হোম অনুবাদ জর্জ সেফেরিসের সাক্ষাৎকার : প্রথম কিস্তি

জর্জ সেফেরিসের সাক্ষাৎকার : প্রথম কিস্তি

জর্জ সেফেরিসের সাক্ষাৎকার : প্রথম কিস্তি
874
0

জর্জ সেফেরিস সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রথম গ্রিক কবি। ১৯৬৩ সালে তিনি নোবেল লাভ করেন। তার এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন এডমান্ড কিলি, যিনি সেফেরিসের অন্যতম প্রধান অনুবাদক। ১৯২৮ সালে জন্ম নেওয়া কিলি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলেনিক স্টাডিস প্রোগ্রাম-এর ডিরেক্টর এমেরিটাস এবং চার্লস বার্নওয়েল স্ট্রাউট অধ্যাপক। জর্জ সেফেরিসের এবং কাভাফির কবিতার ব্যাপক অনুবাদ করেছেন তিনি। তার এবং ফিলিপ শেরার্ড-এর যৌথ অনুবাদে সেফেরিসের কবিতাসংগ্রহ ইংরেজিতে প্রকাশিত প্রশংসিত একটি কাজ। এছাড়াও আধুনিক গ্রিক কবিতার অনুবাদ ও সমালোচক হিশেবে তার খ্যাতি রয়েছে। তার রয়েছে ছয়টি উপন্যাস এবং সালোনিকা বে মার্ডার : কোল্ড ওয়ার পলিটিকস অ্যান্ড দ্য পোল্ক অ্যাফেয়ার নামের একটি বই। সাক্ষাৎকারটি দ্য প্যারিস রিভিয়্যু, আর্ট অ্যান্ড পোয়েট্রি সংখ্যা-১৩-এ প্রকাশিত হয়। পরস্পরের পাঠকদের জন্য লেখাটি ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন কবি কুমার চক্রবর্তী।

[১৯৬৮ সালের শেষদিকে এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময়টাতে জর্জ সেফেরিস তার দীর্ঘ আমেরিকা ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে ছিলেন। প্রিন্সটনে ইন্সটিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিতে ফেলো হিশেবে তিন মাসের কোর্সটি তিনি সবেমাত্র শেষ করেছেন, খুবই প্রাণবন্ত অবস্থায় ছিলেন তিনি, কারণ তার কাছে মনে হয়েছে যে এই ভ্রমণ, বিশেষত গত কয়েক মাসে আথেন্সে সংঘটিত রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নিজ চিন্তা ও কবিতা উপস্থাপনার পরিপ্রেক্ষিতে, তার জন্য এক ধরনের  পুনরুজ্জীবনের কাজ করেছে। ভ্রমণকালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বেশ কিছু কবিতা পাঠের আসর―হার্ভাড, প্রিন্সটন, রাটগার্স, পিট্‌সবার্গ, ওয়াশিংটন, ডি.সি., এবং নিউ ইয়র্কের ওয়াইএমসিএ কবিতাকেন্দ্রে—যেখানে সেফেরিস গ্রিক ভাষায় পাঠ করেছিলেন তার কবিতা আর এডমান্ট কিলি তার ইংরেজি অনুবাদ পড়ে শুনিয়েছিলেন, যা ছিল আলাদা দুজন ব্যক্তিত্বের উত্তেজনা ও সাড়ার ভিন্ন এক গুণপনায় উদ্ভাসিত। উদাহরণস্বরূপ, পিট্‌সবার্গে শ্রোতারা (তারা অধিকাংশই ছিল স্থানীয় গ্রেকো-আমেরিকান) কবিতা শোনে হয়ে পড়েছিল মুগ্ধ কিন্তু অভ্যর্থনার পর তারা কবির প্রতি এমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল যেন তিনি এক নির্বাসিত গ্রিক রাজা। নিউ ইয়র্কের কবিতাপাঠ শুরু হয়েছিল সিনেটর ইউজেন ম্যাককার্থির ভূমিকার মাধ্যমে। আলোচনাপর্বে গ্রিসের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে শ্রোতারা কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছিল কবিকে। সেফেরিস এসবের জবাব দিতে চান নি। শ্রোতারা একে এড়িয়ে যাওয়াই মনে করেছিল কবির এ আচরণকে যদিও সেফেরিস তার কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন—পাঠের পর নৈশভোজের সময় তার এড়িয়ে যাবার ব্যাপারে ব্যক্তিগত মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন : বিদেশের মাটিতে একজন অতিথি হয়ে নিজ দেশের সরকারের সমালোচনাকে তিনি সঠিক মনে করেন নি। কিন্তু সত্য হলো, জবাব তিনি জমিয়ে রেখেছিলেন গ্রিসে ফেরার অপেক্ষায়, গ্রিসে ফিরে গিয়ে সামরিক শাসনকে অমান্য করে এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে ১৯৬৯ সালের ২০ মার্চ, স্বৈরাচারী পাপাদোপাউলোস-এর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এক দোর্দণ্ড বিবৃতি দিয়েছিলেন তিনি।

কূটনৈতিক ব্যবহারচাতুর্য আর সুবিবেক গড়ে দিয়েছিল সেফেরিসের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য যা তার উপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত স্টাইলকে বর্ণিল করে তুলেছিল। ভারিক্কি ধরনের সেফেরিস দায়িত্বমুক্ত থাকলে শান্ত স্বরে কথা বলেন, ধীর তার চালচলন, কখনও বা মনে হবে অবসন্ন, যদিও চলার সময় প্রাচীন ইউরোপীয় কায়দায় হাত মুঠিভরে ধরার অভ্যাস আছে তার। এই মুষ্টিবদ্ধতার মধ্যে যেন তিনি জানান দেন তার তারুণ্যের তেজ। কোনো সন্দেহজনক বা সাবলীল কিছু অনুভব করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে তার কণ্ঠস্বরে তীব্র ধার ফুটে ওঠে। আবার কূটনৈতিক দিক থেকেও তার রয়েছে একটি রম্য দিক : আবোলতাবোলের দিকে ঝোঁক, তামাশাপ্রবণতা, নিজেকে ও অন্যকে ধোঁকা দেওয়ার অভ্যাস তার মুখে ফুটিয়ে তোলে বাঁকা চাঁদের মতো হাসি যা তার ডিম্বাকার চেহারার জন্য বেমানান, বিশেষত যখন তার শ্রোতাকে তিনি ‘কেন হাসছেন’ বলে ধন্দে ফেলে দেন। একজন আমেরিকান কবি কয়েক বছর আগে নিউ ইয়র্কে তার প্রথম কবিতাপাঠের সময় তাকে বলেছিলেন ‘মধ্যপ্রাচ্যের গুহাবাসী মানব’। সাক্ষাৎকারগ্রহীতা সাহস করে তাকে এই কবিতাটি দেখানোর পর এক তীক্ষ্ণ ও অবিচল চাহনিতে তিনি নিজেকে আটকে ফেলেন। ‘মধ্যপ্রাচ্যীয় গুহামানব। অদ্ভুত এবং বেঠিক।  আমি নিজেকে এক সময় বলতাম ক্যাপাডোসীয় গুহামানব, আর এটুকুর বেশি কিছু নয়। কেন হাসছেন আপনি?’ তারপর সেই হাসি।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয় প্রিন্সটনের ইন্সটিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতে সেফেরিসের অস্থায়ী নিবাসে, যা ছিল তিন কক্ষের বড় জানালাবিশিষ্ট সাধারণ এক দ্বিতল অ্যাপার্টমেন্ট। ঘরে বইয়ের তাক প্রায় খালি, আথেন্সে সেফেরিসের বাড়িতে আধুনিক গ্রিক ছবি এবং মূল্যবান বস্তুর যে সাজ থাকত, তাও ছিল অনুপস্থিত। তথাপি কবি এই বাড়িটিতে আনন্দেই ছিলেন, কারণ, এই জায়গাটি থেকে তিনি দেখতে পেতেন সঞ্চরণশীল গাছপালা, কাঠবেড়ালির আনাগোনা, উঠানে স্কুল-ফেরত বাচ্চাদের কলকাকলি। পুরো সাক্ষাৎকারের সময়েই তরুণীর মতো বেণিবাঁধা স্বর্ণকেশি চুলের স্ত্রী মারো উপস্থিত ছিলেন, কখনও আনন্দচিত্তে শুনছিলেন, কখনও বা উঠে গিয়ে খাবার বা পানীয় তৈরি করছিলেন।]


এডমান্ড কিলি

শুরুতে ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স স্টাডি সম্পর্কে এবং অতি সম্প্রতি কূটনৈতিক চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ছাত্র হিশেবে আপনি নতুন ক্যারিয়ার শুরু করেছেন, এ সম্পর্কে আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

জর্জ সেফেরিস

প্রিয়ভাজন, অ্যাডভান্সড স্টাডি ব্যাপারটা আমাকে বিভ্রান্ত করে : কী তা? কেউ কি ভুলতে চাইবে কিংবা আরও জানতে চাইবে যে, আমার পর্যায়ের কেউ অ্যাডভান্সড স্টাডিতে অবস্থান করছে? এখন আমি অবশ্যই বলব, শাদামাটাভাবে বিষয়টি হচ্ছে—এখানে পুরো অবস্থাটা আমি বেশ উপভোগ করি, কারণ এখানে রয়েছে অনেক চমৎকার লোক, খুবই ভালো বন্ধু, আর যদি বলি, উপভোগ করি তাদের বিষয়বৈচিত্র্য। আমার চারপাশে রয়েছে অনেক বিষয় : বিজ্ঞান, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্মশাস্ত্র, দর্শন…

এডমান্ড কিলি

কিন্তু এত যে বিজ্ঞানী, এত যে ইতিহাসবিদ, এদের মাঝে নিজেকে কি অপাঙ্‌ক্তেয় মনে করেন না আপনি?

জর্জ সেফেরিস

না, কারণ আমার নিজের বিষয়ে যাদের আগ্রহ নেই তাদের প্রতিই আমি আকর্ষণ বোধ করি।


এটি একটি আশ্চর্য ব্যাপার যে, গ্রিসে দখলদারিত্বের সময় কবিতার প্রতি আগ্রহের পুনরুত্থান ঘটল।


এডমান্ড কিলি

আমার কাছে যে রকমটা মনে হয়, কাভাফি সম্ভবত চিন্তা করে থাকতে পারেন, ইতিহাসবিদদের সাথে সংলাপের সুবিধা আছে, আপনিও কি তাই মনে করেন? যদি অন্যভাবে বলি, আপনি কি মনে করেন যে, ইতিহাসের বিশেষত্ব কবিকে কিছু বলার আছে?

জর্জ সেফেরিস

আপনার স্মরণে আছে কি, কাভাফি তার ইতিহাসচেতনা নিয়ে গর্ববোধ করতেন। তিনি বলতেন : আমি ইতিহাসের লোক―এ রকমই কিছু তিনি বলতেন, যদিও হুবহু তার উক্তিটি আমার মনে নেই। আমি সে-রকম কিছু নই, তা সত্ত্বেও ইতিহাসের চাপ আমি অনুভব করি। অন্যভাবে বললে, সম্ভবত তা অধিকতর রীতিসম্মত, অধিকতর বিমূর্ত কিংবা অধিকতর মূর্ত… কোনটি আমার ঠিক জানা নেই।

এডমান্ড কিলি

গ্রিক কবির সাথে তার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিষয়ে বলবেন কি? আপনি একদা বলেছিলেন, গ্রিসে প্রাচীন গ্রিসের কোনো অস্তিত্ব নেই। এর দ্বারা আপনি সুনির্দিষ্টভাবে কী বোঝাতে চেয়েছেন?

জর্জ সেফেরিস

আমি বোঝাতে চেয়েছি, গ্রিস একটি চলমান প্রক্রিয়া। ইংরেজি ভাষায় ‘প্রাচীন গ্রিস’-এর শব্দার্থের মধ্যে নিহিত আছে সমাপ্তিসূচক অর্থ। পক্ষান্তরে আমাদের কাছে গ্রিস জীবন্ত কিছু, ভালো হোক বা মন্দ হোক; এটি জীবনের অংশ, এখনও এর মৃত্যু ঘটে নি। এটি বাস্তবতা। কেউ একই যুক্তি দেখতে পারে, যখন সে প্রাচীন গ্রিক ভাষার উচ্চারণ নিয়ে আলোচনা করে : তাদের জন্য গ্রিক একটি মৃত ভাষা, কিন্তু আমাদের জন্য এটি ভিন্ন এক কাহিনি। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রাচীন গ্রিক ভাষা বিশেষ কোনো সময়ে তার কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এ কারণেই আপনি স্বেচ্ছাচারিতার সাথে এটি উচ্চারণ করতে পারছেন।

এডমান্ড কিলি

তাহলে আপনি স্পষ্টত ভাষার ক্ষেত্রে কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে গ্রিক ঐতিহ্যকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিশেবে দেখছেন। এ দেশে কিছু ক্লাসিক্যাল ও বাইজানটাইন পণ্ডিত এটি বিশ্বাস করেন না। আমার মনে হয়, কোথাও না।

জর্জ সেফেরিস

আপনি কি জানেন কেন এমনটি হলো? কারণ বিষয়টি তথা গ্রিসের ইতিহাস এত বিশাল যে প্রত্যেক পণ্ডিত এর কোনো সুনির্দিষ্ট সময় কিংবা শাখার মধ্যে নিজেকে সীমিত রাখেন, এবং এর বাইরে আর কিছুই তাতে পাওয়া যায় না। উদাহরণস্বরূপ, গিবন মনে করতেন যে, এক সহস্র বছর ছিল ক্ষয়িষ্ণু। কিভাবে একটি জাতি মোটের উপর এক সহস্র বছর ক্ষয়িষ্ণু থাকতে পারে, হোমারীয় কাব্যকাল এবং খ্রিস্টের জন্মের মধ্যে ৮০০ বছরের ব্যবধান কিংবা প্রায় কাছাকাছি সময়ের দূরত্ব ছিল এবং ধরে নেওয়া যায়, এরপর এক সহস্র বছর ছিল ক্ষয়িষ্ণু সময়।

এডমান্ড কিলি

গ্রিক কবির সাথে তার ঐতিহ্যের সম্পর্কটি কেমন ছিল এ নিয়ে সতত আমার মনে হয়েছে যে, গ্রিক কবি তার অ্যাংলোস্যাক্সন প্রতিপক্ষ যিনি গ্রিক পুরাণ এবং মাঝে-মধ্যে গ্রিস ল্যান্ডস্কেপের ব্যবহার করেছেন, তার চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। আমার মনে পড়ে, বহু বছর আগে যখন আমি কাভাফি এবং সেফেরিসের কবিতায় ইংরেজির প্রভাব বিষয়ে অভিসন্দর্ভ রচনা করেছিলাম, যখন আমি আপনার ল্যান্ডস্কেপে প্রতিবিম্বিত সুনির্দিষ্ট কিছু চিত্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, যেমন, আপনার রচনায় সে সব মূর্তি আবির্ভূত হয় তাদের প্রতীকী অর্থ কী। আপনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন : ‘কিন্তু ওগুলোই প্রকৃত শিলামূর্তি। যে ল্যান্ডস্কেপ আমি দেখেছি সেখানে তারা অবস্থান করছে।’ আমি মনে করি আপনি বলছিলেন, আপনি সব সময় জীবন্ত, প্রকৃত ঘটনা দিয়ে শুরু করেন এবং সেখান থেকে যে কোনো সর্বজনীন অর্থের দিকে যাত্রা করেন যাকে এর মধ্যে ধারণ করা যেতে পারে।

জর্জ সেফেরিস

ক্লাসিক্যাল ভাস্কর্য বিশেষজ্ঞ কোনো একজনের এতদ্বিষয়ক একটি ব্যাখ্যা পেয়েছিলাম আরেকজন ইংরেজ পণ্ডিতের সূত্রে যিনি পার্থেননের ভাস্কর্যকর্ম সম্পর্কে বক্তব্য করছিলেন। বক্তৃতার পর তাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য এগিয়ে গেলাম, এবং আমার যতটুকু স্মরণে আছে তাকে, তিনি তখন বললেন, তোমার একটি পঙ্‌ক্তি আছে আমি যা বোঝাতে চেয়েছি তার সাথে মিলে যায় যেখানে তুমি বলো : ‘শিলামূর্তিগুলো ধ্বংসাবশেষ নয়, বরং আমরাই আসলে ধ্বংসাবশেষ’। আমি বোঝাতে চাই যে, তার মাপের একজন প্রাজ্ঞজন একটি বিষয় ব্যাখ্যার জন্য আমার একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করছিলেন, বিষয়টা আমাকে বিস্মিত করেছে।

এডমান্ড কিলি

একজন কবি যে তার শৈশব থেকে চিত্রকল্প গ্রহণ করে থাকেন, তা আগে আমরা আলোচনা করেছি। একজন গড়পড়তা ইংরেজ থেকে আপনার স্বাতন্ত্র্য বোঝানোর জন্য আপনি বলেছিলেন, ইংরেজদের জীবনে ফুটবল ও কার গাড়ির প্রয়োজনীয়তা যেমন, আপনার কাছে গাধাগুলোও সে রকম। সম্ভবত আমার মনে আছে, আপনি সমুদ্র এবং স্মিরনায় অবস্থিত আপনার নিজ গ্রামের নাবিকদের সম্পর্কেও বলেছিলেন।

জর্জ সেফেরিস

আপনি জানেন, চিত্রকল্পের অদ্ভুত দিকটি হলো, এর অনেকটাই অবচেতনে থাকে এবং মাঝে মাঝে তা কবিতায় এসে আবির্ভূত হয় এবং কেউ জানে না এর উৎপত্তি কোথায়। কিন্তু আমি নিশ্চিত কবির অবচেতন জীবনে এর শেকড়, প্রায়শ তার শৈশবের মধ্যে এবং এ কারণেই আমি মনে করি, যে শৈশব তিনি কাটিয়েছেন তা তার জীবনের চূড়ান্ত নিশানা ঠিক করে দেয়।

আমার মনে হয় দুটি পৃথক বিষয় কাজ করছে : চেতন ও অবচেতনের স্মৃতি। আমি মনে করি, কবিরা প্রকৃতিগতভাবে মগ্নচৈতন্য থেকে জীবনীশক্তি সঞ্চয় করেন। বলা যায়, আপনি যেভাবে স্মৃতিগ্রন্থ লেখেন এটি তা নয়, কিংবা নয় আপনি আপনার অতীতকে, শৈশবকে যেভাবে স্মরণ করতে চান। আমার শৈশবের অনেক ঘটনাই আমার মনে পড়ে যেগুলো আমাকে প্রভাবিত করেছে। যেমন, যখন আমি শিশু ছিলাম, আমাদের ঠাকুরমার বাগানে বাংলো ধরনের একটি বাড়ি ছিল যেখানে আমরা আমাদের গ্রীষ্মযাপন করতাম―আমি সেই বাড়ির কোনায় কোথাও জাহাজের একটি কম্পাস আবিষ্কার করেছিলাম, পরে আমি জেনেছিলাম এটি ছিল আমার পিতামহের। এবং আমার মনে হয়, আমি সেই অদ্ভুত জিনিসটি বার বার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, খুলে, আবার জোড়া দিয়ে শেষ পর্যন্ত নষ্ট করে ফেলেছিলাম। ঘটনাটি আমার স্মৃতিপটে রূপকথা হয়ে রইল। কিংবা আরেকটি ঘটনা বলি―যখন শরৎকাল আসত, যখন ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেত, এবং মাছ ধরার নৌকাগুলো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতে পাল তুলে ভাসতে থাকত, আমরা আনন্দ পেতাম যখন দেখতাম তারা আবার নোঙর ফেলেছে এবং আমার মা বেরিয়ে পড়া জেলেদের কোনো একজনকে বলত, ‘সাবাস, তোমরা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া অতিক্রম করে এসেছ’; এবং সে তখন বলত,  ‘ম্যাডাম, আপনি জানেন, আমরা সব সময় সারেংকে আমাদের সাথে নিয়ে নৌকা ভাসাই।’ এটা আমার কাছে মর্মস্পর্শী ছিল। সম্ভবত আমি যখন প্রথম পর্যায়ের সেই কবিতায় ইউলিসিস সম্পর্কে লিখেছিলাম আপনি সেই কবিতার উপর (‘একটি পরদেশি কবিতাকে নিয়ে’) মন্তব্য করেছিলেন, সম্ভবত আমার মনের মধ্যে সেই জেলের মতো কেউ ছিল। আমার ছোটবেলার সেই বৃদ্ধ নাবিকেরা, যারা এরোতোক্রিতোস আবৃত্তি করত, সব ক্ষেত্রেই, আমার মতে অচেতন রূপকল্পকে জাগিয়ে তোলা, তাদের আলোতে নিয়ে আসা সব সময়ের জন্য কিছুটা বিপজ্জনক কারণ, আপনি জানেন, তারা দ্রুতই বাষ্পীভূত হয়।

এডমান্ড কিলি

একটি ক্ষুদ্র পাঠকগোষ্ঠীর জন্য বহুকাল ধরে লেখার ফলে আপনি কি ক্লান্ত বোধ করেছেন এবং এই পাঠকগোষ্ঠী আপনার কবিজীবনের শুরুতে এতটাই ক্ষুদ্র ছিল যে আপনাকে নিজের টাকায় বই ছাপাতে হয়েছে এবং প্রতিটি বই ৩০০ কপির কম ছাপাতে হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠিত আমেরিকান কবির কাছে এটি সম্পূর্ণ অজানা একটি ব্যাপার।

জর্জ সেফেরিস

আমি আপনাকে একটি উদাহরণ দেবো। আমি যখন আমার প্রথম খণ্ড, স্ট্রফি (দ্য টার্নিং পয়েন্ট) প্রকাশ করলাম, আমি এর ১৫০ কপি ছাপিয়েছিলাম। সেটা ১৯৩১-এর ঘটনা। আমার মনে পড়ে, ১৯৩৯ সালেও বইয়ের দোকানে এগুলোর কিছু কপি ছিল। আমি সেই কপিগুলো বাজার থেকে তুলে নিয়েছিলাম যাতে করে ১৯৪০-এ সেই বইয়ের একটি নতুন সংস্করণ বের করতে পারি। কিন্তু আমাকে অবশ্যই বলতে হবে, কিছুকাল পরেই একটু একটু করে অবস্থার পরিবর্তন শুরু হলো। জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে গ্রিসের পতনের পর আমি যখন মিশরের উদ্দেশে যাত্রা করলাম তখন আমি পূর্বেকার গ্রন্থ চিসটার্ন এবং স্ট্রফি ছাড়াও আমার তিনটি গ্রন্থ যথাক্রমে লগ বুক-১, পুরাণেতিহাস এবং অনুশীলনের খাতা ফেলে এসেছিলাম। এগুলো ছিল একবারেই আনকোরা, আপনি জানেন নির্বাসিত গ্রিক সরকারের সাথে ক্রিতে এবং কায়রোর উদ্দেশে জাহাজে চড়ার আগে আমি ওদের একটি কপিও বিক্রি করি নি। আমার অনুপস্থিতিতে সবকিছুই বিক্রি হয়ে গেল। আমি যখন ফিরে এলাম, এগুলোর এক কপিও অবশিষ্ট ছিল না। বিদেশি শত্রু কর্তৃক দখল গ্রিক জনগণকে মনোনিবেশ ও পড়ার সুযোগ এনে ছিল। এবং আমি দেখলাম, দখলমুক্ত হওয়ার পর যখন আমি ফিরে এলাম তখন আগের চেয়েও গ্রিসে আরও বেশি পরিচিত হয়ে গেছি।

এডমান্ড কিলি

এটি একটি আশ্চর্য ব্যাপার যে, গ্রিসে দখলদারিত্বের সময় কবিতার প্রতি আগ্রহের পুনরুত্থান ঘটল। আমি  এ বিষয়টি জানতে পেরেছি অন্য কবিদের কাছ থেকে, উদাহরণস্বরূপ, গাতসোস এবং ইলাইতিস-দের কাছ থেকে। কবিতা আথেন্সের বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গকে পাঠ ও আলোচনায় ঐক্যবদ্ধ করল, ফলে এ সময়টা ত্রিশের দশকের পর এ শতাব্দীতে কবিতার জন্য শ্রেষ্ঠ সময়ে পরিণত হলো।

জর্জ সেফেরিস

ইলাইতিস তার বই ছেপেছিলেন দখলে যাবার সময় এবং গাতসোসের বিখ্যাত বই আমোরগোস দখলের সময়ই প্রকাশ পেয়েছিল।

এডমান্ড কিলি

দখলের পর কী ঘটেছিল; শীর্ষস্থানীয় কবিরা এত দীর্ঘ সময় কেন নীরব ছিলেন?

জর্জ সেফেরিস

এটাকে আসলে নীরবতা বলা যাবে না। সময় বদলে গিয়েছিল এবং দিগন্তসমূহ প্রসারিত হয়েছিল, আর প্রত্যেকেই দেশের বাইরের জীবনকে অধিকতর প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছিল, তারা প্রকাশের নতুন নতুন ভঙ্গি খোঁজার চেষ্টা করছিল।

এডমান্ড কিলি

আমি ভাবছি আপনি এদেশের বৃহৎ সাধারণ শ্রোতাসমাজের নিকট পাঠ করে নতুন এবং আগ্রহোদ্দীপক কিছু অনুভব করছেন কি না, আমার বন্ধু-বান্ধব যাদের গ্রিক সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই, তাদের সম্পর্কে বলতে হয় যে, তারা গ্রিক ভাষায় আপনার লেখা পড়ে কবিতার ছন্দ সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করেছে তা ইংরেজি ভাষায় আপনার লেখা পাঠ করার অর্জিত ধারণা থেকে ভিন্ন।

জর্জ সেফেরিস

এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি আমেরিকাতে বই পড়ার এই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আরও বেশি কিছু বলতে পারি। সেদিন অন্য এক কবি আমার লেখা সম্পর্কে একটি কবিতা পাঠিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। সেটি এক নতুন ধরনের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঢি হচ্ছে প্রতিক্রিয়াগুলো জানা, প্রশংসা পাওয়া নয় বা প্রশংসিত হওয়া নয়।

এডমান্ড কিলি

এই শরতে রাটগারসে আপনার লিখিত বক্তব্যের পর শ্রোতাদের মধ্যে একজন আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিল আপনার কবিতার ইংরেজি অনুবাদ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী, আপনি তখন আপনার ইংরেজি অনুবাদকের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু তারপরই বলেছিলেন, ‘অবশ্য আমার কবিতার সেরা অনুবাদটি চীনা ভাষায়ই হয়েছে যে ভাষা আমি মোটেও জানি না।’

জর্জ সেফেরিস

এটি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা কঠিন কিছু না, কারণ আপনি জানেন, আমি অনুভব করি সেসব ভাষায় যেগুলো আমি জানি, কারণ সম্ভবত আমি সেগুলো এত ভালো জানি যে, (উদাহরণস্বরূপ, ইংরেজি নয়, ফরাসি ভাষা, যা আমি সত্যি ভালো জানি) অনুবাদের ক্ষেত্রে আরও নতুন নতুন সম্ভাবনা রয়েছে। চীনা ভাষার ক্ষেত্রে অন্য কোনো সম্ভাবনা নাই। কিন্তু প্রশ্নটা কিছুটা পরিবর্তন করে নিচ্ছি, অনুবাদ সব সময় মজার বিষয়, কারণ এটি আপনার নিজের ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি মাধ্যম। এখন অবশ্য আমাদের ভাষার চেয়ে ইংরেজি আরও স্থিতিশীল একটি ভাষা; বলতে হয় আমাদের নিজস্ব ভাষা সৃষ্টি করতে হবে, সব সময় আমরা লিখে যাচ্ছি।

এডমান্ড কিলি

পাউন্ড বলেছিলেন, অনুবাদ লেখকের জন্য অবিরাম নিজের ভাষা সম্পর্কে চেতনাকে তীক্ষ্ণ করার একটি উপায়, এবং তিনি তরুণ কবিদের পরামর্শ দিয়েছেন সুযোগ পেলেই অনুবাদ করতে।

জর্জ সেফেরিস

যদি আপনি এটির অতিচর্চা না করেন তবে এটি সব সময় প্রয়োজনীয়।


আমি বিশ্বাস করি না কোনো বিষয়বস্তু কিংবা কোনো চিত্রকল্প আমার কাজের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে।


এডমান্ড কিলি

আপনি যে ভাষায় লিখেন সে ভাষা গ্রিসের বাইরে খুব কম লোকই জানে। আমি ভাবছি এজন্য আপনার বিরক্তি আসে কি না যে আপনি আপনার দেশের বাইরের কাব্যজগতে প্রধানত অনুবাদের মাধ্যমে পরিচিত।

জর্জ সেফেরিস

প্রাপ্তির একটি ব্যাপার আছে। যেমন, প্রায় এক বছর আগে একজন আমেরিকান চিঠি লিখে আমাকে জানিয়েছিল : ‘সেফেরিস পাঠ করার জন্য আমি আধুনিক গ্রিক শিখেছি।’ আমি মনে করি তা ছিল এক বড় স্বীকৃতি। যিনি স্কুলে কোনো বিদেশি ভাষা শিখছেন তার চেয়েও এটি অনেক বেশি ব্যক্তিগত, তাই নয় কি? আমি অন্যদের বলতে শুনেছি : ‘আপনি জেনে থাকবেন, আমরা আপনার কবিতা পড়ে গ্রিক ভাষা শিখেছি।’ একটি বড় পুরস্কার বটে। এবং আমি অতঃপর যুক্ত করতে চাই, সম্ভবত অনেক বেশি-সংখ্যক পাঠক না পাওয়ার এই ব্যাপারটার মধ্যে ভালো কিছুও নিহিত আছে। আমি বোঝাতে চাই, এর মাধ্যমে আপনি একটি বিশেষ শিক্ষা লাভ করছেন, তা হলো, পৃথিবীতে বিপুল-সংখ্যক পাঠক পাওয়াটা সবচেয়ে বড় পুরস্কার হিশেবে বিবেচ্য নয়। আমি মনে করি, যদি মাত্র তিনজন লোক আমার লেখা পড়ে, আমি বোঝাতে চাই, সত্যিকারভাবে পড়ে, তাহলে এটাই যথেষ্ট। এটি আমাকে মনে করিয়ে দেয় হেনরি মেকক্সকে, আমি মাত্র একবারই ক্ষণিকের জন্য তাকে কাছে পেয়েছিলাম, আর তখন তার সাথে আমার কথোপকথন হয়েছিল। মিসর থেকে ফেরার পথে আথেন্সে তার যাত্রাবিরতি ছিল। তাকে বহনকারী জাহাজ পিরেইউসে নোঙর করেছিল। তখন তিনি কূলে এসেছিলেন শুধু এক্রোপলিস দেখার জন্য। সে সময় তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘প্রিয়বরেষুু, আপনি জানেন যার একজন মাত্র পাঠক তিনি লেখক পদবাচ্য নন। যার দুজন পাঠক, তিনিও লেখক পদবাচ্য নন। কিন্তু যার ‘‘তিনজন পাঠক’’ আছে তিনিই সত্যিকারের লেখক।’ আর ‘তিনজন পাঠক’ এমনভাবে তিনি উচ্চারণ করলেন যেন তিন মিলিয়ন পাঠকই বোঝালেন তিনি।

এডমান্ড কিলি

ইতঃপূর্বে আপনি বলেছিলেন যে গ্রিক ভাষায় ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি সমস্যা আছে। এটি এমনকিছু যা অধিকাংশ আমেরিকান পাঠক স্বভাবগতভাবে বোঝে না। আমাদের একটি ভাষা আছে। আমাদের সমস্যা হলো আমাদের কাছে যে ভাষা আছে তাকে সব সময় টেনে বড় করা যাতে করে এর মধ্যে নতুন শক্তি দেখা যায়। যখন আপনি একটি ভাষা প্রতিষ্ঠা বা সৃষ্টি করার কথা বলেন, আপনি কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন কিছু বোঝান।

জর্জ সেফেরিস

আমরা একাডেমিক কর্মকাণ্ডের দুর্যোগ পেয়েছি। লক্ষ করুন, আমি বাম এবং ডান উভয় দিক থেকে বুঝিয়েছি। শুরুতে আমরা অধ্যাপকদের তৎপরতা দেখেছি যারা আমাদের রক্ত-মাংসের ভাষাকে বিমূর্ত কিছুতে রূপান্তর করতে চেয়েছে যাতে করে বিশুদ্ধ ভাষার ধারণার মতো কিছু পাওয়া যায়। অপর পক্ষে, আমরা আমাদের জনপ্রিয় যে কথ্য ভাষা যাকে আমরা দেমতিকে বলি, সে ভাষার জন্য লড়াই করেছি। কিন্তু এই ঐতিহ্য―পেশাগত ঐতিহ্য এতই প্রবল ছিল যে, এক ধরনের একাডেমিক মন সক্রিয়ভাবে লড়াই করেছে শুদ্ধিবাদী ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষা উভয়ের জন্য। এগিয়ে যাওয়ার সেরা উপায় হলো সব  ধরনের একাডেমিক তৎপরতা ভুলে যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ ক্রিটীয় পুনর্জাগরণকে আমি খুবই প্রশংসা করি। সেই কালে আপনি খুঁজে পাবেন একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতা―দশ সহস্র পঙ্‌ক্তির এক বিশাল কবিতা, যেখানে চাপ ও প্রয়াসের লেশমাত্র নেই, ভাষাটি সম্পূর্ণ সাবলীলভাবে কাজ করছে, যার মধ্যে শিখতে হবে এমন কোনো জাজ্বল্যমান প্রবণতা নেই।

এডমান্ড কিলি

এটি আগ্রহোদ্দীপক যে আপনি অনায়াসসাধ্য সাবলীল কবিতাকে আদর্শ হিশেবে নিচ্ছেন, কারণ আমার মনে আছে, অন্য একটি প্রেক্ষাপটে আপনি বলেছেন যে, নিজেকে প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তি তার স্টাইল বা শৈলী নিয়ে জটিলতার মধ্যে পড়ে।

জর্জ সেফেরিস

মাকরিয়ানিস যিনি তার পঁয়ত্রিশ বছর পূর্ণ না হওয়া অবধি লিখতে কিংবা পড়তে শিখেন নি, তার সম্পর্কে বক্তৃতায় আমি সেই কথাটি বলেছিলাম। আপনি যখন তার পাণ্ডুলিপি দেখবেন তখন মনে হবে এটি একটি দেয়ালের মতো। মনে হবে পাথর দিয়ে তৈরি দেয়াল, পাথরগুলো একটির উপর আরেকটি বসানো। এটি বড় অদ্ভুত। উদাহরণস্বরূপ তিনি যতিচিহ্ন মোটেও ব্যবহার করেন না। কোনো প্যারাগ্রাফ ব্যবহার করেন না। কোনো কিছুই না। এটি এভাবেই রচিত। এবং আপনি দেখবেন যে প্রতিটি শব্দ আরেকটি শব্দের সাথে যুক্ত যেন একটি পাথরের উপর আরেকটি পাথর বসানো। আমি বোঝাতে চাই, যে কোনো ক্ষেত্রেই, যখন আপনি সত্যি কিছু অনুভব করেন, আপনি তা প্রকাশের ক্ষেত্রে সমস্যা বোধ করবেন। এবং সেটিই সর্বোপরি আপনার স্টাইল গঠন করে দেবে।

এডমান্ড কিলি

নিজস্ব শৈলী গঠনে আপনি কী কী সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন?

জর্জ সেফেরিস

সেটি আরেক কাহিনি। যৌবনে আমি গ্রিক ভাষা নিয়ে যথেষ্ট কাজ করেছি। নির্ঘণ্ট, পুরানো বই, মধ্যযুগীয় বই এবং এ জাতীয় বিষয় নিয়ে। কিন্তু শুধু পাঠ করতে গিয়ে যে অসুবিধায় পড়েছি তা নয়, এগুলো ভুলে যাওয়া ও স্বাভাবিক হওয়াও ছিল কঠিন কাজ। আমি জানি না, সম্ভবত স্বাভাবিক হতে পারার আশীর্বাদ আমার উপর ছিল। এটি অন্যদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।…

এডমান্ড কিলি

আমি জানি আপনি সবসময় মনে করেছেন, স্টাইলের ক্ষেত্রে পরিচিতিবোধ আনার চেষ্টা করা একজন কবির জন্য প্রথম করণীয় কাজ। মনে হয়, এটি আপনার পূর্বসূরিদের মধ্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান ধারা থেকে ভিন্নতর, অন্ততপক্ষে পালামাস ও সিকেলিয়োনেস-এর অনুসৃত ধারা থেকে।

জর্জ সেফেরিস

সেটি সম্ভবত স্থানিক বৈশিষ্ট্য। আমার পেশাগত জীবনের শুরুতে কাজ করতে গিয়ে আমি অনুভব করেছিলাম যে, গ্রিসের জনগণ অতিমাত্রায় বাগাড়ম্বরপূর্ণ। এবং আমি এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। এটাই ছিল আমার উপলব্ধি। এবং আমি এর বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছি। উদাহরণ দিতে পারি, শব্দ, বিশেষণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ করে যৌগিক বিশেষণের ক্ষেত্রে, সেগুলো আমি পরিহার করতাম। আপনি জানেন, কিছু জিনিস পরিহার করার ক্ষেত্রে আমি আমার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। প্রকাশের ক্ষেত্রে আমার আগ্রহ ভাষার রঙের প্রতি খুব বেশি ছিল না, যা গ্রিকদের মধ্যে প্রচুর পাবেন, তবে আমার আগ্রহ সর্বোপরি সারবস্তুর প্রতি, আর নির্যাসটুকু প্রকাশের ক্ষেত্রে আপনাকে আপনার বিষয়ের ব্যবহারে পরিমিত হতে হবে। আপনার মনে আছে, ভালেরি বলেছেন, গীতিময়তা হলো সর্বোপরি ’আহা’ আশ্চর্যবোধের প্রকাশ। আমার জন্য ’আহা-ই’ যথেষ্ট। আমি কখনও আশ্চর্যবোধের ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা করি না।

এডমান্ড কিলি

আমি স্টাইল বা শৈলী বিষয়টিকে ভাষা পরিমিতভাবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া হিশেবে অনুসরণ করতে চাই। আপনি কি একমত হবেন যে আপনার কাজের একটা ধারা আছে যেখানে রয়েছে স্ট্রফি এবং তাকে যা কিছুই অনুসরণ করেছে তার মাঝামাঝি অধিকতর সংহত প্রকাশ।

জর্জ সেফেরিস

অবশ্যই। এটি যতটা না রচনাশৈলীর উন্নয়ন তার চেয়েও বেশি হলো বিবর্তন। সবকিছুই বিবর্তিত হয়। আমি বোঝাতে চাই, তাকে বিবর্তিত হতে হবে যিনি নতুন কিছু দেখতে চাইবেন। তাকে অন্য বিষয়গুলো দেখতে হবে এবং এগুলো প্রকাশ করতে হবে। অবশ্যই এখানে একটা বিবর্তন আছে, কিন্তু আমি একে উদ্ধৃতি চিহ্নযুক্ত ’উন্নয়ন’ হিশেবে দেখি না। যদি আমার সামনে অনেক বছর থাকত আমি সম্ভবত অন্যভাবে লিখতাম, এমনকি ভিন্ন স্টাইলে। আমি সম্ভবত আমার প্রথাগত চরণযুক্ত কিংবা অন্ত্যমিলযুক্ত ভাষা লিখতাম। কবিতায় আপনি প্রকাশকে সজীব রাখার জন্য সময়ে সময়ে বিষয়ের ভিত্তি পরিবর্তন করেন। যে মূল বিষয় আপনি কবিতায় খুঁজছেন তা হলো পুরানো, বহুল ব্যবহৃত প্রকাশগুলো পরিহার করা, সেটাই হলো মূল সমস্যা।

এডমান্ড কিলি

গদ্যশৈলী সৃষ্টি করার সমস্যাটি বলবেন কি? গ্রিসে হাতে গোনা কবিদের মধ্যে আপনি একজন যিনি গদ্য সমালোচনা-ভাষার পাশাপাশি কবিতা-সমালোচনার ভাষাতেও জোরালো প্রভাব ফেলেছেন। একটি জীবন্ত অথচ সযত্ন গদ্যশৈলী সৃষ্টি শুরু থেকেই আপনার সংগ্রামের অংশ হয়েছে।

জর্জ সেফেরিস

হ্যাঁ, কিন্তু আপনি জানেন, আমার সংগ্রাম সব সময় পরিমিত প্রকাশের জন্য। আমার প্রকাশের মূলেই রয়েছে এটি এবং অবশ্যই গদ্যে তা অধিক স্পষ্ট, আমি বাক্‌সংযমের বিষয়টি বোঝাচ্ছি।

এডমান্ড কিলি

টেপ মেশিনটি রেকর্ড করা বন্ধ করে দিয়েছে মনে হয়। কিছু বলুন এবং দেখি  তো এটি এখনও ঠিকমতো কাজ করছে কি না।

জর্জ সেফেরিস

ওয়ালেস স্টিভেনস একটি বিমা কোম্পানিতে ছিলেন।

এডমান্ড কিলি

আশা করি এটি আমাদের সাথে কিছুক্ষণ চলবে। আপনার মন্তব্যগুলোর একটি আমাকে আকৃষ্ট করেছে যা হচ্ছে কবিতা ও জনসেবার মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি, আমি মনে করি আপনি বুঝিয়েছেন কবির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সে ধরনের কাজ না নেওয়া যা কবি হওয়ার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।

জর্জ সেফেরিস

আমি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়টি বলি নি। আমি আসলেই এটা জানি না, কারণ আমি অন্যদের জন্য কথা বলতে পারি না। তবে অন্তত আমার জন্য আমি মনে করি, লেখালেখি করতে হয় এমন কাজ পেশা হিশেবে আমার না নেওয়ার সুবিধা আছে, কারণ আমি আমার নোটবুক কিংবা কবিতার বইয়ে লিখি। উদাহরণ দিই, আমি প্রফেসর নই কিংবা শিক্ষক নই কিংবা সাংবাদিকও নই। আমি বরং অন্য পেশা পছন্দ করি।


প্রিয় এলিয়ট, আমার মনে হচ্ছে আমি আমার পেশায় ভীষণ বিরক্ত হয়ে পড়েছি এবং আমি এসব ছেড়ে দেবো।


এডমান্ড কিলি

আপনার পেশাগত জীবনে এমন কিছু ঘটেছে কি না, অর্থাৎ কূটনীতিক হিশেবে আপনার অভিজ্ঞতা, যা কোনোভাবে আপনার কবিতার চিত্রকল্পকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে কিংবা প্রকাশের জন্য আপনার নির্বাচিত বিশেষ বিষয়সমূহের উপর প্রভাব ফেলতে পারে?

জর্জ সেফেরিস

আমি বিশ্বাস করি না কোনো বিষয়বস্তু কিংবা কোনো চিত্রকল্প আমার কাজের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে, যদিও আমি বলতে পারি―আপনি কিভাবে এটি অনুবাদ করেছেন : ‘লাস্ট স্টপ’-এর চরণগুলো : জনতার পাপে আত্মাসমূহ ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছিল, প্রতিটি আত্মা খাঁচায় বন্দি পাখির মতো কাজে নিয়োজিত ছিল। আমি বোঝাতে চাই যে, এটি ছিল আমি সরাসরি জনসেবা থেকে নিয়েছি এমন একটি প্রতিচ্ছবি। কিন্তু আমি তা-ও অনুভব করতে পারতাম যদি আমি কূটনৈতিক সার্ভিসে না-ও থাকতাম। কিন্তু এটি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, আমি এমন একটি কাজে নিয়োজিত ছিলাম যা আমার সৃজনশীল কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। এবং অন্য বিষয়টি হলো আমি কিভাবে ব্যাখ্যা করব―আমি সাহিত্য গোত্রভুক্ত মডেল নিয়ে কাজ করতে বাধ্য ছিলাম না। অবশ্য সেই পেশায় ভোগান্তি আছে। যা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে তা হচ্ছে যথেষ্ট সময় না পাওয়া। যদিও অন্যরা আপনাকে বলতে পারে যে, সময় না পাওয়াটা তুলনামূলকভাবে ভালো কারণ অবচেতন অবস্থাই কাব্যিক কাজ সম্পাদন করছে। এটিই হলো, টম এলিয়টের দৃষ্টিভঙ্গি। আমার মনে পড়ে একবার যখন আমি লন্ডন থেকে বৈরুতে বদলি হয়েছিলাম (লন্ডনে মাত্র দেড় বছর কাজ করার পরে), আমি তাকে বলেছিলাম, ‘প্রিয় এলিয়ট, আমার মনে হচ্ছে আমি আমার পেশায় ভীষণ বিরক্ত হয়ে পড়েছি এবং আমি এসব ছেড়ে দেবো।’ আমার মনে আছে তিনি বলেছিলেন, ‘সাবধান হোন, যদি তা করে থাকেন তবে সাবধান হোন’ এবং অতঃপর তিনি অবচেতন, কবিতার অবচেতন ক্রিয়াশীলতার কথাটি বলেছিলেন। এবং আমি তাকে বললাম, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আমার যদি একটি কাজ থাকে, একটি দাপ্তরিক কাজ যা আমার মগ্নচৈতন্যে হস্তক্ষেপ করছে, তাহলে সেই কাজটি করতে আমি ইচ্ছুক নই। আমি বোঝাতে চাই আমি একজন কাঠমিস্ত্রি হতে চাই এবং যে কোনো স্থানে কাজ করতে চাই যেখানে আমার মগ্নচৈতন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে যে কোনো কাজ করতে সক্ষম, সেটি নৃত্য হোক বা অন্য কিছু হোক।’ এবং আমি আরও বললাম, ‘আপনি জানেন, আমি আপনাকে বলতে পারি কখন আমার সামাজিক জীবন আমার মগ্নচৈতন্যে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করল। এটি ঘটেছিল ’৪০-এর সেপ্টেম্বরে ইতালীয়দের সাথে যুদ্ধের প্রাক্কালে, যখন আমি রাজনৈতিক স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। অতঃপর আমি ভালোভাবেই জেনেছি যে, আমার অবচেতন সত্তা আমার দাপ্তরিক কাজের দ্বারা নিপীড়িত হচ্ছে। ‘‘স্বপ্নের মধ্যেই দায়িত্বের শুরু’’।’

এডমান্ড কিলি

আপনি একবার কবিতা ও রাজনীতির মধ্যে যোগসূত্র নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।

জর্জ সেফেরিস

আমি প্রপাগান্ডা লেখা কিংবা ‘ফরমায়েসি’ লেখা বলতে কী বোঝাচ্ছি কিংবা আমাদের সময়ের এ জাতীয় লেখাকে আপনি যে নামেই ডাকুন না কেন সে সম্পর্কে আমি যা বলেছি আপনি তা-ই বোঝাচ্ছেন। আমি বিশ্বাস করি যে, অনুভব-সংশ্লিষ্ট বাস্তব কোনো কিছু অনুভব হিশেবেই ব্যাখ্যাত হওয়া উচিত। আমি মনে করি না যে, ইস্কিলাস যন্ত্র্রণাকাতর পার্সিয়ানদের কিংবা দুঃসাহসী জারেক্সেস কিংবা দারিয়াসের ভূত প্রমুখকে মঞ্চে উপস্থাপন করে কোনো প্রপাগান্ডা নাটক করছিলেন। পক্ষান্তরে, এর মধ্যে একটা মানবিক আবেগ ছিল, তার শত্রুদের জন্য। এমন নয় যে, গ্রিকদের সালামিসের যুদ্ধ জয়ে তিনি আনন্দিত হন নি। এমনকি তখনও তিনি দেখিয়েছেন যে জারেক্লেসের পরাজয় ছিল স্বর্গ থেকে আরোপিত শাস্তি। দম্ভের জন্য সাজা যা জেরেক্সেস সমুদ্রকে কশাঘাত করে অর্জন করেছিল। সমুদ্রকে কশাঘাত করে যেহেতু সে দাম্ভিকতার পরিচয় দিয়েছিল সেহেতু সালামিসের যুদ্ধে সমুদ্র সমুচিত শাস্তিই দিয়েছিল।

এডমান্ড কিলি

জাতীয় সীমারেখায় কবিতাকে তুলনা করা সম্ভব কি? কিংবা আমরা কি সর্বদাই আবশ্যিকভাবে একটি মাত্র ঐতিহ্যের মধ্যে থেকে গুণগত তুলনা করে থাকি?

জর্জ সেফেরিস

কবিতে কবিতে তুলনা করার বিষয়ে আমি এক প্রকার অনাগ্রহ বোধ করি। এটা খুবই কঠিন কাজ। এমনকি একই ঐতিহ্যের অনুসারী হলেও। উদাহরণস্বরূপ : দান্তে এবং আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের মধ্যে তুলনার চেষ্টা করুন, আমি জানি না তাতে কী প্রাপ্তি ঘটবে। কিংবা, ফরাসি ঐতিহ্যে, আপনি কিভাবে রাসিন ও ভিক্তর উগোর মধ্যে তুলনা করবেন? আপনাকে অনেক গভীরে যেতে হবে, ঐতিহ্যের তলদেশ পর্যন্ত যেতে হবে যাতে করে একটি সাধারণ ভিত্তি খুঁজে পেতে পারেন যেখানে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ তুলনা হতে পারে। পক্ষান্তরে, উদাহরণস্বরূপ, আমি নিজে আমার স্টকহোম ভ্রমণ বক্তৃতায় ইয়েটসকে ব্যবহার করেছিলাম কারণ আমি স্টকহোম গমনের মাত্র কয়েক মাস আগে বাউন্টি অব সুইডেন পড়ছিলাম যেখানে তিনি তার নোবেল পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার সব ঘটনা বর্ণনা করছেন : তার স্টকহোম ভ্রমণ, পুরস্কার-প্রদান অনুষ্ঠান এবং সব কিছুই। এবং আমি মানুষ হিশেবে তার সাথে এক ধরনের সম্পর্ক অনুভব করেছিলাম―কবি হিশেবে নয়, একজন মানুষ হিশেবে কারণ ইয়েটস একটি সমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্যবিশিষ্ট দেশের অধিবাসী ছিলেন, যদিও দেশটিতে রাজনৈতিক গোলযোগ ছিল। প্রসঙ্গত, তার মধ্যে একজন গণমানুষের কবির উদাহরণ মেলে, তিনি প্রপাগান্ডা লেখেন নি।  উদাহরণস্বরূপ, তিনি যখন কবিতা লেখেন একজন আইরিশ বৈমানিককে নিয়ে তখনও মোটেও তা প্রপাগান্ডা না : যাদের সাথে আমি যুদ্ধে লিপ্ত তাদের আমি ঘৃণা করি না,  ইত্যাদি। কিংবা তিনি লিখেন কবিতা  ‘দ্বিতীয় আগমন’, সেটিও  প্রপাগান্ডা নয় : কবিতা  ’কেন্দ্র ধারণ করতে পারে না’ ইত্যাদিও, যেটির শুরু মূলত আইরিশ রাজনৈতিক জীবনের কোথাও থেকে, কিন্তু এর অনেক গভীরতা এবং এটাই হলো আসল বিষয়, আমি মনে করি।

এডমান্ড কিলি

আপনি আপনার লেখায় ‘দ্য কিং অব আসিনি’ কবিতাটি সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন যে সেই বিশেষ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লেখার পদ্ধতি ঠিক করতে আপনি দু-বছর সময় নিয়েছেন এবং অতঃপর কোনো এক-সময় সেই কবিতার জন্য নোটগুলো এক বন্ধুকে দিয়ে আপনি এক দীর্ঘ সন্ধ্যায় চূড়ান্ত খসড়াটি সম্পন্ন করেছিলেন। এলিঅট ইঙ্গিত করেছেন যে আপনি কবিতাটি শেষ করেছিলেন (রাত ১০টা থেকে ভোর তিনটার মধ্যে) ঠিক এই কারণে যে আপনার সামনে আপনার নোটগুলো ছিল না।

জর্জ সেফেরিস

আমার কোনো নোট ছিল না। এবং তিনি সম্ভবত ঠিকই বলেছেন। আমি জানি না। এ ক্ষেত্রে, আমার বাড়িতে আমার সব কাগজপত্র ও আমার বইগুলো আছে। এবং আমি ভেবে বিস্মিত হই, এটি আমার জন্য সহায়ক নাকি সহায়ক নয়, কোনো কাগজপত্র কিংবা কোনো বইপত্র ছাড়া ফাঁকা লেখার ডেস্ক থাকাটা অপেক্ষাকৃত ভালো নয় কি না, যেখানে প্রতিদিন আপনি নিয়মিত সময়ে বসতে পারেন।

এডমান্ড কিলি

আপনি কি সচরাচর কবিতা লেখার আগে কবিতাটির অভিজ্ঞতা নোট করেন?

জর্জ সেফেরিস

ও, অনেক ধরনের পথ আছে। মাঝে মাঝে  করি, মাঝে মাঝে করি না। কিছু বিষয় আছে আপনাকে মনে রাখতে হবে এবং আমাকে ওগুলো কোথাও লিখে রাখতে হবে, অতএব, অবশ্যই আমি নোট করি। উদাহরণস্বরূপ, একটি কবিতা আছে যেখানে আমি ক্রনোগ্রাফার মাখাইরাসকে উল্লেখ করেছি, যেখানে ব্যভিচারের দানবটি সম্পর্কে সেই গল্পটির উল্লেখ না করাটা অসম্ভব ছিল।

এডমান্ড কিলি

আমি নোট বলতে বুঝাই নি যখন আপনার মনের মধ্যে কবিতাটি লেখা হয়ে গেছে, বরং সেই অভিজ্ঞতাসমূহকে নিয়ে নোট রাখা বুঝিয়েছি যা কার্যত কবিতার রূপ নিচ্ছে।

জর্জ সেফেরিস

না,  আমি তা করি না, যখন আমি নোট করি, তখন বোঝাই লেখার উপকরণ, নোট যেগুলো প্রয়োজন, কারণ সেগুলো বর্ণনামূলক। এবং এমন নোটও আছে সেগুলোতে আছে ভাবনা, কবিতা লেখার ভাবনা। যেমন কাব্যিক প্রকাশ, কাব্যিক উচ্চারণসমূহ, আমি নোট বলতে সে ধরনের নোটকে বোঝাই। যদি আপনার সম্পর্কে আমাকে একটি কবিতা লিখতে হয়, আমি নোট করতাম এভাবে যে ‘মাইক অনেক বছর ধরে ধূমপান থেকে বিরত আছে।’ আমি বোঝাতে চাই যদি কোনো কিছু গ্রিক ভাষায় আমার কানে ভালো শোনায়, আমি তা লিখতাম। ওটাই আসল কথা―সে-সব বিষয় যেগুলোর অন্যের কাছে মূল্য নেই। এগুলোকেই আমি কাব্যিক নোট বলি। মাঝে মধ্যে আমি সেগুলো সম্পূর্ণ অবহেলা করি, এবং মাঝে-মধ্যে আমি তাদের কাছে ফিরে যাই। কখনও বা সেগুলো যখন সম্পূর্ণ বিস্মৃত হই, তখন এক ঝলক ওগুলো দেখে আমি বলি, ‘ও, ওই কবিতাটা বরং ভালো ছিল’, যদিও সাধারণ লোকের কাছে এগুলোর কোনো অর্থ নেই। তথাপি সেগুলো আমাকে একটা বিশেষ অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় যা ইতোমধ্যে আমার মনে ক্রিয়াশীল রয়েছে, সম্প্রসারিত হচ্ছে, একটা অবয়ব তৈরি করছে।

এডমান্ড কিলি

আপনি কি এসব নোট সংরক্ষণ করেন, নাকি ধ্বংস করে ফেলেন?

জর্জ সেফেরিস

ও, আমি অনেকগুলো ধ্বংস করে ফেলি। কয়েক মাস আগে এক্ষেত্রে হেলেন জাতীয় একজন লোক নোটের ছবি তোলায় আগ্রহী হয়েছিলেন। এবং আমার ধারণা হয়েছিল যে, আমি দ্য চিসটার্ন এর উপর লেখা আমার নোটগুলো রেখে দিয়েছিলাম। আমার সব নথিতে আমি সেগুলো খুঁজেছিলাম, অতঃপর আমার কাছে প্রতীয়মান হলো যে, আমি সেগুলো ধ্বংস করে ফেলেছি। শুধু ‘নোটস ফর আ উইক’টি আমি খুঁজে পেয়েছিলাম যা অতি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে, অর্থাৎ সেই নোটগুলোর মধ্য থেকে হারানো দুটো কবিতা।

এডমান্ড কিলি

যেভাবেই হোক আমি এ ব্যাপারে দুঃখিত, কারণ আমি মনে করি ‘দ্য চিসটার্ন’ এমন একটি কবিতা যা তার বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়েছে এবং সেক্ষেত্রে নোটগুলো সহায়ক হতে পারত, কোনো না কোনোভাবে আমার জন্য সহায়ক হতে পারত।

জর্জ সেফেরিস

এ নিয়ে অভিযোগ করবেন না। ওগুলো কবিতাটিকে আরও দুর্বোধ্য করতে পারত। উদাহরণস্বরূপ, কাব্যে আমার বিবর্তনের সাধারণ ধারণাটি হচ্ছে: ‘আহ, আপনি দেখেন, সেফেরিস নিয়মিত পঙ্‌ক্তি, অন্ত্যমিল ও কঠিন রীতিসিদ্ধ পদ্যময়তা দিয়ে শুরু করেছিলেন এবং অতঃপর মুক্তছন্দের দিকে ধাবিত হলেন’, যখন আমি আমার নোট প্রত্যক্ষ করি, আমি দেখি যে, স্ট্রফি গ্রন্থের প্রধান কবিতা ‘এরোতিকোস লোগোস’ অত্যন্ত কঠিন রীতিসিদ্ধ পদ্যময়তা দিয়ে লেখা হয়েছে, কিন্তু আমার নোটগুলো বলে যে, এই কবিতাটিও মুক্তছন্দে লেখা হয়েছে। আমি প্রথম দিকের কিছু খসড়া খুঁজে পেয়েছি।

এডমান্ড কিলি

আপনি কি এগুলো প্রকাশের বিষয়টি কখনও ভেবেছেন?

জর্জ সেফেরিস

ঈশ্বর সাক্ষী, না।

 

দ্বিতীয় কিস্তির লিংক

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা: লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব ( ২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২), তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪);

প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬), অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯),মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫);

অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪)।

ই-মেইল : kumar.4585@yahoo.com
কুমার চক্রবর্তী