হোম অনুবাদ অস্কারজয়ী সেরা চলচ্চিত্র ‘মুনলাইট’ নির্মাতার সাক্ষাৎকার

অস্কারজয়ী সেরা চলচ্চিত্র ‘মুনলাইট’ নির্মাতার সাক্ষাৎকার

অস্কারজয়ী সেরা চলচ্চিত্র ‘মুনলাইট’ নির্মাতার সাক্ষাৎকার
1.36K
0

সমকামী নন তিনি। তারপরও সমকামীদের নিজের থেকে আলাদা করে দেখেন না ব্যারি জেনকিন্স। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে এবং মাত্র দুটি চলচ্চিত্র দিয়েই বাগিয়ে নিয়েছেন গোল্ডেন গ্লোবসহ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে বিশ্বসেরা অনেক স্বীকৃতি ও সম্মান। এই সেদিন অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে জমকালো অনুষ্ঠানে উপস্থাপিকার ভুলে কেমন বেকায়দায় পড়েছিলেন তিনি, যারা দেখেছেন সেই অনুষ্ঠান, জানেন তারা সবাই। যাহোক, শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালের সেরা চলচ্চিত্র তাঁর ‘মুনলাইট’। সমকামিতা নিয়ে বিস্ময়কর এই কালো চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই প্রথম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড জিতলেন মুসলিম কোনো অভিনেতা—মাহেরশালা আলি। বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাক্টর বিভাগে পুরস্কার জেতেন তিনি।

 

ট্যারেল ম্যাকক্রেনি-র নাটক ‘In Moonlight Black Boys Look Blue’. মুনলাইট ছবিতে উঠে এসেছে শারন চরিত্রটির জীবনের তিনটি ভিন্ন পর্যায়ের গল্প। মায়ামির দরিদ্র পটভূমিতে আঁকা গল্পটি দেখাতে চায় সামাজিক প্রত্যাশার ভার কিভাবে পরিচয় ও পৌরুষের ওপর প্রভাব ফেলে।

 

২০১৬ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কে বসে জেজেবেল পত্রিকার রিচ জুজভিয়াকের সাথে তার চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রের রাজনীতি এবং পুরুষ হিসেবে তাঁর নিজস্ব জীবনপদ্ধতি সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ব্যারি জেনকিন্স। অস্কারবিজয়ী কৃষ্ণাঙ্গ এই মার্কিন চলচ্চিত্রকারের অন্তর্গত ভুবন, শিল্পদৃষ্টি এবং বিশ্ববীক্ষার নানা স্তরের উন্মোচন ঘটেছে এই সাক্ষাৎকারে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন তানভীর মাহমুদ। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

 


সাক্ষাৎকার
❑❑


জেজেবেল

বহু মানুষ এই ছবিটিকে সমকামী বলে অভিহিত করেছে। আপনার কি মনে হয় এই আখ্যা যথার্থ?

ব্যারি জেনকিন্স

হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই। আমি মনে করি এটি চরিত্রটির পরিচয়ের কেন্দ্রে আছে, কাজেই ছবির পরিচয়ের কেন্দ্রেও এটি থাকবে।

জেজেবেল

একথা জিজ্ঞেস করছি, কারণ আমি ভেবেছিলাম শারনের (একটি চরিত্র) যৌন-অভিরুচি নিয়ে কিছু দ্ব্যর্থকতা ছিল। এবং আমরা তকমা এঁটে দেয়ার প্রতি মানুষকে এখন বেশি করে অনিচ্ছা প্রকাশ করতেই দেখছি।

ব্যারি জেনকিন্স

সত্য। তবে গল্পটি নির্ভর করে ট্যারেল ম্যাকক্রেনি-র ওপর, যিনি খোলামেলাভাবে এবং বাহ্যিকভাবেও সমকামী। আমি এও মনে করি এই কাজটি কালনির্ভর এবং আমি আর ট্যারেল কেউই নিজেদের মিলেনিয়াল বলে মনে করি না। তবে আপনি ঠিক কোন অবস্থান থেকে কথাগুলো বলছেন তাও আমি বুঝি… কিন্তু আমি জানতে চাই কিভাবে আপনি প্রশ্নগুলো সাজাচ্ছেন, কারণ এমন করে কেউ প্রশ্ন করে নি। আমি এভাবে বিষয়টি তলিয়ে দেখতে কৌতূহলী।


শারন যৌনতার চেয়ে আরও মৌলিক কিছুর সন্ধানে রত।


জেজেবেল

ঐতিহ্যগতভাবে আমরা সবকিছুকে বাইনারি ধারায় দেখে এসেছি। এবং বিশেষ করে পুরুষদের বেলায় নিগ্রো নাম দেয়ার সেই একফোঁটা-রক্ত-নিয়মের মতো করে যৌনতাকে মাপা হয় : যদি কখনো একবারের জন্যও একজন পুরুষ অন্য আরেকজন পুরুষের সাথে যৌন সাহচর্যে আসে তবে তাকে অনিবার্যভাবেই সমকামী অভিহিত করা হবে। যৌনতা নিয়ে আমাদের বোঝাপড়া যখন সাংস্কৃতিকভাবে বিকশিত হচ্ছে সেই সময়ে এসে আমরা এই ধরনের ভাবনাকে সঠিক নয় বলে মনে করি।

ব্যারি জেনকিন্স

Barry-Jenkins-Moonlight-golden-globes-nomination
পরিচালক ব্যারি জেনকিন্স

এটা একটা ভালো যুক্তি। এটি কখনো চিত্রনাট্যে ছিল না, ছবিতেও বলা হয় নি। কিন্তু আমি কেভিন চরিত্রটিকে (শ্যারনের বন্ধু) কখনো সমকামী বলে ভাবি নি। আমি বরাবর তাকে উভকামী বলে ভেবেছি প্রায়। তবে তকমা আঁটার চিন্তা কখনোই জেঁকে বসে নি। এই দুজন পুরুষের বিষয়ে ভেবেছি আমি এখানে, আর সে যেমন ধরনেরই হোক, তাদের সম্পর্ক নিয়ে ভেবেছি। এটি অনেকটা এমরফাস, পূর্ণরূপ পাচ্ছে না এমনধারা কিছু একটা। আপনার প্রশ্নে ফেরত গেলে বলা যায় এটি কোনো সমকামী ছবি নয়। কিন্তু, আবার বলি, আমি এমনও ভাবি যে এটি ট্যারেল-এর পরিচয়ের কেন্দ্রে আছে, এবং এটি শারন তার ব্যক্তিত্ব ও পরিচয়ের যেদিককে দমিয়ে রাখতে চায় তারও কেন্দ্রে আছে। সেই দিক থেকে মানুষ কেন এই ছবিকে সমকামী ছাঁচে ভাবতে চায় তা বুঝবার ক্ষেত্রে আপনি এগুতে পারেন। আমার জন্য এটি কেবল এই চরিত্র বিষয়ে, এই জায়গাটি নিয়ে কাজ। এর আগের ইন্টারভিউ যিনি নিয়েছেন তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ছবির শেষে কেন চরিত্র দুটি তাদের সম্পর্ককে শারীরিক মিলনে পূর্ণতা দেয় না?’ এটা অনেকটা এমন যে চরিত্রটির ভ্রমণ সেইদিকে ছিল না। আমি এও ভাবি যে তেমনটা হতো ঐ চরিত্রটির জন্য অতি প্রথা অনুসারী এক সমাধান। আমার মতে তেমন কিছুর বদলে চরিত্রটির নিজের বহু সমস্যা সমাধান করার আগেই আরও দীর্ঘ পথ বরং যাবার ছিল, এমনকি ছবি শেষ হয়ে যাবার পরেও।

জেজেবেল

শারন যৌনতার চেয়ে আরও মৌলিক কিছুর সন্ধানে রত। কুইয়ার মিডিয়াতে যৌনতা নিয়ে পর্যাপ্ত কিছু না থাকা বিষয়ে হতাশ এমন একজন মানুষ হয়েও। যারা সমকামিতার রূপায়ণ নিয়ে খুঁতখুঁতে সেই লোকেদের জন্যই যেন এই বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া হয়। এই ছবিটি থেকে আমি এমন কিছু পাই নি। সমকামের সমস্যার চাপে অন্য বিষয়গুলো তলিয়ে না যাওয়াই বরং কঠিন। তবে এই ছবিটি নিপুণভাবে কয়েকটি বিষয় নিয়ে কাজ করেছে—একজন ‘পুরুষ’ হবার অর্থ কী, এবং অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা কিভাবে একে প্রভাবিত করে ও জট পাকিয়ে তোলে।

ব্যারি জেনকিন্স

এবং সামাজিক বাধ্যবাধকতা কিভাবে, আপনি যেমন মানুষ বলে নিজেকে অনুভব করেন অথবা কেমন মানুষ আপনার হয়ে ওঠা প্রয়োজন তার ওপর, খবরদারি করে। যাতে করে আপনি স্রোতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেন বা সাঁতার দিতে পারেন। পৃথিবীর দিকে যাত্রার এই-ই আমার পথ ছিল বরাবর।

জেজেবেল

কারণ আপনি বিষমকামী।

ব্যারি জেনকিন্স

কারণ আমি বিষমকামী। তারপরও ট্যারেলের অভিজ্ঞতার মূলে আছে এমন এক বিষয় নিয়ে আমি কাজ করছি। আমি তার স্বরকে সংরক্ষণ করতে চেয়েছি বটে, তবে আমি এর মাঝে নিজস্বতাও চেয়েছি। আমার কাছে এসবের অর্থ কী—এই যে পৌরুষের ধারণা এবং যে পৃথিবীতে ট্যারেল ও আমি বেড়ে উঠেছি, আমি এর রপায়ণ যথাসম্ভব পুঙ্খানুপুঙ্খ ও ছোট পরিসরে করার চেষ্টা করি। সে পৃথিবী আপনাকে কেমন করে বলে, ‘এই হলো পুরুষ বলতে যা বোঝায়। সে এমন করে হাঁটে, এমন ধরনের পোশাক পরে। নারীদের সাথে তার আচরণের ধারা এই। এভাবে সে অন্য পুরুষদের সাথে আচরণ করে। সে চায় অন্য পুরুষেরা তাকে এমনভাবে দেখুক।’ আমি মনে করি এসব যদি আপনি যথেষ্ট পরিমাণে পান, আসলে যার মানে বাড়াবাড়ি রকমের বেশি করে পান, তবে আপনি কে এবং আপনি অন্য পুরুষদের কী চোখে দেখতে চান কিংবা কিভাবে পোশাক পরতে চান বা নারীদের সাথে কেমন করে কথা বলতে চান—এসবের খেই হারিয়ে ফেলবেন অনেকটা।

mccraney_opener
কাহিনিকার ট্যারেল আলভিন ম্যাকক্রেনি

ম্যাকক্রেনির নাটকটি যখন আমার কাছে এল, যিনি আমাকে এটি পাঠিয়েছিলেন তিনি আমাকে বললেন, ‘এটি আপনাকে নিয়ে নয়… কিন্তু আপনাকে নিয়েই।’ আমি তৎক্ষণাৎ বুঝে উঠতে পারি নি এটি আসলে কী নিয়ে ছিল। কিন্তু আমি এক পা পিছিয়ে গিয়ে ধরতে পারলাম কোথায় আমার আর ট্যারেলের অভিজ্ঞতা একই তলের। সেই খুঁজে পাওয়া এমন উচ্চাঙ্গের আর কাব্যিক ছিল না। এটি বরং এমন ছিল—‘শিট, এই তো ঠিক—আমার মনে পড়ে এই পরিপার্শ্বে থাকা কেমন, অন্য লোকগুলোর নির্দিষ্ট রকমের আচরণ দেখা কেমন। শিট, এই লোকগুলো যদি দেখে আমি এমন আচরণ করছি তবে আমার গাঁড় মারা যাবে।’ এরপর আপনি ছেঁকে নিতে শুরু করবেন : দশ বছর বয়সে কেমন লাগে, ষোলতে কেমন লাগে, পঁচিশে এসেও যদি সেই অনুভূতিগুলোকে বাধা না দেয়া হয় তবে কী ঘটে? এবং ট্যারেলের বেলায় কেমন হয়ে থাকতে পারে যদি তার অনুভূতিগুলো বাধাহীন থেকে গিয়ে থাকে, যদি তিনি নিজেকে নিজের মতো হয়ে উঠতে দিয়ে থাকেন? সেই জায়গায় এসে আমি ভেবেছি, ‘আচ্ছা, এবার ঠিক ধরতে পেরেছি আমি।’ বড় কাজটি ছিল ট্যারেলের সাথে এই আলাপটি। আমার মতো করা রূপান্তর তাকে দেখানো, তার অনুমোদন নেয়া। এই অনুমোদন নেয়া এমন ছিল না যে, ‘ট্যারেল আপনি সমকামী এবং আপনি নাট্যকার—আমি এটা ঠিক দেখাচ্ছি আপনি তা নিশ্চিত করতে পারেন?’ এটা ছিল এমন, ‘আপনার চরিত্রগুলোর প্রতি আমি কি সুবিচার করেছি? আপনি পৃথিবীতে যা দিয়েছেন তা কি আমি নিতে পেরেছি, এবং একে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্দায় আনতে পেরেছি?’ এবং এখনও পর্যন্ত মনে হচ্ছে কাজটা আমরা ভালোই করেছি।


অভিনেতা নির্বাচন এবং ছবির বাকি অংশটাও দুর্দান্ত হয়েছে।


জেজেবেল

আপনি সুনির্দিষ্টতার উল্লেখ করেছেন, কিন্তু স্বল্পপ্রতিনিধিত্বশীল এমন সব গোষ্ঠীকে যে ছবিগুলো দেখায়, বিশেষ করে এই ছবিটির মতো মোহনাধর্মী যেগুলো, এদের বেলায় একটা বোঝা থাকে মাথায়। তা হলো এদেরকে এদের চরিত্রগুলোর বয়ানের বাইরে বড় করে দেখা হয়। এবং এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না যে আমরা কালো পুরুষদের এমন চিত্রায়ণ খুব বেশি দেখি না যেখানে তারা পর্দায় পুরুষদের সাথে যৌনাচারে লিপ্ত হয়। আমি ভাবি আপনি সেই দায়িত্বের কতখানি গ্রহণ করেছেন অথবা পাত্তা দিয়েছেন বা ভেবেছেন।

ব্যারি জেনকিন্স

দেখুন একজন কালো মানুষ একটা কালো ছেলেকে সমুদ্রে দোলায়, শেখায় কেমন করে সাঁতার কাটতে হয়। অথবা আমার জন্য সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে যখন ত্রেভান্তে-র জন্য আন্দ্রে অলান্দ রান্না করে [রোডস, যিনি শারনের চূড়ান্ত রূপায়ণের ভূমিকায় আসেন]। আমি কখনো একজন কালো পুরুষকে অন্য কালো পুরুষের জন্য রান্না করার দৃশ্য কোনো ছবিতে দেখি নি। আমার মনে হয়েছে, ‘কোন বাঞ্চোতের কারণে আমি দেখলাম না এই দৃশ্য?’ আমার মনে হয়েছে আমাদের ঐরকম সব কিছুকে ঠিক করে দেখাতে হবে। কারণ আমরা যদি ওগুলো ভুলভাবে দেখাতাম, আমার মনে হচ্ছিল আমি ট্যারেলের কাজটির জন্য, চরিত্রগুলোর জন্য, আমার সম্প্রদায়ের জন্য—যে প্রতিবেশে আমি আর ট্যারেল বেড়ে উঠেছি তার জন্য, হানিকর হতো। কিন্তু চিন্তাশীলতার দিক থেকে আমি একজন চিত্রপরিচালক ও একজন শিল্পী হিশেবে চেষ্টা করি এসব না ভাবতে। যেমন ধরুন—‘এই রান্নাঘরটাই কি ঠিক রান্নাঘর?’ ‘সে কি ঠিক পোশাক পরেছে?’ ‘সে কি ঠিক কথাগুলোই বলছে?’ অর্থাৎ বস্তুনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করা। এই যে আলাপ আমরা এখন করছি তা একেবারে গোড়ার দিকেই সেরেছিলাম, আমি যখন মায়ামি উড়ে গিয়েছিলাম সৃষ্টিশীল বিবাহে ট্যারেলের পাণিপ্রার্থনারও আগে। সেই ঘটনা যখন ঘটল এবং তিনি বললেন যে তিনি আমার ওপর আস্থা রাখেন, তখন বাকি রইল, ‘আমাদের এবার ঠিক মতো কাজটা করতে হবে।’ আমাদের সেই অভিনেতাদের খুঁজে বের করতে হবে যাদের এক কেমিস্ট্রি আছে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, দুজন বাচ্চা ছেলে সমুদ্রসৈকতে বসে তাদের প্রথম যৌন-অভিজ্ঞতা লাভ করে, তখন বাতাসে যে চাপ থাকে তা ধরছি আমরা।’

জেজেবেল

একজন বিষমকামীকে (ত্রেভান্তে রোডস) শারনের চূড়ান্ত রূপায়ণের জন্য মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে আপনার মাঝে কোনো শঙ্কা কাজ করেছে?

ব্যারি জেনকিন্স

না। যে সময়টুকু আমরা ছবিটা শুটিং করার জন্য পেয়েছিলাম তা আমি মনে করেছিলাম ঐ বিষয়কে নিজের প্রতিকূলে যেতে দেবার চেয়ে অনুকূলে আনতেই বরং আমি সক্ষম হব। তেমন কারো বদলে যে কিনা চিন্তার দিকে থেকে চরিত্রটির ব্যক্তিত্বকে তৈরি করবে, এমন একজনকে [নির্বাচিত করা] যে কিনা চরিত্রটির ব্যক্তিত্বের সাথে নিজেকে মেলাতে পারবে, চরিত্রটি রূপ দিতে পারবে। কিন্তু আমি বলব, আমরা একটা উন্মুক্ত অডিশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেছি। আমি একবারও অভিনেতাদের কাউকে জিজ্ঞাসা করি নি তাদের যৌনরুচির বিষয়ে। এটা কোনো সমস্যাই ছিল না। চরিত্রটি কী হবে আমার মাথায় এই ধারণা ছিল, এবং ত্রেভান্তে, ব্যক্তিগত জীবনে যার সাথেই সঙ্গম করুক না কেন, সেই চরিত্রটি ছিল না। সে এসে কেভিনের চরিত্র পড়তে আরম্ভ করল, আমি বললাম, ‘না, তুমি ঐ লোক নও।’ সে এখনকার চেয়ে আরও অত্যুৎসাহী ছিল তখন। সে এত বোকাচোদা ছিল যে আমি অন্য চরিত্রগুলির মুখের কথাও তার মুখে শুনতে পেতাম। আমি বললাম, ‘এই লোকটির কিছু একটা আছে। ছবির এই ছেলেটা যা হয়ে উঠেছে এটা নিয়ে এই লোকটার বেখাপ্পা কিছু একটা আছে।’ এরপরও আমরা ওর চোখে দেখলাম যে সে তখনও সৈকতের সেই ছেলেটা রয়ে গেছে, যাকে আমরা দ্বিতীয় গল্পের শেষে গিয়ে ভাঙতে দেখি। আমি ভাবলাম, ‘এটা আমার চরিত্র।’ এবং একথা দিয়ে আমি যা বোঝাই তা হলো : ত্রেভান্তের সাথে খাপ-খাওয়াতে এখন আমাকে এই চরিত্রের ব্যাপ্তিতে বদল আনতে হবে। কারণ ওকে এখানে এত উপযুক্ত মনে হচ্ছিল। সব চরিত্র রূপায়ণ এভাবেই নির্ধারিত হয়েছিল।

জেজেবেল

আমি মনে করি অভিনেতা নির্বাচন এবং ছবির বাকি অংশটাও দুর্দান্ত হয়েছে। কিন্তু বড় পরিসরে যেসব কথা বলা হয় শারন ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষালি এবং সমকামী। সে চলচ্চিত্রের এতসব বাধা গৎকে খণ্ডন করেছে… আপনি একজন বিষমকামীকে অভিনেতাকে দিয়ে চরিত্রটিকে সেখানে পৌঁছে দিয়েছেন। আপনার সাথে কথা বলে এটি অবশ্য পরিষ্কার যে আপনার উদ্দেশ্যের কাছে এসব রাজনীতি গৌণ।

ব্যারি জেনকিন্স

mahershala-ali-02-1488226179
অভিনেতা মাহেরশালা আলি

অবশ্যই এসব গৌণ ছিল। আমরা একটা বিষয় নিশ্চিত করেছিলাম, যদিও আমি জানি না এটা এইচ আর সংক্রান্ত কারণে নাকি অন্য কিছু, যেন অডিশনে আসা কাউকে তার যৌনরুচি নিয়ে প্রশ্ন না করা হয়। কিন্তু, আমার উদ্দেশ্যের নিরিখে এটাই ছিল সবচেয়ে সরাসরি পথ। এমনকি ত্রেভান্তে যখন এল পথ ভিন্ন ছিল না, লোকটার মুখের দিকে তাকিয়েই কাজ হলো। আমি স্বজ্ঞাপ্রবণ শিল্পী। স্বজ্ঞার ওপর ভর করে চলতে চেষ্টা করি। কেউ যখন আপনার রুমে ঢোকেন আর আপনি আপনার কাজের রূপ সেই মানুষের মুখে দেখতে পান, আপনাকে তখন তাকে নিয়েই এগুতে হবে।

জেজেবেল

পরিচিতির রাজনীতির ঢোল এত জোরে বাজাবার জন্য আমার প্রায় অনুশোচনাই হচ্ছে। কারণ ছবিটা আসলেই জমকালো এবং তাক লাগানোভাবে অভিনীত। কিন্তু আমি মনে করি এটাই সবচেয়ে আনন্দের যে, ছবিটি মুক্তি পেল, বিশেষ করে এবারকার মতো একটি বছরে।

ব্যারি জেনকিন্স

হ্যাঁ, আরও বহু যুক্তিতেই। ছবিটা প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে শুরু হয়েছিল, কাজেই এর সংগঠন এই সময়ে এসে শেষ হওয়াটা বিস্ময়কর আনন্দের। আমি জানি না কেন এমন হয়। কী এমন রসায়ন ছিল আমার লক্ষ্য ও ট্যারেলের উদ্দেশ্যের মধ্যে কিংবা আমাদের সকল অংশীদারের মধ্যে এই ছবিটা তৈরি করবার ক্ষেত্রে। কিন্তু মনে হয়, যেন আমি এই গল্পটি বলার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। এই ছবিটি আমি ২০১০, ২০১১-তে তৈরি করতে পারতাম না। আমার মনে হয় না আমার সেই আবেগ ও চিন্তার পরিসর ছিল।

জেজেবেল

আপনি কি আপনার পৌরুষ নিয়ে স্বস্তিতে ছিলেন সেই সময়গুলোতে?

ব্যারি জেনকিন্স

একেবারেই না।

জেজেবেল

এখন স্বস্তি পান?

ব্যারি জেনকিন্স

নির্ঘাৎ আমি স্বস্তিতে আছি! থাকব নাই-বা কেন? আমি যদি স্বস্তিতে না থাকতাম তা ট্যারেল এবং চরিত্রগুলোর প্রতি হানিকর হতো। কথাগুলো প্রায়ই আসে। এমন লোক এসেছেন যারা কাজ করতে চেয়েছেন খাঁটি সহমর্মিতা থেকে। এটা যথেষ্ট নয়। এই ধরনের কাজের লেবেল খুব নিচু হয়, কিন্তু ট্যারেলের কাজটা এত ধারালো এবং সুনির্দিষ্ট ছিল যে, যখন আমি পড়েছি আমার এটা না করে উপায় থাকে নি। না করলে তা হতো কাপুরুষতা। এর মানে যদি এই দাঁড়ায় যে, এই কাজ করতে নিজের পৌরুষের বিষয়ে আমাকে আরও স্বস্তির জায়গায় আসতে হতো, তবে তাই করতে হতো।


আমার অনুমান, আমি সমকামী হতে পারতাম


জেজেবেল

এই ছবি কি আপনাকে নিজের পৌরুষের সাথে স্বস্তির এক জায়গায় এনেছে?

ব্যারি জেনকিন্স

পুরোপুরি। একগাছা যুক্তিসঙ্গত কারণে। যখন সুপ্রিম কোর্ট সমলিঙ্গ বিয়ে আইনসঙ্গত করল জাতীয়ভাবে, সবাই তাদের ফেইসবুক প্রোফাইল রংধনু রঙে বদলালো, আমার কাছে সেসব ছিল পরোক্ষ সমর্থন, পরোক্ষ সহমর্মিতা। আমি অনুভব করলাম, এসব পেরিয়ে গিয়ে একজন সক্রিয় সমর্থক হতে হবে, সক্রিয় সহমর্মিতা ঢালতে হবে। আমি যখন রংধনু রঙে আমার প্রোফাইল বদলালাম। আমার এক ভাই-সম্পর্কীয় আত্মীয় বলল, ‘হচ্ছেটা কী রে ভাই? করছ কী তুমি?’ আমি যাদের সাথে বেড়ে উঠেছিলাম তাদের সবার কাছ থেকে এত দূরে থাকি। তখন উপলব্ধি করলাম, আমার অনুমান, আমি সমকামী হতে পারতাম। আর সে কথা এরা জানতেই পারত না। আমি ভাবলাম, ‘এর উপযুক্ত জবাব কী হতে পারে?’ ভাবলাম, ‘কোনো জবাবই দেবো না। চুদি না তোদের।’ মানে, আমি আমার সেই ভাইকে ভালোবাসি, কিন্তু আমার উঠে দাঁড়াবার জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল। এসব ঘটেছিল এই ছবি তৈরি করতে যাবার আগে। আমাকে দাঁড়াতে হয়েছিল।

তানভীর মাহমুদ

তানভীর মাহমুদ

জন্ম ৯ অক্টোবর, ১৯৮০, ঢাকা। ইংরেজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। এমবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অপরাধতত্ত্ব ও বিচার-এ এমএসএস।
পেশা : চাকরি।

প্রকাশিত বই : প্রতিবিহার (কবিতা)

ই-মেইল : editor.hansadhani@gmail.com
তানভীর মাহমুদ