হোম অনুবাদ আমার জীবন : ১ম পর্ব

আমার জীবন : ১ম পর্ব

আমার জীবন : ১ম পর্ব
1.50K
0
ফিদেল ক্যাস্ত্রোকে কে না চেনে? তিনি ছিলেন উত্তর ক্যারিবিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র কিউবার রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হিশেবে তার যা পরিচিতি, তার চেয়েও তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের এক মহাকাব্যিক চরিত্র হিশেবে। যে কিউবা ১৯৫৯ সালের বিপ্লবপূর্ব সময়ে পরিচিত ছিল জুয়া আর বেশ্যার দেশ হিশাবে, সেই কিউবাকে কেমন করে তিনি মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় অভিশাপ বেকারত্ব, অশিক্ষা আর বেশ্যাবৃত্তির নিগড় থেকে মুক্ত করলেন? সমাজতন্ত্রের জাদুমন্ত্রে কিভাবে তিনি গোটা দেশের সব মানুষকে করে তুললেন এক একজন ফিদেল ক্যাস্ত্রো? আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ তাকে পয়ষট্টিবার হত্যা করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। আমেরিকা থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরের দেশ কিউবা; বলা চলে আমেরিকার পেটের মধ্যেই তার অবস্থান। তারপরও তারা কিছুই করতে পারে নি সমাজতান্ত্রিক কিউবার। বিশ শতকের শেষ দশকে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়। তার পথ ধরে সমাজতন্ত্রের পতন ঘটে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতেও; একই পথে এগুতে থাকে চিন। একা হয়ে পড়ে কিউবা, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে একচুলও সরে আসে নি। সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থনৈতিক অবরোধ ও আগ্রাসনের হুমকিকে মোকাবেলা করে এখনও টিকে আছে কিউবা বিপুল বিক্রমে। যে ফিদেলের নেতৃত্বে এটি সম্ভব হলো, কেমন ছিল তার জীবন? কী করে তিনি পারলেন এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে? সবারই তা জানতে ইচ্ছে করে। আমাদের জানা মতে, এ পর্যন্ত ফিদেলের কোনো জীবনী প্রকাশিত হয় নি, কিংবা তিনি নিজেও তার কোনো আত্মজীবনী লিখে যান নি। স্পেনের সাংবাদিক ইগনাসিও র‌্যামোনেতের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ১০০ ঘণ্টা কথা বলেছিলেন ফিদেল ক্যাস্ত্রো। ইগনাসিও র‌্যামোনেত ফিদেলের সেই বয়ান লিপিবদ্ধ করেন স্প্যানিশ ভাষায়। ফিদেলের ওই বয়ানে উঠে এসেছিল তার জীবনের আদ্যোপান্ত। ফিদেলের সেই জীবন-বয়ান নিয়ে ২০০৬ সালে স্প্যানিশ ভাষায় প্রকাশিত হয় গ্রন্থ। সেই গ্রন্থই ফিদেলের বাচিক আত্মজীবনী হিশেবে সমধিক পরিচিত। এনড্রু হার্লে ২০০৮ সালে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন সেই গ্রন্থ। বাংলাভাষার পাঠকদের জন্য ফিদেলের এই আত্মজৈবনিক বয়ান ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাকসুদ ইবনে রহমান।
.
আজ ১৩ আগস্ট ২০১৭, ক্যাস্ত্রোর ৯২-তম জন্মদিনে প্রকাশিত হলো এই বাচিক আত্মজীবনীর প্রথম পর্ব।

 


আমার ছেলেবেলা : প্রকৃতির কোলে


একজন মানুষ পরিপূর্ণভাবে তার ভাগ্যের নিয়ন্তা নয়। একজন মানুষ বিশেষ ধরনের পরিবেশ, সংকট ও সংগ্রামের মধ্যে জন্ম নেওয়া একজন সন্তানও বটে। একটা লেইদ মেশিন যেমন করে একটা ধাতুকে বিভিন্ন আকার দেয়, সমস্যা তেমনি করে একজন মানুষকে তৈরি করে। একজন মানুষ বিপ্লবী হিশেবে জন্মায় না। আমি নিজেকে একজন বিপ্লবী হিশেবে তৈরি করেছি। যেসব ঘটনা বা পরিস্থিতি আমাকে বিপ্লবী করেছে আমি সেগুলো নিয়ে মাঝে মাঝেই ভেবেছি। আমার জন্ম হয়েছে বড় এক জমিদারিতে।


আমি বাড়ি ছাড়া অন্য যেকোনো জায়গায়ই থাকতে পছন্দ করতাম বেশি। আমার কাছে কর্তৃত্বের অপর নাম ছিল বাড়ি আর এই বিষয়টাই আমাকে চটিয়ে তুলত এবং আমার মধ্যে বিদ্রোহী চেতনার অঙ্কুরোদ্‌গম তখন থেকেই শুরু হয়েছিল।


আমি জন্মেছি একটি খামারে। সেটি ছিল ওরিয়েন্তের প্রাক্তন একটি রাজ্য; নাইপ সাগর থেকে খুব একটা দূরে নয়। পাশেই ছিল আখক্ষেত। খামারটির নাম ছিল বিরান। সেটি ঠিক গ্রামও ছিল না আবার শহরও বলা যায় না। বিরান কয়েকটি বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন বাড়ি ছাড়া আর কিছুই না। আমাদের বাড়ি ছিল ওখানে। মিউনিসিপ্যালটির রাজধানী থেকে ধুলোমাখা রাস্তাগুলো সে সময় ছিল কর্দমাক্ত। মানুষ ঘোড়ার পিঠে অথবা গরুর গাড়িতে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেত। তখনও সেখানে কোনো ধরনের মোটরগাড়ি চলত না; কোনো বিদ্যুতের ব্যবস্থাও ছিল না। আমরা তখন ছোট ছিলাম। বাড়িতে তখন আমরা মোমবাতি অথবা কেরোসিনের বাতি জ্বালাতাম।

আমাদের বাড়িটি ছিল কাঠের। বাবা ছিলেন গরিব কৃষকের সন্তান। তিনি ছিলেন সেপনের গেলিসিয়ার লুগা প্রদেশের লানকারা গ্রামের লোক। সে কারণেই আমাদের বাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল সেপনের স্থাপত্যশিল্প অনুসরণ করে। ওখানকার গেলিসীয় স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী পোষা পশুপাখিকে বাড়ির নিচে রাখার ব্যবস্থা করা হতো। আমাদের বাড়িটিও ওই রীতি অনুসারে খুঁটির মতো কাঠের স্তম্ভের উপর দাঁড়ানো ছিল। স্তম্ভগুলো ছিল ছয় ফুটের বেশি লম্বা। গেলিসিয়াতে বাড়ির স্তম্ভের ক্ষেত্রে এই উচ্চতাই ছিল সাধারণ রীতি। আমার মনে আছে, আমার বয়স যখন তিন কি চার বছর, তখন আমাদের ঘরের নিচে গরু ঘুমাত। রাত নামার সাথে সাথেই ওরা ঘুমিয়ে পড়ত। গরুগুলো ঘরের নিচে খুঁটিতে বাঁধা থাকত। ঘরের নিচে একটা ছোট খোয়াড়ে শূকর, মুরগি, হাঁস—এমন অনেক ধরনের পশুপাখিও রাখা হতো। ওই ঘরেরই দ্বিতীয় তলায় ১৯২৬ সালের ১৩ই আগস্ট দুপুর ২টায় আমার জন্ম।

এই ধরনের গ্রাম্য পরিবেশ, দৃশ্যাবলি, কাজকর্ম, গাছ-গাছালি, আখের ক্ষেত, পাখি আর পোকামাকড়ের মধ্যে আমি খুব ছোটবেলায় বেড়ে উঠেছিলাম।


আমার বাবা


আমার বাবা ছিলেন প্রবল আত্মপ্রত্যয়ী এবং ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন লোক। অনেক চেষ্টায় তিনি নিজেই লিখতে এবং পড়তে শিখেছিলেন। খুবই কর্মঠ লোক ছিলেন তিনি। প্রচুর ঘুরে বেড়াতেন। আর তার ভাবখানা এমন ছিল—যেন চাইলেই সব পাওয়া যায়। তার সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল প্রকৃতিগত। আমার বাবা ছিলেন এক গরিব কৃষকের সন্তান। ১৯৯২ সালে আমি একবার গেলিসিয়ার লানকারায় বাবার বাড়িতে গিয়েছিলাম। ছোট্ট একটা বাড়ি। তিরিশ ফুট লম্বা আর আঠার-বিশ ফুট প্রশস্ত গ্রামীণ সেই ছোট্ট বাড়িতে গোটা পরিবারটি থাকত। সম্ভবত পোষা প্রাণীও। শোবার ব্যবস্থা এবং রান্নার ব্যবস্থা একই রুমে করতে হতো। বাবাদের কোনো জমি ছিল না।

আমার বাবা যখন ষোল-সতের বছরের যুবক তখন তাকে স্প্যানিশ মিলিটারিতে রিক্রুট করা হয়। কিন্তু তিনি কিউবায় এলেন যখন তার বয়স বিশ বছর। তিনি কিউবায় এলেন ১৮৯৫ সালে, কিউবার দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। কোন অবস্থায় এবং কিভাবে তিনি কিউবায় এলেন তা কেউই বলতে পারে না। বড় হওয়ার পর বাবার সাথে আমিও কখনো ওই বিষয়ে কথা বলি নি। আমার বড় বোন এঞ্জেলিটা এবং ভাইবোনদের মধ্যে দ্বিতীয় রেমন আর আমার চার বছরের ছোট ভাই রাউল আমার বাবার সাথে ওইসব বিষয়ে প্রচুর কথা বলেছে। পরে আমি ওদের কাছে শুনেছিলাম যে বাবা ছিলেন ওইসব গেলিসিয়ার গরিব ছেলেদের একজন যারা ধনীদের দেওয়া টাকার বিনিময়ে তাদের বদলি হিশেবে মিলিটারি সার্ভিসে নাম লিখিয়েছিলেন। আমার বাবাও একইভাবে মিলিটারিতে নাম লিখিয়েছিলেন। আমার বাবা কিউবায় এসেছিলেন একজন স্প্যানিশ সৈন্য হিশেবে।

আমি বাড়ি ছাড়া অন্য যেকোনো জায়গায়ই থাকতে পছন্দ করতাম বেশি। আমার কাছে কর্তৃত্বের অপর নাম ছিল বাড়ি আর এই বিষয়টাই আমাকে চটিয়ে তুলত এবং আমার মধ্যে বিদ্রোহী চেতনার অঙ্কুরোদ্‌গম তখন থেকেই শুরু হয়েছিল। আমি কর্তৃত্ব পছন্দ করতাম না। ওই সময়ে দৈহিক শাস্তির বিধান ছিল। চড়-থাপ্পড় ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার।


বাবার মধ্যে ছিল গেলিসীয় অভিবাসীদের সেই মহৎ গুণাবলী—দয়া, আতিথেয়তা আর সহৃদয়তা। তার সহৃদয়তার বহু গল্প আছে।


আমার বাবা খুব অল্পতেই রেগে যেতেন। দৃঢ়চেতা না হলে তিনি যে সম্পদ করেছিলেন তা তিনি পারতেন না। কিউবায় এসেছিলেন তিনি একা, শূন্য হাতে। এমনকি তার কাছে তখন এক সেন্টও ছিল না। অন্য গেলিসীয় অভিবাসীদের মতোই তিনি ছিলেন নম্র, বিনয়ী এবং কর্মঠ। তিনি ছিলেন প্রত্যয়ী এবং মহান চরিত্রের মানুষ। কেউ তার কাছে সাহায্যের জন্য এলে তিনি তাকে না বলতে পারতেন না। তিনি মনোযোগ দিয়ে কথা শুনতেন এবং বিপদাপন্ন মানুষকে সাহায্যের জন্য সব সময়ই প্রস্তুত থাকতেন। তার বেড়ে ওঠার সময়ে তিনি নিজেই অভাবগ্রস্ত ছিলেন। আমার বাবা এগারো বছর বয়সেই তার মাকে হারিয়েছিলেন। তার বাবা আবার বিয়ে করলে তার গোটা ছেলেবেলাটাই অতিক্রান্ত হয় প্রচণ্ড কষ্ট আর উচ্ছৃঙ্খলতার মধ্যে। কিন্তু বাবার মধ্যে ছিল গেলিসীয় অভিবাসীদের সেই মহৎ গুণাবলি—দয়া, আতিথেয়তা আর সহৃদয়তা। তার সহৃদয়তার বহু গল্প আছে।

১৮৯৮ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আমার বাবাকে স্পেনে প্রত্যাবাসন করা হয়। কিন্তু বাবা মনে হয় কিউবাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। ঠিক পরের বছর তিনি আরো অনেক গেলিসীয় অভিবাসীদের সাথে কিউবায় ফিরে এলেন। ১৮৯৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি হাভানা বন্দরে নামেন। তখন তার কাছে কানাকড়িও ছিল না। সাথে ছিল না পরিবারের কোনো সদস্য। তিনি যখন এলেন তখন মার্কিনিরা ব্যাপকভাবে বন সাফ করে আখের আবাদ শুরু করেছে। লোক ভাড়া করে গাছ কাটিয়ে বন পরিষ্কার করে আখের চাষ করাচ্ছিল মার্কিনিরা।

ওরিয়েন্তে প্রদেশে একজন সাধারণ শ্রমিক হিশেবে কাজ শুরু করেছিলেন আমার বাবা। তিনি অন্য শ্রমিকদের সংগঠিত করেন। তাদের বেশিরভাগই ছিল স্প্যানিশ। কারো কারো বাড়ি আবার ছিল হাইতি ও জ্যামাইকাতে। তিনি ওই শ্রমিকদের নিয়ে মার্কিন কোম্পানিগুলোর আখ চাষের জন্যে জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করতেন। ওই শ্রমিকদের সংগঠক হিশেবে তিনি এভাবে মুনাফা করতে লাগলেন এবং প্রচুর জমির মালিক হয়ে গেলেন।

আমরা যেখানে থাকতাম (বিরান), সেটাকে শহর বলা যায় না। বিরান ছিল ছড়ানো ছিটানো কিছু বাড়ির সমষ্টি মাত্র। আমি যখন ছোট ছিলাম, আমাদের গরুর খামারটা ছিল ঠিক আমাদের ঘরের নিচেই। পরে আমাদের বাড়ির প্রায় চল্লিশ গজ দূরে একটি খামার তৈরি করা হয়। রাস্তার ঠিক অপর পারে একটা কামারশালা ছিল। সেটির খুব কাছেই ছিল একটি কসাইখানা। আমাদের বাড়ির অন্যদিক দিয়ে প্রায় চল্লিশ গজ দূরে ছিল একটা বেকারি। বেকারির কাছাকাছি একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। রাস্তার ধার ঘেঁষেই ছিল একটা স্টোর, যেখানে খাদ্যদ্রব্য (অপচনশীল) এবং আরো অনেক কিছুই পাওয়া যেত। রাস্তার অপর পাশেই ছিল পোস্ট অফিস আর টেলিগ্রাফ অফিস। তার অনেকটা কাছেই ছিল জীর্ণ ব্যারাকের মতো কিছু ভবন। তালপাতায় ছাওয়া ছাদযুক্ত কিছু কুঁড়েঘরও ছিল সেখানে। ওই ঘরগুলোতে কয়েক ডজন হাইতিয়ান অভিবাসী খুবই দীন-দরিদ্রভাবে জীবন-যাপন করত। তারা আখ চাষের সময় কাজ করত।

আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল কমলালেবুর বাগান। আমার বাবা নিজেই গাছের ডাল ছাঁটার কাজটি দুই হাতলের একটা কাঁচি নিয়ে তত্ত্বাবধান করতেন। বাগানটা ছিল ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ একর জমির ওপর। সেখানে অন্য সব ফলের চাষও হতো। আমাদের তিনটি বড় মৌমাছির ঘরও ছিল। সেগুলোতে ছিল চল্লিশটার মতো মৌচাক। সেগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে মধু আহরণ করা যেত। আমি এখনো চোখ বুজে ওই কমলালেবুর বাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে পারব। আমি জানি বাগানের কোন গাছটি কোথায় আছে। নিজ হাতে খোসা ছাড়িয়ে আমি বাগানের কমলালেবু খেতাম। পুরো গ্রীষ্মকাল এবং বড়দিনের ছুটির সময়টা বাগানেই কাটাতাম। আমি এক জীবনে যত কমলা খেয়েছি আমার মনে হয় না আর কেউ তা খেয়েছে।

আমাদের বাড়ি থেকে একশ গজ দূরে সীমানা করা একটা জায়গায় মোরগের লড়াই হতো। এই খেলাটির আয়োজন করা হতো ফসল কাটার সময়ে প্রতি রোববার। এছাড়া বড়দিন, নববর্ষ এবং ইস্টার সানডেতেও মোরগের লড়াইয়ের আয়োজন হতো। গ্রামে সে সময় এটাই ছিল জনপ্রিয় খেলা। আমার বাবা যখন জোয়ান সৈনিক ছিলেন তখন তিনি প্রচুর তাস খেলতেন। গ্রামের লোকেরা ডমিনোও খেলত।


মা বিপ্লবীদের জননী হিশেবে নিজের ভূমিকাকে সানন্দে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন, যে কারণে তাকে অনেক কষ্ট ও যাতনাও সহ্য করতে হয়েছিল।


আমাদের বয়স যখন দশ কী বারো বছর তখন আমাদের বাড়িতে একটি রেডিও ছিল। ওই রেডিওর কথা আমার মনে আছে। যতদূর মনে পড়ে, বাবা ছাড়া ওই রকম রেডিওর মালিক ওই অঞ্চলে আর কেউ ছিল না। আমি এতক্ষণ যা কিছুর বর্ণনা দিলাম—শুধু স্কুলঘর আর পোস্ট অফিসটা বাদে—সব কিছুর মালিক ছিলেন আমার বাবা। ১৯২৬ সালে আমার জন্মের আগেই বাবা বেশ খানিকটা সম্পদের মালিক হয়ে গিয়েছিলেন। জমির মালিক হিশেবে তিনি বেশ বিত্তবানই ছিলেন। ডন এঞ্জেল ক্যাস্ত্রো হিশেবেই পরিচিতি ছিল তার। অত্যন্ত শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। ওই সময়ে প্রায় সামন্ততান্ত্রিক একটি এলাকায় তিনি ছিলেন প্রচণ্ড দাপুটে একজন মানুষ। অল্প অল্প করে জমি কিনে এক সময় প্রচুর জমির মালিক বনে যান তিনি।


আমার মা


আমার মায়ের নাম ছিল লিনা। তিনি কিউবানই ছিলেন। মায়ের পরিবারও ছিল গরিব কৃষক পরিবার। আমার নানা ছিলেন গাড়োয়ান। তিনি গরুর গাড়িতে করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় আখ বহন করতেন। বাস্তবে আমার মা ছিলেন অশিক্ষিত এবং আমার বাবার মতোই নিজে নিজে লিখতে ও পড়তে শিখেছেন। কঠিন সংকল্প ও প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে তাকে তা অর্জন করতে হয়েছে। আমি কখনো তাকে বলতে শুনি নি যে তিনি স্কুলে গিয়েছেন। তিনি ছিলেন নজিরবিহীন কঠিন পরিশ্রমী এক নারী। কোনো কিছুই তার সদা-সতর্ক চোখকে ফাঁকি দিতে পারত না। মা ছিলেন একাধারে বাবুর্চি, ডাক্তার এবং আমাদের সবার তত্ত্বাবধায়ক। আমাদের প্রয়োজনের সবকিছুর জোগান তিনিই দিতেন। সব ধরনের সমস্যা সমাধানের আবদার আমরা তার কাছেই করতে পারতাম। তিনি কিন্তু আমাদের নষ্টও হতে দেন নি। শৃঙ্খলা, সঞ্চয় এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে তিনি ছিলেন একগুঁয়ে স্বভাবের। এক কথায়, তিনি ছিলেন একজন পারিবারিক অর্থনীতিবিদ। যেসব কাজকর্ম তিনি করতেন সেসবের জন্য তিনি কিভাবে সময় বের করতেন অথবা কোথায়ই-বা এত উদ্যম পেতেন তা কখনও কেউ বুঝে উঠতে পারে নি। তিনি কখনও বসতেন না; পুরো দিনে আমি কখনোও তাকে এক সেকেন্ডের জন্যও বসতে দেখি নি।

তিনি সাত-সাতটি সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছেন, যদিও তখন প্রসবকালীন সময়ে ধাত্রীর ব্যবস্থা ছিল। আমরা সব ভাইবোন ওই একই বাড়িতে জন্মেছিলাম। তখন কোনো ডাক্তারের ব্যবস্থা ছিল না—সম্ভবও ছিল না—ওই সুদূর গ্রামাঞ্চলে এমন ব্যবস্থা থাকারও কথা না। নিজের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য তার মতো এত পরিশ্রম কেউ করে নি। তাকে ছাড়া—আমি যে মানুষ সবসময়ই পড়তে পছন্দ করি—বাস্তবে অশিক্ষিতই থেকে যেতাম। আমার মা তার সন্তানদের অনেক বেশি আদর করতেন। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন, সাহসী এবং আত্মত্যাগী এক নারী। আমরা আমাদের অজান্তে যেসব দুঃখকষ্ট তাকে দিতাম তিনি সেগুলো দৃঢ়তার সাথে এবং অবিচলিতভাবে মোকাবেলা করতেন। খামারে কৃষি-সংস্কার এবং জমি পুনর্বণ্টনের প্রশ্নে তিনি কোনো নেতিবাচক মনোভাব দেখান নি।

আমার মা ছিলেন খুব ধার্মিক। তার বিশ্বাসকে আমি সব সময়ই শ্রদ্ধা করতাম। মা হওয়ার যে কষ্ট তার মধ্যেও তিনি কোনো না কোনোভাবে তৃপ্তির আনন্দ উপভোগ করতেন। মা বিপ্লবীদের জননী হিশেবে নিজের ভূমিকাকে সানন্দে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন, যে কারণে তাকে অনেক কষ্ট ও যাতনাও সহ্য করতে হয়েছিল। খুবই সাধারণ এবং গরিব এক কৃষকের সন্তান হিশেবে তার পক্ষে মানবতার ইতিহাস জানা সম্ভব ছিল না, কিংবা যেসব ঘটনা তার দেশ কিউবার অভ্যন্তরে এবং বিশ্বব্যাপী ঘটে চলেছিল সেসবের গভীর কারণও তার পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব ছিল না।

বিপ্লবের সাড়ে তিন বছর পরে ১৯৬৩ সনের ৬ আগস্ট আমার মা মারা যান। আমার বাবা অবশ্য অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন। বাবা ছিলেন মায়ের চেয়ে বয়সে অনেক বড়। তিনি মারা যান ১৯৫৬ সনের ২১ অক্টোবর।

২য় পর্বের লিংক

মাকসুদ ইবনে রহমান

জন্ম ১৯৬৪, নারায়ণগঞ্জ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা।

Latest posts by মাকসুদ ইবনে রহমান (see all)