ত ঠিকানার চিঠি খুঁজে ওই মহাফেজখানায়
তার আঙুলের ছাপ বাতিল করে চলে ব্যাংক স্ট্যাম্পগুলো।

ফাঁকা? কারণ পালিয়েছে অসংখ্য মানুষ, চলে গেছে অন্য কোথাও
আর সেখানে শরণার্থী হয়ে গেছে, ওই সমতল ভূমিতে
সেখানে পাহাড়কে কাচে পরিণত করতে অবশ্যই তারা এখন
চূড়ান্ত শিশিরপতন হয়ে যাবে। এদের মধ্য দিয়ে
তারা দেখতে পারে আমাদের—উন্মত্তভাবে বাড়িগুলো মাটিতে
লুকিয়ে ফেলছি, রক্ষা করতে ওই আগুন থেকে, দেয়ালের
মতো যা ধসে পড়ছে। সেনারা জ্বালে এবং উস্কে তুলে শিখাগুলো,
আমার পৃথিবীটাকে আচমকা কাগজমণ্ড বানিয়ে ফেলে

যা সোনারূপ ধরে, এর পর পলকেই ছাই। মুয়েজ্জিন মরে গেলেন যখন
শহর থেকে যেন প্রতিটি আজান কেড়ে নেওয় হলো।
পাতাগুলোর মতো বাড়িগুলো ঝাড়ু দিয়ে জড়ো করা হলো
আগুনে জ্বালিয়ে দিতে। এখন আমরা প্রতি রাতে
বাড়িগুলো লুকিয়ে রাখি—তাদের বাড়িগুলোর মতোই, যেগুলো
ফাঁকা ফেলে গেছে। আমরা বিশ্বস্ত। ফুলের মালা দিয়েছিলাম
তাদের দরজায়। রোজ রাতে আরও বিশ্বস্ত হই, আগুন ফের হয়ে ওঠে
দেয়ালের মতো, আর আমরা অন্ধকার খুঁজি, যখন তা ধসে পড়ে।

২.
‍‌‍‍‌’আগুনের ভেতরে আমরা এবার, এসে অন্ধকারের সন্ধানে,’
পথের উপর পড়ে থাকা একটা কার্ডে লেখা,‌‌ ‘‌হতে চাই সেই লোক
যে রক্ত ঝরায়। ভিজিয়ে দিতে তোমার হাত।
না হয়, আমি নিজেকে ফেলে রাখব হিমঠান্ডায়, যতক্ষণ
না বৃষ্টি কালি হয়ে ওঠে, আর যন্ত্রণার মুখে আঙুলগুলো
হয়ে ওঠে সিলমোহর, সারারাত যা চিঠিগুলো বাতিল করে চলে।’
পাগল গাইড! হারিয়ে যাওয়া মানুষ তো এভাবেই কথা বলে। তারা
খুঁজে বেড়ায় একটা দেশকে, যখন তা হয়ে গেছে ছাই। অলীক হৃদয়,

মনে করো সে জীবিত। আমি বৃষ্টির মাঝে ফিরে এসেছি
তাকে খুঁজতে, জানতে কেন সে আর চিঠি লিখে নি।
আমি নগদ অর্থ নিয়ে এসেছি, নকশা অাঁকা মুদ্রা,
নতুন স্ট্যাম্প কিনতে, এরই মধ্যে যা দুর্লভ, ফাঁকা,
যার গায়ে নাম নেই কোনো দেশের। কোনো বাতি ছাড়াই
লুকোনো ও ফাঁকা বাড়িগুলোতে খুঁজি তাকে—সে হয়তো
জীবিত, ধুঁয়ার দরজা খুলে অন্ধকারে এখনও তার ছাই-হওয়া
কথাগুলো প্রশ্বাসে-নিশ্বাসে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলছে :

‘সব শেষ, কিছুই বাকি নেই।’ আমি হয়তো
নীরবতাকে বাধ্য করব আরশি হয়ে উঠতে, যেন
তার গলার আওয়াজ পাই আবার, পরামর্শ পেতে।
তরঙ্গের মতো ছুটছে ধাবানল। আমি কি নদীটা পার হব?
বন্ধ সব ডাকঘর। কে বিলি করবে নকশা-কাটা
চিঠিগুলো, জেলখানায় পাঠানো আমার বার্তাগুলো?
একমাত্র নৈঃশব্দ্যই আমার চিঠি নিয়ে যেতে পারে তার কাছে।
না হয়, কোনো মৃত ডাকঘরে দাবড়ে বেড়াবে শুধু অন্ধকার।

৩.
‘হারিয়ে যাওয়াদের গোটা মানচিত্র আলোকিত করা হবে।
মুয়েজ্জিনের মরার পর এই মিনার আমিই তো আগলে আছি।
এক্ষুনি আসো, আমি এখনও জীবিত। দিনের বিপরীতে এখনও
প্রায় একখান নকশা-কাটা ডাকটিকিট রয়ে গেছে, কিছুটা
সাদা তো, কিছুটা কালো। এর পিঠের আঠা সিক্ত এখনও
যেহেতু তা খোলা পড়েছিল হেমন্তের শেষ দেশে—
কিনুন এটা, আমি শুধু একবারই সুযোগ দেবো, রাতে। ছুটে আসুন
আমি নিহত হওয়ার আগে, আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হওয়ার আগে।’
এই অন্ধকার বৃষ্টির মাঝে, বিশ্বস্ত থাকো, অলীক হৃদয়,

এ তো তোমারই যন্ত্রণা। অনুভব করো তুমি। করতেই হবে তোমাকে।
‘কিছুই থাকবে না আর, সবই শেষ হয়ে গেছে,’
আমি আবারও শুনতে পেলাম কণ্ঠ তার : ‌’এ তো কথার
পবিত্র মসজিদ। খুঁজে পাবে আমার কাছে তোমার চিঠিগুলো। আর
আমারগুলো তো আছে তোমার কাছেই। আসো দ্রুত। আর এসব হারানো খাম
ছিঁড়ে বের করে আনো।’ আর মিনারে উঠে :
আগুনের ভেতরে এসে পড়েছি আমি। দেখা পেয়েছি অন্ধকারের।

এ তো তোমারই যন্ত্রণা। অনুভব করতেই হবে তোমাকে। করো
অনুভব, হৃদয় আমার, বিশ্বস্ত থাকো তার ওই একই কথার
উন্মাদ জিগিরের কাছে—কারণ সেই তো মাটির প্রদীপের
সলতে ভেজায়, রোজ রাতে আলো জ্বালে, যখনই এই গ্রহের গায়ে
খোদিত বার্তাগুলো সে পড়ে নিতে মাড়িয়ে চলে সিঁড়ির ধাপগুলো।
তার হাতই ছিল ডাকটিকিট বাতিলের ওই সিলমোহর।
এ তো এক মহাফেজখানা। আমি খুঁজে পেয়েছি এখানে
তার কথার সেই অবশেষ, অসীম বাসনার ওই মানচিত্র।

৪.
আমি সেগুলো পড়ি, ওই প্রেমিকের চিঠিগুলো, ওই এক উন্মাদের,
পড়ি তার কাছে লেখা চিঠিগুলো, যার কাছ থেকে পাই নি উত্তর।
আমি দীপ জ্বালি, আমার উত্তর পাঠাই, মহাদেশজুড়ে বিস্তৃত
বধির এক জগতে ছড়িয়ে দিই আজান। আর আমার বিলাপ
অন্তহীন চিৎকার, সব সময়েই যার শেষ ঘনিয়ে আসছে, সেই জগতের
দিকে পাঠানো ঠিকানাহীন ও অফেরতযোগ্য চিঠির মতোই
এ চিৎকার। আমার কথাগুলো ব্যাপক বৃষ্টিধারার মতো ছুটে যায়,
যায় সেখানে, দূর সাগর পারের ওই ঠিকানাগুলো বরাবর।

বৃষ্টি হচ্ছে আমি যখন এসব কথা লিখছি। আমার কোনো নামাজ নেই।
আছে শুধু এক চিৎকার, কান পাতুন, এই তো আমরা!
এই তো আমরা! যাদের চিঠিগুলো শুধুই আর্তনাদ, যা জেলখানায়
দেহের মতোই দুমড়ে মুচড়ে যায়। এখনও প্রতিরাতে আমি নিজেকে
মিনারের ধাপগুলোতে ঠেলে নিয়ে যাই। পাগল ছায়ামূর্তি,
নকশা করা চিঠিগুলো আমি মেঘে ছুড়ে দেই। হারানোরা তো এমনই :
ভোরের লোভে তারা বাতাসকেও ঘুষ দেয়, এই তো গোপন মতলব।
তবে এখানে তো সুর্য নেই। হায়, কোনো সূর্যই নেই এখানে।

তবে নির্মম কঠোর হও তুমি, যাকে রক্ষা করতে পারি নি আমি,—
আমাকে পাঠাও তোমার চিৎকার, একমাত্র এই কৌশলেই যদি কাজ হয় :
আমি পেয়েছি প্রেমিকার কাছে লেখা এক জেলবন্দি মানুষের চিঠি—
একটা চিঠির শুরুতে লেখা : ‌’এইসব কথা হয়তো কখনও তোমার নাগাল পাবে না।’
আরেকটার শেষটা হলো : ‌’তোমার স্পর্শ না পেয়ে আমার চামড়া
মিশে যাচ্ছে শিশিরে।’ আর জবাবে আমি শুধু বলতে চাই :
চিরকাল বাঁচতে চাই আমি। কী আর বলতে পারি আমি?
বৃষ্টি হচ্ছে, যখন এসব লিখছি আমি। পাগল হৃদয়, সাহসী হও।

রথো রাফি

জন্ম ৩১ মার্চ, ১৯৭৫; দক্ষিণ তারুয়া, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বিএসসি অনার্স, রসায়ন। পেশায় সাংবাদিক।

ই-মেইল : rothorafi@yahoo.com

Latest posts by রথো রাফি (see all)