হোম অনুবাদ জর্জ সেফেরিসের সাক্ষাৎকার : দ্বিতীয় কিস্তি

জর্জ সেফেরিসের সাক্ষাৎকার : দ্বিতীয় কিস্তি

জর্জ সেফেরিসের সাক্ষাৎকার : দ্বিতীয় কিস্তি
419
0

প্রথম কিস্তির লিংক


এডমান্ড কিলি

আপনি কি মনে করেন এলিঅট এজন্যই দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর হারোনো অংশগুলো পুনরুদ্ধার না করার ব্যাপারে খুবই সজাগ ছিলেন, যা ইদানীং পুনরাবিষ্কৃত হয়েছে?

জর্জ সেফেরিস

যখন তিনি আমার কাছে দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড রচনার কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন, হারানো পাণ্ডুলিপির ব্যাপারে খুবই মরিয়া মনে হয়েছিল তাকে। অপরপক্ষে তিনি আমাকে আরও বলেছিলেন, কত না অর্থবহ ছিল, তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, পাউন্ডের হস্তক্ষেপ সত্যিকার অর্থে কতই না অর্থবহ ছিল।

এডমান্ড কিলি

আপনি কি পরিত্যক্ত লেখাগুলোর প্রকাশ সমর্থন করেন?

জর্জ সেফেরিস

বলতে পারব না, এটা নির্ভর করে। এর জন্য প্রয়োজন যথেষ্ট কৌশলী হওয়া। কবির নিজের দ্বারা নয়। সম্পাদকদের দ্বারা। যদি তারা প্রকাশ করে, তবে তারা গুরুত্ব দিতে চাইবে যে, লেখাগুলো মহামূল্যবান আবিষ্কার, এবং আমি এটিকে খারাপ মনে করি।  অতিরঞ্জন, সম্পাদক এবং ভাষাতাত্ত্বিকেরা সবসময় অতিরঞ্জন করে আসছে, আমি তা-ই মনে করি।

এডমান্ড কিলি

আপনার একটা ডায়েরি, যেটি আমার স্ত্রী ও আমি অনুবাদ করেছি, তার একটি অংশে দেখি, আপনার সাথে এলিয়টের সম্পর্ক আপনার জীবনে নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি জানি না পাশ্চাত্যের অন্য কোনো সাহিত্যিকও আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কি না। আমি বিশেষ করে হেনরি মিলার এবং লরেন্স ডুরেলের কথা ভাবছি এবং হতে পারে আরও কেউ আছেন। কিন্তু আমি জানি না। আমি আপনার স্বদেশি লেখকদের কথাও ভাবছি : উদাহরণস্বরূপ, থেয়োতোকাস এবং কাতসিমবালিস।

জর্জ সেফেরিস

আপনি জানেন, ডুরেল আমার চেয়ে বয়সে অনেক নবীন। তার সাথে যখন আমার দেখা হয় তখন তাকে খুবই চমৎকার তরুণ মনে হয়েছিল। তার বয়স পঁচিশের কাছাকাছি ছিল। আমি হেনরি মিলারসহ তার সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম। মারোউসি, কাতসিমবালিসের মূর্তি দর্শনে তারা আথেন্সে এসেছিলেন। যদি আমার স্মৃতি ঠিক থাকে তবে সেদিনটি ছিল যুদ্ধ ঘোষণার দিন।


তখন আমার বয়স বত্রিশ কী তেত্রিশ। আমি হয়ে পড়েছিলাম জ্যাজে আসক্ত।


 এডমান্ড কিলি

অবশ্য সেই জায়গায় কাতসিমবালিসের মূর্তিটি অতিকায় ছিল না।

জর্জ সেফেরিস

না, তবে মিলার তাকে অতিকায় কিছু বানানোর ভয় দেখাচ্ছিলেন।

এডমান্ড কিলি

হ্যাঁ, তিনি তা-ই করেছিলেন।

জর্জ সেফেরিস

তার সাথে দেখা হওয়াটা ছিল আনন্দদায়ক ব্যাপার। বলতে গেলে তারা হলেন প্রথম, ঠিক প্রথম না হলেও দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় পর্যায়ের পাঠক যারা আমি যা করছিলাম তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। উদাহরণ টেনে বলি, তাদের একজন, মিলার কিংবা লরি, আমার কবিতাগুলো পাঠ করার পর আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি জানেন, আপনার যে দিকটা আমি পছন্দ করি তা হচ্ছে, আপনি বিষয়ের ভেতরটা বের করে আনেন। আমি তা ভালো অর্থে বোঝাচ্ছি।’ এটা ছিল আমার জন্য একটি চমৎকার প্রশংসা।

 এডমান্ড কিলি

তারা আপনার কবিতার সাথে কিভাবে পরিচিত হলেন?

জর্জ সেফেরিস

সে সময় কাতসিমবালিশ-এর কেবল ইংরেজি অনুবাদ ছিল। আমি বোঝাচ্ছি যে তা ছিল পাণ্ডুলিপি অনুবাদ।

এডমান্ড কিলি

আথেন্সে এসে তারা কেন সরাসরি কাতসিমবালিসের কাছে গেলেন? কেন তারা পছন্দ করে এমন একজন পুরুষের কাছে গেলেন? গ্রিসের বাইরে তিনি কি সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব হিশেবে বিশেষ পরিচিত ছিলেন?

জর্জ সেফেরিস

আমি তা জানি না। সম্ভবত তা ছিল অভিন্ন বন্ধুত্বের কোনো বিষয়। দ্য কলোসাস অব মারোওসি লেখার পর তিনি হয়ে উঠেছিলেন বড় ধরনের সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। সে সময়ে ইংরেজি ও আমেরিকান সাহিত্যের সাথে আমার যোগাযোগের চেয়েও তার যোগাযোগ ছিল বেশি। আমাকে বলতেই হচ্ছে যে, সে সময়ে আথেন্সে এক ধরনের আন্তর্জাতিক বোহেমিয়ার চল ছিল। আমি বলতে যাচ্ছি যে যুদ্ধের প্রাক্কালে। আমি আরও বলব যে কাতসিমবালিসের মনে খারাপ উদ্দেশ্যবহির্ভূত এক অসাধারণ গুণপনা ছিল। হয়তো তিনি কাউকে সমালোচনা করতেন কিন্তু তা ছিল উদারতার সাথে। আর তিনি বিশ্বাস করতেন যে, আমাদের এই দেশ, এই ছোট্ট দেশ, কিছু একটা করার ক্ষমতা রাখে। তার ছিল এ ধরনের বিশ্বাস।

এডমান্ড কিলি

হেনরি মিলার সম্পর্কে কিছু বলুন? তার বিষয়ে কেমন ছিল আপনার উদ্দীপনা?

জর্জ সেফেরিস

আমি মিলারকে পছন্দ করি কারণ তিনি একজন সহৃদয় মানুষ, আর আমি মনে করি―আমাকে ক্ষমা করবেন যে আমি তা বলছি, তা একেবারেই কোনো সমালোচনা নয় : একজন লেখক সম্পর্কে সহৃদয় মানুষের বলার চেয়ে আর কিছু প্রশংসা হয় না―মিলারের রয়েছে বিশাল উদারতা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যখন আমেরিকা ফিরে যাওয়ার সময় এল (তাকে এই পরামর্শ দিয়েছিল আমেরিকার কনসাল; একজন আমেরিকান নাগরিক হিশেবে তাকে দেশে ফেরত যেতে হতো কারণ যুদ্ধ ছিল আসন্ন), একদিন তিনি আমাকে বললেন : প্রিয় জর্জ, আমার প্রতি তুমি ছিলে খুবই উদার, আর আমি তোমাকে কিছু একটা দিতে চাই। আর তখন তিনি একটা দিনলিপি বের করলেন যা তিনি তার গ্রিসে অবস্থানকালীন রেখেছিলেন। আমি বললাম : ‘দেখো হেনরি, আমি এটা জানি যে তুমি একটা বই লিখতে যাচ্ছ আর এগুলো ছাড়া তুমি পারবে না তা অর্থাৎ তার জন্য এই টীকাগুলোর প্রয়োজন হবে তোমার।’ ‘না,’ তিনি বললেন, ‘উপহারকে হতে হয় পুরোপুরি।’ আমি মনে করি এটা হলো অসাধারণ আচরণের দিক। আর আমি কখনও তা ভুলব না। দিনলিপিটি ছিল কলোসাস-এর এক প্রকার প্রথম খসড়া, তাতে নিশ্চয় ছিল অনেক ব্যক্তিগত আবেগের আস্ফালন, কৌতুক।

এডমান্ড কিলি

বইটিতে তো রয়েছে বেশ কিছু কৌতুক।

জর্জ সেফেরিস

হাইদ্রা এবং পোরোস প্রণালির দিকে যাত্রার বিষয়টি ছিল অসামান্য। মনে পড়ে? মিলার সম্বন্ধে আমার অনুভূতি হলো : অগ্রজ লেখকদের বিষয়ে বোঝাপড়া থাকাটি একটি বড় ব্যাপার; কিন্তু মিলার হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি যাকে আমি শ্রদ্ধা করি গ্রিসে প্রত্যাবর্তনের কোনো ধ্রুপদি প্রস্তুতির আশা ছাড়াই। এটাই তার শুদ্ধতা।

এডমান্ড কিলি

প্রথমবারেই সবকিছুকেই গ্রহণ করার আত্মিক শুদ্ধতার কথাই কি বলছেন?

জর্জ সেফেরিস

আমার মনে হয় যখন তিনি ঠিক করলেন মাইসেনে যাবেন ভ্রমণে, তখন আমিই তাকে প্রথম দিয়েছিলাম ইস্কিলাসের একটি রচনা। কিন্তু আমি নিশ্চিত তিনি ইস্কিলাস পড়ে কিছুই দেখেন না; তিনি আরগোসের সমভূতিতে জাজ ট্রাম্পেটবাদককে শুনতে শুনতে দেখেন স্থানীয়দের। এটা স্বতঃস্ফূর্ত আচরণ। আর আমি তা পছন্দ করি।

এডমান্ড কিলি

জ্যাজ ট্রাম্পেটবাদক?

জর্জ সেফেরিস

আমার মনে হয়, জ্যাজ ট্রাম্পেটবাদক অনুপ্রাণিত হয়েছিল লুইস আর্মস্ট্রং-এর মাধ্যমে। কারণ সে আর্মস্ট্রং শুনেছিল একটি ছোট্ট ও আদ্যিকালের গ্রামোফোনে যা আমার আথেন্সের বাড়িতে তখন ছিল। আমি নিজে জ্যাজ আবিষ্কার করেছিলাম আট কিংবা দশ বছর আগে …

এডমান্ড কিলি

মিলারের গ্রিসে আসার আগে। এজন্যই আপনি তাকে জ্যাজ শিখিয়েছিলেন?

জর্জ সেফেরিস

তখন আমার বয়স বত্রিশ কী তেত্রিশ। আমি হয়ে পড়েছিলাম জ্যাজে আসক্ত। নিজেকে বলেছিলাম, যা-ই হোক, একই সাথে বাখ, মহান বাখ, আর জ্যাজের গুরুত্বকে অনুধাবন করতে পারলে তুমি। মনে পড়ছে, একদিন আমি মিত্রোপাউলোসকে বললাম : হে প্রিয় সংগীতবিশারদ, অস্বস্তিতে না ফেলে অনুভবকে প্রকাশের ক্ষেত্রে জ্যাজ হলো আমাদের জন্য হাতেগোনা কয়েকটি উপায়ের মধ্যে একটি। এটা ’৩৪ সালের, না ভুল বললাম, ৩৫ সালের ঘটনা।

এডমান্ড কিলি

গ্রিস বা তার বাইরে  তখন অন্য কোনো লেখক কি ছিল যার বা যাদের  সাথে আপনার বিশেষভাবে কোনো সম্পর্ক হয়েছিল?

জর্জ সেফেরিস

এটা নির্ভর করে কোন সময়টার কথা আপনি বলছেন তার ওপর। উল্লেখ্য, এক সময় সিকেলিয়ানোসের সাথে আমার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৯২৯ সালে তার সাথে আমার প্রথম দেখা যদিও তার অসুস্থতার পর ছাড়া এবং ১৯৪৪ সালে গ্রিসে আমার  ফিরে না-আসা পর্যন্ত তা অন্তরঙ্গ হয় নি। যখন তার শারীরিক সব দুর্দশা দেখা দিয়েছিল সেই অসুস্থতার সময়টাতে  সিকেলিয়ানোস সত্যিই স্মরণীয় একজন। যখন আমি দেশের বাইরে দায়িত্বরত ছিলাম তখনও সুযোগ করে আথেন্সে এসে তার সাথে দেখা করতাম। এক সময় শুনলাম, তার  সেরিব্রাল হেমোরেজ হয়েছে। তাকে একদিন দেখলাম ন্যাশানাল থিয়েটারের প্রিমিয়ার শোতে, চোখে কালো চশমা। বললাম, ‘আহ অ্যাঞ্জেলো, এখানে আপনাকে পেয়ে আমি যারপরনাই আনন্দিত যদিও শুনেছি যে আপনার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।’ ‘সুহৃদ’, তিনি বললেন, ‘এটা মস্তিষ্কের ওপরে একটুখানি রক্তাভতা নেওয়ার মতোই একটা চমৎকার ব্যাপার।’ বুঝলাম তিনি হেমোরেজকে ইঙ্গিত করছিলেন। আমি তাকে বললাম, ‘এটাও চমৎকার ব্যাপার যে আপনি এই বিষয়টাকে এভাবে বললেন। আমি খুব আনন্দিত।’ তিনি বললেন : ‘জর্জ, দেখো, আমি শো-এর বিরতির সময় আপনাকে একটি গল্প বলব।’ বিরতির সময় আমি তার কাছে গেলাম। তিনি বললেন, ‘আপনি কি রোকামবল পড়েছেন?’ এটা ছিল এক ধরনের ফরাসি থ্রিলার। সিকেলিয়ানোস বললেন : ‘একদা এক মহিলা রোকামবলের মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মারল। রোকামবলের তখন চোখ নষ্ট হওয়ার অবস্থা। সুতরাং তাকে তার একজন বন্ধু প্যারিসের সবচেয়ে বিখ্যাত এক চক্ষু ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার চোখ ভালো করে পরীক্ষা করল। সে-সময় তার বন্ধু পাশের কক্ষে অপেক্ষমাণ ছিল এবং ডাক্তার কী বলে তা শুনছিল। শেষমেশ ডাক্তার  রোকামবলকে বলল : ‘‘মহোদয়, আপনাকে দুটি বিষয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে : হয় আপনাকে চোখের দৃষ্টি হারাতে হবে না-হলে  মুখের বিকৃতি।’’ সে-মুহূর্তে চারপাশ নীরব হয়ে উঠল। ঠিক তখনই পাশের কক্ষে বসা রোকামবলের বন্ধুর গলার স্বর বেজে উঠল, শোনা গেল রোকামবলের বন্ধুর গলা : ‘‘রোকামবলের চোখের দৃষ্টিশক্তির কোনো দরকার নেই।’’ ’

এডমান্ড কিলি

সিকেলিয়ানোস সম্পর্কে আমাকে আরও কিছু বলুন। গ্রিসের বাইরে তার সম্পর্কে তেমন একটা কারও জানা নেই।

জর্জ সেফেরিস

তার মৃত্যুর সময়ে রচিত একটি লেখায় তার একটি ব্যাপার আমি উল্লেখ করেছি। আথেন্সে এসে তিনি একটা বড় ধরনের বিপদে পড়েছিলেন, আমি তখন ছুটে গিয়েছিলাম তার কাছে। আমি খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম, তিনি তখন তার এক বন্ধুর বাড়িতে,  ভেঙে পড়েছিলেন তিনি একেবারে। আবারও সেই একই চমৎকার প্রতিক্রিয়া। আমি তাকে বললাম, ‘প্রিয় অ্যাঞ্জেলো, আপনি কি ভালো আছেন?’ তিনি বললেন, ‘আমি ভালো আছি, তবে এক চমৎকার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। অতীব সুন্দর এক পরম অন্ধকারকে আমি দেখতে পেয়েছিলাম।’

এডমান্ড কিলি

আপনি কি পালামাসকে জানতেন? কেমন ছিলেন তিনি মানুষ হিশেবে?

জর্জ সেফেরিস

আপনি জানেন, মানুষ-সম্পর্কে আমার স্মৃতিগুলো বড় অদ্ভুত। যেমন, অন্যরা তাদের মনগড়া ব্যাখ্যার দ্বারা সিকেলিয়ানোসকে পছন্দ করে থাকে; কিন্তু আমার কাছে তিনি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন তার শেষ বছরগুলোর চমৎকার ও বিয়োগান্তক মুহূর্তগুলোর জন্য। এখন পালামাস বিষয়ে আমার শেষ একটি স্মৃতি হলো যখন আমি তাকে বিদায় জানাতে যাই তখনকার, কারণ, তাড়াতাড়িই আমি চলে যাচ্ছিলাম। কথাবার্তার সময় তিনি তার কবিতায় বর্ণিত নানা ধরনের উত্তেজিত লোকজনের কথা উল্লেখ করলেন, তারপর বললেন : ‘আপনি জানেন, আমাদের পরিবারে অনেক পাগল রয়েছে। এক সময় আমি চেয়েছিলাম ‘‘টু জেনোস টন লোক্সোন’’ নামে একটা বই লিখতে।’ ইংরেজিতে একে কিভাবে অনুবাদ করব? ‘…বংশপরিচয়।’


দর্শনের অবস্থান বা বিশ্ববোধ নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।


এডমান্ড কিলি

পাগলমানবের।

জর্জ সেফেরিস

ঠিক পাগল নয়। অস্বচ্ছ বা তির্যক মানব।

এডমান্ড কিলি

তির্যক মানব?

জর্জ সেফেরিস

আমি আসলে শব্দটির যুতসই পরিভাষা চাচ্ছিলাম।

এডমান্ড কিলি

সম্ভবত তা হলো বিষম-মানব।

জর্জ সেফেরিস

আমি তাকে বললাম: ‘মি. পালামাস, এটা দুঃখজনক যে আপনি বইটা লেখেন নি। কারণ, আমি মনে করি লিখলে তা হতো একটি সেরা বই।’ তার ছিল খুবই আকর্ষণীয় কৌতুকবোধ।

এডমান্ড কিলি

গ্রিক সাহিত্যে পালামাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অবদানকে আপনি কিভাবে বিবেচনা করেন?

জর্জ সেফেরিস

তবে বলি, দোকিমেস-এ আমি তা উল্লেখ করেছি। তবু আবার বলছি,  গ্রিক সাহিত্যে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো, আমি মনে করি, তার সাথে তুলনা করলে কাভাফির প্রকাশকে মনে হয় অস্পষ্ট যদিও কিছু কিছু মুহূর্তে তা অধিক বাস্তব।

এডমান্ড কিলি

কিন্তু যে মুহূর্তে আপনি বলছেন ‘যদিও অধিক বাস্তব’…

জর্জ সেফেরিস

আবার কাভাফির ব্যাপারে আমি যা পছন্দ করি তা হলো যে তিনি শুরুটা করেছিলেন কিছু ভয়ংকর অবাস্তব সব কবিতা দিয়ে, তারপর তিনি তার একাগ্রতা ও কাজের দ্বারা তার নিজস্ব স্বরকে খুঁজে পেলেন। ৩৪ বছর বয়স পর্যন্ত তার লেখা কবিতাগুলো মোটেও ভালো কিছু ছিল না। সেই কবিতাগুলোর ব্যর্থতা সম্পর্কে কোনো বিদেশি পাঠককে বোঝানো যাবে না কারণ, অনুবাদের ভাষা কবিতাগুলোকে উৎকৃষ্ট করে বসে একেবারে। এগুলোকে বিশ্বস্তভাবে অনুবাদের কোনো উপায় নেই।

আপনি জানেন, আসলে আমি যদি কাভাফি সম্পর্কে নিজের মতো করে বলি তবে বলতে হয় আমার ভালো লাগা হলো : তিনি এমন মানুষ ছিলেন যিনি সেই সময়ে এমন আভাসই দিচ্ছিলেন যেন তাৎপর্যপূর্ণ কোনোকিছুই করার সামর্থ্য নেই তার। তারপর তার কাছে ধরা দেওয়া সবকিছুকে বাতিল করতে করতে অবশেষে তিনি দেখেন যে তিনি তার ভাষা খুঁজে পেয়েছেন। এটা সত্যিই এমন একজন মানুষের নিদর্শন যে তার বাতিলকরণের মাধ্যমে নিজ পথ খুঁজে পেয়েছে।

এডমান্ড কিলি

ঠিক কী তিনি বাতিল করেছিলেন?

জর্জ সেফেরিস

এগুলো হলো―প্রকাশ, সহজ করে বললে, বাগ্‌বাহুল্য, এসবকিছু। উদাহরণস্বরূপ প্রাচীন ট্র্যাজেডি নিয়ে তার কোনো কবিতাকে চিন্তা করলে তা মনে হবে বাজে, অবিশ্বাস্যরকম বাজে। এসব কিছুকে বাদ দিলে কাভাফি সারা জীবন ধরে স্বীয় প্রকাশকে পরিশ্রুত করে গেছেন। এমনকি তার শেষ কবিতাটি যা তিনি আন্তিয়োচের প্রান্তদেশ বিষয়ে, খ্রিস্টিয়ান ও জুলিয়ানের ঘটনা বিষয়ে, লিখেছেন, তাতেও তা প্রমাণিত। শেষ পর্যন্ত এই লেগে থাকার কারণেই তাকে আমার পছন্দ। তিনি এক বড় দৃষ্টান্ত। সারা জীবনই কিছু কিছু জিনিসকে না-গ্রহণ করার, এসবকে বাতিল করার সাহস ছিল তার। তাই যে-সব মানুষেরা তার বাতিল হয়ে যাওয়া লেখাগুলোকে চালু রাখতে চায়, তাদের আমি যথেষ্ট সন্দেহ করি যতক্ষণ না একজন পাঠক এ ব্যাপারে অতি যত্নবান হন। আপনি জানেন, এর জন্য প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টির।

এডমান্ড কিলি

এবার আগেকার সময়ের একজন বিখ্যাত লেখক কাজান্তজাকিস-এর বিষয়ে আপনি কী বলবেন। আমেরিকাতে কাভাফিকে যারা কবি হিশেবে শ্রদ্ধা করেন তারা কিন্তু নিজেরাও কবি, যেমন ধরুন অডেন, এবং আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকান তরুণ কবি। এদের মধ্যে বেশিরভাগই কাভাফিকে জানেশোনে, তাদের মধ্যে কাভাফির প্রতি রয়েছে এক ধরনের সহানুভূতিময় মনোভাব। তবে সাহিত্যের শিক্ষার্থী ও অন্যান্য সাহিত্য পড়ুয়াদের কাছে কাজান্তজাকিস কবি এবং ঔপন্যানিক উভয় হিশেবেই সবচেয়ে জনপ্রিয়। কবিতা বা আখ্যান যা-ই হোক না কেন, তাকে না কমিয়ে, কাজান্তজাকিসের সাহিত্যের ওপর আলোচনা আমারও বাড়তি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জর্জ সেফেরিস

আমি তাতে অবাক হই না। বিষয়টা হলো, একজন লেখকের সাথে পরিচিতি হওয়ার সুযোগ থাকাটা একান্তই প্রয়োজন যা আমি করে উঠতে পারি নি কাজান্তজাকিসের ক্ষেত্রে, আপনি জানেন এটা সত্যিই আমার জন্য ভয়াবহ একটা ঘটনা। যতক্ষণ কাজান্তজাকিস বিবেচ্য, ততক্ষণ আমি আপনাকে তার বিষয়ে একটা সাবধান করে রাখছি। একদিকে রয়েছে তার কবিতা, যা কবিতাই, যাকে বলা হয় অদিসি অনুবৃত্তি, এবং অবশ্যই তার কাব্যনাটকগুলো, অন্যদিকে রয়েছে তার গদ্য : উপন্যাস যার বিচার করতে আমি অক্ষম। যে-উপন্যাসগুলো আমি পড়িই নি তাদের ওপর কথা বলতে আমি জানি না। আমি শুনেছি যে উপন্যাসগুলো উৎকৃষ্ট মানের এবং যারা তা বলেছে তারা আমার বিশ্বাসভাজন, এবং সত্যিই হয়তো এগুলো উৎকৃষ্ট মানের। কিন্তু অদিসি অনুবৃত্তিগুলো আলাদা। সেখানে যদিও অনেক আকর্ষণীয় কথাবার্তা আছে তবু সেগুলো ঠিক কবিতা নয়। আমি বলি কী, আকর্ষণীয় কথাবার্তাগুলো হলো সেগুলো যেগুলো মানুষ কাজান্তজাকিসের তথ্যে ভরপুর। আমার মনে হয় না তাতে কোনো কবিতা আছে, অন্তত আমি যা কবিতা বলে মনে করে সে-ধরনের কিছু নেই।

এডমান্ড কিলি

দার্শনিক বা ধর্মীয় অবস্থার বর্ণনা হিশেবে কাব্যিক বিবেচনাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে ‘চিন্তা’ বিষয়ে কী বলা যায়?

জর্জ সেফেরিস

আমি জানি না। দর্শনের অবস্থান বা বিশ্ববোধ নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই। যখনই বিশ্ববোধের সাথে লেখালেখির ঠোকর লাগতে থাকে, তখন কী হয় আমি জানি না। বিশ্ববোধ ব্যাপারটাকে খটমটে, বিরক্তিকর আর (জানি না কিভাবে বলব), নীরস ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি আমি। কবিতায় যারা বিশ্ববোধকে প্রকাশ করতে চায় তাদের আমি পছন্দ করি না। আমার মনে আছে একবার থেসালোনিকেতে আমার একটি কবিতাপাঠের অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেখানে একজন দার্শনিক দাঁড়িয়ে আমাকে বললেন, ‘কিন্তু মোটের ওপর আপনার বিশ্ববোধ কী ধরনের মি. সেফেরিস?’ তখন আমি কললাম, ‘প্রিয় বন্ধু, আমাকে ক্ষমা করুন, আমি দুঃখিত যে আমার কোনো বিশ্ববোধ নেই। আমি এই উন্মুক্ত স্বীকারোক্তি করলাম আর বলছি যে, কোনো রকমের বিশ্ববোধ ছাড়াই আমি লিখে যাচ্ছি। জানি না, সম্ভবত আমার এই বিশ্ববোধ না-থাকার ব্যাপারটাকে আপনি যাচ্ছেতাই ভাবছেন মহাশয়, কিন্তু আমি যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করি কী ছিল হোমারের বিশ্ববোধ?’ এর কোনো জবাব পাই নি আমি।

এডমান্ড কিলি

আরও একটি সাধারণ প্রসঙ্গে যাওয়া যাক, আথেন্সে এক আলোচনায় আপনি বলেছিলেন যে, এই শতাব্দীর গ্রিক লেখকদের বিষয়ে লক্ষ করার মতো একটা ব্যাপার হলো, তাদের অধিকাংশই প্রকৃত গ্রিক ও রাজ্যের বাইরের ছিলেন। নিজেকে উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন যে আপনিও বেড়ে উঠেছিলেন স্মিরনায়। কিভাবে স্মিরনার শেকড় আপনার লেখালেখি বা জ্ঞানী হওয়ার পেছনে সাধারণভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল তা বলবেন কি?

জর্জ সেফেরিস

আমি বলি কী,  গ্রিক ভাষা বা ভূমিতে যা কিছু ব্যক্ত তার সবই আমার কৌতূহলের বিষয়। আমি বলতে চাচ্ছি যে, গ্রিক ভূখণ্ডটাই যদি মোটাদাগে ধরি তা হলে যেমন আপনি জানেন আমি দারুণভাবে আগ্রহী ১৭-শ শতাব্দীতে ক্রিতে যা ঘটেছিল তার বিষয়ে। আবার উদাহরণস্বরূপ, রোমানিয়ার জনসাধারণ, মোলদাভিয়া ও ওয়ালাচিয়ার ক্ষুদ্ররাজ্যশাসনব্যবস্থা আমাকে খুব টানে। এমনকি কাইসারিয়োস দাপোনতেস-এর মতো অদ্ভুত নগন্য মানুষও আপনাকে টানবে যদি আপনি জানেন তার সম্পর্কে। আমার মনে হয় উত্তরের দ্বীপ স্পোরাদেসের স্কোপেলোস-এর কোথাও থেকে এসেছিলেন তিনি, জীবনের একটা দীর্ঘ সময় ক্ষুদ্র রাজ্যে কাটান তিনি, তারপর কনস্তানতিনোপলে, আর শেষমেশ এমটি. আথোসে কাইসারিয়োস নামে অবসর নেন। আমি বোঝাচ্ছি না যে তিনি একজন বড় কবি ছিলেন, শুধু তার নিজেকে প্রকাশের বিষয়টা আমাকে আকর্ষণ করেছিল। আমি বলছি না তিনি সব মহৎ কবিতা-টবিতা লিখেছেন, কিন্তু তারপরও অষ্টাদশ শতাব্দীতে সেই রাষ্ট্রগুলোতে গ্রিক ভাষার বিস্তার ঘটেছিল। এমটি. আথোসের আরেকজন সাধু হলেন, তার নামটা আমি স্মরণ করতে চাইছি, হ্যাঁ তার নাম ছিল পামবেরিস, তিনি একটা কবিতা লিখেছিলেন যা খুব বড় নয়, কারণ তিনি কবিতাটি লেখার যে-পদ্ধতিটি গ্রহণ করেছিলেন তা দিয়ে বড় কবিতা লেখা অসম্ভব অর্জন। তিনি একে নাম দিয়েছিলেন ‘পোয়েমা কারকিনিকোন’, বা বলতে গেলে ‘পোয়েম ক্যান্সারাস বা ক্যান্সারাক্রান্ত কবিতা’। এই কবিতা এমনভাবে উদ্ভাবিত হয়েছিল যে তা বাম থেকে ডানে বা ডান থেকে বামে পড়া যেত আর এর অর্থ বোধগম্য হতো এই দুভাবেই। তবে বোধগম্য হলেও তা ছিল এমনই দূরবর্তী যে প্রতিটি পঙ্‌ক্তির অর্থ বোঝানোর জন্য তাকে টীকা যুক্ত করতে হতো। এসব সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো আমাকে আনন্দ দিত। আর মনে হয় এগুলোই সব মিলিয়ে আমাদের গ্রিক সাহিত্যের এত পেশাগত ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। আবার, অন্য রচনা : ‘শ্মশ্রুহীন মানুষের ভর’ যা লেখা হয়েছে প্যারোডির শৈলীতে। এটা বিশেষভাবে আমাকে আনন্দ দিত কারণ, আমাদের সাহিত্যে হালকা চালের রম্যরচনা খুব একটা আমি দেখি নি। হয় মানুষ এসব রচনা লিখতে চায় নি বা বিষাদাক্রান্ত মনের অ্যাকাডেমিক লোকজনের দ্বারা এসব লেখা বাতিল হয়েছিল।

এডমান্ড কিলি

খুবই মজার উক্তি। অন্য এক উপলক্ষে আপনি বলেছিলেন, একটি জিনিস আপনি খুঁজে পান যে অ্যাংলো-স্যাক্সন ঐতিহ্য ছাড়া আর কোনো ঐতিহ্যে এই আজগুবি উপাদান পাওয়া যায় না—এক উপাদান যা ন্যায্যভাবে আমাদের সাহিত্যে বহমান এবং যা সর্বদাই কোনো না কোনো আঙ্গিকে অস্তিত্বশীল ছিল বলে প্রতিভাত।

জর্জ সেফেরিস

এই বিবেচনায় অ্যাংলো-স্যাক্সন সাহিত্য আমাদের থেকে আলাদা; এবং আমি মনে করি যে এডওয়ার্ড লিয়ার ও লুইস ক্যারোলের সমতূল্য একই ধরনের আবোলতাবোল বিষয়ের ব্যবহার অন্য কোনো মহাদেশীয় রাষ্ট্রই দাবি করতে পারবে না।

এডমান্ড কিলি

আপনি ইংল্যান্ডে তিন তিনটি চাকরিকাল কাটিয়েছেন, আপনার সাহিত্যিক অগ্রগতির  সেরা অংশটাই ছড়িয়ে আছে সেই সময়টিতে। সে-সময়টাকে কি আপনি কাজের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক ছিল বলে মনে করেন?

জর্জ সেফেরিস

তা ঠিক নয়। লেখালেখির জন্য আমার সেরা সময়টা ছিল যখন আমি রোমানিয়ায় ছিলাম কারণ, সেখানে আমি একেবারেই অপরিচিত ও বিচ্ছিন্ন ছিলাম, একই সাথে ভাষাগত জায়গা থেকে ছিলাম গ্রিসের কাছাকাছিও। ফলে আমি আমার অবসর সময়কে কাজে লাগাতে পারতাম। সেখানে ছিল না ক্লান্ত হওয়ার মতো কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানাদি।


নোবেল পুরস্কার একটি দুর্ঘটনা মাত্র, এর বেশি কিছু নয়।


 এডমান্ড কিলি

ইংল্যান্ডে আপনার অবস্থানকালীন প্রথম দিকের সময়টাতে সেখানকার জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের সাথে আপনার জানাশোনা কেমন ছিল? নিশ্চয় তখন এলিঅটের সাথে আপনার দেখা হয়েছিল।

জর্জ সেফেরিস

না, এলিঅটকে আমার একটি পরিচিতিপত্র দেওয়া ছিল, আমি তার দপ্তরে ফোন করি, কিন্তু তার সচিব আমাকে জানাল যে এলিঅট আমেরিকায় অবস্থান করছেন। এটা ছিল সেই সময়টা যখন তিনি হার্ভাডের চার্লস এলিঅট নর্টন অধ্যাপক হিশেবে কাজ করছিলেন। প্রথমদিকে এলিঅট বা অন্য কোনো লেখকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয় নি কখনও। প্রথমত আমি ছিলাম ব্যক্তি হিশেবে লাজুক প্রকৃতির, তার ওপর তখন আমি নিজের প্রকাশের বিষয় হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম। এর তুলনায় যখন ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমি ইংল্যান্ডে এলাম, তখন মধ্যপ্রাচ্যে কাজের কারণে ইংরেজদের মধ্যে অনেক বন্ধু জুটে গেল আমার, ফলে কাউন্সিলর হিশেবে ইংল্যান্ডের গ্রিস এম্বেসিতে যখন পুনরায় এলাম তখন আমার আর সমস্যা থাকল না, ততদিনে ইংল্যান্ডে আমি অনেকটাই পরিচিত হয়ে গেলাম। এটা ১৯৪৮ সালে আমার কবিতার প্রথম ইংরেজি অনুবাদ কিং আসিনে অ্যান্ড আদার পোয়েমস প্রকাশ হবার ঠিক পরপরই।

এডমান্ড কিলি

ইংল্যান্ডে আপনার প্রথম দাপ্তরিক ভ্রমণের সময়, আমার জানতে ইচ্ছা করছে, কোনো ইংরেজ বা আমেরিকান সাহিত্যের সাথে কি আপনার পরিচয় হয়েছিল যা এলিঅটের কাজের পাশাপাশি আপনাকে আনন্দ দিয়েছিল?

জর্জ সেফেরিস

আমার মনে হয় ডব্লিয়ো. বি. ইয়েটসকে আমার একজন উপদেশাত্মক মানুষ মনে হয়েছিল যা আমি পরে পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি তার প্রথম দিকের কাজ সম্পর্কেই বলছি। মোটের ওপর আপনি দেখবেন ইয়েটসের মতোই লোকগাথাকে ব্যবহারে আমি উদ্যোমী ছিলাম।

এডমান্ড কিলি

আমেরিকান সাহিত্য সম্পর্কে বলবেন কি? আপনার বিকাশকালে কোনো আমেরিকান লেখক প্রিয় ছিল কি আপনার?

জর্জ সেফেরিস

এটা আমাদের জন্য একটি অদ্ভুত ব্যাপার―আমার মনে হয় বিদেশে সবারই এটা হয়―আমি বলতে চাচ্ছি, যে-একজন আকস্মিকভাবেই শিল্প-সাহিত্যে ঢুকে পড়ে। যেমন, আমি মনে করতে পারছি না ঘটনাটা যেভাবে আর্চিবাল্ড ম্যাকলিশ-এর বিষয়ে আমি অবগত হয়ে যাই। আর তার কাজ আমি অনুবাদ করি এবং সম্ভবত গ্রিক ভাষায় তা ছিল তার প্রথম অনুবাদ। তারপর মারিয়ান মুর, যুদ্ধের আগেই আমি মারিয়ান মুর-এর ‘বানরেরা’ এবং ‘শামুকের প্রতি’ কবিতা দুটি অনুবাদ করি।

এডমান্ড কিলি

আপনি বলেছেন, আকস্মিক আপনি তাদের মুখোমুখি হন। তো কী ছিল সেই আকস্মিকতা?

জর্জ সেফেরিস

আহ্, আমি জানি না। কিছু রিভিয়্যুতে কবিতাগুলো আমি দেখি তবে এখন আর নাম মনে নেই কোনটাতে। আর এজরা পাউন্ড। যুদ্ধের আগেই আমি তার ঠিক তিনটা ক্যান্টোস অনুবাদ করে ফেলি।

এডমান্ড কিলি

আমেরিকান সাহিত্যের প্রসঙ্গ যখন এলই তখন সত্যিসত্যিই আগেকার আমেরিকান কবিদের কথাই মনে পড়ল আমার : উদাহরণস্বরূপ, ওয়াল্ট হুইটম্যান এবং এমিলি ডিকিনসন।

জর্জ সেফেরিস

ওয়াল্ট হুইটম্যান সম্পর্কে আমার জানাশোনা ছিল, কারণ, যখন ফরাসি সাহিত্য দিয়ে আমার শুরু হয় তার আগেই থেকেই ফরাসিতে হুইটম্যান অনুবাদিত হয়ে যায় যা আমার কাছে সহজলভ্য ছিল। আর তারপর হেনরি মিলার হুইটম্যানের প্রশংসা করতেন। তিনি আমাকে হুইটম্যান সম্পর্কে কিছু আভাস দেন। তা ছিল যুদ্ধ শুরু হওয়ার কাছাকাছি সময়ের ঘটনা। কিন্তু আমি হুইটম্যান পড়া চালিয়ে যাচ্ছিলাম যেমনটা আমার তরুণ বয়সে এডগার অ্যালেন পো অধ্যয়ন চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

এডমান্ড কিলি

এখন কিছুদিনের মধ্যে আপনি গ্রিসে ফিরে যাবেন। এই আমেরিকা ভ্রমণের ব্যাপারে—যেটা  আপনার তৃতীয় সফর যদি আমি ভুল না করে থাকি—এই দেশ সম্বন্ধে আপনার কিছু বলার আছে কি?

জর্জ সেফেরিস

আমার এবারের তৃতীয় আমেরিকা সফরটিই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অন্যগুলোর চেয়ে তা সমৃদ্ধও। আমি মনে করি না শুধু নিউ ইয়র্ক দেখলেই আমেরিকা দেখা হয়। আমি এখন দূরবর্তী এক জায়গা প্রিন্সটনে এক বনের মাঝে আছি এবং অবশ্যই কোনো বিখ্যাত স্থান অপেক্ষা এই দূরবর্তী স্থান থেকেই আমেরিকাকে ভালো করে দেখছি এবং বুঝতে পারছি।

এডমান্ড কিলি

অবশ্যই প্রিন্সটনবাসীদের কাছে প্রিন্সটন দূরের কিছু নয়।

জর্জ সেফেরিস

হ্যাঁ, আমি বলতে চাইছি যারা ভ্রমণের সময় চেষ্টা করে কসমোপলিটান এলাকাগুলোকে দেখে নিতে, তাদের কাছে প্রিন্সটন দূরের মনে হতেই পারে। আর মোটের ওপর, আমাদের মতো ভ্রমণকারীরা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ নিতে আসি না।

এডমান্ড কিলি

এই সফরে খুশি হওয়ার মতো আপনি কী কী দেখলেন?

জর্জ সেফেরিস

মুগ্ধকারী বিষয়গুলো আমি এখানে বলতে চাই না। কেউ জানে না তাৎক্ষণিক তাকে কী মুগ্ধ করে। আমি বলতে চাইছি স্মৃতিতে সম্প্রসারণের জন্য সময় লাগে।

এডমান্ড কিলি

কিছু কাজ কি করে উঠতে পেরেছেন?

জর্জ সেফেরিস

হ্যাঁ মনে হয় পেরেছি। কিন্তু বলতে পারছি না এখন। কাজ শেষ করা বিষয়ে কিভাবে বলতে হয় আমি জানি না। আমি মনে করি একমাত্র কাজ শেষ হলেই তা বলা সম্ভব। কাজ সম্প্রসারণের সময় তার বিষয়বস্তু নিয়ে কিছু বলতে আমি আগ্রহী না। কিন্তু কখনও কখনও এমন একটা ভেতরের অনুভূতি কাজ করে যে, মনে হয় সময়টা নষ্ট করা হয় নি। যা-ই হোক, তা এমন একটা যা আপনাকে সত্যি বলছি : সত্যিকার অর্থে শেষ হবার মতো কিছু একটা হয় নি যা আমি বলতে পারি আপনাকে। এর বিষয়বস্তু না বলেও এটাই শুধু বলতে পারি যে আমি একটি কবিতার দু-পঙ্‌ক্তি লিখতে পেরেছি।

এডমান্ড কিলি

ইউজেন ম্যাককার্থির কবিতার একটি সংকলন আপনি সদ্য হাতে পেলেন। তিনি যে একটি কবিতার বই লিখেছেন বস্তুত তার গত বছরের প্রচারণার সময়, এই বিষয়টা আমার মনকে নাড়া দিয়েছে।

জর্জ সেফেরিস

হ্যাঁ, কেন নয়? বিষয়টা আমি ভালোই বুঝেছি। যদি সুখানুভূতির কাল থাকত তবে কবিতার ক্ষেত্রে এবং একই সাথে রাজনীতির কিছু অধ্যায়ে তা না হওয়ার কারণ নেই। আমার একটি কবিতা হচ্ছে ‘থ্রাশ’ যা আমার জীবনের ভীষণ সক্রিয় একটি সময়ের পর, আমি বলতে চাচ্ছি যে রাজনৈতিক সক্রিয়তার পর, লেখা হয়েছিল, কারণ, পোরোস যাওয়ার ঠিক আগে আমি ছিলাম গ্রিস রাষ্ট্রপ্রধানের প্রধান একান্ত সচিব। অবশ্যই আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মতো কবিতার জন্ম হয় না, কবিতার জন্য দরকার প্রস্তুতি। থ্রাশ লেখার সময়টা যদি চিন্তা করি তাহলে দেখব আমি গত বছরের অর্থাৎ আমার সক্রিয় বছরে শুরু করে  রাখা অনেক টীকা, পঙ্‌ক্তি টুকে রেখেছি। এছাড়াও সেই সময়টাকে আমি মনে করতে পারছি যখন চাকরি আমাকে মেরে ফেলছিল, কারণ আমি রাজনীতিবিদ নই, একজন সরকারি কর্মচারী মাত্র। স্মরণ করতে পারছি সেই দিনগুলো যখন সকাল আটটায় আমি অফিসে যেতাম আর ঘরে ফিরতাম পরের দিন সকাল পাঁচটায় খানাপিনা ছাড়া এবং ঘুমহীনভাবে। আমি বলছি  আপনাকে চমকে দিতে নয় বরং দেখাতে যে, মোটের ওপর সময় আমাকে চেপে ধরেছিল। এটাও ঠিক, ওই সময়ে অন্য অনেক কিছু আমার কাজকে প্রভাবিত করেছিল, আর এসবের মধ্যে আমি উল্লেখ করব সেই ঘটনা যে অনেক আকাঙ্ক্ষার পর যুদ্ধ শেষে আমি আমার দেশে ফিরেছিলাম।

এডমান্ড কিলি

আপনি কি মনে করেন, ওই সক্রিয় সময়টাতে আপনার লেখা পঙ্‌ক্তির বাইরে কবিতারা তাৎপর্যপূর্ণভাবে গর্ভধারিত হচ্ছিল এবং আপনি যখন পোরোসে গেলেন তখন তা সুসংলগ্ন কাজ হিশেবে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে আত্মপ্রকাশ করতে পারত? এক মাস ছুটি, তা-ই কি ছিল না?

জর্জ সেফেরিস

দুই মাস। আমার পেশাগত জীবনে প্রথম দীর্ঘ ছুটি, দীর্ঘতম একটি ছুটি।

এডমান্ড কিলি

আর আপনি দীর্ঘতম কবিতাটি  লিখে উঠতে পারলেন এক বসায় : দুই মাস ছুটিকালীন একটানা  কাজ করে?

জর্জ সেফেরিস

না, কবিতাটি লেখার কাহিনিটি আপনি পাবেন সে-সময়ে লেখা আমার দিনলিপিতে, অর্থাৎ পোরোসে, ৪৬-এর সময়টাতে। আমি সাঁতার কাটতে যেতাম তখন—না, প্রথমে আমি বাগানে (এটি ছিল একটি বিশাল বাগান) কাঠ কাটতাম, তারপর সমুদ্রে যেতাম, তারপর সাতটায় রাতের অন্ধকার নেমে আসার আগ পর্যন্ত কাজ করতাম। এটা আশ্চর্যের, হ্যাঁ এমনটা বলার জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন, আমি বলছি কিভাবে এমন একটা জীবন দ্বারা একজন ধীরে ধীরে নির্মল হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, এই চিত্তশুদ্ধির ব্যাপারটা আমি স্বপ্নেও টের পেয়েছি যা সদ্য প্রকাশিত আমার দিনলিপিতে বলেছি আমি।

এডমান্ড কিলি

আমি আর মাত্র একটি বিষয় আলোচনা করতে চাই। গ্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতিতে আপনার যে অসাধারণ অবস্থান এখন—আমি মনে করি নোবেল একবার পেলে সবার ক্ষেত্রেই এরকমটা হয়—এক্ষেত্রে আপনি যদি মনে করেন এটা যে-কোনোভাবে আপনার কবি হিশেবে ব্যক্তিগত ভূমিকা থেকে জ্ঞানী হিশেবে আবির্ভূত গণভূমিকা, বা উদাহরণস্বরূপ তরুণ কবি বা চারপাশের সাংস্কৃতিক জীবনের বা দেশের দায়িত্বপালন-সংক্রান্ত কোনো পদ, এসব পালনের ক্ষেত্রে আপনার অনুভূতিকে আক্রান্ত করেছে?

জর্জ সেফেরিস

শুরু থেকেই স্পষ্ট করে বলা উচিত—ইংরেজিতে বললে—নোবেল পুরস্কার একটি দুর্ঘটনা মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। বুঝতে হবে এটা কোনো নিয়োগ নয়। আর আমি মনেও করি না যে কোনো দায়িত্ব পালনের জন্য আামি নিয়োগপ্রাপ্ত। এটা একটা নেহাত দুর্ঘটনা যা একজনকে দ্রুত সম্ভব ভুলে যাওয়া উচিত। না হলে এ জাতীয় ব্যাপারে যদি আপনি অতি বিমোহিত হন তবে আপনার অবস্থা হবে নিজেকে ধ্বংস করার মতো। নোবেল পাওয়ার সময়টাতে এক সমালোচক—ইংরেজিতে ঠিক কী যে বলব—ধরুণ  কাসান্দ্রা-ধরনের এক সমালোচক লিখলেন, সেফারিসকে এখন অত্যন্ত সাবধান হতে হবে, কারণ,  নিজের কাজে একেবারে নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছেন তিনি, এমনকি অসুস্থতায় মারাও পড়তে পারেন তিনি, কারণ, এ ধরনের সাফল্য পাওয়া মানুষের ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটে থাকে। তো কোনো বিবেচনা ছাড়াই এই সমালোচক মনগড়া এসব বলেছিলেন। যা-ই হোক, নোবেল প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় স্টকহোমে আমার বিচারকদের (বা তারা যা-ই হোক না কেন) উদ্দেশে বলেছিলাম : ভদ্রমহোদয়গণ, ধন্যবাদ আপনাদের, দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আমাকে কেউ-না-হতে বা অখ্যাত হতে দেওয়ায়, যেমনটা হোমার ইউলিসিস সম্পর্কে বলেছিলেন। আর আমি ছিলাম অতি বিশ্বস্ত। যা-ই হোক না কেন, কাউকে গলা ধাক্কা দিয়ে দায়িত্বের এক ফাঁকা সাগরে ফেলে দেওয়ার কারও অধিকার আছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ তা মোটের ওপর ধিক্কারজনক।


আপনারা ধরে নেবেন যে আমার প্রকাশিত প্রতিটি কবিতাই আমার শেষ কবিতা।


এডমান্ড কিলি

আমরা নোবেল পুরস্কারের বিষয় থেকে সরে আসি। একটি ছোট দেশ হিশেবে গ্রিসে সব সময়ই কোনোভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিকসূত্রে হলেও স্বীকৃত রাজকবির ঐতিহ্য ছিল বলে আমার মনে হয় (এটা ব্রিটিশ বাদে অরীতিনির্ভর ঐতিহ্য)—এই বিষয়টা কবি ও তাদের অনুসারীদের কাছে এমন একটা অনুভূতি যে প্রতিটি প্রজন্মেই রয়েছে কবিতার মুখপাত্র, যদিও বা এই মুখপাত্রের ভূমিকা কখনও কখনও আত্মগরিমাদুষ্ট। সিকেলিয়ানোসের কথা উদাহরণস্বরূপ এখানে বলা যায় যিনি এই ভূমিকা পালন করেছিলেন, আর পালামাসও তার সময়ে তা-ই করেছিলেন।

জর্জ সেফেরিস

হ্যাঁ, ঈশ্বর তাদের কৃপা করুন, কিন্তু আমাকে দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে নিজেকে আমি কখনও কারও বা কোনোকিছুর মুখপাত্র ভাবি নি। কোনোকিছুর মুখপাত্র হওয়ার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই। এখন আবার অনেকে মনে করে থাকেন যে এ ধরনের কাজ করতেই হয়; কিন্তু আমি আমার মতোই মনে করি, মোটের ওপর, এই কারণেই আমি কম লিখি। আমি কখনোই এই ধরনের বাধ্যবাধকতা অনুভব করি নি; আমি শুধু মনে রাখি যে একজন কবি হিশেবে আমি নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছি কি না, আমাকে লিখতে হবে। বলতে গেলে শুরু থেকে এটাই ছিল আমার ভাবনা। মনে পড়ছে আমার প্রথম বই প্রকাশের সময়টা, তখন অনেকে বলেছিল : ‘মহাশয় সেফেরিস, এখন আপনাকে চেষ্টা করে দেখাতে হবে যে আপনি আরও পারেন।’ আমি তাদের বললাম : ‘ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা ধরে নেবেন যে আমার প্রকাশিত প্রতিটি কবিতাই আমার শেষ কবিতা।  ধারাবাহিক  লেখার  জন্য আমার কোনো আকাঙ্ক্ষাই নেই বলতে গেলে।’ এ-ই আমার শেষ কবিতা। আর যদি আমি আরেকটা লিখি তবে তা হলো এক আশীর্বাদ। এখন পরের কবিতাটি লেখার জন্য আমি কতটা কাজ করেছি বা করি নি এটা অন্য বিষয়—ব্যক্তিগত বিষয়। অন্যরা ভাবে যে তারা দেশের কণ্ঠস্বর। ঠিক আছে। ঈশ্বর তাদের আশীর্বাদ করুন। আর এটা ঠিক, কখনও কখনও তারা এই কাজে খুব ভালোও করেছেন।

এডমান্ড কিলি

জয়েস এভাবে ভেবেছিলেন। আমার মনে পড়ছে আ পোর্ট্রেট অব দ্য আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়ংম্যান-এর শেষদিকে স্টিফেন ডেডালাসের বিখ্যাত উক্তিটি : ‘আমার গোত্রের অসৃষ্ট চেতনাকে আমার আত্মার কামারশালায় তপ্ত পিটিয়ে তৈরি করা।’

জর্জ সেফেরিস

আমি আপনাকে আরেকটি উদাহরণ দিতে পারি। আমাদের যৌবনকালে জানার সমস্যা নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা হতো। চেষ্টা করা হতো গ্রিক ও অ-গ্রিকদের পার্থক্য টানার—গ্রিক হলে তা হতো প্রশংসার, না হলে নিন্দার; সংক্ষেপে চেষ্টা চালানো ‘সত্যিকারের’ গ্রিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার। এজন্যই আমি লিখেছিলাম : ‘গ্রিকত্ব হলো নির্ভরযোগ্য কিছু কাজের সমষ্টি যা আসলে গ্রিকদের দ্বারা সৃষ্ট হতে যাচ্ছে।’ আমরা বলতে পারি না আমাদের এমন কিছু কাজ হয়েছে যা গ্রিকচেতনা সৃষ্টিকারী। আমরা একটি পঙ্‌ক্তি দেখার সময় লক্ষ করতে পারি যে তার অনেকটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন। এটা সোজা ব্যাপার নয়। আমি জানি না কী আমার কণ্ঠস্বর। অন্যরা  কিছু সময়ের জন্য যতই মনে করে যে এটাই তাদের চেতনা ততই তা ভালো। এটা তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়। এটা আমি আরোপ করতে পারি না; কারণ এ বিষয়ে কারও স্বৈরাচারিতা  দেখানো উচিত নয়।

এডমান্ড কিলি

অনেকে আপনার সুস্থ দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে ভেবেছেন, কিন্তু অন্য অনেকে মনে করেন একজন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত হিশেবে, বিশেষ করে একটি দেশের একমাত্র নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত হিশেবে, আপনার ভূমিকা  হওয়া উচিত মুখপাত্র এবং জনগণের বিবেক হিশেবে।

জর্জ সেফেরিস

হতে পারে তা, কিন্তু তার স্বভাব তাকে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করলেই একজন তা গ্রহণ করে, একে আপনি অন্য কিছুও বলতে পারেন। একই সময়ে অপ্রয়োজনীয় কোনো কিছু লিখতে আমি বাধ্য হই নি। ‘প্রয়োজনীয়’ বলতে আমি বুঝি প্রকাশ করা বা তাকে চাপা দেওয়া।

এডমান্ড কিলি

যা-ই হোক, প্রশ্ন  ফুরিয়ে আসছে। তরুণ প্রজন্মের প্রতি কোনো পরামর্শ না থাকলে আপনাকে আর জিজ্ঞেস করার কিছু নেই আমার।

জর্জ সেফেরিস

আছে, পরামর্শ আছে।

এডমান্ড কিলি

বলার আছে? খুব ভালো।

জর্জ সেফেরিস

গ্রিক তরুণ প্রজন্মকে বলতে চাই : আধুনিক গ্রিক ভাষায় যতটা সম্ভব চর্চা করে যাও তোমরা। আর এলোমেলো লেখার কাজ নাই। লেখা সম্পর্কে তাদের বলতে চাই, নিজের কাজের ওপর বিশ্বাস রাখবে, কিন্তু এমনভাবে রাখবে  যে মনে হবে না তা। তোমরা মনে রাখবে কবিতাই একমাত্র কাজ যেখানে মিথ্যা বলা যায় না। কবিতায় মিথ্যা চলে না। যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও তবে এক সময় তুমি ধরা পড়বে, আজ বা পাঁচ বা দশ বছর পরে হলেও; মিথ্যা বললে তোমাকে ধরা পড়তেই হবে এক সময়।

এডমান্ড কিলি

মিথ্যা সম্পর্কে যখন আপনি বলেন, আপনি প্রথমত বলতে থাকেন মিথ্যা সম্পর্কে আপনার আবেগি…

জর্জ সেফেরিস

আমি জানি না আমি কী বোঝাচ্ছি। একজনের চিন্তার বাস্তবতায় সম্ভবত এটি একটি আবেগময় ব্যাপারই। জানি না ঠিক। আমি বুঝি, খাঁটি বিষয়ের বিশেষ আওয়াজের ব্যাপার আছে। তুমি তাকে টোকা দিলে সে এমন এক শব্দ করবে যা বলে দেবে যে সে খাঁটি।

এডমান্ড কিলি

আপনি কি মনে করেন প্রত্যেক লেখকই সর্বদা নিজেকে বোঝে এভাবে যে, যে-শব্দ সে শোনে তা খাঁটি বা তা নয়?

জর্জ সেফেরিস

না, এটা বলা কঠিন। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে তার থাকবে একটি  সহজাত প্রবণতা, একটি পদনির্দেশক প্রবণতা যা তাকে বলে : ‘প্রিয়, সাবধান; তুমি পড়ে যেতে যাচ্ছ। এক্ষণে তুমি বাড়াবাড়ি করছ।’ তারপর যখন সে শুনবে তা, তখন বলার জন্য গড়িমসি না-করেই  নিজেকে বলে বসবে সে : ‘কেন, তুমি তো  ঠিকই আছ, হে প্রিয়।’ তুমি মোটেও ঠিক নেই হে।

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা: লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব ( ২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২), তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪);

প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬), অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯),মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫);

অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪)।

ই-মেইল : kumar.4585@yahoo.com
কুমার চক্রবর্তী