ঘড়ি

ঘড়ি
128
0
[খায়রি সালাবি মিশরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখক যার রচনার পরিমাণ বিপুল, পেয়েছেন ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা। ইতোমধ্যে তার ৬ খণ্ডে গল্পসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে। গল্পের পাশাপাশি একজন সফল ঔপন্যাসিকও তিনি। তার উপন্যাসকে মিশরের সাহিত্যে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বলে মনে করেন সমালোচকরা। পাশাপাশি ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা নিয়েও যেমন লিখেছেন তিনি, আছে সমালোচনামূলক বইও। অফ দ্য ইজিপশিয়ান স্ট্রিট উপন্যাস তাকে লেখক হিশেবে প্রকৃত পাঠকের কাছে নিয়ে আসে। তার লেখা পড়ে পাঠক চমকিত হয়। আপাত উপভোগ্য একটি লাইনের ভিতর পাঠক অনেক সময় আটকেও যায়, ভাষার এক নিজস্ব খেলা যেন খেলতে নামেন তিনি। পৃথিবীর বহু ভাষায় তার লেখা অনূদিত হয়েছে, এবং চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। সালাবির জন্ম মিশরের খার্ফ আল শেখ গ্রামে, ১৯৩৮ সালে; মারা গেছেন কায়রোয়, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১১ সালে, ৭৩ বছর বয়সে। সমালোচকেরা তার সম্পর্কে বলেন : বিভিন্ন শহর আর গ্রামগুলির অধিবাসীদেরকে তিনি তার ফিকশনে নতুন জীবন দিয়েছেন, মিশর যাদের কথা ভুলে গিয়েছিল। দ্য ইজিপশিয়ান স্ট্রিট, দ্য লজিং হাউস, দ্য টাইম-ট্রাভেলস অফ, দ্য ম্যান হু সোল্ড পিকলস অ্যান্ড সুইটস তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। অনূদিত গল্পটি নেয়া হয়েছে ডেইনস জনসন-ডেভিস সংগৃহীত ও অনূদিত ইংরেজি  অনুবাদ আন্ডার দ্য নেকেড স্কাই, শর্ট স্টোরিজ ফ্রম দ্য অ্যারাব ওয়ার্ল্ড বইটি থেকে।]

রাস্তার তুমুল হট্টগোল আর চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়া অদ্ভুত এক পরিবেশের ভিতর দিয়ে আমি হাঁটছিলাম, নিজেকে মনে হচ্ছিল সোলেমান পাশা কিংবা তার মতোই কেউ একজন যে একা একা হাঁটছে। প্রতিটি পদক্ষেপে আমি যেন মানবসভ্যতার বিপুল এক স্রোতকে এক পাশে সরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ বের করে নিচ্ছিলাম। কায়রোর নারীরা ছিল নগ্ন, আর তারা যেন শরীর থেকে কেরোসিনের গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছিল, পুরুষদের দেখে মনে হচ্ছিল তারা নারীদের শরীরের পেছনে লেগে থাকা সিলিন্ডার, যেন তাদের পাছা দিয়ে দ্রুত বেগে গ্যাস নির্গত হচ্ছে, তারা নারীদের অন্তর্বাসের ভিতর দলাপাকানো নোটগুলিকে গুঁজে দিচ্ছিল। আচমকা এই জনস্রোতের ভিতর আমি যেন আমার ভাইটিকে দেখতে পেলাম—ক্ষেতে কাজ করার সেই দীর্ঘ, ঢিলেঢালা, পেছনে টুপি লাগানো গালাবিয়া আর কার্ডিনাল ঘরে বসে থাকা বৃদ্ধ পোপের শাদা টুপি পরা। এই ভিড়ের ভিতরও তার কাঁধ, থাই আর বুক যেন আমার দিকে প্রসারিত করে রাখা। তাকে এখানে এই অবস্থায় দেখতে পেয়ে আমি আনন্দিত হলাম। দাঁড়িয়ে পড়ে এমনভাবে গলা আর ঘাড় চুলকোতে লাগলাম যেন অবশ্যই সে আমাকে দেখতে পায়।


আমি যখন লাশটির কাছ থেকে খানিকটা দূরে সরে দাঁড়িয়েছি, লোকেরা তখন তার চারপাশে চিরবিদায়ের প্রার্থনায় বসেছে। ঠিক তখনই আমি আমার ছোট ভাইটিকে দেখতে পেলাম যে এখনও যুদ্ধ থেকে ফিরে আসে নি


আর সেও ঠিক আমার মতোই তার গলা আর ঘাড়ে চুলকোতে শুরু করে দেয়। আমরা ভিড় ঠেলে যতই পরস্পরের কাছাকাছি হতে থাকি, আমার মনে হতে থাকে আমরা দুই ভাই আমাদের নিজস্ব পথেই নিজস্ব ভঙ্গিতেই এগিয়ে চলেছি। সে যা-ই হোক, আমরা দুজনেই যেন পরস্পরকে সম্ভাষণ করবার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। আমি তার দিকে যখন করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালাম, ভাইটিও তাই করল লোকের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থেকে, আর যখনই আমাদের হাতগুলি খুব দ্রুত পরস্পরকে স্পর্শ করল, মনে হলো যেন আমরা দুজন প্রীতি সম্ভাষণ জানাচ্ছি না, পরস্পরকে তিরস্কার করছি; অভিশাপ দিচ্ছি।

তারপর, জনস্রোতে আমি তাকে হারিয়ে ফেললাম। দেখতেই পেলাম না সে কোথায় হাওয়া হয়ে মিলিয়ে গেল। আর তখনি চমক ভাঙার মতো করে মনে পড়ল—ভাইটিকে আমি বহু বছর ধরে দেখি নি, আর আমার এটাও মনে পড়ে গেল যে, আমি তাকে ঘটনাবলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম। প্রশ্নগুলি যেন এখন নিজে নিজেই ভিড়ের লোকদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে দিল—আপনাদের মধ্যে কেউ কি আমার ছোট ভাইটি সম্পর্কে কিছু বলতে পারবেন যে ভাইটি যুদ্ধ থেকে ফিরে আর আসে নি… কিন্তু প্রশ্নগুলি মুখ ফোটে আর বের হলো না।

আর আচমকা নিজেকে আমি এক শবমিছিলের একজন হিশেবে আবিষ্কার করলাম। কাউকে জিজ্ঞেস করলাম মৃত ব্যক্তিটি কে ছিলেন, উত্তর পেলাম, কেউ যেন বলে দিল যে মৃত ব্যক্তিটি আমার বড় বোনের স্বামী, তিনি যুদ্ধেই মারা গিয়েছিলেন; আবার কেউ একজন যেন বলল—এই সংবাদটিও সবার এখন জানা হয়ে গিয়েছে। আমার কেবলই মনে হতে লাগল যে শবযাত্রার এই মিছিলে, আমার আশপাশে যারা হাঁটছিল, এই ঘটনাটির জন্য তারা সবাই আমাকেই দায়ী মনে করে দোষী সাব্যস্ত করবে, যদি কখনো তারা আমাকে একা কোথাও পেয়ে যায়। কিন্তু আমি তো কোনোভাবেই বুঝতে পারছি না আমাকে দোষী ভাববার কী আছে! মিছিলের সঙ্গে চলতে চলতে আমরা এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছলাম, মনে হলো জায়গাটি বিস্তৃত এক গোরস্তান, আর একটা বিশেষ চিহ্ন আমাকে বুঝে উঠতে সাহায্য করল যে আমার ধারণাটিই ঠিক—এই তো ঠিক এখানেই সেই প্রাচীন চিনার গাছটি দাঁড়িয়ে আছে, কালের সাক্ষী হয়ে—আমাদের গ্রামের গোরস্তানের একদম মাঝখানে।

আমি যখন লাশটির কাছ থেকে খানিকটা দূরে সরে দাঁড়িয়েছি, লোকেরা তখন তার চারপাশে চিরবিদায়ের প্রার্থনায় বসেছে। ঠিক তখনই আমি আমার ছোট ভাইটিকে দেখতে পেলাম যে এখনও যুদ্ধ থেকে ফিরে আসে নি, যার সম্পর্কে আমরা কোনো খবরই জোগাড় করতে পারি নি। ব্যর্থ হয়েছি। আমরা আমাদের সাধ্য মতো খবর জোগাড়ের চেষ্টা করেছি, বিভিন্ন জায়গায়। তার লম্বাটে মুখের গড়ন, সেই গড়নের প্রগাঢ় সৌন্দর্য এখনও দেখি ঠিক আগের মতোই আছে, যে-গড়নের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে, এমনকি তার স্নিগ্ধ হাসিটুকুও। সে একটি লম্বা ঢিলেঢালা গালাবিয়া পরেছিল, তার ওপর চাপিয়েছিল আর্মিদের বেল্ট। আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম, আর কাঁদতে লাগলাম।


শব-মিছিলটি হচ্ছে এক নীতিবান আত্মোৎসর্গকারীর মিছিল। এবং আমার ভিতরে তীব্র এক ঈর্ষাবোধও জেগে ওঠে, ঈর্ষাটিকে আমি অনুভব করতে থাকি যা এই লোকটির মৃত্যুর কারণে আমার ভিতরে জেগে উঠেছে।


যখনই তাকে বলতে গেলাম যে তার সঙ্গে আসলে কী ঘটেছে, তা খুঁজে বের করতে গিয়ে কী ভয়ানক একটা সময় অতিক্রম করেছি; অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছিল—আমার কথাগুলি শুনেই সে হেসে উঠল, যেমনটা সে প্রায়ই করত; হাসতে হাসতেই সে বলে—আমরা যেন এসব নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত না হই। এর মধ্যে শব-মিছিলটি গোরস্তানে ঢুকবার মুখে থেমে যায়। এ সময় লাশের কাছে থাকা শোকাকুল স্বজনদের দেখে মনে হয় তারা গভীর শ্রদ্ধায় নত, যেন তারা উথলে ওঠা শোকের এক একটা ধাক্কায় ভেঙে পড়ে যাবে—এতই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে তারা। যদিও আমরা সবাই এমন সব পরিবার থেকে এসেছি যেখানে আভিজাত্যের কারণে এমন শোক খুব কম করেই প্রকাশ করা হয়। আমি নিজেকে বলি—এ শব-মিছিলটি হচ্ছে এক নীতিবান আত্মোৎসর্গকারীর মিছিল। এবং আমার ভিতরে তীব্র এক ঈর্ষাবোধও জেগে ওঠে, ঈর্ষাটিকে আমি অনুভব করতে থাকি যা এই লোকটির মৃত্যুর কারণে আমার ভিতরে জেগে উঠেছে।

হঠাৎ যেন নতুন এক আবিষ্কারের মতো আমি দেখতে পেলাম ড. হেনরি কিসিঞ্জার, প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং প্রেসিডেন্ট ফোর্ড শোক-মিছিলটির সামনে দিয়ে হেঁটে চলেছেন। তাদের এই হেঁটে চলার কারণেই, এই মৃত লোকটির মতোই তাদের জন্যও লোকেরা যেন শোক প্রকাশ করছে, প্রচণ্ড আক্ষেপে আর শোকে তারা যেন ফেটে পড়ছে। আমাদের গ্রামের এক লোক বিশেষ একটি ভঙ্গিতে শরীর দুলিয়ে, ঝুঁকিয়ে তাদেরকে সম্ভাষণ জানাল এবং মৃদু হাসি হাসল ঠিক যে রকমের হাসি এরা হাসেন আর এই ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই যেন অন্তর্হিত হয়ে গিয়েছিল, কেউ ছিল না চারপাশে; বিপুল বিস্তীর্ণ এক মরুভূমির ঝলসে দেয়া উত্তাপ আর কেরোসিনের গন্ধ ছাড়া আর কেউ ছিল না। আর এর মধ্যেই কোথা থেকে এক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, এক পাঠকারীর, যে সুরে তালে কোরান পড়ছে; আর ঠিক তখন সূর্যটা আকাশে ঝুলে থাকতে থাকতে ক্রমে ডুবছিল দূরে, দিকচক্রবালে, একটি ঘড়ি যেমন হাতের সাহায্য কিংবা ডায়াল করা ছাড়াই আপন কক্ষে চলতে থাকে।

এমদাদ রহমান

গল্পকার ও অনুবাদক
জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৭৯; বাদেসোনাপুর, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল স্টাডিস অ্যান্ড পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন-এ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প [গল্প, চৈতন্য, ২০১৪]

ই-মেইল : emdadrahman777@gmail.com