হোম অনুবাদ আমার জীবন : পর্ব-৩

আমার জীবন : পর্ব-৩

আমার জীবন : পর্ব-৩
254
0
২য় পর্বের লিংক

ম্যাচাদোর পতন এবং বাতিস্তার উত্থান

.
ম্যাচাদোর একনায়কতান্ত্রিক শাসনামলে সারা দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। এই ভয়ঙ্কর খাদ্যাভাবই তার পতনের মূল কারণ। ১৯২৯ সালের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র কিউবার জনগণের ওপর চাপিয়ে দিল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি। চুক্তির শর্তের কারণে কিউবা অনেক কিছুই উৎপাদন করতে পারত না, আমদানি করতে হতো। যদিও যুক্তরাষ্ট্র কিউবা থেকে চিনি নিত, কিন্তু ১৯২৯ সালের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কালে তারা চিনির ওপর করারোপ করল। সীমিত পরিসরে যে চিনি কিউবা রপ্তানি করত তার দামও তলানিতে নেমে গেল। অর্থনৈতিক অবস্থা হয়ে পড়ল আরো বিপর্যস্ত। কিউবা জুড়ে ক্ষুধা বিপন্ন করে তুলল মানুষের জীবন।

ম্যাচাদো তার শাসন শুরু করেছিল খানিকটা জনসমর্থন নিয়েই। এই সমর্থনের কারণ ছিল তার জাতীয়তাবাদী কর্মসূচি। তিনি মানুষকে কাজ দিয়েছিলেন। শিল্প-কারখানাও তৈরি করেছিলেন, কিন্তু কর্তৃত্বপরায়ই হওয়ার কারণে ম্যাচাদোর শাসন পরিণত হলো এক রক্তাক্ত অধ্যায়ে। ছাত্ররা জুলিও অ্যান্তোনিও মেল্লার নেতৃত্বে তার বিরোধিতা শুরু করল। মেল্লা ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ইউনির্ভাসিটি স্টুডেন্ট ফেডারেশন এবং বিশ কি বাইশ বছর বয়সে প্রতিষ্ঠা করেন কিউবান কমিউনিস্ট পার্টি। মেল্লা ছাত্র, শ্রমিক এবং জনসাধারণের কাছে ছিলেন এক অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। ১৯২৯ সালের ১০ জানুয়ারিতে নির্বাসনে থাকার সময়ে ম্যাচাদোর নির্দেশে তাকে হতা করা হয়।

মেল্লা ছিলেন অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী এক যুবক। যিনি হোসে মার্তির পরেই কিউবার জনগণের কাছে প্রধান এক চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হন। মেল্লা শ্রমিকদের জন্য আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার কথা ভাবতেন। ওই সময় ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কাছ থেকে ইতিহাস আর বীরত্বগাথা শুনত। অবশ্যই এর মধ্যে রাশিয়াতে ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লব সংগঠিত হয়ে গেছে। সন্দেহাতীতভাবে ওই বিপ্লবের আমূল সংস্কারবাদী মতবাদ এবং নীতিতে অনুপ্রাণিত হয়েই মেল্লা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কিউবান কমিউনিস্ট পার্টি। হোসে মার্তির দ্বারাও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন মেল্লা। তিনি ছিলেন অনেক বেশি মার্তিয়ান এবং বলশেভিক বিপ্লবের প্রতি প্রবল সহানুভূতিশীল। এসবের প্রভাব ছিল বলেই তিনি একদিন মার্তির মার্ক্সবাদী বন্ধু কার্লোস বেলিনোকে নিয়ে কিউবায় প্রতিষ্ঠা করেন কমিউনিস্ট পার্টি।

১৯৩৩ সনের অগাস্ট মাসে আন্দোলনের মুখে ম্যাচাদো ক্ষমতাচ্যুত হন। তারপরই সেপ্টেম্বর মাসে ঘটে সার্জেন্টদের অভ্যুত্থান (Sergents uprising)। আমি তখন মাত্র সাত বছরে পা দিয়েছি। সার্জেন্টদের উত্থান হয় ম্যাচাদোর দুষ্কর্মের সহযোগী অফিসারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। ওই সময় প্রত্যেকেই গুপ্ত অবস্থা থেকে বেরিয়ে এলেন। তাদের মধ্যে বাম সংগঠনগুলো ছিল, ডানপন্থি চিন্তার লোক ছিল এবং এমনকি মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী দলগুলোও ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা একটা পরিচালনা পরিষদ তৈরি করল। এই পরিষদে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামীরা, ওই সংগ্রামে আহতরা এবং খুবই পরিচিত কিছু অধ্যাপকও ছিলেন। সংগ্রামী লোকদের মধ্যে রেমন গ্রাউ মার্টিন নামে শরীরবিদ্যার একজন অধ্যাপক ছিলেন। পরে তিনি কিউবার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। ৪ সেপ্টেম্বর আন্দোলনের পরে তিনি ক্ষমতায় আসীন হন এবং অ্যান্তোানিও গুইতেরাসকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দেন। গুইতেরাস ছিলেন খুব সাহসী এবং ভয়ঙ্কর এক মানুষ। তিনি ম্যাচাদো বিরোধী আন্দোলনের সময় সেন লুইস ব্যারাক দখল করে নেন।


তারপরও আমার মতে রুজভেল্টের মতো এত ভালো রাষ্ট্রনায়ক উত্তরে আমাদের প্রতিবেশীরা আর কখনো পায় নি।


গুইতেরাস আইন প্রয়োগ করেন। তিনি টেলিফোন কোম্পানিসহ যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো দখলমুক্ত করেন। কিউবাতে তখন তা ছিল অকল্পনীয়। তিনি সমিতি ও ইউনিয়নগুলোর ক্ষমতায়ন করলেন। শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে নামিয়ে আনলেন আটঘণ্টায়। এই ধরনের আরো অনেক প্রগতিশীল পদক্ষেপ নিয়েছিলেন গুইতেরাস। তার কর্মসূচিগুলোর মধ্যে একটি ছিল শ্রম আইনের জাতীয়করণ। তিনি এই আইনটি ভালো উদ্দেশ্যেই প্রণয়ন করেছিলেন, কিন্তু এই আইনের কারণে দেশ থেকে হাইতিয়ানদের নিষ্ঠুরভাবে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল। এই দৃঢ়চেতা, কঠিন ও বলিষ্ঠ মন্ত্রী মূলত এই আইনটি প্রণয়ন করেছিলেন কিউবান শ্রমিকদের রক্ষা করার জন্য। কিউবান শ্রমিকরা ওই সময়, বলা চলে, চাকরির অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। স্পেনিশ ব্যবসায়ীরা তখন চাকরির ক্ষেত্রে স্পেন থেকে নিয়ে আসা তাদের আত্মীয়-স্বজনদেরই অগ্রাধিকার দিতেন।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সামার ওয়েলেসের মাধ্যমে বাতিস্তাকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছিলেন। যদিও তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট। তিনি ওই সময়ে ল্যাটিন আমেরিকাতে সু-প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার চরিত্র-প্রকৃতি জানা সত্ত্বেও—ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পরে এই রাষ্ট্রটি শক্তিশালী এবং ক্রমবর্ধমান একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হওয়ার পরও—তার সময় বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। তারপরও আমার মতে রুজভেল্টের মতো এত ভালো রাষ্ট্রনায়ক উত্তরে আমাদের প্রতিবেশীরা আর কখনো পায় নি। হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমি তাকে পছন্দ করতাম এবং শ্রদ্ধা করতাম। তিনি ছিলেন পঙ্গু। বক্তৃতায় তার উষ্ণ কণ্ঠ ছিল আকর্ষণীয়।

রুজভেল্ট কিউবার জনগণের চেতনা এবং সংগ্রামী মনোভাবকে হয়তো শ্রদ্ধাই করতেন এবং একথা নিশ্চিত যে তিনি লাতিন আমেরিকার সাথে আরো ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়েছিলেন। উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই যে রুজভেল্ট পূর্বেই হিটলারের ক্ষমতা দখলের মধ্যে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের হাতছানি দেখেছিলেন। তিনি প্লেট সংশোধনী (Platt Amendment) বাতিল করে নতুন চুক্তির মাধ্যমে পাইনস দ্বীপ ও ইসলা দ্রা পিনোস, যা নাকি ১৮৯৮ সন থেকে যুক্তরাষ্ট্র দখল করে ছিল, কিউবাকে ফেরত দিলেন। কিন্তু গুয়ানতানামো এখনও যুক্তরাষ্ট্রের দখলেই আছে। প্লেট সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সাংবিধানিক অধিকার পেয়েছিল। এই সংশোধনী জারি করা হয়েছিল ১৯০১ সালে এবং তা বাতিল করা হয় ১৯৩৪ সালে।

গুইতেরাস যে সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন তা টিকেছিল মাত্র তিন মাস। ফুলহেনসিও বাতিস্তা তাদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেন। অ্যান্তোনিও গুইতেরাস যখন একটা বিদ্রোহের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য মেক্সিকো যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তখন তাকে হত্যা করা হয়। গুইতেরাসকে হত্যা করা হয় ১৯৩৫ সালে। বাতিস্তা সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে নিলেন। নিজেকে উন্নীত করলেন কর্নেল পদে। অন্য অফিসারদেরও নানান পদে উন্নীত করেন তিনি। আমার ধারণা বাতিস্তাই একমাত্র কর্নেল যিনি সেনাবাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন। বাতিস্তা সাত বছর শাসন করেন। ১৯৪০ সালে তৈরি হলো সাংবিধানিক পরিষদ। ওই সময়ের প্রথম দিকটায় আমি সান্তিয়াগোর ওই শিক্ষকের বাড়িতেই ছিলাম। তারপর আমি চলে গেলাম কলেজ দ্যা লা স্যালেতে এবং পরে কলেজ দ্যা ডোলারসে। ওটা ছিল যাজকদের কলেজ। ১৯৪০ সালে আমি চলে গেলাম হাভানার কলেজ দ্যা বেলেনে। ওটাও ছিল যাজকদের স্কুল। দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো স্কুল হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছিল ওই স্কুল। আমি ওখান থেকেই ১৯৪৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে আসি।

৪র্থ পর্বের লিংক

মাকসুদ ইবনে রহমান

জন্ম ১৯৬৪, নারায়ণগঞ্জ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা।

Latest posts by মাকসুদ ইবনে রহমান (see all)