হোম অনুবাদ আমার জীবন : পর্ব-৮

আমার জীবন : পর্ব-৮

আমার জীবন : পর্ব-৮
154
0
৭ম পর্বের লিংক

কমিউনিস্ট দলগুলোর রক্তক্ষরণে মৃত্যু


চিবাসের রাজনীতি আমাকে প্রভাবিত করেছিল। এদোওয়ার্দো চিবাস ছিলেন জনপ্রিয় এক দলের নেতা। যে দল চুরি, ফটকাবাজি এবং দুর্নীতির প্রচণ্ড বিরোধিতা করত। চিবাস অবিরত এই সব অন্যায়ের নিন্দা করতেন। প্রায়শই নিন্দা ও সমালোচনা করতেন ফুলহেনসিও বাতিস্তার।

সাপ্তাহিক এক রেডিও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চিবাসের সুখ্যাতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। অনুষ্ঠানটি রোববার রাত ৮টা থেকে ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত প্রচারিত হতো। ওই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক সম্মান অর্জন করেন। সেটিই ছিল আমাদের দেশে রেডিও অনুষ্ঠানের রাজনৈতিক প্রভাবের প্রথম ঘটনা। চিবাসের জন্ম হয়েছিল প্রচার মাধ্যমের বদৌলতে। তিনি জনপ্রিয় হয়েছিলেন তার প্রচণ্ড রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কারণে। প্রতি রোববার রেডিওতে আধা ঘণ্টা কথা বলতেন। তার প্রচুর শ্রোতা ছিল।

চিবাস সরকার থেকে চোরদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে চেয়েছিলেন। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বা টেলিফোন বিল বাড়লে তিনি বিদ্যুৎ এবং টেলিফোন কোম্পানিরও তীব্র সমালোচনা করতেন। তিনি ছিলেন একজন অগ্রসর চিন্তাবিদ, কিন্তু বৈপ্লবিক সামাজিক পরিবর্তন তার উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। একটা নতুন রাজনৈতিক যুগের তখন সূচনা হচ্ছিল।


উগ্র জাতীয়তাবাদ হচ্ছে আন্তর্জাতিকতাবাদ ধ্বংসের আসল কারণ। আন্তর্জাতিকতাবাদ ছাড়া মানবতার কোনো মুক্তির পথ নেই।


হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের প্রথম বর্ষে পড়ার সময় আমি চিবাসের অনুসারীদের সংস্পর্শে আসি। বাতিস্তার বিরুদ্ধে তার নীতিনিষ্ঠ এবং সরাসরি অবস্থান গ্রহণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার বিরামহীন সমালোচনার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। যে সব ছাত্র ত্রিশের দশকে জেরার্দো মাচাদোর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল তাদের নিয়েই গঠিত হলো কিউবান রেভ্যুলুশনারি পার্টি (অথেনটিক)। এই দল হোসে মার্তির নেতৃত্বে গঠিত রেভ্যুলুশানারি পার্টির কথাই মনে করিয়ে দেয়। এই দলের সঙ্গে ‘অথেনটিক’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়, কারণ কিউবান রেভ্যুলুশনারি পার্টি নামে কিউবাতে আরেকটি দল ছিল। চিবাস এই অথেনটিক পার্টির সাথেই যুক্ত ছিলেন। র‌্যামন গ্রাউ সান মার্তিন ১৯৩৪ সালে এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই দল ১৯৪৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে। মাত্র দুই বছর ছয় মাস পরে চিবাস প্রতিষ্ঠা করেন কিউবান পিপলস পার্টি বা অর্থোডক্স পার্টি। চিবাস তখন সিনেটর। পার্টি প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি তার আগের দলের সব ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা শুরু করেন, কারণ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ওই দলের নৈতিক এবং রাজনৈতিক দুর্বলতা পরিষ্কার হতে শুরু করে। ১৯৩৩ সালে যে বিপ্লবী চেতনা ছিল ওই দলে তার কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না।

তখন শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে গুয়াতেমালাতে খামার থাকার অভিযোগ আনলেন চিবাস। শিক্ষামন্ত্রীর কিছুটা রাজনৈতিক বিচারবুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি মাচাদো এবং বাতিস্তার বিরুদ্ধে আন্দোলনও করেছিলেন। তিনি ছাত্র এবং প্রফেসর এই দুই অবস্থাতেই ছিলেন বামপন্থী। এই মন্ত্রী চিবাসের দাবি প্রত্যাখ্যান করলেন এবং মহাসমারোহে চিবাসকে তার অভিযোগ প্রমাণ করতে বললেন। চিবাস তা প্রমাণ করতে পারলেন না। কোনো একটা সূত্রের মাধ্যমে তিনি যে তথ্য পেয়েছিলেন সেই সূত্র তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের জোগান দিতে পারে নি। খুব চাপে পড়ে গেলেন চিবাস। মিথ্যা প্রচার এবং কুৎসা রটনার দায়ে তাকে অভিযুক্ত করা হলো। চিবাস শেষ পর্যন্ত বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। এক রোববারে রেডিও অনুষ্ঠানে কথা বলার পর নিজের পাকস্থলীতে নিজেই গুলি করলেন। কয়েকদিন পর তিনি মারা গেলেন।

চিবাস মারা যান ১৯৫১ সালের আগস্ট মাসে। ১৯৫২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রায় দশ মাস আগে তিনি আত্মহত্যা করেন। মাচাদোর বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিশেবে পরিচিত ছিলেন। গুয়ানতানামোর ওরিয়েন্ত এলাকার এক ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন চিবাস। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, চিবাস ও আমি একই স্কুলে পড়াশোনা করেছি। চিবাসও আমার মতোই সানতিয়াগোর কলেজ দ্য ডোলারস্ এবং হাভানার বেলেরে পড়াশোনা করতেন। তিনি মাচাদো বিরোধী ছিলেন। ১৯৪৪ সালে কিউবান রেভ্যুলুশনারি পার্টি (অথেনটিক) ক্ষমতায় আসার পর সিনেটর মনোনীত হন। ১৯৩৩ সালে শরীরবিদ্যার অধ্যাপক র‌্যামন গ্রাউ যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন আমি তখন হাইস্কুলে শেষ বর্ষের ছাত্র। র‌্যামন গ্রাউ মাত্র তিন মাস ক্ষমতায় ছিলেন। বাতিস্তা তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন।

হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরবিদ্যার অধ্যাপক র‌্যামন গ্রাউ ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। গোটা বিশ্ব তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের গণতন্ত্র, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব—এইসব ধারণায় পরিপূরিত।

বাতিস্তা নিজেও কিছু চাপের কারণে গুটিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৪০ সালে সংবিধান অনুমোদনের পর বাতিস্তা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ওই সময় কিছু ক্ষেত্রে তিনি খানিকটা প্রগতিশীল ছিলেন কমিউনিস্টদের প্রভাবের কারণে। কমিউনিস্টরা সে সময় ফ্যাসিবাদ বিরোধী জোটে তার সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

মিউনিখে তখন বিশ্বের দুই পরাক্রমশালী ঔপনিবেশিক শক্তি—ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড—হিটলারকে দিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছিল। আমি মনে করি না যে ওই সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা কোনোভাবেই হিটলার এবং স্তালিনের মধ্যে চুক্তির ন্যায্যতা প্রতিপাদন করে। বিষয়টা দুর্বোধ্য, খুবই দুর্বোধ্য। সব কমিউনিস্ট পার্টি—যারা নিয়ম-শৃঙ্খলার বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত—তাদের সবাইকে তখন মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তি সমর্থনে বাধ্য করা হয়। এভাবেই ওই দলগুলোর রক্তক্ষরণে রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটে। ওই পদক্ষেপগুলো ছিল খুবই জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু একটার পর একটা ওই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকল। সবচেয়ে বেশি নিয়মানুবর্তী এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ লাতিন আমেরিকার কমিউনিস্ট পার্টিগুলোও—যারা মহান অক্টোবর বিপ্লবের প্রতি অনুগত—ওই চুক্তিকে সমর্থন করেন। আমি তাদের আত্মত্যাগ এবং দৃঢ়তার প্রতি প্রচণ্ড শ্রদ্ধা রেখেই একথা বলছি। লাতিন আমেরিকার ওইসব কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে কিউবান কমিউনিস্ট পার্টিও ছিল। এই দলটির প্রতি আমি সব সময়ই অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলাম।

এমনকি মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তির (১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সম্পাদিত অনাক্রমণ চুক্তি) আগেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ থেকে কিউবার কমিউনিস্টরা বাতিস্তার সাথে জোটবদ্ধ হয়। বাতিস্তা ইতোমধ্যেই ১৯৩৪ সালে বিখ্যাত এপ্রিল ধর্মঘটের ওপর রক্তাক্ত দমন-পীড়ন চালিয়েছিলেন। ধর্মঘটটি ডাকা হয়েছিল ১৯৩৩ সালের অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে বাতিস্তার অভ্যুত্থানের প্রতিবাদে। ১৯৩৩ সালের ওই সরকার প্রশ্নাতীতভাবেই বিপ্লবী চরিত্রের ছিল। ওই সরকার ছিল কার্লোস বালিনো, হোলিও আন্তনিয়ো মেইয়া এবং সর্বশেষ রুবেন মার্তিনেজ ভিয়েনার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শ্রমিক এবং কিউবান কমিউনিস্ট পার্টির গৌরবময় সংগ্রামের ফসল। ফ্যাসিবাদ বিরোধী জোট গঠনের আগে আমার জানা নেই কত লোককে বাতিস্তা হত্যা করেছেন আর কত টাকা তিনি চুরি করেছেন। ১৯৩৩ সালের শেষের দিকে তার বিশ্বাসঘাতকতার সময় থেকে বাতিস্তা সব সময়ই ছিলেন আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের দাবার ঘুঁটি।


যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি কেবল এক ধরনের বিদ্রোহী চেতনা এবং ন্যায়বিচারের সামান্য ধারণা নিয়ে পা রেখেছিলাম সেখানে আমি হয়ে উঠলাম একজন বিপ্লবী।


১৯৪৪ সালের জুন মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখনো শেষ হয় নি। লাখ লাখ সোভিয়েত সৈন্য যারা সমাজতন্ত্র রক্ষার যুদ্ধে জীবন দিয়েছিল তাদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা বার্লিনের রাইখস্টেগের ওপর উড়ছিল। জাপান তখনো তার প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছিল আর জোটও জোটবদ্ধই ছিল। দুটি পারমাণবিক বোমা জাপানের অরক্ষিত নাগরিক শহরের ওপর ফেলা হয়েছিল বিশ্বকে আতঙ্কিত করার জন্য। তার ঠিক পরপরই শুরু হলো বিশ্বব্যাপী কমিউনিজম দমনের ঢেউ। যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাকার্থিজমের (যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদ জোসেফ ম্যাকার্থি ১৯৫০-এর দশকে যে নীতি অনুসরণ করে সন্দেহভাজন কম্যুনিস্টদের খুঁজে বের করে সরকারি চাকরি থেকে অপসারণ করতেন) উত্থান ঘটল। তখন রোজেনবার্গের মতো সাহসী প্রগতিশীল পুরুষ এবং নারীদের হত্যা করা হলো, অন্যদের কারাগারে পাঠানো হলো, উৎপীড়নের শিকার হলেন অনেকে। কিউবায়ও র‌্যামন গ্রাউ প্রশাসনের সম্মানিত কমিউনিস্ট শ্রমিক নেতাদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে একটি বিপ্লবী দল কৌশলগত আন্দোলন পরিচালনা করতে পারে, কিন্তু অবশ্যই কৌশলগত কোনো ভুল করতে পারে না।

আন্তর্জাতিকতাবাদের সহানুভূতি পেয়ে আমরা নিজেদের বিপ্লবে লাভবান হয়েছি ঠিকই, কিন্তু একইসাথে বিশ্ব উগ্র জাতীয়তাবাদের দ্বারা মারাত্মকভাবে এবং ন্যক্কারজনকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ হচ্ছে আন্তর্জাতিকতাবাদ ধ্বংসের আসল কারণ। আন্তর্জাতিকতাবাদ ছাড়া মানবতার কোনো মুক্তির পথ নেই।


মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রথম পাঠ


আমি আইনের স্কুল থেকে স্নাতক পাশ করেছি ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বয়স তখন ২৪ বছর। ১৯৫২ সালের ১০ মার্চ বাতিস্তার অভ্যুত্থান আমাকে হতাশ করে। একই বছর হাভানা থেকে কংগ্রেসের নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। ছাত্রাবস্থায়ই ওই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় চিবাসের প্রতিষ্ঠিত অর্থোডক্স পার্টির সমর্থকদের সাথে শুরু থেকেই সম্পর্কিত ছিলাম। শুরু থেকেই তাদের আন্দোলনের একজন নিবেদিত দরদী ছিলাম। পরে দেখলাম কিছু বিষয় আমার সাথে মিলছে না। আমি আস্তে আস্তে অধিকতর প্রগতিবাদী সচেতনতা অর্জন করতে থাকলাম। মার্কস এবং লেনিনকে বেশি বেশি অধ্যয়ন করতে থাকলাম। আমি ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এবং আরো অনেক লেখকের অর্থনীতি ও দর্শনের ওপর লেখা পড়ছিলাম। আমি মূলত মার্ক্সের রাজনৈতিক চিন্তা এবং রাজনৈতিক তত্ত্বের ওপর লেখা বইগুলি পড়ছিলাম। কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো বাদ দিলে মার্ক্সের যেসব লেখা আমাকে বেশি টানত সেগুলো হচ্ছে—‘দ্য সিভিল ওয়ার ইন ফ্রান্স’, ‘দ্য এইটিন্থ ব্রুমেয়ার’, ‘দ্য ক্রিটিক অব দ্য গোথা প্রোগ্রাম’ এবং তার আরো সব রাজনৈতিক লেখা। গবেষণা করতে গিয়ে তিনি যে দৃঢ়তা, আত্মত্যাগ, তপস্যা এবং একাগ্রতার পরিচয় দিয়েছেন তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। লেনিনের লেখার মধ্যে আমি ‘দ্য স্টেট’ এবং ‘দ্য রেভ্যুলুশন’ এবং ‘ইমপেরিয়ালিজম এ সুপিরিয়র ফেইজ অব ক্যাপিটালিজম’সহ অসংখ্য বিষয়ের ওপর তার সমালোচনামূলক গ্রন্থগুলো পড়েছি। ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির ইতিহাসের ওপর এঙ্গেলসের লেখা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তার আরো একটা বই আমার কাছে খুবই কৌতুহলোদ্দীপক মনে হয়েছে। সেটি হচ্ছে দ্য ডায়ালেক্ট অব নেচার। যে বইটিতে তিনি বলেছেন যে সূর্য একদিন নিভে যাবে; যে জ্বালানি সূর্য নামক ওই তারাকে জ্বলতে সাহায্য করে তা একদিন নিঃশেষিত হয়ে যাবে এবং তখন সূর্য আর আলো দেবে না। এঙ্গেলস যখন একথাটি লিখেছেন তখন নিশ্চয়ই তিনি স্টিফেন ডব্লিউ হকিংসের এ ব্রিফ হিস্টরি অব টাইম’ পড়েন নি অথবা আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের সাথেও তার পরিচয় ছিল না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ছিলাম রাজনৈতিকভাবে অজ্ঞ এক মানুষ। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাধান্য ছিল র‌্যামন গ্রাউ সান মার্তিনের দলের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেই বুঝতে পারলাম যে ওখানে বল প্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন এবং অস্ত্রের মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখার একটা পরিবেশ বিরাজ করছে। ক্ষমতাসীনদের ওই দলটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মপন্থা নিয়ন্ত্রণ করত। দুর্নীতিপরায়ণ সরকারের কাছে এটি ছিল একটি রক্ষাপ্রাচীর। ওই দলের যে মূল নেতা তার ভালো অবস্থান ও পদবী ছিল। তিনি সরকারি সম্পদসহ সব ধরনের সুবিধা ভোগ করতেন। ওই সময় চিবাস কিউবান রেভ্যুলুশনারি পার্টির (অথেনটিক) বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন। সেই আন্দোলনের ফলেই চিবাসের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হলো কিউবান পিপলস্ পার্টি বা অর্থোডক্স পার্টি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে ওই আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায় চলছিল।

১৯৪৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দেই। একজন ভূস্বামীর সন্তান হিশেবে ষষ্ঠ শ্রেণি শেষ করি। সপ্তম শ্রেণি পার হওয়ার পরেই আমি একটি প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির জন্য ভর্তি হই। তারপরই আমি হাভানা চলে আসি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য। বাবার টাকা থাকার কারণে আমি স্কুল থেকে স্নাতক নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যাই। বিরানের হাজার হাজার ছেলেমেয়ের চেয়ে আমি কি কোনো অংশে ভালো ছাত্র ছিলাম? তাদের অনেকেই তো ষষ্ঠ শ্রেণি পার হতে পারে নি। তাদের কেউই স্কুল থেকে স্নাতক পাশ করে নি; তাদের কেউই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে নি।

ওরিয়েন্ত প্রদেশের সানতিয়াগো দ্য কিউবার মতো দুই চারটি শহরে শ্রমিকদের সন্তানেরা—যারা আঁখের আবাদে বাস করত অথবা ওইসব শহরের বাইরে থাকত—বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক তো দূরের কথা হাইস্কুলের স্নাতকের কথা স্বপ্নেও কল্পনা করত না। ওই সময় হাইস্কুল পাসের পরই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য হাভানায় যেতে হতো। আর হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে গরিবদের কোনো স্থান ছিল না। ওই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মধ্যবিত্ত এবং সম্পদশালী লোকদের ছেলেমেয়ের জন্য। তারপরও যারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারত তাদের নিজস্ব শ্রেণি-ধারণার ঊর্ধ্বে উঠতে হতো। তাদের মধ্যে যারা আদর্শবাদী এবং সমাজের কল্যাণে সংগ্রামে লিপ্ত তারা বহু সংগ্রাম করে কিউবার ইতিহাসে জায়গা করে নিত।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি কেবল এক ধরনের বিদ্রোহী চেতনা এবং ন্যায়বিচারের সামান্য ধারণা নিয়ে পা রেখেছিলাম সেখানে আমি হয়ে উঠলাম একজন বিপ্লবী। হয়ে উঠলাম একজন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী এবং সেখানে অর্জন করলাম হৃদয়ানুভূতি ও মূল্যবোধ, যা আমার সারা জীবনের সংগ্রামের পাথেয়।

[পরের পর্ব আগামী শুক্রবার]

মাকসুদ ইবনে রহমান

জন্ম ১৯৬৪, নারায়ণগঞ্জ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা।

Latest posts by মাকসুদ ইবনে রহমান (see all)