হোম অনুবাদ জীবনানন্দ দাশের নির্বাচিত দিনলিপি

জীবনানন্দ দাশের নির্বাচিত দিনলিপি

জীবনানন্দ দাশের নির্বাচিত দিনলিপি
2.99K
0

জীবনানন্দ দাশের নোটবই থেকে নির্বাচিত কিছু অংশ বেরিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত ‘বিভাব’ জীবনানন্দ দাশ জন্মশতবর্ষ স্মরণ সংখ্যায়। বিভাব-এর জন্য নোটবইয়ের পাঠোদ্ধার ও পাদটীকা রচনা করেছেন জীবনানন্দের ভ্রাতুষ্পুত্র অমিতানন্দ দাশ।

জীবনানন্দ দাশ তাঁর দিনলিপি লিখেছেন মুখ্যত ইংরেজি ভাষায়। কখনো কখনো—ছেঁড়া-ছেঁড়াভাবে—ব্যবহার করেছেন বাংলা। এখানে প্রকাশিত দিনলিপিতে কবির নিজের লেখা বাংলা অংশটুকু, ধরিয়ে দেয়ার জন্য, ছাপা হলো বাঁকা হরফে। নিম্নরেখ অংশগুলো জীবনানন্দ দাশের নিজস্ব।

জীবনানন্দের দিনলিপি একেবারে সাঁটে—প্রায় অবোধ্য সঙ্কেতে—লেখা। আমরা উদ্ধারযোগ্য এমন অংশের অনুবাদ এখানে প্রকাশ করলাম, যা থেকে জীবনানন্দের মনের একটি পরিচয় মিলবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাক্য অস্পষ্ট, মোচড়ানো বা অর্ধসমাপ্ত ঠেকতে পারে; তার কারণ অংশত কবির নিজেরই আবছা প্রকাশভঙ্গি, বাকিটার পুরো দায় অনুবাদকের।

দিনলিপিটুকু কিছুটা বোধ্য করে তোলার জন্যে অমিতানন্দ দাশ-রচিত পাদটীকার সহায়তায় কিছু সূত্র অনুবাদিত দিনলিপির নিচে যুক্ত করা হলো।

সাজ্জাদ শরিফ

২৩. ৭. ৩১

—প্রেমে প্রেমে হয়তো আমার জীবন সুরভিত করে তুলতে পারত গেঁয়ো এক মেয়ে : ওয়াই. তা পারে, তবু কত দূরে সে এসব থেকে। হয়তো সে তা-ই, তবু সে তা নয়…আহ, কোথায় যে খোঁজ পাওয়া যাবে তার…যদি পাওয়া যেত!

—কত বছর পর আমাদের দেখা, কোনো ক্ষান্তি নেই, আমাদের বইয়ের প্রতিটি পঙ্‌ক্তি আর পৃষ্ঠায় নিবিড়, আর মৃত্যু সবকিছুর সমাপ্তি টেনে দেয়…মৃত্যু = অস্থি আর ছাই

—ব্রাহ্মবাদ ইত্যাদি কখনো কখনো বোধহীন দেহহীন আত্মাহীন বস্তুর চেয়ে বেশি কিছু ঠেকে নি আমার কাছে! অন্য ধর্মগুলোয় (হিন্দুত্ব, পৌত্তলিকতা, রোমান ক্যাথলিকবাদ ইত্যাদি) আছে আত্মার রঙ (শিল্পের সত্য)…সত্য দূর, সত্য দূর…নক্ষত্রের মহান সত্য আমার যদিও

—পরিহাস : ওয়াই. ইত্যাদির কাছে যাওয়ার পর হৃদয়ের এক উদ্ভাস ঘটেছে, তবু স্নানের পর বেরিয়ে এসেছিল এক অপ্সরা—কিন্তু একচোখো সহদেব ছাড়া আর কেউ দেখার ছিল না।

 

২৪. ৭. ৩১

হাতের ১০টা আঙুলেরি দরকার আছে : একটা কেটে গেলেই বুঝতে পারা যায়—

—আজ : অনেক নোংরা লেগে যাওয়া এক দিন : আত্মার অপমান (প্রত্যেকটা কুকুর-বেড়ালকে আজ আমি কুর্নিশ করেছি)।

—বিতাড়িত হয়েছে এক ব্যর্থ, এক বেকার, এক অসফল মানুষ : কম সফলতা দেখাও, তোষামোদ পাবে

 

২৫. ৭. ৩১

—একটা গল্প : জাতিবোধমুক্ত এক যুবক, মনমেজাজ ইউরোব্রিটিশ, ঘেন্না করে খদ্দর-টদ্দর, সীফর্থ বা পিডব্লি­উ বা লেসিস্টার বা কাস্টমস ইত্যাদি ইত্যাদির কাছে মোহনবাগান হেরে গেলে আনন্দ হয় মনে—আর ধমনীতে খুঁজে পায় পর্তুগিজ বা ওলন্দাজ বা স্কট রক্ত—সন্তানাদি আর পরিবেশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার

—পরিহাস : অন্নদা অ্যান্ড কোং, রামানন্দ অ্যান্ড কোং ইত্যাদি ইত্যাদি আমার বাবা-মার বন্ধু যদিও, তবু আমি যা তা-ই হওয়ার কারণে, রয়ে গেলাম বিচ্ছিন্ন—নিরুপায়—শিকার…স্মৃতি

—সাহিত্য এখানে কত যে ভোগায় : কপর্দকহীন শিক্ষিতের কোনো শেষ উপায় এখানে নেই—তাকে ঠেলে দেয়া হয় থাম থেকে খুঁটিতে, তপ্ত কড়াই থেকে আগুনে—হিরণ, ব্রজেন, রজনীসহ আরো সব বামনদের মিষ্টি ইচ্ছায়, আর রোববার—সমস্ত সহানুভূতির বাইরে, পৃথিবী বলছে ‘যাও ফাঁসিতে ঝোলো’—তার কলম (শেষ সম্বল) তাকে কিছুই এনে দেবে না এখানে—না পুরস্কার, না অবসরভাতা, না তার কোনো নিরাপত্তা…কিভাবে সে সামলাবে? কী দুরবস্থা তার।

—একটা ব্যঙ্গ : খোলা চিঠিই বলা যাক—এত যে টাকার ভোগ (এটাই তো সবার ওপরে) হিরণ, রজনী ইত্যাদির মতো (ধর্ম, নীতি ইত্যাদি নিয়ে তাদের ওষ্ঠসেবাটুকু বাদ দিলে) মনের নীচতা আর হিংস্রতায়, অভীষ্টের নিশ্চয়তায়, উপায়ের নিপুণতায় শিকাগোর কোনো বদমাশকে পেরিয়ে যাবে কী করে…যদি ঈশ্বরও নেমে এসে তাদের নমনীয় হতে বলে, টাকা খোয়ানোর বদলে ওরা বরং নাস্তিকতা মেনে নেবে…

—কালী আর কৃষ্ণ (কেশব) শ্লোকের বিভূতি ও সম্মোহ বিষয়ে…কত যে উদার (ক্যাথলিক) আর গভীর আর পরিব্যাপ্ত হচ্ছি আমি দিন দিন…খোলা মন আর সংবেদনশীল অভিজ্ঞতায় (পরিব্যাপ্ত) ভরা শিক্ষার গুণে ঘটছে ব্যাপারটা…সংকীর্ণ মত-পথ এমনকি একজন শিল্পীর কাছেও ধারণাতীত…এমন বহুকিছুর অবাধ উদ্ভাসই হয়তো আমি মেলে ধরতে বা প্রকাশ করতে পারব অন্ধ বিশ্বাসীদের কাছে যা ভয়াবহ…

—তবু মিসরীয় বা মোয়াবীয় বা সডোমীয় বা ব্যাবিলনীয়রা কি গায়?…এখানে ভারতীয় জিনিস মাটির লোকায়ত জ্ঞান, অনেক দিনের পরিচয়, বাড়ির জিনিস, দেশাত্মবোধসহ আরো বহু অনুষঙ্গ আমাদের স্বদেশি পণ্যকেই করে তুলেছে অতুলনীয়।

 

২৬. ৭. ৩১

—স্ত্রী যে অন্যের সঙ্গে ঘর বেঁধেছে তা দেখতে স্বামী ফিরে এসেছে ১৬ বছর পর, আর মেয়েটিকে শান্তি দিতে ফিরে চলে গেছে আবার…গল্প

—প্রশান্ত শরৎ আর অপূর্ব আকাশ আর আজ সকালের রোদ কত না পুরোনো স্মৃতি, হারানো সুযোগ আর গভীর বেদনা ফিরিয়ে আনছে এই ট্রেনে…

—সব যেন ফুরিয়ে গেছে—কোনো উদ্দীপনা নেই, নেই কোনো প্রণোদনা—বিপুল অবসন্নতা


ড. দাশ। ফাঁপা নির্বোধটা আজও আমার মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দিল।—লম্বা হাঁটা (বাসভাড়া নেই)—খোঁজ খোঁজ, এরপর রওয়ানা


২৮. ৭. ৩১

—তিন পয়সা মাত্র সম্বল, কী আর দিতে পারে তিনটা পয়সা?

—ড. দাশ। ফাঁপা নির্বোধটা আজও আমার মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দিল।—লম্বা হাঁটা (বাসভাড়া নেই)—খোঁজ খোঁজ, এরপর রওয়ানা

—কপর্দকহীন অবস্থা, কাদায় গড়াগড়ি খাওয়া নোংরা শুয়োরের মতো, আমাকে অশুচিসিক্ত করে ফেলছে।

—আর. এন. সুরের ঠিকানা পেয়েছি কিন্তু টাকা নেই—টাকা নেই ক্ষুন্নিবৃত্তির—বাসের—মোহনবাগানের খেলা দেখার (এক স্বপ্ন), এমনকি ময়দানে ঘোরার বা আরো বহুকিছুর—

—কোন সামাজিক অবস্থানে বা মর্যাদায় এসে আমি পৌঁছেছি এখন?…এক অস্পৃশ্য—যে ঋণভার বইতে অক্ষম। দেউলিয়া নৈতিকতার বস্তুসামগ্রীর মতো—অসামর্থ্য প্রকাশ করে শুধু—এক উপদ্রব

 

২৯. ৮(৭). ৩১

—ওয়াই.-এর কার্ড…সে এক সময় ছিল…এখন কোনো ছায়াও নেই : কিভাবে যে বদলে যায় সব : এখন করুণা

 

৩১. ৭. ৩১

—ট্রেন—প্রচণ্ড গরম আর সূর্য—ধুলো আর ময়লা—পুলিশ—ছায়াচ্ছন্ন টুকরো টুকরো জমি, টাটকা বাতাস, গ্রাম্য বিথি, স্বপ্ন স্বপ্ন—বাংলা সব সময়ের—হয়তো শক্তিক্ষয়ী আর তুচ্ছ, তবু অন্য যে কোনোকিছুর চেয়ে হাজারো দিক থেকে সে আমার আপন—তার সন্তান—তার মাটি—তার পরিবেশ, প্রান্তর আকাশ, সূর্য ছায়া নীরবতা আর স্মৃতি—…

—গেঁয়ো পথ আর নক্ষত্রের অরব অন্ধকারের মধ্য দিয়ে স্টেশনের দিকে যাত্রা, ট্রেন চলে যেত আরেকটু হলে?—

—সমস্ত—পৃথিবী জুড়ে রাত্রি নিজেকে প্রকাশ করেছে : স্নিগ্ধ স্মৃতি

—বিস্তৃত আর নিবিড় পরিসর কিন্তু রোমান্সের মনটা আর নেই : অথচ আগেকার দিনগুলোয়?—আর এখন!…টাকা আর অবস্থানই সব! কেন বস্তুগত আর বাস্তব ধারণা আর জি. বি.-র পেছনে লেগে থাকলাম না এ নিয়ে মনের অর্ধেকটা জুড়ে বেদনা—কোথাও কবিতা নেই—

—মা কলকাতা তার আলোয় আর চাপিয়ে-দেয়া বাসে অপরূপা…মা, তোমার ক্লান্ত ছেলেকে গ্রহণ করো। নির্বোধ পলাতকের মতো তোমার স্তন ছেড়ে কেন আমি চলে যাই বারবার?

 

১. ৮. ৩১

—লাবণ্যর চিঠি (ছুরি মারছে) : এ অন্ধকার বাত্যাতরঙ্গে হয়তো ভেসেই যাব আমি, আর ফিরব না কখনো—‘ভীরুর মতো’—যা চায় তাই তাকে দাও, সেজন্যই বেঁচে থাকো—‘তোমার দায়িত্ব, মঞ্জু’ : জড়িয়ে ধরার মতো হয়তো একমাত্র সে-ই আছে পৃথিবীতে।

 

২. ৮. ৩১

—ওয়াই. ইত্যাদি কোনো সাড়াই জাগাচ্ছে না : কেবলই আমার থিতু হওয়ার সংগ্রাম, আর এ সংগ্রামে আমাকে গ্রাস করে ফেলছে গভীর এক অপমানের বোধ।

 

৪. ৮. ৩১

—মুহূর্তের মধ্যে একজন মানুষ বা একটি স্থান বা কোনো ব্যক্তি কিভাবে তীব্র মনোযোগ কেড়ে নেয়, আবার মরে যায় পরমুহূর্তেই…

—আমরা আছি প্রবল তাড়ায়, অতিরিক্ত গ্রস্ত হয়ে, তীব্র চেষ্টায় আর শ্রমে জেনে নিতে চাইছি দার্শনিক বিশ্রাম আর বিচ্ছিন্নতা আর এসব নিয়ে সুচিন্তিত বিবেচনাগুলো—এ দৃষ্টিকোণ থেকে, অধিকাংশের বিবাদ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে মনে হবে উদ্ভট, হাস্যকর আর করুণ এবং কখনো কখনো অতি তুচ্ছ আর হীন (যদিও বিশাল এক মুখোশ আর বিপুল ভানে ওসব আড়াল হয়ে থাকে)

 

৫. ৮. ৩১

—শরতের মিষ্টি সকাল : অসামান্য আকাশ, প্রান্তর, জল আর রোদ, মনে জেগে উঠছে আশা আর স্বপ্নে ভরা কিশোরবেলার দিন…আর এই বাংলায় থাকতে আমার অনীহা?…কখনোই না…এই সেই গ্রামপথ

—চাবুকের ঘায়ে চোখ কাটা মহিষের দল—গর্ভকেশরে অর্ধনিমিলিত চোখ ঢাকা মুসলমান বালক—এসবের অনুদ্ধারযোগ্য মানে

—অপরূপ দুপুর—নিদ্রাচ্ছন্নতা, তাজা হাওয়া আর খোলা দরজা…ঘুম আর অসামান্য দিবাস্বপ্নের জন্য দুর্নিবার তৃষ্ণা…কবিতা, শিল্প ইত্যাদির প্রতিরক্ষা…মানুষ, এ পৃথিবীতে যেমনভাবে আছে তাতে, নির্বাসিত, যন্ত্রণাবিদ্ধ, কলঙ্কচিহ্নিত আর দুঃখদীর্ণ হয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য…ফলে অবশ্যই এক স্বপ্নরাজ্য তার থাকতে হবে, সেটা দেবে কবি অথবা যে তা পারে—আমার আজকের দিবাস্বপ্ন : গ্রাম (‘ধানসিড়ি’)—তাতে শস্যক্ষেত, হলদেটে শস্য, শরতের সকাল আর দুপুর, আর বহুযুগ ধরে আমাকে যে চেনে সেই মেয়ে (কাউকে জানা ও বোঝা আর উপলব্ধি করা : সকল আবেগ আর অনুরাগের চেয়ে এর মূল্য অনেক)

—আজ সকালেই এমন এক মেয়ের দেখা পেয়েছি (স্কট’স লেন) : তার চোখ বোঝে, উপলব্ধিও করে।

—এই বিপুল শহরের—এক ব্যাবিলনের—উপরে বিশাল সাদা মেঘ আর রাতের ঘন নীল পটভূমিকা : আশ্চর্য সৌন্দর্য : প্রকৃতির অন্তহীন বৈচিত্র্য গভীরভাবে অনুভব করার জন্য ঈশ্বর চান মানুষের অবকাশ আর মন।

—ব্যাখ্যা : ঈশ্বর মানুষকে দিয়েছেন অজস্র বীজ আর তীব্র যৌনাকাঙ্ক্ষা—মানে পরিবারপোষণের ঝঞ্ঝাট আর সুগভীর যন্ত্রণা—অর্থাৎ সভ্যতার ট্রাজেডি আর প্রতিযোগিতা ইত্যাদি; আর এ দুইয়ের মাঝখানে কল্পনাপ্রবণ বা আধ্যাত্মিক মানুষ যা চায় তার কোনো জায়গা নেই : আজকের রাতের বিস্ময়কর নীল আকাশ আর অসামান্য সাদা মেঘ দেখে এইসব মনে পড়ছে


প্রাণশক্তি খোয়ানোর বদলে আমার তা-ই কেবল করা উচিত যেটা আমার জায়গা, যাতে আমি উপচে উঠি


৭. ৮. ৩১

জ্যেঠামশায়ের শ্রাদ্ধ কাল

—মানুষের মরা উচিত

—স্বাধীনতার উদ্দীপনা, মর্যাদাবোধ দূরত্ববোধ উদাসীনতা আর বিপুল অবসন্নতা : ‘মানুষের মরা উচিত’।

 

৮. ৮. ৩১

জ্যেঠামশায়ের শ্রাদ্ধ : উপাসনা—গান—এসবের চিরাচরিত আর স্থির মর্মবস্তু আর সোজা সরল ভাব ইত্যাদি ইত্যাদি—রজনী আর অন্নদা প্রমুখ আর ব্রহ্মব্রাহ্ম-এর দুর্বিষহ পরিবেশ…ঈশ্বরের নিয়তি আজ একই বিছানায় আমার সঙ্গী করেছে…এমনকি কোনো দপ্তরে স্টেনোটাইপিস্টের চাকরিও এর চেয়ে অনেক স্বস্তির হতো…

—চলে আসার পর শান্তি…

 

৯. ৮. ৩১

—ওয়াই.-এর জন্মদিন প্রসঙ্গে, টেলিফোন আর তার নীরবতা

—বিষ্ণু দে : পরিচ্ছন্ন আর ধোপদুরস্ত : তার হীনম্মন্যতা : কবিতা চাচ্ছেন…

—মাঝে মাঝেই ভাবি প্রাণশক্তি খোয়ানোর বদলে আমার তা-ই কেবল করা উচিত যেটা আমার জায়গা, যাতে আমি উপচে উঠি—স্ফূর্তি পাই, যা আমার ক্ষেত্র : যে পেশা বা কর্মে লালিত হবে সাহিত্য (মুদ্রণ আর প্রকাশনা)—সিটি কলেজ বা অবাঙালিদের চাকরিতে সেটা কখনো হবে না…

‘বসে থাকা’ প্রসঙ্গে—বেকার কখনো বসে থাকে না : তারা দাঁড়িয়ে থাকে আর ছোটে আর থরথর করে কাঁপে আর হাঁপায়; ঠিকঠাক কেবল সে-ই, শাশ্বত আনন্দের জন্য যার আছে আরামচেয়ার বা কুশন, সোফা আর বিছানা

 

১২. ৮. ৩১

—প্রেমেন জাগিয়ে তুলল এসব : আমার কবিতা আর সাহিত্যসাধনা,—আমার ওয়াই., ওসব কোথায়?! মাত্র ২ বছর আগেও আকুল হয়ে ছিলাম ওসবের জন্য, আর এখন—

 

১৫. ৮. ৩১

—এক ধনীর দুলাল এল তার মিনার্ভা গাড়িতে চড়ে—আর স্বপ্ন…

—মাড়োয়ারি আর পাটব্যবসা আর আমার বাংলা (জাল্লান ভবন) : এসব মাড়োয়ারির আত্মতুষ্টি আর উগ্রতা।

—প্রেমেনের (ফাজলামি) কাছ থেকে কোনো প্রস্তাবই নেই বা অন্য কোনো ইঙ্গিত : চিঠির বাক্স শূন্য।

—ওয়াই. : কী হলো তার?…চিঠি না, কিচ্ছু না…প্রেমময় এক পরিস্থিতিতে কল্পনা করে নিতে পারি তাকে : চুমু আর মমতা—মাত্র দু’বছর আগেও সে হতে পারত আমার জীবন-মরণ : কিন্তু এখন!

 

১৬. ৮. ৩১

—বিষ্ণু দে : ম্যাগ. বোর্ড—সাম্প্রতিক সাহিত্য (অনৈক্য)। রবি বা প্রমথর মতো খ্যাতিমান হওয়ার জন্য লালায়িত আর ক্ষুৎকাতর হয়ে আছে : এক পরিহাসনাট্য

—টি. এস. এলিয়ট—কিউবিস্ট চিত্রকলা—রামানন্দ, উপেন গাঙ্গুলি এদের ইয়ার্কি—প্রেমেনের রেনেসাঁস—অচিনের বাগাড়ম্বর—তরুণ লেখকেরা যেসব পথে ব্যস্ত—বুদ্ধ আর তার কবিতা, গল্প, নাটক আর উপন্যাস ইত্যাদি—তার ‘সাংবাদিকতা’ আর স্টেটসম্যান—পরিচয় মুদ্রণসৌকর্য আর ৭৫০ কপির জন্য ৭৫০ টাকা—বিলেত থেকে কাগজ আনা, ৫০০ টাকা বেখবর—মাস চলছে, আর ইত্যাদি ইত্যাদি

 

১-৫. ৯. ৩১

—বৃষ্টিতে একঘেয়েমির চূড়ান্ত—শরৎ চাটুজ্যের উপন্যাস (দত্তা আর পরিণীতা) কত পোক্তই না করা যেত : শরতের আপোষে নিষ্পত্তি আর ‘ট্রাজেডি’ অন্য ধাঁতের। যুব আন্দোলন : তরুণ আর প্রবীণের ঝগড়া (মেয়েদের তৈজসপত্র নিয়ে) : কী যে গোঁড়ামি আর অন্ধবিশ্বাস—

 

৫. ৯. ৩১ ও ৭. ৯. ৩১

—কবিতা ফেরত এল (পরিচয়—প্রভাষ আর হিরণ)—


মৌলিকতা আর প্রতিভার কোনো জায়গা নেই : বুদ্ধর চতুরালির জায়গা আছে সর্বত্র অথচ আমার কোথাও নেই


৮. ৯. ৩১ ও ৯. ৯. ৩১

—নদীর পাড়—নিচু মেঘ আর ভরন্ত নদী আর চারিদিকে ‘ভেজা ভেজা ভাব’—পান্না-সবুজ ধান আরও কত কী : অসামান্য দৃশ্য প্রকৃতির আর নদীর—ফুটবলের উপদ্রব—এক যুবক তার কুকুরসমেত—

—পূজাকে সুঘ্রাণ করে তুলছে দিন আর গোধূলি—কাঁসর ইত্যাদি—ভবসিন্ধু : ‘আমার প্রাণটার ভিতর যেন কেমন করে’ : আরতি দিছি—বান ভরছি : তার ক্যাথলিক ল্যাটুচের (লাড়ুচ সাহেব) কল্যাণে সে এখন খ্রিষ্টান—

 

১০. ৯. ৩১

—লাবণ্যর বদ্ধমূল অভিমান আর বুদ্ধিহীনতা আর নিরাশা

—লাবণ্যর : ১৫ তারিখ অব্দি দেখো, তারপর ‘Organiser নেও’ আর খুকুনের কফের নাক : এসবের করুণ রসাভাস

 

১৪. ৯. ৩১

—স্ত্রী আর সন্তান গ্রহণের কারণে (এ জন্য ক্ষমাপ্রার্থী) অনুরাগ, প্রেম, এমনকি সহানুভূতি অব্দি থেকে আমার দাবি খারিজ হয়ে গেছে

—‘সাহায্য করো তোমার সহযোদ্ধাদের’ বরিশালের অধ্যাপক আর জনতার কাছে এ জন্য লজ্জিত

—মায়ের ক্যাট্ ক্যাট্ খ্যাট্ খ্যাট্—কারো পৌরুষ বা আচরণের অবধারিত অবনমন আর অপমান—কারো কিছু বলার অধিকার নেই—

 

১৫. ৯. ৩১

—‘মডার্ন বেঙ্গলি পোয়েট্রি’ নামের ‘আগাম’ রচনা বাদ যাচ্ছে : প্রচণ্ড এক আঘাত—বিষাক্ত অপপ্রচারের কুফল…যেন কিছুতে কিছু এসে যায় না—‘মাথা ঠান্ডা রাখো’ সম্বল…

—মায়ের কাছে স্বীকারোক্তি আর মায়ের কাছ থেকে সান্ত্বনা।

—(লাবণ্যর) গ্রন্থি ফুলে গেছে—তাপ-টাপ বেড়ে গেছে

—এমনকি নিজের কোনো লন্ঠনও কারো নেই—

—একটা দৃষ্টিকোণ থেকে খ্যাতির আর শিল্প-কারখানার আর অনস্তিত্বের জীবনে কোনো তফাৎ নেই—(তাতেই সান্ত্বনা)।

 

১৬. ৯. ৩১

—জোর যার মুল্লুক তার : দেখলাম সঙ্গমরত কুকুর—সঙ্গমরত কুকুর : তাদের দিন আর রাত : অদ্ভুত চিৎকার (বাবা নাক ডাকছে? মায়ের প্রশ্ন)—সে ভেতরে আসে, এরপর নিবেদন করে—

—আমার সবকিছুই পুরোনো ছাতা-পড়া ছেঁড়া আর ব্যবহৃত : সাহিত্য, লাইব্রেরি, ক্যাটালগ—এমনকি আমার কবিতায়ও সেটা ঝাপটা দিয়ে ফিরে আসে, কোনোই কাজে আসে না অ্যান্থলজি আর কর্তিকা : ওহ, সুধীন দত্তের মতো যদি এমনকি একেবারে সাম্প্রতিকতম ফরাসি জার্নালটাও আমি নাড়াচাড়া করতে পারতাম!…কেবল আনকোরা হবার কারণেই নতুনত্বের কতগুলো কর্তৃত্ব রয়েছে—

—মৌলিকতা আর প্রতিভার কোনো জায়গা নেই : বুদ্ধর চতুরালির জায়গা আছে সর্বত্র অথচ আমার কোথাও নেই : ভাবনা। বুদ্ধর কড়া আর খুনে সমালোচনা, পুরোটা নড়বড়ে করে দিয়েছে (যেটা করা আসলে কর্তব্যও)…আয়াক্স আর অন্যরা : সমালোচনার চর্ব্বিতচর্ব্বন : করুণা হয়

—গোবিন্দ দাস আর দেবেন সেন যে হেম বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের চেয়ে মহত্তর তা নিয়ে আবার…কিন্তু ধারণার জগতে—এমনকি কর্মের জগতেও—ট্র্যাজিক ব্যতিক্রম ঘটে থাকে

—লালখুটিয়ার দিকে হাঁটছি : অবয়ব, স্মৃতি, ভাবনা…মেঘের সঙ্গে মুখোমুখি আর মেঘ (তাদের রঙ)—ধানক্ষেত সরে যাচ্ছে, শহরের আবাদ হচ্ছে : করুণা হয়—

 

◙     ◙     ◙

 

উল্লেখসূত্র :
অন্নদা অ্যান্ড কোং : অন্নদাচরণ সেন। 
ব্রাহ্ম সমাজের—বিশেষভাবে ব্রাহ্ম শিক্ষা সোসাইটির—প্রভাবশালী ব্যক্তি।
রামানন্দ অ্যান্ড কোং : রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। 'প্রবাসী' ও 'মডার্ন রিভিউ' পত্রিকার সম্পাদক। 
ব্রাহ্ম সমাজ ও বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট নেতা। 
হিরণ, ব্রজেন : সম্ভবত ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট শিক্ষানেতা। 
রজনী : রজনীকান্ত গুহ। বরিশালের ব্রজমোহন কলেজের অধ্যক্ষ। 
ড. দাশ : ড. সরোজ দাশ। খ্যাতিমান চিকিৎসক। ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট সদস্য। 
আর. এন. সুর, জি. বি. : পরিচয় অজ্ঞাত। 
লাবণ্য : লাবণ্য দাশ। জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী। 
ঞ্জু : মঞ্জুশ্রী দাশ। জীবনানন্দের মেয়ে। 
জ্যেঠামশায় : হরিচরণ দাশ। কবির জ্যেষ্ঠতাত। 
বিষ্ণু দে : তিরিশের দশকের বিশিষ্ট কবি। 
প্রেমেন : প্রেমেন্দ্র মিত্র। তিরিশের দশকের বিশিষ্ট কবি ও কথাসাহিত্যিক। 
অচি : অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। তিরিশের দশকের বিশিষ্ট কবি ও কথাসাহিত্যিক। 
বুদ্ধ : বুদ্ধদেব বসু। তিরিশের দশকের বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক। 
সুধীন দত্ত : সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তিরিশের দশকের বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। 
পরিচয় পত্রিকার সম্পাদক। 
গোবিন্দ দা : গোবিন্দচন্দ্র দাস (১৮৫৫-১৯১৮)। কবি। 
দেবেন সেন : দেবেন্দ্রনাথ সেন (১৮৫৮-১৯২০)। কবি। 
হেম বন্দ্যোপাধ্যায় : হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। উনিশ শতকের কবি।
সাজ্জাদ শরিফ

সাজ্জাদ শরিফ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক at প্রথম আলো
জন্ম ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৩, পুরান ঢাকা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর।

প্রকাশিত বই :
ছুরিচিকিৎসা [কবিতা, ২০০৬, মওলা ব্রাদার্স]
যেখানে লিবার্টি মানে স্ট্যাচু [গদ্য, ২০০৯, সন্দেশ]
রক্ত ও অশ্রুর গাথা [অনুবাদ, ২০১২, প্রথমা]

ই-মেইল : sajjadsharif_bd@yahoo.com
সাজ্জাদ শরিফ