হোম অনুবাদ আমার জীবন : পর্ব-৫

আমার জীবন : পর্ব-৫

আমার জীবন : পর্ব-৫
245
0
৪র্থ পর্বের লিংক

আমার নামের প্রথম অংশ ধর্মপিতার

.
মা আমাদের বিরানে নিয়ে আসার পরই আমরা ওই শিক্ষকের বাড়ির লোকজনের অপরাধটা বুঝতে পারলাম। আমাদের দেখে প্রত্যেকেই বুঝতে পারল যে আমরা সত্যিকার অর্থেই না খেয়ে থেকেছি। এই কারণেই আমরা বাড়ি ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। চিরশত্রু ওই শিক্ষক দুপুরে আমাদের বাড়িতে খেতে আসতেন। তিনি সব সময়ই বেছে বেছে মুরগির ভালো টুকরাগুলো তুলে নিতেন। মা যখন আমাদের বিরানে নিয়ে এলেন তখন পর্বান্তের (সেমিস্টার) পরীক্ষা চলছিল। তখনো ওই শিক্ষকই আমাদের পড়াতেন। তখন বিরানেই ছিলেন তিনি। এই সুযোগে রেমন আর আমি তার বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ সংগঠিত করলাম।

এটাকে ঠিক বিদ্রোহ বলা যায় না। বলা যায় আমাদের প্রথম প্রতিশোধের পর্ব। এই প্রতিশোধের ঘটনাটি আমরা ঘটিয়েছিলাম গুলতি ছুড়ে। স্কুলঘরের ছাদ ছিল দস্তার প্রলেপ দিয়ে তৈরি। পেয়ারা গাছের ডাল কেটে আর রাবারের ফালি দিয়ে গুলতি বানিয়েছিলাম। কাছেই ছিল একটা বেকারি। ওখান থেকে চুলা জ্বালানোর কাঠ নিয়ে একটা পাঁচিল বানিয়ে সেটার আড়ালে অবস্থান নিয়ে গুলতির গোলাবর্ষণ শুরু করলাম। প্রায় আধা ঘণ্টা গোলাবর্ষণ চলেছিল। আমাদের শিক্ষক ওই স্কুলঘরেই থাকতেন। ছাদের ওপর অবিরাম পাথর বর্ষণের প্রচণ্ড আওয়াজে শিক্ষকের চিৎকার-চ্যাঁচামেচি চাপা পড়ে গেল। আমরা ছিলাম প্রতিশোধপরায়ণ ক্ষুদে শয়তান।

পরে কিভাবে যে ওই শিক্ষকের সঙ্গে বাবা-মার আবার বোঝাপড়া হলো তা বুঝতেই পারি নি। আমাকে আবার সানতিয়াগোতে তার বাড়িতেই পাঠানো হলো। ওই সময় ভাগ্য আমার পক্ষে ছিল না। রেমন থেকে গেল বিরানেই। অ্যাজমা তাকে ওই যাত্রায় রক্ষা করল। হ্যাঁ, তবে এইবার আমাকে আর না খেয়ে থাকতে হয় নি। কিন্তু এবারও সময়ের অপচয় হলো একইভাবে। মাসের পর মাস বাড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা করা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ ছিল না। তবে আগের মতোই নিজে নিজে গুণের নামতা মুখস্ত করতাম। জানুয়ারি মাসে ওরা আমাকে ভর্তি করিয়ে দিল কলেজ দ্য লা স্যালেতে প্রথম শ্রেণিতে। জীবনে এই প্রথম আমি সত্যিকার অর্থে শিক্ষা অর্জন শুরু করলাম।


তখন সবাই আমাকে ডাকত ইহুদি বলে। বাপ্তিজম না হলে ওই সময় লোকে ওভাবেই ডাকত।


এর মধ্যে ম্যাচাদোর পতন এবং বাতিস্তার ক্ষমতা দখলের মধ্যবর্তী সময়ে ১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে একটা বড় ধর্মঘট ডাকা হলো। আমি যে বাড়িতে থাকতাম তার পেছনে ছিল একটা মাধ্যমিক স্কুল। সেনাবাহিনী ওই স্কুলটি দখলে নিয়েছিল। ওখানে আমি অনেক অন্যায় কাজ হতে দেখেছি। আমি স্কুলে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন আগেই ওই হাইতিয়ান কনসাল বিয়ে করেন পিয়ানো শিক্ষককে। হাইতিয়ান ওই কনসালের নাম ছিল লুইস হিবার্ট। আমার শিক্ষকের পরিবারের সামাজিক অবস্থায় পরিবর্তন এল। পাশের যে নতুন বাড়িতে তারা উঠলেন তা ছিল আগের বাড়ির চেয়ে অনেক ভালো। বাড়িটা বেশ বড়। নতুন বাড়িতে ছাদ চুঁইয়ে পানিও পড়ত না। ক্ষুধা তখন আর ওই বাড়ির নিত্যসঙ্গী নয়। তাদের আয়ও বেড়ে গিয়েছিল। আমার শিক্ষকও সম্ভবত বেতন পেতে শুরু করেছিলেন।

তারাই আমাকে সানতিয়াগোর একটি গির্জায় বাপ্তিজম করাতে নিয়ে গেলেন। কারণ, তখন সবাই আমাকে ডাকত ইহুদি বলে। বাপ্তিজম না হলে ওই সময় লোকে ওভাবেই ডাকত। আট বছর বয়সে আমাকে বাপ্তিজম করানো হলো। আমার ধর্মপিতা হওয়ার কথা ছিল বাবার এক ধনী বন্ধুর। তার নাম ছিল ফিদেল সান্তোস। তিনি অনুষ্ঠানে সময় না দিতে পারায় শেষ পর্যন্ত ওই হইতিয়ান কনসালকেই আমার ধর্মপিতা করা হলো। যাই হোক, যেহেতু বাবার ওই বড়লোক বন্ধুকে ধর্মপিতা করার কথা ছিল, সেই কারণে তার নামের প্রথম অংশটি যুক্ত হল আমার নামের সঙ্গে। কিন্তু আমার সত্যিকার ধর্মপিতা হলেন ওই হাইতিয়ান কনসাল আর ধর্মমাতা হলেন পিয়ানো শিক্ষক।

ওই বাড়িতে আমি ছিলাম প্রায় দুই বছর আট মাসের মতো। নতুন বাড়ির বারান্দার পাশে একটা আঙুর গাছ ছিল। গাছের বড় বড় পাতার ছায়ার নিচে চেয়ারে কিংবা লাল টালির ফ্লোরে বসে আমি বারবার গুণের নামতাগুলো পড়তাম। নিজে নিজেই পড়তাম। তখন থেকেই আমি নিজে নিজে নানাভাবে শিক্ষালাভ করতে থাকি। নতুন বাড়িতে ছোট্ট একটা করিডোরে গদি আঁটা একটা আসনের ওপর আমি ঘুমাতাম। যতটুকু মনে পড়ে আসনটা ছিল বেতের তৈরি। করিডোর থেকে বাড়ির পেছনের রাস্তায় যাওয়া যেত। ওই সময় সারাক্ষণই বোমা বিস্ফোরিত হতো সানতিয়াগোতে। প্রায় প্রতি রাতেই কয়েকটা করে বোমার বিস্ফোরণ ঘটত। এক রাতের কথা আমার মনে আছে। ওই রাতে ২০ থেকে ৩০টিরও বেশি বোমার বিস্ফোরণ ঘটেছিল। আমার তখন মনে হয়েছিল যেকোনো মুহূর্তেই ওই বাড়িতে কিংবা আমার খুব কাছে কোথাও বোমার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আমি জানতামই না কেনইবা এই বিস্ফোরণ ঘটছে, কারাইবা এটা করছে। এখন মনে হয়, ম্যাচাদো অথবা বাতিস্তা বিরোধী কোনো শক্তি এটা করত।

আমার মধ্যে ওই বাড়ি সম্পর্কে এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হলো। তাদের ওইসব ফরাসি নিয়ম-কানুন এবং জীবন-যাপন পদ্ধতিতে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। একদিন আমি ভেঙে ফেললাম তাদের সব নিয়ম-কানুন আর আচরণবিধি। তারা আমাকে জোর করে সবজি, বিট, ক্যারট ইত্যাদি খাওয়াত। ওইসব খাবারে একেবারেই অভ্যস্ত ছিলাম না। পরেও বহুদিন পর্যন্ত কিছু সবজি আমি একেবারেই খাই নি। ফরাসি প্রথা বা অভ্যাস আর নিয়ম-কানুনগুলো ছিল সামন্তীয়। একদিন আমি বললাম, ‘আমি এটা করব না, ওটা করব না।’ সত্যিকার অর্থে আমার বিদ্রোহটা ফরাসি আচরণ এবং জীবন-যাপন পদ্ধতির বিরুদ্ধে ছিল না। যে অন্যায় আচরণের স্বীকার হয়েছিলাম, বিদ্রোহটা ছিল মূলত তার বিরুদ্ধে।

আমার এই বিদ্রোহটা ছিল সহজাত। সত্যিকার অর্থে এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম সচেতন বিদ্রোহ। আমি তা যেভাবে চেয়েছিলাম ঠিক সেভাবেই ঘটেছিল। তারা আমাকে সোজা কলেজ দ্যা লা স্যালেতে আবাসিক ছাত্র হিসাবে পাঠিয়ে দিলেন। আমি ওখানে  গেলাম প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় পর্বান্তের সময়ে। ওখানে পাঠানোয় খুবই খুশি হয়েছিলাম। ওই স্কুলে অন্য ছেলেদের সঙ্গে খেলতে পারতাম। স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের বৃহস্পতিবার এবং রোববার নিয়ে যেতেন সমুদ্রের কাছে একটা জায়গায়। সেখানে খেলাধুলা এবং রোমাঞ্চকর সব কর্মকাণ্ড করতে পারতাম। আমি অবশেষে একটি সুখী বালক হয়ে উঠলাম।


বাঁচার প্রয়োজনেই তারা আবিষ্কার করেছিলেন যে বাঁচার একমাত্র উপায় অন্যকে শোষণ করা।


আমার ক্ষেত্রে যা ঘটেছিল তার জন্য আমি তাঁদের দায়ী করি না। তারা ওই সমাজেই বাস করতেন। আমি একথা বলতে চাই না যে তারা ছিলেন বিকৃত বুদ্ধির এক দল মানুষ এবং শিশু নির্যাতনকারী অথবা ওইরকম কিছু একটা। ওই সমাজটা ছিল অন্যায়-অত্যাচার ও অসমতায় জর্জরিত। সেখানে জীবনযাপন ছিল প্রচণ্ড কষ্টের। অভাবও ছিল চরম। যারা ওই সমাজে বসবাস করতেন তাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হতো। ওই সমাজ মানুষের মধ্যে জন্ম দিত চরম স্বার্থপরতা আর আত্মকেন্দ্রিকতার। মানুষকে শেখাত কিভাবে সব কিছুতে প্রথম হওয়া যায় আর কিভাবে সবকিছুর মধ্যে লাভের সন্ধান করা যায়। সমাজ তাদের দয়া আর উদারতার শিক্ষা দিত না। ওই সমাজেই তাদের বাঁচতে হতো। বাঁচার প্রয়োজনেই তারা আবিষ্কার করেছিলেন যে বাঁচার একমাত্র উপায় অন্যকে শোষণ করা। চূড়ান্ত বিবেচনায় দেখা যায়, তাদের আসলে কিছুই ছিল না এবং তারা আসলে শোষণ করছিল ধনীলোকের সন্তানদের। বাস্তবে আমিও ছিলাম শোষণের শিকার। আমার পরিবার যে টাকা পাঠাত তা ওই গরিব পরিবারটি ভোগ করত। আর যার ফলাফল আমার জীবনে বয়ে এনেছিল নিদারুণ কষ্ট।

 

শিক্ষকরাই আমার পাহাড়ে চড়ার প্রেরণা

.
আমার পঞ্চম শ্রেণির মাঝামাঝি সময় থেকে স্নাতক পর্যন্ত প্রায় সব শিক্ষকই ছিলেন স্প্যানিশ। তারা ছিলেন জাতীয়তাবাদী। তারা প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থি রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী। তারপরও তারা নিয়ামানুবর্তিতায়, চরিত্রে এবং কঠোরতায় ছিলেন সর্বোৎকৃষ্ট। তারা ধার্মিকও ছিলেন। বিশেষভাবে রোমান ক্যাথেলিক ধর্মসংঘের অনুসারী। তাদের বলা হত জেসুুইট (Jesuit)। তারা আমাকে পড়িয়েছেন সাত বছরের বেশি সময় ধরে। তারা ছিলেন শিক্ষিত এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারী। যদিও আমরা টাকা দিয়ে পড়তাম, কিন্তু ওই স্কুলে পড়াশোনা খুব ব্যয়বহুল ছিল না। ওখানে কোনো ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি ছিল না। পুরোহিতরা কোনো টাকা নিতেন না। তারা কঠোর আত্মসংযমী জীবনযাপন করতেন। তারা ছিলেন কঠোর নিয়মানুবর্তী, আত্মত্যাগী এবং কঠিন পরিশ্রমী। তাঁরা আমাকে সহযোগিতা করতেন।


স্প্যানিশ জেসুইটরা জানতেন কিভাবে একটা ছেলের মধ্যে ব্যক্তির সম্মান এবং মর্যাদাবোধ প্রোথিত করতে হয়।


তারা আমার মধ্যে তৈরি করেছিলেন ঘর থেকে বাইরে বেরোনোর মানসিকতা আর জাগিয়ে তুলেছিলেন প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। আমি পাহাড়ে উঠতে পছন্দ করতাম। পাহাড় সব সময়ই ছিল আমার কাছে চ্যালেঞ্জের। পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করার তীব্র বাসনা সব সময় আমার মন আচ্ছন্ন করে রাখত। মাঝে মাঝে আমার পাহাড়ে চড়ার কারণে চার ঘণ্টা পর্যন্ত বাস অপেক্ষা করত। আমি একাই উঠতাম পাহাড়ে। মাঝে মাঝে এক-দুইজন আমার সঙ্গেও থাকত। এ কারণে কেউ কখনো আমাকে কোনো শাস্তিও দেন নি। শিক্ষকেরা কারো মধ্যে কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য, আত্মত্যাগের মনোভাব, কোনো প্রচেষ্টা বা ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা দেখতে তাকে সে ব্যাপারে উৎসাহ এবং উদ্দীপনা দিতেন। তারা ছাত্রদের চরিত্র গড়ে তোলার ব্যাপারে সব সময় উৎকণ্ঠায় থাকতেন।

আমি ওখানে ছিলাম প্রায় চার বছর। আমি স্কুলে থাকতেই পছন্দ করতাম। শিক্ষকরা আমাদের বৃহস্পতিবার এবং রোববার গ্রাম আর সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যেতেন। সানতিয়াগোর উপসাগরে জলবেষ্টিত উপদ্বীপ দেখতে যেতাম আমরা। ওখানে তারা খেলাধুলার ব্যবস্থা রেখেছিলেন। সাঁতার কাটার জন্য ছিল সমুদ্রসৈকত। ওখানে বাস্কেটবলের মাঠ, সাঁতার কাটার জায়গা এবং মাছ ধরার ব্যবস্থা ছিল। আমরা ঘুরতে বের হতাম আর নানা ধরনের খেলা খেলতাম। সপ্তাহে দুইবার আমরা প্রচুর আনন্দ করতাম। পরে আমি সানতিয়াগো দ্য কিউবার কলেজ দ্য ডোলারসে ভর্তি হলাম। জেসুুইটদেও ওই স্কুলের মতো গ্রাম্য পরিবেশটা সেখানে ছিল না। তারপরও সেটি ছিল ভালো একটা স্কুল এবং আমিও এর মধ্যে পরিণত হয়ে উঠলাম ।

আমি যে স্কুলগুলোতে পড়েছি সেগুলোর শিক্ষকরা ছিলেন স্প্যানিশ। ফলে জেসুইটদের সামরিক মেজাজ এবং সাংগঠনিক দক্ষতার সঙ্গে ছিল স্প্যানিশ চরিত্র এবং ব্যক্তিত্ব। স্প্যানিশ জেসুইটরা জানতেন কিভাবে একটা ছেলের মধ্যে ব্যক্তির সম্মান এবং মর্যাদাবোধ প্রোথিত করতে হয়। তারা চরিত্র, সততা, অকপটতা, ন্যায়পরায়ণতা, সাহস এবং ত্যাগের মানসিকতাকে মূল্য দিতেন। তারা জানতেন এই মূল্যবোধগুলো কিভাবে একটি মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত করা যায়।

৬ষ্ঠ পর্বের লিংক

মাকসুদ ইবনে রহমান

জন্ম ১৯৬৪, নারায়ণগঞ্জ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা।

Latest posts by মাকসুদ ইবনে রহমান (see all)