হোম অনুবাদ আদুনিসের কবিতা

আদুনিসের কবিতা

আদুনিসের কবিতা
900
0

শুধু আরববিশ্বের নয়, আন্তর্জাতিক কাব্যজগতের এক পরিচিত নাম আদুনিস বা অ্যাডোনিস। জন্ম ১ জানুয়ারি, ১৯৩০। মূল নাম যদিও আলি আহমদ সাইদ ইসবার, কিন্তু কাব্যিক নাম বা তাখাল্লুসই এখন প্রধান পরিচয়। আধুনিক আরবি কবিতার এক বিশাল মহীরূহ তিনি; শেকড় তার আরবীয় সাহিত্যের গভীরে, ডালপালা ছড়িয়ে আছে সমগ্র ভূগোলে। শৈলী ও ভাবসম্পদে ঋদ্ধ হওয়ার দরুন তার কবিতা প্রথম থেকেই বোদ্ধা ও রসিকদের সমীহ আদায় করে নিয়েছে। 

শিল্পসফল কবিতা রচনা যেমন তার নেশা, তেমনই কাব্যিক কলাকৌশল নিয়ে আকরগ্রন্থ রচনায় তিনি সিদ্ধহস্ত। প্রাচীন, মধ্য বা আধুনিক আরবি কবিতা সম্পর্কে জানতে হলে তার রচিত, সম্পাদিত গ্রন্থই দ্বিধাহীন আশ্রয়। অনুবাদেও সমান পারদর্শী। ইভ বনফোয়ার কবিতা-সমগ্রসহ ফরাসি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি ও কবিতা আরবি ভাষায় অনুবাদ করেছেন, আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সম্পদও ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। আর তার নিজের কবিতা পৃথিবীর প্রায় সবকটি ভাষাতেই অনূদিত হয়েছে। ‘মাওয়াকিফ’ নামে একটি সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করতেন, যেখানে মাহমুদ দারবিশও যুক্ত ছিলেন। এটি ছিল শিল্পোন্মাদ কবি-সাহিত্যিকদের আগ্রহের বিষয়। সে সময় আরবীয় সাহিত্য জগতে আরো একাধিক সাময়িকী বের হতো। তবে আদুনিসের মাওয়াকিফ ছিল স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। দু-ডজনের অধিক কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। গদ্যগ্রন্থের সংখ্যা ডজন-দেড়ের মতো। এখানে অনূদিত কবিতাগুলো তার (তানাব্বা, আইয়ুহাল আ’মা) ‘হে অন্ধ, পূর্বাভাস দাও’ গ্রন্থ থেকে নেয়া। সিরীয় এই কবি জাত্যাভিমান নয়, আল-হামারা-গ্রানাডার আরবীয় স্থাপত্যকে কবিতার বুনটে বেঁধে দিয়েছেন বর্তমানের স্পেনের শিল্পকে সমন্বিত করেই। তা যেন ভিন্নতর এক স্থাপত্য।

মুনকাসির ফুয়াদ

 


গ্রানাডার দ্বাদশ প্রদীপ



ভূমায় এবং আকাশে একটি মাত্র ঘর
এখানে, ভূমধ্যসাগর ও সিয়েরানেভেদার মাঝখানে।
পাহাড় হাত রাখে তরঙ্গের হাতে
সাগর চড়ে বসে বৃক্ষ-জানালায়
এটা ভিড়ের দরজা।
দেখি, কবি-কল্পনা চড়ে বসছে আল-হামারায়
হুগো, গাঙ্গোরা, খেমেনিয়েজ, রিলকে, লোরকা।
শুনি আরমান্দু ব্লাসিয়ু ভালদিস :
(আক্ষেপ হয়, যদি জন্ম হতো
গ্রানাডার যুগে!)
সংকীর্ণতাই শূন্যতা এ ইতিহাসের সুগন্ধিতে
সংকীর্ণতাই ইতিহাস এ মাটির সুবাসে
চড়ে যাও, হে কবি! প্রশ্নের গম্বুজে
পাঠ করো সুগন্ধ রায়হান-গুল্মলতার বায়ু
ঠোঁটদুটিকে চুম্বিত করো অর্থ-গভীরতায়।

 


দরজা খোলা আল-হামারার আকাশপানে
যেন তার শিশুরা বের হয়, মিলিত হয় পরস্পরে
হাত পাঁচটি প্রার্থনা
হাত একটি তাবিজ, যা প্রতিরোধ করে অনিষ্ট
কী বহন করে নিয়ে যায় এই সাংকেতিক হাত
ডালিমকে শেষ করে দেয়, নাকি বিলাপরত কলিজাকে?
এই সেই হুদারাহ নদী:
পায়ের মল এবং পাদুকাহীন পদযুগল।
আঁকড়ে ছিল ইঁদুর সূর্যের কিনারা
সেভাবেই ছেড়ে দিই, দীর্ঘায়িত হতে থাকে রং ও রেখার চাদরে
ঢুকেছি এখন গোলক-ধাঁধায়
সকল দুর্ভাবনাকে বন্দি করে সবুজ রহস্যে :
কল্পনা—সৃষ্টজগতের আদম
আল-হামারা—প্রাসাদজগতের হাওয়া।
স্বপ্ন দ্যাখো, দ্যাখো স্বপ্ন
তা যদি না পারো, গিলে খাবে তোমায় ঘুম ও রাত।

 


মদিরা-দ্বার
আমি কি অনাহূত নাকি বহিষ্কৃত
মাতাল হয়েছে আমার থেকে অনেক মোড় ও আলখাল্লা
কেঁপে ওঠে এখানে ইতিহাসের জুঁই।
কুফি ও নাস্‌খি লিপির বাগানে আমি মাতাল
গান আসে তোমার কারণে এবং চলে যায়
সকল স্থানে, অস্থানে।
অনেক হলঘর সুসজ্জিত, সাঁতার কাটে আলোর ঝিলে।
অনেক পতঙ্গ ঢুকে পড়ে সেখানে
যেন মুক্ত হতে পারে এর রঙ-রেখা থেকে
নত হয়ে দেয়ালের সামনে
যেখানে মাটিই স্তুতি
দেয়াল সুন্দরের সহোদর।
জীবন হলো টেরাকোটা-শরীরের নাভি
তারাপুঞ্জ—দুটি কানের নিচে চূর্ণকুন্তল

 


মেঘ ধরতে গিয়ে ভীত হতে নেই।
বলো, হে মোর পদপাত, শান্ত হও
কালোর মাঠে, রায়হান-প্রান্তরে
নেমে আসে চাঁদ জলের সিঁড়িতে
দেখতে চায় তাতে প্রেয়সীর মুখ
লজ্জায় নিভে যায় চারপাশে প্রদীপের আলো।
এই স্তম্ভগুলোর কাঁধে অলঙ্কারের সংশয়
কাঁধ মেঘগুচ্ছ ও তরঙ্গমালা
কে এই দুর্বল চিত্রকর?
তার টেরাকোটায় তারাপুঞ্জ বন্দি
মুক্তির লক্ষ্যে উদাসীন
লিপি একটি নদী, যা মসিতে লেখা
যেন এখানে বয়ে যেতে পারে কালের জল।

 


এটাই তোমার মেরু, হে টেরাকোটা-ভক্ত
গম্বুজগুলোর বিচিত্র অবস্থা ও অবস্থান
গম্বুজে মর্মর-ধ্বনি, পাখাগুলো ঈর্ষান্বিত
মদিরতার নিচে ভ্রাম্যমাণ কুরসি
বয়ে চলে আগ্রহ-হরিণ
এখানে অসীমতা আলখাল্লা-পরা
দীপাধারে সমাসীন দিগন্ত
বারান্দায় কান রাখো :
রাত ও সূর্যের বিয়ে
এই অনন্ত বাসর আমার মাঝে, আমার মাঝে।
আমার শরীর আমার নয়
পেয়েছে আমাতে আগ্রহ ও স্বাদ
আমাকে তাই মুক্তি দাও : ইন্দ্রিয় সাজাব আমি
তুলব নতুন করে মনোবাসনা।

 


তা অবশ্য ঘটনাবহুল
প্রবেশ করে সুঁই ছিদ্রে, সেলাই করে জানলার কাপড়
এতে অনেক তরণি, অসংখ্য হরিণ-স্কন্ধ
অনেক অশ্বপৃষ্ঠ, চড়ে বসি কোনো একটিতে
নাড়িয়ে দিই দূরের খেজুরবীথি
জানি না কেন কাঁদছিল সেই জানলা
অথচ দেখেছি, আকাশ বাড়িয়ে দিচ্ছে তার দিকে নীল রুমাল
বর্ণনা করে এই জানলা
চাঁদ ঘটায় অবাক কাণ্ড আল-হামারায়
যখন ঢেকে যায় তা মেঘে
ঝিলের মতো জানলা
যা প্রশস্ত হয় শুধু স্বপ্নারোহীর জন্যই
জানলাগুলো তারার কানের দুল
ছেদ শব্দটিই বেমানান আল-হামারার বর্ণমালায়

 


লাল, নীল ও হলুদের মাঝে কোমারেস হাম্মামে
জল হয় তৃষ্ণার্ত, অতৃপ্ত।
তুমি জানতে পারবে তা কেন হয়
ঝরনার উদ্ভব ঘটে এভাবেই যেন দেহ হতে পারে
জল ব্যস্ত সংগীতে পরিণত হবার চেষ্টায়
ভাবে সকল স্নানার্থী
আকাশ কয়েক গজ মাত্র, যা যথেষ্ট কোমরবেষ্টনী হিশাবে
এভাবেই স্বভাব
আলিঙ্গন করে প্রকৃতি ও এর আবহ
অথবা এভাবেই আমার কাছে উপমা দেওয়া হয়
আমি বলি, ওইসব দৃষ্টান্তের দিকে চেয়ে :
বেশ মনোরম এই ধীরতায়
বস্তুনিচয়ের পরিচয়-ঢাকা
এই সন্ধ্যায়, গ্রানাডা অনিদ্রিত আমার ভাবনায়
শুয়ে আছে আমার দুই বাহুতে
গ্রানাডা! তোমার বুর্নুসের আঁচল টেনে ধরো
শুভ হবে কালের জন্য পেঁচিয়ে যাওয়া।

 


একটি প্রান্ত বলল কানে কানে :
প্রবেশ করেছ হে কবি! আমার ত্রিভুজে
নিষ্কৃতি সুদূরপরাহত
আমার অনেক স্তন, পাত্র নেই।
হও আমার মতো
ভ্রমণ করো শুধু তোমার শরীরে
যেন অবহিত হতে পারো জগতের সামগ্রিকতায়

অন্য একটি কোণ বলে :
বুদ্ধি এখানে ইন্দ্রিয়-সেবক
টেরাকোটাই এখানে মাটির বাক-প্রশিক্ষক
কিন্তু টেরাকোটায় চোখ বুলাও শুধু
এর পেছনে ধর্মদ্বেষ সাঁতার কাটে হাওয়ায় হাওয়ায়
পরিধানে সংশয়ের বেগুনি রঙ

আল-হামারার কোণগুলো মিথ্যা করে দেয় জ্ঞানকে :
ঝরে পড়ে সেখানে আলো,
যেন ছদ্মপরিচয়ের কোনো প্রশ্নকর্তা
গুটিয়ে নিচ্ছে কোণগুলো তার পাজামা
যেখানে সূর্যালোক ঝুলিয়ে দিত কল্পনার ট্রাউজার

 


টেরাকোটা ও চিত্রের ভাঁজে ভাঁজে
স্বপ্নের শূন্যগর্ভ নদ-নদী
নেই কোনো জল্লাদ এই গম্বুজের নিচে
শোণিত নেই অলিন্দে
কিছুই নেই, শুধু কবিতার পদচ্ছাপ।
পুরুষরা ঝুঁকে দাঁড়ায় আল-হামরার দ্বারে
কল্পনার সুবাদেই নিক্ষিপ্ত ভ্রমণের চূড়া থেকে
সবাই সচেষ্ট স্বর্গকে টেনে নিতে নিজ নিজ ঘরে।
নারীরা ফুঁক দেয় গ্রানাডার গিরায় গিরায়
তাদের জন্য বিনুনি খুলে দেয় তারকাপুঞ্জ
কিন্তু আমার শরীর ভাবনাগ্রস্ত এই মুহূর্তে
বলব কি, আমি জন্ম নিই নি এখনো।
এসো না, হে ভবিষ্যৎ এসো না
অপেক্ষা করো, দাঁড়াও, পথ খুঁজে নিই তোমাকে দেখার-চেনার
উপায় শিখে নিই তোমাকে অভ্যর্থনা দেবার

 


বৃদ্ধকাল
ভাঙা বগির ছায়ায় বসে
ধূমপান করছে ঋতুগুলো
দ্যাখো, আমি কি বলব আল-হামারার দেয়ালগুলোকে :
ছিঁড়ে ফেল তোমার অন্তর
কান্নার ভেতর দিয়ে ডাকব কি খুঁটিগুলোকে?
সময় হয় নি কোনো ক্ষত শুশ্রূষার
সম্বোধন করছে কি এসময়-ই?
কিন্তু কান পেতে আছি, হে গ্রানাডা, তোমার কল্পনায়
সহানুভূতি জানায় বাস্তবের ললাটরেখাকে
কান পেতে আছি তোমার গম্বুজে
পাঠ করবে তুমি প্রেমের কাসিদা
কিন্তু কিন্তু
এই সে রাত—দান করে আমাকে গিটার
যেন গান গাই ঊষার।

 


আবিষ্কার হবে ভিন্ন কোনো অ্যাস্ট্রোল্যাব?
বলবে, আকাশ স্থির আল-হামারার হৃদয়ে
আকাশে খনন করছে কবিতা নিজ চেহারা।
সাধ বড় অদৃশ্য বিষয় দর্শনের
এভাবেই এক করে দিই সৃষ্টিজগৎ ও তার কর্মে
বস্তু ও তার সমকক্ষে
বস্তু ও তার প্রতিপক্ষে
আমি বলি, গ্রানাডার দুহাত ভবিষ্যতের উদ্যানে
যা-কিছু আসে যেন সামনের দিক থেকেই
এটাই গ্রানাডার পদরেখা
একই রং রচনা করছে জগৎকাব্য

 


কান পাতো হে কবি! গ্রানাডায়
তুমি প্রেমিক নও অতীত সন্ধ্যার
কারণ তুমি অনাগত ভোরের অংশ
সন্ধ্যা-ই ডেকে আনে ভোর
খুলে দেয় দিগন্তমূল
স্বাদ দেয় গভীর উচ্চতার
তোমার জন্য সূর্যের উপমা, গ্রানাডার উদাহরণ
দুটি কপোল :
একটি কপোল প্রাচ্যে
অন্যটি প্রতীচ্যে।


সংশ্লিষ্ট পোস্ট : সহি ইসলাম, ভ্রান্ত ইসলাম, আইএস ও আদুনিস  ●  আরবের কারাগারগুলো লেখকে ভরা নয় কেন : অ্যাডোনিস
Lutfur

মুনকাসির ফুয়াদ

জন্ম ১ জুন, ১৯৭৯; ব্রাহ্মণবাড়িয়া। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা শিক্ষকতা।

ই-মেইল : munkasir.fuad@gmail.com
Lutfur

Latest posts by মুনকাসির ফুয়াদ (see all)