হোম অনুবাদ গদ্য বিলোলের সাথে আলাপ

বিলোলের সাথে আলাপ

বিলোলের সাথে আলাপ
687
0

এই কথা কিছুদিন যাবৎ তোমাকে বলব ভাবছি—আমাদের জীবন—তোমার ও আমার—প্রতিকূলতাগুলো আমাদের সামনে পথ মাত্র, প্রতিবন্ধক নয়। আমাদের মোক্ষ হলো, যাই ঘটুক, যত প্রতিকূলতাই থাকুক, জীবন যত নিষ্ঠুরই হোক, আমরা নিজেদের ভেতরের কোমল পলি মাটির সত্তাটিকে কতটা ধরে রাখতে পারি। এ হলো ঠিক ফর্ম ও আর্ট-এর মূলের মতো। ফর্ম পীড়ন করবে এবং বাস্তব সেই পীড়ন সয়ে নিজের শেইপ নির্ধারণ করে টিকে থাকবে। বাস্তবটিও হলো শিল্পীর, ফর্মও শিল্পীরই। ফর্ম শিল্পী নিজেই। বাস্তবটিও শিল্পী নিজেই। শিল্পী নিজেই সেই অগ্নিছাঁচ যার মাঝ দিয়ে তারই বাস্তব রূপ পাবে। প্রতিবিহার।

এদুয়ারদো চিয়িদার ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি সমুদ্রের পাশে, পাহাড়ে বসানো। রহস্যময়, অব্যাখ্যেয় গড়ন এক। স্পেসের ব্যবহার এখানে কেমন এসব নিয়ে অনেকেই কথা বলেন। নেগেটিভ স্পেস, পজেটিভ স্পেস ইত্যাদি। এসব আমি বুঝি না। এখানে ইন্সক্রুটাবল দৈবকে দেখা যায়। আমি এই ব্যাখ্যাহীন, ক্রুর কখনো হয়তো, মূক দৈবের উপস্থিতিকে অনুভব করি।

1
এদুয়ারদো চিয়িদার ভাস্কর্য

শব্দগুলো বিবর্তিত হবে। তাদের মাঝে সব ভাব আবর্তিত হবে। যেমন ধরো, নিখোঁজ বাতাস। এখানে বাতাস আসলে হারায় নি; নিজের অন্তরকে সে খুঁজে ফিরছে হয়তো, অথবা উদাস হয়ে আলুথালু ঘুরছে। কিংবা তুমি সেই বাতাসে নিখোঁজ হলে নিজের মাঝে। হারাতে হারাতে পেলে নিজেকে, পেতে পেতে খোয়া গেলে আবার। এমন গুম হয়ে যাবার আলপথে কিছু সুবাস ছড়াল।

—”অস্ফুট স্বর। ফিকে ঠোঁট। খটখটে দুপুর। টুকরো টুকরো আড়াল। ফুটপাত জোড়া পোকায় কাটা বই। ধুলো উড়ানো আকাশ। টুং টাং জট । রিকশার সাথে টেম্পো। টেম্পোর সাথে বাস। হুড়োহুড়ি। ভিখারির আস্ফালন। সবুজ আর লাল সিগন্যালের বিরতি। হকার যাত্রা। গন্তব্যহীন উদ্দেশ্য। নতুন নিত্য। দোলনচাঁপার চাপা গন্ধ। অপেক্ষার দীর্ঘ প্রতীক্ষা! “

এই দৃশ্যবাস্তব বা ঘ্রাণ বা স্তবসমূহ আলাদা-আলাদাভাবে পাশাপাশি বসল যে এমনটা সুন্দর। আলাদা করে, স্বমহিমায় পাশে থাকার ভেতর যোগসূত্রকে ভাস্বর করা প্রয়োজন হয় প্রায়ই।

এভাবে দেখতে পারো। উপরন্তু, বহু ফুল দিয়ে মালা গাঁথতে যেমন পারো, ভাবতেও পারো যে একটি ফুলের কাছে গিয়ে ঘ্রাণ ও দৃশ্যসুখ পাওয়া মধুর হতে পারে। বিবাহের মতো এটা। ঘর করার মতো। রাতে কেবল স্ত্রী-ই থাকে সঙ্গমের জন্য। ঘ্রাণ নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায় তার যোনির। সেখানে অন্য কারো ঘ্রাণ পুরুষ যেমন চাইবে না, নারীও চাইবে না। কিন্তু বাহির হলো সেই মালার কাছে যাওয়া—সবাই মিলে গলায় বা হাতে ঝুলছে নির্বিশেষে, কেউই বিশেষ নয়। নির্বিশেষের সুখ আছে, বিশেষের শান্তি। উভয়েরই মাঝে এই দুই ভাব যাতায়াতও করে, বাসও করে, তবে আমরা বিশেষকেই কামনা করি। এমনকি প্রেমিকা হলেও, পাঁচজনকে একত্রে সময় দিই না, পারিও না দিতে। সবারই অভিমান আছে, অভিমান কিন্তু মন খারাপ নয়, অহমের ভাব।


কারো কোনো নিখুঁত আকৃতি নেই। এটাই ওদের সৌন্দর্য।


কবিতায় ইমেজগুলোকে মোজাইকের মতো ভাবি। পাশাপাশি বসছে, ভিন্ন, স্বতন্ত্র, কিন্তু অর্কেস্ট্রা তৈরি করছে, কারণ হারমনি আছে অন্তঃশীল। সিগারেটে তামাকের ক্ষুদ্র কুঁচিগুলো দেখেছ? ওরা কিন্তু কেউ গোল, বা চারকোনা, বা ত্রিভুজ আকৃতির নয়। কারো কোনো নিখুঁত আকৃতি নেই। এটাই ওদের সৌন্দর্য। আমার অনুভবে কবিতার ইমেজগুলো কুঁচিকুঁচি ওই তামাক খণ্ডের মতো। অনিয়মিত আকৃতির, নিজের মতো, সচেতন, ধ্যানী, জ্বলবে বলে জেগে আছে…চিত্রকল্প নিয়ে আমার এই অনুভূতি বছর পনের আগের। এই ভাষার প্রবল প্রকাশ দেখতে চাইলে এবং সহজলভ্য উপায়ে দেখতে চাইলে পাবে টি এস এলিয়ট-এর দ্য ওয়েইস্ট ল্যান্ড এ।

অরূপ… অশ্রুতি, অদেখা, উপস্থিতি, এসব স্বমহিমায় ভাস্বর আমার অনুভবে। এছাড়া আমার কোনো কারুজকলা নেই। এ আমি বুঝতে সক্ষম, যা অপ্রকাশ্য, অনির্বচন, অলব্ধ তার সমগ্রতাকে রূপ দেয়ার ক্ষমতা অতি গভীর, সুখের ও যৌনতার।

আমি ছন্দ শিখি নি। আমার ধারণা তুমিও শেখো নি ছন্দ। না শিখলেও সমস্যা নেই। আমি সুরের উল্লম্ব, উচ্চাবচতার স্তনস্পর্শী হই। দীর্ঘ কোনো তান, একরৈখিক কোনো স্বরপ্রক্ষেপ বা বিভঙ্গ আছে এমন স্বরপ্রক্ষেপকে ছোঁয়ার প্রয়াস পাই। আরও যা, দৃশ্যের বা ছবির বা একটা আলাদা উপস্থিতির সাঙাত অস্তিত্বকে বাজতে দিই। বাজিয়ে দিই। ইমেজের ম্যুজিক্যালিটি বরাবরই আমার ধ্যানী আয়াসের লক্ষ্যভূমি।

—‘রুচি তৈরি হয় selection-এর সুযোগ থেকে, যখন অনেকের মধ্যে থেকে বেছে নিতে পারা যায়। প্রচুরের থেকে নিতে নিতে আসে পছন্দ করবার শক্তি। আর ‘একমাত্র’ থেকে তৈরি হয় অভ্যেস। মানিয়ে নেয়ার, এবং বেছে নিতে না পারার অভ্যেস। অজস্রের মুখোমুখি যতবার পারা যায়, দাঁড়াতে হয়, কল্পনাতে হলেও।’

আমরা প্রচুরের সামনেই নিজের অংশ খুঁজে পাই। কিন্তু এক স্বামীর প্রেম, শৈশব ও কৈশোর থেকেই গড়ে উঠাও মন্দ নয়।

আমরা পারি দুটো বাস্তবকে প্রতিবিহার করাতে, এর মাঝ দিয়ে ওকে বিহার করিয়ে আনতে। অন্যভাবেও বুঝি। আমার বাস্তব। আমার কথা কোনো ধ্রুব সত্য নয়। আমার সত্য। তোমার জগৎটা শব্দে আসবে। বা সুরে আসবে। ভাষা তো জগৎটা। শব্দটা নয়। বাস্তব। ভাষাকে আমি এভাবে বুঝি। কাজেই এই ইন্টারপ্রিটেইশান অন্যের বেলায় নাও খাটতে পারে।

—কিভাবে ঢুকতে হয়?

আসলে কবিতা অনেক অন্তরপ্রদেশ ঢুঁড়ে দেখতে পারে। তুমি এসব প্রদেশে ঢোকো।

আমার বাস্তবগুলো কখনো শরীরী কিন্তু বিমূর্ত, কখনো পুরো বিমূর্ত সব জগতে সাঁতরায়। যেমন, তার স্মৃতির মূলে আর্দ্র শেকড়ে খেলা করে… এমন ধারা বাস্তব। কাজেই এই অনুধাবন অন্যের বেলায় নাও খাটতে পারে।

ধরো একটা শরীরী বাস্তবতা হলো জঙ্গম।

অন্যটি হলো গতি জড়তা। আরেকটা হলো স্পাইর‍্যালিং মৌশান। এখন ভাবো আমি স্পাইর‍্যালিং মৌশানকে সারসের মাঝে ধরে ফেললাম। আবার স্বচ্ছতার শরীরী অনুভূতিকে আমি ধরলাম গোলাপি বেগুনি রঙের আঁচড়ে। গোলাপি বেগুনি মেঘ ঝরে পড়ছে হ্রদের কিনারে।

—জঙ্গম!

অশোধিত এক জান্তবতা—যা আবার জীবনের সূত্র ঢেকে রেখেছে স্নেহকেও। জঙ্গম। গতিময়তা। অশোধিত ঐ প্রাণ হলো এক নেকড়ে। যে কিনা দৌড়ে পার হচ্ছে ঝরনা বা পাহাড়। প্রপাত পেরোনো রোমশ নেকড়ে (আমি বলি রোম নেকড়ে)।

—জীবনের সাথে কী সম্পর্ক?

কোনটার জীবনের সাথে সম্পর্ক?

—অশোধিত জান্তবতার?

আমি বস্তুর আত্মাকে দেখি। তার ভেতরের স্পন্দনকে ধরি।

—সেটা কেমন করে? শেখাও।

মানে, এটা দেখতে হবে তোমাকে ব্যাস। পুরো শরীরী হতে হবে।

—সেই দেখার জায়গায় যেতে হলে কী প্রয়োজন?

ওই বাস্তব বা ওই কাঠ, মাটি, পদ্ম, ধাতু এর ভেতরটাতে বাস করতে হবে। বা ওরা তোমার মাঝে জন্মাবে। তোমার ধ্যান তোমাকে ওখানে নেবে। তোমার ইন্দ্রিয়ে ওর দেহটা অনুভব বুঝতে হবে। দেহে দেহকে অনুভব করা, বোঝা। হলদে পাখির রঙ অনুভব করতে হবে তোমার ত্বকে। মনে হবে রঙটা তোমার স্তনে বা হাতের ত্বকে বেজে চলেছে। স্রোতটা ধরতে হবে, বা জড়ো প্রাণের সার—ধরো সৌরঝড় থেমে গেলে এর পর কী ঘটে সেই জগৎটা কেমন?

প্রস্তরে নির্বাণ পেল যত সৌরঝড়।


এই হলো স্বর। এখানেই সুর থাকে। শ্রুতিতে থাকে, দৃশ্যে থাকে, সঙ্গতিতে থাকে


সুরও দেখো নাকি তুমি? দেখতে পাও?

—রঙ বেড়ে ওঠে সুরে। কৈশোর, যৌবন, পরিণতি পায়। এর শাখা বাড়ে, কলি আসে, মুকুল পাই। ফল ঢলো-ঢলো হয়। এত প্রবল হয় এরা… নিজের আলোকে, বিভাবকে প্রতাপের মতো প্রতিষ্ঠা দেয়।

আলোর-আলাদা আলয় গড়ে তোলে সুর, পরিসর, আর সুর-পরিসর নিজেদেরই মাঝে। সুরের তনু বেড়ে ওঠে।

মেজাজ বলে যে প্রপঞ্চ আছে তাকেও ধরে নিতে পারো এই ধারাতেই।

স্বর হলো গহিন জগৎ, আবার উপরিতলের রূপও। প্রক্ষেপ, বিস্তার, বিহারে তোমার সেই ভাষার বা বাস্তবের তলগুলোকেই নিয়ে আসবে কবিতায়। আবারো সেই ভাষা ও বাস্তব এসে গেল, দেখো।

তোমাকে বলব নাটক পড়তে। গ্রিক নাটক। আমি একেবারে গ্রিক ট্র্যাজেডিকে এরিস্টটল যেমন করে বুঝতে চেয়েছেন নাট্যিক সংগঠনের নিরিখে তেমন করে কবিতাকেও বুঝি। আমি একে পৌরুষও বলে থাকি। এই হলো স্বর। এখানেই সুর থাকে। শ্রুতিতে থাকে, দৃশ্যে থাকে, সঙ্গতিতে থাকে। প্রাতিস্বিকতাকে বুঝে থাকে কেউ কেউ এই প্রত্যয়গুলোতে। কিন্তু আমি সমগ্রতাকে বুঝি স্বর ও সুরে। সুরে আশ্রয় জন্মায়।

—কেমন সেটা?

পৌরুষ আশ্রয় ও নিশ্চয়তা দেয় তোমার চিত্রকে, ধ্বনিকে। সাম্যে প্রতিষ্ঠা দেয়া, সৌধের মতো উল্লম্ব, গৌরবে কবিতাকে স্মৃতির দরজাহীন পরিধিতে জমাট অস্তিত্ব দেয়া। যা ছিল না তাকে শূন্যতায় জন্ম দেয়াই পৌরুষ। আস্থাশ্রাবী।

সুর পড়ে যাওয়া নিয়ে যেভাবে কবিরা ভাবেন, হয়তো মুক্তি তার বাইরেও ঘটতে পারে। সুরকে বাড়তে দিয়ে মুখ, বিকাশ, চূড়াতে নিয়ে যাবার ধারাতে চালিত করা যায় কবিতাতেই। আমরা ক্লাইম্যাক্স, মোক্ষণ এসব জানি তো আমরা। আমি বরং ছবির বহুপ্রজতা থেকে এই পৌরুষই কামনা করি। সুর পড়ে যাবার সম্ভাবনা থেকে বহু দূরে সেই জগৎ।

আমি বারবার করে স্বরে ফিরতে বলব। ওখানে তোমার জগৎ, তোমার বাস্তব। আবার বাস্তবের প্রকাশও সে-ই। স্বর। কাজেই স্বর পেলে সুর পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই কেউ দূরে যায়, বিস্তর দূরে।

2
জ্যাকসন পোলকের ছবি

খণ্ড খণ্ড ছবির একত্র সংসারে ওদের নিজেদের সঙ্গীত আছে। সেই সঙ্গীত দেখাও যায়। সৌম্য, বুদ্ধ এক সংগীত যেমন দেখো তুমি, এই এত খণ্ডের যে জগৎ তার মাঝে দোলা, বিশ্রাম, বিস্তার ও খুবই স্পর্শনীয় শরীরী ও প্রত্যক্ষ সংঙ্গীত ও সুর খেলা করে। এমনকি জ্যাকসন পোলকের ছবিগুলোতে আমি এদের দেখেছি। কবিতাও এমনই। একেবারেই বিরোধ নেই, বরং মিলই খুব বেশি। জ্যাকসন পোলকের আপাত এলোমেলো বর্ণবিচ্ছুরণে ছেয়ে যাওয়া পটে চমৎকার ছন্দের খেলা দেখি আমি।

যা দেখছ এই চিত্রে তা কেওসের আপাত আভাস মাত্র। ভেতরটাতে কসমসের সাম্য আর শৃঙ্খলা। কানে দোলা দেয় না, কিন্তু নিজেদের মাঝে সাম্য, মৌনী সব ধরে রেখে কবিতায় এমন বহু সুর খেলে যায় যাকে কবিই বোঝেন কেবল।

তানভীর মাহমুদ

তানভীর মাহমুদ

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৮০, ঢাকা। ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাধতত্ত্ব ও বিচার-এ এমএসএস।
পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই : প্রতিবিহার (কবিতা)

ই-মেইল : editor.hansadhani@gmail.com
তানভীর মাহমুদ