হোম অনুবাদ ওয়ারিশ

ওয়ারিশ

ওয়ারিশ
1.37K
0

‘রোকেয়াকে!’ স্ত্রীর ড্রয়িং রুমের টেবিলের উপর রাখা গয়নার বাক্স থেকে একটি মুক্তো বসানো ক্লিপ নেবার সময় তার উপরের লেখাটি পড়লেন শওকত হুসেন: ‘রোকেয়াকে, শুভেচ্ছান্তে।’

আঞ্জুর পক্ষে এটা খুবই স্বাভাবিক, নিজের সহকারী রোকেয়াকে পর্যন্ত ভোলে নি। কিন্তু তারপরও কী অদ্ভুত ব্যাপার—শওকত হুসেন আবারও ভাবতে থাকেন সবকিছু কেমন সাজানো আর গোছানো রেখে গেছে ও—বন্ধু-বান্ধব, প্রত্যেকের জন্যই কোনো না কোনো উপহার। মনে হয় যেন নিজের মৃত্যুকে ও আগে থেকেই দেখতে পেয়েছিল। বাড়ি থেকে সকালবেলা বের হবার সময়ও তো সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিল; মাত্র দু’সপ্তাহ আগের কথা; ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামল আর অমনি একটা গাড়ি এসে—হত্যা করল ওকে।

রোকেয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন শওকত সাহেব। তিনি তাকে আসতে বলেছেন; এই এত বছর ধরে এই মহিলা তাদের সঙ্গে থেকেছেন কত আন্তরিতার সঙ্গে, তার মনে হলো সেই মহিলার ঋণের কথা। বসে থাকতে থাকতে আবার তার মনে এল সেই ভাবনা—তাই তো, এটা তো অদ্ভুত ব্যাপার যে, আঞ্জু সবকিছু এভাবে সাজিয়ে রেখে গেছে। প্রতিটি কাছের মানুষের জন্য রেখে গেছে কোনো না কোনো প্রীতি উপহার, তার স্নেহের নিদর্শন। প্রত্যেকটি আংটি, গলার হার, ছোট ছোট চীনা বক্স—এই বক্সগুলোর প্রতি ওর ছিল এক গভীর টান—সব জিনিসের উপর কারও না কারও নাম লেখা আছে। কত না স্মৃতি জড়িয়ে আছে এসব জিনিসের প্রতিটিতে।…এই—এই জিনিসটি শওকত আঞ্জুমানকে দিয়েছিলেন;—এইটা—এই এনামেলের ছোট্ট ডলফিনটা; চোখ দুটো রুবি পাথরের তৈরি, ভেনিসের এক গলি পথে হাঁটবার সময় জিনিসটা দেখতেই যেন ছোঁ মেরে নিয়ে নিয়েছিল আঞ্জু। এখনও মনে পড়ে ওর সেই আনন্দের ছোট্ট চিৎকার। তার জন্য অবশ্য তেমন কিছুই রেখে যায় নি আঞ্জু, শুধুমাত্র তার একটা ডায়েরি ছাড়া। পনেরটি ছোট ছোট অধ্যায়—সবুজ চামড়ায় বাঁধানো, সামনেই ওর লেখার টেবিলে পড়ে আছে। বিয়ের পর থেকেই এই ডায়েরিটা লেখা শুরু করেছিল ও। সারা জীবনে হাতে গোনা যে কয়টি দাম্পত্য কলহ হয়েছে—কলহ বলা ঠিক হবে না, খিটিমিটি; তা ঐ ডায়েরিটাকে নিয়েই। শওকত সাহেব যদি কখনও ঘরে ঢুকে দেখতেন তার স্ত্রী ডায়েরি লিখছে, সঙ্গে সঙ্গে আঞ্জুমান সেটাকে বন্ধ করে দিত অথবা নিজের হাত দিয়ে ঢেকে ফেলত। ‘না না না’ তিনি যেন শুনতে পেলেন, ‘আমি মরে গেলে তারপর।’


আয়না যেমনটা বলে—নিজেকে একজন নজরকাড়া সুপুরুষ না ভেবে পারলেন না।


এই ডায়েরিটাই তাহলে তার জন্য রেখে যাওয়া ওয়ারিশ! এই জিনিসটাই একমাত্র ভাগাভাগি করে নি দুজনে এতদিন, যতদিন আঞ্জু বেঁচেছিল। তিনি সব সময় ভাবতেন আঞ্জু তার চেয়ে বেশি দিন বাঁচবে। এক মুহূর্ত থেমে যদি শুধু ভাবতেন যে, ও কী করছে, তাহলে হয়তো এখনও বেঁচেই থাকত। ফুটপাথ থেকে সোজাভাবে রাস্তার দিকে পা দিয়েছিল, যে গাড়িটি তাকে চাপা দিয়েছিল তার ড্রাইভার গোয়েন্দা তদন্তে এই কথা বলেছে। ড্রাইভার নাকি কোনো সুযোগই পায় নি তাকে বাঁচানোর…একটা কণ্ঠস্বর এসে শওকত সাহেবের চিন্তাকে থামিয়ে দিলো।

‘রোকেয়া আপা আসছেন স্যার’,—কাজের লোকটি বলল।

ভদ্র মহিলা ভেতরে এল। তাকে আলাদাভাবে কখনও আগে দেখেন নি শওকত সাহেব, কান্নারত অবস্থায় তো নয়ই। ভীষণ ভেঙে পড়েছে; এটা স্বাভাবিক। কারণ আঞ্জুমান তার কাছে শুধু একজন চাকরিদাতাই নয়, আরও অনেক বেশি কিছু ছিল। বন্ধুর মতোই দেখত ওকে। একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বসতে বলতে বলতে ভাবলেন শওকত সাহেব, তার কাছে এই মহিলা অন্যান্য যেকোনো সাধারণ মহিলার চেয়ে আলাদা কিছুই ছিল না। এই রোকেয়ার মতো—ছোট-খাটো, সাধারণ সস্তা শাড়ি পরা, সহকারীর ফাইল হাতে—কত হাজার হাজার মহিলাই তো আছে। কিন্তু আঞ্জু, সহমর্মিতার এক প্রতিভাস্বরূপ; নিজ গুণে এই রোকেয়া নামের মহিলাটির মধ্যে আবিষ্কার করেছিল যাবতীয় গুণাবলী। বিচক্ষণ, কত শান্ত, কতইনা বিশ্বাসী, এটা-সেটা আরও কত কী!

রোকেয়া প্রথমে কোনো কথা বলতে পারল না। রুমাল বের করে চোখ মুছতে মুছতে বসল। তারপর কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল।

‘আমাকে মাফ করবেন, শওকত সাহেব।’

শওকত সাহেবও বিড়বিড়িয়ে কী যেন বলতে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন—কান্নাটা তো খুব স্বাভাবিক। তিনি ধারণা রাখেন তার স্ত্রী এই মহিলার জন্য কতখানি ছিল।

‘এখানে কত ভালো ছিলাম’, ঘরের চারপশে তাকিয়ে দেখতে দেখতে বলল মহিলাটি। তার চোখ গিয়ে স্থির হলো পেছনে, যেখানে লেখার টেবিলটি রয়েছে। এখানেই ওরা কাজ করত—আঞ্জু ও রোকেয়া। বিখ্যাত একজন রাজনীতিবিদের স্ত্রী হবার সুবাদে অনেক দায়-দায়িত্বই পড়েছিল আঞ্জুর কাঁধের উপর। তার কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারীই ছিল সে। প্রায়ই দেখা যেত তাকে আর রোকেয়াকে লেখার টেবিলটিতে—রোকেয়া টাইপ মেশিন নিয়ে বসে আঞ্জুর বলে দেওয়া কথাগুলো লিখছে। সন্দেহ নেই, রোকেয়াও এসব কথাই এখন ভাবছে। এখন কাজ হলো তার স্ত্রী যে শাড়ির ক্লিপটি ওর জন্য রেখে গেছে তা ওকে দিয়ে দেওয়া। এই উপহারটি ওর জন্য আসলে বেমানান মনে হয়। এর চেয়ে বরং কিছু টাকা দিলে অথবা টাইপ মেশিনখানা দিয়ে দিলেও ভালো হতো হয়তো। অথচ তার বদলে এটা—‘রোরেকয়াকে, শুভেচ্ছান্তে।’

যথারীতি ক্লিপখানা হাতে নিয়ে পূর্বেই ভেবে রাখা কিছু গোছানো বাক্যসহকারে সেটা তাকে দিলেন। তিনি জানেন যে, ক্লিপটিকে রোকেয়া গুরুত্ব দেবে অনেক। তার স্ত্রী নিজে এই ক্লিপ বহুদিন পরেছে…। রোকেয়াও সেই মতো উত্তরে বলল, সে ঠিক কোন চোখে দেখে এই উপহারটিকে, যেন-বা সেও আগে থেকেই কী বলবে তা ভেবে রেখেছিল, ওটি তার কাছে নাকি এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে চিরদিন…। ওর হয়তো অন্য আরও ভালো শাড়ি থেকে থাকবে যাতে ক্লিপটি এত বেমানান মনে হবে না—শওকত সাহেব ভেবে নিলেন। সে পরেছিল একটা সাধারণ শাদা-কালো মেশানো শাড়ি যেটা তার পেশাগত কাজে মানানসই। হঠাৎ খেয়াল করলেন তিনি, ওর যেন কান্না-কান্না ভাব—আসলেই তাই। ওর নিজেরও তো আছে এক দুঃখের স্মৃতি—একমাত্র ভাইটি, যার কাছে সে ছিল নিবেদিত প্রাণ—মাত্র এক বা দুই সপ্তাহ হলো মারা গিয়েছে। কী যেন একটা দুর্ঘটনায় যেন-বা। শুধু মনে পড়ছে আঞ্জু তাকে কী যেন একটা বলেছিল এ ব্যাপারে;—আঞ্জু, করুণার এক প্রতিভা, সহজাত কারণেই এ ব্যাপারটিতে ভয়ঙ্কর ভেঙে পড়েছিল।

ইতোমধ্যে রোকেয়া উঠে দাঁড়িয়েছে। দৃশ্যত, সে হয়তো বুঝেছিল যে, আর দেরি করা অনুচিত। কিন্তু শওকত সাহেব ওর ভবিষ্যতের ব্যাপারে দু’একটা কথা না বলে যেতে দিলেন না। কী কী পরিকল্পনা আছে আর? কোনো ব্যাপারে কোনো প্রয়োজন কিনা…ইত্যাদি। রোকেয়া এক পলক তাকিয়েছিল টেবিলের দিকে, যেখানে সে তার টাইপ মেশিনটি নিয়ে বসত, যেখানে ডায়েরিটা পড়েছিল। আর আঞ্জুর স্মৃতির ভেতরে হারিয়ে গেল সে, মুহূর্তকাল তার পরামর্শের কোনো উত্তরই দিতে পারল না। তাকে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সে যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। সুতরাং তাকে আবার বলতে হলো: ‘কী করবেন বলে ভাবছেন মিস রোকেয়া?’

‘কী ভাবছি! ও হ্যাঁ, না না, কোনো অসুবিধা নেই, শওকত সাহেব’, নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘আপনি দয়া করে আমার ব্যাপারে কোনো চিন্তা করবেন না।’

শওকত সাহেবের মনে হলো মহিলাটির বোধহয় কোনোরকম অর্থ সাহায্যের প্রয়োজন নেই। বরং ভালো হবে ওর জন্য কাগজে-কলমে ধরনের কিছু একটা করা। এই মুহূর্তে যা করা সম্ভব তা হলো, যেমনটা করলেনও তিনি; তার হাতটা চেপে ধরে বললেন, ‘মিস রোকেয়া, যদি কখনও কোনোরকমের সাহায্যের প্রয়োজন হয় আপনার, মনে রাখবেন সেটাকে আমি আমার কর্তব্য বলেই ধরে নেব…।’ এই বলে তিনি দরজা খুলে দিলেন। এক মুহূর্তের জন্য, চৌকাঠের উপর, হঠাৎ করে কী যেন এক চিন্তায় রোকেয়া দাঁড়িয়ে পড়ল। ‘শওকত সাহেব’, রোকেয়া বলল, প্রথমবারের মতো একেবারে সোজাসোজি তার দিকে তাকিয়ে আর প্রথমবারের মতো শওকত সাহেবও তার মুখভঙ্গি দেখে ধাক্কা খেয়ে গেলেন, আন্তরিকতাপূর্ণ, কিন্তু কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে চোখ দুটি—‘যদি যেকোনো সময়’, সে বলতে থাকে—‘যেকোনো কিছু যদি আমি আপনার জন্যও করতে পারি তাহলেও তা নিজের ভাগ্য বলে মনে করব।’

এই বলে সে চলে গেল। কিন্তু যে শব্দগুলো সে বলল আর যে দৃষ্টি দিয়ে গেল তা ছিল একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। মনে হলো তার যেন এটা স্থির ধারণা বা আশা যে, অবশ্যই তাকে শওকত সাহেবের প্রয়োজন হবে। শওকত সাহেবের মাথায় একটা উৎসুক আর চমকপ্রদ চিন্তা এসে উপস্থিত হলো যখন তিনি ফিরে গিয়ে বসলেন তার নিজের চেয়ারটিতে। এমন কি হতে পারে যে দীর্ঘ দিন যাবৎ তিনি তাকে খেয়ালই করেন নি অথচ তার প্রতি সে লালন করত এক গোপন আবেগ, যেমনটা সাধারণত নাটক নোবেলে হয়ে থাকে। দরজা থেকে ফিরে যাবার সময় তিনি একটা আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে পেলেন। পঞ্চাশের উপরে বয়স তার; অথচ আয়না যেমনটা বলে—নিজেকে একজন নজরকাড়া সুপুরুষ না ভেবে পারলেন না।


শ্রমিক শ্রেণির একজন পুরুষ, যারা ভদ্রমহিলাদের ড্রয়িংরুমে যাবার কল্পনামাত্রই করতে পারে।


‘বেচারি রোকেয়া!’ মুচকি হাসতে হাসতে বললেন তিনি। এই মজার ব্যাপারটা নিজের স্ত্রীর সাথে ভাগাভাগি করতে পারলে কী ভালোই না লাগত! তিনি এগিয়ে গেলেন আঞ্জুমান এর ডায়েরিটার দিকে। ‘শওকতকে’, ডায়েরিটা খোলামাত্রই দেখতে পেলেন, ‘কী চমৎকার দেখাচ্ছিল…।’ ব্যাপারটা এমন হলো যে, মনে হলো যেন তার স্ত্রী তারই কথার জবাব দিলো। মনে হলো, সে যেন বলল, তুমি তো মহিলাদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। রোকেয়ারও হয়তো তাই মনে হয়েছে। তিনি পড়তে লাগলেন, ‘ওর স্ত্রী হতে পেরে আমি কতইনা গর্বিত!’ আর স্বামী হিশেবে শওকত সাহেবও যথেষ্ট গর্ব বোধ করতেন। প্রায়ই যখন তারা একসঙ্গে বাইরে ডিনার করতে যেতেন তখন নিজেদের টেবিলের চারপাশে তাকিয়ে দেখতেন আর তখন আঞ্জুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলতেন, ও হলো এখানকার সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা! তিনি পড়তে থাকেন। সে বছর প্রথম তিনি সংসদে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা তখন নিজেদের এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের জন্য ঘুরে বেরিয়েছেন একসঙ্গে।…‘শওকত যখন মঞ্চে গিয়ে বসল তখন লোকজনের প্রতিক্রিয়া ছিল মারাত্মক। পুরো দর্শকসারি উঠে দাঁড়াল আর গাইতে লাগল—“ও আমার দেশের মাটি তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।” আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।’

শওকত সাহেবের মনে পড়ল ঘটনাটি। আঞ্জু মঞ্চে তার পাশেই বসেছিল। তিনি আজও মনে করতে পারেন, সে তার দিকে কী অবাক চোখে তাকিয়েছিল তখন, আর কিভাবে ওর চোখে এসেছিল আনন্দাশ্রু। আর তারপর? শওকত পাতা উল্টালেন—তারা একসময় ইতালির ভেনিসে গিয়েছিলেন। নির্বাচনের পর সেই সুখময় ছুটির দিনগুলোর কথা তার মনে পড়ল। ভেনিসের বিখ্যাত ‘ফ্লোরেইন্স’-এর আইসক্রিম খেয়েছিলেন তারা। তিনি হাসলেন—তখনও কতটা শিশুর মতো ছিল আঞ্জু, আইসক্রিম খেতে ভালোবাসত। ‘শওকত ভেনিসের ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটা বর্ণনা আমাকে শোনাল। ও বলল যে ডজেরা নাকি…’ সে এসব বর্ণনা লিখে রেখেছে এমনভাবে যেন একটা স্কুলের মেয়ের খাতা। আঞ্জুর সাথে বেড়াতে যাবার একটা মজা ছিল যে, ও শিখতে খুব আগ্রহী ছিল। সে ছিল একেবারেই গাধা, এটা প্রায়ই বলত ও নিজেই, যেন এটা কতই না-খারাপ একটা ব্যাপার। আর তারপর—তিনি পরের অধ্যায়টি খুললেন—তারা ঢাকা ফিরে এলেন। ‘আমাকে যাতে লোকজন প্রশংসা করে সে ব্যাপারে আমি ছিলাম ভীষণ সচেতন। আমি আমার বিয়ের গয়নাগুলো আর দামি শাড়ি পরেছিলাম।’ তিনি যেন দেখতে পাচ্ছিলেন ওকে, বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা, দলের প্রধান ওবায়েদ সাহেবের পাশে বসে আছে, বিজয়ীনির মতো। শওকত সাহেব পড়তে লাগলেন; দ্রুত, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা, আঞ্জুর ছোট ছোট খণ্ড খণ্ড বর্ণনার ভেতরে নিজের স্মৃতিগুলো মিলিয়ে মিশিয়ে পড়তে লাগলেন। ‘রাতের খাবার খেলাম সংসদ ভবনে…প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ভোজসভায়। মন্ত্রী সাহেবের স্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, শওকতের স্ত্রী হিশেবে আমি নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল কিনা।’

তার কয়েক বছর পর—অন্য একটি অধ্যায় খুললেন শওকত হুসেন—তিনি তখন নিজের কাজের ভেতরে একেবারে ডুবে গিয়েছিলেন। আর আঞ্জু, স্বাভাবিকভাবেই হয়ে গিয়েছিল আরও একাকী। ওর জন্য খারাপই লাগত, কারণ ওর কোনো ছেলে-মেয়ে ছিল না। ‘কত যে চেয়েছিলাম’ একটা অধ্যায়ের শুরুতে লেখা—‘শওকতের একটা ছেলে হোক!’ খারাপ দেখালেও সত্য যে, এ ব্যাপারে শওকত নিজে কখনো দুঃখ প্রকাশ পর্যন্ত করেন নি। জীবন এমনিতেই কত পূর্ণ, কত ভরপুর ছিল। সে বছর সরকার তাকে ছোট-খাট এক পদ দিয়েছিল; সরকারের ছোট-খাটো একটা পদ, অথচ ওর মন্তব্য ছিল; ‘এখন আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে ও একদিন প্রধানমন্ত্রী হবে!’ যাই হোক, কোনোরকম অন্যথা না হলে হয়তো এটাও সম্ভব হতো। তিনি এখানটায় একটু থামলেন, কী হতে পারত একবার ভেবে নিলেন। রাজনীতি ছিল একটা জুয়া, মনে পড়ে; কিন্তু সবকিছু এখনও শেষ হয়ে যায় নি। এ পঞ্চাশ বছর বয়সেও নয়। দ্রুত তিনি আরও কিছু পাতায় চোখ বোলালেন, ছোট ছোট ঘটনায় ভরা, অগুরুত্বপূর্ণ, দৈনিক সাধারণ ঘটনাবলীর বর্ণনা, আঞ্জুর জীবনের গল্প।

অন্য আর একটা অধ্যায় নিয়ে দ্রুত পাতা উল্টালেন তিনি। ‘আমি কি ভীতু! সুযোগটাকে চলে যেতে দিলাম। কিন্তু এটা খুব স্বার্থপরের মতো দেখাত যদি তাকে আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে চিন্তায় ফেলে দিতাম, যেখানে ওর নিজেরই অনেক বিষয় আছে ভাববার। আর আমরা কত অল্পদিনই বিকেলটা এক সাথে কাটাতে পাই।’ এখানে সে আসলে কী বোঝোতে চেয়েছিল? ওহ, এই তো তার ব্যাখ্যা রয়েছে এখানটায়—সেবা সংস্থায় ওর কাজের ব্যাপারে লিখেছে ও। ‘আমি সাহস করলাম এবং শেষটায় বলেও ফেললাম শওকতকে। ও দয়াবান, কত ভালো। কোনো নিষেধ করল না।’ সেদিনকার কথাবার্তা তার মনে পড়ল। সে সেদিন বলেছিল কতটা অলসভাবে দিন কাটায়, কোনোই কাজ নেই তার। সে চায় তার নিজের কোনো কাজ থাকুক। কিছু একটা করতে চেয়েছিল—বলতে গিয়ে তার মুখটা রাঙা হয়ে উঠেছিল, শওকত সাহেবের মনে পড়ে—অন্যদের সাহায্যার্থে সে কাজ করতে চেয়েছিল—ওই তো, ওই চেয়ারটিতে বসেই সে বলছিল কথাগুলো। খেলাচ্ছলে একটু অনুযোগও করেছিলেন তিনি তখন আঞ্জুমানের প্রতি। স্বামীর সেবাযত্ন, ঘরকন্যা, এতসব কাজ কি যথেষ্ট ছিল না ওর জন্য? অবশ্য তারপরও যদি বাইরের কাজ ওর এত ভালো লাগে তাহলে তার কোনো আপত্তি নেই। কী আর তেমন কাজ। কোনো কোনো জেলায় যাওয়া, কিছু মিটিং-সিটিং। শুধু এটাই ওকে মনে রাখতে হবে যেন আবার অসুস্থ হয়ে না পড়ে।

সুতরাং প্রত্যেক বুধবার ওকে বিভিন্ন বস্তি এলাকায় যেতে হতো। তার মনে পড়ে কী ঘেন্নাই না লাগত ঐসব দিনগুলোতে যখন সে একেবারে শাদামাটা শাড়ি পরে বের হতো। কিন্তু সে যে এসব কাজগুলোকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল তা বোঝা যেত। তার ডায়েরি ভরা এ ধরনের উদাহরণ: ‘কুলসুম বেগম…দশটা ছেলে-মেয়ে তার…স্বামীর একটা হাত কাটা গেছে দুর্ঘটনায় পড়ে…আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করলাম একটা চাকরি দিতে’, তিনি মাঝে মাঝে লাইন বাদ দিয়ে পড়ে যেতে লাগলেন। শওকত সাহেবের নামটা খুব কমই এসেছে ডায়েরিতে। তার আগ্রহ ইতোমধ্যে কমে গেছে। কিছু কিছু বাক্যের কোনো অর্থই খুঁজে পেলেন না তিনি। উদাহরণস্বরূপ: ‘সোস্যালিজম নিয়ে কিছু তর্ক হলো ‘ক’ এর সঙ্গে।’—কে এই ‘ক’?—অক্ষরটি দিয়ে কোনো নামই তার মনে পড়ল না; হবে কোনো কমিটি মিটিং-এ হয়তো দেখা হয়েছিল, ভাবলেন তিনি। ‘ক’ উচ্চবিত্তদের ভয়ানকরকম সমালোচনা করল…আমি মিটিং শেষে যখন ক-এর সঙ্গে হেঁটে আসছিলাম তখন ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু লোকটা বড্ড একগুয়ে মনের।’ তার মানে এই ‘ক’ হলো একজন পুরুষ—সন্দেহ নেই ঐসব আঁতেলদের কেউ একজন হবে—যেমনটা আঞ্জু লিখেছে—যারা আসলে হলো ভীষণ একগুয়ে আর ভয়ানক। বোঝা যাচ্ছে যে, সে ঐ লোকটাকে নিমন্ত্রণ করেছিল এবং তার সঙ্গে দেখা করেছিল। ‘ক’ ডিনারে এসেছিল। সে মিনির সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল!’ এই বিস্ময়সূচক চিহ্নটি তার মনের চিত্রপটে অন্য আরেক মোচড় দেয়। মনে হচ্ছে সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলাদের সঙ্গে ওঠা-বসা তার মোটেই ছিল না।

ধারণা করা যায়, সে হয়তো শ্রমিক শ্রেণির একজন পুরুষ, যারা ভদ্রমহিলাদের ড্রয়িংরুমে যাবার কল্পনামাত্রই করতে পারে। শওকত জানেন এ ধরনের লোকদের সম্বন্ধে, তাই এই ‘ক’ যেই হোক তার প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই। এই এখানটায় আবার ‘ক’ প্রসঙ্গে—‘ক’ এর সঙ্গে শহিদ মিনারে গিয়েছিলাম। সে বলে আবার বিপ্লব আসতে বাধ্য। সে বলে, আমরা নাকি বোকার স্বর্গে বাস করছি।’ ক-এর মতো লোক তো তাই বলবে—মনে হলো শওকত সাহেব স্পষ্টভাবে নিজেও ক-এর কথাগুলো শুনেছেন। মনে হলো দেখতেও পাচ্ছেন তাকে—একটা গাট্টাগোট্টা খাটো মতো মানুষ, দাড়ি-গোঁফে উসকোখুসকো, মোটা সস্তা কাপড়ের পোশাক পরনে, যে জীবনেও হয়তো কোনো সৎ কর্ম করে নি। নিশ্চয়ই আঞ্জুও ওর সম্বন্ধে তাই ভাবত? তিনি পড়তে থাকেন। ‘ক’ মেনে নেবার অযোগ্য কিছু কথা বলল…সম্বন্ধে।’ নামটা খুব সাবধানে কাটিকুটি করে রাখা। ‘আমি তাকে বললাম যে, আমি আর কোনো বাজে কথা শুনব না…সম্বন্ধে।’ আবারও নামটা কেটে অস্পষ্ট করে ফেলা হয়েছে। হতে পারে কি এটা আসলে ছিল শওকত সাহেবেরই নাম? তাহলে কি এ কারণেই আঞ্জুমান সেদিন তাড়াতাড়ি ডায়েরির পৃষ্ঠা ঢেকে ফেলেছিল যখন তিনি ঘরে ঢুকেছিলেন।

এই চিন্তাটি ক-এর প্রতি তার বিরক্তিবোধ বাড়িয়ে দিলো। কত বড় সাহস, তারই রুমে বসে তাকেই সমালোচনা! আঞ্জু কেন তাকে কখনও বলে নি? সে তো কোনোকিছুই গোপন করত না; কথা ও কাজে সে ছিল একান্ত সরলপ্রাণ। তিনি পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলেন, ‘ক’ সম্বন্ধে সব ক’টা বাক্য পড়তে লাগলেন। ‘ক’ আমাকে তার ছোটবেলার গল্প শোনাল। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নাকি মানুষের ঘরমোছার কাজ করেছেন ওর মা…এটা যখনই আমি ভাবি, আমি মেনে নিতে পারি না…নিজের জীবনের এত বিলাসবহুলতা…একটা লিপস্টিক কিনে ফেলি তিন হাজার টাকায়!’ এত জটিল জটিল চিন্তা করে নিজের ছোট্ট মাথাটাকে অযথা না ঘামিয়ে আঞ্জু যদি শুধু একবার বিষয়টা নিয়ে আলাপ করত শওকত সাহেবের সঙ্গে। লোকটা ওকে বই ধার দিয়েছিল। কার্ল মার্কস। The Coming Revolution আদ্যাক্ষর ‘ক’ ‘ক’ ‘ক’, বারবার—বারবার এসেছে। একবারও কেন তার পুরো নাম লেখে নি। এই আদ্যাক্ষরের ব্যবহারগুলো যেন কেমন ঘরোয়া, আন্তরিক—যা ঠিক আঞ্জুর সঙ্গে মেলে না। সামনা-সামনি সে তাকে কি ‘ক’ বলেই ডাকত? তিনি পড়তে থাকলেন।


তার নিজের স্ত্রী একজন অচেনা মানুষকে সঙ্গ দিচ্ছে, একাকী।


ডিনারের পর ‘ক’ এল অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই। সৌভাগ্যক্রমে আমি ছিলাম একা।’ মাত্র এক বছর আগের ঘটনা। ‘সৌভাগ্যক্রমে’—কেন লিখেছে, সৌভাগ্যক্রমে?—‘আমি ছিলাম একা।’ শওকত সাহেব সেই রাতে কোথায় ছিলেন? নিজের নোটবুক খুলে তিনি এক বছর আগের সেই দিনের প্রোগ্রামগুলো পরীক্ষা করে নিলেন। শহরের মেয়র ভোজসভা ডেকেছিলেন সেদিন। তার মানে ‘ক’ আর আঞ্জুমান সেদিন সন্ধ্যাটা কাটিয়েছিল দুজনে! তিনি মনে করার চেষ্টা করলেন, যখন তিনি বাড়ি ফিরছিলেন তখন আঞ্জু কি তার জন্য অপেক্ষায় বসেছিল? রুমটা কি আর আর দিনের মতোই স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল? টেবিলের উপর কি পড়েছিল সিগারেটের ছাই কিংবা প্রান্তভাগ? চেয়ার দুটো কি ছিল একেবারেই কাছাকাছি টেনে আনা? তিনি কিছুই মনে করতে পারলেন না—কিছু না; নিজের দেওয়া বক্তব্যটা শুধু মনে পড়ছে, যেটা তিনি সেদিন দিয়েছিলেন ভোজসভায়। ক্রমে বিষয়টা একেবারে ব্যাখ্যাতীত হয়ে পড়ল তার কাছে—সমগ্র বিষয়টাই: তার নিজের স্ত্রী একজন অচেনা মানুষকে সঙ্গ দিচ্ছে, একাকী। হয়তো এর পরের অধ্যায়ে আছে এর ব্যাখ্যা। কম্পমান হাতে তিনি ডায়েরির শেষ অধ্যায়টিতে পৌছলেন—অধ্যায়টি অসম্পূর্ণ রেখেই মারা গেছে আঞ্জুমান।

এখানেও প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই সেই অভিশপ্ত আদ্যাক্ষরটি। ‘ক-এর সঙ্গে একা ডিনার করলাম। সে খুব উত্তেজিত হযে পড়ল। সে বলল, এই মুহূর্তে আমরা একজন আর একজনকে বুঝতে পারছি…আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি। কিন্তু সে শুনতে রাজি নয়। সে হুমকি দিয়ে আমাকে বলে, আমি যদি…’ পৃষ্ঠার বাকি অংশটা অস্পষ্ট। পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে সে লিখে রেখেছে, মিশর মিশর মিশর…। একটা শব্দও এর ভেতর থেকে বের করে শওকত সাহেব পড়তে পারলেন না; কিন্তু এইসব কিছুর তো একটাই মাত্র ব্যাখ্যা হতে পারে: স্কাউন্ড্রেলটা তার স্ত্রীকে অভিসারিণী বানাতে চেয়েছিল…তার নিজেরই রুমে! শওকত সাহেবের মুখ লাল হয়ে গেল। দ্রুত পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে লাগলেন। আঞ্জু কী উত্তর দিয়েছিল এই বেটাকে? আদ্যাক্ষরগুলো আর নেই। শুধু ‘সে’ এখন। ‘সে আবার এল। তাকে বললাম এ মুহূর্তে আমি কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছি না।…তাকে চলে যাবার জন্য বললাম।’ এই বাড়িতেই সে আঞ্জুর উপর জবরদস্তি করেছিল? কিন্তু কেন আঞ্জু এ কথা এতদিনেও তাকে বলে নি। এক মুহূর্তের জন্য হলেও কি আঞ্জুর মনটা তখন টলে ওঠে নি? তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে কেন ইতস্তত করল?…তারপরে: ‘তাকে আমি একটা চিঠি লিখলাম।’ তারপরের পৃষ্ঠাগুলো খালি। তারপরে আবার লেখা: ‘চিঠির কোনো উত্তর এল না।’ তারপর আরও আরও খালি পৃষ্ঠা; আর তারপর এই ‘সে হুমকিতে যা বলেছিল তাই করেছে।’ তারপরে—তারপরে কি? শওকত পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টান। সব শূন্য। হ্যাঁ, এইখানে, ওর মৃত্যুর ঠিক আগের দিনের লেখা: ‘আমারও কি সাহস আছে ওটা করার?’—এই ওর লেখা শেষ লাইন।

শওকত ডায়েরিটা ঠেলে ফেলে দিলেন মেঝেতে। তিনি আঞ্জুমানকে যেন ঠিক তার সামনে দেখতে পাচ্ছেন। সে দাঁড়িয়ে আছে ফুটপাথের প্রান্তভাগে। তার চোখে স্থির দৃৃষ্টি; হাত শক্তভাবে মুষ্টিবদ্ধ। ওই গাড়িটা এল আর… তিনি কিছুতেই মানতে রাজি নন। সত্যিটা জানতেই হবে তাকে। ফোন করলেন।

‘মিস রোকেয়া!’ অপর প্রান্ত নীরব। তিনি শুনতে পেলেন কেউ একজন হাঁটছে যেন রুমটিতে।

‘আমি রোকেয়া বলছি’—কণ্ঠস্বরটি অবশেষে কথা বলল।

তিনি বজ্রকণ্ঠে বললেন, ‘কে এই ‘ক’?’

তিনি শুনতে পেলেন রোকেয়ার ঘরের দেয়ালে টিকটিক করছে কোনো সস্তা ঘড়ি; তারপর একটা লম্বা নিঃশ্বাসের আওয়াজ।

‘সে ছিল আমার ভাই!’ রোকেয়া বলল, ‘যে ভাই আত্মহত্যা করেছিল কিছুদিন আগে।’

তিনি শুনলেন রোকেয়া জিজ্ঞাসা করছে, ‘কিছু কি জানতে চাইছেন?’

‘না’—চিৎকার করলেন, ‘কিছু না।’

তিনি তার ওয়ারিশি সম্পত্তি পেয়ে গেছেন। আঞ্জু শেষ সত্য বলে গিয়েছে তাকে। সে তার প্রেমিকের সঙ্গে মিলনের জন্য লাফিয়ে পড়েছে ফুটপাথ থেকে রাস্তায়। ফুটপাথ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে শওকতের কাছ থেকে মুক্তি পাবার জন্য!

নোট :
গল্পের চরিত্রগুলোর নাম বদলে দিয়েছি এভাবে—

মি. গিলবার্ট ক্লানডন                                                 শওকত হুসেন
অ্যাঞ্জেলা                                                            আঞ্জুমান
মিস. সিসি মিলার                                                   রোকেয়া
স্যার এডয়ার্ড                                                       ওবায়েদ
মিসেস জোনস্                                                       কুলসুম বেগম
বি.এম.                                                             ‘ক’

এছাড়াও বদলে দিয়েছি কয়েকটা জায়গার নাম। যেমন: লন্ডন হয়েছে ঢাকা এবং লন্ডন টাওয়ার হয়েছে শহিদ মিনার ইত্যাদি। নামগুলো ছাড়াও আরও কিছু কিছু জায়গায় ইচ্ছাকৃত পরিবর্তন এনেছি। যেমন ‘Broach’-কে বলেছি ‘শাড়ির ক্লিপ’, ‘attahe’-কে বলেছি ‘সহকারী’, মদের গ্লাসের পরিবর্তে লিখেছি সিগারেটের ছাই ইত্যাদি। এছাড়া অন্যান্য সবক্ষেত্রে চেয়েছি বিশ্বাসযোগ্য থাকতে, যতটা সম্ভব কাছাকাছি থাকা যায় মূল গল্পের এবং ভাষার। এসব কিছুর পেছনে একটাই কারণ, সেটা হলো—অনুবাদ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, যখন আমি প্রথম গল্পটি পড়ি তখন থেকেই যে, এরকম একটা ঘটনা শুধুমাত্র পৃথিবীর যেকোনো একটি দেশ বা একটি সমাজে আটকে থাকতে পারে না। এই গল্প সার্বজনীন, যেকোনো নারী-পুরুষের জন্য। তাই গল্পের শরীরটাকে লন্ডন থেকে ঢাকায় এনে দেখতে চেয়েছি। চেয়েছি লেখিকার আরও কাছাকাছি হতে। ভাষারভঙ্গিতে তাই দু’এক জায়গায় সামান্য ঘুরিয়ে দিলেও আমি প্রতিটি শব্দ ও লাইনের এবং প্রতিটি যতিচিহ্নের কাছে থেকেছি দায়বদ্ধ। এবার পাঠক বলুন…

sakira.mukta@yahoo.com'
sakira.mukta@yahoo.com'

Latest posts by সাকিরা সুলতানা (see all)