হোম অনুবাদ অসমাপ্ত ভুতের গপ্পো

অসমাপ্ত ভুতের গপ্পো

অসমাপ্ত ভুতের গপ্পো
246
0

আমার মা প্রায়ই ভুতের দেখা পান। সত্যি কিনা কে জানে? কোথায় যেন পড়েছিলাম অ্যালার্জির সাথে এ ধরনের মানসিক অবস্থার একটা যোগসূত্র রয়েছে। ধারণাটা আরও পাকাপোক্ত হলো কারণ মারও খুব অ্যালার্জির সমস্যা ছিল এবং তিনি মোটেও ডাক্তার দেখাতে চাইতেন না। সবচেয়ে বেশি ধূম্রজাল সৃষ্টি হতো তার মন-মেজাজের হালনাগাদ বুঝতে… এই রেগে যান তো এই হাসেন, কখনও দুঃখবোধে কাতর হয়ে পড়েন আবার খানিক বাদেই দায়িত্বশীলতার মোড়কে ঢাকা এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের রূপ ধারণ করেন।

আমার মা প্রথম যাকে ভুত হিশেবে দেখেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিলেন। অ্যালেন কুক। শুধু ষাটের দশকে তার লম্বা ঘন কালো চুলের কথা ছাড়া আমার আজ আর বেশি কিছু মনে নেই। মা বলতেন, দুজন গাড়িতে গুড, ব্যাড অ্যান্ড আগলি-র থিম সং বাজিয়ে তারা শহরজুড়ে ঘুরে বেড়াতেন। চালকের আসনে থাকতেন মার স্কুল জীবনের বন্ধু টম আলভারেজ। তবে টমের সাথে সম্পৃক্ততাকে মন দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক বলতে নারাজ মা, তার দাবি নিছকই বন্ধু ছিল টম।


মা কখনই ধার্মিক ছিলেন না। তবে বাইবেলের প্রতি তার ভক্তি বেশ স্পষ্ট ছিল। চার্চের কিছু সংগীতের প্রতিও বেশ অনুরক্ত ছিলেন যা আমরা বুঝতে পারতাম।


অনেক মজার সময় পার করতেন মা এবং বন্ধুরা। ধরা যাক কখনওবা খালি পরিত্যক্ত কারখানায় ঢুকে হৈ-হুল্লোড়, কখনওবা জেটির ধারের কফিশপে গরম ধোঁয়া উঠা কাপ হাতে তুমুল আড্ডাবাজি। রাত গভীর হয়ে গেলে হয়তো কাপড় বিছিয়ে খোলা ময়দানেই রাত্রি কাটিয়ে দিতেন তারা। সবটাই অবশ্য নিছক ঝোঁকের বশে।

অ্যালেন শুধু আমার মা নয়, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথেও মিশতেন নিয়মিতই। বিশেষ করে লিন্ডা আন্টির সাথে। মার অন্যান্য বন্ধুদের মতোই আমার বৃদ্ধ দাদু-দাদির সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করে কাটাতেন এলেন। জে আর আর টকিয়েন-এর বই পড়ার অভ্যাস ছিল অ্যালেনের। প্রায়ই তার হাতে এলভিশের একটা কপি চোখে পড়ত আমার।

ফেরা যাক মার কথায়। কোনো চরিত্রের উপস্থাপন মা একেবারেই করতে পারতেন না। অবশ্য বাবা এ বিষয়ে বেশ পারঙ্গম ছিলেন; সহজেই অতীতের যেকোনো চরিত্রকে কোনো বিশেষণ দিয়ে মজার করে তুলে ধরতেন আমাদের সামনে যা মার ক্ষেত্রে ভাবাই যেত না। বরং মা তার জীবনের গল্পগুলোকে ছবির মতো সাজিয়ে আমাদের শোনাতেন। তাতে থাকত না কোনো অতিরঞ্জন। শৈশবে সাইপ্রাস গাছের যত্ন নেয়ার গল্প; কিংবা পপ ফেস্টিভ্যালে উপভোগের স্মৃতিগাথা তিনি শোনাতেন আর যেন সব ছবির মতো স্পষ্ট হয়ে উঠত আমাদের চোখের সামনে। কিভাবে পারতেন মা? আমি যখন আমার টিনএজ নিয়ে লিখি তখন চেষ্টা করি অতিকথন করতে। পাঠক-প্রিয়তার কথা ভেবে কখনও দৃষ্টি আকর্ষক কথা জোড়া লাগিয়ে দেই কখনওবা খুবই আবেগঘন কথা। কিন্তু এসবের কোনোটাই মা করতেন না। মাঝে মাঝে আমাদের মনে হতো, মার কি ছেলেবেলার কথা আদৌ মনে আছে কিছু?

২.
তবে মা আমাদের প্রায়ই ভুতের গল্প শোনাতেন। যদিও তাতে প্রয়োজন মতো রং চড়াতেন তিনি। বেশি ভীতিকর হলে এড়িয়ে যেতেন। তবে ঠিকঠাক ভাবে গল্পের আমেজ ফুটিয়ে তুলতে করতেন কণ্ঠের উঠানামা। সে সময় তার গলার স্বর আমাদের কাছে অপার্থিব মনে হতো। কখনও সেসব গল্প ছিল অতিকথন, কখনও উত্তেজনার পারদে ঠাসা।

মা কখনই ধার্মিক ছিলেন না। তবে বাইবেলের প্রতি তার ভক্তি বেশ স্পষ্ট ছিল। চার্চের কিছু সংগীতের প্রতিও বেশ অনুরক্ত ছিলেন যা আমরা বুঝতে পারতাম। শ্রদ্ধাবোধ ছিল যিশু খ্রিস্টের প্রতিও। একবার মা এবং আমি বিলিফনেট ডট কম-এ একটি ধর্মীয় কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। মজার বিষয় হলো তারা আমাদের দুজনকেই ধার্মিক হিশেবে চিহ্নিত করেছিল।

যা হোক, মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক। মার ঐ বান্ধবী অ্যালেন দূরে মেয়েদের একটি কলেজে পড়তে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে  একজন বয়ফ্রেন্ডও জুটিয়েছিলেন তিনি। যদিও মা তাকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। তো হঠাৎ একদিন খবর এল সড়ক দুর্ঘটনায় অ্যালেন নিহত হয়েছেন। তুষারপাতের মাঝে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে মা এজন্য দায়ী করে অ্যালেনের বয়ফ্রেন্ডকেই। তার দাবি, অ্যালেনকে গাড়ি চালানোর স্বাধীনতা দেয়া মোটেও উচিত হয় নি তার।

এ ঘটনার পর মা বার্কেলে থেকে ঘরে ফিরে এল। পুরো বিষটার কিছুই বুঝতে পারছিলাম না আমি। অপেক্ষায় ছিলাম কখন অ্যালেনের মরদেহ ফিরিয়ে আনা হয়। তবে আমি অবাক হচ্ছিলাম সবাই সত্যি জানার চেষ্টা না করে মাকে প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে মা মাঝে মাঝেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিল যা আমাদের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ ছিল।


কল্পনায় আমি প্রায়ই সেই ঘরটায় শুয়ে থাকি, তাকিয়ে থাকি ঐ আয়নার দিকে। কিন্তু সেই ভুত কখনোই আমার দিকে চেয়ে থাকে না।


তবে অ্যালেনের শেষকৃত্যের দিন মা মুখ খুলললেন। জানালেন গত রাতে লিন্ডার আন্টির সাথে তার ব্যাপক কথা কাটাকাটি হয়েছে যা এক পর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একটি খামার বাড়িতে একসাথে একটি রুমে থাকার সময় এ ঘটনা ঘটে।

কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো হঠাৎ তীব্র আলোর ঝলকানি দেখা দিয়েছিল রুমে থাকা আয়নায়। মা বললেন, ‘তাকিয়ে দেখি অ্যালেন আমার দিকে তাকিয়ে বলছে মারামারি বন্ধ করো। আমি ও লিন্ডা দুজনেই অনুভব করলাম এটা অ্যালেন। আমরা শান্ত হলাম। মুহূর্তেই যেন শান্তির ছোঁয়ায় ভরে গেল পুরো ঘর।’

শৈশবে এ গল্প শুনে আমি বেশ মুগ্ধ হতাম। এমনকি প্রতিবছরের আগস্টে যখন আমি দাদুবাড়ি যাই তখন ঐ ঘরটাতেই থাকি। আয়নাটি এখনও আছে। আমি তাকিয়ে থাকি আয়নাটার দিকে। যেন আমার জন্য এখনও অপেক্ষা করে আছে অ্যালেনের ঐ ভুত।

প্রায়ই ভাবি একদিন ঐ রাতের ঘটনা সম্পর্কে লিন্ডা আন্টিকে জিজ্ঞাসা করব। কিন্তু হয়ে ওঠে না কারণ মা কিংবা আন্টি কেউই আর ঐ বিষয়ে কথা বলার অবস্থায় নেই। ফলে কল্পনায় আমি প্রায়ই সেই ঘরটায় শুয়ে থাকি, তাকিয়ে থাকি ঐ আয়নার দিকে। কিন্তু সেই ভুত কখনোই আমার দিকে চেয়ে থাকে না।

লতিফুল বারী

লতিফুল বারী

লেখক ও সাংবাদিক।
জন্ম: ২২ জুন, ১৯৮৮; বগুড়ায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যায়ন বিভাগে স্নাতকোত্তর।
কাজ করেন একটি বেসরকারি বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তা বিভাগে।

ইমেইল: nebir_bd@yahoo.com
লতিফুল বারী