হোম অনুগল্প কবি এবং ক্রসফায়ার

কবি এবং ক্রসফায়ার

কবি এবং ক্রসফায়ার
91
0

কবি এবং ক্রসফায়ার

কবিকে ফোন দিলেন এক পাঠক। বললেন, ‘আইনের চোখে আপনি অপরাধী। যেকোনো সময় ক্রসফায়ারে পড়তেই পারেন।’ এতে একটু ঘাবড়ে গেলেন কবি। জানতে চাইলেন, ‘কেন?’

পাঠক বললেন, ‘কারণ আপনার লেখা পড়ে আমি মাতাল হয়েছি।’


ঈশ্বরের দাওয়াত

সপ্তাহে সবাই একদিন প্রার্থনার জন্য জমায়েত হয় মন্দিরে। তেমনি এক সকালে লোকজন এসে দেখতে পায়, ভেতর থেকে মন্দিরের দরজা বন্ধ। তখনও মন্দিরে পূজারি এসে পৌঁছান নি। পূজারি এসেও দেখলেন বাইরে দাঁড়িয়ে লোকজন। ভেতরের অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করলেন তিনি। দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ভেতরে কে? সবাই তো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।’ এরপরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া এল না। পূজারি আবার বললেন, ‘আরে, তোমার চাওয়াটা না জানলে কিভাবে তোমার সব ব্যবস্থা করে দেবো?’ তখন ভেতর থেকে একজন বলল, ‘মন্দিরের ভেতর কাউকে ঢুকতে দেবো না আমি। আজ কাউকে ঈশ্বরের ভাগ দেবো না। আজ ঈশ্বর শুধু আমার। একাই তার প্রার্থনা করব আমি।’

মানুষটার বোকামি ধরে ফেললেন পূজারি। জোর গলায় বললেন, ‘আহা, কী সর্বনাশ করেছ! এই জন্যই তো বলি, ঈশ্বর কেন বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন। তিনি তো মন্দিরে প্রবেশ করতে পারছেন না! রোদে পুড়ছেন।’

ভেতর থেকে লোকটি বলল, ‘ঈশ্বর বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন?’

এবার তাকে ঠিকভাবে পেয়ে বসল পূজারি। বলল, ‘সারা রাত তিনি স্বর্গে ছিলেন। সকালে মন্দিরের সামনে এসে দেখলেন তুমি দরজা বন্ধ করে বসে আছো। তাই বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন, রোদে পুড়ছেন। এখন তুমি যদি দরজা না খুলো তবে তিনি আবার স্বর্গে চলে যাবেন।’ একথা শুনে দেরি না করে দরজা খুলে দিল লোকটা। সবাই ঢুকল মন্দিরে। লোকটি তখন পূজারিকে বলল, ‘ঈশ্বর কি এখন মন্দিরে প্রবেশ করেছেন?’

পূজারি বললেন, ‘সবাই প্রবেশ করলে তবেই সবার শেষে মন্দিরে প্রবেশ করেন ঈশ্বর। কিন্তু তিনি তো তোমার উপর রাগ করেছেন। তাই তোমার উপর একটা দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি।’

‘কী দায়িত্ব?’ জানতে চাইল লোকটা। পূজারি বলল, ‘যারা মন্দিরে আসবে না তাদের দায়িত্ব তোমার উপর দিয়েছেন। এখন থেকে তাদের কাছে তার দাওয়াত পৌঁছে দেবে তুমি। তাদেরকে বলবে মন্দিরে আসতে।’

‘ঈশ্বর তাহলে আমার কথাও ভাবেন!’ এই বলে সানন্দে রাজি হয়ে গেল লোকটা। আর পূজারি মনে মনে বললেন, ‘যুগে যুগে এভাবেই বোকারা মানুষের দ্বারে দ্বারে ঈশ্বরের দাওয়াত নিয়ে যায়।’


পতন

নাতিকে নিয়ে স্ত্রীর কবর জিয়ারত করতে যাচ্ছেন নানা। মাঠ পেরিয়ে যাচ্ছিলেন। সামনে পড়ল একটা বড় গাছ। গাছ দেখে নাতি বলল, ‘এই গাছে নিশ্চয়ই পাখি থাকবে নানা।’ নানা বললেন, ‘দেখো খুঁজে, তোমার জন্য কোনো পাখি অপেক্ষা করছে কিনা!’ গাছের দিকে তাকাতেই তাদের চোখে পড়ল একটা পাতা উপর থেকে এঁকেবেঁকে ঝরে পড়ছে। দুজনের চোখ অবাক হয়ে দেখতে লাগল সেই দৃশ্য। নানা দ্রুত ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘গাছের কাণ্ডে কান পাতো।’ নানার কথায় নাতিও কিছু না ভেবে কান রাখল গাছের কাণ্ডে। নানা জানতে চাইলেন, ‘শুনতে পাচ্ছ কিছু?’

নাতি বলল, ‘গাছের সমস্ত পাতারা চিৎকার করছে নানা। কিন্তু কেউ তারা ওই পাতাটার পতন ঠেকাতে পারছে না।’

নানার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা অশ্রু। বলল, ‘তোর নানির মৃত্যুর সময়ও আমরা সবাই চিৎকার করেছি, কিন্তু কেউ ঠেকাতে পারি নি। মৃত্যুকে কেউ ফেরাতে পারে না।’


কবর

অন্ধ ব্যক্তি এক লোকের কাছে জানতে চাইল, ‘মরে যাবার পর সবাইকে কবর দেওয়া হয়। কবরে কী আছে?’

লোকটি বলল, ‘কবর তো মাটির নিচে হয়। শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার।’

তখন অন্ধ লোকটি দুঃখ করে বলল, ‘আমার তো সবকিছুই অন্ধকার। আমি তো সবসময় একটা কবর নিয়েই হাঁটি।’


একসঙ্গে

একটি পা বলল, ‘হাঁটার সময় বারবারই মনে হয় এই বুঝি তুমি আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছ।’ অন্য পা-টি বলল, ‘আমারও ঠিক একই কথা মনে হয়, এই বুঝি তুমি আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছ।’ প্রথম পা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘সারা জীবন আমরা একসঙ্গে থাকি, অথচ ভাবো, কখনোই একসঙ্গে হাঁটতে পারি না।’

চন্দন চৌধুরী

জন্ম ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭৫, কুমিল­া। স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশক।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
যাবে হে মাঝি, দিকশূন্যপুর [বলাকা, ২০০৩]
লাল কাঁকড়ার নদী [বলাকা, ২০০৭]
কাকের ভাস্কর্য [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০১১]
হাসির দেবতা [গদ্যপদ্য, ২০১৩]
অক্সিজেনের গান [গদ্যপদ্য, ২০১৪]
কন্যা কালীদহ [গদ্যপদ্য, ২০১৪]
মা-পাখি ম্যানিয়া [বেহুলাবাংলা, ২০১৫]
পাণ্ডবজন্ম [বেহুলাবাংলা, ২০১৫]
ঢাকা সিরিজ [বলাকা, ২০১৫]

ছোটগল্প—
আয়নাপাথর [কথাপ্রকাশ, ২০০৯]

অণুগল্প—
না-মানুষ [বেহুলাবাংলা, ২০১৭]

উপন্যাসিকা—
নীলতোয়া জোনাকি [বলাকা, ২০০৪]

শিশুতোষ গল্প—
গোল্ডফিশ ও একটি প্রজাপতি [বলাকা, ২০০৪]
শহরজুড়ে বাঘ-ভালুকের মিছিল [বলাকা, ২০০৮]
হ্যালো ফড়িংমিয়া [বলাকা, ২০১০]
দুষ্টুরা দশ মিনিট আগে [কথাপ্রকাশ, ২০১০]
ভূতের বাচ্চাটা ক্লাসে এলে কাঁদে [কথাপ্রকাশ, ২০১৪]
সাত রঙের ভাই বোন [বেহুলাবাংলা, ২০১৫]

শিশুতোষ ছড়া—
লাল ফড়িঙের বৌ [কথাপ্রকাশ, ২০১০]

অনুবাদ—
যাযাবব, মূল : কাহলিল জিবরান [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০০৮]
গহীনে গোপনে, মূল : কাহলিল জিবরান (যৌথ) [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০১১]
আরব বিশ্বের কবিতা [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০১৩]
নতুন ডানার উড়াল, পৃথিবীর তরুণ কবিদের কবিতা [কথাপ্রকাশ, ২০১৩]
অগ্রদূত, মূল কাহলিল জিবরান [বেহুলাবাংলা, ২০১৭]
পৃথিবীর ঈশ্বরের, মূল : কাহলিল জিবরান [বেহুলাবাংলা ২০১৮]

সম্পাদনা—
শূন্য দশকের গল্প [কথাপ্রকাশ, ২০১৩]

জীবনীমূলক—
বীরশ্রেষ্ঠ (ছোটদের) [কথাপ্রকাশ, ২০১০]
মাদার তেরেসা (ছোটদের) [কথাপ্রকাশ, ২০১১]
বিশ্বজয়ী বাংলাদেশি [কথাপ্রকাশ, ২০১৫]

ই-মেইল : chandan.kk75@gmail.com

Latest posts by চন্দন চৌধুরী (see all)