হোম অনুবাদ আমার জীবন : পর্ব-২

আমার জীবন : পর্ব-২

আমার জীবন : পর্ব-২
387
0
১ম পর্বের লিংক

স্পেনের গৃহযুদ্ধ


স্পেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৩৬ সালের ১৮ জুলাই। আমার বয়স তখনও দশ বছর হয় নি, কিন্তু ততদিনে আমি লিখতে ও পড়তে শিখে নিয়েছি। আমাদের গ্রাম বিরানে স্পেনের লোক ছিল ১২ থেকে ১৪ জন। তারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন আমার বাবার সাথে। তাদের মধ্যে আবার দুই ভাগ ছিল। একদল স্পেনের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের সমর্থক, আরেক দল বিরোধী ন্যাশনালিস্টদের সমর্থক। আমাদের ওখানে একজন হিসাবরক্ষক ছিলেন। তার ভালো পড়াশোনা ছিল। সাতটি ভাষা জানতেন তিনি। সত্যিকার অর্থেই বেঁটে এক লোক, কিন্তু তার সাধারণ জ্ঞান এবং পড়াশোনা প্রশ্নাতীতভাবেই অন্যদের চেয়ে বেশি ছিল। গ্রিস সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল তার। তিনি ডেমোসথেনিজের (Demosthenis) ব্যাপারে কথা বলতেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যার কাছ থেকে আমি প্রথম ডেমোসথেনিজ সম্পর্কে জানতে পারি। ডেমোসথেনিজ ছিলেন একজন অসাধারণ বক্তা। এই অ্যাসচুরিয়ান (Asturian) হিশাবরক্ষকই স্পেনের গৃহযুদ্ধ নিয়ে আমার সাথে কথা বলতেন।


জন্মস্থানই আমার ওপর নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল। খুব গরিব লোকজনের সাথে ছিল আমার বসবাস।


আমাদের গ্রামের স্পেনের লোকদের মধ্যে যারা বামপন্থি ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের সমর্থক ছিলেন, তাদের মধ্যে একজন বাবুর্চি—বাতজ্বরের কারণে তিনি ভালোভাবে হাঁটতে পারতেন না। খুব ভালো বাবুর্চিও ছিলেন না তিনি। আমি অবশ্য তাকে খুব পছন্দ করতাম। তার নাম ছিল গার্সিয়া। একেবারেই অশিক্ষিত এক লোক। ছেলেবেলায় আমার গ্রামের শতকরা ২০ ভাগেরও কম লোক শিক্ষিত ছিলেন। ১৯৩৬ সনে আমি যখন সানতিয়াগোর একটি আবাসিক স্কুলের ছাত্র তখনই স্পেনের গৃহযুদ্ধটা শুরু হয়। আমি তখন গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে গ্রামের বাড়ি বিরানে এসেছি। ম্যানুয়েল গার্সিয়া, সেই বাবুর্চি, এক পায়ে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতেন এবং ভীষণ পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। যেহেতু আমি লিখতে ও পড়তে পারতাম, তাই তিনি আমার কাছে ছুটে আসতেন। আমাকে পত্রিকা পড়ে শোনাতে বলতেন। তিনি ছিলেন বামপন্থি রিপাবলিকানদের একজন ভয়াবহ রকমের সমর্থক। আমি তাকে পত্রিকা থেকে স্পেনের গৃহযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ পড়ে শোনাতাম। এভাবেই আমি দশ বছর বয়সের আগেই যুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছি।

এই গার্সিয়ার কল্যাণেই আমি স্পেনের গৃহযুদ্ধকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমি জানতে পেরেছি স্পেনে কী হয়েছিল এবং কেন স্পেনিশ রিপাবলিকানরা পরাজিত হলো; কেনইবা হিটলার আর মুসোলিনির হস্তক্ষেপের মুখেও যুদ্ধের শুরু থেকেই পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আরো বুঝতে পেরেছিলাম এসবের আসল মানেটা কী, যা নাকি বিশ্বকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। দেখেছিলাম রক্তাক্ত সেই যুদ্ধে কিভাবে মানুষ একে অপরকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছে।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ


এরপরই শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আমার এখনও সুনির্দিষ্টভাবে দিন-তারিখসহ সবকিছু মনে আছে; তা ছিল ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর। আমার বয়স তখন ১৩ বছর এবং আমি ওই যুদ্ধ সম্পর্কে সবকিছুই পড়েছি—রুর (Ruhr) দখল, অষ্ট্রিয়া দখল, সুদেটইনল্যান্ড (Sudetenland) দখল, মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তি এবং পোল্যান্ড দখল। আমি ওইসব ঘটনার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলাম না, তবে আস্তে আস্তে সবকিছুই জেনেছিলাম।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মূল যে যুদ্ধগুলো হয়েছিল সেগুলোর কথা বেশ মনে আছে। জাপানে অ্যাটম বোমা নিক্ষেপের ঘটনা তো একেবারে পরিষ্কার মনে আছে। এ বিষয়ে আগ্রহ থাকার কারণেই আমি বিস্তারিতভাবে বলতে পারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং স্পেনের গৃহযুদ্ধের খানিকটা আগে শুরু হয় আবিসিনিয়ার যুদ্ধ। আমি তখন সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি। তখন দোকান থেকে বিস্কুট কিনলে বিস্কুটের সাথে ট্রেডিং কার্ড পাওয়া যেত। ওই কার্ডগুলোর নামই ছিল ‘আবিসিনিয়ায় ইতালিয়ানরা’। ওই কার্ডগুলো আমরা সংগ্রহে রাখতাম এবং তা দিয়ে খেলতাম। যুদ্ধ আমার পছন্দের বিষয় ছিল। যেমন, আরকোলির (Arcole) যুদ্ধে অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে নেপোলিয়ান যখন পতাকা হাতে তুলে নিয়ে ব্রিজ পার হতে সৈন্যদের নির্দেশ দেন—‘তোমাদের জেনারেলকে অনুসরণ করো’—তা যেকোনো বালককে মুগ্ধ করে। তারপর আছে অসটারলিটজের (Austerlitz) যুদ্ধ। এইসব নেতাদের ব্যাপারে আমি বলতে গেলে পাগলই ছিলাম। তারপর আমার খেপামি ছিল হানিবল বার্কা এবং আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট সম্পর্কেও। অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইতিহাস বইতে এসব বিখ্যাত ব্যক্তিদের বিষয়ে পড়তে গিয়ে তাদের সম্বন্ধে এক ধরনের আগ্রহ আমার মধ্যে জন্ম হয়। আমি স্পার্টাকানদেরও পছন্দ করতাম। তারা যেভাবে তিনশ লোক থারমোপাইলাকে (Thermopylae) রক্ষা করেছিল তা-ও পছন্দের বিষয় ছিল। আমি সামরিক নেতা আর যোদ্ধাদের পছন্দ করতাম।


ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ প্রকৃতি


যুদ্ধ যেমন দেখেছি তেমনি দেখেছি প্রকৃতির বিরুদ্ধ আর বিরূপ রূপও। খুব ছোটবেলায়ই আমার হারিকেন, ঘূর্ণিঝড়, প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবাত, জলস্তম্ভ এবং তীব্র ঝড়ো বাতাসের অভিজ্ঞতা হয়। চার কি পাঁচ বছর বয়সে প্রথম ভূমিকম্প অনুভব করি। আমাদের ঘরসহ সবকিছুই কেঁপে কেঁপে উঠেছিল। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও আমার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।


উত্তরাধিকার


জন্মসূত্রে পাওয়া সুযোগ-সুবিধা আর এক টুকরো ভাগ্য সাথে নিয়েই আমি বড় হয়েছিলাম। আমি ছিলাম ভূস্বামীর সন্তান। তবে যেখানে বেড়ে উঠেছিলাম সেখানে আমার বন্ধু-বান্ধব ও অন্য ছেলেমেয়েরা ছিল খামারের শ্রমিক এবং অত্যন্ত দরিদ্র কৃষকের সন্তান। আমার মায়ের পরিবার ছিল দরিদ্র। গেলিসিয়া থেকে আসা আমার বাবার কিছু চাচাত ভাইও ছিলেন গরিব। বাস্তবে গেলিসিয়াতে আমার বাবার পরিবারও গরিবই ছিল।

জন্মস্থানই আমার ওপর নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল। খুব গরিব লোকজনের সাথে ছিল আমার বসবাস। আমার মনে আছে সেসব অশিক্ষিত বেকার মানুষের কথা, যারা আখখেতের কাছে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাদের কেউই এক ফোঁটা পানি, নাস্তা, আশ্রয় কিংবা পরিবহন সুবিধা দিয়ে সহযোগিতা করতেন না। যেসব বাচ্চার সাথে আমি বিরানে খেলতাম, যাদের সাথে আমি বেড়ে উঠেছিলাম, যাদের সাথে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতাম—তারা ছিল খুবই গরিব। মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে টিনের কৌটায় করে উচ্ছিষ্ট খাবার নিয়ে এসে দুপুরের খাবারের সময় তাদের দিতাম। আমার কুকুরটা নিয়ে তাদের সাথে পায়ে হেঁটে অথবা ঘোড়ায় চড়ে সোজা চলে যেতাম নদীর দিকে। পাথর ছুড়ে পাখি শিকারের জন্য আরও নানা জায়গায় যেতাম। ব্যাপারটা খুবই ভয়ঙ্কর, কিন্তু তখন গুলতি ব্যবহার করে পাখি মারাটা ছিল খুবই মামুলি বিষয়।


আমার কাছে গ্রাম মানেই স্বাধীনতা। আমার শৈশবের পরিধি ছিল বিরানের সরকারি স্কুল পর্যন্ত।


সানতিয়াগো আর হাভানাতে আমি কিন্তু ধনীদের ছেলেমেয়ের বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি। তারা পয়সাওয়ালা লোকদের ছেলেমেয়ে ছিল। তারাও আমার বন্ধু ছিল। তাদের সাথেও খেলাধুলা করতাম। কিন্তু আমি ঠিক তাদের মতো ধনীদের এলাকায় থাকতাম না। স্কুলে আমাদের মাথায় থাকত মূলত খেলাধুলা, ক্লাস আর বাইরে বেড়ানোর ভাবনা। আমার শখ ছিল মূলত দুটো—খেলাধুলা আর পাহাড়ে ওঠা। সানতিয়াগোর একটি উপদ্বীপে ছিল একটি খামার। ওখানে সাঁতার কাটার জন্য সৈকতও ছিল। যেহেতু ওটা ছিল একটা সাগর, তাই সেখানে তালগাছের কাণ্ডের খুঁটি দিয়ে বেড়া দেওয়া একটি গোসলের জায়গা ছিল। ওখানে সত্যিকার অর্থেই হাঙরের বিপদ ছিল। ওখানে তিনটি ডাইভিং বোর্ড ছিল। আমি খুব উঁচু বোর্ড থেকে ঝাঁপ দিতে পারতাম না, কিন্তু প্রথমবার ঠিকই সর্ব্বোচ্চ বোর্ড থেকে ডাইভ দিয়েছিলাম নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য। ভাগ্যিস মাথাটা আমার নিচের দিকেই ছিল। ডাইভিং বোর্ডটা সত্যি সত্যিই খুব উঁচু ছিল, কোনো কিছু না ভেবেই ওখান থেকে ডাইভ করেছিলাম।

আমার সব খেলার সাথি ও বন্ধুরা ছিল গরিব। আমি বুর্জোয়া সংস্কৃতি রপ্ত করি নি। বাবা সত্যিকার অর্থেই ছিলেন একজন বিচ্ছিন্ন ভূস্বামী। বাবা-মা যেমন বাইরে কারো সাথে দেখা করতে যেতেন না তেমনি আমাদের বাড়িতেও অতিথি আসত না বললেই চলে। ধনিক শ্রেণির যে সংস্কৃতি বা রীতিনীতি তা তাদের মধ্যে ছিল না। তারা সারাক্ষণ শুধু কাজই করতেন। আমাদের যোগাযোগ ছিল শুধু বিরানের লোকজনের সাথে।


স্কুলজীবনের শুরু


‘ওই ছেলের সাথে বা ওর সাথে খেলা করো না।’ বাড়িতে কেউই আমাকে এই ধরনের কথা বলত না। আমি সেইসব কুড়েঘর আর জীর্ণ বাড়ি—যেগুলোকে ব্যারাক বলা হতো এবং যেখানে হাইতিয়ানরা বাস করত—সেখানে যাওয়া-আসা করতাম। অবশেষে একদিন বাড়িতে সেজন্য বকাও খেয়েছিলাম। বকা খাওয়ার পেছনে সামাজিক কোনো বিবেচনা ছিল না। আমার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কারণে বকা দেওয়া হয়েছিল। আমি সেখানে যেতাম ভুট্টা-পোড়া খেতে। যে কারণে বাবা-মা আমাকে হাভানার পশ্চিমে গুয়ানাহায় (Guanajay) একটি সংশোধনাগারে পাঠিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।

বাবা-মা বলতেন, ‘হাইতিয়ানদের সাথে পোড়া ভুট্টা খেতে থাকলে তোমাকে গুয়ানাজয়ে পাঠিয়ে দেব।’ অন্য আরো অনেক কারণেই একাধিকবার ওইখানে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলে তারা আমাকে শাসিয়েছেন। দুনিয়াটা বুঝতে শুরু করার পর মনে হয়েছিল আমি যত স্কুলে গিয়েছি তার মধ্যে গ্রামের ওই শৈশবই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো স্কুল। আমার কাছে গ্রাম মানেই স্বাধীনতা। আমার শৈশবের পরিধি ছিল বিরানের সরকারি স্কুল পর্যন্ত।

আমার বড় এক বোন আর এক ভাই ছিল। বোনের নাম অ্যাঞ্জেলিটা (Angelita)। ভাইয়ের নাম রেমন। তারাও ওই স্কুলেই পড়তেন। স্কুলে যাওয়ার বয়স না হতেই আমাকে ওই স্কুলে পাঠানো হয়েছিল। তারা আমাকে ক্লাসরুমের ঠিক সামনে একটি ডেস্কে বসাতেন। খুবই দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ২৫ জন ছাত্রছাত্রী ওই স্কুলে যেত। সম্ভবত, তা ছিল ১৯৩০ সাল। আমি ঠিক জানি না আমি কিভাবে লিখতে শিখেছিলাম। সম্ভবত অন্য বাচ্চাদের দেখে দেখে লিখতে শিখেছিলাম। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র চার বছর। তারা আমাকে ওখানে বসে থাকতে বাধ্য করেছিলেন। আমি স্কুলে দুষ্টুমি করতাম। ভূস্বামীর সন্তানেরা যেমন করে থাকে। একজন শিক্ষক আমাদের বাসায় আসতেন। আমাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে খাওয়া-দাওয়া করতেন। কিন্তু স্কুলে ঠিকই শাস্তি পেতে হতো। মাঝে মাঝে রুলার দিয়েও আমাদের পেটানো হতো। শাস্তি হিসেবে মাঝে মাঝে আমাকে দুই হাত সামনে প্রসারিত করে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে হতো। শিক্ষকরা হাতের তালুতে কিছু পয়সা রেখে দিতেন। এ রকম ঘটনা অবশ্য প্রতিদিন ঘটত না। স্কুলের সেই অত্যাচারের কথা এখনও খুব স্পষ্টভাবেই মনে করতে পারি।

আমি আর আমার ভাইবোন ছাড়া ওই স্কুলে এমন একজনও ছিল না যাদের সামান্য হলেও টাকাপয়সা কিংবা একটি দোকান অন্তত ছিল। তাদের বাবা-মায়েরা ছিলেন দিনমজুর, বর্গাচাষী কিংবা শুধু এক খণ্ড জমির মালিক। ছয় বছর বয়সে বাবা আমাকে পাঠিয়ে দিলেন সানতিয়াগো দ্য কিউবাতে। কারণ, আমার একজন শিক্ষক ধরে নিয়েছিলেন ‘আমি খুবই বুদ্ধিমান ছেলে’। তারা ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, আমাদের সবার বড় বোন অ্যাঞ্জেলিটাকে (সে আমার থেকে তিন বছর চার মাসের বড়) বিরানের স্কুলশিক্ষক ইউফ্রেসিয়ার সাথে সানতিয়াগোতে (ওখানেই ইউফ্রেসিয়ার বাড়ি) পাঠিয়ে দেবেন। অ্যাঞ্জেলিটার বয়স তখন নয় কি দশ। আমার বোনকে ওখানে পাঠিয়ে দেয়া হলো। সাথে আমাকেও। ওই সিদ্ধান্ত রীতিমতো আমার মাথা ঘুরিয়ে দিল। যাই হোক, আমারও আগ্রহ ছিল সানতিয়াগো দেখার। যে কারণে আমি এ নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবি নি।


গ্রাম থেকে দূরে


সানতিয়াগো তখন ছিল ছোট একটি শহর। আমার ওপর তা দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। ছোট ছোট বাড়িঘর। একতলা বাড়ি। সানতিয়াগোতেই ছয় বছর বয়সে প্রথম অবারিত সমুদ্র দেখেছিলাম। সমুদ্র থেকে দূরের কোনো গ্রাম থেকে যাওয়ার কারণে সুবিশাল ওই সমুদ্র দেখে প্রথমে অভিভূত হয়েছিলাম।

আমার শিক্ষকের বাড়িটি ছিল পাহাড়ের ওপর। সেখানে হিস্পানিরাই ছিল সংখ্যায় বেশি। কাঠের তৈরি ওই বাড়িটি সংকীর্ণ, অন্ধকার আর খুবই ছোট। বৈঠকখানায় একটি পিয়ানো ছিল। বাড়িটিতে দুইটি শয়নকক্ষ, একটি স্নানাগার আর একটি বারান্দা। বারান্দা থেকে সিয়েরা মায়েস্ত্রা পাহাড়ের চমৎকার দৃশ্য দেখা যেত। কাছেই ছিল সানতিয়াগোর সাগর। কাঠের দেয়াল, জীর্ণ আর বিবর্ণ টালির ছোট্ট বাড়িটি থেকে চত্বর বলতে শুধু ময়লা-আবর্জনা ফেলার গাছবিহীন খোলা জায়গাটুকু দেখা যেত। পাশেই ছিল একসারি একতলা বাড়ি। তারপর পাশের ব্লক ধরে সোজা গেলেই পাওয়া যেত একটা দোকান। সেখানে বাদামি রংয়ের চিনি দিয়ে তৈরি নুগট বিক্রি হত।


আমার মনে আছে, কিউবার প্রেসিডেন্ট এবং স্বৈরশাসক মাচাদোর (Machado) সৈন্যরা তখন স্কুলটি দখলে নিয়েছিল। স্কুলের সব ছাত্র-ছাত্রী মাচাদোর শাসনের বিরুদ্ধে থাকায় তারা তা করেছিল।


আমার মনে আছে, বাড়ির সামনে খোলা চত্বরটার অপর পাশে ঈডি ঈডি দি মুর (Yidi Yidi the Moor) নামে ধনী এক লোকের একটা বড় বাড়ি ছিল। ওই বাড়ির ঠিক পেছনেই ছিল মাধ্যমিক স্কুল। ওখানে আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। আমার মনে আছে, কিউবার প্রেসিডেন্ট এবং স্বৈরশাসক ম্যাচাদোর (Machado) সৈন্যরা তখন স্কুলটি দখলে নিয়েছিল। স্কুলের সব ছাত্র-ছাত্রী ম্যাচাদোর শাসনের বিরুদ্ধে থাকায় তারা তা করেছিল। আমার আরও মনে পড়ে, স্কুলটি দখলে নেওয়ার সময় নিরীহ এক লোককে বন্দুকের বাঁট দিয়ে পেটাচ্ছিল। আমার ধারণা, লোকটি ওদের উদ্দেশে কিছু একটা বলেছিলেন। আমরা যেহেতু ঠিক ওখানেই থাকতাম, এই রকম আরো অনেক ঘটনাই আমি দেখেছিলাম।

ওই সময় সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। পাশ দিয়ে কেউ যাওয়ার সময় সৈন্যরা তাকে থামাত। তারা বিরানের এক মিস্ত্রি অ্যান্তোনিওকে হাজতেও পাঠিয়েছিল। পরে জানতে পারি যে, সৈন্যদের মতে তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট। আমার মনে আছে, অ্যান্তোনিওর স্ত্রীর সাথে আমিও জেলখানায় তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। জেলখানাটা ছিল সানতিয়াগোর অ্যালামেডার এক প্রান্তে। অন্ধকার সেই জেলখানা ছিল বিষণ্ন। এর দেয়ালগুলো ছিল নোংরা, ময়লা আর ছত্রাকে ঢাকা। ওখানকার কারারক্ষক, জেলখানার শিক আর কয়েদিদের দৃষ্টির কথা মনে পড়লেই আমার গায়ে রীতিমতো কাঁপন ধরে যায়।

সানতিয়াগোর ওই ছোট্ট বাড়িটির ছাদের ফুঁটো দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ত। ভিজে যেত ঘরের সবকিছুই। বাইরের চেয়ে ঘরের ভেতরেই বৃষ্টি হতো বেশি। বৃষ্টির পানি যেখানে পড়ত সেখানে তারা বালতি বসিয়ে রাখত। বাড়িটি ছিল ভয়ঙ্কর রকম স্যাঁতস্যাঁতে। ওখানেই আমি আর আমার বোন থাকতাম। একটা ছোট্ট ঘরে ভাঙা খাটে থাকতেন আমার ওই শিক্ষিকার বাবা। তার বাবার নাম ছিল নেস্টর। আর অন্য একটি রুমে থাকতেন আমাদের শিক্ষিকার বোন বেলেন। বেলেন আবার একজন পিয়ানোবাদকও। তিনি ছিলেন একজন মহৎ মানুষ, কিন্তু তার একজনও শিক্ষার্থী ছিল না।

সানতিয়াগোতে ততদিনে বিদ্যুৎ চলে এসেছিল। ওই বাড়ির লোকজন অবশ্য খুব একটা বিদ্যুৎ ব্যবহার করত না। তাদের তেলের বাতি ছিল। তখন সম্ভবত বিদ্যুতের চেয়ে তেলের দাম ছিল কম। ওই বাড়িতে প্রথমে থাকতেন তিন বোন। আমার ধারণা, ওদের বাবা-মা ছিলেন হাইতিয়ান। তিন বোন হাইতিতে নাকি ফ্রান্সের স্কুলে পড়াশুনা করেছিলেন তা ঠিক জানতাম না। একজন হয়েছিলেন স্কুলশিক্ষক এবং আরেকজন পিয়ানো-শিক্ষক আর তৃতীয়জন ডাক্তার। আমরা সেখানে যাওয়ার কিছুদিন আগেই ডাক্তার বোনটি মারা যান। তারপর থেকে বাবা নেস্টরের সাথে ছিলেন আমার শিক্ষক এবং তার আরেক বোন। তাদের মা আগেই মারা গিয়েছিলেন। এসমেবিডা নামে সহজ সরল একটি গ্রাম্য মেয়ে ওই বাসায় কাজ করত। কাজের মেয়ে হলেও তাকে একটি পয়সাও দেয়া হতো না। পরে আমার ভাই রেমনও যোগ দিয়েছিলেন আমাদের সাথে। সব মিলিয়ে আমরা সাতজন ওই বাসায় থাকতাম।


৩য় পর্বের লিংক

মাকসুদ ইবনে রহমান

জন্ম ১৯৬৪, নারায়ণগঞ্জ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা।

Latest posts by মাকসুদ ইবনে রহমান (see all)