হোম অনুবাদ কাফকা ও তাঁর পূর্বসূরিগণ : হোর্হে লুইস বোর্হেস

কাফকা ও তাঁর পূর্বসূরিগণ : হোর্হে লুইস বোর্হেস

কাফকা ও তাঁর পূর্বসূরিগণ : হোর্হে লুইস বোর্হেস
732
0

কাফকার পূর্বসূরিদের উপর একটা গবেষণা করার পরিকল্পনা করেছিলাম। প্রথমে ধারণা ছিল কাফকা অলঙ্কৃত স্তুতিবাক্যে ঘেরা ফিনিক্সের মতোই অনন্য। কিন্তু আরেকটু এগোতেই মনে হলো বিভিন্ন সময়ের বিচিত্র সব সাহিত্যকৃতির মাঝেই কাফকার সুর ও প্রবণতাগুলো দেখতে পাচ্ছি। সেগুলোর কয়েকটি এখানে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করছি।

প্রথমত গতি বিষয়ক জেনোর প্যারাডক্স। ‘ক’ থেকে ‘খ’ অবস্থানে গতিশীল একটি বস্তু কখনোই পৌঁছাতে পারবে না (এরিস্টটলের বর্ণনা অনুযায়ী), কেননা সে দূরত্ব পেরুতে হলে আগে মোট দূরত্বের অর্ধেক দূরত্ব তাকে অতিক্রম করতে হবে। তারও আগে পেরোতে হবে অর্ধেকেরও অর্ধেক দূরত্ব, তার আগে সেই অর্ধেকের অর্ধেকেরও অর্ধেক দূরত্ব আর এভাবেই অসীম সংখ্যক অর্ধেক দূরত্ব তাকে পেরুতে হবে। এই বিখ্যাত সম্পাদ্যের কাঠামোটিই সত্যিকার অর্থে আমরা পাই the castle-এ। গতিশীল বস্তু, তীর ও একিলিসই হচ্ছে সাহিত্যের প্রথম কাফকাসদৃশ চরিত্র। দ্বিতীয় যে লেখাটি ভাগ্যক্রমে আমার সামনে এসে পড়ে তার প্রবণতা ঠিক কাঠামোগত নয়, বরং ভাবগত। নবম শতাব্দীর গদ্য লেখক হান ইউ-এর একটি উপকথা। যেটি মারগিউলিসের অসাধারণ একটি বই Anthologie raisonnée de la littérature chinoise (1948)-এ পেয়েছি। রহস্যময় ও গম্ভীর এই অনুচ্ছেদটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

সার্বজনীনভাবে ইউনিকর্নকে মঙ্গলের প্রতীকরূপেই ভাবা হয়। সব গল্প, গাথা, মনীষীর জীবনী ও অন্যান্য সব গুরুত্বপূর্ণ লেখায় এমনটিই বলা আছে । এমনকি গ্রাম্য মহিলা এবং শিশুরাও জানে ইউনিকর্ন শুভলক্ষণ বহন করে। কিন্তু এই প্রাণী কখনই গৃহপালিত পশুগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয় না, বেশিরভাগ সময়েই দুর্লভ, সহজে শ্রেণিবিন্যস্তও করা যায় না একে। ইউনিকর্ন না দেখতে ঘোড়ার মতো, না ষাঁড়ের মতো, নেকড়ে বা হরিণের মতোও না। এমতাবস্থায় ইউনিকর্নের মুখোমুখি হলে এটা ঠিক কী ধরণের প্রাণী—তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে না। কেশর আছে এমন প্রাণীকে আমরা ঘোড়া বলে চিনি আবার শিংঅলা এমন প্রাণীকে ষাঁড় বলে ডাকি। কিন্তু আমরা জানি না ইউনিকর্ন আসলে ঠিক কিসের মতো! [১]


অপারেজয় এক সৈন্যদল অসীম দুর্গ থেকে যাত্রা শুরু করে, পাহাড়-মরুভূমি পেরিয়ে, ভয়ঙ্কর সব দানবের মোকাবেলা করে রাজ্যজয় করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকে, কিন্তু কোনোদিনই কারকাসনে পৌঁছাতে পারে না। যদিও দূর থেকে কেবল একনজর দেখার সুযোগ পায়।


তৃতীয় লেখাটা অধিকতর সহজলভ্য উৎস, কিয়ের্কেগার্দের রচনাবলি থেকে পাওয়া। এই দুই লেখকের মধ্যে আত্মিক যোগসূত্র কেউ অস্বীকার করতে পারবে না; যতদূর জানি, কাফকা যে কিয়ের্কেগার্দের মতোই সমসাময়িক সময় ও পূঁজিবাদী সমাজকে উপজীব্য করে প্রচুর ধর্মীয় নীতিগল্প লিখেছেন, এই ব্যাপারটা এখনও গুরুত্বের সাথে দেখা হয় নি। লওরি (Walter Lowrie) তাঁর কিয়ের্কেগার্দ (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৩৮) বইয়ে এ দুটি নীতিগল্পের উল্লেখ করেছেন। প্রথমটি এক নকলবাজের গল্প যে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির মাঝে ব্যাংক নোট পরীক্ষা করে থাকে। একইভাবে ঈশ্বর কিয়ের্কেগার্দের উপরে সন্দেহযুক্ত হওয়ার পরেও তাকে কোনো দায়িত্বের ভার দিতে পারেন, বিশেষ করে যখন তিনি জানেন যে অশুভশক্তির সাথে তার পরিচয় বেশ ঘনিষ্ঠ। অপর নীতিগল্পের বিষয় উত্তর গোলার্ধ অভিযান। ড্যানিশ মন্ত্রিপরিষদ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, এই অভিযানে অংশগ্রহণ আত্মার চিরন্তন মঙ্গলের জন্যে উপকারী। যদিও স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, সেখানে পৌছানো বেশ দুঃসাধ্য, এমনকি প্রায় অসম্ভব, এবং এই অভিযানে অংশ নেয়া সবার পক্ষেই সম্ভব নয়। শেষপর্যন্ত তারা ঘোষণা করে ডেনমার্ক থেকে লন্ডন পর্যন্ত যে কোনো পথেই ভ্রমণ, এমনকি নিয়মিত আসা যাওয়া করে এমন স্টিমারে যাত্রাও, উত্তরগোলার্ধ অভিযান হিসেবে বিবেচিত হবে।

চতুর্থ যে আদি সংস্করণটি পেয়েছি তা ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত ব্রাউনিং (Robert Browning)-এর একটি কবিতা Fears and Scruples। এক ব্যক্তির, অন্তত তার নিজের ধারণা অনুযায়ী, তার এক বিখ্যাত বন্ধু আছে। যাকে সে কখনোই দেখে নি এবং যার কাছ থেকে কোনোরূপ সাহায্য পাওয়ারও সম্ভাবনা তার নেই, কিন্তু সে জানে তার বন্ধুটি মহৎগুণের অধিকারী এবং অন্যদের সে বন্ধুর লেখা চিঠি দেখিয়ে বেড়ায়। কেউ কেউ সেই বন্ধুটির মহৎগুণের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে, হস্তলিপি বিশারদগণ ঘোষণা করে যে চিঠিগুলো ভুয়া হতে পারে। শেষ লাইনে লোকটি প্রশ্ন তোলে : ‘এই বন্ধুটিই যদি হয়ে থাকে…ঈশ্বর?’

আমার নোটে আরও দুটি গল্প টুকে রাখা আছে। একটা লিও ব্লয়ের (Léon Bloy) Histoire désobligeantes থেকে নেয়া, সেইসব লোকদের বিষয়ে যারা সারাজীবন ধরে বিভিন্ন ধরনের গ্লোব, মানচিত্র, রেলরোডের সময়সূচি এবং ট্রাঙ্ক সংগ্রহ করতে থাকে, কিন্তু তাদের জীবন পার হয়ে যায় এমনকি নিজের শহরেরও বাইরে না গিয়েই। অন্যটির শিরোনাম Carcassonne, লর্ড ডানসানির (lord dunsany) লেখা। অপারেজয় এক সৈন্যদল অসীম দুর্গ থেকে যাত্রা শুরু করে, পাহাড়-মরুভূমি পেরিয়ে, ভয়ঙ্কর সব দানবের মোকাবেলা করে রাজ্যজয় করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকে, কিন্তু কোনোদিনই কারকাসনে পৌঁছাতে পারে না। যদিও দূর থেকে কেবল একনজর দেখার সুযোগ পায়। (স্পষ্টতই গল্পটি প্রথমটির থেকে বিপরীত, একটাতে কখনোই শহর ত্যাগ করা হয় না, অপরটাতে সেখানে কখনোই পৌঁছানো সম্ভব হয় না)

খুব বেশি ভুল না হলে যেসব বিচিত্র উদাহরণ হাজির করলাম সেগুলোর সাথে কাফকার সাদৃশ্য পাওয়া যায় এবং এগুলোর একটার সাথে আরেকটা বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। দ্বিতীয় বিষয়টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকটা লেখায়ই কমবেশি কাফকার ভাবাদর্শ খুঁজে পাওয়া যায়। কাফকা না লিখলে আমাদের পক্ষেও এই বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারটা আবিষ্কার করা সম্ভব হতো না। অন্যভাবে বললে এর অস্তিত্বই থাকত না কোনো। ব্রাউনিং-এর Fears and Scruples কবিতাটি কাফকার লেখার ভবিষ্যদ্বাণী করে। কিন্তু কাফকা পড়ার অভিজ্ঞতা আমাদের কবিতাটার পাঠানুভূতিকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে, এনে দেয় তীব্রতা। ব্রাউনিং নিজে কখনোই কবিতাটিকে এমনভাবে পড়েন নি যেভাবে আমরা এখন পড়ছি। সমালোচনার অভিধানে পূর্বসূরি শব্দটি অপরিহার্য কিন্তু একে সব ধরনের বিতর্ক ও তুলনার উর্ধ্বে যেতে হবে। প্রত্যেক লেখকই তার পূর্বসূরি নির্মাণ করে। তার কাজ অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে পরিবর্তিত করে যেমন তা ভবিষ্যত কেউ পাল্টে দেয়। [২]

এই পারস্পরিক সম্পর্কের সাথে জড়িত মানুষের একত্ব অথবা বহুত্ব খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্রাউনিং বা লর্ড ডানসানি (Lord Dunsany) কাফকার পূর্বসূরি হিসেবে যতটা প্রকট, ততটা প্রকট নয় বেট্রাখটুং (Betrachtung)-এর আদি কাফকা, লোকায়ত পুরাণ ও নির্মম আচারগুলো।

.

 ১. পবিত্র এই প্রাণীটির অপরিচিতি এবং মানুষের হাতে এর নিন্দনীয় আর দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু চিনা সাহিত্যের প্রচলিত বিষয়। ইয়ুং-এর (Carl Gustav Jung) Psychologie und Alchemie-এর শেষ অধ্যায় দ্রষ্টব্য; যাতে দুটি আগ্রহব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত রয়েছে।
২. টি এস এলিয়টের points of view (১৯৪১), পৃ: ২৫-২৬ দ্রষ্টব্য।
তানভীর আকন্দ

তানভীর আকন্দ

জন্ম ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৪; গফরগাঁও, ময়মনসিংহ।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত।

ই-মেইল : tanvirakanda09@gmail.com
তানভীর আকন্দ