হোম অনুবাদ ট্যাং কবিতার অন্তর্মাধুর্য

ট্যাং কবিতার অন্তর্মাধুর্য

ট্যাং কবিতার অন্তর্মাধুর্য
1.30K
0

চীনের প্রাচীন কবিতা বিশ্বসাহিত্যে একটি বিশিষ্ট জায়গা আলোকিত করে আছে। প্রাচীন চীনা সমাজে কবিতার প্রভাব ছিল বিস্ময়কর। কবিতা ছিল প্রধানত উচ্চতর শ্রেণির বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। কনফুসিয়াস কবিকে অলোকসামান্য মানুষ হিশেবে গণ্য করেছেন। তাঁর মতবাদ অনুযায়ী কবির দৃষ্টিতে প্রতিফলিত হয় সমাজের বিচ্যুতি এবং কবির অনন্য প্রয়াসে সমাজ ক্রটিমুক্ত ও আলোকদীপ্ত হয়ে ওঠে। কবি আবির্ভূত হন নৈতিকতার অবিকল্প কণ্ঠস্বর হিশেবে। কনফুসিয়াসের দর্শন রাজকীয় প্রতিষ্ঠানকে সুসংহত করেছে। হান রাজবংশ (খ্রিস্টপূর্ব ২০৬-২২০ খ্রিস্টাব্দ) হতে এ দর্শন শাসনতান্ত্রিক নীতিমালার আদর্শ হিশেবে আদৃত হয়ে এসেছে। কনফুসীয় মূল্যবোধ চীনা সমাজের অগ্রগতি ও চীনা সাহিত্যের বিকাশের ক্ষেত্রে রেখেছে অভূতপূর্ব ভূমিকা। কনফুসিয়াস স্কুলের ‘অ্যানালেক্টস’-এ কবিতার গুরুত্ব নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। কবিতাকে আত্মোন্নয়নের সূত্র; দেশের অবস্থা অবলোকনের দর্পণ; পিতার যত্ন নিশ্চয়ন, পারিবারিক আচরণ পরিশীলন ও জ্ঞান ব্যবহারের নির্দেশতন্ত্র; মিথষ্ক্রিয়ামণ্ডিত, সমাজবদ্ধ জীবন পরিচালনার বিধান; পাখি, চতুষ্পদী প্রাণী ও বৃক্ষ সংবলিত কোষ হিশেবে বিবেচনা করা হয়েছে (Eno 96)।


ট্যাং যুগে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় কিংবা রাজপ্রাসাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মে নিয়োগ দানের জন্য কাব্য প্রতিভা মূল্যায়িত হতো।


তৃতীয় শতকে হান রাজবংশের পতনের পর দীর্ঘ সময় ধরে চীনে কেন্দ্রীয় সরকারের অবর্তমানে রাজনৈতিক অনৈক্য ও সামাজিক নৈরাজ্য প্রবল হয়ে ওঠে; চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিভিন্ন আঞ্চলিক রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। স্বল্পায়ু সুই রাজবংশ (৫৮১- ৬১৮) এবং অনুবর্তী ট্যাং রাজবংশে (৬১৮-৯০৭) চীনের অখণ্ডতা দৃশ্যমান হয়। চীনের কাব্যিক ঐতিহ্যে রয়েছে রাজনৈতিক ইতিহাসের অনিবার্য প্রতিফলন (Hinton 145)| ট্যাং রাজবংশ দীপ্তিময় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল রচনার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে প্রোজ্জ্বল। সামন্ততান্ত্রিক এ শাসনামলে নাগরিকগণ নির্বিবাদ পরিবেশে জীবন ধারণ করেছেন। রাত্রিকালে তাদের দরজায় অর্গল লাগাতে হয় নি। হৃত দ্রব্যাদি পথেঘাটে পড়ে থাকলেও লুব্ধতাবশত কেউ তা স্পর্শ করে নি। নারীর সমমর্যাদা সমাজে ছিল প্রতিষ্ঠিত। সম্রাজ্ঞী য়ু জেতিয়ান সিংহাসনে আরোহণ করে সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তৃত করেছিলেন। তিনি তাওবাদ ও বৌদ্ধধর্মের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছিলেন এবং শিক্ষা ও সাহিত্যের উন্নয়ন সাধনে ব্রতী হয়েছিলেন। নানা জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানে কোনো সমস্যা পরিলক্ষিত হয় নি। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জগৎ উদ্দীপ্ত ও প্রশস্ত থাকায় সৃষ্টিশীলতা অনবদ্য উচ্চতা স্পর্শ করেছিল। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ট্যাং যুগে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় কিংবা রাজপ্রাসাদের গুরুত্বপূর্ণ কর্মে নিয়োগ দানের জন্য কাব্য প্রতিভা মূল্যায়িত হতো। আমলা বা কর্মকর্তাগণের মূল্যায়নপর্বে কবিতা রচনায় দক্ষ ব্যক্তি চাকরি লাভে সক্ষম হতেন (Shushe 12)|

ট্যাং রাজবংশের রাজধানী চেংয়ান (Chang’an) ও লুইয়াং (Luoyang) তৎকালীন পৃথিবীর বৃহত্তম ও অতি কজমোপলিট্যান শহর হিশেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল; এ জাতীয় শহরে বিদেশি পণ্য ও অদ্ভুত পোশাক পরিহিত পর্যটকের আধিক্য ছিল লক্ষণীয়। গ্রহণযোগ্য বৈদেশিক নীতি প্রচলিত থাকায় পারস্য ও আরব দেশীয় ব্যবসায়ীগণ বিখ্যাত সিল্ক রোড ধরে রাজধানীসহ অন্যান্য উপকূলবর্তী শহরে আগমন ও বসতি স্থাপন করতেন। সিল্ক রোড ও সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা বিধানের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা সুনির্দিষ্ট ছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার কারণে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলত অ্যান-শি বিপ্লব (৭৫৫-৭৬৩) ট্যাং রাজবংশের বিপর্যয় ডেকে আনে। অ্যান লুশান ও শি সিমিং পরিচালিত বিপ্লবী সামরিক বাহিনী রাজধানী দখল করে কার্যত ট্যাং রাজবংশের ধ্বংস নিশ্চিত করে। দেশের দু-তৃতীয়াংশ জনতা মৃত্যুবরণ করেন অথবা আশ্রয়হীন হয়ে বিতাড়িত হন। বিপ্লবোত্তর এক শতক ধরে শিল্পকলা বেগবন্ত থাকলেও গৃহযুদ্ধে সৃষ্ট ভয়ঙ্কর সমরবাদের বিভীষিকা থেকে এ রাজবংশ মুক্তি লাভ করতে পারে নি।

13162556_1216535878380136_1992412166_n
ট্যাং কবিতার অনুবাদ বই

খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকে ‘শি জিং’ বা কবিতার বই রচিত হলেও ট্যাং যুগ চীনে চিহ্নিত হয় কবিতার সোনালি ক্ষেত্র হিশেবে। ট্যাং কবিতায় ভাস্বর মানবিক মূল্যবোধ, দুঃখ, বেদনা, প্রেম, মৃত্যু, অসাধারণ নৈসর্গিক ও সৌন্দর্য-চেতনা পাঠককে আবিষ্ট করতে পারে। ট্যাং কবিগণের কাব্যভাষার সাথে চিত্রভাষার সাদৃশ্য লক্ষণীয়। চর্যাপদের আগে রচিত ট্যাং কবিতায় চর্যাপদীয় দুর্বোধ্যতা ও সাধনতত্ত্ব যেমন দুর্নিরীক্ষ্য তেমনি অ্যাংলো-স্যাক্সন কবিতার লোকাতীত সংবেদনাও দুর্লক্ষ্য। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ ছিল ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ যুগে রচিত ‘চর্যাপদ’ আমাদের একমাত্র প্রাচীন কাব্য। আমাদের প্রাচীন কাব্যভাণ্ডারে ২৪ জন কবির সাড়ে ছেচল্লিশটি কবিতা মূলত গূঢ় তত্ত্বের দীপ্তি দান করে। অন্যদিকে, ট্যাং যুগে ২২০০০ কবি উপহার দেন প্রায় ৫০,০০০ কবিতা যেগুলো ভাব, বিষয় ও ছন্দে বিচিত্র। ষোল শতকে বিকশিত তিন পঙ্‌ক্তি সংবলিত জাপানি হাইকু কবিতা, চার পঙ্‌ক্তিবিশিষ্ট ট্যাং কবিতার প্রভাব-পুষ্ট মানস সম্পদ (Wilson 17) ট্যাং যুগের বিখ্যাত কবিগণের মধ্যে লি বাই, ডু ফু, ওয়াং ওয়েই, মং হাওরান, ওয়াং চ্যাংলিং, মং জিয়াও, লি হো, উয়ান ঝেন, বাই জুয়ি, লুও বিন-ওয়াং, ঝ্যাং রো-জু, চ্যাং জিয়ান, হান য়ু, ঝ্যাং জি, লি শ্যাং-য়িন, পিউ এ সিয়ো উল্লেখযোগ্য।


রোমান্টিক চেতনা ট্যাং কবিতাকে সমুজ্জ্বল করে তুলেছে। রোমান্টিক স্কুলের পুরোধা হিশেবে লি বাই (৭০১-৭৬২) সমধিক উল্লেখযোগ্য।


রোমান্টিক চেতনা ট্যাং কবিতাকে সমুজ্জ্বল করে তুলেছে। রোমান্টিক স্কুলের পুরোধা হিশেবে লি বাই (৭০১-৭৬২) সমধিক উল্লেখযোগ্য। চীনের ইতিহাসে এরূপ প্রতিভাধর কবির আবির্ভাব কমই ঘটেছে। ‘কবিতার অমর সাধক’ হিশেবে তিনি প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। সামন্ততান্ত্রিক গোঁড়ামির শৃঙ্খল ভেঙে তিনি মানবসত্তাকে মুক্ত করতে প্রয়াসী হন; আপন কল্পনার অসীম বর্ণে নির্মাণ করেন কবিতার উদার চিত্রকল্প। ‘চাঁদের নিচে নিঃসঙ্গ সুরাপান’ তাঁর একটি উপভোগ্য কবিতা। ‘পুষ্পরাজির মাঝখানে এক জগ মদ:/ একা করছি পান, সন্নিকটে নেই কোনো বন্ধু।/ কাপ তুলে ধরে, ইঙ্গিতে ডাকি উজ্জ্বল চাঁদকে;/ আমার ছায়াসহ আমরা তিনজনের পার্টি।/ যদিও চাঁদ সুরাপানে অনভ্যস্ত/ এবং ছায়া কেবল অনুসরণ করে আমার প্রতিটি পদক্ষেপ/ মুহূর্তের জন্য তারা যা তাই ধরে নেব,/ বসন্ত সমাগম, করি বসন্ত উপভোগ/…।” এখানে কবি তাঁর ছায়া ও চাঁদকে নিয়ে যে উচ্ছলিত ভঙ্গিমায় বসন্ত উপভোগ করেন তা ট্যাং যুগের অন্য কবিতায় বিরল। এ কবিতায় কবি আনন্দপিয়াসী চিত্তের উদ্দাম স্বাধীনতাকে বাক্সময় করে তুলেছেন।

বস্তুবাদী স্কুলের অগ্রণী কবি ডু ফু (৭১২-৭৭০) এ্যান-শি বিদ্রোহের (৭৫৫-৭৬৩) প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। এ বিদ্রোহজাত গৃহযুদ্ধের ফলে ক্রমান্বয়ে ট্যাং রাজবংশের হিরণ্ময় দ্যুতি ম্লান হয়ে আসে। যোদ্ধা ডু ফু শাসকের পক্ষে যুদ্ধ করেও শাসক মহলের নিকট থেকে প্রতিভা ও কর্মের কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি লাভ করেন নি। পরবর্তীকালে অবশ্য তিনি ‘কাব্য মহাজ্ঞানী’ হিশেবে আদৃত হন। বঞ্চনা ও দারিদ্র্য ডু ফু-কে বিষণ্ন, নিঃসঙ্গ ও বস্তুবাদী করে তোলে। তাঁর কবিতা ‘ভ্রমণে নিশীথ ভাবনা’ পাঠকের সামনে তুলে ধরে মগ্ন বিলাপের শিল্পিত ধ্বনিপুঞ্জ: ‘কূল জুড়ে হালকা নলখাগড়া, ক্ষীণবল বায়ু।/ নিভৃত নিশীথে, উচ্চ-মাস্তুলযুক্ত নৌকা।/ নিঃসীম ভূতলের প্রান্তরূপে নক্ষত্রপুঞ্জ করে অবতরণ।/ চাঁদ ভেসে ওঠে, বহমান বিশাল নদীর ওপর।/ আমার কাব্যসৃষ্টির জন্য সুখ্যাত হওয়া কিভাবে সম্ভব?/ অফিসের বাইরে বৃদ্ধ ও অসুস্থ সামনে পেছনে, এখানে ওখানে/ কার সাথে রয়েছে আমার সাযুজ্য, তবু?/ নিঃসঙ্গ এক শঙ্খচিল, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থলে সুস্থিত।’ কবিতার প্রথম স্তবকে প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলির নান্দনিক চিত্রায়ণ পরিলক্ষিত হলেও শেষ স্তবকে খেদ ও নিঃসঙ্গতার রূপকল্প প্রমূর্ত। ‘নিঃসঙ্গ এক শঙ্খচিল’ কবির করুণ, বিজন মানসকে প্রতীকায়িত করে। ‘বসন্ত পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক কবিতায় বসন্ত কুসুমের ভেতর কবি যুদ্ধের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া অবলোকন করেন: ‘জাতির পতন ঘটেছে, দেশ ভোগ করছে দুঃখকষ্ট:/ শহরে বসন্ত বৃক্ষ ও তৃণ সতেজ হয়ে উঠছে।/ কালপ্রবাহে বিপন্ন পুষ্পরাজি বয়ে আনে অশ্রু;/ ভয়াবহ বিদায়-গ্রহণ—পাখিরা থমকে দেয় আত্মা।’ ডু ফু যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের বাস্তব চিত্র এঁকেছেন পরম মমতায়। ‘পাথর পরিখা গ্রাম নিয়োগকর্তাগণ’ কবিতায় সৈনিক সংগ্রহের জন্য কর্মকর্তাগণ দিনান্তে পাথর পরিখা গ্রামে উপস্থিত হলে এক বৃদ্ধার মর্মভেদী বিলাপ শোনা যায়:

‘ইয়েচেঙের নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত তিন ছেলের মধ্যে/ একজন কেবল বাড়িতে পাঠিয়েছে চিঠি।/ অন্য দুজন যুদ্ধে হয়েছে নিহত।/ উত্তরজীবী যথাসাধ্য কৌশলে লাভ করেছে জীবন;/ মৃতরা তাদের নিয়তিকে করেছে নিরুদ্ধ।/ আমার দুগ্ধপোষ্য নাতি ছাড়া/ এ সংসারে আর কোনো পুরুষ নেই।/ সেজন্য পুত্রবধু এখনও আমাদের যায় নি ছেড়ে—/ তাছাড়া তার নেই কোনো শোভন পোশাক।’ যন্ত্রণাকাতর বৃদ্ধার বিলাপ কবিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে; তিনি শুনতে থাকেন ‘দূরবর্তী সাশ্রু দীর্ঘশ্বাসের শব্দ’।

সাবঅলটার্ন মানুষের চিত্র শুধু ডু ফু আঁকেন নি, পিউ এ সিয়ো (আনুমানিক ৮৩৪-৮৮৩) তাঁর ‘ওক ফল সংগ্রহকারিণী মহিলার জন্য বিলাপ’ কবিতায় এক নিরন্ন বৃদ্ধার জীবন ধারণের বাস্তব বর্ণনা তুলে ধরেছেন। ‘হেমন্তে পাকে ওক ফল,/ কণ্টকিত ঝোপে আচ্ছাদিত পাহাড়ে পড়ে ঝরে।/ পীতবর্ণ চুলের কুঁজো এক মহিলা/ ওগুলো কুড়োবার জন্য মাড়ায় প্রভাতি হিম।/ ঘণ্টা খানেকের শ্রমে তার মেলে এক মুঠো কেবল,/ দিনমানে ওক ফলে পূর্ণ হয় এক ঝুড়ি।/ সেদ্ধ করে বার বার রোদ্দুরে দেওয়া হলে,/ খাদ্য হিশেবে ওগুলো ব্যবহৃত হবে সারা শীতকাল।’ প্রাচীন চীনের মতো প্রাচীন বঙ্গেও ভাতের অভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়। চর্যাপদের কবি ঢেন্ঢণপাদ উচ্চারণ করেছিলেন: ‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী।/ হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেসী।’ অর্থাৎ টিলার ওপরে প্রতিবেশীহীন ঘরে কবির হাঁড়িতে ভাত নেই। দারিদ্র্যের এ জাতীয় প্রকট রূপের সাথে সওদাগরদের জীবনের তুলনা করেছেন ঝ্যাং জি (৭৬৬-৮৩০) তাঁর ‘বুড়ো কিষাণের গান’ কবিতায়। খাজনাক্লিষ্ট দরিদ্র কৃষক পাহাড়ে গিয়ে সন্তানদের ওক ফল যোগাড় করতে বলেন। কবিতার শেষে সওদাগরি জীবনধারার সংকেত মূর্ত হয়ে ওঠে: ‘পশ্চিম নদীতে, সওদাগরদের রয়েছে অপরিমিত মুক্তা;/ তাদের নৌকার ভেতর কুকুরগুলোকে দেওয়া হয় মাংস।’ এভাবে শ্রেণিবৈষম্যের ভয়াবহ দিক উন্মোচিত হয় ট্যাং কবিতায়।


ট্যাং কবিতায় মানুষের দৈন্যের সাথে যে প্রাকৃতিক প্রতিবেশ চিত্রিত হয়েছে তার প্রচ্ছায়া প্রায় চোদ্দশত বছর পরে আধুনিক চীনে দুষ্প্রাপ্য।


ট্যাং কবিতায় দারিদ্র্যের অসহনীয় অবস্থার বর্ণনা পাঠের পর চীনের পাহাড়ি গ্রাম প্রত্যক্ষ করার জন্য আমার আগ্রহ বেড়ে যায়। ট্যাং রাজবংশের পরিবেশের সাথে আধুনিক পাহাড়ি পরিবেশের উন্নয়নগত ব্যবধান বিদ্যমান থাকলেও চীনা পাহাড়ি পরিবেশ বোধকে শাণিত করতে পারে, এ বিশ্বাস ছিল দৃঢ়মূল। আমি ২০১৪ সালের জুন মাসে ইউনান প্রদেশের য়ু দিং কাউন্টিভুক্ত চ দিয়ান (Cha Dian) পাহাড়ি গ্রাম পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়ি। এ গ্রামে য়ি কিংবা লোলো নৃ-তাত্ত্বিক  জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারার সাথে আমার পরিচয় ঘটে। তারা সামাজিকভাবে সুসংগঠিত বলে আমার কাছে প্রতিভাত হয়। সামাজিক ও উন্নয়নধর্মী বিষয়াবলির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তারা নিয়মিত তাদের সম্মেলন ভবনে উপস্থিত হন। পাহাড়ি বাড়িগুলো অত্যাধুনিক না হলেও প্রধানত ইষ্টকনির্মিত। পরিবারের নানা বয়সের সদস্যগণ শিক্ষা, কৃষি ও শিশু পালনের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন এবং সরকারের উন্নয়ন কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। য়ি জনগোষ্ঠীর বাড়িগুলোতে রয়েছে রকমারি ফলের গাছ। আপেল, নাশপাতি, আম, কলা, আখরোট, ডালিম  ছাড়াও রয়েছে নাম অজানা অনেক ফলগাছের সমারোহ। বিভিন্ন উচ্চতার পাহাড়ি জমিগুলোতে হচ্ছে ধান, তামাক ও সবজির চাষ। গ্রিনহাউস ভেষজ উদ্ভিদের চাষ এখানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাড়িগুলো থেকে যে রাস্তা নেমে এসেছে তার দু ধারে ডালিম গাছের সারি। গ্রামটিতে বাংলাদেশের মতোই রয়েছে পোষা কুকুরের আনাগোনা। বাড়িগুলোতে রয়েছে ছাগল পালনের সুব্যবস্থা। ছাগলগুলোর সুন্দর স্বাস্থ্য দেখে প্রতীয়মান হয় যে, এখানে পুষ্টিকর পশুখাদ্যের কোনো অভাব নেই। কোনো কোনো বাড়িতে রয়েছে গ্রামীণ পশু ফার্ম। সেখানে হাঁস, মুরগি ও শুকর পালন করা হচ্ছে। গ্রামের এ পরিবেশ দেখে আমার বিশ্বাস জন্মেছে যে, প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে এখন আর দারিদ্র্যের উল্লেখযোগ্য কোনো চিহ্ন নেই। আমাদের বিদায় জানাবার জন্য য়ি মানুষজন যে সাংস্কৃতিক আবহ রচনা করেন তা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামের মহিলাগণ একটি লাইনে দাঁড়িয়ে সমবেত কণ্ঠে নাতিদীর্ঘ একটি গীত পরিবেশন করেন। তাদের ভাষা দুর্বোধ্য হলেও বাংলাদেশের নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর গীতের মতোই প্রলম্বিত, আন্তরিক সুর আমার বিস্ময় ও আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ট্যাং কবিতায় মানুষের দৈন্যের সাথে যে প্রাকৃতিক প্রতিবেশ চিত্রিত হয়েছে তার প্রচ্ছায়া প্রায় চোদ্দশত বছর পরে আধুনিক চীনে দুষ্প্রাপ্য।

মধ্য ট্যাং যুগের কবি লি হো (৭৯০-৮১৬) রোমান্টিক হলেও প্রথাবিরুদ্ধ কল্পনায় ভাস্বর করে তুলেছেন কাব্যভুবন। নিজেরর জীবন-প্রদীপ ২৬ বছর প্রোজ্জ্বল থাকলেও কবিতা তাঁর কাছ থেকে পেয়েছে কালাতীত উজ্জ্বলতা। লি হোর কবিতা ‘ম্যাজিক তন্ত্রীর জন্য শিল্পকর্ম’ আজও বিকিরণ করে প্রাতিস্বিক বিভা: ‘পশ্চিম পাহাড়ে সূর্য অস্ত যায়, পূর্ব পাহাড়ে ঘনায় অন্ধকার,/ ঘূর্ণিঝড়ে উৎক্ষিপ্ত ঘোড়াগুলো পদদলিত করে মেঘপুঞ্জ।/ বর্ণিল বীণা ও আটপৌরে বাঁশি থেকে ঝরে ক্ষীণ সুরমালা:/ যখন সে শরৎ ধুলোয় পা ফেলে খসখস করে ওঠে তার বুটিদার ঘাগরা।/ বাতাস যখন ছুঁয়ে যায় দারুচিনি পাতা এবং ঝরে পড়ে একটি দারুচিনি বীজ/ নীল র‌্যাকুনের চোখ ঝরায় রক্ত আর শীতার্ত খেঁকশেয়াল যায় মরে।/ স্বর্ণখচিত লেজসহ ড্রাগন অঙ্কিত প্রাচীন প্রাচীরগাত্রে/ বৃষ্টির দেবতা শরৎ পুকুরে বেড়ায় ভেসে;/ বৃক্ষের অপদেবতায় রূপান্তরিত শতবর্ষী পেঁচার বাসায়/ যখন সবুজ অগ্নিশিখা উদ্‌গত হয় তখন শোনে সে হাসির শব্দ।’ অদ্ভুত চিত্রকল্পে রচিত হয়েছে কবিতাটি। কবির অন্ধকার, মৃত্যু ও প্রেত চেতনা একান্তই ব্যক্তিগত এবং বিখ্যাত চৈনিক কবিদের নির্মল কল্পনা থেকে তা ভিন্ন। বস্তুত কনফুশীয়, টাওয়িস্ট ও বৌদ্ধ বিশ্বাসের পরিমণ্ডল থেকে নিজের দূরত্ব রচনা করে তিনি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন অদ্ভুত কাব্যশিল্প। মধ্য ট্যাং যুগের হলেও তিনি অন্ত্য ট্যাং যুগের অমলিন বৈশিষ্ট্যে জ্যোতিষ্মান।

ট্যাং কবিতা প্রধানত প্রাচীন ও নব্য কাব্যপ্রকরণ অনুযায়ী লিখিত। ট্যাং যুগের পূর্বে অনুসৃত রীতি তথা অনিয়ন্ত্রিত অক্ষর সংখ্যা ও ছন্দশৈলী যোগে রচিত হয়েছে অনেক ট্যাং কবিতা। নব্য প্রকরণের মধ্যে লুশি ও জুয়েজু উল্লেখ্য। লুশি প্রকরণ অনুযায়ী আট পঙ্‌ক্তি দিয়ে ছন্দে রচিত হয় কবিতা এবং জুয়েজু প্রকরণ অনুযায়ী চার পঙ্‌ক্তির সমন্বয়ে ছন্দে সজ্জিত হয় কবিতার শরীর। ট্যাং রাজবংশ সমকালীন জ্ঞাত পৃথিবীর সাথে ব্যবসায়িক ও সাংস্কৃতিক সূত্রে যুক্ত থাকায় কাব্যসাহিত্যে যেরূপ ঔজ্জ্বল্য সঞ্চালিত হয় তেমন উদ্ভাস পরিবাহিত হয় চিত্র, স্থাপত্য ও মৃৎশিল্পেও। চীনের বিভিন্ন জাদুঘর, বৃটিশ মিউজিয়াম, কোরিয়ার জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত ট্যাং রাজবংশের শিল্পকলা ও স্থাপত্যের নিদর্শন একটি অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক রেনেসাঁর পরিচয় অনুধাবনে যথেষ্ট সহায়ক বলে আমার কাছে প্রতিভাত হয়েছে। বৃটিশ মিউজিয়ামে ট্যাং শাসনামলের মৃৎপাত্র প্রদীপ, পুষ্পদলের নকশাখচিত উজ্জ্বল মৃৎপাত্র ট্রে, ধূপদানি, মোমদানি, চীনামাটির স্টেম-কাপ, ব্রোঞ্জ পাত্র, সমাধি মৃৎপাত্র, ত্রিবর্ণরঞ্জিত জগ প্রভৃতি উন্নত শিল্পরুচির স্মারক হিশেবে গণ্য।


ট্যাং যুগে সম্রাট, প্রশাসক, সওদাগর, গবেষক, যোদ্ধা, নারী, শিশু, সন্ন্যাসী, টাওয়িস্ট যাজক, পরিব্রাজক, ভৃত্য, গণিকা সকলেই কাব্যচর্চা উপভোগ করতেন।


ট্যাং সমাজে ইহজীবন ও পরজীবনে সম্পদের জাঁকালো প্রদর্শনীর প্রচলন ছিল। ফলে জীবদ্দশায় যেমন বর্ণিল পাত্র বা বাক্স ব্যবহার করা হতো তেমনি সমাধির জন্য ব্যবহৃত হতো বর্ণোজ্জ্বল মৃৎপাত্র। সমাধি মৃৎপাত্র ট্যাং সমাজের আন্তর্জাতিক চারিত্রকে উন্মোচন করে। উজ্জ্বল বর্ণশোভিত পাত্র ইরান অথবা সিরিয়া থেকে আহরণ করা হতো; এগুলোর শোভাকর মোটিফ গৃহীত হতো ইরান এবং কেন্দ্রীয় এশিয়া থেকে। সাংকাই (Sancai) বা ত্রিবর্ণে সিসা-ঔজ্জ্বল্যের ব্যবহার মৃৎপাত্রকে অতিমাত্রায় আকর্ষণীয় করে তুলত। সাধারণত সবুজ, হলুদাভ বাদামি ও হলুদাভ শুভ্র রঙ মিলে ত্রিবর্ণ মায়াময় সৌন্দর্য সৃষ্টি করত। শৈল্পিক সমাধি পাত্র মৃত ব্যক্তির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সম্মানের প্রতীক হিশেবে পরিগণিত ছিল। কোরিয়ার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে ট্যাং যুগের একটি বৌদ্ধ স্তম্ভ (Buddhist Stele)| গাও ওয়ানহাই তাঁর মৃত পিতামাতার শান্তিপূর্ণ চিরবিশ্রামের জন্য আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় ৬৬০ খ্রিস্টাব্দে এ স্তম্ভ নির্মাণ করেন। সপ্তম শতকের ট্যাং স্থাপত্যে বোধিসত্ত্বের চিত্রায়ন একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত এশীয় প্রত্ন-নিদর্শন কবি এজরা পাউন্ডকে এশীয় সাহিত্য ও শিল্পকলার প্রতি অনুরাগী করে তুলেছিল। শিল্প সমালোচক অধ্যাপক ফেনোলোসার টীকাভাষ্য অনুসরণে এবং অধ্যাপক মোরি ও অ্যারিগার অর্থোদ্ভেদ অনুযায়ী পাউন্ড ১৯১৫ সালে প্রাচীন চীনা কবিতার অনুবাদকর্ম ‘ক্যাথি’ (Cathay) প্রকাশ করেন। এ কাব্যে প্রাচীন চীনা কবিতা ও অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগের ‘সমুদ্রাভিযাত্রী’ (The Seafarer) কবিতাসহ মোট ১৫টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়। এ কাব্যগ্রন্থে  চীনের অষ্টম শতকের ট্যাং কবি রিহাকু বা লি বাইকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। লি বাই এর দীর্ঘ কবিতা ‘নির্বাসীর পত্র’ (Exile’s Letter) সহ ১২টি অনুদিত কবিতা ‘ক্যাথি’ কাব্যে সংকলিত হয়েছে। পাউন্ড চীনা ভাষায় জ্ঞান লাভ করেন নি। কিন্তু প্রাচীন চীনা কবিতার অর্থঘনত্ব, রূপকল্পময়তা ও প্রতীকতা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি আধুনিক ইংরেজিতে প্রাচীন চীনা কবিতার কথাবস্তুর অনুবাদ করেছেন মাত্র, ভাষান্তরিত কবিতাকে দৃঢ়সংলগ্ন করার জন্য তিনি চীনা ব্যাকরণ রীতির অনুগামী হতে পারেন নি। পাউন্ডের অনুবাদে বিকিরিত চীনা কবিতার শক্তি ও দীপ্তির প্রশংসা করেছেন ডব্লিউ. বি. ইয়েটস, ফোর্ড ম্যাডোক্স ফোর্ড, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস ও টি. এস. এলিয়ট।

ট্যাং কবিতার স্বপ্নডাঙা বাংলা ভাষার কবি ও কবিতাপ্রেমীগণকে ঝলকে ওঠা পথের সন্ধান দিতে পারে। চীনা ভাষার জ্ঞানবল না থাকায় ট্যাং কবিতা অনুবাদের জন্য আমাকে প্রধানত নির্ভর করতে হয়েছে ঝ্যাং টিং-চেন ও ব্রুস এম. উইলসন অনুদিত 100 Tang Poems’, এ. সি. গ্রাহাম কর্তৃক ভাষান্তরিত ‘Poems of the Late T’ang’ এবং ডেভিড হিনটন অনুদিত ও সম্পাদিত ‘Classical Chinese Poetry: An Anthology’ গ্রন্থের ওপর। প্রথম গ্রন্থটি ভ্রাতৃপ্রতিম রবীন্দ্রনাথ বর্মণ এবং দ্বিতীয় গ্রন্থটি সতীর্থবন্ধু শবনম আখতার স্বাতীর সৌজন্যে আমার হস্তগত হয়েছে। ট্যাং কবিতা অনুবাদের জন্য আমার শ্রদ্ধাস্পদ শিক্ষক মুহম্মদ আলীম উদ্দীন এবং কবিবন্ধু আতাহার আলী খান নিরন্তর অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁদের সকলকে আমি জ্ঞাপন করছি সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ।

ট্যাং যুগে সম্রাট, প্রশাসক, সওদাগর, গবেষক, যোদ্ধা, নারী, শিশু, সন্ন্যাসী, টাওয়িস্ট যাজক, পরিব্রাজক, ভৃত্য, গণিকা সকলেই কাব্যচর্চা উপভোগ করতেন। স্থাপত্য, মৃৎশিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রশান্ত ধারায় সমাজ নিয়ত স্নাত হতো বলে অভাবনীয় মানস সম্পদে ট্যাং যুগ পূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্তর্গত আনন্দের মূল্যবান উৎস হিশেবে আমরা ট্যাং কবিতার দিকে ফিরে তাকাতে পারি।

 

উদাহৃত রচনাবলি
    
  1. Graham, A. C.. Poems of the Late T’ang. New York: New York Review Books, 1977.
  2. Hinton, David. Classical Chinese Poetry: An Anthology. New York: Farrar, Straus and Giroux, 2008.
  3. Shushe, Huangshan., ed. The Poetry of Tang Dynasty. Chinese Red. 2012.
  4. The Analects of Confucius. Ed. Robert Eno. 2003, 2012, 2015. (www.indiana.edu)
  5. Ting-Chen, Zhang and Bruce M. Wilson. 100 Tang Poems. Beijing: China Translation and Publishing Corporation, 1988.

ক  বি  তা


ঝ্যাং রো-জু  [৬৬৬-৭২০]

বসন্ত, নদী, পুষ্পগুচ্ছ, চাঁদ: রাত

বসন্তে নদী সমুদ্রতল অব্দি স্ফীত হয়,
জোয়ার-ভাঁটায় চাপতে ওঠে উজ্জ্বল চাঁদ।
অসীম আলো নিয়ে জল চমকায়।
বসন্ত নদীর ওপর কি থাকে না উজ্জ্বল চাঁদ?
পুষ্প সুরভিত মাঠের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে নদী,
জ্যোৎস্নায় চিকচিক করে ওঠে বরফ গুটিকার মতো।
কে পারে দেখতে জ্বলজ্বলে তুষার,
অথবা দ্বীপের শুভ্র বালুকাকে চাঁদের শুভ্র আভা থেকে পৃথক করতে!
আকাশ, নদী—একটা সম্পূর্ণ রঙ।
উজ্জ্বল, উজ্জ্বল—আকাশে নির্জন বৃত্ত।
মানুষের ওপর চাঁদ কখন প্রথম কিরণ ঢেলেছিল?
কে প্রথম নদীতীর থেকে দেখেছিল চাঁদ?
মানবকুল, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনিঃশেষভাবে,
দেখে একই নদী, একই চাঁদ:
কেউ কি জানে কার জন্য সে করে প্রতীক্ষা?
আমরা কেবল দীর্ঘ নদীকে প্রবাহিত হতে দেখি।
        এক গুচ্ছ মেঘ
        ঝুলে থাকে আকাশে
আজ রাতে কোন বাড়ির পর্যটক জোয়ারে হবে ভাসমান?
কোন নিঃসঙ্গ রমণীর ছাদ থেকে চাঁদ কিরণ ঢালে?
ঘরের ওপর আলো খেলছে করুণ খেলা,
সরে যায় কারো ফেলে রাখা ড্রেসিং টেবিলের ওপর।
কাপড়-কাচার কাষ্ঠখণ্ড হতে সরাতে কিংবা
অন্ধের শরীরে গড়িয়ে পড়া থেকে একে রোধ করা অসম্ভব।
        সবুজ মেপ্‌ল পুকুর
        অনেক দূর! অসহনীয়!
চাঁদের আলোয় এখন আমরা একটির সাথে আরেকটির সাদৃশ্য
অনুসন্ধান করছি।
জ্যোৎস্নায় আমি যদি শুধু বয়ে যেতে পারতাম তোমার কাছে,
অথবা সেই মাছকে দিয়ে যদি বার্তা পাঠাতে পারতাম যে
জল থেকে লাফ দিয়ে
জলের গভীরে চলে যায়
অথবা বন্য রাজহংসীকে দিয়ে যে আকাশের উঁচুতে উড়ে
থেকে যায় উজ্জ্বলতায়।
গতরাতে আমি পুকুরের নিশ্চলতায়
পাপড়ি পতনের স্বপ্ন দেখেছি
হায়, তোমার প্রত্যাবর্তন ছাড়া কেটে গেল অর্ধেক বসন্ত।
বসন্ত! প্রায় নিঃশেষিত, নদীর জলে দ্রুতবেগে বাহিত।
উদীয়মান কুয়াশার সাগরে সংগোপিত, এখন অনুজ্জ্বল
চাঁদ নদী ও পুকুরের ওপারে পশ্চিমদিকে হেলে পড়ছে।
জেইশি হতে জিয়াং নদী পর্যন্ত রাস্তা সীমাহীন।
কি করে জ্যোৎস্নায় অনেকে আসবে ফিরে?
মনে হচ্ছে অস্তায়মান চাঁদ নদীতীরের পুষ্পপ্রসূ গাছকে
অশান্ত চিন্তা নিয়ে ঝাঁকা দিচ্ছে।


ওয়াং ওয়েই  [৭০১-৭৬১]       

উপ-হাকিম ঝ্যাং-এর জন্য

বার্ধক্য কেবলই লালন করে নিস্তব্ধতা,
পার্থিব উৎকন্ঠা-শূন্য এক হৃদয়।
আমার স্থানীয় বনাঞ্চলে প্রত্যাবর্তন ভিন্ন
আমার জন্য রাখি নি কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
সেখানে আমার শার্শি মুক্ত পাইন বৃক্ষ সমীরণে,
জ্যোৎস্নাস্নাত পাহাড়ে আমি বাজাব জিথার।
সফলতা ও নিষ্ফলতার স্বরূপ নিয়ে তুমি তোলো প্রশ্ন:
গহীন নদী হতে ভেসে আসে কূলে ধীবরের গান।


লি বাই  [৭০১-৭৬২]       

চাঁদের নিচে নিঃসঙ্গ সুরাপান

পুষ্পরাজির মাঝখানে এক জগ মদ:
একা করছি পান, সন্নিকটে নেই কোনো বন্ধু।
কাপ তুলে ধরে, ইঙ্গিতে ডাকি উজ্জ্বল চাঁদকে;
আমার ছায়াসহ আমরা তিনজনের পার্টি।
যদিও চাঁদ সুরাপানে অনভ্যস্ত
এবং ছায়া কেবল অনুকরণ করে আমার প্রতিটি পদক্ষেপ
মুহূর্তের জন্য তারা যা তাই ধরে নেব,
বসন্ত সমাগম, করি বসন্ত উপভোগ।
টালমাটাল ছায়া, বিলোড়িত চাঁদ
আমার নাচ ও গানে হয় সহগামী।
তথাপি নিয়ন্ত্রিত, আমরা একত্রে করি আমোদ;
পানোন্মত্ত, প্রত্যেকে নিই ছুটি।
এখন অশৃঙ্খলিত বন্ধুত্বের চির অবসান ঘটাতে
চল ছায়াপথ পেরিয়ে হই সম্মিলিত।
       

বসন্ত দিনে স্বচ্ছ খাঁড়ির ওপর বেড়ানো

গভীর গিরিখাতের মুখে, আমি গাইছি গান।
সত্বর হবে পথের অবসান। মানুষজন যায় না উচ্চতর কোনো গন্তব্যে।

আমি খাড়া পাহাড় বেয়ে অসম্ভব উপত্যকায় উঠি,
আর খাঁড়ির উৎসের সন্ধানে প্রবাহের প্রতিকূলে চলি এগিয়ে।

মুক্ত শিলাখণ্ডের ওপর যেখানে নবজাত মেঘেরা ভেসে চলে,
সেখানে বুনো ফুলের উদ্দামতার ভেতর এসে পড়ে এক আগন্তুক।

দীর্ঘসময় ধরেই রয়েছি এখানে, অসমাপ্ত আমার আরোহণ,
অসংখ্য পাহাড়চূড়ার পশ্চিমে অস্তমিত হয় সূর্য।


ডু ফু  [৭১২-৭৭০]     

পাথর পরিখা গ্রাম নিয়োগকর্তাগণ

দিনান্তে আমার আবাসনের ব্যবস্থা হলো পাথর পরিখা গ্রামে,
যেখানে কর্মকর্তাগণ রাতে মানুষজনকে জড়ো করতে লাগলেন।
আমার বৃদ্ধ আমন্ত্রক বাগানের পাঁচিল টপকিয়ে পালাল;
তার বয়স্ক গৃহিণী খুলে দিতে গেলেন দরজা।
রোষতপ্ত ছিল কর্মকর্তাগণের চিৎকার,
মর্মভেদী ছিল বৃদ্ধ মহিলার বিলাপ।
তারপর দেখলাম তিনি কথা বলতে উদ্যোগী হলেন:

        “ইয়েচেঙের নিরাপত্তাবিধানে নিয়োজিত তিন ছেলের মধ্যে
একজন কেবল বাড়িতে পাঠিয়েছে চিঠি।
অন্য দুজন যুদ্ধে হয়েছে নিহত।
উত্তরজীবী যথাসাধ্য কৌশলে লাভ করেছে জীবন;
        মৃতরা তাদের নিয়তিকে করেছে নিরুদ্ধ।
আমার দুগ্ধপোষ্য নাতি ছাড়া
এ সংসারে আর কোনো পুরুষ নেই।
সে জন্য পুত্রবধু এখনও আমাদের যায় নি ছেড়ে—
তাছাড়া, তার নেই কোনো শোভন পোশাক।
রাতের অন্ধকারে, আমাকে নিয়ে চলুন আপনাদের সাথে।
যদিও আমি দুর্বল বৃদ্ধা রমণী,
        হেয়াঙে আমাকে কাজে নিয়োজিত রাখুন—
এখনও আমার রয়েছে সকালের খাবার তৈরি করার শক্তি।”

যদিও গভীরতর অন্ধকার গ্রাস করেছে তাদের কন্ঠধ্বনি,
মনে হলো আমি দূরবর্তী সাশ্রু দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনলাম।
নিশান্তে আমি যখন যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি নেই,
পড়ে থাকেন শুধু বৃদ্ধ মানুষটি যার কাছ থেকে নিতে হয় বিদায়।

     

ভ্রমণে নিশীথ চিন্তাভাবনা

কূল জুড়ে হালকা নলখাগড়া, ক্ষীণবল বায়ু।
নিভৃত নিশীথে, উচ্চ-মাস্তলযুক্ত নৌকা।
নিঃসীম ভূতলের প্রান্ত রূপে নক্ষত্রপুঞ্জ করে অবতরণ।
চাঁদ ভেসে ওঠে, বহমান বিশাল নদীর ওপর।

আমার কাব্যসৃষ্টির জন্য সুখ্যাত হওয়া কিভাবে সম্ভব?
অফিসের বাইরে, বৃদ্ধ ও অসুস্থ—সামনে পেছনে, এখানে ওখানে
কার সাথে রয়েছে আমার সাযুজ্য, তবু?
নিঃসঙ্গ এক শঙ্খচিল, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থলে সুস্থিত।

     

নতুন চাঁদ

ঊর্ধ্বগামী আলোর হালকা ফালি, চাপ কাত করে
রেখেছে তার ফেঁপে ওঠা অন্ধকার—নতুন চাঁদ

ওঠে এবং, প্রাচীন সীমান্ত গিরিপথ,
মেঘেদের পেছনের প্রান্তসীমা পেরিয়ে সবেমাত্র উদিত। রৌপ্য

পরিবর্তনহীন—স্টার নদী ঠান্ডায় উজ্জ্বল
শূন্য পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রসারিত হয়। শুভ্র

শিশির ঢেকে রাখে উঠোন, সেখানে ক্রিস্যানথামাম
ফুল স্ফীত অন্ধকারের সাথে ঘনীভূত।


মং চিয়াও  [৭৫১-৮১৪]

গিরিখাতের বিষাদ
(দশটির সিরিজে তৃতীয় কবিতা)

গিরিখাত সমূহের ওপরে আকাশের এক সুতো:
গিরিখাতে জলপ্রপাত পাকিয়ে রাখে হাজার রজ্জু।
ঊর্ধ্বে, চূর্ণময় সূর্যালোক, চন্দ্রালোকের ঢাল:
নিচে, বন্য তরঙ্গের টানে লাগাম।
বহু শতাব্দী ধরে হিমায়িত ছায়ার গভীরতায়
একটির পর একটি মৃদু দীপ্তির অভিঘাত:
গিরিখাতসমূহের মাঝে আলোকরশ্মি দুপুরে পড়ে না থেমে;
সেখানে জলপ্রণালি বিপদসংকুল, বিরাজিত অধিক ক্ষুধাতুর থুথু।
বৃক্ষ শেকড়রাজিকে পচা শবাধারে আবদ্ধ রাখে
এবং মোচড়যুক্ত কঙ্কালসমষ্টি কাত হয়ে ঝুলে থাকে:
তুষার উড়ে এসে বসে বিধায় বৃক্ষশাখারা কাঁদে
শোকার্ত ছন্দঃস্পন্দ, দূরবর্তী ও স্পষ্ট।
            এক প্রত্যাখ্যাত নির্বাসিত ব্যক্তির কুঞ্চিত নাড়িভুঁড়ি
            যে জল ও আগুনে দগ্ধ ও আন্দোলিত হয় তার ভেতর
            দিয়ে সে হেঁটে চলে।
            একটা জীবনকাল মিহি সুতোর মতো,
            রশির মাধ্যমে রাস্তা ওপরের দিকে প্রান্তসীমায় চলে যায়।
            প্রেতাত্মার উদ্দেশ্যে যখন সে জলপ্রবাহে অশ্রুর অর্ঘ বর্ষণ করে
            প্রেতাত্মারা একত্রিত হয়, তরঙ্গে খেলে যায় ঝিলিমিলি।

 

অচিন্তপূর্ব

ধারাল তরবারি হতে দূরে থাকুন,
যাবেন না রূপসী রমণীর কাছে।
অতি নিকটবর্তী ধারাল তরবারি আপনার হাতে চোট বসাবে,
অতি নিকটবর্তী রমণীর সৌন্দর্য আপনার জীবনে চোট বসাবে।
দূরত্বের মধ্যে রাস্তার বিপদ নিহিত নেই,
চাকা ভেঙে যেতে দশ গজই যথেষ্ট।
প্রেমের বিষণ্নতা পৌনঃপুনিক প্রেম নিবেদনে নিহিত নেই,
একটি মাত্র সন্ধ্যা আত্মায় রেখে যেতে পারে ক্ষতচিহ্ন।


হান য়ু  [৭৬৮-৮২৪]

ফেজান্ট ও তীর

সমভূমির ওপর সম্পূর্ণ নিঃশব্দে জ্বলে আগুন:
বাজ-ভয়াকুল ফেজাণ্ট পুনরায় পেয়েছে নিরাপদ আশ্রয়।
ধীরে মাঠ হয়েছে অনায়ত, ঘনবদ্ধ হয়ে দর্শকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
বিক্রম দেখিয়ে সবাইকে আলোড়িত করার জন্য,
গুলিবর্ষণ বন্ধ রেখে, জেনারেল তার বাহনে বসে ধনুক আকর্ষণ করেন।
আতঙ্কে কেঁপে ওঠে ফেজাণ্ট, কিন্তু প্রবল তীর আঘাত হানে তাকে।
ঊর্ধ্বে সে উড়াল দেয়, প্রত্যক্ষকারীর অনেক অনেক ঊর্ধ্বে
যতক্ষণ না তার লাল পুচ্ছ এবং শরযষ্টির শ্বেতাংশ চাপাকারে নিম্নগামী হয়।
কর্মকর্তা-অভিনন্দিত জেনারেল পেছনে দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে হাসেন।
তার ঘোটকের সম্মুখে পড়ে থাকে বিক্ষিপ্ত বহুবর্ণ পালকরাশি।


য়ুয়ান ঝেন  [৭৭৯-৮৩১]

বিষাদের প্রকাশ

বিগত বছরগুলোয় আমরা ঔদাস্যভরে মৃত্যু ও মৃত্যুবরণের অর্থ নিয়ে খোশগল্প করেছি:
তখন থেকে এটা ঘটেছে আমার চোখেরই সামনে।
আমি তোমার প্রায় সমস্ত পোশাক পরিচ্ছদ বিতরণ করেছি
তবে তোমার সেলাই সামগ্রী টেনে সরাতে পারছি না।
তোমার অতীত আসক্তির কথা মনে রেখে আমি তোমার প্রিয়তমা তরুণীদের প্রতি সদয় হয়েছি।
স্বপ্নে তোমার আত্মার সাথে আমি সম্মিলিত হয়েছি, এবং সূত্রকে গীতল হতে বলেছি।
নিশ্চিতভাবে জানি এ দুঃখ সবার সঙ্গী।
কিন্তু নিঃস্ব ও সাদাসিধে দম্পতিদের কাছে জীবন বয়ে আনে বিষাদময়তা।


লি হো  [৭৯০-৮১৬]

ম্যাজিক তন্ত্রীর জন্য শিল্পকর্ম
(একজন ডাকিনী অকল্যাণকর প্রাণীদের বিতাড়িত করছে)

পশ্চিম পাহাড়ে সূর্য অস্ত যায়, পূর্ব পাহাড়ে ঘনায় অন্ধকার,
ঘূর্ণিঝড়ে উৎক্ষিপ্ত ঘোড়াগুলো পদদলিত করে মেঘপুঞ্জ।
বর্ণিল বীণা ও আটপৌরে বাঁশি থেকে ঝরে ক্ষীণ সুরমালা:
যখন সে শরৎ ধুলোয় পা ফেলে খসখস করে ওঠে তার বুটিদার ঘাগরা।
বাতাস যখন ছুঁয়ে যায় দারুচিনি পাতা এবং ঝরে পড়ে একটি দারুচিনি বীজ
নীল র‌্যাকুনের চোখ ঝরায় রক্ত আর শীতার্ত খেঁকশেয়াল যায় মরে।
স্বর্ণখচিত লেজসহ ড্রাগন অঙ্কিত প্রাচীন প্রাচীরগাত্রে
বৃষ্টির দেবতা শরৎ পুকুরে বেড়ায় ভেসে;
বৃক্ষের অপদেবতায় রূপান্তরিত শতবর্ষী পেঁচার বাসায়
যখন সবুজ অগ্নিশিখা উদ্গত হয় তখন শোনে সে হাসির শব্দ।

 

ম্যাজিক তন্ত্রী

ডাকিনী অর্ঘ্য নিবেদন করে, মেঘপুঞ্জ পূর্ণ করে আকাশ,
সবুজ পাথুরে মালসার জ্বলন্ত কয়লায় ধুনোর ধোঁয়া ধুকধুক করে।
সমুদ্র দেবতা ও পর্বত পরী তাদের আসন গ্রহণ করেন,
গর্জমান ঘূর্ণিঝড়ে খসখস করে মানত-করা কাগজ।
তার প্যাশন-কাঠের রত্নখচিত বীণায় সোনার পাতের ফিনিক্স নৃত্য করে
প্রত্যেক অস্পষ্ট উক্তির দিকে ভ্রুকুঞ্চিত করে সে একবার তন্ত্রীতে ঘা দেয়।
তার থালা ও পেয়ালার স্বাদ গ্রহণের জন্য সে নক্ষত্রকে ডাকাডাকি করে এবং পিশাচকে করে আহ্বান:
যখন পর্বত অপদেবতারা খাদ্য গ্রহণ করেন, মানুষ শিউরে ওঠে।
চুং-নানের পেছনে সূর্যের আভা পাহাড়ের খাদে নিচে ঝুলে থাকে:
এখানে দেবতাগণ কোথাও এবং কোথাও না এর মাঝামাঝি চিরকাল বিরাজ করেন।
দেবতাগণ বকাঝকা করেন, দেবতাগণ সন্তুষ্ট, প্রেতমাধ্যমের মুখের মাংসপেশির সংকোচনে তা অভিব্যক্ত।
—অতঃপর দেবতাগণ অসংখ্য রক্ষীর সাথে নীল পর্বতমালায় ফিরে যান।


পিউ এ সিয়ো  [আনুমানিক ৮৩৪-৮৮৩]

ওক ফল সংগ্রহকারিণী মহিলার জন্য বিলাপ

হেমন্তে পাকে ওক ফল,
কণ্টকিত ঝোপে আচ্ছাদিত পাহাড়ে পড়ে ঝরে।
পীতবর্ণ চুলের কুঁজো এক মহিলা
ওগুলো কুড়োবার জন্য মাড়ায় প্রভাতী হিম।
ঘণ্টা খানেকের শ্রমে তার মেলে একমুঠো কেবল,
দিনমানে ওক ফলে পূর্ণ এক ঝুড়ি।
সেদ্ধ করে বারবার রোদ্দুরে দেওয়া হলে,
খাদ্য হিশেবে ওগুলো ব্যবহৃত হবে সারা শীতকাল।

পাহাড়ের সম্মুখে রয়েছে ধানের রাঙা মঞ্জরিগুচ্ছ
ওদের সুগন্ধ নাসারন্ধ্রকে করে সর্বত্র জর্জরিত।
সযত্নে রাশীকৃত, দক্ষহাতে কাঁড়ানো,
প্রতিটি শাঁস পাথরের কণ্ঠভূষণের মতন,
সমস্তই অর্পণ করা হয় সরকারের কাছে,
ব্যক্তিগত ভাণ্ডারে থাকে না কিছুই।
কিভাবে যে এক দ্যান বা ততোধিক
কেবল পাঁচ দৌ হিশেবে হয় কলিত?
ধূর্ত কর্মকর্তারা উচ্চপদস্থগণের কঠোর অসম্মতির তোয়াক্কা করে না
লুব্ধরা বামাল লুকোতে হয় না উৎকণ্ঠিত।

লুকোনোর সময় ব্যক্তিগতভাবে যা কর্জ করা হয়
ফসল কাটার সময় তার অধিক ফিরিয়ে দিতেই হয় সরকারি শস্যগারে।
শীতকাল থেকে গ্রীষ্ম,
ওক ফল শূন্য জঠরকে করে বঞ্চনা।
এমনকি তিয়ান চেং-জি, যা জেনেছি যদি সত্য হয়,
অবগত ছিলেন যে রাজা হতে তাকে দয়াশীলতার ভান করতেই হবে।
ওক ফল সংগ্রহকারিণী এ মহিলাকে হঠাৎ দেখে,
বিস্মিত হবার কিছু নেই, এ আস্তিনগুলো অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।

 

* এক দ্যান= এক হেক্টোলিটার
* পাঁচ দৌ= পাঁচ ডেকালিটার
গৌরাঙ্গ মোহান্ত

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

জন্ম ৭ জানুয়ারি ১৯৬২, লালমনির হাট। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব।

প্রকাশিত বই :
১. আধিপ্রান্তর জুড়ে ছায়াশরীর (২০০৯, শ্রাবণ)
২. শূন্যতা ও পালকপ্রবাহ (২০১২, ম্যাগনাম ওপাস)
৩. ট্রোগনের গান (২০১৬, পরিবেশক- সাহিত্য বিলাস)
৪. জলময়ূরের শত পালক (২০১৬, সাহিত্য বিলাস)
৫. ঝলকে ওঠা স্বপ্নডাঙা (২০১৬, পরিবেশক- কবি)
৬. Robert Forst : A Critical Study in Major Images and Symbols (2009, Shrabon)
৭. বেগম রোকেয়া স্মারকগ্রন্থ (যৌথ, ২০০৫, রংপুর)
৮. পুথি রহিব নিশানী : হেয়াত মামুদ (যৌথ,, ২০০৬, রংপুর)

ই-মেইল : gauranga4613@yahoo.com
গৌরাঙ্গ মোহান্ত