হোম অনুবাদ আরবের কারাগারগুলো লেখকে ভরা নয় কেন : অ্যাডোনিস

আরবের কারাগারগুলো লেখকে ভরা নয় কেন : অ্যাডোনিস

আরবের কারাগারগুলো লেখকে ভরা নয় কেন : অ্যাডোনিস
3.68K
0

আরব বিশ্বেও নাকি সবাই কবি! সেই বিশ্বের সবাই যাকে কবি হিশেবে চেনে তিনি অ্যাডোনিস (আলি আহমদ সাইদ এসবার)। জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৩০; সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের লাটাকিয়া শহরের কাছের গ্রাম আল-কাসাবিনে এক কৃষক পরিবারে। বিদ্যালয়ে পড়ার সামর্থ্য না থাকায় মসজিদ-কেন্দ্রিক মক্তবে কোরআন শিক্ষা দিয়ে পড়াশোনার শুরু। ধ্রুপদী আরবি কবিতা মুখস্থ করানোর মাধ্যমে বাবাই ছোটবেলায় তাকে সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। আরবি গদ্য-কবিতার সূত্রপাত অ্যাডোনিসের মতো কয়েকজনের হাতেই। বিশ-ত্রিশ বছর ধরে সাহিত্যে সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ীদের তালিকায় আসে তার নাম। ২০১১ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরুর পর তিনি নীরব ছিলেন। আরব বিশ্বের প্রধান কবি এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের নিজ সম্প্রদায়ের (আলাউয়ি) লোক হিশেবে তার কাছে সেখানকার বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যাশা ছিল বেশি। ওই বছরের জুনে বিবৃতি দিয়ে আসাদকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান তিনি। সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে কোনো পক্ষেই উচ্চকিত ছিলেন না তিনি। ৮৬ বছর বয়সী অ্যাডোনিস আরবি সংবাদপত্র আল-হায়াতে আরব-বসন্তের ব্যর্থতা নিয়ে নিয়মিত কলামে লিখেছেন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে প্যারিসে আইএসআইএসের হামলার সময় প্রকাশিত হয় তার সর্বসাম্প্রতিক গ্রন্থ ইসলামে সহিংসতা। ১৯৭৫ সালে সিরিয়া থেকে নির্বাসিত হয়ে স্ত্রী (সাহিত্য সমালোচক খালিদা সাইদ) এবং দুই মেয়েকে (আরওয়াদ ও নিনার) নিয়ে আছেন প্যারিসে।

কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যাডোনিসের এই সাক্ষাৎকারটি ২০১৬ সালে প্যারিসের রাস্তা শঁজেলিজের একটি ক্যাফেতে বসে নিয়েছেন জোনাথন গায়ের। দ্য নিউ ইয়র্ক রিভিউয়ের (১৬ এপ্রিল ২০১৬) জন্য আরবি থেকে অনুবাদ করেছেন জোনাথন গায়ের এবং শরাফ আল-হাওরানি। পরস্পরের জন্য ইংরেজি থেকে এই সাক্ষাৎকারের বাংলা করেছেন ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ।


জোনাথন গায়ের

সিরীয় যুদ্ধ শুরুর সময় আপনি বাশার আল-আসাদকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। এখন তাকে কী লিখবেন?

অ্যাডোনিস

কিছুই বদলায় নি। বরং, সংকট আরো বেড়েছে। দুই বছরে চল্লিশটা দেশ আইএসআইএসের বিরুদ্ধে জোট গড়ে তুলেও কিছুই করতে পারে না? এটা কিভাবে সম্ভব? ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা না করলে কিছুই হবে না। ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়-আশয় আলাদা করতে না পারলে কোনো পরিবর্তনই আসবে না; আরবের পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। ধর্ম আর সমস্যা সমাধানের কোনো উপায় নয়। ধর্মই সমস্যার কারণ। যে কারণে এটিকে আলাদা করা দরকার। প্রত্যেকটি স্বাধীন মানুষ সে যা চায় তার ওপর আস্থা রাখে, আমাদেরও তাতে শ্রদ্ধা থাকা উচিত। ধর্ম কি সমাজের জন্য ভিত্তি হবে? না।

জোনাথন গায়ের

সর্বশেষ কবে আপনি সিরিয়ায় গিয়েছেন?

অ্যাডোনিস

২০১০ সালে।

জোনাথন গায়ের

যুদ্ধের আগে আপনি কি তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে কোনো কথা বলেছেন?

অ্যাডোনিস

আমি জানি না। আমিও আপনার মতোই সংবাদ শুনেছি। আমি জানি সিরিয়া ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু কেন তা হয়েছে? পরিকল্পনাটা কী? দেখুন, একজন বিপ্লবী অবশ্যই তার দেশকে রক্ষা করে। সে শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করে। আমি শুনেছি, আলেপ্পোর বাজারগুলো একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্যকিছুর সঙ্গে তো এই সম্পদের তুলনা হয় না। তারা কিভাবে এটিকে ধ্বংস করে? একজন বিপ্লবী জাদুঘর লুট করে না। খ্রিস্টান, আলাউয়ি কিংবা দ্রুজ হওয়ার কারণে একজন বিপ্লবী সাধারণ মানুষকে হত্যা করে না। বিপ্লবীরা ইয়াজিদিদের মতো একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে না। এটা কি কোনো বিপ্লব? পশ্চিম কেন এটিকে সমর্থন জোগায়?

জোনাথন গায়ের

সিরিয়ার সংঘাত নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা আছে আরব বিশ্বে।

অ্যাডোনিস

আপনি জানেন, অনেক আরব আছে যারা বিপ্লবীদের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছে, তারা সবসময় আমার সমালোচনা করে। তারা বলে যে আমি বিপ্লবের—সেই বিপ্লব যা জাদুঘর ধ্বংস করে—পক্ষে নই।


আপনি আপনার নতুন বই ইসলামে সহিংসতা’য় লিখেছেন, আইএসআইএস ইসলামের পরিসমাপ্তির প্রতিনিধিত্ব করছে


জোনাথন গায়ের

বিপ্লবটা কী এবং কারা এর সঙ্গে যুক্ত?

অ্যাডোনিস

কিছু বিষয় আছে যা বলা যায় না… একজন লেখক কখনোই হত্যার পক্ষে থাকতে পারে না। আপনি জানেন, এটা সম্ভব নয়। কিন্তু কিছু লোক আছে যারা হত্যা ও সহিংসতা পছন্দ করে। যে লোক গায়ে বিস্ফোরক বেল্ট বেঁধে কোনো স্কুলে ঢুকে নিজেকে উড়িয়ে দেয়, একজন লেখক বা চিত্রকর কী করে তার পক্ষে থাকতে পারে? কী করে তা সম্ভব? স্কুলের ওরা তো শিশু। কিভাবে, কী করে আপনি তাদের হত্যা করেন? এটা তো অকল্পনীয় এক দানবীয় কাণ্ড। ভাই, শাসনব্যবস্থা যদি স্বৈরাচারী হয় তাহলে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করুন। শিশু ও স্কুলের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন না। দেশকে ধ্বংস করবেন না। নির্দোষ মানুষকে হত্যা করবেন না। শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়ুন। এটি অপমানকর। এই ধরনের অবস্থার মধ্যে থাকা অপমানজনক। ইয়েমেনের মতো একটি দেশকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া, ইতিহাসে আমি এমন কিছু আর দেখি নি—এটা তো একজন নির্বোধকে প্রেসিডেন্টের স্থলাভিষিক্ত করা। আপনি দেখুন, মানুষ তা সমর্থন করছে। বুদ্ধিজীবীরাও। আপনি কিভাবে এর সাথে লড়বেন? তাদের পক্ষে না থাকায় তারা আপনার সমালোচনা করবে। আপনাকেও তাদের মতোই এক দানব হতে হবে।

জোনাথন গায়ের

জিহাদিদের মতো।

অ্যাডোনিস

শুধু জিহাদিরা নয়, কারণ জিহাদিরা সাধারণ মানুষেরই একটা অংশ। সেইসব মানুষ যারা প্রকাশ্যে তাদের প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি ঘোষণা করা উচিত বলে মনে করে না। আপনি কখনো এর বিরুদ্ধে একটা বিবৃতিও কোথাও পড়েছেন? আমরা এখন যা বলছি তা, অনেকেই আছেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে বলছেন। জিহাদি গ্রুপগুলো যা করছে তার বিরুদ্ধে বড় কোনো গোষ্ঠী, বড় কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা আরবের কোনো দেশকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে দেখেছেন? এর মধ্যে মেনে নেওয়ার একটা ব্যাপার আছে। এই ধরনের সহনশীলতা এক ধরনের স্বীকৃতি। আরবের কোনো দেশেই এ ব্যাপারে একটা প্রতিবাদও হচ্ছে না। এর মানে কী? তারা মানুষকে হত্যা করে, নারীদের বাজারে বিক্রি করে। তারা জাদুঘর ধ্বংস করে, যেটা মানব সভ্যতার বিশাল অর্জন। অথচ সেখানে একটা প্রতিবাদও নেই, এসবের বিরুদ্ধে একটা বিবৃতিও নেই।

জোনাথন গায়ের

আপনি আপনার নতুন বই ইসলামে সহিংসতা’য় লিখেছেন, আইএসআইএস ইসলামের পরিসমাপ্তির প্রতিনিধিত্ব করছে। এখানে কি একটা নতুন সূচনাও আছে?

অ্যাডোনিস

আপনি জানেন, আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। তা কিভাবে? যদি মানুষ, যদি মানবতা একটা সমাপ্তিতে পৌঁছায় তাহলে তো বিশ্বেরই ইতি ঘটে। যতক্ষণ পর্যন্ত এখানে ব্যক্তিরা আছেন—আমি এখন যা বলছি তা হচ্ছে আমি একা নই। মিসর এবং অন্যান্য দেশে অনেক ব্যক্তিই আছেন। তারা আমি যা বলছি তা বলছেন। এই কারণেই আমাদের আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে যে মানুষ আরো ভালো কোনো সমাধান পাওয়ার মতো একটা অবস্থায় পৌঁছবে। কিন্তু কখন ও কিভাবে হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে যতদিন পর্যন্ত আরবরা এই পুরনো, জিহাদি, ধর্মীয় ভিত্তিতে চিন্তা ও কাজ করবে ততদিন তারা সামনে এগুতে পারবে না। এটা সম্ভব নয়। এটা তো এমন কিছু যা লুপ্ত হয়ে গেছে, যা নিঃশেষ হয়ে গেছে। আইএসআইএস হচ্ছে সর্বশেষ হুঙ্কার। নিভে যাওয়ার আগে ধপ করে জ্বলে ওঠা মোমবাতির মতো।

পুনর্জাগরণ ঘটতে সময় লাগে। প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেড় হাজার বছরে আমাদের এই সমাজ নাগরিকদের জন্য কোনো সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। আমাদের দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ নেই। এখন পর্যন্ত আরব সমাজ ব্যক্তিদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যে ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন অধিকারের জায়গা থেকে একই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। দৃষ্টান্ত হিশেবে বলা যায়, খ্রিস্টান সমাজে মুসলিমদের মতো একই অধিকার নেই। দেড় হাজার বছর—দেড় হাজার বছরের সমস্যা আমরা কিভাবে এক-দুই সপ্তাহ বা এক-দুই মাসে সমাধান করব?

জোনাথন গায়ের

এক্ষেত্রে পরিবর্তনের জন্য পশ্চিমের সঙ্গে নতুন কোনো সংযোগ কি দরকার? আমি আপনার কবিতা ‘বিষয়ের মানচিত্রে চলমান আকাঙ্ক্ষা’ (১৯৮৭) পড়েছি। যেখানে আইফেল টাওয়ার ভূমধ্যসাগরে ভাসছে এবং আবু নাওয়াজ (৭৫৬-৮১৮, প্রখ্যাত আরব কবি) এবং ভিক্টর হুগোর মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। আরব ও পশ্চিমের মধ্যে সেতুবন্ধন—

অ্যাডোনিস

প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে অর্থনীতি ও সামরিক ধারণার সংযোগ আছে, এটা উপনিবেশবাদের তৈরি। ভৌগোলিকভাবে আমরা বলতে পারি যে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য বলে কিছু একটা আছে। আর উপনিবেশবাদ সেটার সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু শিল্পে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বলে কিছু নেই। আপনি পল ক্লে’র (সুইস-জার্মান চিত্রশিল্পী) চিত্রকলায় দেখবেন, তিনি কিভাবে তিউনিসিয়া এবং পূর্ব আরব থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ইউজিন ডেলাকোয়া’র (ফরাশি চিত্রশিল্পী) চিত্রশিল্পেও আপনি এটা দেখবেন। তিনি মরক্কো থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আপনি আর্তুর র‌্যাঁবো (ফরাশি কবি) পড়লে দেখবেন—র‌্যাঁবোর সেরা জিনিসটা হচ্ছে তিনি পাশ্চাত্যের লোক নন; যদিও তিনি পাশ্চাত্যে জন্মেছেন। আপনি যখন আবু নাওয়াজ কিংবা আবু আল-মা’রি (৯৭৩-১০৫৭, আরব কবি ও দার্শনিক) পড়বেন, আপনি বলতে পারবেন না যে তারা প্রাচ্যের কিংবা পাশ্চাত্যের। সৃষ্টিশীল লোকেরা একই বিশ্বের, তারা কোন দেশ থেকে এসেছে বা কোথাও গিয়েছে তা গ্রাহ্য করার বিষয় নয়। তারা ভূগোল, ভাষা ও জাতীয়তার বাইরে একসঙ্গে বসবাস করে। তারা মানবতার সৃজনশীল দুনিয়ার মানুষ। এই দিক থেকে কোনো প্রাচ্য-পাশ্চাত্য নেই। ওয়াল্ট হুইটম্যান আমার কাছে আবু তাম্মামের (৭৮৮-৮৪৫, আরব কবি) মতোই। তিনি আমার অংশ এবং আমি তার অংশ।


আরবের কারাগারগুলো লেখকে ভরা নয় কেন—তা দেখে আমি বিস্মিত হই


 জোনাথন গায়ের

কিন্তু পাশ্চাত্য তো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ঘটিয়েছে, আরব বিশ্বে যেটার ঘাটতি আছে বলে আপনি মনে করেন।

অ্যাডোনিস

ইউরোপের যে সংকটের অভিজ্ঞতা তা তারা ধর্ম ও চার্চ থেকে পুরোপুরি আলাদা নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাটিয়ে উঠেছে। মধ্যযুগে যাজকীয় আদালত ছিল আজকের জিহাদিদের আদালতের মতোই। তারা লোকজনকে হত্যা করেছে এবং পুড়িয়ে মেরেছে। কিন্তু পাশ্চাত্য রাষ্ট্র থেকে চার্চকে আলাদা করা এবং আধুনিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে। আমরা এখনো সেই পর্যায়ে আছি। পাশ্চাত্য তখন যেহেতু এই আলাদা করার কাজে সফল হয়েছে, সেহেতু আরবদের এই দুটিকে আলাদা করার কাজে বাধা দেওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা এই আলাদা করার কাজের জন্যই সংগ্রাম করছি। সবকিছু সত্ত্বেও এবং পাশ্চাত্য রাজনীতিবিদদের বাধা সত্ত্বেও আমরা এই আলাদা করার কাজে সফল হব। পাশ্চাত্য রাজনীতিবিদেরা আরবদের এবং আরব শাসকদের অবজ্ঞা করে। অবজ্ঞা। পাশ্চাত্য তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিশেবে আরব সরকারগুলোকে ব্যবহার করে।

জোনাথন গায়ের

তাহলে সরকার ও ধর্মকে আলাদা করার কার্যকরী উপায় কী হবে?

অ্যাডোনিস

আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে। কাজটি অনেক কঠিন। অনেক লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাওয়া প্রয়োজন হবে। বসে বসে তো আপনি কিছু করতে পারবেন না। আপনাকে সংগ্রাম করতে হবে, উঠে দাঁড়াতে হবে, মোকাবেলা করতে হবে। লিখতে হবে এবং জেল খাটতে হবে। আরবের কারাগারগুলো লেখকে ভরা নয় কেন—তা দেখে আমি বিস্মিত হই। কেন বিস্মিত হই—তার মানে হচ্ছে আরব লেখকেরা তাদের কাজটা ঠিকমতো করছেন না। তারা সমালোচনা করছেন না। তারা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে, জীবনের প্রকৃত ইস্যুতে কথা বলছেন না। তারা আরব জীবনের প্রকৃত সংকট নিয়ে কথা বলছেন না। রাষ্ট্রের নয়, আমি বরং সমালোচনা করব লেখকদের। লেখকদের অবশ্যই জেলে থাকা উচিত। এর মানে হচ্ছে তারা সত্য বলছেন। জেলের বাইরে থাকা মানে তারা সত্য কথাটা বলছেন না। অন্তত যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের বই নিষিদ্ধ হচ্ছে… আমরা বলতে পারি যে সংস্কৃতির একটা ভূমিকা আছে।

জোনাথন গায়ের

সিরীয় গৃহযুদ্ধের সময়ে কবিতা লেখার ব্যাপারটা কেমন?

অ্যাডোনিস

বোমার সাথে তো আপনি কবিতার তুলনা করতে পারেন না। আপনার এই তুলনা টানা ঠিক না। যেকোনো অন্ধ বুলেট একটি শাসনব্যবস্থাকে পাল্টে দিতে পারে। যেকোনো ঘৃণ্য বুলেট একজন মহান মানুষকেও মেরে ফেলতে পারে। উদাহরণ হিশেবে জন এফ কেনেডির (যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট) কথা বলা যায়। আপনি এই ধরনের তুলনা করতে পারেন না, কারণ মৌলিকভাবেই এটি ভুল। কবিতা রচনা করা তো বাতাস তৈরি করার মতো, সুগন্ধি তৈরি করার মতো, নিশ্বাস নেওয়ার মতো। বস্তুগত মাপকাঠি দিয়ে তো সেটির বিচার করা যায় না। এই কারণেই কবিতা যুদ্ধকে ঘৃণা করে এবং যুদ্ধের সাথে এটির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর লাশ, ভগ্নস্তূপ, ধ্বংসযজ্ঞ ও ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করা যেতেই পারে। তখন হয়তো কেউ কিছু লিখতেই পারে, কিন্তু তখনও সেগুলো যুদ্ধেরই উপাদান।

জোনাথন গায়ের

বলা হয় যে, আইএসআইএস কবিতা লিখেছে, ওসামা বিন লাদেন কবিতা লিখেছেন।

অ্যাডোনিস

এগুলো কবিতা নয়। এগুলোকে কবিতা হিশেবে বিবেচনা করা ঠিক না—অবশ্যই না। কারণ, কবিতা তো একটা সামাজিক প্রপঞ্চ। সংস্কৃতি যখন প্রতিদিনের জীবনের অংশ, তখন প্রত্যেকেই কবি এবং প্রত্যেকেই ঔপন্যাসিক। হাজারো ঔপন্যাসিক আছে এখন। কিন্তু এর মধ্যে আপনি যদি পড়ার মতো পাঁচ জনকে পান তাহলে আপনি ভালো অবস্থায় আছেন। যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার উপন্যাস আছে, কিন্তু পড়ার মতো উপন্যাস পাবেন মাত্র পাঁচ-ছয়টা, এর বাইরে আর যা আছে সব আবর্জনা। আরবদেরও একই অবস্থা। সব আরবই কবি, কিন্তু তাদের ৯৫ শতাংশই ছাইপাঁশ।

জোনাথন গায়ের

সম্প্রতি আপনি লিখেছেন, অভিবাসন আরব সংস্কৃতির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপে আমরা এখন অভিবাসন সংকট মোকাবেলা করছি। এ বিষয়ে আপনি কিছু বলতে পারেন?

অ্যাডোনিস

দুটি বিষয়কে আমি অভিবাসনের কারণ হিশেবে দেখছি। হয় কাজ নেই, না হয় তাদের স্বাধীনতা নেই—কর্মহীনতা কিংবা স্বাধীনতাহীনতা। তাই নাগরিকেরা কিংবা মানুষেরা কাজের জায়গার খোঁজে বের হচ্ছে এবং মুক্ত হতে চাচ্ছে। আর আরবের দেশগুলো তো দরিদ্র। গত দুইশ বছরে আমরা ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কোনো ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করতে পারি নি। কিন্তু আমাদের সম্পদ আছে। আমরা সেসব সম্পদকে অকেজো হাতিয়ার হিশেবে নষ্ট করছি। আমরা অস্ত্র কিনছি, বিমান কিনছি, আমাদের হয়ে লড়ার জন্য বিমানের পাইলটও কিনছি। ঠিক ইয়েমেনে সৌদি আরব যা করছে। বিশ্বটা একেবারে কর্দমাক্ত। আমরা সব আদিম। আমরা এখনো মধ্যযুগেই আছি। আর আপনি জিজ্ঞেস করছেন আধুনিক সময় সম্পর্কে। কায়রোতে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা রাস্তায় বিদেশি গাড়ি দেখে আপনি বোকা হবেন না। আমরা একটা গাড়ি উৎপাদন করতে পারি না। আমরা একটি কফির কাপ বানাতে পারি না। তাহলে আমরা আধুনিক হলাম কিভাবে? পাশ্চাত্য রাজনীতিবিদরা আমাদের বোকা বানাচ্ছে। আপনারা বুদ্ধিজীবী। আপনারা বিষয়গুলো বুঝবেন।


আপনি আরব ইতিহাসে একজন কবিও পাবেন না যিনি ধার্মিক ছিলেন


জোনাথন গায়ের

সাম্প্রতিক লেখায় আপনি আরব পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উদাহরণ হিশেবে ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর আল-হায়াতে ছাপা আপনার ‘আমি কে—কে আমরা’ লেখাটির কথা বলা যায়।

অ্যাডোনিস

বড় পরিসরে দেখলে এটি শুধু আরবদের সংকট নয়, এটি মানবসত্তারই সংকট। কারণ, ধর্ম যে উত্তর দিয়েছে তা হচ্ছে: খ্রিস্টান হচ্ছে খ্রিস্টান, ইহুদি হচ্ছে ইহুদি এবং মুসলিম হচ্ছে মুসলিম। প্রত্যেকেই একে ‘অপরের’ তদন্ত ও তদারকির আওতায়। আমি যা বিশ্বাস করি সে তা বিশ্বাস করলে আমি তাকে স্বীকৃতি দেই; আমি যা বিশ্বাস করি সে তা না করলে আমি তাকে স্বীকৃতি দেই না। একেশ্বরবাদী ধর্মে ‘অপর’-এর ধারণাটিকে এভাবেই শনাক্ত করা হয়েছে। এইভাবেই ধর্মহীন লোকের জন্য পরিচয়ের ধারণাটি জটিল হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে আরব সুফিদের কিছু পরামর্শ আছে। আপনি তো জানেন, আর্তুর র‌্যাঁবো বলেছেন, ‘জো এত আন উথ’—আমি অপর। র‌্যাঁবোর হাজার বছর আগে আরব সুফি বলেছেন, ‘অপর মানে আমি।’ আপনি জানেন, ইসলামে মুসলিমরা বাড়ি, জমি ও পিতার টাকার উত্তরাধিকারের মতো তাদের পরিচয়ের উত্তারাধিকার বহন করে। পরিচয়ের বিষয়টি তার ওপর একটি অগ্রাধিকার হিশেবে আরোপিত হয়। সুফিরা বলেছেন, না, পরিচয় জিনিসটা হচ্ছে অব্যাহতভাবে তৈরি করে যাওয়ার ব্যাপার। নিজের কাজ ও আদর্শকে কাঠামোর মধ্যে আনার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ তার পরিচয়কে একটা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। পরিচয় যদি তৈরি করা জিনিস হয় তাহলে ‘আমি’ স্বতন্ত্র হতে পারে না। এটি অপরের সাথেই থাকে এবং অপর এটিরই অংশ। আমার ক্ষেত্রে, আমি যদি আমি হতে চাই তবে আমাকে অন্যদের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এইভাবে সুফিবাদে পরিচয় অসীম পর্যন্ত উন্মুক্ত।

একটা মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত জীবিত থাকে ততক্ষণ পর্যন্তই সে তার পরিচয়কে অব্যাহতভাবে নবায়ন করে যেতে পারে। কবি হলেই তার পরিচয়ের সমাপ্তি ঘটে যায় না, কারণ সে মরে যাওয়ার পরও তার লেখা অব্যাহতভাবে নবায়িত ও পর্যালোচিত হতে থাকে এবং বিভিন্নভাবে সেটির পাঠ চলতে থাকে, তাহলে তার পরিচয় তো উন্মুক্ত। এই দিক থেকেও কবিতা ধর্মের বিরুদ্ধে। এটি ধর্মের সাথে যায় না। আপনি আরব ইতিহাসে একজন কবিও পাবেন না যিনি ধার্মিক ছিলেন। তিনি বিশাল মহান কবি এবং ধার্মিক—এটি বলা প্রায় অসম্ভব। তিনি যদি ধার্মিক হন, তবে তিনি অবশ্যই সুফিদের মতো হবেন, যিনি নিজেকে বলতেন আস্তিক এবং বিশ্বাসী ছিলেন ঈশ্বরে। এটি ইসলামের আনুষ্ঠানিক ঈশ্বর থেকে একেবারেই ভিন্ন—মতবাদ, আইন ও প্রতিষ্ঠানের ঈশ্বর। সুতরাং, প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যে মানবিক সত্তার সত্যিকারের ক্ষমতা নিহিত নেই; প্রশ্ন উপস্থাপনের মধ্যে সত্যিকারের ক্ষমতা নিহিত।

জোনাথন গায়ের

সত্তর বছর আগে আপনি অ্যাডোনিস নাম নিয়েছিলেন।

অ্যাডোনিস

না, আমি ধর্মবিশ্বের বাইরে থাকার জন্য এই নাম তৈরি করেছিলাম। (অ্যাডোনিস গ্রিক পুরাণের চরিত্র হিশেবে বেশি পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। তবে আরব- ও ইউরোপ-কেন্দ্রিক প্রাচীন বিভিন্ন সভ্যতা, পুরাণ ও ধর্মে অ্যাডোনিসের উপস্থিতি লক্ষণীয়।)

জোনাথন গায়ের

কিন্তু এই নাম হয়ে গেছে—

অ্যাডোনিস

একটা অপরাধ!

জোনাথন গায়ের

কেন?

অ্যাডোনিস

নামটি আরব ও মুসলিম নাম না হওয়ার কারণে সমালোচনা করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সব সংস্কৃতির মধ্যে ধর্মীয় সংস্কৃতিই সবচেয়ে অধঃপতিত এবং এটি অগভীর হয়ে গেছে।

জোনাথন গায়ের

তাহলে আরব সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ—

অ্যাডোনিস

আমি তো আপনাকে বলেছি, যতদিন মৃত্যু ও প্রেম এখানে আছে, ততদিন শিল্পও থাকবে। চিন্তা করবেন না। পাঠক খুব অল্প, কিন্তু, সেটা ঠিক আছে। আধুনিক চিন্তায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী ফ্রেডরিক নিৎশের (জার্মান দার্শনিক) কোনো লেখা তার জীবদ্দশায় ছাপা হয় নি। কেউ তাকে চিনত না। এটাই সব সময় শিল্পের নিয়তি। অনেকেরই ছাপা হবে এবং লাখ লাখ কপি বিক্রিও হবে, কিন্তু তাদের বইগুলো আবর্জনার স্তূপে পর্যবসিত হবে।


সংশ্লিষ্ট পোস্ট : সহি ইসলাম, ভ্রান্ত ইসলাম, আইএস ও আদুনিস  ●  আদুনিসের কবিতা

ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

জন্ম ১৯৭৭; ময়মনসিংহ। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই :
আলো অন্ধকারে আলো অন্ধকারের যাত্রা [গল্প; ঐতিহ্য, ২০০৪]
বিপন্ন সিরিয়ার কথাকার জাকারিয়া তামেরের গল্প [অনুবাদ; মেঘ, ২০১৫]
মওদুদিপুত্রের জামায়াত-বিরোধিতা [অনুবাদ ও সম্পাদনা; প্রকৃতি, ২০১৭]

ই-মেইল : soroishwarja@gmail.com