হোম অনুবাদ আমার জীবন : পর্ব-৬

আমার জীবন : পর্ব-৬

আমার জীবন : পর্ব-৬
248
0
৫ম পর্বের লিংক

স্কুলে না পাঠালে বাড়িতে আগুন দেব

.
হাইস্কুলে পড়ার সময় মোটের ওপর ছিলাম ক্রীড়াবিদ এবং পর্বতারোহী। প্রধান কাজই ছিল খেলাধুলা আর ভ্রমণ। এসবই পছন্দ করতাম আমি। স্কুলের মধ্যে বেশ খানিকটা বিশিষ্ট হওয়ায় ইউমুরি উপত্যকায় স্কুলের অভিযানকারী দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়েছিল আমাকেই। কারণ নেতাকেই প্রহরী হিসাবে সারারাত জেগে থাকতে হতো। সেটিই ছিল আমার প্রথম অভিযান। দলের সদস্যদের ইউনিফর্ম ছিল। তাদের থাকতে হতো গ্রামাঞ্চলে তাঁবুতে। তখন নিজস্ব উদ্যোগে পর্বতারোহণের মতো আরো কিছু কার্যক্রম নিয়েছিলাম। আমি স্কুলের সব খেলায় অংশ নিতাম।

খেলার পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করতাম। ক্লাশে যেতাম ঠিকই, কিন্তু ক্লাসে কখনো মনোযোগ দিতাম না। পড়াশোনা যা করতাম সেটা ক্লাসের বাইরে। ফলে, আমি একজন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত লোক হয়ে উঠলাম। নিজে নিজে পাটিগণিত, বীজগণিত, পদার্থবিদ্যা, জ্যামিতি ও উপপাদ্য পড়তাম। নিজে নিজে কী শিখি নি আমি! অবশ্য অনেক ভাগ্যবান ছিলাম, কারণ চূড়ান্ত পরীক্ষায় ফল সবসময়ই ভালো হতো। বই থেকে পড়তাম। অনেক রাত জেগে পড়াশোনা করতাম। রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত পড়তাম। সবাই তখন বাতি না নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। প্রতিদিন পড়ার হলঘরের বাতি নেভানোর দায়িত্ব ছিল আমার। যে কারণে অঙ্কসহ সব বিষয়ই আমি নিজে নিজেই শিখেছি।

ছোট ভাই রাউল তখন বিরানে থাকত। সে আমার পাঁচ বছরের ছোট। ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ছিল সে। তাকেও আমাদের সঙ্গে লা স্যালেতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল চার বছর ছয় মাস বয়সে। রাউল মায়ের সঙ্গে আমাদেরকে দেখতে আসত। আমাদের সঙ্গে চাইত থাকতে। থাকার জন্য কান্নাকাটি করত। লাথি মারত আর মেজাজ দেখাত। মা বাধ্য হয়েই রাউলকে রেখে যেতেন। আমরা চার ছেলে—রেমন, রাউল, আমি আর ক্রিস্টোবিটা (ক্রিস্টোবিটা বিদেশি কোম্পানির করাতকলের ম্যানেজারের ছেলে)—একটা রুমে থাকতাম। তখন কিছুটা দুর্ব্যবহারের ঝোঁক রাউলের। এ কারণে আমি তাকে মাঝে মাঝে বকতাম, কিন্তু রেমন সবসময়ই ওর পক্ষ নিত। রেমন ছিল সবার বড়। ছুটিতে বাড়ি গেলে বাবা-মা রাউলের অনেক সমালোচনা করতেন। তাদের বলে ওর সব দায়িত্ব নিয়ে নিলাম। শুরু করলাম ওর ওপর নজর রাখা। দেখলাম, সে খুব উচ্ছৃক্সখল। কিছু বই পড়তে দিলাম তাকে। ওর মধ্যে আগ্রহ তৈরি হলো। আমি ওর মধ্যে পড়ার একটা আগ্রহ জাগিয়ে দিলাম। বাবা-মাকে বোঝাতে পারলাম যে সে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে। তারা রাজি হলেন। রাউল চলে গেল হাভানায়।

 

দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিদ্রোহ

.
কলেজ দ্যা স্যালেতে আবাসিক ছাত্র ছিলাম। সেখানেই আমার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া শেষ হয়। চতুর্থ শ্রেণি বাদ দিয়ে আমি যখন পঞ্চমে উঠলাম তখন উপাধ্যক্ষের সঙ্গে আমার বড় ধরনের একটা ঝগড়া হলো। উপাধ্যক্ষ ছিলেন ব্রাদার বার্নারডো। তিনি আবাসিক ছাত্রদের দায়িত্বে ছিলেন। তার কাজই ছিল ঘুরে ঘুরে ছাত্রদের প্রহার করা। আবাসিক ছাত্ররা মিলে একদিন সমুদ্রে ঘুরতে গিয়েছিলাম। নৌকায় করে সমুদ্রসৈকত থেকে ফিরছিলাম। তখন আরেকজন ছাত্রের সঙ্গে ঝগড়া লেগে গেল। সে ছিল উপাধ্যক্ষের প্রিয় ছাত্র, একদম চোখের মণি। ব্যাপারটা খুব অলৌকিক যে আমরা নৌকার মোটরের ওপর পড়ি নি। মোটরের ওপর কোনো ঢাকনা ছিল না। অন্য ছাত্ররা আমাদের ছাড়িয়ে দিয়েছিল। স্কুলে ফিরে ওই ছাত্রকে আমি উঠে দাঁড়াতে বললাম। সে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই আমি তাকে মারা শুরু করলাম। কিছুক্ষণ দুজনের ঘুসাঘুসি চলল। অন্যরা এসে আবার আমাদের ছাড়িয়ে দিল। এখন আমার আর ঠিক মনে নেই যে কী কারণে ওই ছেলের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছিল।

ছাত্রটি যেহেতু উপাধ্যক্ষের প্রিয়পাত্র তাই ওই ঘটনার খেসারত দিতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয় নি। কয়েকদিন পর সন্ধ্যার দিকে স্কুলের গির্জার বেদিতে একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল। মারামারির পরপরই বুঝতে পেরেছিলাম যে খারাপ কিছু একটা ঘটবে। সে কারণে আমি খুবই সতর্ক ছিলাম। চুপিসারে স্যাক্রিস্টিতে (গির্জার যে কক্ষে প্রার্থনার আনুষ্ঠানিক পরিচ্ছদ ও অন্যান্য উপাচার রক্ষিত হয়) ঢুকেছিলাম। ওখান থেকে নিচে গির্জার বেদির অনুষ্ঠানের সবকিছু দেখা যায়।

গির্জার আঙ্গিনার দিকে স্যাক্রিস্টির ভারি দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল। ওখানে দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের উপাধ্যক্ষ। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। গির্জার বিধিবিধানের প্রতি তাঁর কোনো শ্রদ্ধা ছিল না। তিনি আমাকে তাঁর সাথে যেতে বললেন। করিডোর দিয়ে তাঁর সাথে হেঁটে ডানে গেলাম। তারপর হল বরাবর আরো খানিকটা যাওয়ার পর তিনি ক্লাসরুমের সামনে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন ওই ছেলের সঙ্গে আমার কী হয়েছে। কথা শেষ করার আগেই তিনি ডান হাত দিয়ে যত জোরে সম্ভব আমাকে একটা থাপ্পড় দিলেন। এই ঘটনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তারপর বাঁ হাত দিয়ে আগের মতোই জোরে আরেকটা থাপ্পর দিলেন। তাঁর হাত তো একজন শক্তিশালী মানুষের হাত। পঞ্চম শ্রেণির প্রথম পর্বান্তে পড়া এক বালকের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হলো সেই হাত। আমার মাথা ঘুরছিল, কান ভোঁ ভোঁ করছিল। এর মধ্যে রাত হয়ে গেল। এটা ছিল ভয়ানক এক অভিজ্ঞতা। ঘটনাটি ছিল লজ্জাকর এবং অপমানের। কয়েক সপ্তাহ পরে দ্বিতীয়বার একই ঘটনা ঘটল। ওপরতলায় আবাসিক হলে যাওয়ার সময়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আমি কথা বলছিলাম। তিনি আমার মাথার পাশে দুইবার ভালো রকমের দুইটা চড় মারলেন।


এতটাই রেগে গিয়েছিলাম যে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে মাখন মাখানো রুটিগুলো উপাধ্যক্ষের মুখের ওপর ছুড়ে মারলাম।


কলেজ দ্যা স্যালেতে যেভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হতো তা ছিল আমার কাছে অচিন্তনীয়। তৃতীয়বার এবং শেষবারের মতো আমি আবারও মার খেলাম। ঘটনাটা ঘটেছিল খাবার ঘর থেকে নাস্তা করে ফেরার সময়। একটু দুধ এবং দুয়েকটা ছোট রুটির রোল খাওয়ার জন্য আমাদের কয়েক মিনিট সময় দেওয়া হতো। একটা কাচের পাত্রে থাকত মাখন। আমরা খুব দ্রুত দুই-তিনটা মাখন মাখানো রোল খেয়ে আরো দুই-তিনটা সঙ্গে নিয়ে নিতাম। কারণ ওই বয়সে ক্ষুধা একটা সাংঘাতিক ব্যাপার। নাস্তা করে ফেরার সময় আমরা উঠানে লাইন ধরে দাঁড়ালাম। লাইনটা যেখানে শেষ সেখানে একটা থাম ছিল। কে আগে থামটি ছুঁতে পারবে—আমরা সেই প্রতিযোগিতায় নেমে গেলাম। যে আগে থামটি ছুঁবে সে-ই সর্বপ্রথম ব্যাট করতে পারবে। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে হাতাহাতি, টানাটানি আর ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। আমরা মাত্র আট থেকে দশ মিনিট খেলার সময় পেতাম। যে কারণে একটা মুহূর্তও আমরা নষ্ট করতে চাইতাম না।

এই অবস্থায় আমি হঠাৎ অনুভব করলাম কেউ একজন দুই থেকে তিনবার আমার মাথার পাশে আঘাত করল। তাকিয়ে দেখি আবারো সেই উপাধ্যক্ষ। কিন্তু ওটাই ছিল শেষবার। আমি প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়েছিলাম। এতটাই রেগে গিয়েছিলাম যে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে মাখন মাখানো রুটিগুলো উপাধ্যক্ষের মুখের ওপর ছুড়ে মারলাম। তারপর ছুটে গিয়ে আমি তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম একটা বাচ্চা বাঘের মতো। গোটা স্কুলের সামনে আমি তাঁকে কামড়াতে থাকলাম। লাথি মারছিলাম আর সজোরে ঘুসি মারছিলাম। ওটা ছিল আমার দ্বিতীয় বিদ্রোহ। আমি ছিলাম ছাত্র আর তিনি ছিলেন ক্ষমতাধর একজন ব্যক্তি, যিনি একজন ছাত্রের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছিলেন এবং অপমান করেছিলেন। সিদ্ধান্ত নিলাম এই ঘটনা কোনোভাবেই আর ঘটতে দেব না। অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করলাম।

অধ্যক্ষ ছিলেন লিওন মারি। করিডোরের শেষ মাথায় পড়ার হলঘরেই ছিলেন তিনি। আমি তাঁর কাছে গিয়ে যা ঘটেছে তা বলার চেষ্টা করলাম। তিনি আমাকে কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তিনি তো তোমাকে শুধু একটা ধাক্কা দিয়েছেন।’ উপধ্যক্ষ আমাকে মারার সময় অধ্যক্ষ হয়তো দেখেন নি, কিন্তু আমি নিশ্চিত, উপাধ্যক্ষকে লাথি, ঘুসি ও কামড় মারার সময় তিনি দেখেছিলেন। ফলে, স্কুল প্রধানের কাছ থেকে আমি এমন বিচারই পেলাম। কিন্তু ঘটনাটি ওই স্বেচ্ছাচারী শিক্ষকের ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতি ছিল প্রচণ্ড এক আঘাত। সব ছাত্রই বলেছিল আমি ঠিক কাজটিই করেছি। কেউই জানত না পরে কী ঘটবে। সবাই অপেক্ষা করছিল। উপাধ্যক্ষ কী প্রতিশোধ নেন তা দেখার জন্য। তখন আমরা পঞ্চম শ্রেণির প্রথম তিন মাসে ছিলাম। প্রতি সপ্তাহে আচরণের ওপর আমাদের গ্রেড দেওয়া হতো। যাদের আচরণ ভালো তারা সাদা গ্রেডে। খারাপ ব্যবহারের জন্য লাল গ্রেড। এই গ্রেডটি খুব বেশি দেওয়া হতো। যাদের ব্যবহার খুবই খারাপ তাদের দেওয়া হতো সবুজ গ্রেড। এই গ্রেডটি দেওয়া হতো না বললেই চলে।


অধ্যক্ষ তাদের বললেন, তাদের তিন সন্তানের মতো বদমাস ছেলে তিনি জীবনে কখনো ওই স্কুলে দেখেন নি।


গ্রেড দেওয়ার দিন আমি অপেক্ষার প্রহর গুনছিলাম। অনেকেই পেল সাদা গ্রেড; কেউ কেউ পেল লাল; সবুজ কেউই পেল না। আমি কোনোটাই পেলাম না। আমাকে কোনো গ্রেডই দেওয়া হলো না। কিছু সময়ের জন্য তিনি আমাকে উপেক্ষা করলেন। আমিও তাঁকে উপেক্ষা করলাম। নিজের গর্ব আর মর্যাদাবোধের কারণেই আমি আর কখনোই তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি নি। কয়েক সপ্তাহ পরেই ছিল বড়দিন। এই পুরো সময়টা তাঁর সঙ্গে আমার কোনো কথাই হয় নি।

ক্রিস্টমাসে আমার মা আর বাবা এলেন। অধ্যক্ষ তাদের বললেন, তাদের তিন সন্তানের মতো বদমাস ছেলে তিনি জীবনে কখনো ওই স্কুলে দেখেন নি। রাউল সে সময় প্রথম গ্রেডে পড়ে। বয়স মাত্র ছয় বছর। আমি বুঝি নি ওই বয়সে সে কিভাবে বদমাস হতে পারে। আর রেমন তো ছিল একটা সাধুসন্ত ছেলে। অধ্যক্ষের কথা শুনে মা-বাবা আমাদের বিরানের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, মা-বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন যে তারা আমাদের আর স্কুলে পাঠাবেন না। রেমন খুশিই হলো। সে বাড়িতে ট্র্যাকটর আর পিক-আপ চড়তে পছন্দ করত। আর রাউল এত ছোট ছিল যে সে কোনো মতামত দিতে পারার কথা নয়। আমি শুধু দেখলাম কিভাবে সব অন্যায়ের দায় আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো। অন্যায়ভাবে আমাকে চড় মারা হলো, আঘাত করা হলো। এখন আবার দেওয়া হলো শাস্তি, স্কুলে যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে ।

ফলে আমাকে আবার বিদ্রোহ করতে হলো। তাদের বললাম যে আমাকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে। আমি যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। এবারের বিদ্রোহটা ছিল নিজ বাড়িতে। আমি তো তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তাম, বয়স তখন সম্ভবত ১১ বছর হবে। আমি এক ভয়ঙ্কর কথা বলে ফেললাম। বললাম যে স্কুলে না পাঠালে গোটা বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেব। আমাদের বাড়িটা ছিল কাঠের তৈরি। সত্যিকার অর্থে ওই কাজটি আমি করতাম না, কিন্তু ওটা করার কথা বেশ জোর দিয়েই বলেছিলাম, কারণ স্কুলে ও বাড়িতে আমার প্রতি যত অন্যায় করা হয়েছিল সেসবের বিরুদ্ধে লড়াই করার ব্যাপারে ছিলাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমি আমার বিষয়টা পরিষ্কার করেছিলাম এবং তারাও তা বুঝতে পেরেছিলেন।

৭ম পর্বের লিংক

মাকসুদ ইবনে রহমান

জন্ম ১৯৬৪, নারায়ণগঞ্জ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা।

Latest posts by মাকসুদ ইবনে রহমান (see all)