হোম অনুবাদ গদ্য লাকী আখন্দ : আমাদের বৃষ্টিদিনের গান

লাকী আখন্দ : আমাদের বৃষ্টিদিনের গান

লাকী আখন্দ : আমাদের বৃষ্টিদিনের গান
558
0

গত কয়েকদিন ধরে প্রচণ্ড বৃষ্টি। বৃষ্টির তেজ মাঝে মাঝে শহর ভাসিয়ে নিয়ে যাবে এমন অবস্থা। এরকম দিনেই হয়তো ‘দ্য ট্যাম্বুরিনম্যান’ কিংবা ‘ফেমাস ব্লু রেনকোট’ শোনা যায়। আমিও হয়তো তেমন কিছুই ভাবছিলাম। হঠাৎ এর মাঝেই কে যেন বলল, লাকী আখন্দ মারা গেছেন। অন্য সবকিছু মুহূর্তেই ভুলে গেলাম। আমার সাথে সাথে মনে হলো, লাকী আখন্দ তো মারা গেছেন ১৯৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর। আমার জন্মের আরো বছরখানেক আগে। যেদিন হ্যাপী আখন্দ মারা গিয়েছিলেন। এরপর লাকী আখন্দ আজকে (২১ এপ্রিল) আরেকবার মারা গেলেন। যেটাকে আমরা আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যু বলি।

এর আগে আমি শুনেছিলাম লাকী আখন্দ কাউকে চিনতে পারছেন না। তখন আমার মনে হয়েছিল, এমনই তো হওয়ার কথা ছিল যে, লাকী আখন্দ অন্যদের চিনতে পারবেন না। তার চোখের মাঝে ভেসে থাকবে ব্লার হয়ে আসা একটা আকাশ। আমিও হয়তো একদিন এভাবে কাউকে চিনব না। সেদিন নিশ্চয় আমি অন্ধ থাকব না। আমার চোখের সামনে এক টুকরো বরফ, যার ধোঁয়ায় আমি চিনে নেব ঈষৎ বসন্তকাল। আমার মনে পড়বে, লেমন থেকে ধীরে ধীরে ইয়েলো হয়ে যাওয়া সন্ধ্যাগুলো। রেডিও নব ঘুরিয়ে তুমি শুনতে থাকবে মি. টাম্বুরিনম্যান কিংবা নীল মনিহারের শেষ কিছু লাইন। আমি সম্ভবত আরেকবার চোখ খুলতে চেষ্টা করব অথবা আরেকবার শীতে গড়িয়ে পড়ব। এসব ভাবনার মাঝেই আমার মূলত লাকী আখন্দকে মনে পড়ে।


লাকি আখন্দ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মিউজিশিয়ানদের একজন। হ্যাপী মারা যাওয়ার আগে এই দুই ভাই যেখানেই হাত দিয়েছেন সোনা ফলেছে।


স্কুলে থাকতেই এমন কোনো এক সন্ধ্যায় হয়তো শুনেছিলাম, ‘আগে যদি জানিতাম’। আচ্ছা, আগে জানলে কী এমন হতো? হ্যাপী তো চলেই গেল। যাকে ভেবে এই গান লেখা, সেই শম্পা রেজাও তো ফিরে তাকাল না। তবুও লাকীর এই গান মানুষ শুনেছে। কোনো এক বসন্তদিনে এইসব গান শুনেই আমরা বড় হতে থাকি। আমাদের গানের খাতায় আরো অনেক গান যুক্ত হতে থাকে। আমার ক্যাসেটের ‘এপিঠ-ওপিঠ’-এ সেসব গান রেকর্ড করে আনি। এসব নতুন গানের ভিড়ে পুরোনো অনেক গান চাপা পড়ে যেতে থাকে। তবে ‘নীল মনিহার’ কিংবা ‘আগে যদি জানিতাম’ এই গানগুলো আর পুরনো হয় না যেমন পুরনো হয় না ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’ অথবা ‘ফেয়ার ওয়েল এঞ্জেলিনা’। আমি বারবার ক্যাসেটের পিঠ উল্টিয়ে কিংবা রেডিওর নব ঘুরিয়ে এসব গান শুনতে থাকি।

লাকি আখন্দ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মিউজিশিয়ানদের একজন। হ্যাপী মারা যাওয়ার আগে এই দুই ভাই যেখানেই হাত দিয়েছেন সোনা ফলেছে। সে সময়ে তাদের হাত দিয়ে তৈরি প্রত্যেকটি গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মূলত ৮৭ সালের ডিসেম্বরের সেই দিনের পর আক্ষরিক অর্থে মৃত্যু হয়েছে লাকীর সংগীত জীবনেরও। এরপর ১৯৯৮ সালে তিনি আবারো ফিরে আসলেও, তখন তিনি ছিলেন আগের লাকীর ছায়া। তবুও রক্ত-মাংসের লাকীকে গান গাইতে দেখাটাও নিশ্চয় কম প্রাপ্তি ছিল না।

বাংলাদেশের মিউজিক আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে তাতে লাকী আখন্দের অবদান অনেক। আধুনিক বাংলা পপ গানের অন্যতম রূপকারদের একজন লাকী| ১৯৭৫ সালে ভাই হ্যাপি আখন্দের জন্য যে অ্যালবামটিতে সংগীত আয়োজন করেন সেখানেই নিজের জাত চিনিয়েছেন লাকী। অ্যালবামটিতে ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ ও ‘কে বাঁশি বাজায়রে’ গানে কণ্ঠ দেন হ্যাপী আখন্দ। একই অ্যালবামের ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে’ ও ‘পাহাড়ি ঝরনা’ গানে কণ্ঠ দেন হ্যাপী ও লাকী দুজনেই এবং লাকী নিজে ‘নীল নীল শাড়ি পরে’ ও ‘হঠাৎ করে বাংলাদেশ’ গানে কণ্ঠ দেন। এই গানগুলো প্রত্যেকটি নিজ সময়কে অতিক্রম করে গেছে। শুধু এই গানগুলোয় নয়, তার সুর করা ‘কাল কী যে দিন ছিল’, ‘লিখতে পারি না কোনো গান,’ ‘ভালোবেসে চলে যেও না’, ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ ‘হৃদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা’র মতো গানগুলোও বছরের পর বছর প্রত্যেকদিন নতুন নতুন শ্রোতাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে নিচ্ছে। এই গানগুলো তৈরির ২৫-৩০ বছর পর আমি নিজে যখন এই গানগুলো শুনতে শুরু করি, তখন সেগুলো নতুন কিছু হিশেবেই আমার কাছে ধরা দিয়েছে। আমি এখনো এই গানগুলোর মধ্যে দিয়ে নিজেকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করি। শৈশবের সেই অদ্ভুত সময়টাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি, যখন প্রথমবারের মতো এই গানগুলো শুনে শিহরিত হয়েছিলাম।

তবে এইসব ভালোলাগার বাইরেও আরেকটি কারণে লাকী আখন্দ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যখন গান করতে আসেন, তখন তিনিসহ হাতে গোনা কয়েকজন ছিলেন এই পথের যাত্রী। রাস্তা এতটা সহজ ছিল না লাকীর জন্য। একে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ এবং তার অস্থির প্রজন্ম। মাত্রই মধ্যবিত্ত নতুন মাত্রায় বিকশিত হচ্ছে। এই ‘মন’কে পড়তে পারা অত সহজ ছিল না। তার ওপর পাশ্চাত্য ঘরানার পপ মিউজিক করতেন বলে আক্রমণও হয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। সুতরাং লড়াইটা যতটা ভেতরের ছিল, ততটাই ছিল বাইরের। বিশেষত ‘ক্লাসিক্যাল’দের রক্তচক্ষুর ভয় তো সবসময় ছিল।

তবে এ যাত্রায় একা ছিলেন না লাকী। পাশে পেয়েছেন আজম খান, ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফিরোজ সাঁই, পিলু মমতাজ, জানে আলমদের নিয়ে গড়া ঝিঙ্গা শিল্পীগোষ্ঠী এবং ‘উচ্চারণ’-এর  আজম খানের মতো মহীরুহকে। বিশেষ করে আজম খানের কথা আলাদভাবে বলতেই হয়। শুরুতে অনেকেই আজম খানকে পাত্তা দিতে না চাইলেও, একটা পর্যায়ে আজম খান মানেই ছিল তারুণ্যের উপচে পড়া ভিড়। মঞ্চ পরিবেশনার মাধ্যমে সংগীতকে কেবল শোনার না দেখার বিষয়েও পরিণত করেছিলেন আজম খান। ওপেন এয়ার কনসার্টের দর্শকরাই এক সময় আজম খানকে নিজেদের ‘গুরু’ বানিয়ে নিল। এভাবেই বাংলা রক মিউজিক ছড়িয়ে পড়ল লাখ লাখ তরুণদের মাঝে। ঢাকার বাইরেও তৈরি হচ্ছিল নতুন নুতন রকপ্রজন্ম। যেখান থেকে পরবর্তীতে ওয়ারফেজ, এল আর বি, নগর বাউল, মাইলস, সোলসসহ অনেক জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোর সৃষ্টি। এখনো এই ধারায় যখন কোনো তরুণ গিটার হাতে রকের ভাষায় গল্প বলতে সামনে এগিয়ে আসছে, তার পেছনে অনুপ্রেরণা হয়ে জ্বলজ্বল করে স্বর্ণোজ্জ্বল সেইসব ঘটনা।


হ্যাপী আগেই বিদায় নিয়েছেন, এবার গেলেন লাকীও। কিন্তু তারা যে রাস্তা তৈরি করে গেছেন সেখান থেকে তৈরি হয়েছে মিউজিক্যাল লড়াইয়ের নতুন আরেকটি ধারা


এখন প্রশ্ন হচ্ছে লাকীর করা গানগুলোর মধ্যে এমন কী ছিল যা তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। প্রথমত, সুরের দিক থেকে গানগুলো ছিল দারুণ শ্রুতিমধুর। যেসব গান লাকী তৈরি করেছেন তার কথাগুলোও দারুণ, সেই সাথে সুরের ভ্যারিয়েশনও চমৎকার। এছাড়া সে সময় নতুন নতুন ইনস্ট্রুমেন্টের এক্সপেরিমেন্ট তো ছিলই। সবমিলিয়ে প্রত্যেকটি গান ঐ সময় গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে শ্রোতাদের কানে নতুন একটা টেস্ট দিতে পেরেছিল। যা তরুণদের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলেছিল।

আরেকটা বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, যে সময় বাংলা পপ-রক মিউজিক এক্সপ্লোর করছিল, সে সময় পাশ্চাত্যেও রক মিউজিক তু্ঙ্গে। ‘রক অ্যান্ড রোল’ যুগ তখন মধ্যগগনে। ১৯৭৩ সালে এলভিস প্রিসলির স্টেজে করা একটি গান স্যাটেলাইটে দেড় বিলিয়ন দর্শক প্রথমবারের মতো উপভোগ করে। ১৯৮২ সালে মাত্র মাইকেল জ্যাকসনের ‘থ্রিলার’ মুক্তি পেয়েছে। এর আগে ১৯৭৯ সালে বাজারে আসে পিঙ্ক ফ্লয়েডের ‘দ্য ওয়াল’, ৮১ সালে মাত্র ‘মেটালিকা’ আত্মপ্রকাশ করেছে। এছাড়া জিম মরিসন, চাক বেরি, কিংবা বিটলসসহ অন্যান্য সব রকস্টাররা এসে পড়ছিল এদেশে মিউজিকে বিপ্লব ঘটাতে যাওয়া তরুণদের মাঝে। তাই সে-সবের প্রভাবও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের মিউজিকেও পড়েছিল।

হ্যাপী আগেই বিদায় নিয়েছেন, এবার গেলেন লাকীও। কিন্তু তারা যে রাস্তা তৈরি করে গেছেন সেখান থেকে তৈরি হয়েছে মিউজিক্যাল লড়াইয়ের নতুন আরেকটি ধারা। পরবর্তীতে শিল্প হিশেবে বাংলা পপ ও ব্যান্ড সংগীত দাঁড়ানোর পিছনে লাকী আখন্দের অবদান অস্বীকার করাটা অন্যায় হবে।

এই লেখা শেষ করতে করতে আমার আরেকটি দৃশ্যের কথা বারবার মনে পড়ছে, আজ থেকে কয়েক প্রজন্ম পরে কোনো এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় কারো বারান্দা থেকে ভেসে আসছে ‘আমায় ডেকো না…’। এমন একটি দৃশ্যের গায়ে হাত দিয়ে আরো অনেকদিন বেঁচে থাকা যেতে পারে।

হাসনাত শোয়েব

জন্ম ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৮। স্নাতকোত্তর (দর্শন), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
সূর্যাস্তগামী মাছ [কবিতা, মেঘনাদ প্রকাশনী, ২০১৫]
ব্রায়ান এডামস ও মারমেইড বিষ্যুদবার [কবিতা, জেব্রাক্রসিং, ২০১৭]

ই-মেইল : soyeb69@yahoo.com