হোম অনুবাদ কলম্বিয়ার কবিতাগুচ্ছ : আর্মান্দো ওরোজকো তোভার

কলম্বিয়ার কবিতাগুচ্ছ : আর্মান্দো ওরোজকো তোভার

কলম্বিয়ার কবিতাগুচ্ছ : আর্মান্দো ওরোজকো তোভার
980
0

আর্মান্দো ওরোজকো তোভার (জন্ম ১৯৪৩- মৃত্যু ২০১৭) একাধারে কবি ও চিত্রশিল্পী। কলম্বিয়ার বোগোটা শহরে তার জন্ম। কিউবার হাভানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা নিয়ে পাশ করে রেডিও হাভানায় চাকরি করেছেন। পরে কলম্বিয়ায় ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার পাশাপাশি সাংবাদিকতাও করেছেন।

তিনি তার বাবার উৎসাহ পেয়ে সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তার প্রথমদিককার লেখালেখিতে প্রেম, বিষাদ ইত্যাদি ব্যক্তিগত একান্ত বিষয়ের প্রাধান্য থাকলেও, পরে মায়াকোভস্কি,নেরুদা, হারনানদেজ, ভালেজোর প্রভাব তার উপর পড়ে। তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তার রচনার বিষয়কে প্রসারিত করেন।

কিউবা বিপ্লবের দিনগুলোয়, যখন তিনি কিউবায় ছিলেন, তখন প্রচুর লেখালেখি করেছেন। পুরস্কার পেয়েছেন। তার কয়েক বছর পর দেশে ফিরে সশস্ত্র বিপ্লবের পরিকল্পনা করেন, কিন্তু পরে আবার সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে লেখায় মনযোগী হন। বহুবার মতবাদ ও লেখনির জন্য কারাবাস সহ্য করতে হয়েছে তাকে। তিনি নিজেকে একজন নাস্তিক এবং বস্তুবাদী ভাবতেই পছন্দ করেছেন আজীবন। গত ৩০ জানুয়ারি, ২০১৭ তার প্রয়াণ ঘটে।

তোভারের কবিতা এশিয়া, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে বড় একটা পরিচিত নয়। সম্ভবত এই প্রথম তার কবিতার বাংলা তর্জমা হলো। তিনি সেটা দেখে গেছেন, যা বড় আনন্দের বিষয়।

তার কবিতার বঙ্গানুবাদ সম্পর্কে তোভার মন্তব্য করেছিলেন :

“Gracias Mrinmoy Chakraborty, estoy profundamente emocionado de ver mis poemas entraducidos por ti a tu idioma”

(Mrinmoy Chakraborty, I am deeply moved to see my poems entraducidos yourself to your language).


উদাহরণ

[আউগুস্তো লারা সাঞ্চেজের জন্য]

সংগ্রামের ভেতর জয়
লুকানো থাকে রূপকের আকারে
আয়নার পিছনে থাকা
মুখের মতোই।

যে কোনো দিন হয়ে যেতে পারে তোমার লড়াই
আর প্রতিটি কোণে একটি স্বপ্ন
অথবা বর্শা থাকতে পারে তোমার প্রতীক্ষায়।

পরাজয়ের আশা করো না
যদি এখনো নিশ্চিহ্ন হয়ে না যাও
তাহলে তোমার আত্মার ভেতর মরচে তরবারির ক্ষয় করতে থাকবে।

মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করো না,
মৃত্যুর জন্য একটি উদাহরণ দরকার।


ওরিহুয়েলা

সারাদিন ধরে আমি মাথায় নিতে ব্যর্থ হলাম মিগুয়েলকে
যা ছিল প্রায় বিস্ফোরণে ফেটে যাবার পর্যায়ে
বহুদিন আগে তারই মতো ওরিহুয়েলা যাবার পথে।

সারাদিন আমি আমার মধ্যে বয়ে বেড়ালাম তার ছাগল জমির দলিল,
তার কর্কশ নাইটিংগেল পাজামা আর তার পকেট,
তার হাস্যোচ্ছল মাটি, খোলা মুখ দিয়ে ছুঁড়ে দিচ্ছিল ভালোবাসার ঝলক।

সারাদিন আমি তার কারাকুঠুরি বয়ে বেড়ালাম,
তার মৃত্যুর আগামী কোনো সন্তানের মতো।

(কবি মিগুয়েল হারনান্দেজের জীবনী পড়ার পর।)


সুযোগ

[ইসাবেলের জন্য]
A roll of the dice will never abolish chance—Mallarme

সব সুযোগই একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট।

সুযোগ হলো একটি অনুসন্ধানের
স্মৃতিচিহ্ন।

রাস্তার
তাৎক্ষণিকতা।

তোমার দেহের উষ্ণ আগুনের ভেতর
গোপন শিকারির পদক্ষেপ।


ইল দানিল বিদায়

স্মৃতির বেদনা
ঘুম পাড়াবে আমায়
যেমন সাগর পাড়ায় পাথরকে।

যদি হৃদয় হতো তরী
থাকত এখানে তার উড়ানের ছায়া।


ঈগল

The four also had the face of an eagle—Ezekiel

কাকেরা যা নষ্ট করেছে সে-সবে তার হাত পূর্ণ ছিল
তার ভাবনা ছিল এক অদ্ভুত সিঁড়িপথ
স্বপ্নরা যেমন কারাগারে যায়

বাঁচার পথের খোঁজ পেয়েছিল সে
স্বর্গীয় উদ্যান আর ধর্ষিত জঠরে
নিজেকে বের করে এনে
কষাঘাত করেছিল ভিতর দরজা
আর খুনি খসড়াগুলোয়।

সে জানত কিসের মৃত্যু হয়েছিল ছায়ার ভেতর
বিধ্বস্ত শুশুকের অরণ্যে

সে চড়েছিল জনহীন পারামসের
মর্মর পাথরে
সে ঘা মেরেছিল সমতলগুলিতে তার শকুন পাখনায়
তার বুকে ঝুলছিল সোনার শিকল

নিজেকে সে উলঙ্গ দেখেছিল
ফাঁসি প্রাচীরের ছায়ায়
পেট ভর্তি মিউ মিউ করা
সমুদ্রবিড়ালের ভায়োলিনের শব্দে

স্মরণ করেছিল তার শাস্তিপ্রাপ্ত হাতের কথা
সে জানত না উড়ানের আগেই ব্রোঞ্জের ছাই উড়ে এসে
পড়েছে তার মুখে

সে ভেবেছিল যে আর উপায় নেই সেরে ওঠার
প্রলাপ আর হিংসার ভেতরকার
ঈগলনখের জ্বর থেকে।

অবশেষে সে অশুভ লক্ষণের ভেতর খোঁজ পেল বিস্মৃতির
কাল্পনিক প্রতীকী হাওয়ার জলাভূমির

সে জানত কখন আতঙ্কের শুরু হবে।

[পারামস- দক্ষিণ আমেরিকার বৃক্ষহীন মালভূমি।]


কিছুতেই তোমাকে বিদায় দিতে পারব না

[প্রিয় কবি তোভারের জন্য এলিজি]

আমি অতলান্তিক দেখি নি
কিন্তু তার ঢেউ ছুঁয়েছি,
স্বপ্নের ভেতর হেঁটে গেছি মাচ্চু পিচ্চু, আন্দিজের চূড়োয়,
ইনকার অলিতে গলিতে।
আমি আমাজন দেখি নি, দেখি নি প্রেইরি, পারামস
অথচ বিষুব বাতাসে পুড়তে পুড়তে ভিজে উঠেছি কতবার।
প্রিয় বন্ধু তুমি ছিলে আমার একমাত্র জীবন্ত লাতিন
বহুদূর থেকে তোমাকে ছুঁতে পারার মুগ্ধতা
আমি কেমন করে বোঝাই!
তুমি চে’র পৃথিবী থেকে এসেছিলে
তুমি মার্কেসের পৃথিবী থেকে এসেছিলে
তুমি এসেছিলে নেরুদা, জোভালদো, দালতোন,
হেরাউদ, কাস্তিল্লো, পায়েরাস, মার্কোসের পৃথিবী থেকে।
তোমার কথা মনে হলেই আমার
ফার্কের বিপ্লবীদের কথা মনে হয়
যাদের বিরুদ্ধে নতুন শতাব্দীর সবচেয়ে ঘৃণ্য
আকাশ অভিযানে নেমেছে মার্কিনী ঈগল
আর তার স্বদেশি অনুচরেরা।
তোমার মাটিতে যে যুদ্ধ এখনো সম্পন্ন হয় নি
যে স্বপ্ন তুমি পুষে রেখেছিলে কলম্বিয়ার অরণ্যের গভীরে,
গম খেতে, কেতজেল পাখির ডানায়
সে স্বপ্ন পূরণ হবার আগেই চলে যেতে হলো?
আমরা কিন্তু তোমাকে ছাড়ব না
তোমার প্রিয় অক্ষরের মধ্যে যে উত্তাপ আছে
তোমার ভালোবাসার বীজের ভেতর যে তোমার সমুদ্রনীল
বিষণ্ণতা আছে, তাকে আমরা ছুঁয়ে থাকব
যতদিন পৃথিবীর সমস্ত মায়ের কোল
না নিরাপদ হয়, ততদিন
আমাদের হাত থেকে তোমার স্মৃতির নিস্তার নেই।
তোমার দেশ কাঁদছে
এশিয়া থেকে একফোঁটা শিশির আমিও পাঠালাম
সেই সমুদ্রের শোকে আহুতি দেবে বলে;
কিন্তু কিছুতেই তোমায় বিদায় দিতে পারব না!

 

 

মৃন্ময় চক্রবর্তী

জন্ম ১৯৭৬। কবি, গদ্যকার, অনুবাদক এবং চিত্রশিল্পী।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :

বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলি [২০০৪]
এই মৃগয়া এই মানচিত্র [ ২০০৮]
পাঁচালি কাব্য : ভুখা মানুষের পাঁচালি [২০০৯]

সম্পাদিত গ্রন্থপুস্তিকা :

রাত্রির কঠোর বৃন্ত থেকে, মানিক শতবর্ষপূর্তি (শমীবৃক্ষ)
নির্মোহ রবীন্দ্রনাথ (শমীবৃক্ষ)

সম্পাদিত পত্রিকা : মাটির প্রদীপ

ই-মেইল : mrinmoyc201@gmail.com