হোম অনুবাদ উত্তর আমেরিকার পাঁচটি সাম্প্রতিক কবিতা

উত্তর আমেরিকার পাঁচটি সাম্প্রতিক কবিতা

উত্তর আমেরিকার পাঁচটি সাম্প্রতিক কবিতা
761
0

যুক্তরাষ্ট্রের ২০০১- ২০০৩ সালের পোয়েট লরিয়েট বিলি কলিন্স সম্পাদিত ‘পোয়েট্রি ১৮০’ ( র‍্যানডম হাউস ট্রেড পেপারব্যাকস নিউ ইয়র্ক, ২০০৩) এবং  কারমিন স্টারনিনো ও মলি পিকক সম্পাদিত ‘দা বেস্ট ক্যানাডিয়ান পোয়েট্রি ২০১২’ (টাইট্রোপ বুকস, ২০১২)—এই  দুটি সাম্প্রতিক কবিতার সংকলন থেকে কবিতাগুলো নেয়া হয়েছে। চ্যাঙমিঙ ইউয়ান কানাডার কবি, বাকি সবাই যুক্তরাষ্ট্রের।

এডওয়ার্ড নোবলস : কবিতার বইয়ের নাম থ্রু ওয়ান টিয়ার ( ১৯৯৭), দা ব্লু স্টোন ওয়াক ( ২০০০)। বসবাস  করেন যুক্তরাষ্ট্রের মেইন রাজ্যের পেনবস্কট নদীর ধারের বেনগর শহরে।

রবার্ট ফিলিপস : সাতটি কবিতার বই (স্পিনাচ ডেজ, সিলেক্টেড পোয়েমস ইত্যাদি) ও তিনটি গল্পগ্রন্থের জনক; সম্পাদক ও সমালোচক। হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস এন্ড লেটারস থেকে পুরস্কার পেয়েছেন।

চ্যাঙমিঙ ইউয়ান : চীনের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম। কানাডায় অভিবাসনের আগেই লেখালেখি শুরু করেন। ইংরেজিতে ডক্টরেট এই কবি ভ্যানকুভারে শিক্ষকতা করেন। তাঁর ছেলে এলেন কুইং ইউয়ানও একজন কবি।  দেশবিদেশের বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় ও সংকলনে চ্যাঙমিঙ ইউয়ানের কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভবত তিনিই ম্যান্ডারিনভাষী কিন্তু ইংরেজিতে লিখেন এমন কবিদের মধ্যে বিরল একজন।

রিচার্ড জোনস : কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের জনক; উল্লেখযোগ্য কবিতার বই হচ্ছে দা ব্লেসিংস : নিউ এন্ড সিলেকটেড  পোয়েমস। বেশ কিছু কাব্য সংকলনে তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে।

জো ওয়েন্ডেরথ : শৈশব কেটেছে বাল্টিমোরে। কবিতার বই ডিজফরচুন ( ১৯৯৫), ইট ইজ ইফ আই স্পিক (২০০০)। উপন্যাসও লিখেছেন। মিনেসোটার মার্শালে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক।

মোশতাক আহমদ


নীল পরিবার ॥ এডওয়ার্ড নোবলস
Nuclear Winter by Edward Nobles

.
যেদিন নীল আসমানটা নেমে এসেছিল—
আকাশের নিচে চাপা পড়ে পৃথিবীটা নীল হলো,
ঘরবাড়ি গাড়িঘোড়া ঝোপঝাড়
আকাশের রঙ মেখে নীলাভ সাজলো;
শিশুরা সহসা অন্ধ দৌড়বাজ ।
আমার গিন্নি নীল ফ্যাশনেবল পোশাক পরে
হাতে রাখল হাত, নীল চোখে বিষাদ;
আমি হাঁটা দিলাম বাড়ির পেছনে অরণ্যের দিকে—
নীল গাছের ভেতর নীল তুষারে ঢেকে গেলাম।
গাছের ফোঁকর থেকে বেরিয়ে এল একটা নীল কাক
পথের ওপর শুয়ে পড়ে বেদনায় নীলবর্ণ শৃগাল।

সে বছরটা খুব দ্রুত ফুরিয়ে গেল পৃথিবীতে।

আমাদের দুই ছেলেমেয়ে অবশেষে
আমাদের দেহের উপর হাঁটু গেঁড়ে বসল
নীল গ্র্যানাইট পাথর সেজে।

ঈশ্বরের ভালোবাসা চেয়ে চেয়ে কেউ কাঁদছে—
একটি নীলরঞ্জিত পরিবার
নীল তুষারের ভেতর হারিয়ে গেল।


সন্ত্রস্ত পাখি ॥ রবার্ট ফিলিপস
A Panic Bird by Robert Phillips

.
এই মাত্র উড়ে এল বুকের ভেতর
কিছুকাল আলো দেবে মগজে আবার
ভুল করে ঢুকে যাচ্ছে হাড়ের রাজত্বে
ভাঙনের শব্দ পাই বুকের খাঁচায়

দেখতে পেলে নির্ঘাত বাধা দিতাম শত
শক্ত ঢিল ছুড়ে কিংবা লাঠি দেখিয়ে
অথবা চকিতে ধরেই ফেলতাম ঘাড়

চালাক পাখিটা আসে পেছন দরজায়
নাগালের বাইরে ওড়াউড়ি তার
দেহের দালানে ঢুকে শতেক জ্বালাতন

শকুন আটকে যেনবা ইলেকট্রিকের তারে
বিকট চিৎকার ডানা ঝাপটানোর ফাঁকে
আমার যকৃতে ধারাচ্ছে তার ঠোঁট
নাড়িভুঁড়ি ফুসফুস ছিন্নভিন্ন তাতে
হাড় কালা আর রক্ত কালা হায়
নিশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে প্রায়

এমন সময় সরু ডানা ঝাপটে বেরোয়
উড়ছে উড়ছে ওই যে যাচ্ছে চলে
রেখে গেল দুর্গন্ধ আর ঝরা পালকের রাত

জীবন তো বয়ে চলে
নতুন শিকার হতে


অপেক্ষমাণ ॥ চ্যাঙমিঙ ইউয়ান
Waiting by Changming Yuan

.
ঘুরপথে আসা লেট করা বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা থাকে যাত্রীদের
শীতের ঘাসের জন্যে যেমন অপেক্ষা

জেব্রাশাবক শিকারের আগে সিংহেরও অপেক্ষা থাকে
গ্রীষ্মকালের সূর্য অপেক্ষমাণ কুয়াশাময় দুঃস্বপ্নের

জানালার পাশে অপেক্ষমাণ সবুজ অর্কিড
অজানা খনির গহবরে হিরার দ্যুতিময় অপেক্ষা

প্রাত্যহিক গাছগাছালি দেখতেও খামোখা দাঁড়িয়ে যাওয়া
অন্ধকারের জন্য অপেক্ষা
যে অন্ধকার শব্দে অনূদিত হবে শাদা কাগজে

আলোকবর্ষ জুড়ে শীতার্ত তারাদের অপেক্ষা
লেখা শেষ করে দীর্ঘতর অপেক্ষা


ঘণ্টা ॥ রিচার্ড জোনস
The Bells by Richard Jones

.
নির্জন টাওয়ারের ঘণ্টা
কবির মতোই ভাবছে বসে একলা ঘরে;

এক-মানুষের শক্তি লাগে
লোহায় গড়া সেই ঘণ্টা নাড়াতে ।

হঠাৎ নিচের দড়িতে কার স্পর্শ পেল টের:
বাজার সময় হলো এইবেলা
বুঝতে পেরে  মাথা নাড়ে ।

দূরের এক ঘরে
কবি শুনল রাত একটা বাজার নির্ঘোষ,
ঘণ্টা বাজছে—
উৎকর্ণ তাই।


আমার জীবন ॥ জো ওয়েন্ডেরথ
My Life by Joe Wenderoth

.
অবশেষে নিজের ঘরে ঢুকে দেখি
ফাঁদে পড়ে আছে এক ভয়ার্ত জানোয়ার,
দানাপানি দিয়ে বাঁচাই,
কৃতজ্ঞতায় ঘুর ঘুর করে আমার দুপায়ে:

পোষা প্রাণীটার নাম রাখলাম ‘বাবাজীবন’।
রোজ দানাপানি দিতে হয় নিজ হাতে
আমার বিছানায় ঘুমায়, স্বপ্নের ভেতর শ্বাস নেয়,
ভালবাসায় বেড়ে ওঠে, শক্তপোক্ত হয়
বেঁচে থাকবার খুচরো চালাকিগুলো শেখে।

সেদিন ওর গলায় চেন বেঁধে সান্ধ্য ভ্রমণে বেরিয়ে মনে হলো
সহজেই আমাকে খুন করে ফেলতে পারে সে
যখন তখন
হয়তো সে মতলবেই রয়ে গেছে এ বাড়িতে,
আমিও পালছি সরল বিশ্বাসে।
জানি না কী করা!

দানাপানি বন্ধ করে দিলাম,
হেলদোল নাই, আরো ডাগর হচ্ছে,
নিজেই নিজের খেয়াল রাখছে ইদানীং।
ওকে আর ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি শোনাই না,
তবুও নিরাপদ তন্দ্রা।
জানি না কী উপায়!

বাবাজীবনকে আর কোনও খুচরা চালাকি শেখাই না—
নিঃসঙ্গতার খাঁচায় রেখে আসি বারান্দার কোণে;
দেখি, সে-ই আমাকে আরেকটা নিঃসঙ্গতার খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়েছে।
কিছু বলার কি করার নেই।
বাবাজীবন আর আমার মাঝে
এক অপ্রবেশ্য নীরবতার
ঘুর্ণি
ধেয়ে আসছে।

মোশতাক আহমদ

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮; টাঙ্গাইল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক, জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে একটি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
সড়ক নম্বর দুঃখ/ বাড়ি নম্বর কষ্ট [দিনরাত্রি, ১৯৮৯]
পঁচিশ বছর বয়স [সড়ক প্রকাশ, ১৯৯৪]
মেঘপুরাণ [পাঠসূত্র, ২০১০]
ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি [পাঠসূত্র, ২০১৫]
বুকপকেটে পাথরকুচি [চৈতন্য, ২০১৭]

প্রবন্ধ—
তিন ভুবনের যাত্রী [এ লিটল বিট, ২০১৬]

ই-মেইল : mostaque.aha@gmail.com