হোম অনুবাদ চোনিং দর্জি ও তার কবিতা

চোনিং দর্জি ও তার কবিতা

চোনিং দর্জি ও তার কবিতা
557
0

চোনিংকে একঅর্থে মস্ত এক প্রহেলিকা বলা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার কবিতা অনুবাদের কাজ করতে গিয়ে এক পর্যায়ে ভুটানের সাম্প্রতিক কবিতাচর্চায় গিয়ে পৌঁছাই। সেখানেই চোনিংয়ের কবিতার সন্ধান মেলে। পরে গুগল-সাম্রাজ্যের কোথাও ঠিকুজি না-পেয়ে তাকে অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা ভিন্নদিকে মোড় নেয়। অনেক চোনিং ও কতক দর্জি পেরিয়ে ভুতুড়ে এক ফেসবুক প্রোফাইলে কাছাকাছি একজনের খোঁজ পাওয়ায় অভিভূত হন অনুবাদক। এরপর নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেন চোনিং। কিন্তু নিজেকে প্রকাশ করায় তার সচেষ্ট অনীহার দিকটি বর্তমান অনুবাদকের কাছে যথেষ্ট বিস্ময় হাজির করতে সক্ষম হয়। লেখালেখি ও প্রাসঙ্গিক তথ্য জানতে গেলে একের পর এক সন্দেহের প্রকাশ ঘটাতে শুরু করেন। একেকটা জিজ্ঞাসার জবাব দিতে থাকেন অত্যন্ত সতর্ক ভঙ্গিতে, এক-দুই শব্দে। এমনকি, সবটা খুলে বলার পরও।

ভুটানে তার কবিতার সিরিয়াস পাঠক নেই বলে একদিকে অনুতাপ, অন্যদিকে বাংলাদেশে তার কবিতা অনূদিত হচ্ছে জেনেও বিকারহীন—চোনিং এমনই রহস্য আর এতটাই জটিল যে, একপর্যায়ে স্বপ্নে আবির্ভাব ঘটে তার। পুরোনো দিনের ডায়ালফোনে তাকে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু সেখানেও ব্যস্ত এ কবি পরে কথা বলবেন বলে সেদিনের মতো লাইন বিচ্ছিন্ন করেন। এভাবে তাকে অল্পবিস্তর জানার চেষ্টা বাস্তবতার গণ্ডি অতিক্রম করে পরাবাস্তব এক সাধনায় পর্যবসিত হয়। দিন চলে যায় মাসের দিকে। অবশেষে জানা যায় কিছু তথ্য আর সামান্য পরিচয়।

চোনিং দর্জি পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। জন্ম ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর; ভুটানের ক্যাংলুং ট্রেশিগ্যাং-এ। লেখালেখির পাশাপাশি গান গাওয়া ও ফুটবল খেলা পছন্দ করেন।

বয়সে তরুণ হলেও তার কবিতা মানুষের শাশ্বত জীবন ও যাপনের নানান দিকের ওপর আলোকপাত করে, প্রতীকায়িত করে অপরাপর জৈব ও বস্তুবিশ্বের সাথে। এই প্রতিতুলনা ও ছোট-ছোট ভাবনাগুলোকে এক অর্থে এপিগ্রাম বা অ্যাফোরিজম বলা যায়। আর এ কারণে, তার লেখা গভীর কোনো চিন্তা উদ্‌গীরণ না-করলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ভুটানে কবিতাচর্চা অতটা বিকশিত নয়। ইংরেজিতে তা আরো কম। পত্রপত্রিকায় ইংরেজি কবিতা প্রকাশিত হয় না বললেই চলে। তাই চোনিংসহ অন্যরা ‘পোয়েট্রি স্যুপ’ নামের ব্লগজিনে লেখালেখি করেন। বর্তমান চারটি অনুবাদ-কবিতার উৎসও একই।


পাখি

❑❑

যে পাখি পাহাড়ের গায়ে বসে থাকে
সে পৃথিবীর নীল আকাশ দেখতে পায়
সে নিজের উত্থান-পতন দেখে
এক এক করে দেখতে থাকে
অনেককিছুই, অনেকবার

যে পাখি কাকের পেছনে বসে থাকে
সে জীবনভর অন্যের পেছনে
নিজের স্বপ্ন রচনা করে চলে
সে জানে না কোন প্রশ্নের কী উত্তর
কিন্তু অন্য মানুষের খামতির কথা
খুব ভালো করে জানে


স্বপ্ন ও জীবন

❑❑

জীবনের সাথে আমার স্বপ্নে দেখা
পাশাপাশি শুয়েছিল আবেগ
স্বপ্নে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি
তার পাশেই জেগেছিল খেয়াল

স্বপ্নের ভেতর ঢুকে পড়ে লোভ আর লালসা
আমার শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হয় বিষ
তবু জীবন তন্ন তন্ন করে সত্যকে খুঁজে ফেরে
আমাদেরই ক্ষুদ্র সব জীবনছবির ভেতর

কিন্তু স্বপ্নই জেগে থাকে জীবনে
বাস্তবে থাকে সে ঘুমের ভেতর
গভীরে গিয়ে মানুষ নিজেকে হারায়
জীবনের কেন্দ্রে জেগে থাকে কবি


মানুষ

❑❑

জলের তরঙ্গে ভাসা জীবন—
মনে হয় মাধুর্য ও করুণার নদী
কখনো মনে হয় জীবন এক ঘোর তমসা
অথচ ভুল ভাবনায় কত দিন কেটে গেল

মানুষের হৃদয় খুবই নাজুক প্রকৃতির
রক্তমাংসে গড়া মানুষও।
অথচ লোকে শক্তির বড়াই করে
এরচেয়ে তামাশা আর হয় না


পরিবর্তন

❑❑

সময় বয়ে যায়
দিনের পরে রাত আসে
রাত শেষে দিন
মানুষের কোনোকিছুই
কখনো একরকম লাগে না

হয়তো ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই
মানুষের এতরকম ভেদ
একরকম জিনিসের দিকে
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা
হয়তো তার ভালো লাগে নি

মাহবুব অনিন্দ্য

জন্ম ০১ ডিসেম্বর, ১৯৮৪; পাটেশ্বরী, কুড়িগ্রাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ২০০৯ থেকে সেখানেই নিয়োজিত আছেন শিক্ষকতায়।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—
ঘাসফুল অপেরা [চৈতন্য, ২০১৬]
অপার কলিংবেল [বেহুলাবাংলা, ২০১৮]

ই-মেইল : mahbubanindo@gmail.com

Latest posts by মাহবুব অনিন্দ্য (see all)