হোম অনুবাদ আমাকে ‘আমি’ হতে শিক্ষা দাও

আমাকে ‘আমি’ হতে শিক্ষা দাও

আমাকে ‘আমি’ হতে শিক্ষা দাও
1.41K
0

নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গোও (৫ জানুয়ারি, ১৯৩৮) কেনিয়ায় ক্যামিরিথু প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী একজন কেনিয়ান ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং উপনিবেশিক বিশ্লেষণের তাত্ত্বিক। তিনি আরভাইনে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি এবং তুলনামূলক অন্যান্য ভাষাভাষী সাহিত্যের বিশিষ্ট অধ্যাপক। তার লেখা বইগুলো প্রায় ত্রিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।


কেনিয়ার নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গোও-এর বক্তৃতাটি (জুন,২০১৫) পরস্পরের পাঠকদের জন্য ভাষান্তর করেছেন দেবাশীষ ধর।


১৯৬৯ সালে নাইরোবি থেকে প্রায় একশ মাইল দূরে নেইরি শহরে গাকাম্বা নামের একজন সাইকেল মেরামতকারী একটি ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছিলেন, পরিত্যক্ত একটি স্কুটার ইঞ্জিন মেরামত করে একটি উড়োজাহাজ বানালেন যার নাম দিয়েছিলেন ‘কেনিয়া’। উড়োজাহাজটি কয়েক মাইল বেশ উড়ল এবং এটি অবতরণের সময় গাছপালার সাথে লেগে ক্রাশ করল। এরপর কেনিয়ার স্বাধীন গণতন্ত্রের সদ্য অ্যাটর্নি জেনারেল চার্লস নজোনজো উড়োজাহাজ চালানোর বৈধ কাগজপত্র ছাড়া গাকাম্বার উড়োজাহাজ উড়ানো নিষিদ্ধ করলেন; যেহেতু তার পুরোনো ধাঁচের উড়োজাহাজটি ইউরোপের মতো অত উন্নতমানের ছিল না। যদিও নজোনজোর গাকাম্বাকে উড়োজাহাজ উড়ানো বন্ধের বিষয়টি আমার কাছে তেমন আগ্রহের নয়, এটার চেয়ে বরং তাদের জন্মগত ভূমির প্রতি তাদের দুজনের চিন্তার স্বরূপের প্রতিই আমার যত কথা। গাকাম্বা হয়তো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও অতিক্রম করতে পারে নি, কিন্তু নজোনজো দক্ষিণ আফ্রিকার ফোরট হেয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং লন্ডনের লিঙ্কন ইনস্টিটিউট থেকে ব্যারিস্টার পাশ করে সবচেয়ে উচ্চ শিক্ষিত কেনিয়ান হয়ে বের হয়েছিলেন। নজোনজো বেশ ভালো ইংরেজি জানতেন এবং ইউরোপিয়ান উপনিবেশিকদের মতো করে ভালো বলতেনও। অন্যদিকে গাকাম্বা ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন না, কিন্তু সে তার মাতৃভাষা জিকুয়ুতে বেশ ভালো বলতেন। মূল বিষয় হচ্ছে গাকাম্বা জিকুয়ুতে কথা বলা একজন ধাতুকর্মী ও কারিগর যিনি বলছেন, আমার দেশে আমরা নিজেরাই উড়োজাহাজ বানাতে পারি এবং এটা যে আমরা বানাতে পারি তা প্রমাণিত হোক। আর সেই শিক্ষিত ভালো ইংরেজি বলা অ্যাটর্নি জেনারেল বললেন, ‘না আমরা পারব না।’ গাকাম্বা এই উড়োজাহাজ বানানোর স্বপ্নটাকে তার নিজের করতে চাইতেন, আর নজোনজো চাইতেন স্বপ্নটা আরেকজনকে দিয়ে বাস্তবায়িত হোক। গাকাম্বা চেয়েছিলেন অসম্ভবকে সম্ভব করতে আর সেই শিক্ষিত কেনিয়ান ইংরেজি বলা ব্যারিস্টার বললেন, ‘না তা কখনো চেষ্টাও করো না।’


উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে প্রতিটি গল্পেই এই জাতীয় উদ্যোগগুলোকে বাতিল করে দেয় পুরোপুরি ইউরোপের প্ররোচনায়।


এখানে কেনিয়ার দুইজনের পরস্পর বিরোধী দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়। গাকাম্বার মতে, ‘আফ্রিকা নিজে কিছু বানাতে পারে।’ নজোনজো মনে করে, ‘ওসব ইউরোপের উপর ছেড়ে দাও।’ সাধারণ একজন কারিগর হয়ে যে দেশকে ছেড়ে না গিয়ে সহায়ক হয়ে নিজেকে উদারভাবে বিচরণ করে দিতে চায় তাকে সমর্থনের পরিবর্তে বরং নজোনজো তার স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করল। যার ফলে গাকাম্বার বানানো যন্ত্রটি সাধারণ কেনিয়ানদের দ্বারা কেনিয়ার একটি অন্যতম নির্দিষ্ট মডেল বা দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারল না—তবে সেটা হয়তো হতে পারতো।

গাকাম্বার উদ্যোগ এবং পরিণতি আমাকে ষাটের দশকের আরেকটি গল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। এটা ছিল ১৯৬৯-এর দিকে, খুব বেশি সময় হয় নি তখন নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে যোগদান করেছিলাম। মূল সিলেবাসে জাতীয় সাহিত্যে ইংরেজিতে শেক্সপিয়ার থেকে টি এস এলিয়ট পর্যন্ত ব্যাপক বিস্তৃত ছিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, ‘কেনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে অউয়র এনুয়াম্বা, তাবান লো লিয়ং-এর মতো প্রখ্যাত দেশীয় লেখকদের কোনো লিখাই উল্লেখ না করে ইংরেজিকেই জাতীয় সাহিত্যরূপে কেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিশেবে সরবরাহ করা হচ্ছিল? তাই আমরা ইংরেজি বিভাগের বন্ধের ঘোষণা দিলাম। বাস্তবে আমরা ইংরেজি সাহিত্যের বন্ধের কথা বলি নি বরং ইংরেজি সাহিত্যের সাথে সংশ্লিষ্টতা বজায় রেখে আমাদের বাস্তবতাকে আমদেরই সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে স্থাপন করার কথা বলেছিলাম। আমরা কি এখান থেকে ওখানে গিয়ে সেখান থেকে ওখানে গিয়ে শুরু করতে পেরেছি? আমরা কি এখনো একটি উপনিবেশিক প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি? আমরা কি একটি স্ব-নেতিবাচক প্রক্রিয়ায় বা উপনিবেশিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে যেতে পেরেছি? আমরা চেয়েছিলাম কেনিয়ায় আমাদের সাহিত্যকে মূল করে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের সাথে সংযুক্ত করতে। আমরা কেনিয়াকে কেন্দ্রিকরণ করে সাহিত্য বিভাগকে ইংরেজি সাহিত্যের সাথে মোটামুটিভাবে ইস্ট-আফ্রিকান, আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রো-আমেরিকান সাহিত্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য, ল্যাটিন আমেরিকা এবং তারপর ইউরোপ এই ভাবে গড়ে তুললাম। তখন ইংরেজি বিভাগ সাহিত্যকে ইংরেজি সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল, আমরা একে তা থেকে মুক্ত করলাম এবং বিশ্ব সাহিত্যের সাথে সংযুক্ত করলাম। আফ্রিকা এবং অন্যত্র যে বিতর্কটি অনুসৃত ছিল, বিশাল নাইরোবি বিতর্ক সৃষ্টি করা হয় সেটা এখন উপনিবেশিক তত্ত্ব হিশেবে পরিচিত। আমাদের বিভাগ হতে শিক্ষার্থীরা যারা বের হইয়েছিলেন তারা বিশ্বে অনেকেই এখন বুদ্ধিজীবী নেতৃত্বসম্পন্ন। প্রিস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক সাইমন জিকান্দী, সাউথ আফ্রিকার প্রিটরিয়ার অধ্যাপক জেমস ওগুদে, হোদি দ্বীপের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গিতাহি গিতিতি উল্লেখ্য এদের কয়েকজন দেশে-বিদেশে খ্যাত। কিন্তু আরো অনেকেই দেশে আছেন, যেমন হেনরি চাকাভা, ক্রিস ওয়ানজালা, ওয়ানজিকু মুকাভি, কিমানি জোজু প্রমুখ। দেশে বিদেশে তাদের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিপাত গভীরভাবে সমাদৃত।

১৯৭৪ সালে প্রথমে কেনিয়া ভাষা সাহিত্যের উপর ভিত্তি করে আমাদের স্কুলগুলোয় সাহিত্য পঠনের একটি পথ হিশেবে সাহিত্য বিভাগ ঘোষণা করা হয়। এরপর আফ্রিকায় এবং পৃথিবীর অন্য স্থানে সুখ্যাতি লাভ করে। এর মানে হচ্ছে যে একজন কেনিয়ান প্রাথমিক পড়াশোনা হতে এমনকি স্নাতক করা অবস্থায় এখান থেকে সাহিত্য পাঠের জ্ঞান চর্চা করে থাকবে এবং এর সাথে সম্পর্কিত এশিয়া এবং ইউরোপের সাহিত্য পাঠও করবে। এভাবে তাদের পদতল দূঢ়ভাবে কেনিয়াসহ পৃথিবীব্যাপী নাগরিকদের মাঝে সাহিত্য চর্চায় দৃঢ় হয়ে উঠবে। কিন্তু এই মুই শাসন সাহিত্যের পাঠ্যক্রমে অনুচ্ছেদে সিলেবাসটিকে একেবারে খণ্ড খণ্ড করল এবং সরকার এটার পরিবর্তন করে গিয়ে এমনভাবে করল যে কেনিয়ার নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতি ইংরেজি ভাষা সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখল। যার ফলে কেনিয়ার সাহিত্য সংস্কৃতি ইংরেজি ভাষা থেকে মুক্ত হতে পারল না। ইংরেজি ভাষা কেনিয়ার সাহিত্যকে ধীরে ধীরে এভাবে ধ্বংস করে চলছে।

ক্যামিরিথু প্রদেশে একটি গল্প আছে। এটি নিয়ে আমি অনেকবার লিখেছিলাম। ক্যামিরিথু প্রদেশে জনগণের উদ্যোগে নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বুদ্ধিজীবী, ভূমিহীন চাষি, বেকার জনগণের সচেতনতার লক্ষে ‘যখন আমি চাই তখন বিয়ে করব’ নাটকটি তৈরি করল—নাটকটি হয়তো তখন প্রথম জিকুইয়ো ভাষায় উপনিবেশিক কেনিয়ায় নাইরোবি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ক্যামিরিথু গ্রামের গ্রামীণ অধিবাসীদের নিয়ে লিখা হয়েছিল। যদি তুমি বিশ্বাস কর জনগণ হচ্ছে উন্নয়নের প্রধান লক্ষ এবং হাতিয়ার তাহলে তুমি তাদের সাথে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়েই কাজ করবে এটাই অনেক সহজ হবে এবং স্বাভাবিক। নাটকটি তাই একশ’রও বেশি গ্রামে প্রদর্শিত হয়েছিল এবং যখন ১৯৭৭ সালের ১১ নভেম্বর নাটকটির প্রদর্শন বন্ধ করে দেয়া হলো সহকারী লেখকের জন্য—তখন আমাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। তখন ক্যামিরিথুরা বলল, আফ্রিকা ভাষায় আমাদের জন্য সহজ আর আমাকে যারা ধরে নিয়ে গেল তারা বলল, ‘ইংরেজিতেই সহজ।’

এভাবে সেই গাকাম্বার উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে প্রতিটি গল্পেই এই জাতীয় উদ্যোগগুলোকে বাতিল করে দেয় পুরোপুরি ইউরোপের প্ররোচনায়। কোনো সমালোচনা ছাড়াই তারা এমন পরিবেশ তৈরি করে যে কেনিয়ার মাটি কেনিয়ার জনগণের নয়, যেন এটা তাদের নিজেরই। তবে এটা কি একটি দুর্ঘটনা?

এই প্রশ্ন থেকে আমার আরেকটি গল্পের কথা মনে পড়ে যায়। এটা মবিয়ে কইনানজিকে নিয়ে যিনি কেনিয়ার আলিয়েন্স উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং পরে আমেরিকার ভিরজিনিয়া ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা করেছিলেন। এরপর শেষে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ১৯৩৮ সালে দেশে ফিরে আসেন। তার বাবা তাকে নিয়ে অনেক গর্ব করতেন এবং স্বপ্ন দেখেছিলেন তার ছেলে এখানে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে। কইনানজি তার বাবার চিন্তার স্বপক্ষে দাঁড়ান এবং কেনিয়ায় গিথাংগুরি টিচার্স কলেজ প্রতিষ্ঠা করে বাবার স্বপ্ন পূরণ করেন। উপনিবেশিক কেনিয়ায় এটাই ছিল দেশের প্রথম উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।


আপনি পৃথিবীর সব ভাষাতেই কথা বলতে পারেন কিন্তু নিজের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি কিছুই জানেন না, তবে এর নাম দাসত্ব।


কইনানজি ‘বুকার টি ওয়াশিংটন’ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তার মতো আত্মনির্ভরশীল হয়ে নিজেকে গড়ে তোলেন। ওয়াশিংটন নিজেই ভিরজিনিয়া হ্যাম্পটন থেকে স্নাতক করেন এবং তিনি তুস্কিগি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। যদিও বুকার টি ওয়াশিংটনের সামাজিক মর্যাদার ব্যাপারে সন্দেহজনক ছিল, কিন্তু তার অর্থনৈতিক অবস্থান কইনানজিকে অনেক প্রভাবিত করেছিল। তাই তিনি গিথাংগুরি কলেজকে কেনিয়ার সাধারণ জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য গড়ে তুলেছিলেন। আফ্রিকায় একটি স্বাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিশেবে গড়ে তুলতে গিথাংগুরি কলেজের শিক্ষকদের সেভাবে তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। উপনিবেশিক বিরোধী প্রথম স্বাধীন স্কুল প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তখন একটা বড় প্রপঞ্চ ছিল যা মার্কাস গারভেয়িতের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। আফ্রিকার জনগণদের আত্মনির্ভরশীলতার এই আন্দোলনের মূল শ্লোগান ছিল, ‘ঘরে এবং বিদেশে আফ্রিকানদের জন্য আফ্রিকা।’ যখনি স্কুল আন্দোলনের কমিটির নেতারা কোথাও সাক্ষাৎ করতেন তখন উনারা নিজেদের যতটুকু সামর্থ্য তা দিয়ে অর্থের জোগান দিতেন আন্দোলনের জন্য। গিথাংগুরির ক্ষেত্রে ঠিক একই নীতি অনুসরণ করত। গিথাংগুরির নারী-পুরুষও যতটুকু পারত অর্থ সহযোগিতা করত আন্দোলনের জন্য। গিথাংগুরির জনগণের স্বাধীন স্কুল প্রতিষ্ঠার এই আন্দোলন এমন একটা আন্দোলনে নিয়ে গিয়েছিল যে আফ্রিকার স্বপ্ন বাস্তবায়নে উপনিবেশিক বিরোধী এত বড় আন্দোলন আগে কখনো হয় নি। কেনিয়ানরা বার বার এটাই বলার চেষ্টা করেছিল, ‘আমরা কেনিয়ানরাই কিছু করতে সক্ষম’, কিন্তু উপনিবেশিক রাষ্ট্রের শাসকরা বলল, ‘না আমরা তোমাদের কিছু করতে দিব না।’ ১৯৫২ সালে রাষ্ট্র গিথাংগুরির স্বাধীন স্কুলগুলো বন্ধ করে দিল এবং আফ্রিকার সকল পত্রিকা অফিস বন্ধ করে দিল এবং জোর করে কারাদণ্ডে পাঠাল বেশ কিছু সম্পাদকদের। এই ঘটনা বন্দি শিবিরে থাকা আফ্রিকান ভাষার কবি সাহিত্যিক গাকারা ওয়া ওয়ানজাউ, স্ট্যানলে কাজিকাদেরও উত্তেজিত করেছিল। এসব কি ঠিক সুস্থ ছিল? অপমান আর বঞ্চনাকে মাথায় মুকুট করে সেই সব স্বাধীন দেশপ্রেমিক সৈনিকদের নিয়ে গিথাংগুরিকে কারাগারে পাঠানো হলো। কেনিয়ায় আফ্রিকার এই আত্মনির্ভরশীলতাকে তকমা লাগিয়ে অপমান, লাঞ্চনা এবং পরাজিত করে দেখানো হলো।

আফ্রিকার কেনিয়াকে কেন্দ্রীভূত করে গড়ে তোলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ধ হওয়ার এইসব ঘটনা ইংরেজদের পরিকল্পনা পদ্ধতি অনুসারেই সংঘটিত হয়েছিল। ১৯৫২ সালের পরে এমন আইন করা হয় যে, অন্য যেকোনো বিষয় গণিত, পদার্থ, কেমিস্ট্রি, ইতিহাস এসবে পাস করুক না করুক ইংরেজিতে পাস না করলে পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ হওয়া যাবে না। ইংরেজিকে পাঠ্যক্রমে পৃথিবীর সকল জ্ঞান বিজ্ঞানের সাথে সমকক্ষ করে স্থাপন করে দেয়া হয়েছিল। পরে ১৯৬৪ সালে কেনিয়ার স্বাধীন আফ্রিকান সরকার নতুনভাবে ‘ওমিনদে শিক্ষা কমিশন’ গঠন করে এবং কমিশন শিক্ষাক্ষেত্রে আফ্রিকা ভাষাকে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চতর পর্যন্ত রেখে শিক্ষা পদ্ধতি স্থাপন করলেও ইংরেজি ভাবসম্পন্ন জাতীয়তাবোধকে জিইয়ে রাখা হয়েছে। উপনিবেশিক স্পিকারদের এইসব নীতিমালা এমনভাবে করে রাখা হয়েছে যাতে দেশের ভেতর তাদের মনোভাব কেনিয়াবিরোধী বা আফ্রিকাবিরোধী হয়েই বিরাজমান থাকে। বিংশ শতাব্দীর দিকে অলিয়স ফ্রান্সিসের প্রতিষ্ঠাতা ওয়ালটর রোডনে তার বই হাউ ইউরোপ আনডেভেলোপড আফ্রিকা-তে তুলে ধরেন যে, ‘উপনিবেশিকদের মনস্তত্ত্বে এমন শক্ত মনোভাব স্থাপন করা প্রয়োজন যদি কখনো তাদের প্রগতিশীলতা একটা স্বাধীন সংগঠন হয়ে প্রগতিবাদী রূপে আকার গঠন করে জেগে ওঠে তবে তাদের ওই প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা ভাষা এবং আত্মার ভেতর ফ্রান্সই যেন শুধু  থাকে গভীরভাবে।’

আফ্রিকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যখন আফ্রিকা ভাষা নিষিদ্ধ করে দিল তখন তাদের স্পিকাররা যদি তা অনুসরণ না করত তবে তাদের অপরাধী গণ্য করে গ্রেপ্তার করা হতো। স্কুলের বাচ্চারা যদি স্পিকারদের  মাতৃভাষায় কথা বলতে দেখে ধরে ফেলে তবে তারা সাথে সাথে এই অপরাধে ভুগে যেন তার চামড়া থেকে বেশ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এরূপ আচরণ করে পকেট থেকে একটি ইশতিহার বের করে পড়ে যে ‘আমি খুব বোকা’ এরকম আর হবে না, এসব বলে ক্ষমা প্রার্থনা জানায় অনেকটা পোষা পশুরা পালিত হলে একইভাবে যেরকম অনাকাঙ্ক্ষিত কষ্ট এবং অভিপ্রেত আচার-আচরণ করে থাকে আনন্দের সাথে। এরপরে অনুগত সন্তানের মতো অভিবাদন করে তিরস্কার পুরস্কার যেটাই হোক ভোগ করে, যাতে করে মুখ থেকে লালা বের হওয়ার মতো ইংরেজি শব্দ ঝরে আর মাতৃভাষা যেন দুর্গন্ধের মতো ছড়ায় সবসময়।

নজোনজো এবং তার ইংরেজির প্রতি এই প্রবল ঝোঁক থাকাটা কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছিল না যদিও বা তার ওইসব কাজকর্ম একটি নিঃসঙ্গ নেকড়ের মতোও নয়, তিনি হচ্ছেন আফ্রিকার মধ্যবর্তী শ্রেণির শিক্ষিত মনোভাবের একজন। এই নজোনজোবাদ হচ্ছে এখনো আফ্রিকার প্রধান সমস্যা। ইউরোপ আফ্রিকাকে তাদের ওই উচ্চারণভঙ্গির একটি কাঁচামাল দিল আর আফ্রিকা ইউরোপকে এই মহাদেশের মাটিতে যেখানে সেখানে বিচরণ করতে দিল। এটা সত্য যে খড়গ হাতেই ইউরোপ তাদের কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করল অন্যদিকে মৌন সম্মতি হয়ে পরাজিত থেকে নিখুঁত ইংরেজি বলে আফ্রিকা ধীরে ধীরে বিজয়ের পথ নিশ্চিত করে।

আপনি পৃথিবীর সব ভাষাতেই কথা বলতে পারেন কিন্তু নিজের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি কিছুই জানেন না, তবে এর নাম দাসত্ব। সম্প্রতি গত বছরের দিকে নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্রমণে গিয়ে ভালো লাগল। তারা নিজেরাই দুটো জিনিস তৈরি করল, খনিজ পানি যার নাম দিল ‘রয়েল সাতিমা’ আর ‘দই’। আমি সেখানে তাদের বানানো দই এবং পানি খেলাম। আমার খুব ভালো লাগল যে এই দুটো জিনিস কেনিয়া উৎপাদন করেছে। যখন আমি জার্মানিতে দশম অবৈতনিক ডক্টরেট ডিগ্রি নিতে গিয়েছিলাম তখন সেখানে ময় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল আমাকে তাদের তৈরি করা একটি কাপড় উপহার দিল। দেশের তৈরি একটি শার্ট আমার কাছে ছিল বছরের শ্রেষ্ঠ উপহার। তখন কেনিয়ার এরকম নিজস্ব কোম্পানির প্রাথমিক যাত্রার আদেশ কি সরকারি দালালেরা দিয়েছিল? নজোনজো কি বলেছিল ‘আমাকে আরেকটা উড়োজাহাজ বানিয়ে দাও?’


পরাধীনতা, অনুকরণ, ভিক্ষাবৃত্তি নয় বরং স্বাধীনতা, মৌলিকত্ব এবং শ্রেষ্ঠত্বের জন্য সংগ্রাম করো।


এভাবেই তো এগিয়ে যাওয়া উচিত। আমরা ইতোমধ্যে এটা প্রমাণ করেছি। বন্ধুরা, চলো নাইরোবি এবং ময় বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, সেখানে গিয়ে তাদের কিছু বানানোর এই উদ্যোগের সাথে যোগ দিই। তবে কেবল খনিজ পানি, দই আর পোশাক তৈরিতে থেমে থাকলে কি হবে? সাইকেল কি তৈরি হবে না? ইলেকট্রিক যান কি তৈরি করব না? উড়োজাহাজ কি তৈরি করব না? আমরা কি আমদের প্রতিরক্ষার জন্য অস্ত্র বানাতে পারি না? একটি রাষ্ট্রের কখনো দীর্ঘস্থায়ী বন্ধু থাকে না, আজকে তুমি যার উপর ভর করে যাদের কাছ থেকে অস্ত্র নিচ্ছ কাল তোমাকে সে নিরস্ত্র করে দিতে পারে। যে তোমাকে আজকে খাওয়াচ্ছে কাল হয়তো সে তোমার খাবার কেড়ে নিয়ে যেতে পারে। প্রত্যেক দেশের প্রথমে নিজের খাদ্য সরবরাহ থেকে শুরু করে নিজের পোশাক, ঘরবাড়ি এবং নিজের নিরাপত্তা দেয়া এসব পূরণ করার ক্ষমতা থাকা উচিত। অন্তত একটি দেশের এসব মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটানোর ওই ধারণক্ষমতাটুকু থাকা উচিত।

পরাধীনতা, অনুকরণ, ভিক্ষাবৃত্তি নয় বরং স্বাধীনতা, মৌলিকত্ব এবং শ্রেষ্ঠত্বের জন্য সংগ্রাম করো। গড়ে তোলো আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি যা আমাদের কেনিয়া এবং আফ্রিকার নিজস্ব সংস্কৃতি। দেশে আমদের পছন্দ মতো শিক্ষাবিদ গড়ে তোলো এবং দেশের অর্থনীতির চাকা পরিকল্পনা করে তথাপি এমনভাবে তৈরি করো যাতে সব কিছু নিজেরাই উৎপাদন এবং গ্রহণ করতে পারি। আমরা যে কেনিয়ান তা আমরা আমাদের জাতিগত আচার-আচরণ স্বভাবের স্বরূপ নিজেকে প্রকাশ করে গড়ে তুলে জীবন পথকে পরিচালিত করি। ওইসব পরাধীনতা, অনুকরণ, ভিক্ষাবৃত্তির সংস্কৃতি পরিহার করো। একজন অনুকরণকারী সবসময় নিজেকে চালিত করে একজন অনুসরণকারী, আস্থাহীন এবং পরজীবী হয়ে আর সেই অনুসরণের শুরুটা হয় ভাষা দিয়েই। আপনি যদি আপনার নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি জানেন তবে পৃথিবীর সকল ভাষা ও সংস্কৃতিকে যুক্ত করেন, তখন ওটাই হচ্ছে ক্ষমতায়ন।

স্বাধীন আফ্রিকান স্কুল এবং গিথাংগুরি টিচার্স কলেজ আন্দোলনগুলো থেকেও আমদের শিক্ষা নেয়া উচিত। তারা তাদের নিজেদের পকেট থেকে অর্থ দিয়ে জনগণের উন্নতি ও কল্যাণ করত। আর আজ আমরা সামষ্টিকভাবে সংগ্রহ করি নিজেদের ব্যক্তিগত লাভ ও উন্নতির জন্য করি। ওদের জন্য নেতৃত্ব ছিল জনগণের বিশ্বাস। আর এখন রাজনৈতিক অফিস হচ্ছে একটি ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান, এমনকি ওই সময় ওরা ছিল উপনিবেশিক নিয়মে। ওরা জনগণের জন্য কেনিয়াকে প্রত্যাশা করেছিল এবং বাহিরের লুটরাজের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে চেয়েছিল। একজন বিদেশি লোকের চোখ দিয়ে দেখলে দেখি যে আমরা সাধারণ জনগণের সাথে প্রতারণা করছি, যারা প্রতিদিন রক্ত দিয়ে লড়াই করে চলছে।

আমার উপন্যাস উইপ নট চাইল্ড প্রকাশের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে আলচনাচক্রের আয়োজন হয়। বইটির মূল বিষয় দেশের আত্মত্যাগের ইতিহাস নিয়ে একটি নাটকের দলের অভিনয় দেখলাম। তারা তাদের নিবদ্ধ শরীর দিয়ে সংগ্রামের কষ্ট এবং আত্মাভিমান দৃশ্যগুলো সৃষ্টি করল। তারা প্রতিরোধের সৌন্দর্যবোধ নাটকীয়ভাবে তুলে ধরল এবং তারা গাইল, ‘আমাকে “আমি” হতে শিক্ষা দাও’। যদি তুমি আমাকে “আমি” হতে শিক্ষা দাও, তবে তুমি আমকেই দেখবে। যদি তুমি আমাকে “আমি” হতে শিক্ষা দাও, তবেই আমি স্বাধীন হব, কিংবা তুমি কি ভীত আমাকে স্বাধীন করতে?

 

দেবাশীষ ধর

জন্ম ৫ জানুয়ারি, ১৯৮৯; চট্টগ্রাম। গণিতে স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম কলেজ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পেশায় শিক্ষক। গণিতের প্রভাষক, মিপস ইনস্টিটিউশন অব ম্যানেজমেন্ট টেকনোলজি।

প্রকাশিত বই :
ফসিলের কারুকাজ [অনুপ্রাণন প্রকাশন, ২০১৬]

ই-মেইল : debdhar121@gmail.com