হোম অনুবাদ আরমেন আগোপের সাথে আলাপ

আরমেন আগোপের সাথে আলাপ

আরমেন আগোপের সাথে আলাপ
248
0

আরমেন আগোপ মিশরীয় ভাস্কর শিল্পী। জন্ম ১৯৬৯ সালে কায়রোতে। তবে এখন থাকেন ইতালির পিয়েতাসান্ত্রা শহরে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিখ্যাত পেইন্টার শিমন শাহরিজিয়ানের স্টুডিওতে যোগালের কাজ শুরু। শিল্পের প্রতি ভালোবাসার সূত্রপাত ওখানেই। এরপর কায়রোর হেলওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইনআর্টসে পড়াশোনা—পরবর্তীতে পাড়ি জমান ইতালিতে। অবশ্য তার আগেই দুই হাজার সালে রোম পুরস্কার লাভ করলে দেশ-জোড়া খ্যাতি পান আরমেন। ইতালি গিয়ে সেই খ্যাতি ছিড়য়ে পড়ে বিশ্বময়। তার শিল্প কর্মের প্রদর্শনী হয় যুক্তরাষ্ট্রসহ এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। ২০১০ সালে ইতালির প্রেসিডেন্ট মেডেলে ভূষিত হন আরমেন। এই তরুণ শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ভেরোনিকা নিও। পরস্পরের পাঠকের জন্য সেই আলাপন অনুবাদ করেছেন কবি নাঈম ফিরোজ।


সা ক্ষা কা


ভেরোনিকা নিও

আপনি মিশরে জন্মেছেন আর্মেনিয়ান জাতিসত্তায়। এখন আপনি ইতালিতে প্রতিষ্ঠিত এবং Pietrasantaতে আপনার একটা স্ট্যুডিও রয়েছে। আপনি নিজেকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করেন? সংস্কৃতির বর্ণিল সম্মিলন আপনাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে?

আরমেন আগোপ

মিশরে জন্ম নেয়া একজন আর্মেনিয়ান হিশেবে ইতালিতে দিন গুজরান, কি ভাগ্যবান আমি না? এইখানে আছে শোকের নিয়তি, কিংবদন্তির অতীত আর গৌরবদীপ্ত ঐতিহ্য। এই প্রশ্নটিকে প্রাথমিকভাবে খুব স্বাভাবিক এবং অবধারিত প্রতীয়মান হতে পারে, কিন্তু তা না। আমরা যখন অরিজিন এর কথা বলি তখন তা মূলত দূরত্ববিষয়ক অনুভূতির জন্ম দেয়। অরিজিন শব্দটা আদতে দূরত্বই নির্দেশ করে।

আমি মনে করি না আমার ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে। আমি আর্মেনিয়ান পিতামাতার ঘরে জন্মালেও বড় হয়েছি মিশরের একটি আর্মেনিয়ান লোকালয়ে। আমার অরিজিন কিন্তু সেখানেও উপস্থিত। এই প্রশ্নের প্রসঙ্গটি ব্যাখ্যা দুরূহ কেননা সংস্কৃতির মতন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংজ্ঞায়ন কিম্বা এর রূপরেখা অঙ্কন অসম্ভব। কিন্তু এই তিন সংস্কৃতির একটা জায়গায় মিল আর তা হচ্ছে এরা প্রত্যেকেই মানব সভ্যতায় রেখেছে মূল্যবান অবদান। প্রভাব বলতে আমি বুঝাতে চাই, বাইরের উপাদান সমূহের হস্তক্ষেপ, যা আমার বেলাতে কিন্তু অনুপস্থিত। আমি এই তিনটি সংস্কৃতিতেই যাপন করি আর তারা যেমন আমার অংশ আমিও তাদের। এইখানেও কিন্তু অরিজিন উপস্থিত।

আমি মনে করি না আমি এই তিন সংস্কৃতি থেকে মুক্ত। ব্যক্তিগতভাবে আমি কোনো ফারাক দেখি না শুধু একটা চলমানতা দেখি। আমরা স্পষ্ট দেখবার জন্য বস্তুসমূহের মধ্যে সরলরেখা টেনে দিতে চাই। আমার প্রতীতি এই যে, আমরা যখন বস্তুসমূহকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য রেখাঙ্কন করি তখন মাঝে মাঝে তা অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলে, বিশেষত অবস্তুগত ইস্যুতে। আমার কাজ সম্বন্ধে বলতে গেলে বলা যায় আমার গবেষণার মূলে রয়ে গেছে নানাবিধ অগ্রাধিকার, আগ্রহ ও উদ্দীপকসমূহ। ইউরোপে থাকার একটা বড় দিক হচ্ছে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ ও অর্জনের নানামুখী চর্চা-প্রসার এর সুযোগ।

এটা দিয়ে আমি বুঝাতে চাই, আমার জন্য, এটা সারকথা আমরা যে তিন উপাদানে প্রস্তুত হই যেমন মন, শরীর ও আত্মা মানুষের সবরকম কাজের অভিজ্ঞতায় থাকে বিশেষ করে সৃজনশীল কাজের চর্চায়।


আমি শিল্পদ্রষ্টা ও ভাস্কর্যের মাঝে একটা সুষম অন্বয়ে বিশ্বাসী।


ভেরোনিকা নিও

আপনি Pietrasantaতে বসবাস করেন যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে সুবিদিত অনেক আর্টিস্ট-এর স্ট্যুডিও এবং foundries আছে। আপনি কি কোনো গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত আছেন? আপনি কি অন্য আর্টিস্টদের দ্বারা আসলে প্রভাবিত?

আরমেন আগোপ

আমি একটি স্থানের আত্মার প্রতি আকৃষ্ট হই। রেনেসাঁস কালীন Pietrasantaকে মাইকেল এঞ্জেলো খুঁজেছিলেন এর লাগোয়া ও একে ঘিরে থাকা পাহাড়ের holy stone এর জন্য। তখন থেকেই এই অঞ্চলে মানুষ ও পাথরের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক প্রস্তুত হতে থাকে যা এখানকার জনজীবনের অভিজ্ঞতায় নিয়ে আসে সমৃদ্ধি। পাহাড়সমূহ, শিল্প-উপাদানসমূহের উৎস আর সেইসব উৎসের কাছাকাছি থাকা কারভিং ও ভাস্কর্য প্রস্তুতের নেশাকে প্রবলভাবে জাগিয়ে তোলে। এইসব কিছুই এই জায়গার আবহমণ্ডলের আদলে সৃজনশীল ঐতিহ্যের পরম্পরা প্রস্তুতের মাধ্যমে প্রজন্মান্তরে এই জায়গাটার আত্মাকে ভরিয়ে তোলে।

ভেরোনিকা নিও

আপনি কতিপয় monumental স্থাপনা ও ভাস্কর্য প্রস্তুত করেছেন । আপনি এই monumentalityকে কী প্রকারে দেখেন?

আরমেন আগোপ

আসলে অনেকটা সময়জুড়েই আমি anti-monument-এ আগ্রহী ছিলাম। বহুবছর আমি একটি সিরিজ নিয়েই কাজ করে এসেছি যার নাম দিয়েছি Touch এবং তা ছিল সম্পূর্ণই Touch-এর মর্ম এর বিপরীতার্থক। একটা monumental কাজ সে কাজটার আকৃতির তুলনায় তার দর্শককে অনেক হেয়তর অবস্থানে ফেলে দিতে পারে যেটা অবশ্যই ‘হুমকি’ হয়ে ধরা দিতে পারে সে শিল্পদ্রষ্টার চোখে। আমি বিশ্বাস করি এই বিষয়টা ঈশ্বরের ঐতিহ্যের সাথে জড়িত। একটা মহীরুহ আমাদের শান্তি ও স্বস্তির জায়গা দিয়ে তার ছায়াঅবতলে বসার অনুষঙ্গ জুড়ে দিতে পারে, monumentality প্রায়শই এই কাজটা পেরে ওঠে না।

আমি শিল্পদ্রষ্টা ও ভাস্কর্যের মাঝে একটা সুষম অন্বয়ে বিশ্বাসী। এবং এটা কিন্তু শুধু আকারের বিষয়ে না। গ্রানাইটের মতো শক্তপোক্ত উপাদানে প্রস্তুত মানুষের প্রতিসম কোনো কাজ শিল্পদ্রষ্টা মানুষকে সেগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনুভব করার একটা নির্বাধ আনন্দ দেয়। যেহেতু ভাস্কর্যগুলো কোনো ভিত্তির সাথে যুক্ত থাকে না তারা নড়তে পারে, পারে দুলতেও। এই ব্যাপারটাই ঐ কাজটি ও শিল্পদ্রষ্টাদের ইগো ও উপস্থিতির মধ্যে একটা সাম্য স্থাপন করে যেন ঐ শিল্পকর্মটি ‘ঐহিক’ না প্রতিভাত হয়। শিল্পদ্রষ্টা মানুষেরা ভাস্কর্যের সাথে একই জায়গা ভাগাভাগি করে সমান সম্মানে ব্যবহার করার সুযোগও পায় এতে।

ভেরোনিকা নিও

আমার তো মনে হয় আপনার বিমূর্তায়ন এ আধ্যাত্মিকতার একটা যোগাযোগ আছে। আপনি কি এর সাথে একমত হবেন?

আরমেন আগোপ

বিমূর্তায়ন? আমি আসলে তা নিশ্চিত নই। আমি যা করি তা আসলে আমার জানা কোনো বস্তুর বিমূর্তায়ন নয়। আসলে, ইহা এমন কিছুই প্রস্তুতকরণ যা আদতে তখন পর্যন্ত অনস্তিত্বশীল। এই একটা বিষয়ই প্রক্রিয়াটিকে অভাবনীয় বানিয়ে ফেলে। আমরা এর আগেই অরিজিন শব্দটা ব্যবহার করেছি। মিশর হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে মূলত, বহুঈশ্বরবাদ থেকে অভিযোজিত হয়ে একেশ্বরবাদ এর ধারণা জন্মলাভ করে। এবং যদি আমাদের স্মরণে আসে আমরা দেখব আর্মেনিয়া ছিল প্রথম দেশ যা খ্রিস্টানিটির বা কোনো ধর্মকে স্বাগত জানায় এবং এর অপার্থিব আধ্যাত্মিকতার প্রভূত উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। আর এটাই তো স্বাভাবিক যে একটি আধ্যাত্মিক শক্তিই কোনো শিল্পকর্মেই পুনরায় পর্যবসিত হয় ও আবির্ভূত হয়।

ভেরোনিকা নিও

আগের কোনো এক সাক্ষাৎকার এ পড়েছিলাম যে একটি কাজ করতে গিয়ে আপনি নাকি সুফিয়ান নৃত্যের থেকে রসদ জোগাড় করেন, যা এক ধরনের পুনরাবৃত্তির ধারা থেকে আসে আর যা কাউকে তার বাহ্যিক সত্তা ভুলে অন্তর্গত সত্তাকে আবিষ্কার করিয়ে দেয়। নিজের জীবনে ঠিক কতটা এর অনুসরণ করেন আপনি?

আরমেন আগোপ

আমি আদৌ করি না। এটা একজনের নিজস্বতার অখণ্ডতা আবিষ্কারের ব্যাপার। আমি বিশ্বাস করি না তারা আলাদা, কিন্তু আমরা হয়তো তাদেরকে আলাদা করার কাজে অভ্যস্ত। এটা একটা ভাস্কর্যের মতো, যদি কোনো চূড়া বা রেখা কোনো ঘনভর থেকে উঠে আসে তবে আমরা তাকে বলতে পারি না যে সেই চূড়া বা রেখা ঐ ভাস্কর্য থেকে ভিন্নতর। এটা শুধুই এক অন্তঃশক্তি যা বাইরের স্পেসের সাথে সংযুক্ত হতে ঠিকরে আসছে যেন। হয়তো এই কারণেই পর্যাবৃত্ত গতি, যেখানে সামনে বা পেছনে যাবার কোনো অভীষ্টই নেই, এবং এক জায়গাতেই থাকার কথা, সেখানে অন্য এক গন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়। গ্রানাইটের মতো কোনো বস্তু নিয়ে কাজ করার প্রক্রিয়ায়, যার ব্যবহার হয় একটি বস্তু তা যেখানে আছে সেখানেই রাখার জন্য, সেখানে কোনো প্রকারে একটা অবিচল, সুষম ও পর্যাবৃত্ত গতি প্রয়োজন। ইহাই আমাদের বস্তুর নিজস্বতার ভেতর ও বাইরের চরিত্রের সমমেল আবিষ্কারের দিকে ধাবিত করে।


দুটো কখনোই এক থাকে না। কখনো-বা খুব নিবিড় সম্পর্ক থাকে, বলা চলে আগেরটার প্রবাহের একই ধারা এবং কখনো বা শুধুই বিপরীত ঘরানার।


ভেরোনিকা নিও

আপনার এমন কি কোনো কাজ আছে যা নিয়ে আপনি খুব করে আবেগী? যদি থাকে তা কেন?

আরমেন আগোপ

আছে তো। সেটাই যা আমি এখনো করি নাই। আমি সবটা সময় শুধু পরের কাজটা নিয়েই ভাবি।

ভেরোনিকা নিও

আপনি কখন বোঝেন একটি কাজ সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে?

আরমেন আগোপ

কে বলল যে আমি সবসময় বুঝি? এমনও হয়েছে যে একটি সম্পূর্ণ কাজ কয়েকটি প্রদর্শনী ঘুরে এসেছে, তারপরও আমার হাতে ঘুরে এলে দেখা গেল এর কিছু জায়গায় আবার আমি পরিবর্তন আনছি।

ভেরোনিকা নিও

আপনার সাম্প্রতিকতম কাজ ও তার আগের কাজটির মধ্যে সম্পর্ক কী?

আরমেন আগোপ

দুটো কখনোই এক থাকে না। কখনো-বা খুব নিবিড় সম্পর্ক থাকে, বলা চলে আগেরটার প্রবাহের একই ধারা এবং কখনো বা শুধুই বিপরীত ঘরানার।

ভেরোনিকা নিও

আপনার কাজ গত বিশ বছরের শিল্পিত গতিধারায় ঠিক কতটা বদলেছে, নাকি মোটেই বদলায় নি?

আরমেন আগোপ

সত্যিই অনেক অনেক বদলে গেছে, আবার কিছুই বদলায় নি। যা বদলেছে তা হলো চর্চার পরিকাঠামো, আমি বলতে পছন্দ করি যে এটা ব্যক্তিগতই থেকে গেছে যতটা নিজস্ব থাকা সম্ভব। এটা হয়েছে বাহ্যিক জগতের সচেতনা ও এর ঠিক সমান্তরাল অন্তর্গত জগতের সচেতনার বিষয়ে মানুষের অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞানকে কেন্দ্র করেই।

ভেরোনিকা নিও

সেই সংগ্রাহক সম্বন্ধে বলুন যিনি আপনার কাজে সর্বাধিক প্রকাশটা দেখতে পায়।

আরমেন আগোপ

সে তো সেইজন যিনি আসলে দেখার প্রেষণা ধারণ করেন।


আরমেন আগোপের কিছু ভাস্কর্য

 

নাঈম ফিরোজ

জন্ম ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৩; ধানমন্ডি, ঢাকা। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ব্যান্ড বিটলসের শহর লিভারপুলে প্রবাসী।

শিক্ষা :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকসহ স্নাতকোত্তর এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর। ব্রিটিশ সরকারের কমনওয়েলথ স্কলার হিশেবে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে উচ্চতর স্নাতকোত্তর।

পেশা : বিচারক (বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস এর সদস্য)।

প্রকাশিত বই :
গ্রীনহাউজের বন্দিনী [কবিতা, ভোরের শিশির, ২০০৮]
উবে যাও জলচোখ [কবিতা, মূর্ধন্য, ২০১৬]
পৃথিবীর শেষ কয়েকছত্র মেঘপত্র [কবিতা, তিউড়ি, ২০১৭]

ই-মেইল : nayeemfiroz.jurisprudent@gmail.com