হোম অনুবাদ আমার জীবন : পর্ব-৪

আমার জীবন : পর্ব-৪

আমার জীবন : পর্ব-৪
403
0
৩য় পর্বের লিংক

 

ক্ষুধা থেকে এক বিদ্রোহীর জন্ম


ফুলহেনসিও বাতিস্তার একনায়কতান্ত্রিক শাসন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমার শিক্ষা এবং বেড়ে ওঠায় নিঃসন্দেহে প্রভাব ফেলেছিল। এই দুটি ঘটনা রাজনৈতিক এবং বৈপ্লবিক শক্তির বিকাশ এবং বিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

যাই হোক, সানতিয়াগোর যে শিক্ষকের বাসায় ছিলাম সেখানে আমাকে কিছুই শেখানো হয় নি। তারা আমাকে কোনো স্কুলেও পাঠান নি। ওখানে শুধু ছিলামই, কাজের কাজ কিছুই হয় নি। ওই বাসায় এমনকি কোনো রেডিও-ও ছিল না। ছিল শুধু একটা পিয়ানো। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা পিয়ানো শুনতাম। তারপরও কিন্তু আমি সংগীতবিশারদ হই নি। এটা খুবই বিস্ময়কর।

কথা ছিল আমার শিক্ষকের পিয়ানোবাদক বোন আমাকে প্রথম শ্রেণির পাঠদান করবেন। তার একটা ক্লাসও কিন্তু আমি করি নি। নিজে নিজেই যোগ, বিয়োগ, পূরণ ও ভাগ করা শিখেছি। খাতার পেছনে যে যোগ, বিয়োগ, পূরণ ও ভাগ শেখার টেবিল থাকত বসে বসে সেগুলো মুখস্থ করতাম। বাবা-মা আমাকে এমন এক জায়গায় পাঠিয়েছিলেন, যেখানে সত্যি কথা বলতে কি, দুই বছরেরও বেশি সময় আমার অপচয় হয়েছে। অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল ওখানে। সবসময়ই ক্ষুধার্ত থাকতাম এবং বুঝতামও না যে আমি ক্ষুধার্ত। কারণ, ভাবতাম, আমার বোধহয় এমনিই বেশি বেশি ক্ষুধা লাগে।

আমি আসলে বিরানেই (ফিদেলের জন্মের গ্রাম) সুখী ছিলাম। আমাকে এমন এক জায়গায় পাঠানো হলো যেখান থেকে আমার পরিবার আর প্রিয় গ্রাম বহু দূরে। ওখানে এমন লোকদের অন্যায় আচরণের স্বীকার হয়েছিলাম যারা কেউই আমার আত্মীয় নন। যাই হোক, সৌভাগ্যক্রমে গেব্রিয়েলিটো নামে আমার এক বন্ধু ছিল যার সাথে আমি রাস্তার পাশে খেলতাম। বাকি সময়টা আমার জন্যে ছিল প্রচণ্ড কষ্টের। অতি অল্প সময়ে আমি ওই জীবন, ওই বাড়ি আর তাদের নিয়ম-কানুনে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। এটা ছিল প্রভুর বাজে আচরণের শিকার ছোট্ট এক প্রাণীর মতো সহজাত প্রতিক্রিয়া।


আমি যাতে আচরণবিধির বাইরে না যাই সেজন্য মাঝে মাঝে তারা আমাকে চড়-থাপ্পরও মারতেন।


ওই পরিবারের শিক্ষাদীক্ষা ছিল ফরাসি ভাষায়। তারা খুবই চমৎকার ফরাসি বলতেন। তাদের খুবই ভালো রকমের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল। তাদের ওই আচরণবিধি তারা শুরু থেকেই আমাকে শিখিয়েছিলেন। ভদ্রভাবে কথা বলা, গলা চড়িয়ে কথা না বলা, বেঠিক শব্দ ব্যবহার না করা—এসব ছিল সেই আচরণবিধির অন্যতম। আমি যাতে আচরণবিধির বাইরে না যাই সেজন্য মাঝে মাঝে তারা আমাকে চড়-থাপ্পরও মারতেন।

প্রথম কয়েকটা মাস তো ছিল খুবই ভয়াবহ। আমি তখন নিজেই নিজের জুতা মেরামত করেছি। কাপড় সেলানো সুই ভাঙার কারণে একদিন আমাকে খুব বকাবকিও করেছিলেন তারা। খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস আমার ছিল না। যে কারণে জুতা ছিঁড়ে গেলে নিজেই তা মেরামত করতাম। তবে বাড়িটিকে ঠিক কনসেনট্রেসন ক্যাম্প বলা যাবে না। ওই বাড়িতে এমন কিছুও ছিল যে কারণে কষ্ট একটু কমই বোধ করতাম। শিক্ষকের পরিবারটি ছিল খুবই গরিব। পুরো পরিবার নির্ভর করত শিক্ষকের বেতনের ওপর। ওই বেতনই ছিল তাদের একমাত্র সম্বল। তখন সরকারও শিক্ষকদের প্রায়ই বেতন দিত না। বেতনের জন্য কখনো কখনো মাস-তিনেকের বেশিও অপেক্ষা করতে হতো। এই সমস্যা তাদের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছিল। এ থেকেই জন্ম নিয়েছিল তাদের আত্মকেন্দ্রিকতা। প্রতিটি পয়সার খরচ ওই পরিবারের কাছে ছিল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।

ওই পরিবারে থাকার সময় আমি সারাক্ষণ ক্ষুধার্ত থাকতাম। বিরানে থাকার সময় মা আমাকে জোর করে খাওয়াতেন। আর সানতিয়াগোতে এসে আমি প্রচুর খেতে চাইতাম। ভাত যে কত স্বাদের জিনিস তা আমি সানতিয়াগোতে এসেই আবিষ্কার করেছিলাম। ওরা মাঝে মাঝে ভাতের সাথে এক টুকরা মিষ্টি আলু অথবা কিছু পিকাডিলো দিত। ওখানে রুটি ছিল কিনা তা এখন আর আমার মনে পড়ে না। ওই পরিবারে দুপুরে যে খাবার খেতাম রাতেও সেই খাবারের অবশিষ্টই খেতে হতো। খাবারটা পাঠানো হতো শিক্ষকের এক চাচাত বোনের বাসা থেকে। তার নাম ছিল কোসিতা। তিনি ছিলেন বেশ মোটা। কোসিতার বাড়িতেই রান্না হতো। আমার শিক্ষকের আরেকজন চাচাত বোন ছিলেন—যার নাম মার্সাল। তিনি তার বাসা থেকে ক্যানটিনিটা নিয়ে আসতেন। ক্যানটিনিটার মধ্যে থাকত কিছু ভাত, সামান্য মটরশুটি, মিষ্টি আলু, কাষ্ঠকদলী আর একটু পিকাডিলো। ক্যানটিনিটা আসত হঠাৎ হঠাৎ। তা আবার সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো। আমার মনে আছে, কাঁটা চামচের আগা দিয়ে ভাতের শেষ দানাটি পর্যন্ত আমি থালায় তুলে নিতাম।

একদিন আমার বড় ভাই রেমন সানতিয়াগোতে এসে হাজির। তিনি কেন এসেছিলেন তা আমার ঠিক মনে নেই। তার সাথে ছিল পয়সা রাখার ছোট একটি চামড়ার থলে। তাতে কিছু পয়সা-কড়িও ছিল। পাশের বাড়ির ছেলেদের দেখলে আমার ঈর্ষা হত। ওরা পয়সা দিয়ে কিছু না কিছু কিনে খেত। আমার শিক্ষক এবং তার বোন বেলন আমাকে ফরাসি আদব-কায়দা শিখিয়েছিলেন। তারা শিখিয়েছিলেন যে অন্যের কাছে কিছু চাওয়া ভালো না। তা জানত বাড়ির অন্য বাচ্চারাও। ফলে ওই বাচ্চাদের খাবার থেকে একটু খেতে চাইলে তারা ছুটে গিয়ে আমার শিক্ষক বা তার বোনের কাছে বলত।

আমার মনে আছে, একদিন আমার শিক্ষকের বোনের কাছে এক সেন্তাভো (তখনকার দিনে প্রচলিত মুদ্রার একক) চেয়েছিলাম। তিনি খুবই ভালো মানুষ। কিন্তু তার কাছে তো টাকা-পয়সা থাকত না। আমার কথা শুনে সেদিন তিনি খুবই বিরক্ত ও মর্মাহত হয়েছিলেন। খুব অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তো এরই মধ্যে তোমাকে বিরাশি সেন্তাভো দিয়েছি।’ সত্যিই তিনি আমাকে তা দিয়েছিলেন, কিন্তু এরপর আর একটি পয়সাও দেন নি। সেদিনের পর আমিও আর সাহস দেখাই নি তার কাছে টাকা-পয়সা চাওয়ার।


একদিন বাবা-মা এসেও আমাদের জীবন-যাপনের সেই দুর্দশাগুলো আবিষ্কার করলেন।


কয়েক মাস পর পয়সা ভর্তি টাকার থলে নিয়ে বড় ভাই রেমন যখন আবার এলেন তখন নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হলো। আমি তাকে ওখানে থেকে যেতে বললাম। তাকে বোঝালাম, ও থাকলে আমরা খুব মজা করব। কিন্তু তিনি থেকে যাওয়ার পর দারিদ্র্য আরো বাড়ল। একই পরিমাণ খাবারে ভাগ বসল আরো একটি নতুন মুখের। এসব ঘটনার বছরখানেক পরে আমি ওই বাড়ির দুর্দশাগুলো বুঝতে পেরেছিলাম। একদিন বাবা-মা এসেও আমাদের জীবন-যাপনের সেই দুর্দশাগুলো আবিষ্কার করলেন।

বাবা যেদিন এলেন তখন আমি সবেমাত্র হাম থেকে সেরে উঠেছি। আমার মাথার চুল অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল। ওরা আমার চুল পর্যন্ত কাটায় নি। অনেক পাতলা হয়ে গিয়েছিলাম আমি। আমার এমন শুকিয়ে যাওয়ার আসল কারণটি বাবা বুঝতে পারেন নি। তারা বাবাকে বলেছিলেন, হাম হওয়ার কারণে আমি শুকিয়ে গিয়েছি।

আরেকদিন আমার মা এলেন। এর মধ্যে আমার শিক্ষক, তার বোন এবং বাবা একটা নতুন বাসায় উঠেছেন। তখন তাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে খানিকটা। ওখানে তো আমরা তিনজন ছাত্র-ছাত্রী ছিলাম। প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪০ পেসো করে প্রতি মাসে মোট ১২০ পেসো পেতেন তারা। মা এসে আমাদের দেখে বুঝতে পারলেন যে, আমরা তিনজনই ক্ষুধায় চর্মসার এবং প্রায় অর্ধমৃত হয়ে গিয়েছি। ওইদিনই মা আমাদের নিয়ে গেলেন শহরের একটা ক্যাফেতে। আমরা ক্যাফেতে বসে গোগ্রাসে আইসক্রিম খেয়েছিলাম। সময়টা ছিল আমের মৌসুম। মা আমাদের এক বস্তা ছোট ছোট আম কিনে দিলেন। আমগুলো ছিল বেশ সুস্বাদু। দশ মিনিটেই সাবাড় করে দিলাম এক বস্তা আম। পরের দিনই মা আমাদের নিয়ে এলেন বিরানের বাড়িতে।

বিরান ফিরে আসার ঠিক আগেই ওদের অবস্থার বেশ খানিকটা উন্নতি হয়েছিল। আমাদের তিনজনের ১২০ পেসোর মূল্য আজকের দিনে তৃতীয় বিশ্বের যেকোনো দেশে ৩ হাজার ডলারেরও বেশি। তার ওপর হাইতিয়ান কনসাল বিয়ে করলেন ওই পিয়ানো শিক্ষককে। ফলে তাদের অবস্থার আরো উন্নতি ঘটল। পিয়ানো শিক্ষক স্বাভাবিকভাবেই তখন টাকা জমানো শুরু করলেন। এমনকি তিনি একবার নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে গেলেন। ভ্রমণের স্মৃতি হিশেবে তিনি ওখান থেকে নিয়ে এসেছিলেন ছোট ছোট পতাকা। কী ভীষণ দুর্গতির মধ্যে যে আমরা ছিলাম! তার কাছে কতবার যে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের গল্প শুনতে হয়েছে তার কোনো হিশেব নেই। ওই ভ্রমণ ছাড়াও তিনি কিছু আসবাবপত্রও কিনেছিলেন। পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে আমাদের ক্ষুধার মূল্যে কেনা হয়েছে ওই আসবাবপত্র। তারপর একদিন আমরা বিদ্রোহ করলাম।

 

৫ম পর্বের লিংক

মাকসুদ ইবনে রহমান

জন্ম ১৯৬৪, নারায়ণগঞ্জ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা।

Latest posts by মাকসুদ ইবনে রহমান (see all)