হোম অনুবাদ চার্লস সিমিক-এর কবিতা

চার্লস সিমিক-এর কবিতা

চার্লস সিমিক-এর কবিতা
1.21K
0

চার্লস সিমিক : তাকে মনে করা হয় আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ও মৌলিক কবি। যদিও সিমিকের জন্ম যুগোশ্লাভিয়ার বেলগ্রেডে ১৯৩৮ সালে। শৈশব ও কৈশোরের বড় একটা অংশ কেটেছে সেখানেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি, সোভিয়েত উত্থান, যুগোশ্লাভিয়ায় লাল বাহিনীর হস্তক্ষেপ, একাধিকবার বাবা-মা’র সাথে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানো, অনিশ্চিত রুদ্ধশ্বাস, গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে তার কবিতায়। সিমিক ঠাট্টা করে বলেন—’আমার ট্রাভেল এজেন্ট ছিলেন হিটলার আর স্ট্যালিন’। আজও সিমিকের কবিতায় যুদ্ধবিরোধী অবস্থান সুষ্পষ্ট।

ষোল বছর বয়সে অভিবাসী হিশেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা। তারপর সেখানেই উদ্দাম যৌবনের দিনগুলি। প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৫৯-এ। তখন সিমিকের বয়স ২১, পড়ছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি কলেজে। শেষ পর্যন্ত সিমিক গ্রাজুয়েশন করেন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, ১৯৬৬ সালে। সেই বছরেই বের হয় তার পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ ‘হোয়াট দ্য গ্রাস সেইস’। এরপর একে একে অর্ধশতাধিক গ্রন্থ রচনা আর কাব্যপ্রেমীদের মোহাবিষ্ট হয়ে উঠার গল্প।

কবিতার জন্য অসংখ্যবার পুরস্কৃত হয়েছেন দেশে-বিদেশে। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ডাজন্ট এন্ড’ গ্রন্থের জন্য ১৯৯০ সালে ঝুলিতে পুরেছেন পুলিৎজার প্রাইজ। ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশনের ‘জিনিয়াস গ্র্যান্ট’, ‘গ্রিফিন ইন্টারন্যাশনাল পোয়েট্রি প্রাইজ, ওয়ালস স্টিভেনস অ্যাওয়ার্ড’র মতো স্বীকৃতিগুলো জানান দেয় তার কবিতার গ্রহণযোগ্যতা ও নতুনত্বের।

কবিতার পাশাপাশি পেশাজীবনে অধ্যাপনার সাথে জড়িত চার্লস সিমিক। প্রায় ৩০ বছর ধরে ইউনিভার্সিটি অফ নিউ হ্যাম্পশায়ারে ইংরেজি সাহিত্য ও ক্রিয়েটিভ রাইটিং বিভাগে শিক্ষকতা করছেন তিনি। পাশাপাশি বিখ্যাত ফরাসি ম্যাগাজিন ‘প্যারিস রিভিউ’য়ের কবিতা বিষয়ক কো-এডিটর হিশেবে দায়িত্ব পালন করছেন চার্লস সিমিক।

চার্লস সিমিকের কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন কবি জাকির জাফরান


ছোট্ট পাখির সঙ্গে কথোপকথন


আজ ভোরের হৈ হুল্লোড়ের পর
তোমাদেরকে দেখতে একটিও উঁকি নয় এখন আর।
তোমরা কি আমার কাছে ক্ষমা চাইছ
পত্র-পল্লবের মধ্যে ঐখানে লুকিয়ে থেকে,
নাকি ক্ষণিকের জন্য ভারাক্রান্ত তোমাদের মস্তিষ্ক?

আমার অজ্ঞাত কিছু বিষয় তোমাদের ভালোই জানা :
উপেক্ষিত সূর্যমুখী বীজের উচিত চেঁচিয়ে ওঠা;
উঠোনে বিড়ালদের জট;
আর বিধবার গৃহ ত্যাগ করছে আগন্তুক,
বন্ধনহীন, বাঁকা বাঁকা দেঁতো হাসি পরিধান করে।

অথবা তুমি কি টের পেয়েছ ধরণীর খবর?
ভয়ানক নতুন কিছু যা আমি শুনি নি এখনও?
এমন সাহসী কে ছিল তোমাদের,
যে আমাকে সতর্ক করে—
এখন বিপন্ন আমাদের মধুর বিন্যাস?

বাচ্চারা রাস্তায় যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছে
একে অন্যের দিকে রাইফেল তাক করে
অভিনয় করছে মৃত্যুর।
ছোট্ট পাখিরা আমার, আমাকে এসব বলতে শোনে
ঘন পল্লবের মধ্যে
তোমরা কি লুকাচ্ছ তোমাদের সন্ত্রস্ত চেহারা?


কাঠের খেলনা



উজ্জ্বল রং করা ঘোড়াটির
ছিল ছেলেদের মতো মুখ
আর পায়ের তলায়
ছোট ছোট চারটি চাকা।

এবং মেঝেতে তাকে
টানবার জন্য
একটি লম্বা দড়ি,

সাবধান হওয়া উচিত

অপেক্ষমাণ আরেকটি দড়ি
যা কূটকৌশলে
পিছলে যেত
প্রতিটি প্রচেষ্টা থেকে।

২.
মা বললেন
টোকা দাও, সাড়া দেবে।

তাই চারটি সিঁড়ি বেয়ে
ভেতরে গেলাম আমি
নিঃশব্দে, অলক্ষ্যে।

আর খুঁজে পেলাম
ছোট্ট এক কাঠের খেলনা

অপস্রিয়মাণ দিবালোকে
ক্রমধাবমান শূন্যতায়
এখনও যা আমাকে আড়াল দেয়,
যেন আমি হাতে ধরে আছি চাবি
চির-রহস্যের দিকে।

৩.
কোথায় সেই হারানো ও খোঁজে পাওয়া বিভাগ,
সেই নীরব প্রবেশ,
অস্পষ্ট জীবনের কিছু পরিচ্ছন্ন মুহূর্তের
না-ছাপানো ছবিগুলো, কোথায়?

কোথায় সেই রক্তের ফোঁটা
কোথায় সেই পুঁচকে নখ—
নিচু হয়ে খেলনা স্পর্শের সময়
যা বিদ্ধ করেছে আমার আঙুল?

আর আমি ছুঁয়েছিলাম সে-খেলনার চোখ?

৪.
সন্ধ্যার আলো

আমাকে বানিয়ে দাও একটি রোববার
আমি আমার খেলনার জন্য
ছায়া খুঁজতে যাব।

আমার প্রিয় মুহূর্তগুলো দেখ—
রাস্তার একদম শেষপ্রান্তে
ধুলোমাখা দালানের
ঢালু সিঁড়িগুলো।

যেখানে আমি কথা বলি দেয়ালের সঙ্গে
আর বদ্ধ দরোজার সঙ্গে,
যেন তারা বুঝতে পারছে আমার কথাগুলো।

৫.
কাঠের খেলনাটি বসে আছে মনোরম,

না, তার চেয়েও শান্ত,

যেন-বা কোনও নীরব চলচ্চিত্রে
কোনও খলনায়কের
ভ্রু-পল্লবের শব্দের মতো

কেউ আমার পেছনে এসে কথা বলে।

Zakir Zafran

জাকির জাফরান

জন্ম ৪ আগস্ট ১৯৭৫, সিলেট।
ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : বিসিএস (প্রশাসন)।

প্রকাশিত বই :
সমুদ্রপৃষ্ঠা [কবিতা, ২০০৭, গদ্য পদ্য]
নদী এক জন্মান্ধ আয়না [কবিতা, ২০১৪, গদ্য পদ্য]
অপহৃত সূর্যাস্তমণ্ডলী [কবিতা, ২০১৫, চৈতন্য]

ই-মেইল : zzafranbd@gmail.com
Zakir Zafran